শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

দু এক মুহূর্ত শুধু রৌদ্রের সিন্ধুর কোলে … তুমি আর আমি

‘এই যে শ্রীমতী চিত্রিতা এই দিকে … হ্যাঁ এই টেবিলে। বসুন। নমস্কার । আমি ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়।’

= ‘অ্যাঁ! সে দিন তো বলেছিলেন তারাপদ না কি যেন ?’

‘বাহ। ধন্য আপনার স্মৃতি শক্তি। একটু পরীক্ষা করে দেখলুম। আসলে সেদিন এমন মেঘমেদুর মুখচ্ছবি দেখেছিলেম যে ভাবিনি আমার সাধারণ তারাপদ নামটি আপনার মনে থাকবে। একটি বুড়ো আঙুলের ছবি আপনি পেতেই পারেন। মানে আমার কমেন্ট আরকি!‘

= ‘আপনাদের আরো পরীক্ষা বাকি আছে? এখানে কি হাঁটিয়ে দেখবেন? না কি চুলটা আসল কি না খুলে দেখাবো?’

‘বলতে নেই … হয়তো আমার স্মৃতি বিশ্বাসঘাতকতা করছে … কিন্তু আমার মা, বাবা বা আমি – কেউ কি এমন কোনো বেয়াড়া আবদার করেছিলাম?’

= ‘করেন নি । তবে করতেন নিশ্চিত। আগে  যত জন এসেছিলেন সবাই প্রথমে আপনাদের মতোই হাসি হাসি মুখে বসেছিলেন । তারপর এক একে সবার তাদের দাঁত নখ বেরোল। কি  ভাবেন আপনারা মেয়েদের?’

‘ভাবার আর সুযোগ পেলাম কই?  আপনার ভাব দেখে আমাদের তো প্রায় সমাধি।  তবে আপনি আমাদের যাই ভাবুন … আমরা বেড়াল নই। আগে যারা এসেছিলেন  তারা অবশ্যই বেড়াল জাতীয় প্রাণী। যাদের দাঁত নখ লুকানো থাকে। বেসিক্যালি ভীতু, ফেলিস ক্যাটাস গোত্রের, সাঁইত্রিশটি শ্রেণীতে বিভক্ত। অবশ্য এই প্রজাতিতে আবার সিংহ কিম্বা চিতাও আছে … তবে …’।

= ‘আপনি কি বেড়ালের জাতি তত্ত্ব বোঝাবার জন্যে আমাকে এই রেস্তোরায় ডেকেছেন?’

‘আরে না। পরিস্থিতি এখনও মেঘাচ্ছন্ন কি না বুঝবার চেষ্টা করছি’।

= ‘পরিস্থিতি পরিবর্তনের কিছু কারণ ঘটেছে কি? আমি তো সে দিন যা বলার বলেই দিয়েছি।’

‘সে তো বটেই। ভাবছি … সাধারণত এক থেকে দেড় পারসেন্ট ফসফরাস থাকে মানব শরীরে। আপনার বোধ হচ্ছে অনেক বেশী। না … মানে … আজ নিয়ে মাত্র দুবার দেখা আমাদের। দেখা মাত্র জ্বলে উঠলেন কি না!’

= ‘এবার তবে ফসফরাসের গুণকীর্তন?’

‘না না । ফেরোমন ব্যাপারটা বলাও জরুরী। এ এক রকম হরমোন, প্রাণীদের দেহে থাকে। প্রাচীন গ্রীক ভাষায় যার মানে – সহ্য করা। অমানুষরা এর গন্ধ বিচার করে বন্ধু পছন্দ করে। মানুষের অবশ্য তেমন ক্ষমতা নেই বলেই জানতাম। এখন দেখছি অবোলারা পারে … আবার কিছু কিছু বঙ্গবালাও পারে। আপনাকে  … দু বার বুড়ো আঙুল।’

= ‘বুড়ো আঙুল নিজের কাছে রাখুন । আর ফেরোমন ছেড়ে এখানে মন ফেরান। কি কারণে ডেকেছেন বললে বাধিত হব। আমি কিন্তু বেশীক্ষণ থাকতে পারব না।’

‘কফি খাবেন তো? এসব পরিস্থিতিতে ক্যাপুচিনো বেশ কাজ দেয়। সঙ্গে আলু ভাজা।’

