
(১)
“কাহৈরি ঘিণি মেলি । অচ্ছহু কীস ।
বেটিল ডাক পড়অ চৌদীস ।।
আপনার মাংসেঁ হরিণা বৈরী ।
খনহ ন ছাড় অ ভুকু অহেরী ।।”
চর্যাপদ। মাত্র ১০০০ বছর আগের বাংলা ভাষা ।
আজ মৃত, বাঙালি এই ভাষায় আজ কথা বলে না, এমনকি ভাষাবিদ ছাড়া অন্যে বোঝেও না। অর্থাৎ এ ভাষার মৃত্যু হয়েছে এবং মাত্র ১০০০ বছরের মধ্যে ।
৬০০-৬৫০ বছর আগের বাংলা ভাষার নমুনা দেখা যাক বড়ু চণ্ডীদাসের কবিতাংশে :
“সে নেহ তিয়জ নাহি সহে
সে পুনি আহ্মার দোষ নহে।
কে বুলিতে পারে তোর গুণে
একে একে বসে মোর মনে।
এবে আসি বইস মোর পাশে
গাইল বড়ু চণ্ডীদাসে ।।
কিংবা ২৫০ – ৩০০ বছর আগের বাংলাভাষার নমুনা রামপ্রসাদের গানে:
“কালো মেঘ উদয় হল অন্তরঅম্বরে।
নৃত্যতি মানসশিখী কৌতুকে বিহরে।।
‘মা’ শব্দে ঘন ঘন গর্জে ধারাধরে।
তাহলে প্রেমানন্দ মন্দ হাসি তড়িৎ শোভা করে ।।
ইত্যাদি ইত্যাদি …

এবারে আধুনিক কালের বাংলায় ফেরা যাক :
“অগ্নিময় চক্ষুঃ যথা হর্যক্ষ , সরোষে
কড়মড়ি ভীমদন্ত , পড়ে লম্ফ দিয়া
বৃষস্কন্ধে, রামচন্দ্র আক্রমিলা রণে
কুমারে ! চৌদিকে এবে সমর-তরঙ্গ
উথলিল, সিন্ধু যথা দ্বন্দ্বি বায়ু সহ
নির্ঘোষে!ভাতিল অসি অগ্নিশিখাসম
ধূমপুঞ্জসম চর্মাবলীর মাঝারে
অযুত ! নাদিল কম্বু অম্বুরাশি-রবে!”
মাত্র ১৬৫ বছর মানে রবীন্দ্রনাথ যখন জন্মাচ্ছেন, তখন সৃষ্টি হচ্ছিল আধুনিক বাংলাভাষার প্রথম এবং সম্ভবত শেষ মহাকাব্য – মেঘনাদবধ কাব্য। আজ এই ভাষার অস্তিত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি ছাড়া জীবনসূচিতে কতটা জীবন্ত ? আমাদের দৈনন্দিন যাপনে বা সাহিত্যের চলমান স্রোতে এর ধ্বনি-প্রতিধ্বনির আছে কি কোনো স্পন্দন ? আজও কি বেঁচে আছে এই ভাষার প্রয়োগ ?
