শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

সাহিত্যে নোবেল, না-নোবেল, রবীন্দ্রনাথ এবং অন্যান্য

(স্মরণীয় – ১০ ডিসেম্বর নোবেল পুরস্কার প্রদান দিবস)

১৫ নভেম্বর, ১৯১৩। রবীন্দ্রনাথ তাঁর আশ্রমসচিব নেপাল রায় এবং কয়েকজন কাছের জনকে নিয়ে সন্ধের দিকে পারুল বনের দিকে চলেছেন। পথে একজন পিয়ন তাঁকে একটি জরুরি টেলিগ্ৰাম দেন এবং তিনি যথারীতি জোব্বার পকেটে ঢুকিয়ে নেন। সে দিন খুব হাওয়ার রাত। খোয়াইজুড়ে রাস পূর্ণিমার গোল হলুদ চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে পারুল বন। জোব্বার পকেট থেকে টেলিগ্রামের কাগজটা বের করলেন কবি। ভাঁজ খুলে বার দু’য়েক পড়লেন। চেয়ে রইলেন দূর বনপথে। চোখে উদাস করা চাহনি। তারপর উদাসীন ভাবে নোবেল প্রাপ্তির টেলিগ্রামটা সচিবের দিকে এগিয়ে বললেন, ‘‘নিন, নেপালবাবু। এই আপনার ড্রেন তৈরির টাকা!’’
রবিঠাকুরের কথা শুনে নির্বাক আশ্রম-সচিব নেপালচন্দ্র রায়!
দু’চোখের কোণ ভিজে এল তাঁর!
নোবেল কমিটির কাছে কবির ঠিকানাই ছিল না!
শেষে সুইডিশ অ্যাকাডেমি ‘গীতাঞ্জলি’-র প্রকাশক ম্যাকমিলান কোম্পানির কাছ থেকে ঠিকানা নেয়। ১৪ নভেম্বর, শুক্রবার লন্ডন থেকে কেবলগ্রাম পাঠায় ৬ নং দ্বারকানাথ ঠাকুর দলেনের ঠিকানায়। কমিটি লেখে :
“SWEDISH ACADEMY AWARDED YOU NOBEL PRIZE LITERATURE PLEASE WIRE ACCEPTATION SWEDISH MINISTER.”
নীচে টেলিগ্ৰামটির প্রতিলিপি :

একটু সময়ের ঘড়িকে ১ বছর পিছিয়ে দেওয়া যাক। রবীন্দ্রনাথ নোবেল লরিয়েট হবার তখনও পাক্কা ১ বছর বাকি। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় একটি ব্যঙ্গ-নাটিকা লিখেছেন, নাম  ‘আনন্দ বিদায়’। প্রকাশ করলেন ১৬ নভেম্বর,১৯১২। উদ্দেশ্য কবির বিভিন্ন “মি”র (তাঁর ভাষায় ন্যাকামি, জ্যাঠামি, ভণ্ডামি ও বোকামি) প্রতি তীব্র আক্রমণ।  এ সবই বাঙ্গালা সাহিত্যের মঙ্গলের জন্য স্বঘোষিত কর্তব্য বলে তিনি মনে করেছিলেন। সেখানে তিনি লেখেন : ‘একাধারে কবি, অধিকারী, ঋষি – কিবা ত্যাগ কিবা দান, “পরিষৎ” জল ছিটায়ে দিলেই (কবিবর) স্বর্গে উঠিয়া যান’ কিংবা 

“২য় ভক্ত । এই একবার বিলেত ঘুরে এলেই ইনি P.D. হ’য়ে আসবেন।

৩য় ভক্ত । P.D. কি?

২য় ভক্ত । Doctor of Poetry.

৩য় ভক্ত । ইংরেজরা কি বাঙ্গলা বোঝে যে এঁর কবিতা বুঝবে?