= ‘না’।

‘খান, খান। অল্প ক্যাফেইন স্নায়ু শীতল করে। সেদিন আপনাদের বাড়িতে ঢুকেই সিঙাড়া গরম করার গন্ধ পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম গোটা দুয়েক খাবো চায়ের সঙ্গে … চা টাও কি আর মকাই-বাড়ির নিচে হত … তা পরিস্থিতি এমন হল ছেড়ে আসতে হল সব। আপনার মা অবশ্য বলেছিলেন খেতে কিন্তু আমার  ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েই পেট ভরে গিয়েছিল।’

= ‘দেখুন আমি সরি। আসলে একটু মাপ চাওয়ারও ছিল। তাই আপনার সঙ্গে দেখা করতে এলাম।  আমার মেজাজ এত খারাপ হয়ে গেছিল। আপনাদের সঙ্গে বোধহয় ঠিক ব্যবহার করা হয় নি।’

‘বোধহয়? যাক গে। বড় কথা  বাবা-মা’দের পক্ষে ব্যাপারটা তেমন ভালো হয় নি। কিছুটা বোধহয় … বোধহয় নয় … নিশ্চিত …  ব্যথিত হয়েছিলেন সবাই। মানে … গরম পায়েসে টিকটিকি পড়ার মত ব্যাপার।’

= ‘সরি এগেইন। কিন্তু যাই হোক আমি তো সে দিন বলেই দিয়েছিলাম যে আমি আর এক জনের সঙ্গে … মানে তাকেই বিয়ে করবো। এখন আবার কেন ডাকলেন …  ঠিক বুঝতে পারছি নি।’

‘হ্যাঁ। বলছি। তার আগে … এক্সকিউজ মি … টু ক্যাপেচিনো ওয়ান ফ্রেঞ্চ ফ্রাই মিডিয়াম প্লিজ। হ্যাঁ একটু ইটিং না থাকলে মিটিং … এবার বিষয় প্রবেশ। আমি চিৎঘন চ্যাটার্জির সঙ্গে দেখা করতে গেছলাম।’

= ‘কে? ’

‘চিৎঘন চ্যাটার্জি। সেদিন বললেন না আপনার ফিয়ান্সে?’

=’চিৎঘন কেন হবে । আমি বলেছিলাম … বলেছিলাম … চিদানন্দ।’

‘সরি । নামটা একটু ভুল হয়ে গেছে। যাই হোক তার সঙ্গে দেখা করেছি।’

=’দেখা করেছেন ? কোথায়?’

‘প্রথমে রাসেল স্ট্রিটে ওনার অফিসে আর তারপর গোলপার্কের বাড়িতে। খুবই সজ্জন মানুষ, পরিবারের তো তুলনা নেই। বিশেষ করে ওনার মা। নিজের হাতে কফি তৈরি করে খাওয়ালেন। তাছাড়া ঘরে বানানো প্যাস্ট্রি। উনি তো প্রথমে আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন চিত্রিতা তো প্রায়ই আসে । কিন্তু না আমার ছেলে … না ও … কেউ কিছু বলে নি। এত বড় আনন্দ সংবাদ তুমি দিলে। এর পর যখন চিত্রিতা আসবে ওর কান মুলে দেবো। এই সব কত গল্প।’

= ‘রাবিশ। আপনি ওর অফিস পেলেন কি করে?’

‘জাস্ট আপনাকে ফলো করে। রাসেল স্ট্রিটে আপনি প্রায়ই যান।’

= ‘যাই কারণ আমার নিজের অফিসটাই ওখানে। সপ্তাহে দু দিন যেতে হয় আমাকে।’

‘সেটাই তো। আর আপনার পাশের অফিসটাই চিদানন্দ বাবুর। আপনারা কফি … মানে এই ক্যাপুচিনোই খান প্রতি মুলাকাতে। অবশ্য সঙ্গে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খান কি না আয়াম নট শিওর’।

= ‘আপনি মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। আপনি আমাকে ফলো করেছেন কেন?’

‘হ্যাঁ । করাটা হয়ত ঠিক হয় নি। কারো ব্যক্তিগত পরিসরে নাক গলান আদৌ শোভন নয় । কিন্তু এমন করলাম কেন?’

= ‘হ্যাঁ, কেন?’

‘বললে বিশ্বাস করবেন না … আমার যে ইগো আছে আমি আপনার সঙ্গে দেখা হবার আগে পর্যন্ত জানতেই পারিনি। সেদিন আপনি যখন চেঁচিয়ে আপনার মা বাবাকে বলছিলেন যে আপনার ফিয়ান্সে আছে এবং আপনি তাকেই বিয়ে করবেন। এসব মেয়ে দেখানো আপনার একেবারে পছন্দ নয়। তখন আমি ভ্যাবলা হয়ে গেছলাম ঠিকই কিন্তু তার কয়েক ঘণ্টা পরে ভাবলাম একটু ঘেঁটে দেখি তো!’