শেষের কবিতায় নিবারণ চক্রবর্তীর বয়ানে রবি ঠাকুরের ভাষা নিয়ে যে তীর্যক মন্তব্য করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ – “রবি ঠাকুর সম্বন্ধে আমার দ্বিতীয় বক্তব্য এই যে, তাঁর রচনারেখা তাঁরই হাতের অক্ষরের মতো – গোল বা তরঙ্গরেখা, গোলাপ বা নারীর মুখ বা চাঁদের ধরনে। ওটা প্রিমিটিভ; প্রকৃতির হাতের অক্ষরের মক্শ-করা । নতুন প্রেসিডেন্টের কাছে চাই কড়া লাইনের, খাড়া লাইনের রচনা – তীরের মতো, বর্শার ফলার মতো, কাঁটার মতো। ফুলের মতো নয়, বিদ্যুতের রেখার মতো। নুরালজিয়ার ব্যথার মতো। খোঁচাওয়ালা , কোণওয়ালা, গথিক গির্জের ছাঁদে, মন্দিরের মণ্ডপের ছাঁদে নয়। এমন কি যদি চটকল, পাটকল অথবা সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিঙের আদলে হয়, ক্ষতি নেই ।…
এটা কি ছিল না তৎকালীন আধুনিক সাহিত্যের ভাষাকে নিজের দীর্ঘ অভ্যস্ত ভাষার সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করার নিরলস প্রয়াস, কারণ তিনি বুঝতে পারছিলেন তাঁর এতদিনকার অভ্যস্ত ভাষা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ সাবেকি, একটু পশ্চাদগামী হয়ে পড়েছে? ঠিক এর পর পরই উনি গদ্যে এবং পদ্যেও এমন একটা পরিবর্তন আনলেন যেখানে পুরনো রোম্যান্টিক লাবণ্যের জায়গায় ফুটে উঠল ছোটো ছোটো তির্যক ভঙ্গিমা, হীরক কঠিন দ্যুতি, মহৎ শিল্পীর যা অনিবার্য লক্ষণ নিজেকে বারবার ভেঙে চুরে নতুন করে গড়ে নেওয়া । এর নিদর্শন কি মালঞ্চ থেকে চার অধ্যায়, গল্পসল্প, সে, কিংবা পূরবী – উত্তর কবিতার ভাষায় ফুটে ওঠে নি ।
নীচে সাহিত্য এবং সঙ্গীতের ভাষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব মতের একটা অংশ তুলে ধরলাম, কারণ এখনও যে কোনো সমস্যাতে রবীন্দ্রনাথের মতামত যে অত্যন্ত মূল্যবান এ কথা বাঙালি অস্বীকার করতে পারে না । লেখাটি যখন লিখছিলেন তখন কবির বয়স মাত্র ২০ অথচ কী গভীর উচ্চারণ।
“আমাদের সংস্কৃত ভাষা যেমন মৃত ভাষা, আমাদের সংগীতশাস্ত্র সেইরূপ মৃত শাস্ত্র। ইহাদের প্রাণ বিয়োগ হইয়াছে, কেবল দেহমাত্র অবশিষ্ট আছে। আমরা কেবল ইহাদের স্থির অচঞ্চল জীবনহীন মুখ মাত্র দেখিতে পাই, বিবিধ বিচিত্র ভাবের লীলাময়, ছায়ালোকময় পরিবর্তনশীল মুখশ্রী দেখিতে পাই না। আমরা কতকগুলি কথা শুনিতে পাই; অথচ তাহার স্বরের উচ্চ-নীচতা শুনিতে পাই না, কেবল সমস্বরে একটি কথার পর আর-একটি কথা কানে আসে মাত্র।” – (সংগীত ও ভাব – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , জ্যৈষ্ঠ ১২৮৮)
যাই হোক, গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকেই বাংলা ভাষা তার নতুন প্রকাশভঙ্গি পেয়ে গেল যা রাবীন্দ্রিক বৈশিষ্ট্য থেকে অনেকটাই আলাদা এবং পরিবর্তিত সময়ের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠল যেখানে ক্রমশ ব্রাত্য হয়ে গেল উনবিংশ শতাব্দীর বহুল ব্যবহৃত শব্দগুলো যেমন আইলা, গেলা, আক্রমিলা, মম, মোর, হেথা, হেরিনু , আশে, পশে, তব, এবে, ভাতিল ইত্যাদি ইত্যাদি । রয়ে গেল কিছু স্কুল ম্যাগাজিনের কাঁচা লেখায় আর অ-কবিদের অক্ষম