শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বৈশাখের অসহ্য গরম পড়েছে। দিন কয়েক ছুটি পেয়ে আমি মায়ের কাছে হাজির হয়েছিলাম। এই যাওয়া আসার ব্যাপারে অদ্ভুত ভাবাবেগ কাজ করে আমার। যখন কলকাতায় থাকি তখন এখান থেকে যেতে ইচ্ছে করে না আবার যখন বাপের বাড়ি যাই, তখন ফিরতে ইচ্ছে করে না। এই দুয়ের টানাপোড়েনের ভিতর চলে অফিস। সেখানেও যত বয়স বাড়ছে, ততই পরস্পরের শত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও একে অপরকে দু’একদিন না দেখতে পেলে মনখারাপ করে।

সুকন্যা আমার কলিগ। সে কাল মেসেজ করেছে, ‘কবে ফিরছিস? ‘

এদিকে মা বলছে , শনি-রবি তো তোর ছুটি, তাহলে আর দুটো দিন থেকে গেলে হয় না ?

এ পর্যন্ত মা কোনোদিন জোর করে না। অনেক সময় আসতে চাইলেও বারণ করে। এত দূর জার্নি করে দু’একদিনের জন্য আসা মায়ের ঠিক পছন্দ নয়। তাছাড়া মায়ের কাছে নিজের চেয়েও আমার সংসার এবং অফিসের গুরুত্ব বেশি।

মায়ের সঙ্গে এই নিয়ে আমার তর্কাতর্কি হয়।

-আমি যদি মেয়ের বদলে তোমার ছেলে হতাম, তাহলে তো পাগল করে দিতে। ‘বউয়ের আঁচল ধরে বসে থাকলে হবে, মা’কে দ্যাখ।’

মা হাসতে হাসতে বলে, ‘ছেলে হল শক্তি, মেয়ে হল দুর্বলতা।‘

– কেন, আমরা কি কিছুই পারি না? দিদিমা তো একাই তাঁর সংসার টেনেছে। কই কোনো আফসোস তো দেখিনি।

সুকন্যাকে উত্তর দিতে ভুলে গেছিলাম। আসলে এখানে এলে ডিজিটাল জগতের সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে। সকাল বিকেল বিভিন্ন পাড়া প্রতিবেশীদের খোঁজ খবর সঙ্গে চলতে থাকে, অনেক কাজকর্মও থাকে। এবারে তো বাড়ি ঢোকা মাত্রই দেখি রান্নাঘরে চারখানা টিফিন বক্স। মা বলল, কৃষ্ণা পিসি দিয়ে গেছে বড়ার টক, মোচার তরকারি। মণিমালা বৌদি দিয়ে গেছে তাল বড়া ও কচুর শাকঘণ্ট। রাত্রে ছিল বিহুর জন্মদিনের নেমন্তন্ন। নয় বছরের বালক আজ চার্লি চ্যাপলিন সেজে ছোটদের সঙ্গে কেক কাটল। কাকা পাঠ করল স্বরচিত কবিতা। কত মানুষ যে কাকার মতো এইরকম নীরবে নিভৃতে কবিতা লেখেন, আমরা কেই বা তাদের খোঁজ রাখি। এঁদের এই নির্লোভ মানসিকতার জন্যই পৃথিবীটা এখনও সুন্দর।

বাবা চলে যাবার পর আমাদের ক্ষয়ে যাওয়া বাড়িটার ক্ষত বিক্ষত চেহারাটা মা সারিয়েছে। বাইরের দেওয়ালেও নতুন রঙের আস্তরণ পড়েছে। সেই দেখেই আমাদের পাড়ার একটা ছেলে জিজ্ঞেস করল, ‘ পিসি, তোমরা এখানে থাকবে তো ?’

কী সুন্দর সহজ সরল নির্ভেজাল একটা প্রশ্ন।

উত্তরে যখন বললাম, ‘হ্যাঁ ‘ ওর মুখটা খুশীতে ঝলমল করে উঠল।

কত ঘর আগাছায় ভরে উঠছে এভাবেই।

আমার মাস্টার্স করার সময়েই বিয়ে হয়। তখন আমি ঘনঘন বাপের বাড়ি আসতাম। সেই সময় অনেকে অবাক হত, ‘মেয়ে কেন ঘন ঘন বাপের বাড়ি আসে!’ তাঁদের চাউনি দেখে বুঝতাম, আমাকে নিয়ে অনেক প্রশ্ন এঁদের ভিতর। আবার কেউ কেউ চাউনির ছাউনি সরিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, ‘শ্বশুরবাড়ি কেমন হয়েছে ?’

