শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

রবীন্দ্রনাথ-গীতাঞ্জলি–ইয়েট্‌স্ঃ কোলাহল তো বারণ হল (পর্ব – ২)

প্রথম পর্বের পর…

আমরা তো পূর্বে দেখেছি রোটেনস্টাইন কর্তৃক প্রদত্ত গীতাঞ্জলির প্রাথমিক খসড়ার টাইপ-কপি ইয়েট্‌স্ সঙ্গে নিয়ে ঘুরতেন বাসে-ট্রেনে পড়ার জন্য; আমরা তো এটাও শুনেছি, ৭ জুলাই ট্রেকাডেরা রেস্তোরাঁয় কবিতা পাঠের আসরে রবীন্দ্রনাথের কবিতা সম্পর্কে ইয়েট্‌সের কী উচ্ছ্বসিত প্রশস্তি! তা হলে পরে কী কারণে ঘটল ইয়েট্‌সের মতিভ্রম? গীতাঞ্জলি সম্পর্কে কী তাঁর অভিযোগ? জানলাম, ১৯৬৭ সালে Letters to Macmillan সংকলনে প্রকাশিত ২৮ জানুয়ারি ১৯১৭ সালে লিখিত ইয়েট্‌সের একটি গোপন চিঠির হদিস পাওয়ার পরে। “Everything which bears your name is gold to Macmillan.” – কবিকে বলা রোটেনস্টাইনের এই মন্তব্যের বাস্তবতা ইয়েট্‌সের পক্ষে অস্বস্তির কারণ হয়েছিল। যতই গীতাঞ্জলির প্রতি তাঁর মুগ্ধতা থাকুক, ভারত থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা একজন ‘foreigner’-এর নোবেল পুরস্কার জুটে যাবে অথচ তাঁর মতো ইংল্যান্ডের একজন প্রতিষ্ঠিত কবির ভাগ্যে কবে যে শিকে ছিঁড়বে কে জানে। ইয়েট্‌সের অভিযোগের মূল বিষয়গুলো এখানে দেওয়া গেল যা ইতিহাসের মান্যতায় তাঁর মনস্তত্ত্ব বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। এখানে গীতাঞ্জলির প্রসঙ্গে তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের উল্লেখ করে (Crescent Moon, The Gardener, A Lover’s Gift) ইয়েট্‌স্ ম্যাকমিলনকে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন –

১) You probably do not know how my great revisions have been in the past. William Rothenstein will tell you how much I did for Gitanjali and even his Ms.(Manuscript) of The Gardener.

২) … a continual revision of vocabulary and even more cadence. (অর্থাৎ পুনর্লিখন)। Tagore’s English was a foreigner’s English… I left out sentence after sentence and probably, putting one day with another, spent some weeks on the task.

৩) He is an old man now and these later poems are drowning his reputation.

ম্যাকমিলনের মতো একটি প্রকাশন সংস্থাকে অযাচিত এমন উপদেশ দেওয়ার পর ইয়ে্ট্‌স্ নিশ্চয়ই মনের মধ্যে একটা অপরাধবোধে পীড়িত হচ্ছিলেন। তা না হলে চিঠির শেষে তাঁর এমন পাপস্খালনের চেষ্টা কেন – “Excuse my writing so much unasked criticism but I have been deeply moved by Tagore’s best work and that must be my excuse.”