অনুকৃতিতে । ভাষার চিরকালীনতা হয় না, হয় ভাবের, তাই ধ্রুপদী সাহিত্য ভাষার বৈশিষ্ট্যে নয় ভাবের চিরন্তনতায় আজও জীবন্ত এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনুবাদে এবং রূপান্তরিত আঙ্গিকে । কারণ ভাষা বহতা নদীর মতো যেখানে এক নদীতে দুবার ডুব দেওয়া যায় না। যদিও সব নদীই যে সমুদ্রে পরিণতি পায় তা নয়, অনেক শাখা/উপনদী বড়ো নদীতে হারিয়ে যায় আবার সে নদীও আছে ‘যে নদী মরুপথে হারালো ধারা , ‘তা না হলে গত শতকেই শুধু তথ্য বলছে ২০০০ এর বেশি ভাষা পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাসে এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। এইভাবে চলতে থাকলে আরো ১০০-২০০ বছর বাদে ভাষার প্রকৃতি কি হবে সেটা আমাদের একেবারেই অনুমানের অতীত।

(২)
বিজ্ঞানে ঐকমত্য যতটা স্বাভাবিক, সাহিত্য এবং শিল্পকলায় ততোটাই স্বাভাবিক ‘যত মত তত পথ’। এখানে একেবারে বিপরীতে মেরুর মতবাদ সমান সম্মানে প্রতিষ্ঠিত। টলষ্টয়ের বিরাট বহির্জগতের চলমান জীবনের পাশে দস্তয়েভস্কির অন্তহীন অন্তর্জগতের পুঙ্খানুপুঙ্খ মানচিত্র, গ্ৰীক নাটকের নিয়তিবাদের পাশে সেক্সপীয়রের গভীর ট্রাজিক উচ্চারণ যার রঙ্গমঞ্চ সমগ্ৰ মরজীবন কিংবা গীতাঞ্জলির ঈশ্বরের পাশে সমান ভাবে জ্যোতিষ্মান বোদল্যেরের নিরীশ্বর জগতের ‘লা ফ্লর দ্যু মাল’। বিপরীত ভাবনা থেকে এসে মিলে যায় রবীন্দ্রনাথের শিক্ষার মিলন-এর পাশে শরৎচন্দ্রের শিক্ষার বিরোধ, জীবনানন্দের পরাবাস্তবতার পাশে সমর সেন বা অরুণ মিত্রের সমাজ বাস্তবতা। মিলে যায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পাশে শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং শৈলেশ্বর ঘোষ, কিংবা তারাশঙ্করের পাশে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা সতীনাথ ভাদুড়ী। এমিল জোলার পাশে দিব্বি মানিয়ে যায় কাফকা, কামু কিংবা অঁরি মিশো, ফ্রাঁসিস পোঁজের পাশে পাবলো নেরুদা বা লোরকা, মায়াকোভস্কির পাশে আখমাতোভা। এই সবই প্রমাণ করে বিপরীতে অভিন্নতা। তাই, আমার যা মত সেটাই শেষ কথা এই ভাবনা সাহিত্য শিল্পকলার ভাষা নয়, একনায়কতন্ত্রের ভাষা। গণতন্ত্র যদি কোথাও সামান্যতমও অস্তিত্ববান হয়ে থাকে তা হল সাহিত্য এবং শিল্পকলার ক্ষেত্রে, রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে নয়, যদিও সেখানেও সমাজ এবং রাষ্ট্রের একটা লক্ষণরেখা টানা থাকে, একচ্ছত্রবাদী রাষ্ট্রে তা প্রকাশ্য এবং অন্য ক্ষেত্রে প্রচ্ছন্ন। তা না হলে যুগে যুগে কেন এত বই নিষিদ্ধ ঘোষিত হবে, কেনই বা শিল্পীরা নিগ্ৰহের শিকার হবে, হয় কারাগারে, নয় দেশান্তরিত হয়ে, এমন কী গুপ্তহত্যার নজিরও কম নয়। তবুও সাধারণভাবে তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র শিল্পীদের ততটা বিপজ্জনক বলে মনে করে না। আসলে ভাবনাটা বড় কথা নয়, বড় কথা এর প্রকাশ সাহিত্যের, শিল্পকলার আগ্নেয় সত্তায় কতটা সৃষ্টির বীজ বপন করতে পারবে। তাই এক যুগের নিষিদ্ধ বই পরবর্তী যুগে ধ্রুপদী আখ্যায় সম্মানিত হয়।
একনায়কতন্ত্রের ভাষা!