মন্দ না হলে কেউ বা এত ঘনঘন বাপের বাড়ি আসে!

আসলে নতুন বিয়ের পর একটা ঘোর থাকে। বর থাকলে শ্বশুরঘর একরকম, আর বর দূরে থাকলে কেমন যেন খাঁ খাঁ করত।

তাছাড়া মা বাবাও আমি এলে খুশী হতেন না, ভয় পেতেন। এই বুঝি তাঁদের কোনো কথা শুনতে হয়।

তারপর ধীরে ধীরে অনেক কিছুই বদলে গেল।
এখন আমার সংসারের পড়ন্ত বেলায় ছেলেবেলার বান্ধবীরাও বাপের বাড়ি আসতে চায়, কিন্তু পারে না। তাঁদের ভাই দাদাদের সংসার। সংসারে ভার বাড়ে।

ঝড় উঠেছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিও শুরু হয়েছে। জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কতরকম ভাবতে থাকি। ভাবনাগুলো কখন যে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আবার কখন যে দুম করে ধুয়ে মুছে অন্য ভাবনায় প্রবেশ করে,এই সাময়িক অবসরে তাই নিয়েই থাকি।

আমার ভাই নেই। ফলে এমন দ্বন্দ্বে আমাকে পড়তে হয় না, তবে সব ভালো তো কোথাও নেই, মায়ের একাকীত্ব থেকেই যায়।

সেই একাকিত্বে সঙ্গ দেয় গাছপালা, টিভি, ফোন, গীতা, গীতগোবিন্দ রেডিও, রবীন্দ্রনাথ। মা বলেন, এটাই তাঁর বানপ্রস্থ। গ্যাস বাঁচিয়ে কাঠের উনুনে জ্বাল দিতে দিতে গান ধরেন, ‘ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী একা একা করি খেলা।’

কেউ কেউ খবর নেয়, কেউ এড়িয়ে যায়, কেউবা ভয় দেখায়, কেউ সন্দেহ করে, কেউ নানা দাবি করে – মা তবু কোনো এক ঐশ্বরিক শক্তিবলে নিজের আনন্দ নিজেই খুঁজে পান।

সুকন্যার মা বাবা, শ্বশুর শাশুড়ি সকলেই পরপারে। বাপের বাড়িতে দাদা – বৌদি যথেষ্ট যত্ন করে তবুও তাঁর মন তাঁর নয়। অফিস ঘর মেয়ে বর এসবের মায়ায় ছায়ায় ঝগড়ায় যখন বিরক্ত হয়ে ওঠে তখনই বলে, ‘ শোন, এবার একটা ফ্ল্যাট কিনতে হবে, শেষ জীবনটা সেখানেই কাটাব।’
আমরা মানে আমারই কয়েকজন অফিস কলিগ তাঁকে থামায়, ‘ চুপ কর তো, সামান্য একটা চার্টাড বাসের মায়া ত্যাগ করতে পারিস না, আবার আলাদা থাকবে।’

সম্প্রতি মেট্রোর ব্লু লাইন ও গ্রিন লাইনে সংযোগ হওয়ায় অফিস যাবার চার্টার্ড বাসটির মেম্বার কমতে কমতে প্রায় উঠে যাবার অবস্থা। কিন্তু চন্দনা ও সুকন্যা ওই বাসের মেম্বারশিপ রক্ষার জন্য পাগল। নিজেরাই প্যাসেঞ্জার খুঁজতে শুরু করেছে। মেম্বার বাড়লে ভাড়াও একটু কমে যায়। আসলে যেখানেই নিত্যদিন বেশ খানিকটা সময় কাটে, সেখানেই মায়া পড়ে যায়।

আমার পাশের জন প্রীতি রোম্যান্টিক হেসে বলে, ‘ অঞ্জনদা’কে ছেড়ে থাকতে পারবি? যতই ঝগড়া কর, সেই তো পায়ে কাঁটা ফুটলেও ছুটে যাস।’