= ‘ও, ইগোয় লেগেছে তাই কাদা ঘাঁটার ইচ্ছে হল!’

‘হ্যাঁ।তবে কাদা নয় সাদা মনেই ভাবলাম। দেখুন, আমিও মোটামুটি কাজ করি। টলিগঞ্জে নিজের ফ্ল্যাট।  নয় বছর বিদেশে ছিলাম, ব্যাঙ্কে কিছু আছে। সিক্স প্যাক নেই আবার ভুঁড়ি ও নেই। চেহারা … সোনার আংটির আবার সোজা ব্যাঁকা। বঙ্গভুমে পাত্র হিসেবে তেমন ফেলে দেবার মত নয় … তাহলে?’

= ‘তাহলে ? ডলার রোজগার করেছেন বলে যে মেয়ে দেখবে সেই আপনার গলায় মালা দেবে? আপনাদের এই হচ্ছে আসল রূপ।’

‘শুধু ফসফরাস নয় আপনার শরীরে সোডিয়ামের মাত্রাও একটু মাত্রা ছাড়া। বাতাসের সংস্পর্শে এলেই জ্বলে ওঠে। তাছাড়া খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করেন না। প্রতীতিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে অনুভূতি। টেস্টোস্টেরন এবং ইস্ট্রোজেন ঠিকঠাক সন্তুলিত নয়। এটা আপনাকে বিপদে ফেলতে পারে।’

= ‘মানে?’

‘ধরেই নিলেন ডলারে রোজগার করেছি। এটা তো পাউন্ডও হতে পারে । কিম্বা রুবল। রুপি বা টাকা হতেই বা অসুবিধে কি?’

= ‘বিদেশে রুপি মানে টাকা রোজগার করেছেন ? সে দেশ কোথায় … ধর্মতলায়?’

‘না বাংলাদেশে। রুপি চলে শ্রীলঙ্কা আর নেপালে। বিদেশ বলতেই আমেরিকা বোঝায় না। থাক সে সব কথা। আমরা কথা বলছিলাম … কেন আমি আপনাকে অনুসরণ করেছি।’

= ‘হ্যাঁ … কেন করেছেন’?

‘এলিমেন্টারি মাই ডিয়ার ওয়াটসন। আপনি যখন আপনার বাড়িতে স্ট্রীট কর্নার বক্তব্য রাখছিলেন তখন বোধহয় আপনার মা বাবার দিকে তাকিয়ে দেখেন নি ঠিকঠাক। তাদের মুখটা হয়েছিল যেন বানের জলে ভাসা মানুষ জন। আপনার মুখের দিকে তো তাকানো যাচ্ছিল না । আমি ওনাদের মুখটাই দেখছিলাম। বললে বিশ্বাস করবেন কি না জানি না … বেশ কষ্ট হচ্ছিল’।

= ‘কষ্ট একটু পাওয়া উচিত ওনাদের। গতবারে আমাকে না জানিয়ে গাড়ি দেবেন বলে প্রমিস করেছিলেন করেছিলেন পাত্র পক্ষকে। কেন বলতে পারেন?’

‘এ তো চলে এ দেশে। তাছাড়া গাড়ি … মানে যদি বিয়েটা হত আর কি … আপনিও চড়তেন। তাহলে আপত্তি কিসের?’

= ‘সে বুঝলে আপনি … বা আপনারা … নিজে কেনা যায় না? … তাছাড়া আমি কি কমোডিটি?’

‘না না মর্বিডিটি বলা যায়’।

= ‘ছাড়ুন। আপনাদের সঙ্গে কথা বলা মানে শুকনো মাঠে জাল ফেলা। আপনার আর কিছু বলার আছে’?

‘ক্যাপুচিনো এসে গেছে। আলু ভাজাও। এক ঢোঁক নিন। গুড। দুটো আলু ভাজা সঙ্গে। না, থাক। আমার খিদে পেয়েছে, কটা খাই। সে দিনের সিঙাড়াটা বোধ হয় ফেলাই গেছল। আপনার বাবার রক্তচাপ বেশ বেশী। মায়ের বোধহয় কম। তবু ঠান্ডা তেলে ভাজা কি আর খেয়েছেন?  আর আপনি সে সিঙাড়া মুখে তোলেন নি বেশ বোঝা যায়। আহা ওই দোকানটা ১০৮ বছরের পুরোন। ভাবতে পারেন কোনো এক দিন ওখানে গরম তেলে সিঙাড়া পড়ল আর পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেন নজরুল – গাইলেন মধু গন্ধে ভরা  – ‘ ।