৪র্থ ভক্ত । এ কবিতা বোঝার তো দরকার নাই। এ শুধু গন্ধ! গন্ধটা অনুবাদ করে নিলেই হোল।

২য় ভক্ত । তারপর রয়টার দিয়ে সেই খবরটা এখানে পাঠালেই আর Andrewএর একটা certificate যোগাড় করলেই P.L.

৩য় ভক্ত । P L. কি?

২য় ভক্ত । Poet Laureate.”

কৌতুকের ব্যাপার হল বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সেই নিষ্ঠুর ব্যঙ্গের চাবুক প্রায় হুবহু ঐ চিত্রনাট্য মেনেই বিশ্ব রঙ্গমঞ্চে বাস্তবায়িত হল শুধু চাবুক পরিবর্তিত হয়ে গেল পারিজাত বরমাল্যে যা মঙ্গলময় আশীর্বাদ হয়ে শুধু কবিকেই বরণ করে নিল না, সমগ্ৰ বঙ্গ সাহিত্যকেও বিশ্ব অঙ্গনে একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠিত এবং গৌরবান্বিত করল। যদিও তখন নাট্যকার এ ধরাধাম থেকে বিদায় নিয়েছেন ( মৃত্যু: ১৭ মে,১৯১৩)। চিত্রনাট্যের সঙ্গে ঘটনাটা মিলিয়ে দেখা যাক :

“এই একবার বিলেত ঘুরে এলেই ইনি P.D. হয়ে আসবেন।” ঘটনা হল, বিলেত থেকে ফেরার দু’মাসের মধ্যেই ২৮ অক্টোবর, ১৯১৩ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের একটি বিশেষ অধিবেশনে ভাইস-চ্যানসেলর আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আরও ৬ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকেও সাম্মানিক Doctor of Literature উপাধি দেওয়ার প্রস্তাব করেন এবং সিন্ডিকেট সমগ্ৰ প্রস্তাবটি সিনেটর অনুমোদনের জন্য পেশ করার সিদ্ধান্ত গ্ৰহণ করে। অর্থাৎ কবি P.D হলেন। “তারপর রয়টার দিয়ে সেই খবরটা এখানে পাঠালেই আর Andrew-এর একটা certificate যোগাড় করলেই P.L.” এখানে ঘটনাচক্রে চিত্রনাট্য সামান্য বদল হয়েছিল। P D. হয়েছিলেন এখানেই যদিও তা তখন বিলেতেরই অধীনে ছিল আর certificate টা Andrews নয় গ্ৰেট ব্রিটেনের রয়াল সোসাইটি অব্ লিটারেচারের সদস্য হিসেবে টমাস স্টার্জ মূর রবীন্দ্রনাথকে নোবেল প্রাইজ দেওয়ার জন্য সুপারিশ করে সুইডিস অ্যাকাডেমির কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন রয়্যাল সোসাইটির এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কোনো দেশের পক্ষ থেকেই ভারতীয় কবির রবীন্দ্রনাথের নাম উচ্চারিত হয় নি। Harold Hjame-র নেতৃত্বে নোবেল কমিটি তাঁদের পছন্দমতো প্রার্থীর নাম অ্যাকাডেমির বিবেচনার জন্য পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু তিনজন ইউরোপীয় রবীন্দ্রনাথকে পুরস্কারের যোগ্য বলে এমন ভাষায় সুপারিশ করলেন যে অ্যাকাডেমির সদস্যরা ভারতের তথা এশিয়ার কবিকে সম্মান জানাতে দ্বিধা করলেন না।

Thomas Sturge Moore (1870–1944)