– ওসব আর হবেনা, অনেক গুড় দিয়ে ভাত মেখে খাইয়েছি। বলে কিনা, ঘরের দেওয়ালে ছবি আটকানো চলবে না। ছবিটা আমার আর্টিস্ট বন্ধু প্রিয়াঙ্কা গৃহপ্রবেশে দিয়েছিল। তারপর আবার বলে ওঠে, ‘ যেমন করে হোক, ফ্ল্যাট আমি একটা কিনবই।’

আমরা সমস্বরে বলি, বাপের বাড়িতে একটা ঘর তোর জন্য রাখলেই তো পারতিস। তখন তো খুব বলতিস, শ্বশুরবাড়িই হল মেয়েদের আসল ঘর।

চন্দনা ফুট কাটল, এখন ঘোর কেটেছে।

সুকন্যার মেসেজটা মাকে দেখালাম। তবে আরও একটা দিন থেকেও গেলাম। আমার মাসীও মায়ের কাছাকাছি থাকে। এপাড়া ওপাড়া। তাঁর তিন ছেলে এক মেয়ে। করোনাতে অকালে আমরা মাসতুতো দিদিকে হারাই। সেই বেদনা কখনও পিছু ছাড়ে না। আমি গেলেই অসুস্থ মাসী আমার উপর ভর করে। ছেলেরা যথেষ্ট দেখাশোনা করলেও সেও মাঝেমধ্যে হাঁপিয়ে ওঠে।

ওদের মতো আমিও কি হাঁপিয়ে উঠি না ?

উঠি বইকি।

তখনই উঠে বসি ট্রেনের জানালার ধারে। মাঠঘাট নদী নালা গাছপালাও আমার সঙ্গে দৌড়তে দৌড়তে ক্লান্ত হয়। ট্রেন থামে। আমি নিঃস্ব হই। তখন খুব একা লাগে।
একদিকে মেয়ে, অন্যদিকে মা। মাঝখানে আমি। তারপর আর ভাবি না । বাস ধরি, নদীর ব্রিজ পেরোই। দরজায় কড়া নাড়ি। মায়ের চোখ মুখ প্রশান্তিতে ভরে ওঠে।

ফেরার দিন ছবিটা অন্যরকম। মা ভোর থেকে উঠে তোড়জোড় শুরু করে রান্নার। না খেতে চাইলেও শুনবে না। ভাত, পেঁয়াজ লঙ্কা ভাজা দিয়ে আলু সেদ্ধ, মাছের ঝোল, পোস্ত বাটা সেদিন অমৃতের মতো লাগে। ঠাকুমার ছবিতে প্রণাম সেরে বাবার ছবির দিকে এগোই। বাবার কপালে চন্দনের ফোঁটা দেখে চোখ সমুদ্র হয়, ঢেউ আসে, ঢেউ ভাঙে। জল সরে গেলে আমি বাস ধরি। একটা পথ কুকুর খোলা দরজা দিয়ে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করে। গাছের ডাব পাড়তে সুদামদা আসে। মা পূর্বের স্থিতাবস্থায় ফিরে যান।

এবারে বাড়ি ফিরেই শুনলাম, গ্রামের সকলের খুব মন খারাপ। প্রতিবেশী গ্রামের একটি যুবক গাড়ি চালাতে গিয়ে ইলেকট্রিক পোস্টে ধাক্কা মেরে প্রাণ হারিয়েছে। কী রকম যেন নিঝুম চারিদিক। ছেলেটির দেহ ফিরল কলকাতা থেকে। গাজনের সন্ন্যাসীরা কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ল তার চারপাশে। বয়স্ক ব্যক্তিরা হা হুতাশ করতে লাগলেন, ‘হা ঈশ্বর, আমরা থাকতে ওকেই নিতে হল!’