Macmillan Co. – History of Logos

রোটেনস্টাইনকে সাক্ষী মানাটাই ইয়েট্‌স্ বুদ্ধির কাজ বলে মনে করেছিলেন। কারণ ইয়েট্‌স নিজে ভালই জানতেন, গীতাঞ্জলির প্রকাশের ব্যাপারে রোটেনস্টাইনের ছিল নিঃস্বার্থ প্রয়াস এবং আন্তরিক প্রেরণা। এখানে আগে আর একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে নিতে হয়। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পরেই Valentine Chirol নামক ভারতে ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ এক ব্যক্তি, বাঙালি মুসলমানদের কোনো একটি সভায় প্রকাশ্যে বলেন যে, ইংরেজি গীতাঞ্জলি আসলে ইয়েট্‌স্ কর্তৃক পুনর্লিখিত। সংবাদটি শুনে ক্রুদ্ধ রবীন্দ্রনাথ ১৯১৪ সালের জানুয়ারি মাসে স্টার্জ মুরকে একটি চিঠি লিখে তাঁর ক্ষোভের কথা জানান। উত্তর এসেছিল – “Chirol can be answered by Yeats, by Fox Strangways, by Andrews or by myself at any time – unfortunately no report of any kind has reached any of us.”

ইয়েট্‌স্ নিজের দাবির সমর্থনে যে সাক্ষীকে মান্যতা দিতেন সেই রোটেনস্টাইনের কানেও সংবাদটি গিয়েছিল। এই সমস্ত আজগুবি খবর সম্পর্কে রোটেনস্টাইন তার আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ডে (Men and Memories) যা বলেছেন তা সৌরীন্দ্র মিত্র তুলে দিয়েছেন ‘খ্যাতি অখ্যাতির নেপথ্যে’ গ্রন্থে – “I knew that it was said in India that the success of Gitanjali was largely due to Yeats’s rewriting of Tagore’s English. That this is false can easily be proved. The original MS. of Gitanjali in English and in Bengali is in my possession. Yeats did here and there suggest slight changes, but the main text was printed as it came from Tagore’s hand.” ক্রুদ্ধ অ্যানড্রুজ রবীন্দ্রনাথকে লিখলেন – “There is not a breath of rumour of it over here and there never will be. I wonder where Chirol picked it up”

Rothenstein

রোটেনস্টাইনের উপরোক্ত শেষ বাক্যটি লক্ষ্য করুন, লক্ষ্য করুন ‘suggest slight changes’ শব্দবন্ধ। ইয়েট্‌সের যে কিঞ্চিৎ ভূমিকা ছিল তা ছিল পাণ্ডুলিপির মার্জিনে যাকে বলে pencil- suggestion – revise করা বা correct করার নয়। তাও যতটুকু হয়েছিল, হয়েছিল কবির উপস্থিতিতে এবং সম্মতিতে। কিছু কিছু suggestion অবশ্য কবি অনিচ্ছাসত্ত্বেও যে গ্রহণ করেছিলেন সেটা তাঁর নিজের স্বভাববশত। কবি রোটেনস্টাইনকে একবার শুনিয়েছেন সে কথা – “I am too good-humoured to say ‘no’ to any body if persistently pressed. I am sure I will succumb to this weakness of mine before long.”

Original manuscript of Gitanjali by Rabindranath Tagore – Rothenstein collection

ইয়েট্‌সের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত কতটুকু পরিবর্তন সাধিত হল গীতাঞ্জলির? গীতাঞ্জলির প্রথম খাতার ৮৩টি কবিতার (৮৭?) প্রায় দশ হাজার শব্দকে পাণ্ডুলিপির সঙ্গে প্রকাশিত পাঠকে মিলিয়ে যে সমীক্ষা সৌরীন্দ্র মিত্র করেছেন তা মামুলি প্রিপোজিসন, আর্টিক্‌ল ও কিছু শব্দের পরিবর্তন, যার সংখ্যা পয়তাল্লিশটার বেশি নয়। যেমন কোথাও ‘Oh’ স্থলে বসেছে ‘O’, কোথাও ’you’-এর স্থলে বসেছে ‘thou’,‌ কোথাও-বা ‘shall’ আর ‘will’-এর পরিবর্তন। বাহুল্য বিবেচনায় ‘mad rebellion’, ‘wild laughter’ ইত্যাদি শব্দ বর্জিত হয়েছে। বহু কবিতা একেবারে অবিকৃত থেকে গেছে। এই কবিতাগুলির মধ্যে বাক্য আছে প্রায় পাঁচশ, তাতে সামান্য পরিবর্তনের বাক্য-সংখ্যা সেখানে মোট তেতাল্লিশটি! তা হলে পরে গীতাঞ্জলি সম্পর্কে ইয়েট্‌স কথিত ‘I left out sentence after sentence’ মন্তব্যর মধ্যে থাকে কি কোনো সত্যের সমর্থন? আর কৌতুকের কথা, রবীন্দ্রনাথ বৃদ্ধ তাই তাঁর খ্যাতি আজ অস্তমিত। কথাটা কে বলছেন? রবীন্দ্রনাথের থেকে মাত্র চার বছর বয়সের ছোট ইয়েট্‌স্! একেই বা কী বলা যায়?

