
“… the idea of the Nation is one of the most powerful anaesthetics that man has invented.”
- Rabindranath
রবীন্দ্রনাথ ও লেনিন? দুটি নাম পাশাপাশি দেখে আঁতকে ওঠার কোনোই কারণ নেই। না, ‘মার্ক্সবাদের আলোয় রবীন্দ্রনাথ’, ‘রবীন্দ্রনাথ কি মার্ক্সবাদী?’ অথবা ‘রবীন্দ্র ও লেনিন’ ইত্যাদি ঘোল তৈরি করে কাউকে গেলানোর বিন্দুমাত্র স্পৃহায় আমি আক্রান্ত নই। কারণ এই সরল সত্যটা সম্পর্কে আমার এটুকু জ্ঞান যথেষ্ট টনটনে যে, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাসের জগতে মার্ক্সবাদ অবস্থান নেই। গোড়াতেই বিষয়টা স্পষ্ট করে নেওয়া ভাল।
আমাদের এটাও মনে আছে, রাশিয়া-ভ্রমণ তাঁর ‘এ জন্মের তীর্থদর্শন’ হলেও সোভিয়েত-প্রশাসনের নঙর্থক দিকটাও তাঁকে শঙ্কিত করেছিল। পরবর্তীকালে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ওই উদ্বেগ এবং ভবিষ্যদ্বাণীর যাথার্থ্য প্রমাণিত। এটাও লক্ষ করার, রাশিয়া ভ্রমণের সময় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে স্তালিনের কোনো সাক্ষাৎকার ঘটেনি; এমনকি ‘রাশিয়ার চিঠি’তে স্তালিনের যেটুকু উল্লেখ আছে তা পরোক্ষে। লেনিনের প্রসঙ্গ তো কোনোভাবেই আসেনি। সমগ্র রবীন্দ্র-রচনাতে মার্ক্স এবং মার্ক্সীয় অর্থনীতির প্রসঙ্গই এসেছে কদাচিৎ। বস্তুত মার্ক্সবাদ নিয়ে রবীন্দ্র-অনুধ্যানের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, মানবতা এবং স্বাধীনতার সপক্ষে যাঁরা সোচ্চার –– মত ও পথের বৈপরীত্য সত্ত্বেও তাঁদের চিন্তা ও কর্মের প্রকাশ সময়ের দাবিতে কখনও এক সুরে বাঁধা পড়ে যায় – যেন অদৃশ্য সুতোয় বোনা হয়ে যায় নানা ফুলের একটি মালা। এমনটাও ভেবে নেওয়া যায় – “মিল নেই মিল নেই, তাই বাঁধিলাম রাখি”। রবীন্দ্রনাথ সারা জীবনে অবশ্যই পড়েছেন বিস্তর, কিন্তু রেফারেন্স হিসাবে তাঁর রচনা বা চিঠিপত্রে থেকে গেছে সেগুলোর অত্যল্প উল্লেখ। সমগ্র রবীন্দ্র-রচনাবলীতে পাই শুধু রবীন্দ্রনাথের নিজেরই কথা। তাও তো আরও কত কত কথা তাঁর কাছে শোনার ছিল! তা হলে এত কথার পরে আবার কী হল, যে-কারণে রবীন্দ্রনাথ-লেনিনকে পাশাপাশি বসাতে হল আমাকে? কারণ, অতি ছোট্ট একটি মন্তব্য যা আমার অনেক দিনের জমে থাকা উত্তরহীন একটা প্রশ্নকে আবার উসকে দিল।

মনে পড়ে, বেশ কিছুদিন আগে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত ‘স্বাধীনতার গান ও কবিতা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে (সম্ভবত ১৫/৮/২১ তারিখে, যেখানে লেখকের নামটি জানা যায়নি) এমন মন্তব্য – “উনিশশো সতেরো সালে প্রকাশিত ‘ন্যাশনালিজম’ গ্রন্থটি এমন জাদুময় ছিল যে রোম্যাঁ রোলাঁও গ্রন্থটির পরম ভক্ত হয়ে ওঠেন। লেনিনেরও বিশেষ ভাললাগা ছিল গ্রন্থটির প্রতি।” রোম্যাঁ রোলাঁর কথা তো জানি, কিন্তু লেনিন? কবে-কোথায়-কখন বইটি সম্পর্কে ঘটলো সেই ‘ভাললাগা’? কী সেই ভাললাগার কথা – কেউ আমাদের শোনাবেন? অপেক্ষা করে আছি। আমি কিন্তু একটা সূত্র দিতে পারি ; ব্যাস ওইটুকুই, ওই একটু আলোর আভাস! বলি তা হলে। অনেক দিন আগে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা। লেখাটা খুঁজে পাচ্ছি না। সুভাষবাবু রাশিয়া গেছেন, গেছেন লেনিনের নিজস্ব লাইব্রেরিতে।