বোলপুর থেকে শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস ধরব। বাস স্ট্যান্ড থেকে আমি আজ রূপার সঙ্গ ধরেছি। ট্রেন সেই বেলা একটায়। আগের রাতে আমাদের অঞ্চলে একটি ঝড় বৃষ্টি হওয়ায় আবহাওয়া মনোরম ছিল, কিন্ত বোলপুর সেই খটখটে। সকাল ন’টাকে মনে হচ্ছে বেলা বারোটা। এখন বিশ্বভারতীর নিয়মকানুন অনেক বদলে গেছে, নববর্ষে কবি প্রচলিত জন্মদিন সেই পঁচিশে। অনেক দিন ধরেই মনে হচ্ছিল রূপার সঙ্গে দেখা করব। ও যখন দিল্লীতে থাকত তখন একবার বলেও ছিল যেতে। অফিসের কাজে গিয়ে হাতে সময় কম থাকে, মন পড়ে থাকে বাড়ি ফেরার দিকে। হয়ে ওঠেনি। আজ আঠাশ বছর পর দেখা। কারুকৃতের সামনে প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছে।
ওকে আজ অন্যভাবে দেখব, দুজনেই হয়তো বুঝবার চেষ্টা করব আমাদের পারস্পরিক আমিত্বকে।

ও গাড়ির দরজাটা খুলে দিল। আমি অবাক হলাম ওর গাড়ি চালানো দেখে। আসলে আমি যা যা পারিনা, সেটা অন্য কেউ অনায়াসে করলে আমার তার প্রতি সম্ভ্রম বেড়ে যায়। আমি যখন গুরুপল্লীতে ওর পাশাপাশি কিছুদিন ছিলাম, তখন শিক্ষা ভ্রমণে গিয়ে ওর পা ভাঙল। প্লাস্টার করা পা দিয়ে সাইকেল চালাত। একদিন প্র্যাকটিক্যাল খাতার উপর ওদের বাড়িতে বেড়াতে আসা একটি বাচ্চার দৌরাত্মে চা ছলকে গেল। কিন্তু ওই রাত্রেই গান গাইতে গাইতে সব নতুন করে এঁকে ফেলল। আমি অবাক হতাম, এখানকার ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক যে কতটা সাবলীল হতে পারে ! আমাদের শিক্ষক মলয়দাকে নতুন ভাবে চিনলাম। ছোটবেলা থেকেই আমি নিজের কল্পনায় রচিত শান্তিনিকেতনেই বাস করতাম। সহজ পাঠেই কবিকে তাই আজও গেঁথে রেখেছি।

রূপা বলল, ‘বলো, কোথায় যেতে চাও।’

– জানি না। তুমি যেখানে নিয়ে যাবে।

ইতিমধ্যে সুকন্যা আবার মেসেজ করেছে, ‘প্রচণ্ড গরম, বোলপুর পৌঁছেছিস ?’

ওকে আমাদের ছবি পাঠালাম।

আমরা রতনপল্লীতে জলখাবার খেতে নামলাম। মা প্রত্যেকবার ফেরার সময় বাদাম পাঁপড়, আদা কুঁচি, হাত জিরে, হিং সর্ষের তেলে ভেজে সেটা দিয়ে মুড়ি মেখে দেয়।

ওকে বললাম, ‘খেয়ে দ্যাখো।’

মায়ের হাতের জাদু ওর জিহ্বায় লেগে রইল।

পুরনো বন্ধু বান্ধবদের খোঁজ খবর নিতে নিতে আমরা একে একে পেরোলাম উত্তরায়ণ, বিনয়ভবন। এখন আমরা প্রাক্তনী। অতিরিক্ত জনসমাগম সামলাতে শান্তিনিকেতনের ভিতরে ঢুকতে টিকিট কাটতে হয়। আমাদের দুজনের চাকরির ধরণ বেশ খানিকটা একরকম। রূপা অবশ্য এখন চাকরির তোয়াক্কা না করে বেরিয়ে পড়েছে আরেক প্রকার আনন্দের খোঁজে, যে আনন্দকে পরমানন্দ বললে ভুল হয়না।

মা যেহেতু এখনকার ছাত্রী, তাই তাঁকেও সঙ্গে নিতে চেয়েছিলাম। মা অবশ্য নিজের বাড়িতেই শান্তিনিকেতন গড়ে তুলেছেন। বাবা নেই, আমরা বাড়িতে থাকিনা কিন্তু এই স্বরচিত আশ্রমে তিনি তাঁর নিভৃত আরাধনায় নিজের আনন্দ খুঁজে নিয়েছেন। দুঃখকে আনন্দে পরিণত করার ক্ষমতা শিল্পেরই থাকে। তাই বোধহয় প্রতিটি শিল্পীর ভিতর এক বাউল মন সদা জেগে থাকে।

