
(প্রাককথনঃ রবিচক্রের সম্পাদক মশাইয়ের অনুরোধে আরও একটি লেখা পাঠালাম পত্রিকার পাঠকদের জন্য। আগের বারের আন্তর্জাতিক রাজনীতির মতো গুরুগম্ভীর একটি বিষয়ের পর এবার একটি ভ্রমণ কাহিনী। ডায়রির পাতা থেকে লেখাটি সোজাসুজি তুলে দিলাম। বছর ছয়েক আগে লেখা। সুতরাং এতদিনে হয়ত পরিস্থিতি আর জিনিসপত্রের দাম অনেকটাই পালটে গেছে। সেটাকে আর সংশোধন করিনি। পেটুক বাঙালি আমি, তাই ঘোরার সাথে সাথে খাবার নিয়েও লিখেছি। না হলে তো ঘোরাটাই বৃথা। ডায়রি লেখার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী লেখাতে আমার ব্যক্তিগত মতামতেরও কিছু প্রকাশ ঘটেছে। কোনো পাঠকের মনে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলে আগেই নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। লেখা ভাল লাগলে জানাবেন, গঠনমূলক সমালোচনাও স্বাগত। – ব্রিগেডিযার দেবাশিস দাস। ই-মেল: debs871@gmail.com)
১৭/১৮-ই নভেম্বর, ২০১৯…
ছোটবেলায় বলতাম কাম্পুচিয়া। এখন তা বদলে কম্বোডিয়া। এবার সাকুল্যে দুজন। আমি আর ব্রততী। লোকে বলে বেটার হাফ, আমি বলি বেটার থ্রি কোয়ার্টার। তাকে ছাড়া আমি ওই অচল সিকি!
প্রথমে কলকাতা থেকে আমাদের বিমান উড়ে গেল মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর। তিন ঘন্টার সফর। তারপর প্রায় পাঁচ ঘন্টা বিরতি। এয়ারপোর্টের মধ্যেই ঘুরে ঘুরে Duty Free shop গুলির সম্ভার আর এটা সেটা চেখে দেখতে দেখতে সময়টা বেশ কেটে গেল। এবার ছোট সফর। দুই ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম কম্বোডিয়ার রাজধানী নম পেন (Phnom Penh) । এই দেশে এখনও ‘ভিসা অন অ্যারাইভাল’। তবে বেশ ভালোই মাশুল দিতে হলো। মাথাপিছু তিরিশ ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় আমাদের দু’জনের লাগলো সাড়ে চার হাজার টাকা। অবশেষে লটবহর নিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরে। সেই রাত দশটায় দমদমে পৌঁছে প্রায় ১২ ঘন্টা পর মুক্ত আকাশ বাতাস পেলাম। এদের দেশে এখন দুপুর ২টো আর ভারতে সকাল সাড়ে এগারোটা।
এয়ারপোর্ট থেকেই টুকটুক ভাড়া করে রওনা হলাম আমাদের হোটেলের উদ্দেশ্যে। আমাদের অটো রিকশার মতনই এখানে টুকটুক। অতি জনপ্রিয় ও সস্তা। ছোট টাঙার মতন গাড়ি তবে সামনে ঘোড়ার জায়গায় মোটর সাইকেল লাগানো। বেশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে, খোলামেলা হয়ে বসা যায়। রাস্তায় কিছু অটোরিকশাও দেখলাম। আশ্চর্য ও আনন্দিত হলাম যে সেই অটোরিকশাগুলো সব ভারতে তৈরি। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল পৌঁছতে পৌঁছতে নম পেন শহরের অনেকটাই দেখা হয়ে গেল।

আমাদের বহুতল হোটেল মেকং নদীর কাছেই। অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা সব এখানকার খেমর ধাঁচের। তাড়াতাড়ি চেক-ইন শেষ করেই খেতে চলে গেলাম এদেরই রুফটপ রেস্তোরাঁতে। ১৪ তলায় সুইমিং পুলের সাথে খোলামেলা এদের খাবারের জায়গা। ওপর থেকে ভারী মনোরম দৃশ্য। পুরো শহর আর নদীও দেখা যাচ্ছে। চটজলদি কয়েকটা ফটো ও তুলে নেওয়া হলো। আগে বেড়াতে গেলে ক্যামেরার একটা আলাদা ব্যাগ থাকতো। আমার ইয়াশিকা, ব্রততীর ক্যানন SLR, তার আনুষঙ্গিক উপকরণ। এখন সেসব ঝামেলা বাদ। পকেটে মোবাইল ফোন। তাতেই ছবি তোলা হচ্ছে। কেই বা আর দেখবে। নিজেদেরই দেখা হয় না। তাই এই আপোষ। পেটের মধ্যে ততক্ষনে আগুন জ্বলছে। হোটেলের রেস্তোরাঁর মেনু কার্ড দেখতে দেখতে আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ ভ্রমণের আগের স্মৃতি ফিরে এল। একই রকম সব খাবার। আপাতত চিকেন আর রাইস আর অল্প নুডুলস দিয়ে কাজ চালালাম। এদের ভাত একটু দলা পাকিয়ে থাকে। অনেকটা আমাদের দেশের মনিপুর, নাগাল্যান্ডের sticky rice এর মতন। এবার একটু ভাতঘুম, বাঙালির power nap. এই একটি ব্যাপারে আবার আমাদের দুজনের মতের খুব মিল!