রবীন্দ্রগুণমুগ্ধ টমাস স্টার্জ মুর রয়্যাল সোসাইটির সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সুপারিশ পাঠিয়ে দিলেন সুইডিস অ্যাকাডেমির কাছে। অল্প কথায় লিখলেন – As a fellow of the Royal Society of Literature of the U.K., I have the honour to propose the name of Rabindranath Tagore, as a person qualified in my opinion, to be awarded the Nobel Prize in Literature. প্রভাবশালী স্টার্জ মুরের এই সুপারিশের গ্ৰহণযোগ্যতা বিচারের ভার পড়ে Per August Leonard Hallstorm-এর ওপর। ইতিমধ্যে প্রকাশিত ফক্স স্ট্র্যাংওয়েজের থেকে সংগৃহীত সমালোচনা ও Song Offerings এবং The Gardener পড়ে তাঁর ঐতিহাসিক প্রতিবেদন দাখিল করলেন তিনি, অনেক কথার মাঝখানে লিখলেন – ‘It is certain, however, no poet in Europe since the death of Goethe in 1832 can rival Tagore in noble humanity, in unaffected greatness, in classical tranquility.’ তাঁর সিদ্ধান্ত : ” There is no mistaking the exceptional poetic beauty. The mode of expression is of classical simplicity, the image is only the spontaneous language of thought, and it does not need to be moulded into shape, it is even complete through the mere mention of the word.” আর একজনের কথাও বলা উচিত। তিনিও অন্যতম সদস্য সুইডেনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি Carl Gustaf Verner von Heidenstam।
যদিও ব্যাপারটা যতটা রূপকথার গল্প বলে মনে হচ্ছে ততটা মসৃণ ছিল না। সে বছর সব-সুদ্ধ ২৮টি নাম প্রস্তাবিত হয়েছিল যাঁদের মধ্যে ছিলেন Thomas Hardy, Anatole France, Ernest Lavisse, Pierre Loti এবং ইটালির Grazia Deledda র মতো বিশ্ববিখ্যাত লেখকেরা। প্রায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গিয়েছিল ফরাসি সাহিত্যিক ও সমালোচক Emile Faguet-এর পক্ষে। রবীন্দ্রনাথের নাম প্রস্তাবিত হবার পর আবার নতুন করে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার শেষে ‘Of the thirteen who voted on November 13, twelve were in favour of Rabindranath Tagore.’
শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ P.L. হলেন‌ ১৯১৩ সালে।

Rabindranath Tagore (1861-1941)

১৯০১ সাল থেকে এই নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরু হয় তাঁর ইচ্ছানুসারে পাঁচটি বিষয়ে : সাহিত্য, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং শান্তি। ১৮৯৬ সালের ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেল মারা যান। সেজন্য এই তারিখেই বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। অর্থনীতিতে পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়েছে ১৯৬৯ সাল থেকে। আলফ্রেড নোবেল তার উইলে অর্থনীতির কথা উল্লেখ করেননি। আমি অবশ্য আলোচনাকে শুধুমাত্র সাহিত্যে নোবেল এবং বিশেষকরে সেইসব চিরায়ত সাহিত্যিক যাঁরা মহাকালের দরবারে স্বীকৃত হয়েও রহস্যময় কারণে নোবেল পুরস্কারে বঞ্চিত হয়েছেন এই ব্যাপারটাতেই সীমাবদ্ধ রাখব। কারণ, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং চিকিৎসাশাস্ত্রের জটিল সূত্রাবলীর অবস্থান সাধারণের বোধবুদ্ধির সীমার ওপারেই থাকে, এমনকি ওই বিষয়ের বিশেষজ্ঞের পক্ষেও তা যে যথেষ্ট সহজবোধ্য সে কথাও জোর করে বলা যায় না। আর ‘শান্তি’ পুরস্কারের নিয়মকানুন প্রায়ই দুর্বোধ্য যেখানে দুই বিপরীত মেরুর ব্যক্তিও যেমন একইসঙ্গে পুরস্কৃত হতে পারেন (মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার এবং ভিয়েতনামী সাম্যবাদী Lê-Dú’c-Tho (১৯৭৩) যদিও নীতিগত কারণে লে-দুক্-থ সে পুরস্কার নিতে অস্বীকার করেন, আবার তেমনি একজন বিজ্ঞানী (লিনাস পাউলিং) একবার রসায়নে(১৯৫৪) নোবেল পাবার পরেও আবার ‘শান্তি’ তেও (১৯৬২) পুরষ্কৃত হন অথচ রোমাঁ রোলাঁ যাঁকে শান্তির রাজপুত্র এবং ‘অন্য খ্রীস্ট’ হিসেবে দেখতেন, সেই মহাত্মা গান্ধী যাঁর সম্বন্ধে আইনস্টাইন বলতেন ‘আমাদের সময়ের সবচেয়ে আলোকিত রাজনৈতিক ব্যক্তি’ এবং বলেছিলেন ‘ আগামী প্রজন্ম বিশ্বাস করবে না যে রক্তমাংসে গড়া এই ব্যক্তির মতো একজন মানুষ এই পৃথিবীতে হেঁটে এসেছেন।’ তাঁর নাম পাঁচ পাঁচ বার মনোনীত হওয়া সত্ত্বেও নোবেল কমিটি তাঁকে পুরস্কারের যোগ্য মনে করেন না।

