শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

হারিয়ে যাওয়া গোধূলি

সন্ধে নামছিল ধীরে ধীরে। আকাশের রঙ তখন অদ্ভুত—না পুরো নীল, না পুরো অন্ধকার। যেন দিনের শরীর থেকে আলো ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, ঠিক যেমন আপন কাউকে বিদায় জানানোর সময় শেষ মুহূর্তে আলতো করে হাত ছেড়ে দেওয়া হয়।
আমি সাইকেল চালিয়ে ফিরছিলাম। পাড়ার সেই পুরনো সরু গলি দিয়ে—যে গলিটা আমার জীবনের অনেকটা সময় ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। দু’ধারে পুরোনো বাড়ি। কোথাও ভাঙা বারান্দা, যার লোহার গ্রিলে মরচে জমে বাদামি হয়ে গেছে। কোথাও শুকনো মান্দার গাছ—যাতে বহুদিন ফুল ফোটেনি। তবু গাছটা অপেক্ষা করে আছে। কোথাও জানলার গ্রিলে পুরনো নীল রঙের খোসা উঠে গিয়ে নিচের ধূসর ইঁট দেখা যাচ্ছে।

এই গলির একটা নিজস্ব গন্ধ আছে—ভেজা মাটির, পুরনো দেওয়ালের, আর বহুদিনের বহু মানুষের জমে থাকা গল্পের গন্ধ।
ঠিক তখনই কোথা থেকে একটা গান ভেসে এল। আমি হঠাৎ থেমে গেলাম। সাইকেলের প্যাডেল যেন নিজের থেকেই থেমে গেল।

মেয়ের গলা। স্বচ্ছ। নরম। অথচ তার ভেতরে কেমন এক অদ্ভুত ব্যথা মেশানো।
যেন গলার ভেতর দিয়ে শুধু সুর বেরোচ্ছে না—বেরোচ্ছে কোনও দীর্ঘদিনের জমে থাকা অপেক্ষা, কিছু না-পাওয়া বিকেলের নিঃশ্বাস।
সে গাইছিল—“একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ, প্রাণেশ হে…”
গানটা শুনে বুকের ভেতরটা কেমন যেন হয়ে গেল।
গানটা ঠিক কোন বাড়ি থেকে আসছে বুঝতে পারলাম না।
এই গলিতে বাড়ি অনেক—একতলা, দোতলা, কারও ছাদে পুরনো রেলিং, কারও উঠোনে কদমগাছ। কোথাও আলো জ্বলছে, কোথাও দরজা আধখোলা। কোথাও একটা বুড়ো রেডিওয় খবর বাজছে।
তবু গানটা যেন কোনও নির্দিষ্ট ঘর থেকে নয়। মনে হচ্ছিল—পুরো গলিটার ভেতরেই গানটা ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাওয়ার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
দেওয়ালের সঙ্গে লেগে থাকছে। পুরনো জানলার কাচে এসে ধাক্কা খেয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। গান শুনে দাঁড়িয়ে পড়া আমার বহুদিনের অভ্যাস। ছোটবেলায় এমন কত সন্ধে দেখেছি! তখন পাড়ায় এত শব্দ ছিল না। টিভির চেঁচামেচি ছিল না। মোবাইলের আলো ছিল না। সন্ধ্যা নামলেই গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে হাওয়া আসত। আর কোথাও না কোথাও কেউ গান ধরত।
“হে ক্ষণিকের অতিথি,
এলে প্রভাতে কারে চাহিয়া
ঝরা শেফালির পথ বাহিয়া
হে ক্ষণিকের অতিথি
কোন্ অমরার বিরহিণীরে চাহনি ফিরে
কার বিষাদের শিশিরনীরে এলে নাহিয়া
হে ক্ষণিকের অতিথি।”
হে ক্ষণিকের অতিথি শুধু একটি গান নয়, এটি ক্ষণস্থায়ী ভালোবাসা আর চিরস্থায়ী অনুভূতির এক গভীর প্রকাশ। জীবনে কিছু মানুষ আসে খুব অল্প সময়ের জন্য—হয়তো তারা থেকে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় না, তবুও তাদের উপস্থিতি হৃদয়ের গভীরে অমলিন হয়ে থাকে। তারা আসে নীরবে, ভালোবাসার আলো ছড়ায়, তারপর একদিন আবার নিঃশব্দে চলে যায়। কিন্তু চলে গেলেও তারা ফেলে যায় একরাশ স্মৃতি, এক গভীর শূন্যতা, আর না বলা অনেক অনুভূতি।