হ্যাঁ, ঠিকই তাই – এ রকমই ভেবে একদিন আতংকিত হয়েছিলেন জর্জ অরওয়েল। লিখে ফেললেন সেই উপন্যাস যা আজ জনপ্রিয়তায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ১০টি উপন্যাসের মধ্যে স্থান করে।

‘1984’ – হ্যাঁ, আমি জর্জ অরওয়েলের ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত বিশ্ববিখ্যাত রাজনৈতিক ও ডিস্টোপিয়ান কথাসাহিত্যের সেই ধ্রুপদী উপন্যাসের কথাই বলছি। ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে চার বছর আগে। নাৎসিবাদ এবং ফ্যাসিবাদ পারমাণবিক ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আপাত সমাপ্ত। বিপ্লবোত্তর রাশিয়া সর্বহারার একনায়কতন্ত্র পেয়েছিল কি না জানি না, কিন্তু সর্বহারারা যে দোর্দন্ডপ্রতাপ স্তালিনের স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র পেয়েছিল, ইতিহাস তার স্বাক্ষী। মনে করলেই শিরদাঁড়া দিয়ে আজও একটা ঠাণ্ডা, অরওয়েলের ভাষায় (doublepluscold) স্রোত বয়ে যায়। এই ধরণের অনেক শব্দবন্ধ যারা আজ “অরওয়েলিয়ান” শব্দবন্ধ হিসেবে সাধারণ ব্যবহারে প্রবেশ করেছে, যেমন “বিগ ব্রাদার বা বি বি”, “ডাবলথিঙ্ক”, “থট পুলিশ”, ” থটক্রাইম “, ” নিউস্পীক “, ” ওল্ডস্পিক”, “ইউথপেট্রোল বা ওয়াইপি”, “ওল্ডথিঙ্ক” “ইংসক”, “বেলিফিল” , “ব্ল্যাকহোয়াইট”, “আনপারসন” ইত্যাদি ইত্যাদি এবং ” FREEDOM IS SLAVERY” , “TWO PLUS TWO MAKE FIVE”, “WAR IS PEACE”, “IGNORANCE IS STRENGTH” এই ধরণের অভিব্যক্তি। এই উপন্যাসে সর্বগ্রাসীবাদ, গণ নজরদারি এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের বিষয়বস্তু এবং বাস্তব জীবনের উদাহরণের মধ্যে (স্তালিনীয় সোভিয়েত সমাজতন্ত্র) সমান্তরালতা তৈরি করা হয়েছে। অরওয়েল তার বইটিকে নিছক “ব্যঙ্গ” হিসাবে বর্ণনা করেছেন, এবং “একটি কেন্দ্রীভূত অর্থনীতি যে বিকৃতির জন্য দায়ী” একথা বলেছেন এবং তিনি আরও বলেছেন যে তিনি বিশ্বাস করেন “এর মতো কিছু আসতে পারে”, যা মানুষের অর্জিত মূল্যবোধ, শিল্প-শিক্ষা-সংস্কৃতি-ইতিহাসকে জোর করে বন্দুকের নলের সামনে দাঁড় করিয়ে হলোকাস্টের মাধ্যমে মুছে দিয়ে নব্য একনায়কতান্ত্রিক (অ)সভ্যতার বৈভীষিক সূচনাকে প্রতিষ্ঠিত করবে। তিনি আশংকা করেছিলেন, এই রূপান্তর প্রক্রিয়া ২০২০ সালে প্রায় সমাপ্ত হবে এবং সম্পূর্ণ নতুন INGSOC (ইংলিশ সোস্যালিজম) ২০৫০ এর মধ্যে সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। সৌভাগ্যের বিষয়, তাঁর এই আশংকা এখনও পর্যন্ত অমূলকই প্রমাণিত হয়েছে। তবুও দূর ভবিষ্যতে যে কোনো এক Oceania-র রাষ্ট্রীয় ভাষা যে Newspeak হবে না INGSOC এর মতো স্বৈরতান্ত্রিক আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করতে, সেটা এই মুহূর্তে জোর গলায় বলতে পারি না, যেখানে প্রত্যেক মুহূর্তে “BIG BROTHER IS WATCHING YOU” , অথবা রক্তকরবীতে রবীন্দ্রনাথ যেরকম বলেছিলেন “চুপ করাটাকেও যে শুনতে পায় …”।