স্টার্জ মুর, রোটেনস্টাইন ইত্যাদি কবির বন্ধুমহল ভারত থেকে প্রেরিত চিরোলের গীতাঞ্জলি সম্পর্কে কোনো অভিযোগকে আমলই দেননি। ইয়েট্‌স প্রথমে চুপচাপই ছিলেন, অন্তত ১৯১৭ সালে গীতাঞ্জলি সম্পর্কে ম্যাকমিলনকে সেই গোপন চিঠিটি লেখা পর্যন্ত। তিনি গীতাঞ্জলি সম্পর্কে নিজের কৃতিত্বের বড় সাক্ষী মেনেছেন রোটেনস্টাইনকে, যা আদৌ মান্যতা পায়নি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এবং গীতাঞ্জলির সপক্ষে আরও একজনকে গুরুত্ব আমাদের দিতেই হবে, একটু বেশিই দিতে হবে। তিনি আর্নেস্ট রিজ (Earnest Rhys), রবীন্দ্রনাথের জীবনীকার। তিনি ইংরেজি ভাষার একজন মর্মজ্ঞ লেখক এবং অভিজাত Everyman’s Library Series of Classics-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। বিদেশে জন্ম নেওয়া অন্য মাতৃভাষার কবি রবীন্দ্রনাথের ‘English with so sure and spontaneous a cadence’ যে সে মুগ্ধতার আবেশেই ১৯১৫ সালেই লিখলেন – Rabindranath Tagore: A biographical Study। রিজ ইয়েট্‌সের সেই কৃতিত্বের দাবিকে শুধু নস্যাৎই করলেন না, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁর হস্তক্ষেপে যা ঘটেছে তাকে পাণ্ডুলিপির ‘improvement’ বলা যাবে না বলে দাবি করলেন। রিজ লিখছেন –

“…IT HAS BEEN RUMOURED BY SCEPTICAL CRITICS IN INDIA THAT GITANJALI WAS IN THE PROCESS INDEBTED TO AN ENGLISH GHOST; and the name of Mr. W.B. Yeats has been particularly associated with the mysterious office, thanks, it may be, to his known uncanny powers. It may be as well to say, then, that the small manuscript book in which the author made these new English versions when he was on his way here in 1912, is still in the possession of Mr. Will Rothenstein; and any one who takes the trouble to compare the pocket-book with the printed text will find that THE VARIATIONS ARE OF THE SLIGHTEST, WHILE IN CERTAIN INSTANCES THE PRINTED READINGS MAY BE CRITICIZED AS NOT AN IMPROVEMENT ON THOSE IN THE MS.” এর পর আর কোনো আলোচনা?(বড় হরফ আমার)

আমরা খুব ভাল করে জানি, রবীন্দ্রনাথের অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল সংযম, সৌজন্য আর বিনয়। অন্যের অনভিপ্রেত মন্তব্য তাঁকে দুঃখ দিয়েছে, ক্ষুণ্ণ করেছে; স্বাভাবিক সহনশীলতায় কবি তাঁকে গ্রহণ করেছেন, কিন্তু প্রত্যাঘাত করেননি। রবীন্দ্রনাথ এবং ইয়েট্‌স দুজনেই রোম্যান্টিক, তথাপি ইয়েট্‌সের চরিত্রে অনেক জটিলতা। অনভিপ্রেত হলেও রবীন্দ্রনাথকেও তা থেকে মুক্ত রাখেননি ইয়েট্‌স। সমস্যাটা এখানেই। একটু আলোচনা করা যাক।