= ‘এটি রবীন্দ্রসঙ্গীত – নজরুল গীতি নয়।’

‘আবার একটু অ্যাড্রেনালিন ক্ষরণ হল বেশী। আচ্ছা নজরুলকে কি সব সময় নিজের লেখা গানই গাইতে হবে। রবীন্দ্রনাথ দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সঙ্গে – বাহবা নন্দলাল – বলে ধুয়ো ধরতেন বা নজরুলের সঙ্গে হেঁকে উঠতেন – দে গরুর গা ধুইয়ে এ কথা আপনার রবীন্দ্রভারতীর শিক্ষক বলেন নি?’

= ‘আচ্ছা আপনি আমাদের বাড়িতেও কি গোয়েন্দাগিরি করেছেন’?

‘এ কথা কেন বলছেন?’

= ‘নইলে আপনি বাবার রক্তচাপ, আমার রবীন্দ্রভারতী … এমন কি কোথাকার সিঙাড়া … সব কি করে জানলেন’?

‘এ বার আপনার পর্যবেক্ষণ ঠিক। ঠিক করেছি, আপনার অবর্তমানে, মানে আপনার উপস্থিতিতে সাহস হয় নি আবার ব্যাপারটা গোড়া থেকে জানা দরকার – তাই। একরকম ব্যক্তিগত দায় থেকেই বলতে পারেন’।

= ‘ব্যক্তিগত দায়? সেটা কি রকম?’

‘একটু অদ্ভুত লাগলেও সত্যি কথা হচ্ছে, আমি শুধু মা বাবার জন্যেই বিদেশের বেশ শাঁসালো চাকরি ছেড়ে কলকাতায় এসেছি। আট বছর পরে হটাত জানলাম যে বছর খানেক আগে মায়ের একটা মাইল্ড স্ট্রোক হয়েছিল, কিন্তু আমাকে জানানো হয় নি। আমি ভেবেছিলাম, আমার হৃদয় বৃত্তির উপরে পলি মাটি জমে গেছে … কিন্তু না। ওই এক হড়পা বাণে মনের ময়লা সাফ হয়ে গেল। অবশ্য আসবো বললেই তো আসা যায় না। এক বছর লাগলো মায়া কাটাতে আর এ দেশে আমার মাঠ খুঁজতে। পেলাম, চরতে চলে এলাম। বাবা তেমন কিছু বলল না কিন্তু মা চাঙ্গা হয়ে গেল। এবার তারা বললেন বিয়ে থাওয়া কর। তো … বললাম দেখো তাহলে। প্রথম আপনার বাড়িতেই গেলাম আর তাতেই আবার মায়ের স্ট্রোক হয় আর কি।

=’আমি … আমি… ‘!

‘না … না আপনি বিব্রত হবেন না। সরিও বার বার বলার প্রয়োজন নেই। এত কিছু তো জানতেন না। তাছাড়া চি – দা – ন – ন্দ বাবু আছেন আপনার জীবনে। রবীন্দ্রনাথ তার অতিথি গল্পে দেখিয়েছেন তারাপদদের এমনিই বৌ জোটে না। তার উপর তারাপদর জন্যে চিদানন্দকে ছেড়ে দিলে জোড়াসাঁকো থেকে দক্ষিণেশ্বর কোনো ঠাকুরই  আপনাকে মাপ করতেন না।’

= ‘আমি … আমি… আচ্ছা তবু আপনার ব্যক্তিগত দায়ের ব্যাপারটা বোঝা গেল না।‘

‘হ্যাঁ। ভাবলাম …  এক জোড়া মা বাবার দুঃখ দূর করি। আপনার মা-বাবা তো এটাই শুধু চান যেন তারা আরো বৃদ্ধ হবার আগে আপনার নিজস্ব সংসার হয়। তাহলে তাতে বিলম্ব কেন? আমি যদি উদ্যোগ নিয়ে চার হাত মিলিয়ে দিতে পারি … কেমন হয়? তাই ওই আপনার অবর্তমানে আপনাদের বাড়ি হানা দেওয়া।‘

= ‘মা-বাবা তো কিছু বলেন নি আমাকে?’

