শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

রবীন্দ্রসঙ্গীত সাধনার স্বাধীনতা

কত রাজা আসে যায়, ইতিহাসে চিহ্নহীন তার পদ ধ্বনি বেজে বেজে চলে …। ( ফেরারি ফৌজ, প্রেমেন্দ্র মিত্র)

‘স্বপন দেখিছে রাধারানী, আহা স্বপন দেখিছে রাধারানী’। না । রাধারানী নন – স্বপ্ন দেখছিল দুখিরাম। সে ভারি খুবসুরত খোয়াব, জীবন ধন্য করা খোশখেয়াল। অক্ষাংশ – 22.5422 আর দ্রাঘিমাংশ – 88.3442 যেখানে কাটাকুটি করেছে স্বপ্নের শুরু ঐখানে। পাঠক / পাঠিকা ভয় পাবেন না। ওখানে পৌঁছোবার জন্যে আপনাদের জাহাজের কাপ্তেন হবার প্রয়োজন নেই। আসলে ওটি কলকাতার রবীন্দ্র সদনের সাকিন। সহজ করে বলা যেত। কিন্তু কে না জানে বাঙালি সহজ কথা সহজে বোঝে না।

যাই হোক, সেদিন রবীন্দ্র সদনে একটা ফিস-ফ্রাই ফেলারও স্থান নেই। যে দিকে মন যায় শুধু রবীন্দ্রনাথ। যে দিকে দৃষ্টি যায়, বনেদী বাঙালির সুদৃশ্য কাজ করা শাড়ি / পাঞ্জাবি আর রকমারি দাড়ি, চুল। যে দিকে নাক যায় দামী আতরের খুশবু। যে দিকে কান যায় শুধু ‘সাধু, সাধু’ রব। আর যে দিকে চোখ যাওয়া উচিত নয় – অথচ বারবার ‘রাতের কল্লোল’-এর মত স্বেচ্ছাচারী চোখ চলেই যায় – সেই সুকেশা, সুবেশা, নন্দনবাসিনী, নগ্রোধপরিমন্ডলা…।

এই রে। আরেকটু হলেই বিপদ বাড়াচ্ছিলাম আর কি। সভ্যতার ঊষা লগ্ন থেকেই ‘রম্যাণি বীক্ষ্য’ হলে পুরুষ মানুষ – নিদাঘ গ্রীষ্মে পিচ-রাস্তার মত গলে যায়। কালিদাস থেকে ভারত চন্দ্র হয়ে হালের ‘গোঁসাই ঠাকুর’ বা ‘শ্রী-জাত’ – আমাদের মাথাটি চিবিয়ে খেয়েছেন। সাদা কথায় দর্শকাসন রুচিমান শ্রোতায় পরিপূর্ণ আর মঞ্চে … ? দুঃসহ দুখিরাম, মুখে রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘যেতে যেতে একলা পথে নিবেছে মোর বাতি’। প্রেক্ষাগৃহের বাতি নেভানোই ছিল তাই তদগত দুখিরাম সেখানকার দাঙ্গা পরিস্থিতির কিছু আগাম ইঙ্গিত পায় নি। হঠাৎ যেন ভুঁই ফুঁড়ে একটি শিক্ষিকার হাত – কান ধরে টেনে তুলল দুখিরামকে। অপরিচিত কেউ নয়, তার নিজের অগ্রজা। তানপুরা বাঁধার ছন্দে দুখিরামের কান পাকাতে পাকাতে তিনি গর্জন করলেন ‘ ঝড়কে পেলেম সাথী – তে নিচে ষড়জে নেমে দাঁড়ানোর কথা – নামলি পুরো দু সুতো কম? দিনু ঠাকুর তোকে পদাঘাতে কোপাই নদীতে ফেলে দিতেন। বারবার বলেছি রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে ছেলে খেলা …’। ততক্ষণে প্রেক্ষাগৃহে ব্যাপক কোলাহল । ‘ওই বটে ওই চোর, ওই চোর, ওই চোর’ রব তুলে ধেয়ে আসছেন এতক্ষণের দেবোপম শ্রোতারা, ঠিক কোটালেরই মত।

