
[প্রাককথনঃ ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার জীবনকাল ১৮৯৮ থেকে ১৯৩৬। সালভাদোর দালির অন্তরঙ্গ বন্ধু , নাট্যকার কবি – যাকে স্পেনের উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি গুলি করে মেরেছিলো। সুনীল গাঙ্গুলির একটা কবিতাও আছে – কবির মৃত্যু। শহীদ লোরকার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায় নি। কিন্তু তার কবিতা রয়ে গেছে। কালের স্রোতের শীর্ষে। রবিচক্রের এই পর্বে রইল ভূমিকাসহ লোরকার চারটি কবিতার স্ব-কৃত অনুবাদ।]
গিটার (La guitarra)
১৯২১ সালের নভেম্বর মাসে লেখা লোরকার কবিতা “গিটার”(La guitarra) গভীরভাবে স্প্যানিশ আন্দালুসিয়ার cante jondo বা “গভীর গানের”ঐতিহ্য থেকে জন্ম নিয়েছে। কবিতায় গিটার শুধুই একটি বাদ্যযন্ত্র নয়, বরং শোক, বেদনা ও অস্তিত্বের ব্যথার প্রতীক। একঘেয়ে, থামানো যায় না এমন কান্নার সুর মানুষের অন্তর্গত যন্ত্রণারই প্রতিধ্বনি। ভোরের পাত্র ভাঙা, লক্ষ্যহীন তীর, ভোরহীন সন্ধ্যা—এসব চিত্রে ধরা পড়ে জীবনের নিরাশা ও মৃত্যু-স্মৃতি। শেষের পংক্তিতে গিটার যেন মানুষের হৃদয়—পাঁচ তারকে পাঁচটি তলোয়ারের আঘাত হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। এভাবেই কবিতাটি ব্যক্তিগত শোককে সার্বজনীন রূপ দেয়, আর সঙ্গীতের ভেতর দিয়ে অস্তিত্বের ক্ষতকে ভাষা দেয়।

গিটার কাঁদে।
ভোরের পেয়ালা ভাঙে |
কাঁচের শব্দ।
গিটার কাঁদে।
অশান্ত , অঝোর |
তাকে থামানো
অর্থহীন , অসম্ভব |
গিটার কাঁদে
একঘেয়ে সুর
যেমন জল
যেমন হাওয়া – কাঁদে
বরফের মাঠের উপর।
এ কাঁদন –
সুদূর তমার জন্য
এ কাঁদন –
দক্ষিণের উত্তপ্ত বালুকার
শ্বেত ক্যমেলিয়ার জন্য |
লক্ষ্যহীন তীর ।
নেই প্রভাত – সন্ধ্যা |
ডালে ঝুলে থাকা
প্রথম মৃত পাখি |
হে গিটার!
পঞ্চ তরবারিঘাতে
বিদীর্ণ হৃদয়।
বিদায় (Despedida)
[১৯২১-১৯২৪ সালের মধ্যে লেখা লোরকার কবিতা “বিদায়” (Despedida / Farewell) এক আশ্চর্য সরল অথচ গভীর প্রতীকী রচনা। খুব অল্প কয়েকটি চিত্র—শিশুর কমলা খাওয়া, কৃষকের ফসল কাটা—এর মাধ্যমে কবি জীবনের স্বাভাবিক, চলমান ছন্দকে দেখিয়েছেন। মৃত্যুর সম্ভাবনাকেও তিনি জীবনের এই স্বাভাবিকতার বিপরীতে দাঁড় করাননি; বরং মৃত্যুর পরও জীবন বহমান থাকবে—এটাই কবিতার মূল বোধ।]

যদি আমি যাই
বারান্দাটা খোলা রেখো।
একটি শিশু কমলালেবু খাচ্ছে।
(বারান্দা থেকে তাকে দেখি।)
ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে কৃষক।
(বারান্দা থেকে তার গান শুনি।)
যদি আমি যাই,
বারান্দাটা খোলা রেখো।
বন্ধ্যা কমলার গাছের গান ( Cancion del Naranjo seco)
[ একশো বছর আগে লোরকার কবিতা “বন্ধ্যা কমলার গাছের গান” গভীরভাবে অস্তিত্বের হতাশা ও অক্ষমতার প্রতীক। এখানে বন্ধ্যা কমলার গাছ একদিকে প্রকৃতির দৃশ্য, অন্যদিকে মানুষের মনের অন্তর্গত নিঃসারতার প্রতিচ্ছবি। কমলার গাছে যেমন ফল ধরে না, তেমনি মানুষের জীবনও অনেক সময় সৃজনশীলতা ও অর্থবোধ হারিয়ে ফেলে।]