‘তার কি যো রেখেছেন আপনি। সেদিনের পরে তো প্রায় নোয়াখালীতে গান্ধীজী হয়ে গিয়েছিলেন। মৌনী আর প্রায় উপবাস। ছাগল দুধের বদলে চা। চরকার বদলে দিন রাত ল্যাপটপ।  কেউ কথাই বলতে পারেনি আপনার সঙ্গে। তবে এক ফাঁকে এও জানিয়েছিলেন যে এখনি চিদানন্দ বাবুকে বিয়ে করছেন না আপনি। কেন, কবে, কখন, কোথায় কিছুই আর জানা যায় নি। এক সন্তান হবার পুরো ফায়দা উঠিয়েছেন বলা যায়’।

= ‘এক সন্তানের ফায়দা?’

‘আপনাকে চুপিচুপি বলি এক সন্তানের মা-বাবাদের শিরদাঁড়ার হাড় ছাব্বিশটার জায়গায় বাষট্টিটা হয়ে যায় । মানে দ্বিগুণ নমনীয়। আর সারভাইকালের সাতটা তো হাড় থেকে কার্টিলেজ। সে মাথা আর সন্তানের সামনে উঁচু হতেই পারে না।‘

= ‘খুব কায়দায় কথা বলেন তো? আপনি ও তো এক সন্তান।‘

‘তাই তো। অভিজ্ঞতা থেকেই তো বলছি। তবে শুধরে নিয়েছি। এখন আমি মাথা নিচু আর মা-বাবা উঁচু। আমার আগের গল্পটা আপনি বোধহয় মন দিয়ে শোনেন নি।’

= ‘ঠিক আছে বুঝলাম। আমার অন্যায় হয়েছে। আমি ফিরে মা-বাবার থেকে মাপ চেয়ে নেব। আপনি খুশি?  আর একটা কথা …  আপনি এই যে কথায় কথায় সাধারণ জ্ঞান দেবার চেষ্টা করেন এটা কি শুধু আমাকে ইমপ্রেস করার জন্যে নাকি অন্য কারণ আছে? আপনি তো শুনেছিলাম আই টি তে কাজ করেন । সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হয় কারু ডাটা আন্যালিসিস করেন নইলে প্রোগ্রাম লেখেন । তাতে এত জ্ঞান কি কাজে লাগে বলুন দেখি?’

‘আবার তাড়াহুড়ো করছেন। কিছু আই টি র লোকজন আপনার ধারনা মাফিক কাজ কর্ম করে বটে কিন্তু আরো বহু খেলার মাঠ আছে। আমি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ … মানে গবেষণা করি’।

= ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ? রিয়েলি? খুব ইন্টারেস্টিং কাজ … না? আপনি ঠিক কি করেন ? রোবট বানান?’

‘না । সে অন্য টিম করে। আমরা মানুষের প্রতিক্রিয়া গুলো ভেঙে ভেঙে দেখি আর চেষ্টা করি সেগুলো নকল করতে’।

= ‘কি রকম ? কি রকম?’

‘আপনি যদি চেঁচিয়ে লোক জড় না করেন আপনার হাতটা একবার ধরতে পারি?’

= ‘অ্যাঁ! এখানে … মানে …’।

‘চিরজীবনের জন্যে নয় … ধরুন তিরিশ সেকেন্ডের জন্যে?’

= ‘আচ্ছা মানে … ঠিক আছে … কিছুক্ষণ … ‘।

‘ধন্যবাদ । হু … উ … ম। ধন্যবাদ । রিলাক্স হয়ে বসতে পারেন।‘

= ‘কি হল ব্যাপারটা?’

‘এটাই ধরুন আমার কাজ।‘

= ‘মেয়েদের হাত ধরে বসে থাকা? এটাই আপনার কাজ?’

‘আপনার ও কি কোনো ফিটন গাড়িতে জন্ম?’

= ‘কি ‘?

‘কিম্বদন্তী সঙ্গীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্রের জন্ম হয়েছিল রেল গাড়িতে । তার থেকেই না কি তিনি খুব চঞ্চল। বলেছিলেন তিনিই। আপনি  দশ সেকেন্ডে মন্তব্য করে দেন এবং সবগুলোই ভুল’।

= ‘সরি  সরি । ঠিক আছে আপনিই বলুন, কি নিয়ে আপনার গবেষণা’?

‘আমি খোঁজার চেষ্টা করছি মানুষের প্রতিক্রিয়া … আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে স্পর্শ প্রতিক্রিয়ার রূপ রেখা। এক জন চোখে না দেখা মানুষ কি ভাবে অনুভব করে অন্য মানুষকে। হেলেন কেলার আমাদের রবি কবিকে ছুঁয়ে বসে ছিলেন কিছুক্ষণ এবং তার পর তিনি মুগ্ধ হয়ে যান। কি ভাবে বুঝলেন কবিকে? এটা যদি বুঝতে পারা যায় তবে তা কৃত্রিম ভাবে গড়ে তোলা যাবে। সে ক্ষেত্রে একটি যন্ত্র আমাদের শুধু স্পর্শ করেই বলে দিতে পারবে আমাদের দোষগুণ। বুঝলেন’?