তরুণ বয়স থেকেই ইয়েট্‌স্ ভারতীয় রহস্যবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থিয়োসফিকাল সোসাইটির কার্যকলাপে উৎসাহী হন। দ্বিজেন্দ্রনাথের জামাতা মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায় সোসাইটির প্রচারক ছিলেন। সেই সূত্রে ইয়েট্‌সের সঙ্গে তাঁর আলাপ। রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চার প্রতি কোনো এককালের সাময়িক নাড়াচাড়ার কিছু বিষয় ইয়েট্‌স্‌কে উৎসাহী করে তোলে। ইয়েট্‌স্ সাধারণভাবে আধ্যাত্মিকতা, অলৌকিকতা এমনকি ম্যাজিক ইত্যাদির প্রতিও আকৃষ্ট ছিলেন। গীতাঞ্জলির ভূমিকাতে বন্ধুর মুখে কবির খুব ভোরে উঠে ঈশ্বরসান্নিধ্যলাভের শোনা কথাকেও তিনি গুরুত্ব না দিয়ে পারেননি। অথচ ডাঃ দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্র ইয়েট্‌স্‌কে স্পষ্টই রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছিলেন – “He is the first among our saints, who has not refused to live, but has spoken out of Life itself.” সুতরাং প্রশান্তকুমার পালের এমন অনুমানকে মান্যতা দিতেই হয় – “রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী ইংরেজি কাব্যগ্রন্থগুলিতে ও তাঁর বিভিন্ন কার্যকলাপে মর্ত্যজীবনপ্রীতির অধিকতর প্রকাশ তাঁর প্রতি ইয়েট্‌সের বিমুখতার অন্যতম কারণ কিনা ভেবে দেখা যেতে পারে।” ইয়েট্‌সের মনস্তাত্বিক জটিলতার প্রশ্নটিকেও আমাদের এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। একসময়ে মাদাম মড গনকে বিবাহ করতে চেয়ে ইয়েট্‌স্ প্রত্যাখ্যাত হন। বর্তমানে তিনি তাঁর কন্যা Iseult-এর প্রণয়প্রার্থী। তবে তিনিও ইয়েট্‌সের প্রস্তাবে সায় দেননি। ইয়েট্‌স্‌ Iseult-এর আগমন বার্তা জানিয়ে চিঠিতে রবীন্দ্রনাথকে উপস্থিত থাকতে এমন করে অনুরোধ করছেন (২৫।৬।২০) – “Could you dine or lunch here on Tuesday next? I can get Iseult Gonne. I want her to meet you…if you let me, Iseult to call on you for a half hour one afternoon, you will like. She is one of the most beautiful creatures in the world, aged nineteen and has read all Flaubert and I hope she is dreaming of learning Bengali…” Iseult-এর সঙ্গে কবির পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ইয়েট্‌সের এমন আকুতির তাৎপর্যটুকুকে আমরা কিছুটা তো অনুমান করতেই পারি।

রোটেনস্টাইনের মনে হয়েছে, খুব অল্প লোকই আছেন যাঁরা রবীন্দ্রনাথের মতো থামতে জানেন। “শুধু গান নয়, গীতাঞ্জলি সেই সহজে থেমে যাওয়ার কবিতা”- বলেছেন শঙ্খ ঘোষ। তিনজন নোবেল পুরস্কারপাপ্ত সাহিত্যিক-কবি ইংরেজি গীতাঞ্জলির অনুবাদ করেছিলেন। এঁরা হলেন চিলির পাবলো নেরুদা, স্পেনের হুয়ান রামোন হিমেনেস এবং ফরাসি দেশে থেকে ১৯৪৭ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত সাহিত্যিক আদ্রেঁ জিদ। জিদের অনুবাদ পড়েই তো গীতাঞ্জলির সঙ্গে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর প্রথম প্রেম। শঙ্খ ঘোষ আমাদের এটাও জানাচ্ছেন – “মহাভারতের ২১৪৭৭৮টি পদের তুলনায়, রামায়ণের ৪৮০০০ পদের তুলনায়, ‘গীতাঞ্জলি’র এই থেমে যাওয়া ছোট আয়তন দেখে তৃপ্ত নিশ্বাস নিয়েছিলেন আঁদ্রে জিদ। এর মধ্যে তিনি দেখেছিলেন আলোর নানা স্তর, এর মধ্যে তিনি শুনেছিলেন শুমান বা বাখ্-এর সংগীতের তুল্য কোনো ধ্বনি।”