সন্ধ্যা নামার আগেই হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য নদীর পাড়ের চৌহদ্দি। পায়ে হাঁটা পথ, তবে হোটেল থেকে বার হওয়া মাত্রই ধেয়ে এল এক ঝাঁক টুকটুকওয়ালা। এখানে ভাড়া কাছে পিঠে হলে দুই ডলার। শহরের শেষ প্রান্তে যেতে চাইলে চার থেকে পাঁচ ডলার। দর কষাকষিও চলে খুব। ডলার চলে সর্বত্র। এদের দেশের টাকার নাম রিয়েল। সেটাও চলে, তবে ডলারের পাশে একটু যেন ম্রিয়মাণ তার গ্রহণযোগ্যতা।
আমরা পায়ে হেঁটেই পৌঁছে গেলাম। নদীর পাড়ে এসে দেখি এলাহি ব্যাপার। দেশি বিদেশি মানুষের ঢল নেমেছে সেখানে। সারা বিশ্ব থেকে নানা ভাষা আর আলাদা আলাদা গায়ের রং এর কত মানুষ। গিজগিজ করছে নানা রকম খাবারের ফেরিওয়ালারাও। নদীর বুকে ভাসছে নানা আকারের প্রমোদ তরণী। জলে বেড়াতে বেড়াতে নৈশভোজের আয়োজন। অবশ্যই বেশ খরচসাপেক্ষ। আমাদের হোটেল থেকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিঃশুল্ক নিয়ে যাওয়া হয় রিভার ক্রুজে। আমরা আগামীকালের জন্য তা বুকিংও করেছি। এখন ব্যবস্থাটা দেখা হয়ে গেল। নদীর পাড় ধরে রাস্তা আর উল্টো দিকে নানা রকম পানীয় ও খাবারের রেস্তোরাঁর সারি। চোখ ধাঁধানো তাদের আলোকসজ্জা। পুরো জায়গাটায় একটা উৎসবের আবহ।
অনেকটা সময় এখানে কাটিয়ে আমরা এগোলাম আমাদের রাতের খাবারের জায়গার উদ্দেশ্যে। গুগল দেখে আমার সহধর্মিনী আগের থেকেই ঠিক করে নিয়েছে বিশেষ বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থান আর খাবারের জায়গাগুলো। আমি একটু ছন্নছাড়া আর ভবঘুরে বলে এইসব কাজ সে দায়িত্ব নিয়ে অতি নিখুঁতভাবে করে। না হলে আমার হাতে ছেড়ে দিলে অনেক কিছু বাদ পড়ে যাবে। এই রেষ্টুরেন্টটির বৈশিষ্ট্য হলো যে এটি একটি ট্রেনিং সেন্টারও। বেকার যুবকদের জন্য এখানকার সরকারের অতি সফল প্রয়াস আর বিদেশি পর্যটকদের কাছে স্থানীয় খাবারের স্বাদ পাওয়ার অতি অভিজাত জায়গা। আমরা নিলাম এদের দেশের বিখ্যাত খাবার ফিস অ্যামক। অনেকটা রুই মাছের মালাইকারি। আমাদের পাশের টেবিলের শেতাঙ্গ জুটি অর্ডার দিয়ে আনালেন টেরানটুলা ভাজা। ধপধপে সাদা প্লেটে চারটে বড় বড় মাকড়সা ভাজা। তার চারপাশে স্যালাডের আঁকিবুঁকি। সবার নজরই তখন ওনাদের টেবিলে।

মেনুকার্ডে কাঠ পিঁপড়ে ভাজাও ছিল আর তার দামও অনেক। আমাদের টাকায় প্রায় সাতশ’ টাকা। কেন এই অদ্ভূত খাবার সেই নিয়ে অনধিকার চর্চা করব না, তার কারণ মিলিটারী চাকরির সুবাদে নিজের দেশেও অনেক রকম খাবার খেতে দেখেছি স্থানীয় মানুষকে। তার মধ্যে শামুক, গুগলি, পিঁপড়ের ডিম, সাপ, ব্যাঙ, কুকুর, ভাল্লুক, পচানো সয়াবিন, কি নেই! নাগাল্যান্ডে এক মন্ত্রীর বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে মৌমাছির চচ্চরি খেয়েছিলাম একবার। মন্দ লাগেনি কিন্তু। পরে জেনেছিলাম তার দাম নাকি দশ হাজার টাকা কিলো! আবার অনেক সময় পরিস্থিতির চাপেও মানুষের খাদ্য তালিকায় ঢুকে পড়ে নতুন নতুন অনেক জিনিষ। যেমন কচুর শাক এক সময় শুধু কলকাতার রিফ্যুজি কলোনিগুলিতেই রান্না করা হত। বাজারে পাওয়া যেত না। একসময় বাস্তুহারা মানুষের অসহায় অবস্থাতে ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য বেছে নেওয়া সেই জিনিসটি এখন বড় বড় হোটেলে ডেলিকেসি হিসেবে পরিবেশন করা হয়। এই দেশেও সেই রকম কিছু পরিস্থিতি এসেছিল সত্তরের দশকে। অত্যাচারী শাসকের ভয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ তখন বাধ্য হয় জঙ্গলে লুকোতে। মাসের পর মাস। তখনই হয়ত এইসব মাকড়সা, পিঁপড়ে ঢুকে পড়ে তাদের পাতে। আমাদের ওই কচুর শাকের মতনই। আমি সঠিক জানি না যদিও। কত বিচিত্র সব দেশ আছে এই ভুবনে আর কত রকম খাবার পাওয়া যায়, এইসব ভাবতে ভাবতে টুকটুক ধরে হোটেলে ফেরা। আমাদের বিদেশ সফরের প্রথম দিনটা বেশ ভালই কাটল।

১৯ শে নভেম্বর, ২০১৯
লম্বা এক ঘুমে রাত কাবার। রাতে স্বপ্নে যে ট্যারানটুলা মাকড়সা আসেনি সেটাই শান্তির! আগামী দুটি দিন এই নম পেন শহরের বিশেষ দ্রষ্টব্য গুলো দেখবার ইচ্ছে আছে। আজ আবার আমাদের ২৭ তম বিবাহ বার্ষিকী। কেমন দেখতে দেখতে এতো গুলো বছর কেটে গেল। এই তো সেদিন চারহাত এক হলো। সকাল বেলাটা আমাদের দুজনের মা, বাবা আর ঈশ্বরকে মনে করে দিনটা শুরু করলাম। হোটেল থেকে পায়ে হেঁটে চলে এলাম রয়্যাল প্যালেস-এর কাছে। এক এক করে এদের রয়্যাল প্যালেস, সিলভার প্যাগোডা, ন্যাশনাল মিউজিয়াম ঘুরে ঘুরে দেখা হল। সিলভার প্যাগোডার মেঝে রুপোর পাত দিয়ে তৈরি। শান্তি পেলাম সেখানকার গৌতম বুদ্ধের মূর্তির সংস্পর্শে এসে। গরমের জন্য মাঝে মধ্যে জিরিয়ে নিতেও হচ্ছে। এদের দেশে ডাবের জল খুব ভাল। যেমন বড় ডাবের সাইজ তেমনি সুস্বাদু। একটা ডাব এক ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় ৭৫ টাকা। তবে দুজনে মিলে খেতে হচ্ছে এত জল। এদের ডাব কাটবার পদ্ধতিটাও একটু অন্যরকম। চৌকোনা করে কেটে টেবিলের ওপর বসিয়ে দিল। খেতেও সুবিধে। আবার লম্বা এক চামচ ও দেয় যাতে ভেতরের শাসটা ও খাওয়া যায়। দেখা হল সব ঘুরে ঘুরে। নিখুঁত আয়োজন, তবে সব জায়গাতেই বিদেশিদের জন্য প্রবেশ মূল্য খুব বেশি। এক একজনের দশ ডলার, মানে আমাদের সাড়ে সাতশো টাকা। মধ্যবিত্তের গায়ে লাগে। তেমন আহামরি কিছুও না । আমাদের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, বেলুরমঠ বা ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম-এর তুলনায় অনেক সাদামাটা ছিল এদের রাজার প্রাসাদ, প্যাগোডা বা মিউজিয়াম। অথচ এন্ট্রি ফি আকাশ ছোঁয়া। এখান থেকে বের হয়ে একটা টুকটুক ধরে চলে গেলাম শহরের অন্য প্রান্তে। সেন্ট্রাল মার্কেট।
অনেকটা আমাদের নিউ মার্কেটের ধাঁচের বাজার। সবরকম জিনিস পাওয়া যায় এক ছাতের নীচে। শাক সবজি, মাছ মাংস, জামা কাপড়, জুতো, ঘর সাজানোর টুকিটাকি, সব। এখানে এটা সেটা কেনাকাটা করার পর যাওয়া হল রাশিয়ান মার্কেট। এখানেও একই রকম পসরা। তবে জামা কাপড় আর অটো পার্টস এর দোকান বেশি। বিদেশে কোথাও বেড়াতে গেলে লোকাল বাজারে একবার অন্তত যাই। অনেক কিছু জানতে পারা যায়, অল্প শপিংও করা হয়। যেমন এখানকার মাছের বাজার খুব পরিষ্কার এবং দেখে মনে হয় যেন বড় কোন এক্যুরিয়াম। রাস্তায় টুকটাক খেয়ে ফিরে এলাম হোটেলে। একটু জিরিয়ে নিয়ে ফের পথে নামব।
