
= আসুন , আসুন। ধন্য হোক মানব জীবন। আমাকে সুধাকান্ত বলেছিল আজ একজন অপ্রতিম অক্ষরজীবী আসছেন । আপনার সৌম্য সহাস বিনত নয়ান দেখেই বুঝলাম আপনিই সেই লেখক কূল চূড়ামণি। একটু বিস্ময়ের আভাষ জেগেছে আপনার দু নয়নে। খুব সম্ভব সুধাকান্ত নামের কেউ আপনার পরিচিত নন। এ অতি অনলৌকিক অভিব্যক্তি। সুধাকান্ত নামের কেউ আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। করেছিল পঞ্চানন। আসলে আপনার মত অক্ষরজীবকের এ কথা অবিদিত থাকার কথা নয় যে ঠাকুরের – আমি রবীন্দ্রনাথের উল্লেখ এ ভাবেই করি – নিত্যকাজের সহচর ছিলেন শ্রী সুধাকান্ত। প্রথম পাঠক ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুদ্রকও বটে। তেমনি আমার দুটি যুগান্তকারী প্রবন্ধ সঙ্কলনের মুদ্রণ দায়িত্ব স্বেচ্ছায়, শ্রদ্ধায় বহন করেছে পঞ্চানন। আমি আর ও বিষয়ে কথাটি কইনে। শুধু সস্নেহে তাকে সুধাকান্ত বলে ডাকি। তেমনি বাসায় যে সহচর আছে – তাঁকে ডাকি – লীলমণি। এতটুকু বাসার নাম উত্তরায়ণ, তাতে দক্ষিণের বারান্দা। ছেলে রথী। শুধু লীলাসঙ্গিনীকে ‘ভাই ছুটি’ বলতে পারিনে, সে বড় রাগ করে । আরেকটা দুঃখ – প্রকৃতিগতভাবে আমার শ্মশ্রুরাজির বাড় বাড়ে না। ভালো কথা আপনি কি নিয়ে লেখেন যেন, সুধাকান্ত সঠিক বলতে পারেনি। যাই লিখুন তিনি তো রয়েছেন সম্মুখে পথ রুধি – এড়াতে গেলেই ব্যথা বাজবে। যাই হোক সখ্য হলে প্রতিভার প্রকাশ হবে। এখন একটু অন্যত্র যাই – ওই আসছে নাট্যাচার্য দ্বিজেন্দ্রলাল। না, না এরও অন্য নাম আছে তবে আমার সঙ্গে কিছুটা তিক্ত কষায় সম্পর্ক তো – তাই বলি ওই নাম। মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ কিন্তু …। দেখা হবে আবার।
-কে ওখানে দিলদার ? যোগেশ? কাপ্তেন বেনীমাধব? না কি ইন্দ্রজিৎ? কথা কইছ না যে বড়? এই রে । সরি দাদা, সরি। আপনাকে তো চিনতে পারলাম না। ও- ও- ও । পঞ্চানন বলছিল বটে আজকে এক নতুন মানুষ আসবেন। তা মানুষ না মুর্গি কে জানে। পঞ্চাটা কি দু তিন বার জাপান গেছে – প্রকৃতিতেই হাইকু হয়ে গেছে। কথা কম – হাসি বেশি। এক দিন সকালে বসকে গুড মর্নিং না বলে – বলে কি না ওহায়ো – ও – ও – ও গোজাইমাসু। বসটা মদ্র, এমনিতেই বাংলা বোঝে না বলে গোমড়াথেরিয়াম, তারপর আবার গোজাইমাসু। রেগে কাঁই, পঞ্চা বাঁইবাঁই। বেশ সিরিও কমিক চরিত্র। নামিয়ে দিতাম, কিন্তু আমার আবার কমিক টমিক আসে না। তো- আপনি কি কবি? না? – কি আনন্দ। নাটক লেখেন না তো? বাঁচালেন। একটা টিনের তরোয়াল আর দুটো তিতুমীর – বাঁশের কেল্লা ওমনি ভেঙে পড়বে। আপনি আমার ঘোড়াই-চরিত-ফানুষ – দেখেছেন? দেখবেন কি করে? বাংলার দুর্ভাগ্য। দু বছর হয়ে গেল রিহার্স্যাল আর রিহার্স্যাল। অন্তত তিনশো কাপ লাল চা আর সাড়ে সাতশো সিগারেট ধোঁয়া হয়ে গেল পঞ্চার বাড়ির ছাদে। মঞ্চই দেয় না কোনো শা-। এ দেশে ব্রাত্য কি ভৃত্য না হলে মঞ্চ না – শুধু বঞ্চনা। নইলে যেমন জর্মনীতে ব্রেখট, নরওয়েতে ইবসেন তেমনি বঙ্গভুমে … থাক গে। । আচ্ছা প্রতিভার কথায় মনে পড়ল। কি বলছিল আপনাকে দাড়ি বুড়ো? আরে এতক্ষণ যার সঙ্গে বকবক করছিলেন । জানি জানি মাকুন্দটার দাড়ি নেই। কিন্তু দু পাতা রবীন্দ্রনাথ পড়ে নিজেকে একেবারে দ্বারকানাথের নাতি ভেবে নিয়েছে। ভাবতে পারেন বাপ হয়ে বলে কি না – ছেলেটার নাম দিলাম রথী – না কৃষি কাজ নিয়ে পড়ল না অন্যের বৌয়ের সঙ্গে লটঘট করল। কি হল? ভ্যাবলাকান্ত হয়ে তাকিয়ে আছেন যে। ওওও। জীবনে বোধহয় প্র-কু-পা’র ‘রবিজীবনী’ ছাড়া কিস্যু পড়েন নি।ও ব্যাটাও পড়েনি। হাবিজাবি প্রবন্ধ লেখে আর পঞ্চাকে দিয়ে জোর করে ছাপায়। পঞ্চার বুঝলেন মনটা ভালো। আমার নাটকের জন্যেও খুব খাটাখাটি করে। বলতে নেই দরাজ হাত। এই যত সভা, তার চা – টা , আমার কালো কফি, ফুকফুক – সব ওই ওর ঘাড় ভেঙেই হয়। সাহিত্য চর্চা বাঁচিয়ে রাখতে এ রকম পঞ্চাদের খুব দরকার। আপনি কি লেখেন জানা হল না, এখন চলি । দেখছেন না আধুনিক কপি আসছে এদিকে। যত্তো সব !

= তুমি খাও এঁটো থুতু, আমি তোমার রক্ত চাটি – এই – এই – দাঁড়াও পথিকবর। কে তুমি? এই খেয়েছে ! নতুন নীমচাঁদ । পঞ্চার আমদানি – তাই না। বয়সে বড় বলেই সব সময় সম্মান আশা করবেন না। আমি অতো রেখে ঢেকে কথা বলি না। কি করেছেন আপনি – আপনারা বাংলা ভাষার জন্যে? বাংলা খেয়েছেন? খালাসি-টোলা চেনেন? ওই এক রবীন্দ্র – নজরুল সন্ধ্যা করে করে নিজেদের পিঠ চুলকান। ইদানীং আবার সুকান্তকেও নিচ্ছেন সঙ্গে। কেহ কারো মন বোঝে না – এ যেন আই পি এল ক্রিকেট টিম। সারা পৃথিবী থেকে খেলোয়াড় কিনে – পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি। সত্য সেলুকাস। ভাবুন একবার – একটা খেলায় যদি চিয়ার লিডার না নাচিয়ে আমাদের পয়সাটা দেয়, পাঁচশো বুভুক্ষু কবির বই ছেপে বেরতে পারে। বাংলা সাহিত্য এগোবে অন্তত একশো বছর। আচ্ছা – আপনারাও তো পারেন। চকচক চেহারা দেখে তো মনে হয় প্রতিদিনই ‘ ফুটপাথ বদল হয় মধ্যরাতে’। মানে গাঁটে গাঁটে টু পাইস। তবে ওয়ান পাইস ফাদার মাদার। তাই তো? তা – এ দিকে কি ভেবে? পুরস্কার চাই? আচ্ছা বলুন তো উটের গ্রীবার মতো অন্ধকার – কি ও কেন? বলুন – বলুন । বাক্যি হরে গেল? আমি জানি ওর মানে। কিন্তু কি হবে? যাদের জীবনে কোনো প্রেম নেই ..। কোনও মেয়ের বাপ পাকা চাকরি ছাড়া রা কাড়ে না। এদিকে এম এ পাস করেও আমাদের হাতে হ্যারিকেন। সম্বল বলতে শুধু দিনে গোটা দুই পদ্য, দশটা বিড়ি, চারটে চা আর এক হাতা ভাতা। কাকেই বা বলছি। ধুর! দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া। নেহাত পঞ্চার চিড়িয়াখানায় মুফতে চা-টা জোটে, তাই সব সহ্য করে পদ্য পড়তে আসি – নইলে …। চলি।