ইংরেজি গীতাঞ্জলির প্রথম খসড়া টাইপ-কপি পড়েই ইয়েট্‌সের সেই ঐশ্বরিক অনুভূতির কথা ছেড়ে দিলেও, রোটেনস্টাইন-অ্যান্ড্রু ব্র্যাডলি-স্টফফোর্ড ব্রুক-স্টার্জ মুর-আর্নস্ট রীজ-মে সিনক্লেয়ার-এভলিন আন্ডারহিল-এজরা পাউন্ড-গিলবার্ট মারে-সি এফ অ্যান্ড্রুজ-পাবলো নেরুদা-রামোন হিমনেস-আঁদ্রে জিদ ইত্যাদি অসংখ্য গুণীজন এবং তৎকালীন বিদেশী পত্র-পত্রিকার কাব্য সমালোচকদের প্রশস্তি শুধু গীতাঞ্জলির কাব্যগুণ নয়, বরং ইংরেজি ভাষার প্রতি রবীন্দ্রনাথের অধিকারকেও মান্যতা দেয়। রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রতি নিখাদ দরদ ব্যতিরেকে এই সমস্ত মান্যবরদের আর কোন অভিসন্ধির হদিস আমরা রাখি? কিন্তু আমাদের দেশে খুশবন্ত সিং-এর মতো কিছু মানুষ তো বটেই, এমনকি বুদ্ধদেব বসু-নবনীতা দেবসেনও তো ইংরেজি গীতাঞ্জলিকে তেমন মূল্য দিতে অরাজি। কেতকী কুশারী ডাইসনকে তো রবীন্দ্রনাথকৃত ইংরেজি কবিতার শুদ্ধিকরণে কলম ধরতে হয়। তপোব্রত ঘোষ দেখিয়েছেন, রবীন্দ্র-কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করতে গিয়ে তার মর্মোদ্ধার এবং যথাযথ শব্দচয়নে কেতকী কতটা ব্যর্থ! এর আগেও অনেকে রবীন্দ্র-কবিতার ইংরেজি অনুবাদে ব্রতী হয়েছিলেন। তাঁদের সেই কীর্তি আতঙ্কিত রবীন্দ্রনাথকে নিজের কবিতার অনুবাদ করতে বাধ্য করে।

কোলাহল তো বারণ হল – কবির কলমে

১০ জুলাই ট্রেকাডেরো রেস্তোরাঁয় সম্বর্ধনা সভায় সবাই যখন তাঁর ইংরেজি নিয়ে ধন্য ধন্য করছে তখন রবীন্দ্রনাথ নিজের বাংলা ভাষার প্রতি অন্তহীন প্রেম ও আনুগত্যের প্রতি সোচ্চার হয়েছেন। বাংলা ভাষা তাঁর সেই ঈর্ষাপরায়ণা গৃহিণীর মতো (jealous mistress) যিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের অনধিকার প্রবেশকে প্রশ্রয় দেন না। জগদানন্দ রায়কে একটি চিঠিতে (১৮।৯।১৯১২) তাই লিখছেন, “এটা আমার বহুমূল্য অলংকার সন্দেহ নেই, কিন্তু যাকে বলে অতিশয়োক্তির অলংকার।” নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর মুগ্ধ জনতার জয়ধ্বনিতে বিপন্ন ও অনেকটাই বিভ্রান্ত রবীন্দ্রনাথ পুচ্ছে টিনের পাত্র বাঁধা সেই সারমেয়টির অসহায়তার সঙ্গে নিজের অবস্থার তুলনা করে রোটেনস্টাইনকে লিখছেন – “It is almost as bad as tying a tin can to a dog’s tail making it impossible for him to move without creating noise and collecting crowds all along.”