আজ সন্ধ্যাটাও কাটালাম নদীর বুকে। সূর্যাস্তের সাথে কিছু গান বাজনা , পানীয় ও খাওয়া দাওয়া নিয়ে। এই সানসেট ক্রুজ দেশে বিদেশের বহু নদীর ওপরে আমরা আগেই উপভোগ করেছি। প্যারিসে সেইন নদী, জার্মানির রাইন, বর্মার ইরাবতী, বা আমাদের হুগলি নদী। সব জায়গাতেই একই রকম ফরম্যাট চলছে। তবে গোয়ার মান্ডোভী নদীর রিভার ক্রুজের পাশে এরা সবাই ম্লান। এটা অবশ্যই আমার ব্যক্তিগত মতামত। আগেই বলেছি এই ক্রুজের জন্য আমাদের কোন খরচ করতে হয় নি । হোটেল থেকে কমপ্লিমেন্টারি। তবে খাদ্য ও পানীয় নিজের নিজের খরচেই। তাও মন্দের ভালো, কয়েক ডলার সাশ্রয় হলো। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আগামীকালের বেড়ানোর প্ল্যানটার ছক কষে নেওয়া হলো। অনেক বেশি ঘোরাঘুরি কাল। এই গরমে টুকটুক যাত্রা কষ্টের হবে, তাই এসি গাড়িতে সিট বুকিং করা হলো।
২০ শে নভেম্বর, ২০১৯
আজ আমাদের এক অদ্ভুত গন্তব্য। প্রথমে যেখানে যাব তার নাম S 21, আর তারপরে দেখতে যাব Killing Fields. হ্যা। যেমন বিদঘুটে নাম তেমন সেই জায়গাও। এদের দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়ের নিদর্শন। এরা যত্ন করে রেখেছে মানুষের নরাধম হওয়ার দলিল হিসেবে। যাতে ভবিষ্যতের প্রজন্ম সাবধান হয়।
সত্তরের দশকে এই দেশে ঘটে যায় এক অতি নির্মম গণহত্যা। প্রায় ২০ লাখ মানুষের প্রাণনাশ হয়। কেউ কেউ মারা যান ইন্টারোগেশন এর নামে পাশবিক অত্যাচারে, কেউ অনাহারে, কেউবা অপুষ্টিতে। তবে বেশির ভাগেরই মৃত্যু হয় বিনা কারণে। স্রেফ খুন করা হয় দেশের জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশকে। কারন এদের তখনকার ক্ষমতা দখল করে আসা প্রধানমন্ত্রী কুখ্যাত পল পট ও তার নীতি। ইনি একাধারে কম্যুনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন। এনার বিচারধারায় উন্নয়নের একমাত্র উৎস হলো কৃষি কাজ এবং যারা বুদ্ধিজীবী তারা সবাই হলেন দেশের শত্রু। তাই শহরের সব মানুষদের নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামে। শিক্ষক, আমলা, সৈনিক, ব্যবসায়ী, পুলিশ, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। সব্বাই । এদের লাগানো হয় চাষের কাজে। সাথে সাথে চলতে থাকে নৃশংস অত্যাচারও। নারী, শিশু কাউকেই রেহাই দেওয়া হয় নি। সামান্যতম সন্দেহ হলেই বুদ্ধিজীবী ও দেশদ্রোহী তকমা লাগিয়ে দেওয়া হত যে কোন নাগরিককে। কেউ নরম হাতের তালুর জন্য, কেউ নেহাত চশমা ব্যবহার করার জন্য শিকার হয়েছেন এই কুৎসিত গণহত্যার। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের নকশাল আন্দোলনও কিন্তু এর সমসাময়িক। ভাগ্যিস তা পূর্ণ স্বরূপ ধারণ করতে পারে নি তখন।
যাই হোক, সকালে উঠে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিয়ে হোটেলে ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম। এদের ব্যুফে ব্রেকফাস্ট বেশ এলাহী ব্যাপার। নানা রকম এদেশি খাবারের পশরা। নাম না জানা কত ফল, সবজি ও খাবার। আবার বিদেশিদের কথা ভেবে দুধ, কর্নফ্লেক্স, পাউরুটি, প্যানকেক, ডিম সিদ্ধ, স্যসেজ, হ্যাম, বেকন এসবও আছে। একটু আফসোস হলো। আমাদের সন্তান সঙ্গে থাকলে পিটিয়ে খেলত। সে তখন দক্ষিণ ভারতে। তাও আমরা ঠুকে ঠুকে কিছু রান তো তুললাম। সব কিছুর স্বাদ নিতে নিতে কখন যে পেট দমসম হয়ে গেল!