M K Gandhi (1869 – 1948)

বর্তমানে যখন দেখি মহাশক্তিধর, আধিপত্যবাদী যে দেশ সব থেকে বেশি যুদ্ধাস্ত্র রপ্তানি করে পৃথিবীর কোণে কোণে যুদ্ধকে বাঁচিয়ে রেখে নিজেদের অর্থনীতিকে পুষ্ট করে চলেছে, সেই দেশের কর্ণধার নিজেই নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য নিজেকে মনোনীত করছেন কয়েকজন উমেদারের সাহায্যে তখন হতবাক হওয়া ছাড়া আর আমাদের কোনো পথ থাকে না। এরকম যদি ভবিষ্যতেও চলতে থাকে তাহলে শান্তি পুরস্কারের যৌক্তিকতাও যে প্রশ্নের মুখে পড়বে এ কথা নিঃসংশয়েই বলা যায়।

নোবেল পুরস্কার নিঃসন্দেহে একটি মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার, তবে এর নির্বাচন প্রক্রিয়া কি আজো সমালোচনার ঊর্ধ্বে?
নোবেল পুরস্কার শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্রে (পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য, শান্তি এবং অর্থনীতি) দেওয়া হয়। গণিত, প্রকৌশল বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলির জন্য কোন পুরস্কার নেই।
নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়, যা স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার অভাব সৃষ্টি করে।
কিছু ক্ষেত্রে, পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে বিতর্ক হয়েছে, যেমন – সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য কিছু লেখককে নির্বাচন না-নির্বাচন করা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

Leo Tolstoy (1828-1910)


নোবেলবঞ্চিত মহান লেখক বা বড় সাহিত্যিকের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে লিও টলস্টয়ের নাম। ১৯০১ সালে প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন লিও টলস্টয়। কিন্তু বিচারকরা তার নৈরাজ্যবাদ ও অদ্ভুত ধর্মীয় মতাদর্শের কারণে পুরস্কারের জন্য অযোগ্য মনে করেন। ১৯০২ সালে আবার মনোনীত হন। সেবারও প্রত্যাখ্যাত হন। অবশ্য তিনি মন্তব্য করেন, ‘টাকা-পয়সার লেনদেন একটা কঠিন ব্যাপার। পুরস্কার না পেয়ে ভালো হয়েছে। এটা কেমনে খরচ করতাম?…’ টলস্টয় কিছু মনে না করলেও, তার নাম সেখানে না থাকায় নোবেল পুরস্কারকে একটু দীন মনে হয়। ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’, ‘আনা কারেনিনা’ বিশ্বসাহিত্যের সেরা দুটি উপন্যাস। যেকোনো একটিই পুরস্কার জেতার জন্য যথেষ্ট ছিল। না পাওয়ার পেছনে যেসব কারণ বলা হয় তার একটি হচ্ছে, তার লেখা আদর্শবাদী ছিল না, ছিল বাস্তববাদী। আরেকটি কারণ এবং সবচেয়ে জোরালো কারণ হতে পারে সেটা রাশিয়া ও সুইডেনের মধ্যকার অনেক পুরনো দ্বন্দ্ব।