না। বাস্তবে এমন হয়নি। শুধু ঘর্মস্নাত দুখিরামের ঘুম ভেঙে গেছে। সে সময় রক্তচাপ মাপলে ডায়াস্টলিক নিশ্চিত শ’ দেড়েক হত। একটু জল খেয়ে ধাতস্থ হয়ে দুখিরাম জল্পনা করল – তাই তো। তার দিদি এমনিতে যথেষ্ট স্নেহশীলা কিন্তু রবীন্দ্র-গানে কালিমা লেপনের দুশ্চেষ্টা দেখলে তার মা কালী রূপ ফুটে বেরোয়। এরকম আরো আছেন। হয়ত তারা ঠিক। রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্বর বিচ্যুতি – তা সে যতই সুতো পরিমাণ হোক – স্বপ্নেও সহ্য করা উচিত নয়। অন্তত অখ্যাত লোকের পক্ষে। কারণ বিখ্যাত গায়ক / গায়িকাদের কান অনেক উঁচুতে বিচরণ করে। তারা নেচে – নেচে, গিটার বাজিয়ে, ড্রাম ঠুকে, অবোধ্য প্রিলুড / ইন্টারলুড আর ‘তোম নোম তারানা’ সহ রবি কবির গান উদ্দাম গাইতে পারেন। ঘুরন্ত আলোর দুরন্ত মঞ্চে গাইতে উঠে – নান্দীমুখ ধাঁচে একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন এবং তারপরেই থাকে রকমারি সুস্বাদু গানের বুফে টেবিল।

গত শতকের শেষ থেকেই বিশ্বভারতীর গুরু মশাইরা তাদের শাসনের ছড়িটি – (যা দিয়ে তারা জর্জ বিশ্বাসকে আটক করে ছিলেন ) আলমারির মাথায় তুলে রেখেছেন। তা বলে ঘড়ি তো থেমে থাকে নি। কারাওকে এবং আন্তর্জালের দাপটে রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়ক / গায়িকার অতি-মারী এখন। তাদের সুবিধে – অলীক মাধ্যমের আড়ালে থাকেন, ‘তুমি কি কেবলি ছবি’ হয়ে । আর দুখিরামের কান চাইলেই ধরা যায় কারণ তার ‘ কিনু গোয়ালার গলি’ আপনাদের ঘরের পাশেই।

রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং হয়ত নন কিন্তু কে বা কারা যেন স্থির করে দিয়েছেন – শুধু প্রানের টানে শিক্ষাহীন সাধারণের জন্যে রবীন্দ্র গান গাওয়া ঐতিহ্যের পরিপন্থী, লজ্জা জনক। মজা হল – যত সহজে রবীন্দ্রনাথের অন্য সৃষ্টির সমালোচনা টেবিল চাপড়িয়ে করা যায়, শোভন অশোভনের সীমানায় তাল ঠুকে দাঁড়ানো যায়, সেকালের সজনী-কান্ত থেকে একালের জলজ্যান্তরা যা করেছেন / করে থাকেন – ততটা সহজ গানের ক্ষেত্রটি নয়। সেখানে বুধমণ্ডলী একটু চাঁদি চুলকে থাকেন। এখন যদিও দুখিরামের বুকের পাটা কমজোরি, বোধহয় সেটা আপেল কাঠের – তবু ওই গানের ব্যাপারেই একটি নিজস্ব ধরণে দুঃখের কথা পাড়বে। আর পাড়বে সামাজিক মাধ্যমে । যাতে সেই অশ্ব ডিম্ব প্রসবের কারণে – বাস্তবে কেউ না আবার তার কান পেঁচিয়ে দেয়। তবে প্রস্তাবনায় কয়েকটি গল্প শুনুন পাঠক / পাঠিকা। প্রথমটি বলেছেন দুখিরামের পড়া অন্যতম সেরা গদ্য-বিদ আড্ডাবাজ বাবু কুমার প্রসাদ ।

কুমার প্রসাদ মুখোপাধ্যায়

মিয়া কি তোড়ি গাইছিলেন কিম্বদন্তী আব্দুল করিম খান, শ্রোতাদের মধ্যে রয়েছেন মহিষাদলের রাজা দেব প্রসাদ গর্গ। এক ঘণ্টা গাইলেন বিলম্বিত – এক তালে, তার আবার আটচল্লিশ মাত্রা। রাজা গর্গ শুনছেন । ভাবছেন – এই বুঝি পঞ্চম লাগল। কিন্তু কি আশ্চর্য ! করিম সাহেব একবারও পঞ্চম লাগালেন না । তাতে রাগ মেজাজ বদলে গুর্জরি তোড়ির মত লাগল। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বোদ্ধাদের পক্ষে বিচলিত হবার যথেষ্ট কারণ ছিল। পরে এক সাক্ষাৎকারে শ্রদ্ধেয় দেব প্রসাদ এটি স্মরণ করিয়ে দিলে করিম সাহেব বললেন ‘ ইয়াদ নহি পঞ্চম লগায়া থা ইয়া নহি, আপ বতাইয়ে প্রোগ্রাম আপকো আচ্ছি লগি ইয়া নহি’? ব্যস। শুনতে ভালো লেগেছে কি না ? সারঙ দেব তো বলেইছেন ‘রঞ্জয়তে ইতি রাগ’। আপিল ডিসমিস। দ্বিতীয় কাহিনী।

