শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

পূর্ণ প্রাণে চাবার যাহা…

“জন মন মুগ্ধ কর উচ্চ অভিলাষ, তোমার বন্ধুর পথ অনন্ত অপার,
অতিক্রম করা যায় যত পান্থশালা, তত যেন অগ্রসর হতে ইচ্ছে হয়”।

(দ্বাদশ বর্ষীয় বালকের রচনা। পরবর্তী জীবনে তার বিশ্ব- বিশ্রুত পাকা দাড়ির আভাসও ছিলনা তখন। সেই এক ক্ষয়িষ্ণু হলেও জমিদার সন্তানের বিপ্রতীপ পৃথিবীতে কিভাবে – এ ‘ভাবে’ – পৌঁছল সে? ব্রহ্মা জানেন বা তিনিও জানেন না। কাজেই আমাদের মতন নির্বুদ্ধি-জীবীর তেমন চিন্তা পণ্ডশ্রম। তেমন জাতক এই পুণ্যভূমিতেও সকলের মাঝে একা। সে প্রসঙ্গ থাক আর তিনিও আপাতত নেপথ্যে থাকুন। এবার কয়েকটি ঘোষণা দিয়ে বিষয় প্রবেশ। )

‘দাদা পিছন দিকে এগিয়ে যান , ফুটবল মাঠ পড়ে আছে পিছনে, তবু দরজার কাছে মারামারি, এগোন এগোন পিছনের দিকে… টিকিট… টিকিট…’

‘একটু আগু-পিছু করে বসলেই পিছনে বাচ্চাটা আর তিনজন বসতে পাবেন। আর এখনই বলে দিচ্ছি – খুচরো থাকলে তবেই উঠবেন, আমাদের টাঁকশাল নেই যে আপনাদের সারাদিন খুচরো দিয়ে যাব, আর আগে জ্যাম আছে তাই পুকুর পাড় দিয়ে ঘুরে যাব, যাদের অসুবিধে তারা চাপবেন না’।

‘টিং টং। অনুগ্রহ করে শুনবেন, ট্রেন নম্বর ১২৩৪ কলকাতা – দিল্লি এক্সপ্রেস যার আসার সময় ১০ বেজে ১০ মিনিট – নির্ধারিত সময়েরে চেয়ে ৪ ঘণ্টা বিলম্বে চলছে। যাত্রী সাধারণের অসুবিধের জন্যে আমরা দুঃখিত’।

‘মহোদয় এবং মহোদয়া, বালক এবং বালিকা বৃন্দ, উড়ান সংখ্যা ১১১ এ স্বাগত। আমাদের আজকের বৈমানিকরা হলেন দলপতি শ্রী ‘ অ’ যিনি আমেদাবাদের বাসিন্দা এবং সহকারী শ্রী ‘আ’ বাঙ্গালুরু থেকে। বিমান পরিসেবায় আছে ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ এবং আমি মুখ্য পরিসেবিকা ‘ঘ’। আমাদের উড়ান কম বেশি দু ঘণ্টা কুড়ি মিনিটে মুম্বাই পৌঁছাবে। আমরা হিন্দি ইংরেজি বলতে পারি। মারাঠি ও নেপালি অল্প কিছুটা। কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনাদের জলপান সেবা শুরু হবে । বিমানে ধূমপান…… ইত্যাদি ইত্যাদি’।

প্রথম ঘোষণা থেকে দ্বিতীয়, তৃতীয় হয়ে চতুর্থ ঘোষণায় পোঁছাতে, অর্থাৎ অগতির থেকে গতিতে পৌঁছতে – দুখিরামের জীবন চলিয়া গেছে কুড়ি কুড়ি বছরের পার। সে কতদূর সেই মানব সমাজ যখন সে পেয়েছিল প্রথম গতির স্বাদ। যখন বাবার সাইকেলটিতে ঈশ্বর প্রাপ্তির আনন্দ লেগে থাকত। যে সমস্ত বন্ধুর নিজস্ব সাইকেল ছিল (অতি অল্প) তাদের অধিষ্ঠান ছিল রোমান নৃপতিদের কাছাকাছি। পিত্তি জ্বালানোর জন্যে তারা প্রতি পনের মিনিটে নরম কাপড় দিয়ে সাইকেল মুছত বা টায়ারের হাওয়া পরীক্ষা করে দেখত। সাঁই সাঁই বাতাস কেটে তাদের জয়যাত্রা, অনেক কিশোরী হ্রদয় গভীরে নূপুর বাজিয়ে যেত। কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে। অন্তত দুখিরাম – যে কিনা স্বঘোষিত আনন্দের পূজারি – সেই চাকার দাগে পা দেবে না। সব দাগ ভালোও নয়, আর ওঠেও না, তা সে যতই দামী সাবানেই কাচা হোক।