এই গানটি যেন সেইসব মানুষের কথা বলে, যারা ক্ষণিকের অতিথি হয়ে এসে আমাদের হৃদয়ের চিরকালের আপন হয়ে যায়। তাদের সঙ্গে কাটানো অল্প কিছু মুহূর্ত সময়ের হিসেবে ক্ষণিক হলেও, অনুভূতির দিক থেকে তা অনন্ত।
তখন মনে হতো—গানটা যেন শুধু গাওয়া হচ্ছে না। গানটা যেন বাতাসে জন্ম নিচ্ছে। যেন আকাশের রঙ বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে কোথাও একটা সুর তৈরি হচ্ছে, আর কেউ একজন শুধু সেই সুরটা ধরে ফেলছে।
একবার পাড়ার এক দিদিকে দেখেছিলাম। বয়সে আমার থেকে অনেক বড়। নামটা এখন আর মনে নেই—কিন্তু মুখটা আজও মনে আছে।
বারান্দায় বসে হারমোনিয়াম বাজাচ্ছে। সন্ধে তখন গাঢ় হয়ে এসেছে। আকাশে একটা তারা উঠেছে। দূরে কারও বাড়িতে শাঁখ বাজছে, ধুনোর গন্ধ ভেসে আসছে। দিদি গাইছিল—“আমার ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন…”তার গলার মধ্যে কেমন এক গভীরতা ছিল। গাইতে গাইতে তার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। সে জল থামানোর চেষ্টা করেনি। হারমোনিয়ামের ওপর কয়েকটা ফোঁটা পড়েছিল।

সে তবু গান থামায়নি। আমি তখন ছোট। কিছুই বুঝতাম না। তবু মনে হয়েছিল—এই গানটা কি শুধুই গান? না কি এর ভেতরে কারও জন্য অপেক্ষা লুকিয়ে আছে? হয়তো কেউ চলে গেছে। হয়তো কেউ আর কোনওদিন ফিরবে না। হয়তো সেই মানুষটার জন্যই দিদি গান গাইছে।
সেই দিন প্রথম মনে হয়েছিল—গান আসলে শুধু সুর নয়। গান হল মানুষের বুকের ভেতরের দরজা। যে দরজাটা আমরা সারা দিন বন্ধ করে রাখি—রাতে, একলা হলে, বা সন্ধের হাওয়ায়—হঠাৎ খুলে যায়।
রবীন্দ্রনাথ মানুষটা যেন মানুষের হৃদয়ের গোপন দরজাগুলো চিনতেন। কোথায় কোন ব্যথা লুকিয়ে আছে, কোথায় কোন ভালোবাসা—
সব যেন তাঁর জানা। তাই তাঁর গান শুনলে মনে হয়—এই কথাগুলো তো আমার নিজের! কেউ যেন আমার মনের ভেতরে ঢুকে চুপচাপ শব্দগুলো লিখে রেখে গেছে।
আজ এত বছর পরে আবার সেই রকম এক সন্ধ্যা। গানটা এখনও ভেসে আসছে। আমি সাইকেলটা ঠেলে একটু এগোলাম। গলির শেষে একটা পুরনো বাড়ি। অনেকদিন কেউ থাকে না সেখানে। দেওয়ালে শ্যাওলা। উঠোনে আগাছা। জানালার কাচ ভাঙা। একটা পুরনো আমগাছ ছাদের ওপর ঝুঁকে আছে। বাড়িটার দিকে তাকালে মনে হয়—এখানে একসময় অনেক মানুষ ছিল। হাসি ছিল। আলোর ঝলক ছিল। বিয়ের গান ছিল।
কোনও শিশুর কান্না ছিল। এখন সব নেই।
শুধু দেয়ালগুলো দাঁড়িয়ে আছে—স্মৃতির মতো।
তবু অদ্ভুতভাবে মনে হলো—
গানটা যেন ওই বাড়ির ভেতর থেকেই আসছে। আমি থেমে দাঁড়ালাম। হাওয়া একটু দুলল। শুকনো পাতা মাটিতে পড়ল। তার মাঝেই মেয়েটি গাইছে—কী এক অদ্ভুত আকুলতায়। যেন সে কাউকে ডাকছে। যেন এই পৃথিবীতে কেউ নেই—শুধু সে আর তার গান।