“মা কিন্তু একই রকম জাঁদরেল আছেন। দিব্যি একাই চালিয়ে নিতে পারেন। বাবার থার্ড স্টেজ ক্যান্সার ধরা পড়ল। শেষ রক্ষা হল না। আমি আর এই উদ্বেগ নিতে পারছিলাম না। কত কি করছি, ধর্মস্থানে ঘুরছি কিন্তু শান্তি পাচ্ছি না। তারপর হঠাৎই গুরুর সন্ধান পেলাম।” – রূপা যখন কথাগুলো বলছিল তখন আমরা শ্রীনিকেতনের কাছে।

– জানো, কী লজ্জার কথা, এতদিন আমি এখানে ছিলাম কোনোদিন মন্দিরে যাইনি।

রূপা বলল, “সময় তোমাকে ঠিক নিয়ে যাবে। ওই দ্যাখো, ওটা শিক্ষাসত্র। ১৯২৪ সালের ১লা জুলাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সত্যিকার আদর্শ বিদ্যালয়’ বা গ্রামের শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠা করেন । এখানে পাঠভবনের মতোই প্রথাগত পড়াশোনার পাশাপাশি শিল্প, সৃজনশীলতা ও গ্রামীণ জীবনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা দেওয়া হয় ।”

আমরা যখন পড়তাম তখন দেখেছি বাইরের দেশগুলো থেকে এখানে কত ছাত্রছাত্রী শিক্ষা ভ্রমণে আসত। অথচ, আমরা অবলীলায় উপেক্ষা করি।

– জানোতো রূপা, তখন সুন্দরকে দেখার চোখ ছিল না। আসলে আমার যাওয়া আসার পথে গ্রামগুলোর সঙ্গে আলাদা করে পার্থক্য খুঁজতে বসলে শান্তিনিকেতনকে স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিক লাগত বেশি। তবে এখন ক্রমাগত অসুন্দরের চাপে পিষ্ট হতে হতে আবার বেরতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, নান্দনিকতাকে দেখার চোখ তৈরিও একটা বিরাট স্কিল। বহু কেজো মানুষ জগতে আছেন বটে কিন্তু কাজের সঙ্গে শিল্পী মনকে জুড়ে দিতে ক’জন পারেন !

– চলো, তোমাকে স্বাভাবিক জায়গায় নিয়ে যাই। এখনও কিছু কিছু খোয়াই বেঁচে আছে সেখানে।

তপ্ত বৈশাখী দিন। দুপাশে জঙ্গল। আমরা বাউল রবীন্দ্রনাথ সঙ্গে নিয়ে ছুটে চলেছি আরেক বাউল গুরু বাসুদেব দাসের আশ্রয়ে। রূপা এখন তাঁর শিষ্য। গাড়ির পিছনের সিটে ওর একতারা। মাঝে মধ্যেই আমরা গুনগুনিয়ে উঠছি,’মোর বীণা ওঠে কোন সুরে বাজি।’

– দ্যাখো ঝুমা, উনিও সেই আনন্দকেই খুঁজেছেন বারবার।
“নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু পাছে পাছে” কথাটার ভিতর ডুব দাও।

এরপর তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ ছন্দে পৌঁছে গেলাম আমার-কুটিরে। “যিনিই এখানে বাস করবেন, তিনিই যেন এটিকে তাঁর নিজের কুটির বলে ভাবেন।”- নামকরণের উদ্দেশ্য ছিল এমনই। আমার কুটির কিন্তু গান্ধীজির আদর্শে বিপ্লবী সুষেণ মুখোপাধ্যায়ের তৈরি।
ক্রমে ‘আমার কুটির’ গৃহহারা বিপ্লবীদের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। আমার বাবার ডাক্তার কাকাও এমনই এক বিপ্লবী ছিলেন। বীরভূমের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষদের চিকিৎসা ও শিক্ষার আলো তিনি নিভৃতে দেখিয়ে গেছেন। সেই ধারা আমার বাবা মাও বজায় রেখেছেন । মিউজিয়াম দেখতে দেখতে আমি সেই যুগে পৌঁছে গেলাম।

রূপা বলল, “চলো, বাইরে বসি।”

একটা কোকিল তখনও ডেকে যাচ্ছিল। আমরা বেদীতে বসলাম। ঢকঢক করে জল খেলাম দুজনে।
রূপা গেল গাড়ি থেকে ওর একতারাটি আনতে।