একটি কঠিন গানের সুর সম্পন্ন করে (পরে যেটি কালজয়ী হবে) ঈষৎ দ্বিধাগ্রস্ত পঞ্চম বললেন ‘দাদা-মুনি’র ভাইকে ‘ দেখ কিশোর, এক গীত বনায়া হু – রাগ শিব-রঞ্জনী পর । কয়া তুম গা পাও গে’? স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে ‘আভাস বাবু’ বললেন ‘শিব-রঞ্জনী কি অ্যাসি কি ত্যাসি, সুর বনায়া হৈ তো শুনা দো। গানা মেরা কাম হৈ’। আসমুদ্র হিমাচলে – সেই জাতিস্মরের সিনেমা রমরমিয়ে চলে ছিল এবং তার পঞ্চাশ শতাংশ কৃতিত্ব সেই ‘শাওন ভাদো’র সুর বৃষ্টি দাবী করতেই পারে। দুখিরাম মোটা মুটি নিশ্চিত যে কিশোর কুমার যখন তার অননুকরণীয় ভঙ্গীতে ‘তেরে নয়না’ তে ষড়জ আর কোমল গান্ধার লাগাচ্ছিলেন তখন খুব সম্ভব তিনি জানতেন না শুদ্ধ গান্ধার লাগালেই রাগটি পালটে যাবে ভূপালিতে। (এটাও কিন্তু স্বতঃসিদ্ধ নয়। আরেক কিম্বদন্তী মানা বাবু ওই ‘তেরে নয়না’ মুখড়াতে ষড়জ আর শুদ্ধ গান্ধার লাগিয়ে উপহার দিয়েছিলেন এক অবিস্মরনীয় গান। সে আবার ছায়ানট আশ্রিত।) এখন কথা হল আম শ্রোতার তো আম খাওয়াটাই উদ্দেশ্য। আম যদি সুস্বাদু হয় তবে সে আম – ঢিল মেরে পাড়া হল না না আঁকশি দিয়ে – খুব কিছু বিচার্য কি ?

ওই কিশোর কুমারেরই আরেকটি গল্প। সঙ্গে আছেন কমল কুমার মজুমদারের ‘ঢ্যাঙা বাবু’ – বাঙলা চলচ্চিত্রের পরিপক্বতা যার পথের পাঁচালির পাঠশালায় পড়ানো হয়েছে। তিনি রবীন্দ্র সঙ্গীতের ক্ষেত্রে দু’ জনের অকুণ্ঠ প্রশংসা করতেন – এক সুচিত্রা মিত্র এবং ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ জর্জদা। রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়ে ছবি করলেন ‘চারুলতা’। কিন্তু রবীন্দ্র সঙ্গীত গাওয়ালেন কিশোর কুমারকে দিয়ে। নিজে মুম্বাই গিয়ে গান শিখিয়ে রেকর্ড করে নিয়ে এসে ছিলেন। কাজেই আর কারো ঘাড়ে দোষ চাপানো যাবে না। কিন্তু সিনেমা হলস্থ হওয়ার পরে গানটি শুনে ‘ধম্মে সইবে না’ গোছের কিছু গেল গেল রব উঠেছিল। সত্যজিৎ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন ‘ওখানে ওটাই হত এবং সেটা কিশোর ছাড়া কেউ করতেই পারত না’। যেটা স্পষ্ট করে বলেননি, তা হল নায়ক অমলকে গায়ক হবার দিব্যি দেয় নি কেউ, মনের ভাব/ ছেলে মানুষী প্রকাশ করার জন্যেই গানটি বেছে নিয়েছিল সে। সেটা যখন বোঝা গেছে তখন … । প্রসঙ্গত সত্যজিৎ বাস্তবে ছ’ফুটের ওপর লম্বা ছিলেন আর তার মাথাটি জাগতিক জগত ছাড়িয়ে হিমালয় প্রমাণ উচ্চতায় ছিল। কাজেই তার কানের নাগাল কেউ পেল না। তিনি পরে যখন ‘ঘরে বাইরে’ তুললেন, আবার গায়ক নিলেন চির কিশোরকে। বাঙলা সিনেমায় প্রথম চুম্বন দৃশ্য আর কিশোর গীত রবীন্দ্র গীতি বাঙালি ঢোঁক গিলে হজম করে নিল।