একটা রিকশা পাশ দিয়ে চলে গেল। টুংটাং শব্দ করে। দূরে একটা কুকুর ডাকল। তবু গানটা হারাল না। বরং আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। বয়স এখন অনেক হয়েছে। চুলে সাদা রঙ এসে গেছে। অনেক মানুষকে আসতে যেতে দেখেছি। অনেক সম্পর্ক তৈরি হতে দেখেছি, ভেঙে যেতে দেখেছি। তবু এমন গান শুনলে বুকের ভেতর অকারণ কাঁপন ওঠে কেন? কেন হঠাৎ মনে হয়—আমি আবার ছোট হয়ে গেছি? কেন মনে পড়ে যায় সেই দিদির মুখ—গানের মধ্যে ডুবে থাকা, চোখের কোণে জল?
হয়তো মানুষ কখনও পুরো বড় হয় না।

আমাদের ভেতরে একটা ছোট মানুষ সারাজীবন বেঁচে থাকে। যে সন্ধ্যা নামলে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। যে গান শুনলে হঠাৎ চুপ হয়ে যায়। যে অকারণেই পুরনো দিনের জন্য মন খারাপ করে।
সম্ভবত মানুষের জীবনে কিছু সন্ধ্যা থাকে—যা কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। তারা কোথাও জমে থাকে। সময়ের ভাঁজে। স্মৃতির আড়ালে।
তারপর কোনও একদিন—কোনও এক নির্জন গলিতে—হঠাৎ ফিরে আসে। একই গন্ধ নিয়ে। একই হাওয়া নিয়ে। একই গান নিয়ে।
গলি পেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। পেছনে তাকাইনি । গানটা তখনও ভেসে আসছিল কিনা জানি না। হয়তো আসছিল। হয়তো না।