যে সংস্থায় দুখিরাম কর্মরত ছিল, সে সদাই তার পায়ে গড় করে। এক নিতান্ত অপদার্থ মানুষকে সাত ঘাটের জল খাইয়ে স্থল থেকে হাওয়ায় ভাসিয়েছে। শেষ কিছুকাল দুখিরাম হাওয়াই সফরের অধিকারী হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ বুঝেছেন সময়ের মূল্য টাকার থেকে কিছুটা বেশি । তাই রেলগাড়ির বদলে হাওয়া গাড়ি। তা আকাশে ভাসা আজ কোনো খবরই নয়। আর্থ সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গী হয়ে বাতাস বাড়ির খরচ কিছুটা কমেছে আর সামগ্রিকভাবে মধ্যবিত্তের পকেট কিছুটা ফুলেছে। বাবা মায়ের রুচি, রুজি ও পুঁজির সামগ্রিক উন্নয়নে ছেলে পিলেদের শৈশব থেকেই সর্বস্তরে সর্বোচ্চ হবার শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে । বাতাসে ভাসাটাও সেই শিখর দর্শনের ফল। কিন্তু দুখিরামের বর্ণ পরিচয় ও সমকালীন ভারতবর্ষ, তেমন ছিল না। সুনীল আকাশে একটি চলমান বিন্দুর দিকে ঘাড় ব্যথা করে তাকিয়ে থাকা , জেট বিমানের সাদা লেজ ধীরে ধীরে মেঘের ব্যাপ্তিতে বিলীন হওয়া তার অপার বিস্ময়ের বাল্যকাল, অপুর রেল গাড়ি। তবে গল্পটার একটা খোঁচা আছে।

একবার কাজের সূত্রে এক মাসে দুবার ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানীতে যেতে হবে বলে দুখিরাম কিছুক্ষণের জন্যে বিরক্ত হয়ে ছিল। একে তো দু তিন দিন দারু-ভুত জগন্নাথ হয়ে কাল কাটান বিশেষ বিড়ম্বনা, তায় বিমান যাত্রা । কৈশোরের মুগ্ধতা তার কেটে গেছে। সে বস্তুত এক গাঁ গঞ্জের মানুষ। মাটির থেকে কয়েক হাজার ফুট উপরে – হাওয়াই সুন্দরী হাসি-রাশি দেবী যা দেবেন তাই গ্রহণ বাধ্যতামূলক। যেখানে বাদাম-মুড়ি পাওয়া যায় না। চা ঠিক দুর্লভ নয়, কিন্তু ভূপাতিত হবার পর সেই খরচায় এক পেগ ‘রাজকীয় স্পর্ধা’ পেয়ে যাবেন ছোটখাটো মধুশালায় । জানলার বাইরের দৃশ্য অধিকাংশ সময়েই অতীব বিরক্তিকর। পাশের মানুষের সাথে কথা বলার জো টি নেই। আর মাঝের হাতলটি যে কার দখলে থাকবে তা জজেও জানে না। প্রকৃতি ডাকলে – খুপরিতে দম বন্ধ হয়ে যায়, সে বড় সুখের সময় নয় । তাছাড়া বদ্ধ জায়গার প্রতি তার একটা লজ্জা মিশ্রিত ভয় আছে। এই সব মানসিক তর্কাতর্কি অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যেই দুখিরাম জিভ কেটে ইতি উতি তাকিয়ে দেখেছে, কেউ দেখে নি তো, কেউ বোঝেনি তো তার মনের খবর। ‘যে জীবন ফড়িং-এর’ তাই তো চেয়েছিল সে । হাওয়াই সফর, নিজস্ব খুপরি ঘর, টেবিলের কোন, শোভে টেলিফোন, কণ্ঠের টাই, বারফট্টাই। প্রাপ্যের অধিক পেলে মন এমন বিগড়োয় বটে। বেশ ভাবনার কথা।

গপ্পোটা কিন্তু দুখিরামের ল্যাজ মোটা হবার ইতিবৃত্ত নয়। একা এবং কয়েক জনের চাওয়া পাওয়ার দিক বদলের ইতিহাস। এক দিকদারির দর্শন।

খুব সম্ভব ১৯৭৫-তে দুখিরামের বাড়িতে প্রথম একটি রাশভারী কালো টেলিফোন বসে। ঘরের সব থেকে অভিজাত আসবাব হিসেবে তার গুমোর ছিল দেখার মতো, সে ছিল পাড়ার খবরদার । মাঝে মাঝেই ‘ক্রং ক্রং’ করে গর্জন ছাড়ত আর কে তাকে দৌড়ে ধরতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলত আমাদের মধ্যে। ২০০২ দুখিরামের হাতে প্রথম মোবাইল , আস্তে আস্তে সবার হাতে- তারপর টেলিফোন ব্রাত্য। দুখিরামের এক বন্ধু আবার একটি ঘড়ি (কিম্বা ঘড়ি নয়) তাতেই কথা সারে। দুখিরাম ভাবে সেও একটা কিনবে নাকি ? অথচ এক সময় ওই টেলিফোনটিই তার স্বপ্ন ছিল। শেষ কথা কে বলবে ?