= ‘সে … মহৎ ব্যক্তিরা হয়ত পারেন,  সাধারণ মানুষ পারবে কি?’

‘পারবে। পারে তো। ধরুন যাদু কি ঝপ্পি। দেখেছেন তো সিনেমায়। আমাদের ব্যক্তি জীবনে কি হয় না তেমন? বাচ্চা কাঁদছে, তার মা কি বাবা জড়িয়ে ধরল। চুপ করে গেল তখনই। পরিস্থিতির তো কোন পরিবর্তন হল না। গভীর ব্যথায় বসে আছেন, কেউ এক জন মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। কিছুটা কমল ব্যথা।  খুব আনন্দে জড়িয়ে ধরে লোক, আনন্দ সংক্রামিত হয়ে যায়। বিদায় বেলায় জড়িয়ে ধরি একে অন্যকে। বেদনা কিছুটা লাঘব হয়। অন্য পক্ষও আছে। যা কে বলে ব্যাড টাচ। হয়ত কিছুক্ষণ আগে আপনার হাত আমি ধরাতে আপনার মনে হয়েছিল।’

= ‘না… তা নয়। তা … আপনি আমার হাত ধরে কি বুঝলেন?’

‘বলব একটু পরে। আপাতত আমি আপনার সঙ্গে চিদানন্দ বাবুর বিয়েটা দেওয়াতে চাই। আপনার অফিসের ছুটিছাটার ব্যাপার কি রকম?’

= ‘বাবা। একেবারে দেওয়াতে চান? আমাকে জিজ্ঞেস করারও প্রয়োজন নেই ? হবে না বিয়ে।‘

‘কেন? আপনি ওকে ছাড়া বিয়ে করবেন না। আপনার মা-বাবা তাতেই রাজি। আপনার বাবার কিঞ্চিৎ তাড়া আছে কারণ তার হার্টে অল্প দোষ পাওয়া গেছে। এদিকে চিদানন্দ বাবুর বাড়িতেও কোনও আপত্তি নেই। তাহলে?’

= ‘বলছি তো, হবে না’।

‘আমিও জিজ্ঞেস করছি, হবে না কেন। চিদানন্দের মা পেঁয়াজ রঙের বেনারসি পছন্দ করে ফেলেছেন, আমি সে রং দেখেছি।‘

= ‘এত বাজে কথা বলেন কেন? বলছি হবে না, তো হবে না। আচ্ছা আপনার আত্মসম্মান বোধ নেই’?

‘অসম্মানের ভয়ে প্রতিজ্ঞা ভাঙলে গবেষক হওয়া যায় না। হয় সুনির্দিষ্ট কারণ দেখান, নইলে ছুটির দরখাস্ত করুন’।

= ‘আপনি কে এর মধ্যে আসার? আমার বাবা মা র সঙ্গে আমি কথা বলব’।

‘আপনার বাবা-মাই আমাকে বলেছেন যাবতীয় দায়িত্ব নিতে । প্রথম পর্যায়ের বাজার কালকে করেছেন ওরা। হয়ত প্যাকেট দেখেছেন আপনি। আমিই নিয়ে গেছলাম।’

= ‘কি! আপনি ওদের বাজারে নিয়ে গেছিলেন। কেন?’

‘কারণ চিদানন্দের স্যুটের মাপ আমার কাছে আছে। তা ছাড়া ওদের পছন্দের বৌভাতের শাড়ির রংটাও আমার মোবাইলেই রয়েছে। চিদানন্দ বলেছে কাঁচা হলুদ রংটি আপনাকে মানাবে ভালো’।

= ‘উইল ইয়উ স্টপ জ্যাবারিং। এনাফ ইজ এনাফ’।

‘নো। আই হাভ আ লট টু স্পিক। আনলেস ইউ কাম ক্লিন। আই ফাইন্ড হিম আ পারফেক্ট ম্যাচ ফর ইউ। হোয়াই নট ম্যারি চিদানন্দ’?

= ‘বিকজ হি ডাজ নট এক্সিস্ট। ইউ লায়ার, ইম্পস্টার, হাউ ক্যান ইউ মিট হিম…!’