গীতাঞ্জলি সম্পর্কে অনেক আলোচনা হল, বাকি থেকে যাবে আরও অনেক কিছু। কিন্তু একটা বইয়ের প্রসঙ্গ না আনলেই নয়। বইটির নাম ‘ইংলনডের দিকপ্রান্তে রবির উদয় রবির অস্ত’ – লেখক চঞ্চলকুমার ব্রহ্ম। বইটির নামকরণ সম্পর্কে আমার বিশ্বাস, কেউ যদি ‘পশ্চিমবঙ্গে রবির উদয় রবির অস্ত’ শীর্ষক একটি বই লেখেন তবে সেখানেও অনেকটা সত্য থেকে যাবে। শরৎ-বঙ্কিমের কথা ছেড়ে দিলাম তারাশঙ্কর-মাণিক-বিভূতিই-বা কে পড়ে এখন? রবীন্দ্রনাথ এখনও বাঙালির মননে আলোড়ন তোলেন সে শুধু তাঁর ওই গানের জন্য। এটাই সত্যি কথা। তাই ইংল্যান্ডের ভাবনা এখন থাক। এ বইতে চঞ্চলবাবু রবীন্দ্রনাথকৃত অনুবাদকে কেন্দ্র করে কত কী আলোচনা করেছেন যা বইটির পিছনের মলাটে এমন করে বিজ্ঞপিত – “একই সঙ্গে অনুবাদ-চর্চা ও তুলনামূলক সাহিত্য, বিতর্কিকা ও বিয়োগান্তক অন্তর্নাটক, বিনির্মাণ ও পুনঃ নির্মাণ…মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ থেকে আধুনিক ভাষা-বিজ্ঞান, ইংরিজি কবিতার আপ্ত ইতিহাসের পুনর্বিচার…” ইত্যাদি। বড় শক্ত, একই সঙ্গে এতসব হজম করা! তবে যাঁদের জন্য বইটি লেখা তাঁরা বইটির আদ্যপ্রান্ত পড়ে কিন্তু প্রশ্ন করতেই পারেন, হঠাৎ উড়ে এসে ‘খ্যাতি অখ্যাতির নেপথ্যে’র লেখক সৌরীন্দ্র মিত্রর প্রতি এমন বিদ্বেষপূর্ণ ব্যক্তিগত আক্রমণ কেন? অভিযোগগুলি তো এই –

১) লেখকের বুজরুকিতে ধরা দিতে পারেন এমন মানুষের সংখ্যা আজও অনেক।
২) নেপথ্যকাহিনিটির প্রথম প্রকাশের সময় লেখক অনেক বিদগ্ধ মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করতে পেরেছিলেন।
৩) ছদ্ম-পান্ডিত্যের আড়ালে তথ্যের সঙ্কলন ও প্রয়োগে কাহিনীকারের নিপুণ হাতসাফাই।
৪) লেখকের ব্যাখ্যায় তাঁর হিংস্র, গ্রাম্য মনোবৃত্তির প্রকাশ।

২৭১ পাতার বইতে অনেক তত্ত্বকথার সন্ধান পাওয়া গেলেও পাওয়া গেল না এমন অসূয়া-বশবর্তী ব্যক্তিগত আক্রমণের হেতু! সামান্য চার-পাঁচটা লাইনে শুধু আক্রোশ জানিয়ে দায়িত্ব সারার ফলে বইটির আভিজাত্য যথেষ্ট ক্ষুণ্ণ হয়েছে। সৌরীন্দ্র মিত্রর মৃত্যু ১৯৮৯ সালে। চঞ্চলবাবুর বইটির প্রকাশ ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি জীবিত থাকলে, তাঁর তরফে একটা rejoinder তো আশা করাই যেত।