বই দেখতে দেখতে হঠাৎ তাঁর নজরে পড়লো রবীন্দ্রনাথের ‘Nationalism’ ! পাতা ওলটাতে আরও অবাক হওয়ার পালা। ইংরেজি বইয়ের মার্জিনে লেনিনের করা রাশিয়ান ভাষায় অজস্র মন্তব্য! সুভাষবাবুর আফসোস, সেই ভাষাটা তাঁর আয়ত্তের বাইরে। আমাদের আপসোস, ইস্, যদি বইটার কয়েক পাতা অন্তত ফটো-কপি করে আনা যেত। যাক, এটুকু নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে, লেনিনের ব্যক্তিগত সংগ্রহে ‘Nationalism’ ছিল; লেনিন মন দিয়ে বইটা পড়েছেন এবং মন্তব্যও করেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে লালিত আমার অস্বস্তির নিরসন কবে হবে কে জানে।

আমার ভাবনাকে আর একটু প্রসারিত করব। জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে তাঁর বিরক্তির কথা রবীন্দ্রনাথ বহুবার বহুভাবে বলেছেন। ‘দেশে দেশে মোর দেশ আছে’ – এমন কথা শুধু কাব্য করে বলেননি, এন্ডরুজকেও লিখছেন – “I love india, but my India is an idea and not a geographical expression. Therefore I am not a patriot – I shall seek my compatriots all over the world.” সুতরাং ‘Nationalism in the West’, ‘Nationalism in Japan’ এবং ‘Nationalism in India’ – এই তিনটি বক্তৃতাকে একত্রিত করে Macmillan Co. ওই ১৯১৭ সালেই (যেটা রাশিয়ার কাছে উল্লেখযোগ্য বছর) যখন ‘Nationalism’ বইটি প্রকাশ করে তখন রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিক খ্যাতির প্রেক্ষিতে সেটি লেনিনের নজরে পড়া স্বাভাবিকই ছিল। অনুমান করা অসঙ্গত হবে না যে, বিষয়গুণে বইটি লেনিনের পছন্দের তালিকায় থাকাটাও স্বাভাবিক। তবু এটা নিতান্তই অনুমান।
আমার আজকের বিষয়-ভাবনার কেন্দ্রে প্রধানত আছেন লেনিন; ‘Nationalism’ বইটির প্রেক্ষিতে তাঁর মত-মন্তব্য-ভাবনা ইত্যাদি সম্পর্কে আমার জিজ্ঞাসা। কী দার্শনিক প্রজ্ঞায়, কী ইতিহাসকে মান্যতা দিয়ে সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার বৈচক্ষণ্যে, কী জ্ঞান ও কর্মের সমন্বয় প্রতিভায়, কী শ্রমজীবী মানুষকে সংঘবদ্ধ করা এবং মার্ক্সবাদের আলোয় যুগান্তকারী বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়ার নৈপুণ্যে লেনিন নিঃসংশয়ে সারা বিশ্বের এক অতুলনীয় এবং অবিকল্প রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এত গুণের সমাহার সত্ত্বেও লেনিনের ব্যক্তিত্বের যে দিকটি আমাকে আলাদা করে সম্মোহিত করে রাখে তা তাঁর মানুষ সম্পর্কে দরদ ও মমতা এবং দেশ ও কাল সম্পর্কে সচেতন থেকে শিক্ষা-সাহিত্য-সংষ্কৃতি সম্পর্কে তাঁর গোঁড়ামি-বর্জিত অসাধারণ ভাবনা এবং মূল্যায়ন। ইতিহাস, সমাজ বিজ্ঞান এবং অর্থনীতির প্রেক্ষিতে ফ্রেডরিক এঙ্গেলস্ literary criticism অথবা polemic-এর যে আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন নিঃসন্দেহে লেনিন তার যোগ্য উত্তরসুরী।