‘ চিদানন্দ নেই?’

= ‘না।‘

‘কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। থ্যা > > >ঙ্ক ইউ চিত্রিতা দেবী। ইংরেজদেরও ধন্যবাদ । রেগে যাওয়া মানুষ আর মাতাল যখন ইংরেজি বলে তখন সত্যি কথাই বলে। চিদানন্দ বলে কেউ নেই সে আমি জানি। শুধু যেটা জানি না সেটা এবার খোলসা করুন। বলুন সেদিনের নাটকের অর্থ কি, আর আমাকে কোন কারণে আপনার অপছন্দ হয়েছে। বলুন, বলুন’?

= ‘আপনাকে অপছন্দ হয় নি’।

‘তাহলে’?

= ‘আমি কাউকেই বিয়ে করতে চাইনি’।

‘হিটলারও চান নি কিন্তু মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে করতে হয়েছিল। আপনার ক্ষেত্রে কারণটা কি’?

= ‘আপনার আগে তিন পার্টি এসেছিল।আমি পোস্ট গ্রাজুয়েট, যথেষ্ট ভালো চাকরি করি …  আমাকে দেখেছে যেন অ্যাকোরিয়ামের মাছ। এই একবিংশ শতাব্দীতেও তাদের এই চাই, সেই চাই। বাবার শরীর খারাপ … তো তার চিকিৎসা হবে। তার ওষুধ কি আমার বিয়ে? আমাকে লুকিয়ে ভিখারির মত তাদের গাড়ি দেবো বলেছে। তাও তারা শেষে পছন্দ করেনি  … আমার নাকি রং টা … এই বাঙালির গর্ব কলকাতা শহরের বুকে… ভাবতে পারেন?’

‘খুব পারি। এ রকম হয়। তাই বলে কি আমরা … আমরা …’।

= ‘কি আমরা …’?

‘কফি খাব না? খাবো না আমরা কফি? নিন … কফিটা শেষ করুন। আর কিছু বলি। কারণ সবটা বলে ফেলে আপনারও নিশ্চয়ই খালি খালি লাগছে। এই যে ভাই … কি নাম …গৌতম ! বাহ… গোলমাল শুনে এসেছ তো ? গোলমাল সিনেমা শেষ আন্ড নো গোলমাল এগেন।  … দু ঠোঙা মুর্গী ভাজা … বুঝেছ … বাহ ব্রিলিয়ান্ট। তাহলে গৌতম গেল … এখন গম্ভীর আলোচনা। আমার যা জমা আছে তাতে আমাদের বিয়ে, আপনার মা-বাবার এ বছরের তিরিশ-তম বিবাহ বার্ষিকী, আগামী বছর আমার বাবা-মায়ের পঁয়েত্রিশ-তম বিবাহ বার্ষিকী সবই টায়টোয়ে হয়ে যাবার কথা। হনিমুনটা শুধু দীপুদার হোটেলে করতে হবে কারণ বাজেট শর্ট’।

= ‘দীপুদা কে’?

‘ওই দীঘা … পুরী … দার্জিলিং। আপনি কলকাতায় থেকে ভুলে গেছেন আমি কিন্তু ন’বছর বিদেশে থেকেও নিত্য জপ করতাম। অবশ্য আপনি কিছু সাহায্য করলে শ্রীমতীর কাছেও যেতে পারি। ভ্রু সোজা করুন। শ্রীলঙ্কা, মল দ্বীপ কিম্বা তিন ভুবনের পারে। আচ্ছা বাকি কথা বলে নি। গাড়ি আছে। ছোট তবে পাঁচ জন বসতে পারবে। আপনার বাবা কিছু না দিলেও হবে, কিন্তু এক মেয়ের বাপের অনেক শখ থাকে। আমি তাতে বাধা দেবার কে? এবার?  আপনি বিয়েতে রাজি হয়েছেন বলে ধন্যবাদ।‘

= ‘এবার আপনি তাড়াহুড়ো করছেন।’

‘সাতদিন ছুটি নিয়ে, সারাদিন আপনাকে ফলো করে, রাত জেগে ভেবে … তারপর বলছি। আমার চৌদ্দপুরুষ কক্ষনো মত দিতে এত সময় নেয় নি।’

= ‘আচ্ছা আপনি এত কিছুর পর … কলকাতা শহরে তো আপনার মেয়ের অভাব হবে না …  আমি তো তেমন … যাকে বলে …’।

‘এই যে আপনার সিদ্ধান্তহীনতা এটা ভিটামিনের অভাব। আজ থেকেই একটা মাল্টি ভিটামিন বড়ি। আর … হতেও পারে আপনি ঠিক। আমি যে প্রথমে আপনাকে বিয়ে করার জন্যে পাগল হয়েছিলাম, এমন নয়। বরং একটু রেগেই ছিলাম।‘

= ‘তাহলে ? মত বদলালেন কেন?’