-নমস্কার। ওর কথায় কিছু মনে করবেন না। বঞ্চিত তাই হতাশ, আলো খুঁজছে। সমাজবাদই দিতে পারে ওকে সেই আলো। ভাবছেন আমি কে? ব্যক্তি পরিচয় কিছু নয়, সমষ্টির উন্নতিই একমাত্র লক্ষ্য আজ। ধরে নিচ্ছি আপনার দাস ক্যাপিটাল কিম্বা র্যাডিক্যাল হিউমানিজমের উপর পড়া শোনা আছে। সুতরাং আপনি জানেন যে – সামুহিক উন্নয়ন শুধু মাত্র সমাজবাদের মাধ্যমেই আসতে পারে । মার্ক্স তো বলে গেছেন। শুরুতে তিনি, পরে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস । এরা বলছেন – মূলত তিনটি নীতি নির্ধারক কথা। দার্শনিক নৃবিজ্ঞান, ইতিহাসের তত্ত্ব এবং একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি। তবে এ ছিল অনেকটাই তাত্ত্বিক, তাই লেনিন একে একটু সহজ জনমুখী করলেন। পরে আরেকটু সংশোধিত হল স্ট্যালিনের হাতে। বলশেভিক আন্দোলন – এই সোভিয়েত মার্কসবাদের হাত ধরেই পৃথিবী মুঠোয় ধরত কিন্তু … যা হয় আর কি। স্ট্যালিন-বিরোধী ট্রটস্কি এবং চীনে মাওবাদী মার্ক্সবাদ – এই ধরনের কিছু চিড় ধরে যেতে বিশ্ব বিজয় আর হল না। কিন্তু অংশত ব্যর্থ হলেও নীতি অপ্রাসঙ্গিক হয় না। এই পোড়া দেশে অর্থনৈতিক অসাম্য তো রয়েই গেল। নেহেরু পারলেন না । ল্যাম্প পোস্ট সব খালি আর কালোবাজারিরা বিভিন্ন পোস্টে । পুঁজিপতি আর দালালে ভরে গেল দেশটা। সাধারণ মানুষ দৌড়ল দালাল স্ট্রিটে। এখন আমাদের বুঝতে হবে – আপনার হাই উঠল কি? তাহলে আপনিও তাই। এই বুর্জুয়াদের মতো। এরা – আমাকে দেখলেই পালায়। আপনি নতুন দেখে বড় আশা করে এসেছিলাম, কিন্তু … এখানেও ব্যর্থতা। চলি।
= শ্রী বিষ্ণু, শ্রী বিষ্ণু। আপনার তো কোনো দিন মুখ দর্শন হয়নি। নবীন রাখাল না কি? এসেই ম্লেচ্ছটার কবলে পড়ে গিয়ে ছিলেন? জানি, জানি । সাহেবরা হল ম্লেচ্ছ। কিন্তু যে সব ভারতীয়ের গোপালে বিশ্বাস নেই তারাও ম্লেচ্ছ। আমি হলাম সনাতনী – কাফের তো বলতে পারি না।নারায়ণ, নারায়ণ । এদের সুমতি দাও। বুলগেরিয়ায় বৃষ্টি হলে এদের সর্দি হয়। দেহটা এখানে আছে কিন্তু বাকি সব পড়ে আছে কিউবা, কোরিয়া, মঙ্গোলিয়ায়। দেব-ভূমিতে থেকেও দেব দ্বিজে বিমুখ। এই দ্বিমুখী সত্তাদের মুখে যাবতীয় দেশভক্তদের চন্দন লেপন করা দরকার। আমি আমার গত প্রবন্ধে দেখিয়েছি -সক্রিয়তাই ধম্মের মূল অভিমুখ হওয়া উচিৎ। কবে তাঁর কল বাতাসে নড়বে তার প্রতীক্ষা নয়। আপনি এ বিষয়েই লেখালেখি করেন তো? নচেৎ আর আপনার সাথে বার্তালাপে লাভ কি? নমো বিষ্ণু নারায়ণায়।