একটা অতি সংক্ষিপ্ত উপসংহার। ইয়েট্‌স নোবেল পুরষ্কার পেলেন ১৯২৩ সালে। ১৯১৩ থেকে ১৯২৩ সময়কালে একটা অপ্রাপ্তিজনিত যন্ত্রণায় তিনি বিদ্ধ ছিলেন। তাঁর জীবনে ছিল বেশ কিছু চারিত্রিক জটিলতা। এই সময়ে রবীন্দ্রনাথের নোবেল-প্রাপ্তি এবং ম্যাকমিলনের ‘গীতাঞ্জলি’ সংস্করণের বিপুল জনপ্রিয়তায় তাঁর মন একটা ঈর্ষার যে জন্ম নিয়েছিল তা মনে করার কারণ আছে। এটা শধু সৌরীন্দ্র মিত্র বা প্রশান্তকুমার পাল নন, অনেক বিশেষজ্ঞেরই সেই অনুমান । তা না হলে তিনি কেনই-বা হঠাৎ করে ইয়েট্‌স্ গীতাঞ্জলি সম্পর্কে অদ্ভুত ও অযৌক্তিক দাবি পেশ করতে গেলেন, কেনই-বা রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি জ্ঞান নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলতে লাগলেন যা ইংল্যান্ডের বিদ্বৎসমাজে যথেষ্ট কৌতুকের কারণ হয়েছিল।

যাইহাক, ইয়েট্‌স অবশেষে নোবেল পুরস্কার পেলেন – উল্লেখযোগ্যভাবে প্রশমিতও হল তাঁর ক্ষোভ।

W. B. Yeats

রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ইয়েট্‌সের অন্তিম মূল্যায়নকে কীভাবে মান্যতা দেব – সে কি বৈরিতা না মুগ্ধতা? আমি বলি, শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা এবং তার সৃষ্টির প্রতি মুগ্ধতা – যে মুগ্ধতায় নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্তির পূর্ববর্তী অধ্যায়ে বাসে-ট্রেনে বসে গীতাঞ্জলির টাইপ-কপি পাঠে আবিষ্ট হয়ে থাকতেন – যে মুগ্ধতায় গদ্যে রচিত কবিতাগুলোতে খুঁজে পেয়েছেন ‘spontaneity, ‘simplicity’ আর ‘abundance’ – যে মুগ্ধতায় গীতাঞ্জলির কবিতা-পাঠে ঝরত তাঁর আবেগ – যে মুগ্ধতায় মুক্তমনে রোটেনস্টাইনের কাছে স্বীকারোক্তি, “I find Tagore and you are a great inspiration in my own art.’ – যে মুগ্ধতায় পাঞ্জাবের সাংবাদিক সন্ত নিহাল সিং-এর কাছে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ইয়েট্‌সের অকপট স্বীকারোক্তি, যা তাঁর পূর্বোক্ত মনোভাবেরই পরিচয় বহন করে – “Most persons write so that if you were to detach a sentence from the context, it would have no meaning. With Tagore’s writings, however, it is just the other way about. Almost any sentence will stand by itself – almost any clause. THE MORE YOU STUDY HIS COMPOSITIONS, THE MORE SIGNIFICANT DO THEY BECOME. THEY GROW UPON YOU.(বড় হরফ আমার)।

কবি

কবির সত্তরতম জন্মদিনে প্রকাশিত হলো শ্রদ্ধার্ঘ্য – The Golden Book of Tagore. ইয়েট্‌স্ কবিকে লিখলেন, “আমি আপনাকে জানাতে চাই যে আমি এখনও আপনার বংশবদ ছাত্র ও ভক্ত আছি। আপনি তো জানেন, আপনার কবিতা আমাকে কী রকম উত্তেজিত করে তুলেছিল; সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আপনার গদ্যে আমি খুঁজে পাচ্ছি প্রজ্ঞা ও সৌন্দর্য – ঘরে বাইরে, আপনার ছোটগল্পগুলি, আপনার জীবনস্মৃতি।” কবি উত্তরে লিখলেন (১৬।৭।১৯৩৫), “মনে হল অনেক সুদূর সময়ের সৌরভ বহন করে নিয়ে এল আপনার চিঠি।” ইয়েট্‌সকে তো রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ঔদার্যে ‘পথের সঞ্চয়’ বলে কৃতজ্ঞতা জানিয়েই রেখেছেন।।