এই মুহূর্তে কোনো কোনো দেশ তাদের ধর্মীয় ক্রিয়া-কলা এবং আচারকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে হাজার হাজার বছরের মিথস্ক্রিয়ায় গড়ে ওঠা ভাষার স্বাভাবিক ইতিহাসকে ভুলে গিয়ে ক্রমাগত বিলোপ সাধন করে চলেছেন সেইসব শব্দ এবং শব্দবন্ধকে যাদের শব্দরূপ-ধাতু রূপ-সন্ধি-সমাসের উৎস রয়ে গেছে অন্য ধর্মের ভাষার মূলে। এর ফল যে উভমুখি এবং সমাজের এই (অপ)সাংস্কৃতিক প্রভাব যে দেশে দেশে পারস্পরিক ঘৃণা জাগিয়ে উগ্ৰ দেশপ্রেমের নামে ফ্যাসিবাদকেই প্রতিষ্ঠা করে চলেছে অরওয়েলের “GOD IS POWER” এই অভিব্যক্তিকে হাতিয়ার করে তা কি ধর্মগুরুরা জানেন না? অজান্তেই হোক বা জেনেশুনেই হোক সাধারণ মানুষের মনেও এই ঘৃণার বীজ দেশ ও ধর্মের নামে যে চিরকালের জন্য বপন হয়ে যাচ্ছে তা তো অস্বীকার করতে পারি না। অরওয়েলের বই বেরনোর প্রায় তিন দশক আগে লেখা রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তধারা’ – যখন ফ্যাসিবাদ শব্দটি সাধারণের চর্চাতেই ছিল না, যেখানে এ রকম দুই গুরুর কথা ছিল। একজন উত্তরকূট, অন্যজন শিবতরাইয়ের। একজন সরাসরি বলেন, অন্যজন প্রচ্ছন্ন। শিবতরাইয়ের মানুষকে চেনা যায় তাদের কান ঢাকা টুপি দেখে, যাতে ভুলক্রমেও বাইরের বুদ্ধি ভিতরে ঢুকে না পড়ে আবার উত্তরকূটেরও আছে অন্যরকম টুপি যা সেখানের মানুষের কাছে ছিল অদৃশ্য- এ সবই উভয় দেশের গুরু-ব্যবস্থা। নাটকটি অবশ্যই রূপকধর্মী এবং রূপকের ছলে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় শক্তি কিভাবে স্বাভাবিক নদী ধারাকে বাঁধ দিয়ে নীচের শত্রুভূমির শস্য শ্যামলতাকে মরুভূমিতে পরিণত করে দিতে পারে। এও যুদ্ধের এক কৌশল, যেমন আধুনিক সময়ে বাণিজ্য যুদ্ধ আরেক যুদ্ধ কৌশল। দ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ অবশ্য শেষ অবধি মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস হারাতে চান নি, তাই প্রাণের বিনিময়ে অভিজিৎ প্রাণকে দিয়েই সেই কৃত্রিম বাঁধকে ধ্বংস করেন।

“এ তো স্পষ্টই জলস্রোতের শব্দ।
প্রথম নাচ আরম্ভের ডমরুধ্বনি।
শব্দ বেড়ে উঠছে যে, বেড়ে উঠছে –
এ যেন –
বোধ হচ্ছে যেন –
হ্যাঁ, হ্যাঁ, সন্দেহ নেই। মুক্তধারা ছুটেছে। বাঁধ কে ভাঙলে? কে ভাঙলে? – তার নিস্তার নেই।”
প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ। আবার আকাশে ঝড়।
ওটা ঝড় না সমুদ্রগর্জন। এ তো আমাদের আশেপাশেই।
এই বজ্রবিদারণ মুহুর্মুহু।
আবার ছড়িয়ে পড়ছে দিক থেকে দিগন্তরে
ট্রয়ের মাটি থেকে ছিটকে এসে পড়ছে কুরুক্ষেত্রে,
পার্ল হারবার থেকে হিরোসিমায়,
এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে।
মেঘের ওপার থেকে মর্মভেদী কার উচ্চারণ :
“… It is a tale
Told by an idiot, full of sound and fury ,
Signifying nothing.”