সত্যজিৎ রায় ও কিশোর কুমার

নেমে আসি মা মাটি মানুষের পৃথিবীতে ( আচ্ছা কেউ কি আজ মনে রেখেছেন উল্লেখিত বাক্য বন্ধ প্রকৃত পক্ষে প্রয়াত ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি প্রখ্যাত যাত্রা পালার নাম? নট্ট কোম্পানি নামিয়েছিল দুখিরামের বাল্যকালে? না মনে থাকলে … থাক। ‘দুই বিঘা জমি’ তো বাবুরা না বলেই নিয়ে থাকেন।) এত বিখ্যাত ব্যক্তিদের পরিসর থেকে নামা যাক সাধারণ স্তরে । দুখিরামের এক অগ্রজ বন্ধুর সঙ্গে – রবীন্দ্র-গীতিতে অল্প স্বাধীনতার বিষয়ে – কিছু আলোচনা হচ্ছিল। তিনি অতি সজ্জন এবং রুচিশীল মানুষ। দুখিরামের সঙ্গে কোনো তর্কে প্রবৃত্ত না হয়ে – তাকে একটি বিখ্যাত পত্রের ছবি দু-চার দিন পরে মুঠোফোনে পাঠিয়ে দিলেন। পত্রটি স্বয়ং কবিগুরু লিখেছিলেন তার স্নেহধন্য ‘মন্টু’কে যার বাবার নাম দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। মন্টু বাবু রবীন্দ্র সঙ্গীতে – তেড়ে তানকারী করার পক্ষে সায় দিতে – রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিস্তর তর্ক করেছিলেন। কবি তাকে কথায় ঠেকাতে পারেননি, তাই সেই পত্রের অবতারণা। সেখানে তিনি নানা কথার মাঝে যেটি বলেছিলেন তা হল ‘আমি তো আমার গানে কোথাও ফাঁক রাখিনি’। সঠিক কথা। এতো বন্দিশ নয় যে নানা সুর ও স্বরকে লাগিয়ে গড়ে তুলতে হবে ‘হাওয়া মহল’। রবীন্দ্র সঙ্গীত ‘বর্ণে, গন্ধে, ছন্দে, গীতিতে’ পরিপূর্ণ প্রকৌশলে সৃষ্টি করা নিটোল গান। অবোধের শামী কাবাবের মত একে – তিন বার – তিন রকম মশলা সহ – তিনটি শীলে পিষে তয়ের করা নিষ্প্রয়োজন। এ কথা জজেও মানবে, দুখিরামও।

কিন্তু দুখিরাম তার মূল যে ‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল’ – তার বিষয় ছিল ব্যাকরনের – বা আরো ভালো ভাবে বলতে গেলে বৈয়াকরনের কড়াকড়ি। সুধীজন ভেবে দেখুন একবার – যে কোন ধ্বনিই পর্দা / সুর নির্ভর। এমন কি আমাদের দৈনন্দিন বার্তালাপের ও স্বরলিপি করে দেওয়া সম্ভব। বড়ে গুলাম আলি খাঁ তখন মৃত্যু শয্যায়। তার ছেলে মুনাব্বর আলি খাঁ রাত জাগছেন তার পাশে। গভীর রাতে দূরে কোথাও এক নেড়ি কুত্তা ডেকে উঠল। তিনি কোন রকমে চোখ খুলে মুনাব্বরকে বললেন, ‘শোনো শোনো এই টেবিল ফ্যানের আওয়াজকে ষড়জ ধরলে কুকুরের ডাকে তোড়ির রেখাব গান্ধার পাওয়া যাচ্ছে’। এই তার শেষ কথা। এ অনুভব সত্যি, কিন্তু সাধারণের বুদ্ধি বিন্দুতে এই সিন্ধু আঁটানো যাবে না। এমন সত্যি বুঝতে গেলেও কিছুটা এলেম থাকতে হবে – যা দুখিরামদের না থাকারই কথা। । তাই এই গো – সুলভ গোঁ । সে বলতে চায় – সব কিছু ঠিক সুরে মেলাতে গেলে কথা বলাও ছাড়তে হবে।