-নড়বেন না। দাঁড়ান। ওরা কেউ ধরতে পারেনি কে বট আপনি । অগত্যা তদন্ত আমার হাতে। দেখি, হুম। চশমাটি আধুনিক মানে ল্যাপটপ হ্যাজ। ধিনিকেস্টর মত দাঁড়িয়ে, মানে হাঁটুতে বাত। চোখের কোল ফোলা – কোলেস্টেরল।ঠোঁট পোড়া নয়, মুখ লাল,দশ মেসে ভুঁড়ি। মানে – বায়ু পথে না না কিন্তু – জল পথে রোজ । উফ! হত্তেল ঘুঘু। আঃ-বলছি না চুপ করে দাঁড়ান। বাঁ হাতে হীরের আংটি – পয়সা আছে। তাহলে – নবীন কোনো চলচিত্রের চলমান চলন্তিকা না কি? এ আমাদের স্টকে নেই। কিন্তু… হাতের তালু দেখি – হুম – ছ কোনা- এতো খুনিদের হাতের পাঞ্জা। আপনাকে তো একটু কাল্টিভেট না করে … আরে ডরো মত। আমি পুলিশ নই। গোয়েন্দা দম-কেসে র লেখক নীরবিন্দু বাঁড়ুজ্জে, সুজিতও বলতে পারেন। খুব দমদার। ওই যে পড়ে পোড়া বিড়ি – এখান থেকেই বলে দিচ্ছি- যে ফুঁকেছে সে বাঁ হাতি আর সামনের একটা দাঁত ভাঙা । বিড়িটা চিবিয়েছে মানে খুব ক্ষুব্ধ সত্ত্বা। পাশে অস্পষ্ট হাওয়াই চটির দাগ – ওটা বাটা’রও নয় শ্রীলেদার্সেরও নয়। লোকটির মোটামুটি ওজন ছেচল্লিশ কিলো আর উচ্চতা? সে ধরুন একশ পঞ্চাশ সেন্টিমিটার। আর হ্যাঁ, নিশ্চই কবিতা লেখে। হাঁ বন্ধ করুন – এসব এলিমেন্টারি মাই ডিয়ার ওয়াটসন। থাক । এবার আপনি। কামিয়েছেন অনেক। এবার সাহিত্যের দরবারে কল্কে চাই। পড়াশোনা ঢুঁ ঢুঁ, তাই পঞ্চাকে ধরেছেন। ঠিক ? হুম। এখন প্রশ্ন কি লেখেন? থামুন থামুন, আপনি বলবেন না, আমি আছি কি করতে? বলে দিচ্ছি এখুনি। সিরিয়াস লেখকদের একটা জ্যোতি ঠিকরে বেরোয়। কবিদের এত বড় ভুঁড়ি হয় না। এ রকম ঢ্যাঁড়স না কি নাদ্যোস চেহারা নিয়ে … কি লেখেন … কি লেখেন …। ধর্ম … না। রাজনীতি … না, না। খেলাধুলো … দূর। তাহলে … তাহলে… কি বাকি রইল ফাঁকিবাজদের জন্যে …। হাসছেন? গাল খেয়েও কে হাসতে পারে? এই ধরেছি – হাসির গল্প লেখক। না কি রম্য রচনা? আমার সঙ্গে চালাকি না চলিস্যতি। এই সম্বল নিয়ে এখানে জুটতে এসেছেন? যেখানে অ্যাকাডেমি, জ্ঞানপীঠ,ম্যাগসাইসাই … না এখোনো কেউ পাননি – কিন্তু পেতে কতক্ষণ? সেখানে আপনি …। এত ক্ষুরধার গোয়েন্দা গল্প লিখি আমি, এরা আমাকেই … । আশার ছলনে ভুলি – ওকি উঠছেন না কি? আরে আরে হতাশ হবেন না। লেখক না হলে কি সাহিত্য পুরস্কার পাওয়া যায় না? খুব যায়। শুধু সবার রঙে রঙ মেশাতে হয়। ধৈর্য্য হারালে হবে? নিতান্তই যাবেন তাহলে। আচ্ছা নমস্কার। আমি পঞ্চাকে বলে দেব। কি যেন গেয়েছিলেন অ্যান্টনি কবিয়ালকে দেখে ভোলা ময়রা … এ ব্যাটা ভেড়ের ভেড়ে নেমক ছেড়ে কবির ব্যবসা ধরেছে – হে হে হে।


অল্প দুর্নীতি ছাড়া আজকাল কোনো কাজই সম্পন্য হয় না। তাই বোধহয় এই সব অর্বাচিনের লেখাও সম্পাদক দুজনকে গলাধঃকরণ করতে হচ্ছে। এবার একটু কঠোর হবার অনুরোধ জানাচ্ছি।