কাঠুরিয়া , কুঠার চালাও |
ছিন্ন করো ক্লিন্ন ছায়া।
মুক্ত করো অসহ্য যন্ত্রনা থেকে—
এই নিজেকে নিষ্ফল দেখে যাবার দৈনিক যন্ত্রণা।
কেন আমি জন্মালাম আয়নার ভিড়ে?
দিন , আমাকে ঘিরে ঘুরে বেড়ায়,
ধুলো ওড়ায়ে |
রাত আমারি পুনরুক্তি করে
বারম্বার নক্ষত্রমণ্ডলে।
আমি বাঁচতে চাই— নিজেকে না দেখে।
আমি স্বপ্ন দেখব— দেখতে চাই
খোসা আর কীটপতঙ্গেরা
কেমন স্বপ্নের ভিতরে রূপ নেয়
প্রেয়সী পাখি আর পাতার ভিড়ে।
কাঠুরিয়া , কুঠার চালাও |
ছিন্ন করো ক্লিন্ন ছায়া।
মুক্ত করো অসহ্য যন্ত্রনা থেকে—
এই নিজেকে নিষ্ফল দেখে যাবার দৈনিক যন্ত্রণা।
ক্ষতের রুপোলি চাঁদ
[ ১৯৩৫ সালে লেখা ‘সোনেটস ডেল আমর ওসকুর’, কবিতাগুচ্ছ থেকে এই কবিতাটি নেওয়া | অন্ধকার প্রেমের সনেটসমূহ (Sonetos del Amor Oscuro) হলো ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার এক তীব্র অন্তরঙ্গ ও বিতর্কিত কাব্যসংকলন, যেখানে নিষিদ্ধ আকাঙ্ক্ষা, যন্ত্রণা এবং পরিচয়ের গভীর অনুসন্ধান ধরা পড়েছে। যদিও এটি ১৯৩৫ সালে লেখা হয়েছিল—স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ চলাকালে লোরকার হত্যার এক বছর আগে—তবু এর স্পষ্ট বিষয়বস্তু এবং তাঁর সমকামিতাকে ঘিরে সামাজিক কলঙ্কের কারণে পরিবার বহু দশক ধরে গ্রন্থটি প্রকাশে বাধা দেয়। অবশেষে ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত হলে এটি লোরকার ব্যক্তিগত সত্য এবং তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার নিয়ে গভীর আলোচনার সূচনা করে।]

বাতাসী রাতে – দীর্ঘশ্বাসে
প্রেতাত্মা ভাসে,
রুপোলি বিষাদ |
তার ধূসর ধবল হাত
স্মৃতির ক্ষতের বুক ঢাকে |
ক্রমে ঢেউয়ের ঢলে ভেসে যায়
ফেলে যায়
নিঃসঙ্গ আকাঙ্খী – আমায় |
ও আমার ভালোবাসা
ক্ষতের শোনিতে
অন্তহীন আলোর রণিতে
ফিরে এসো|
এসো ফিরে
মলিনা মৃত্তিকার মর্ম গভীরে
যেখানে নির্বাক ফিলোমেল
খুঁজে পাবে তার প্রজাপতি বন
কালো মেঘ শোক
কোমল স্বপ্নের বাসা |
আহা ! কি মধুর গুঞ্জন বাজে মাথার ভেতরে|
ওগো, আমায় শুতে দাও
যেখানে তোমার প্রেমের প্রাণ সৌন্দর্যে ভাসে
অন্তহীন – আত্মাহীন|
যেখানে হেমন্ত হলুদ ধারায়
আমার রক্তের অশান্ত বিষাদ ছড়ায়
সুগন্ধি কাঁটাবহরের বালুকাবেলায় |


প্রত্যেকটি কবিতা মর্মস্পর্শী। সহজ ভাষার অনুবাদের গুণে তা যেন আরও বেশি মর্ম ছুঁয়ে গেল।