দিলীপ কুমার রায়

দিলীপ কুমার রায় যে স্বাধীনতা রবীন্দ্রনাথের কাছে চেয়ে ছিলেন সেটা দেওয়া কবির পক্ষে সম্ভব ছিল না। তানকারি দিয়ে রবীন্দ্র সঙ্গীত – তাঁর জীবৎকালে এক আধ জন গেয়েছিলেন । তাতে তাঁদের কণ্ঠ সাধনার পরিচয় মিলেছিল ঠিকই, কিন্তু ‘না বলা বাণীর’ নন্দন তত্ত্ব মুখ লুকিয়েছিল নিশীথ অন্ধকারে। সে পীড়া শুধু কবি কেন – সুধা সাগর তীরে সমাগত যে কোন সুধী শ্রোতার পক্ষে সহ্য করা মুস্কিল। ‘আঁধার রাতে একলা পাগল’-এর যে আর্তি তার সপ্তকে আছড়ে পড়ছে, আবার নেমে আসছে ‘আঁধার রাতে’ মন্দ্র সপ্তকে। এই যাওয়া আসার পথে যদি সরগম/গিটকিরি জুড়ে দেওয়া হয় – সেটা হবে পাগলের যন্ত্রণা – না বোঝার পাগলামি। ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ চলচ্চিত্রে রাতের মায়াময় মধ্যরাতে বাগেশ্রীর বন্দিশ ‘ক্যায়সে কটে রজনী – পিয়া বিনা’ মিলে যাচ্ছে ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’র সঙ্গে। কিন্তু সেখানেও রবীন্দ্র গান গাওয়া হচ্ছে স্বরলিপির কাঠামো মেনেই। মুড়কি, গিটকিরি ছাড়াই সম্পূর্ণ দৃশ্যের গুমরে ওঠা বিষাদ ঠিকই অনুভব করছেন দর্শক। বিস্বাদ লাগছে না।

ঠাকুর সত্যি, স্বরলিপি সত্যি। কিন্তু এবার কোটি টাকার প্রশ্ন হল – যারা এত কারিকুরি জানে না। গলায় ঈশ্বরের আশীর্বাদ অল্প। স্বরলিপির গলি ঘুঁজি দেখলে পালাবার রাস্তা দ্যাখে। অথচ ‘বহু বাসনায়, প্রানপণে’ রবীন্দ্র গানের কাছে নীড় খোঁজে – রবীন্দ্রনাথ কি তাদের নন? ইচ্ছে হলে তার গান স্বশিক্ষিত কি গাইবে না? তিনি কি সেই বাড়ির পুজোয় নারায়ণ শিলা? যিনি আসেন পুরোহিতের কোলে চড়ে, নেমে বসেন ফুল সাজানো সিংহাসনে, বিধি সম্পন্ন হলে আবার বিদায় নেন। অর্থাৎ – ঠাকুর – ঠাকুরের কোলেই আসেন ও যান। তাহলে তো বলতে হয় শুধু – মানের ঠাকুর আসেন – কিন্তু – প্রাণের ঠাকুর আসেন না। হয়ত তাই সামনে হাত জোড় করা মানুষদের মন পড়ে থাকে ‘ফুলের মালা, দীপের আলো, ধূপের ধোঁয়ার’ বহ্বাড়ম্বরে। বড় জোর প্রসাদ আর সিন্নির উপরেই।

রবীন্দ্রনাথ

কবি হয়ত এমনটা চান নি। অচলায়তনে তিনি গুরু, শোন-পাংশুদের কাছে দাদাঠাকুর, আর দর্ভকদের কাছে গোঁসাই। দাদাঠাকুর, গোঁসাই আর গুরু – এই তিন মূর্তিতে মিলেই গুরুর সম্পূর্ণ রূপ। এরা একত্র হলেই অচলায়তন ভাঙ্গা যেতে পারে। অন্ত্যজের হাত না মিললে গড়াবে না রথের চাকা। অমলের ডাকে সাড়া না দিয়ে রাজার রেহাই নেই। শেষ বেলায় বিশ্ব নাগরিক হয়েও স্বয়ং গুরুদেবকে বলতে হয়েছে ‘আমি তোমাদেরই লোক’।

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.