কিন্তু সাইকেল চালাতে চালাতে হঠাৎ মনে হলো—গানটা কোনও বাড়ি থেকে আসছে না। গানটা আসছে সময়ের ভেতর থেকে। কোনও এক হারিয়ে যাওয়া গোধূলি থেকে—যেখানে একটা ছেলে সাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, দূরে কেউ হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইছে, আর আকাশের শেষ আলোটা ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। সেই সময়েই দূরে কোথাও একটা ক্লান্ত পাখি দিনের শেষ উড়ান সেরে নিজের বাসায় ফিরছে—ডানায় জমে থাকা আলো আর পথের ধুলো নিয়ে। ডানায় মেখে আনা সন্ধের রঙ, বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা সারাদিনের ক্লান্তি আর অদৃশ্য এক টান নিয়ে। তাকে দেখে মনে হলো, পৃথিবীর সব ফেরা যেন এমনই—নিঃশব্দ, ধীর, অথচ গভীর। মনে হলো, সেই সন্ধ্যাটা আসলে কখনও শেষ হয়নি; শুধু আমরা বড় হয়ে গেছি, পথ বদলে ফেলেছি। তবু হঠাৎ কোনও অচেনা সুর, কিংবা হাওয়ার সামান্য বদলেই সেই সময় ফিরে আসে—নিঃশব্দে, অদ্ভুত পরিচিত হয়ে। আর মনে করিয়ে দেয়, আমাদের ভেতরে এখনও একটা গোধূলি বেঁচে আছে, যেখানে সবকিছু ধীরে ঘটে, যেখানে এক ক্লান্ত পাখি প্রতিদিনই ফিরে আসে নিজের ঠিকানায়, আর কিছুই পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। শুধু আমরা দূরে চলে এসেছি, কোনও এক হারিয়ে যাওয়া গোধূলি থেকে। হয়তো মানুষও সারাজীবন এমনই এক ফেরা খুঁজে বেড়ায়।
কোথাও একটা ঘর, কোথাও একটা আলো, কোথাও একটা পরিচিত সুর—যেখানে ফিরে গেলে মনে হবে, কিছুই হারায়নি।
কিন্তু জীবনের পথ বড় দীর্ঘ। সেই পথে কত মানুষ আসে, কত মানুষ হারিয়ে যায়, কত দরজা চিরদিনের মতো বন্ধ হয়ে যায়। তবু কিছু সুর থেকে যায়—সময়ের ওপারে, স্মৃতির গভীরে, হৃদয়ের নিঃশব্দ কোণে।
হয়তো সেই কারণেই হঠাৎ কোনও সন্ধ্যার গান আমাদের থামিয়ে দেয়।
কারণ সেই সুরের মধ্যে আমরা শুনতে পাই আমাদের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর শব্দ—শৈশবের উঠোন, ভেজা মাটির গন্ধ, কারও না বলা ভালোবাসা, কারও অদেখা অশ্রু।
তখন মনে হয়, আমরা আসলে সময়ের ভেতর দিয়েই হেঁটে চলেছি—আর আমাদের প্রতিটি ফেলে আসা সন্ধ্যা কোথাও না কোথাও বেঁচে আছে।
হয়তো সেই পুরনো গলির ভাঙা জানালার পাশে,
হয়তো সেই মরচেধরা বারান্দার নীরবতায়,
হয়তো কোনও নাম-না-জানা মেয়ের কণ্ঠে ভেসে আসা রবীন্দ্রসঙ্গীতে।
আর তখন বুকের গভীরে এক অদ্ভুত ব্যথা জেগে ওঠে—মিষ্টি, নরম, অথচ অসহনীয়।
কারণ আমরা বুঝতে পারি, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো কখনও ধরে রাখা যায় না; তারা কেবল স্মৃতি হয়ে থেকে যায়।
তবু সেই স্মৃতিগুলোই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
একটা পুরনো গান, একটা সন্ধ্যার আলো, একটা নির্জন গলি—এই সামান্য জিনিসগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জীবনের গভীরতম সত্য।
যে সত্য বলে—
কিছুই পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।
মানুষ হারায়, সময় বদলায়, পথ ফুরিয়ে যায়—
কিন্তু অনুভূতি থেকে যায়।
সন্ধ্যার মতোই থেকে যায়—
ধীরে ধীরে নেমে এসে, নিঃশব্দে হৃদয় ভরে দিয়ে।
আর আমরা—
জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়েও—
মনের গভীরে সেই একটুকরো গোধূলি বয়ে বেড়াই,
যেখানে এখনও একটা ক্লান্ত পাখি ঘরে ফেরে,
কেউ দূরে বসে গান গায়,
আর এক কিশোর সাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বিস্মিত হৃদয়ে।
হয়তো সেই গোধূলিই আমাদের সত্যিকারের বাড়ি—
যেখানে ফিরে যেতে না পারলেও,
স্মৃতির ভেতর আমরা বারবার ফিরে যাই।
আর সেই ফিরেই বেঁচে থাকা—
হয়তো এ জীবন নামের দীর্ঘ যাত্রার সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে সুন্দর গান।

[লেখকের পূর্ববর্তী রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
শৌভিক দে
শৌভিক দে
1 month ago

একে কি গল্প বলা যাবে? না কি এক দীর্ঘ কবিতা , গানের ডানায় ভর করে আমাদের নিয়ে যায় এক গভীর নির্জন পথে। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল সাইকেল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি আমিই নই তো। ভালো লাগল ।

Alak Basuchoudhury
Alak Basuchoudhury
Reply to  শৌভিক দে
15 days ago

এতে যে কোন গল্প নেই, এ ব্যাপারে আমি একমত। তবে ছবি আছে। এটিকে সেই ছবি নিয়ে এক দীর্ঘ স্বগত-কথন মনে হয়।

Debashish Goswami
Debashish Goswami
15 days ago

লেখাটাকে nostalgiaর বেনারসিতে বেশ সুন্দরী লাগছে।

3
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x