ঠিক নির্ধারিত সময়ে আমাদের মিনিভ্যান নিতে এল। বুকিং অনুযায়ী হোটেলে হোটেলে ঘুরে যাত্রী তোলা হয়। সুন্দর ছিমছাম বাতানুকুল এই মিনিভ্যানটি। সাকুল্যে ১৫ জনের আসন। আর সব সহযাত্রীই বিদেশি, থুড়ি শেতাঙ্গ। বিদেশি তো আমরাও। সঙ্গে আছেন আমাদের দোভাষী গাইড, বছর ২০/২২ এর এক তরুণী। তিনি ইংরেজী ভাষায় আজকের বেড়ানোর একটা অগ্রিম খসড়া আমাদের জানান দিলেন। এখানে ভাষা একটা সমস্যা। বেশির ভাগ মানুষই খুব একটা ভালো ইংরেজি বলতে পারেন না। তবে ইনি খুব সড়গড় দেখলাম।
শহরের মধ্যেই রয়েছে আমাদের প্রথম গন্তব্য S 21, এমন নাম হয় কারন এটি আদতে ছিল একটি তিনতলা স্কুল বিল্ডিং। শাসকের নির্দেশে এই স্কুলটিকে রাতারাতি এক রাজনৈতিক বন্দী শিবিরে রুপান্তরিত করা হয়। ক্লাসরুম গুলোকে ব্যবহার করা হয় টর্চার চেম্বার হিসেবে। কোথাও আবার ক্লাস রুমের ভিতরেই পাতলা ইটের দেওয়াল তুলে বানানো হয় ছোট ছোট খুপরি। বিশেষ বিশেষ বন্দীদের নির্বাসনের ব্যবস্থা। ঘুরে ঘুরে সব কটা ঘর দেখলাম। মানুষ মানুষের ওপর কি নির্যাতন করতে পারে তার জ্বলজ্বলে নিদর্শন। এই করুণ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে মনটা কেমন ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। বেড়িয়ে আবার মিনিভ্যানে। এবার এক ঘন্টার সফর। শহরের বাইরে যেতে হবে।

কম্বোডিয়ার রাজধানী নম পেন থেকে সতের মাইল দক্ষিণে অবস্থিত এই জায়গাটার নাম Choeung Ek Killing Fields. টিকিট কেটে আর অডিও গাইড নিয়ে আমরা ঢুকে পড়লাম উঁচু পাঁচিল দেওয়া এক এলাকার মধ্যে, বড় একটা গেট দিয়ে। সারা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বন্দিদের এখানে নিয়ে আসা হত মেরে ফেলার জন্য। ঢাকা দেওয়া লরীতে করে নিরপরাধ মানুষগুলোকে এনে, সেই রাতেই মাথায় আঘাত করে খুন করে মৃতদেহগুলো গনকবরে ফেলে দেওয়া হতো। গুলি করে মারা হত না, খরচ বাঁচানোর জন্য এবং যাতে শব্দ না হয়। যাতে আশেপাশের গ্রামীণ এলাকার লোকজন কোন সন্দেহ না করে , লাউডস্পিকারে চালানো হতো মিউজিক। কস্মিন কদাচিৎ অনেক লোক একসাথে এসে গেলে ২/১ রাত এখানে জীবিত রাখাও হত কিছু বন্দীদের। এই ভাবে প্রায় ১০ লাখ মানুষের প্রাণনাশ করা হয় এই একটি জায়গাতেই। কম্বোডিয়ায় আরও এরকম কয়েকটি Killing Fields আছে। তবে এটাই বৃহত্তম। এখানে একটি মানুষের মাথার খুলির ঢিপি দেখি। প্রতিটি মাথার পেছন দিকে হাড় ভাঙা। কি নির্মম সেই দৃশ্য। আমার মত পোড় খাওয়া মানুষেরও চোঁখ ভিজে আসে। এই নৃশংস গণহত্যা নিয়ে পৃথিবী বিখ্যাত চিত্র তারকা অ্যাঞ্জেলিনা জোলির একটি সিনেমাও আছে । First They Killed My Father. পাঠক আশা করি দেখবেন।
আমাদের আজকের মতন ভ্রমণ শেষ। ফেরার সময় পুরোটা রাস্তা সবাই কেমন চুপচাপ। উদাস মন, জানলার দিকে মাথা হেলিয়ে চুপ করে বসে আছে সব দেশ বিদেশের ট্যুরিস্ট। আসবার সময় কত কথা আর উৎসাহ ছিল সবার। চোখের কোনায় জল চিকচিক করতে দেখলাম এক বিশাল বপু রাশিয়ান তরুণীর। অজানা, অচেনা, অসহায় সেই মানুষগুলোর জন্য অন্য একটি মহাদেশ থেকে আসা আর এক মানুষের সমবেদনা আর দরদ দেখে মনটা ভরে গেল। এখনও আশা ভরসা আছে তাহলে মানুষের ওপর।