আমাদের দুর্ভাগ্য, একদা আমাদের দেশের বামপন্থীদের মধ্যে এঁদের শিক্ষায় আলোকিত হওয়ার ক্ষেত্রে হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের মতো মানুষের সংখ্যা নেহাতই কম ছিল। তাই ভবানী সেনদের মতো বেশ কিছু কমিউনিস্ট নেতাদের সঙ্কীর্ণ ভাবাদর্শ রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সামগ্রিক ও যথাযথ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অন্তরায় ছিল। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তাঁর বৌদ্ধিক প্রজ্ঞায় আক্ষেপ করেছেন যে, বামনসুলভ নেতাদের দৌলতেই রবীন্দ্র মূল্যায়নের এই দৈনদশা যার দায়ভার আজও কমিউনিস্ট পার্টিকে বহন করতে হচ্ছে। আসলে আমরা তো ভুলে যাই, “… we have the landlord obsessed with Christ” – টলস্টয় সম্পর্কে এমন ক্ষোভ প্রকাশ করা সত্ত্বেও লেনিন তাঁকে বিশ্ব-সাহিত্যের অঙ্গনে এক অপরিসীম উচ্চতার আসনে বসিয়েছিলেন – “… we have the great artist, the genius who has not only drawn incomparable pictures of Russian life but has made first-class contributions to world literature.” এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। লেনিনের স্ত্রী ক্রুপ্সকায়ার স্মৃতিরোমন্থন থেকে জানতে পারছি যে, এক সন্ধ্যায় লেনিন একটি কমিউনে গেছেন সেখানে থাকা তরুণ-তরুণীরা কেমন আছে, কেমন চলছে তাদের পড়াশোনা ইত্যাদি খোঁজ নিতে। তাদের সঙ্গে গল্প-গুজবের মধ্যে লেনিন হঠাৎ তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কী পড়? পুশকিন পড়?’ তাদের মধ্যে একজন উত্তর দিল, ‘না, পড়ি না। পুশকিন একজন বুর্জোয়া, আমরা মায়াকোভস্কি পড়ি।’ লেনিন মৃদু হেসে মায়াকোভস্কির প্রশংসা করলেন। তারপর বললেন, ‘তবে পুশকিন পড়বে, পুশকিন আরও ভাল।’



আমার একটা ছোট্ট জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে গিয়ে একটু বেশি কথাই বলা হয়ে গেল। আমার অতি পছন্দের গগনচুম্বী দুই ব্যক্তিত্বের মধ্যে যখন ভাবনার আদান-প্রদান হয় তখন তা শুনে সেই অতলান্তিক গভীরতার তল তো আমার পক্ষে স্পর্শ করা সম্ভব নয়, তবু সেখানে অবগাহন করে যতটুকু তৃপ্তি পাওয়া যায় তাই পরম প্রাপ্তি। এখনও পর্যন্ত কিছু উল্লেখযোগ্য মানুষ আছেন যাঁদের কথোপকথন বা আলাপের কথা মনে পড়ে; যেমন রবীন্দ্রনাথ-গান্ধীজি, রবীন্দ্রনাথ-রোম্যাঁ রোলাঁ, রবীন্দ্রনাথ-আইনস্টাইন, গান্ধীজি-রোম্যাঁ রোলাঁ। রবীন্দ্রনাথ-গান্ধীজির বিতর্কের যে উচ্চতা তার সমতুল্য আর একটি মাত্র বিতর্কের সন্ধান পেয়েছেন রোলাঁ – সেটি হচ্ছে প্লেটোর সঙ্গে সেন্ট পলের বিতর্ক। অবশ্যই লেনিন-রবীন্দ্রনাথের প্রেক্ষিতটা এখানে ভিন্ন। এখানে কোনো বিতর্কের প্রশ্ন আসে না। রবীন্দ্রনাথ এখানে লেখক, লেনিন পাঠক। রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়ে লেনিন মন্তব্য করেছেন, কী মন্তব্য করেছেন আমরা জানি না; যদি জানতামও, সেটা হত এক পক্ষের কথা। কোন rejoinder পেশ করার সুযোগ রবীন্দ্রনাথ পাননি। তবু, তবু অপেক্ষা করে থাকি। না-হয় সেদিন শুধু লেনিনের কথাই শুনব। সেটাকে মেনে অথবা না-মেনে আরও একবার আগ্রহ নিয়ে ‘Nationalism’ পড়ব।