ইয়েট্‌স রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর জীবনের অন্তিম এবং মহত্তম শ্রদ্ধা জানালেন ১৯৩৬ সালে ‘Oxford Book of Modern Verse’ সম্পাদনা করতে গিয়ে। রবীন্দ্রনাথের সাত-সাতটি কবিতাকে সেখানে স্থান দিলেন; না, অনুবাদ হিসাবে নয়, মৌলিক কবিতার স্বীকৃতিতে। শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের কবিতা মান্যতা পেল ইয়েট্‌সের মননে – অর্ঘ্যের বৃত্ত সম্পূর্ণ হল। রবীন্দ্রনাথ বলতেন, যা ভোলবার সামগ্রী তাকে যদি ভুলতে না পারি তবে যা পাওয়ার সামগ্রী তাকে আমরা বড় করে পাব না। ইয়েট্‌সকে আমরা মনে রাখতে চাই সেই পাওয়ার সামগ্রী দিয়েই।

ঋণ –

১) রবীন্দ্রজীবনী / প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় / ২,৩,৪
২) রবিজীবনী / প্রশান্তকুমার পাল / ৬,৭,৮
৩) খ্যাতি অখ্যাতির নেপথ্যে / সৌরীন্দ্র মিত্র
৪) রবীন্দ্রনাথের বিদেশী বন্ধুরা / সমীর সেনগুপ্ত
৫) রবীন্দ্রনাথ ও ইয়েট্‌স্ : কবি-ব্যক্তিত্বের গূঢ় সম্পর্কে অহং-এর দাহ / সুমিতা চক্রবর্তী / কোরক, শারদ ১৪১৫
৬) ইংলনডের দিকপ্রান্তে রবির উদয় রবির অস্ত / চঞ্চলকুমার ব্রহ্ম
৭) এ আমির আবরণ / শঙ্খ ঘোষ
৮) ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ / শঙ্খ ঘোষ
৯) পথের সঞ্চয় / রবীন্দ্রনাথ
১০) পিতৃস্মৃতি / রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১১) GITANJALI – facsimile of the original manscript/ Houghton Library, Harvard university / compiled and edited by Abhik Kumar Dey

[লেখকের পূর্ব রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Ashish Sen
Ashish Sen
6 months ago

ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রথম পর্বটি আবার পড়ে দ্বিতীয় পর্বটি পড়লাম। যাঁরা গভীর জ্ঞানচর্চায় আগ্রহী তাঁদের জন্য তো বটেই, এমনকি আমার মত পাঠক, যাদের জ্ঞানচর্চার দৌড় খুব ভাসা ভাসা, তাদের জন্যও প্রবন্ধটি একটি অচেনা সিংদরজার চাবি খোলার কাজ করেছে। এর পিছনে যে বিপুল পরিমাণ পড়াশুনা আপনাকে করতে হয়েছে সেটা আপনার রেফারেন্স বই এর তালিকা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়। আপনার এই প্রয়াসকে তারিফ করার মত ভাষা আমার নেই।
এই অমূল্য প্রতিবেদনগুলি বই এর আকারে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আগে পত্রিকা সম্পাদকের সাথে আমার অল্পবিস্তর আলোচনা হয়েছে। এবার সেটাকে বাস্তবায়িত করার দাবী আরো জোরালো হল।

Himadri Kumar Das Gupta
Himadri Kumar Das Gupta
Reply to  Ashish Sen
6 months ago

আপনার মন্তব্যে আমি প্রাণিত।