হোটেলে পৌঁছেই সবার আগে আগামীকালের বাসের ব্যাবস্থা করে নিলাম। যাব নম পেন শহর থেকে সিয়ামরীপ । বিশ্বের সবচেয়ে বড় মন্দির অ্যাঙকর ভট এর শহর এই সিয়াম রীপ। সারা পৃথিবীর থেকে রোজ হাজার হাজার মানুষ আসে শুধুমাত্র এই অদ্ভুত সুন্দর স্থাপত্য শিল্প দেখার আশায়।
২১ শে নভেম্বর, ২০১৯
ঠিক সকাল ৮ টায় বাস কম্পানির থেকে ছোট গাড়ি করে আমাদের হোটেল থেকে বাসস্ট্যান্ড অবধি নিয়ে গেল। তার আগেই আমরা বিল চুকিয়ে ঘর খালি করে দিয়েছিলাম। বিশাল আকারের বাস। নাম জায়েন্ট ইবিজ। বাসে WiFi, জল ও অল্প খাবারের আয়োজন। একজন ইংরেজিভাষী কন্ডাক্টরও উপস্থিত। সব মিলিয়ে এলাহী ব্যাপার। অনেক বছর আগে মালয়েশিয়া থেকে সিঙ্গাপুরে যাওয়ার সময় একবার এই রকম লাক্সারি বাসে চড়ে ছিলাম। তবে এই বাসটি তার উপর দিয়ে যায়। মূল্যও অন্যান্য সব বাসের থেকে অনেক বেশি। ঠিক ন’টার সময় বাস ছাড়ল।
আমাদের মহিলা কন্ডাক্টর জানিয়ে দিলেন যে তিনশ’ কিলোমিটারের দূরত্ব আমরা চার পাঁচ ঘণ্টায় অতিক্রম করব। রাস্তায় দুবার হল্ট করা হবে। একটি দশ মিনিটের এবং পরেরটি আধ ঘন্টার। মসৃণ হাইওয়ে দিয়ে ছুটছে আমাদের বাস আর আমরা বড় বড় কাঁচের জানালা দিয়ে রাস্তার দুপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে চলছি। ঠিক দেড়ঘণ্টা চলার পর এসে গেল আমাদের প্রথম স্টপ। এখানকার ধাবা। ঝকঝকে পরিস্কার পরিছন্ন । শুনলাম এই বাস কম্পানির তরফ থেকে নাকি এদের টয়লেটও ইন্সপেকশন করা হয়।
দুঃখ হয় চিন্তা করে যে আমাদের দেশের হাইওয়ের ধাবাগুলোর টয়লেটের অবস্থা কি নিদারুন। কয়েক মাস আগেই আমরা শিলিগুড়ি থেকে কলকাতায় আসি লাক্সারি স্লিপার কোচে করে। যেমন দারুন বাস, তেমন সুন্দর বিছানা। বহুমূল্য টিকিট। রাস্তায় তিন জায়গায় বাস থামে এবং প্রতিটি জায়গাতেই টয়লেটের অবস্থা অতি জঘন্য ছিল। এখনও গা ঘিন ঘিন করে চিন্তা করে। ভাবতে খারাপ লাগে যে এসব ছোটখাটো দেশ যা পারছে, আমরা ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি হয়েও তা পারিনি। আমরা মঙ্গলযান পাঠাই, রকেট বিদ্যাতে পারদর্শী কিন্তু বাথরুম পরিষ্কার রাখতে পারি না। সত্যিই লজ্জার।
এই ধাবায় এককাপ চা খেয়ে নেওয়া হলো। বাস আবার রওনা দিল সিয়ামরীপ এর উদ্দেশ্যে। রাস্তায় লাঞ্চ সেরে আমরা সিয়ামরীপ শহরে ঢুকলাম দুপুর ৩টে নাগাদ। হোটেলে চেক ইন করে একটু আরাম করেই বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। নতুন কোথাও বেড়াতে গেলে প্রথমেই একটু হেঁটে নেওয়া ভাল। এলাকার একটা ধারণা হয়। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম এক বাজারে। নাম ‘মেড ইন কম্বোডিয়া’ । এই দেশের সব রকম হস্তশিল্পের দোকানের মেলা। অনেকটা আমাদের দিল্লি হাটের মতো। জামা কাপড়, কাঠের কাজ, ছবি, রুপোর গয়না, দেশি ওয়াইন সব কিছুর দোকান। ঘোরাও হল। একটু আধটু কেনাও হল। এবারের গন্তব্য পাব্ স্ট্রীট। রাস্তার দুপাশে বার আর রেস্তোরাঁর সারি, আইসক্রিমের দোকান, ম্যাসাজ পার্লার, শো বক্সিং এরিনা। আলো ঝলমলে সব দোকান, বাজনার আওয়াজ আর মানুষের ভীড়ে এক প্রানচঞ্চল এলাকা। একবার এলে আর ফিরতে ইচ্ছে করে না। ভোর অবধি চলে এখানে হৈচৈ, পানীয় ও খাদ্যের আয়োজন। আমরা বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে তারপর এক জায়গায় খাবার খেয়ে টুকটুক ধরলাম হোটেলের উদ্দেশ্যে। সিয়াম রীপ শহরে লক্ষ্য করলাম অনেক কুমীরের চামড়ার জিনিস বিক্রি হচ্ছে। জুতো, ব্যাগ, বেল্ট ইত্যাদি। দামও অনেক। একটা সবথেকে সাধারণ বেল্ট আমাদের প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। তবে আমার এইসব শখ নেই। সস্তা হলেও কিনতাম না। এখানকার রেস্তোরাঁর মেনুতেও দেখলাম কুমীরের নানারকম আইটেম পাওয়া যাচ্ছে। চিলি চিকেনের পাশেই চিলি ক্রকোডাইল। মেনু পড়তে পড়তে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল প্রায়।
২২ শে নভেম্বর, ২০১৯
আজ বিশেষ দিন। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মন্দির প্রাঙ্গন অ্যাঙকর ভট যাওয়া হবে। ২০ ডলারের চুক্তিতে সারা দিনের জন্যে টুকটুক ভাড়া করা হয়েছে। দিন শুরু সকাল পাঁচটায়। প্রথমে টিকিট কেটে সোজা ছুট অ্যাঙকর ভট-এর ভুবন বিখ্যাত সূর্যোদয় দেখতে। হ্যাঁ, অনেকটা টাইগার হিল গোছের ব্যাপার। ঘুটঘুটে অন্ধকারে হাজার হাজার ট্যুরিস্ট সমবেত হয়েছে প্রথম আলোয় অ্যাঙকর ভটকে দেখবে বলে। সূর্য দেবতা সহায় হলেন। অপূর্ব, নৈসর্গিক সৌন্দর্যের সেই স্মৃতি থেকে যাবে জীবন ভর।

সূর্যোদয় দেখার পর মন্দির এলাকায় বসে হাল্কা ব্রেকফাস্ট করে নিলাম। এই মন্দির প্রাঙ্গনের আকার এত বিশাল, স্থাপত্য শিল্প এত নিপুণ এবং ইতিহাস এত সমৃদ্ধ যে ভাষায় ব্যক্ত করা অসম্ভব। প্রায় চারশ একর এলাকা জুড়ে রয়েছে এই অ্যাঙ্কোর ভাট। ঘুরে ঘুরে সব দেখা প্রায় অসাধ্য সাধন। নানা রকম ব্যবস্থা আছে ঘুরে বেড়ানোর। বেশির ভাগ টুরিস্টই আমাদের মতন টুকটুক করে অল্প সময়ের মধ্যে যতটা সম্ভব দেখে ফিরে আসে। তবে বিত্তশালীদের জন্য আছে হেলিকপ্টার ও বেলুন রাইডও । আবার বেশ কিছু মানুষকে দেখলাম সাইকেলে চড়ে ঘুরে বেড়াতে।
আমরা একদিনের পাসই কিনেছি। অনেকেই তিনদিনের পাস নিয়েছেন। সাত দিনের পাসের লাইনেও দেখলাম বেশ কিছু মানুষকে। বলে রাখা ভালো, বহুমূল্য টিকিট। একদিনের পাস কিনতে আমাদের মাথাপিছু পড়ল ৩৭ ডলার, অর্থাৎ মোট ৭৪ ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। এছাড়াও আছে টুকটুক ভাড়া।
আমরা ইন্টারনেট দেখে আগের থেকেই ছোট ট্যুর এর পরিকল্পনা করে নিয়েছিলাম। বিশেষ বিশেষ দ্রষ্টব্য কয়েকটি মন্দির দেখার। একদিনে যতটা সম্ভব। মন্দির চত্ত্বরে গাড়ি ঢোকানো হয় না । ফলে অনেক হাঁটাহাঁটিও আছে। আবার অনেকক্ষণ ধরে মন্দির দেখার পর শারীরিক ক্লান্তি ছাড়া মানসিক ভাবেও একটু বিশ্রাম প্রয়োজন হয়। ভোর পাঁচটা থেকে শুরু করে বেশ অনেকটা দেখে দুপুর নাগাদ আমরা ফিরে আসি হোটেলে। মনে প্রাণে এক অদ্ভুত আনন্দ নিয়ে।