‘দেখলাম আপনি রিকশায় ভাড়া নিয়ে দর দস্তুর করেন না। প্রায় রোজ ফুল কেনেন। পাড়ার বাচ্চাগুলো আপনাকে দেখলে হাসে। তারা চকলেট পায়, কুকুররা বিস্কুট। সাতদিন ঘরে কথা বলেন নি কিন্তু ওষুধ পত্র, বাজার টাজার ঠিক ঠাক করেছেন। এসব দেখতে দেখতে …।’

= ‘তাতেই ছেড়ে দিলাম পথটা আর বদলে গেল মতটা, তাইতো?’

‘খানিকটা তাই । কিন্তু আসলে আমার মা-বাবা। আপনার সেদিনের ঘরোয়া আবির্ভাব, তেমন ফর্সা নয় রং , তেজ আর সত্য ভাষণ … যা কিন্তু আসলে সত্যি নয় … ওই দু জনকে পেড়ে ফেলেছে। এখন যদি আমি আপনাকে বিয়ে না করি … শেষে হয় তো বাবাই করে ফেলবেন।’

= ‘ছিঃ। মা বাবা সম্বন্ধে এসব কি কথা’।

‘সাধে কি আর বলছি। বাবাকে রোজ প্রগ্রেস রিপোর্ট দিতে হচ্ছে আর মা যখন তখন সবিট্রেট খুঁজছে । আসলে ওরাও ঠিক মেয়ে দেখে বেড়ানো টাইপ নয় তো। তাছাড়া গত চৌত্রিশ বছর বাড়িতে কোনো বিয়ে হয় নি। তাই আমাকে ভিড়তে হল। অল্প গোয়েন্দাগিরি। আপনি যখন পার্ক স্ট্রিটের রেস্তোরাঁয় আপনার বান্ধবীকে সব কথা বলে হেসে গড়াচ্ছিলেন … আমি পিছনের টেবিলেই বসে মাছ ভাজা খাচ্ছিলাম। বাকি ইতিহাস।’

= ‘আপনি কি বিশ্বাসযোগ্য?’

‘নিশ্চয়ই। অন্তত চিদানন্দের থেকে বেশি’।

= ‘আবার?’

‘আচ্ছা আপনি সেদিন আর নাম খুঁজে পান নি, না? ডান হাতে খোলা ‘দ্য সিনেমা অফ সত্যজিৎ রায়’, লেখক চিদানন্দ দাশগুপ্ত … সেটাই ঝেড়ে দিলেন’।

= ‘ঠিক আছে … ঠিক আছে … আমি রেগে গিয়েছিলাম। কত বার সরি বলব। আচ্ছা আপনি আমার হাত ধরে কি বুঝলেন এবার বলবেন কি?’

‘হ্যাঁ। বলা যায়। ওই হাত আগে বাবা ছাড়া অন্য কোন পুরুষ মানুষ ধরে নি। কাঁপছিল কিন্তু ব্যাড টাচের জন্যে নয়। খুবই ভাবপ্রবণ। এবার একজন দরকার যে শক্ত করে এই হাত ধরতে পারবে।‘

= ‘তাই ? ছুঁয়ে এত কিছু বোঝা যায়? আমি পারবো?’

‘নিশ্চয়ই। তবে একটু সাধনা লাগবে । মেসিনে ব্লাড প্রেসার মাপার মত। ও আমি শিখিয়ে দেবো। বাই দ্য ওয়ে … আজকের বিলটা বরং আপনিই দিন।‘

= ‘কেন আপনি ডেকেছেন … আমি কেন?’

‘কারণ আজ থেকে আপনার স্পর্শ বিজ্ঞানের পাঠ শুরু হল, তার একটা ফি আছে তো!’

= ‘ঠিক আছে, কিন্তু ধার দিলাম। যদি শিখতে পারি, শোধ নেবো না । আর যদি …’।

‘ঠিক আছে । এখন এই মুর্গি ভাজা উদ্ধার করতে করতে আসুন বাজারের খুঁটিনাটিগুলো ঠিক করে নি। পেঁয়াজ রঙের বেনারসি, হলুদ রঙের কাঞ্জিভরম, লজ্জা বস্ত্র …’।
(ফেড আউট)

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.