জীবনের প্রথম এক দরজার এক রত্তি হিমানী আলমারি সত্তরের গোড়ায় , উপভোক্তা পাঁচ জন , সেখানে বরফ আর বিস্ময় এক সঙ্গে জমা হত। তিন দশকে হিমালয়ের বরফ অনেকটাই গলে গেছে। দুখিরাম এখন আপনি আর কপনি মাত্র। ঘরে দু-দরজার বেশ বড় যন্ত্রটিতেও আজো সেই বরফই জমে, শুধু জমা বিস্ময় কখন গলে উবে গেছে । অন্যের বাড়িতে চার দুয়ারী বরফ কল দুখিরাম আড়ে আড়ে চায়। শ্রীরাধা যেমন যা পেলেন রাখতে পারলেননা, জীবন কাটল অলীকের সন্ধানে।

তার ছেলে মেয়ে বা বউয়ের বেশবাসে আলমারি উপচে পড়ে, তবু এদিক ওদিক গেলেই দুখিরাম আরও কিছু নিয়ে আসে। এ ঠিক কিসের হাতছানি ?

ভারতবর্ষে ইতিউতি কিছুটা ঘুরেছে দুখিরাম, সিংহ ভাগ এখনো ছোঁওয়াই যায় নি অথচ বিদেশ যাত্রার টিকিট সুলভ বলে বিজ্ঞাপিত হলে সে উৎকট আগ্রহে দেখে। আঙুর যদি মিষ্টিও হয় পেড়ে খেতেই হবে ?

দুখিরামের এক নিকটাত্মীয় একটি রাজা-গজা গাড়ি কিনেছেন। সেটি দেখে – না না দুখিরামের কোনও স্পর্ধিত ইচ্ছে হয়নি – বরং সে সভয়ে ভেবেছে নতুন গাড়িতে যা আছে – এনার আগের গাড়িতেও (সেও দামি তবে তুলনায় কম) সবই তো আছে। এমন কি দুখিরামের নিতান্ত হেলাফেলার চারচাকাটিতেও আছে। তবে ? আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না।

বীমা ব্যবসায়ে মানুষের গড় আয়ু হিসেব করার একটি মোটা উপায় আছে। মা, বাবা কত দিন জীবিত ছিলেন তা যোগ করে দুই দিয়ে ভাগ করা। সে অংককে মান্যতা দিলে আজ – বিধাতা দুখিরামকে যে জীবন রসদ দিয়ে চরতে পাঠিয়েছেন, তা শেষ। আশার কথা বিজ্ঞান ও অংক – জীবনে সব সময় মেলেনা । কোথাও যেমন মাইনের ওপর বোনাস পাওয়া যায় । তবে তবে দুপুরের রোদ আর নেই একথা বুঝে নেওয়াতেই বুঝদারি। এখন বুঝবে – না বোঝা বাড়াবে – তার খোঁজেই দুখিরামের এত বকবকানি।

কথা শুরু হয়েছিল যাওয়া- আসা, হাওয়ায়-ভাসা নিয়ে। কিম্বা নতুন কিছু পাবার ক্ষীয়মাণ আনন্দ নিয়ে। শেষে ডিঙি ভিড়ল – শুধু পাশের জন কি পেলো সেই ঘাটে। শুধু অভীপ্সার অভিমুখ পালটে গেল বারবার, ভাঁড়ার পূর্ণ হল না কিছুতেই, দিনের শেষে হাতে রইল পেনসিল। যে ছেঁড়া পাতা শেষ তক্‌ দুখিরাম খুঁজে পেয়েছে – বস্তুত তা বহু প্রাচীন- তবে মানে বুঝতে নিজেকেও ঝুরি নামানো বট হতে হয়। যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই – যাহা পাই তাহা চাই না। এ এক শাশ্বত সত্য – কারণ গোড়ায় গলদ। ঠিক কি যে চাই সেটাই এক অনন্ত অডিসি। বুদ্ধেরই বুঝতে কত জন্ম লেগে গেল আর ক্ষুদ্র জীব তার সন্ধান পাবে কি। তবে তার ঠাকুর আছেন। তার গান অবসরে নতুন করে বুঝবার চেষ্টায় আছে দুখিরাম। তিনি গাইছেন –

পূর্ণ প্রাণে চাবার যাহা রিক্ত হাতে চাস নে তারে …।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x