জীবনে এক একটা দিন আসে অন্যান্য সব দিনগুলোর থেকে আলাদা। এত দেশ বিদেশ ঘুরেছি, কত জায়গা দেখেছি, সেই ১২/১৩ বছর বয়স থেকে চরৈবতি। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিক আনন্দ পেয়েছি বটে, অথচ কয়েক দিন পরেই স্মৃতি ম্লান হয়ে গেছে। তবে হাতে গোনা এমন কিছু অভিজ্ঞতা আছে যা কিনা এখনও তরতাজা। জীবনে প্রথম সমুদ্রের মুখোমুখি হওয়া, প্রথম কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা, প্রথম মোটর সাইকেল চালানো বা বাবার হাত ধরে জাম্বো সার্কাসে হাতির শুঁড়ের মধ্যে ১০ পয়সা গুঁজে দেওয়া… এইরকম কিছু অভিজ্ঞতার স্মৃতি এখনও একদম জ্বলজ্বল করে মনের মধ্যে। অ্যাঙ্কোরভাট
সেই রকমই এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। ঈশ্বরের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ, সেই মানুষের এক দাম্ভিক প্রয়াস। অপার কল্পনাশক্তি, নিপুণ স্থাপত্য শিল্প ও অগাধ ঈশ্বর প্রেমের মধুর মিশ্রণ। মন ভরে আছে, ভরে আছে প্রাণ।
ইতিহাস বলে ১২শ শতাব্দীতে তামিলনাডুর হিন্দু রাজা সূর্যবর্মন(২য়)-এর তত্ত্বাবধানে তৈরি হয় এই মন্দির প্রাঙ্গণ প্রায় ৪০০ একর জমির ওপর। আদতে তৈরি করা হয় বিষ্ণু মন্দির হিসেবে এবং কয়েক দশকের মধ্যেই হয়ে যায় বৌদ্ধ ধর্মের মন্দির। লোকগাথাতে বলে ইন্দ্র দেবের আদেশে তৈরি করা হয়েছিল এই মন্দির এবং তাও এক রাতের মধ্যে। স্রষ্টা নাকি স্বয়ং বিশ্বকর্মা। মেরু পর্বতের আদলে গড়া এই মন্দিরের চারদিকে প্রহরীর মতন দাঁড়িয়ে আছে বিশাল পাথরের নাগ দেবতা ও সিংহ। মন্দিরের ভেতরে দেওয়াল জুড়ে অপূর্ব সব ভাষ্কর্য। কোথাও রামায়নের গল্প, কোথাও বা মহাভারতের। এক জায়গায় সমুদ্র মন্থনের বিশাল বিবরণ। চোখ ফেরানো যায় না, এত নিপুণ।
অ্যাঙ্কোর ভাট কথাটা তর্জমা করলে বোঝায় মন্দির শহর। অথচ ১৩ শতাব্দীর গোড়ার দিকেই নাকি এখান থেকে শহরটাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় অন্যত্র। ফলে খাঁ খাঁ করতে থাকে এই বিশাল স্থাপত্য। রোদ , জল, হাওয়ার ঝাঁপটা আর বড় বড় গাছের দাপটে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায় মহিমাময় এই সৃষ্টি। প্রায় পাঁচশ বছর পর, এক ফরাসি পরিব্রাজক আবিষ্কার করেন ভগ্নদশা এই মন্দির। পুনরায় সারা বিশ্বের বিস্ময়, আগ্রহ ও চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় এই মন্দির। আজ এই মন্দির কম্বোডিয়ার পতাকাতেও আছে এবং প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ বিদেশি পর্যটক আসে এই অ্যাঙ্কোর ভাট দেখতে।
আমাদের আপাতত ভ্রমণ শেষ। আগামীকাল বিশ্রামের জন্য রাখা হয়েছে। আশেপাশে ঘোরাঘুরি করা হবে। তবে কোন বিশেষ দ্রষ্টব্য জায়গা না। পরশু ব্যাংকক্ হয়ে কলকাতা। সুন্দর এই দেশ ও এখানকার মানুষজন। অনেক ভালো ভালো স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফিরবো। আবার অধিকাংশই ভুলে যাব কিছু দিন পর। কিন্তু অ্যাঙ্কোর ভাট-এর স্মৃতি মুছবে না। এইটাই এক বড় প্রাপ্তি।