যবনিকার আড়ালে কার কণ্ঠস্বর :
“GOD IS POWER …”
আমি কিন্তু আমার বুকের ভিতরেই স্পষ্ট শুনছি:
“ওরে ভাই, কার নিন্দা করো তুমি। মাথা করো নত।
এ আমার , এ তোমার পাপ।“

তথ্যসূত্র:
১) বাঙালীর ভাষা : সুকুমার সেন এবং
সুভদ্রকুমার সেন
২) বাংলার সাহিত্য-ইতিহাস : শ্রীসুকুমার সেন
৩) রামপ্রসাদী : সম্পাদনা – সর্বানন্দ চৌধুরী
৪) সঙ্গীতচিন্তা : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৫) মুক্তধারা : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৬) বলাকা : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৭) মেঘনাদবধ কাব্য : মাইকেল মধুসূদন দত্ত
৮) 1984 : GEORGE ORWELL
৯) Macbeth : William Shakespeare
১০) রক্তকরবী : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


অসাধারণ আলোচনা ! কি মসৃণ গতিতে ভাষার বিবর্তন বর্ণনা করেছেন, সাথে বিশ্ব বন্দিত লেখকদের লেখার তুলনামূলক অভিব্যক্তি ! ঋদ্ধ হলাম। আন্তরিক শ্রদ্ধা জানবেন। 🙏
এমন একটা লেখা প্রকাশিত হওয়ার প্রয়োজন ছিল।অল্প কথায় ভাষার বিবর্তনকে ধরার চেষ্টা হয়েছে।তবে ভাষার বৈপরীত্য -এই বিষয়টি থেকে একনায়কের ভাষায় প্রবেশ করার মাঝের জায়গাটা এখনকার ভাষায় যাকে বলে interface বা বলা যেতে পারে ‘জোড়’ এর অংশটা আর একটু দীর্ঘ হলে ভাল হত।একটু যেন হঠাৎই অরওয়েল হাজির হলেন।তবে লেখার গুণে ঐ ত্রুটি টুকু উপেক্ষা করা যায়।বেশ ভাল লেগেছে।
সোমনাথ দাশগুপ্ত
আপামরের জন্যে রচিত নয়। যেহেতু রবিচক্রের বৃত্তে বোধহয় আমি একাই পামর তাই সভয়ে পাঠ করলাম। দ্বিতীয় পাঠের পর যত টুকু নেওয়া গেল তাতে আমাদের হাতে কিছু নেই। ভাষা যদি বহমান না হয় তবে তার মৃত্যু নিশ্চিত এত কালের ফরমান। আমার সকল দিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়।
লেখকের গভীর পাঠাভ্যাস ও ঝংকারময় গদ্য প্রসবের প্রতি প্রণতি রইল।