তারপর মোবাইলে তানপুরা বাজিয়ে সুর মেলালো। ও জানে এরপর আর কোনো কথা থাকতে পারে না শুধু ‘নদী ভরা ঢেউ’ –

“নদী ভরা ঢেউ বোঝ নাতো কেউ
কেন মায়ার তরী বাও বাও গো
ভরসা করি এ ভব কাণ্ডারী
অবেলার বেলা পানে চাও চাও রে ।।

বাইতে জাননা কেন ধর হাল
মন মাঝিটা তোর হল রে মাতাল
বুঝিয়া বলো তারে
যেতে হবে পারে
হালটি ছাড়িয়া এখন দাও দাও রে ।।

বাইতে ছিল তরী পাগলা ভবা
ভাঙা তরী জলে জলে ডুবা ডুবা ।
চুবানি খেয়ে ধরেছে পায়ে
ওরে কাণ্ডারি এখন বাঁচাও বাঁচাও রে ।।”

ঠিক পৌনে বারোটা। রূপাকে বললাম, ‘ মায়ের হাতের মৌরলা মাছের টক আছে টিফিন বক্সে। তুমি খাবে ?

– হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়। কিন্তু কীভাবে নেব?

– আরে, তুমি টিফিন কৌটো রেখে দাও। এই ছুতোয় আরেকবার দেখা হবে।

বাউল হওয়া কি এত সোজা ?

আমরা এখন স্টেশন রোডের দিকে। চারপাশ থেকে হাত নাড়াচ্ছে ঘাস ফুল ও পদ্ম পতাকা। জীবন এখানে স্বাভাবিক, চেনা ছন্দ। আমি আবার বন্ধ খাঁচা ফিরে পেলাম। মেনে নেওয়া ও মানিয়ে নেওয়ার বাস্তব আমাকে ঘিরে ফেলল। রূপা বলল, আমি আর এগোব না,ভীষণ জ্যাম শুরু হবে। কে কাকে টপকে কত আগে যেতে পারে তার লড়াই। ও ফিরে যেতে পারে কিন্ত আমি ? আমাকে তো যেতেই হবে। রাস্তার ধার ঘেঁষে বাইক মিছিল চলছে। বন্দি দশা ও সাময়িক মুক্তির মধ্যে আমার আর তেমন আলাদা লাগে না। অভ্যস্ত হয়ে গেছি। মনে হয়,যেটুকু পেলাম তাই বা কম কী ! আমার শান্তিনিকেতনকে আমি নিজের মত করে গড়েই শান্তি পাই যেখানে কোনো আগে পরে নেই, কে পাঠভবন কে বিদ্যাভবন, কে শিক্ষাসত্র, কে গ্রামীণ কে শহুরে অথবা কে বহিরাগত – দৃষ্টির ভিতর সুচারু কৌশলী উঁচু নিচু ফারাক নেই।

ট্রেনে উঠলাম। রূপা ফিরে গেল। মাকে ফোন করে সব বললাম। এও বললাম, তাঁর হাতের মাখা মুড়ি, গাছের বেল ও মাছের টক রূপাকে দিয়েছি। ও খুব খুশী। কেবল টিফিন বক্সটা রয়ে গেছে।

“একটা টিফিন বক্স ছাড়তে পারছিস না ?”

মা পেরেছে। তিনিও অপরাজিতা । রূপা অপরাজিতা হবার সাধনায় আনন্দ খুঁজে পেয়েছে। আমি পারিনি, পারবও না, কেবল ঘুরে মরি এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। গল্পগুলো জমাট বাঁধে না, শরতের মেঘের মতো একটু হাওয়া পেলেই ভাসতে ভাসতে হাজির হয় অন্য কোথাও। বৈশাখি গরমের দাপট বাড়ে। রবীন্দ্রনাথ দূর থেকে হাত নাড়িয়ে মিলিয়ে যান শান্তিনিকেতন থেকে জোড়াসাঁকোর দিকে। ট্রেনের জানালা দিয়ে ছুটে আসে তপ্ত লু বাতাস, সঙ্গে আমার গ্রাম, পাড়া প্রতিবেশীদের সঙ্গে আড্ডা, মায়ের ঘ্রাণ, ফেলে আসা জীবন। মনের ভিতর তখনও বাজতে থাকে অপরাজিতার একতারা।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x