Henrik Johan Ibsen (1828 – 1906)

জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক এমিল জোলার নাম প্রথম দু’বছরই (১৯০১ এবং ১৯০২) সুইডিস অ্যাকাডেমিতে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু প্রকৃতিবাদী (Naturalist) লেখক বলে তাঁর নাম দু’বারই প্রত্যাখ্যাত হয়। তিনি ১৯০২ সালে হঠাৎই মারা যান চিমনি থেকে নিঃসৃত কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়ায়। নোবেল পুরস্কার পান নি নরওয়ের বিশ্ববিখ্যাত নাট্যকার হেনরিক ইবসেনও যিনি শেক্সপিয়রের পর নাটকের জগতে যাদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত, তাদের মধ্যে অন্যতম। নরওয়ের সেরা লেখক ও আধুনিক নাট্যেতিহাসের অন্যতম নক্ষত্র ইবসেনের অন্যতম সৃষ্টি ‘এ ডলস হাউস’, ‘হেড্ডা গেবলার’, ‘পিলারস অব সোসাইটি’ প্রভৃতি। বাস্তববাদী নাট্যকার ইবসেনকে নোবেল না দেওয়ার পক্ষে যে যুক্তি দেখানো হয়, তার লেখা আদর্শবাদী নয়।

বিশ্বসাহিত্যের সেরা পাঁচজন ঔপন্যাসিকের অন্যতম জেমস জয়েসের নাম পুরস্কারের খাতায় না থাকায় নোবেল পুরস্কার নিজেই তার জৌলুশ হারিয়েছে। ‘ইউলিসিস’, ‘ফিনেগেনস ওয়েক’, ‘এ’ পোর্ট্রেট অব দ্য আর্টিস্ট আ্যজ এ ইয়াং ম্যান’ ও ছোটগল্প সংগ্রহ ‘দি ডাবলিনার্স’ আধুনিক ও উত্তরাধুনিক সাহিত্যের সংযোগ সড়ক স্বরূপ। নতুন ধারা ও নতুন বর্ণনা-রীতির (বিশেষ করে চৈতন্য প্রবাহ রীতি) নির্মাণে তিনি অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেন। খুব মজার ব্যাপার হলো জেমস জয়েস প্রভাবিত সাহিত্যিক স্যামুয়েল ব্যাকেট  ও সল বেলো নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। জয়েসকে নোবেল দিয়ে নোবেল কমিটি নিজেদের গৌরবান্বিত করতে পারত।

James Joice (1882-1941)

যেমন পান নি ৭ খণ্ডে রচিত মহাকাব্যিক উপন্যাস “In Search of Lost Time’ এর রচয়িতা মার্সেল প্রুস্ত্ এবং ‘The Castle, The Trial এবং বিখ্যাত গল্প ‘Metamorphosis’ এর লেখক ফ্রাঞ্জ কাফকা কিংবা ডুইনো এলিজিগুচ্ছ বা অর্ফিয়ুসের প্রতি সনেটের কবি রাইনের মারিয়া রিলকে। যেমন পান নি The Lighthouse, Mrs Dalloway খ্যাত ভার্জিনিয়া উলফ।
জানি না এদের বাদ দিয়ে আদৌ আধুনিক ধ্রুপদী সাহিত্যের পাঠ সম্ভব কিনা।

Robert Frost (1874-1963)


বিশ্বজোড়া খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় কবি রবার্ট ফ্রস্ট কেন নোবেল পেলেন না এটাও একটা দুর্বোধ্য বিষয়। কবিতার জন্য চারবার পুলিৎজার বিজয়ী এবং ৪০টিরও বেশি সম্মাননা ডক্টরেটধারীর (অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, প্রিন্সটন, হার্ভার্ডসহ প্রায় সব প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যুক্ত) নোবেল অপ্রাপ্তি একটু বেখাপ্পা দেখাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতা জোরজবরদস্তিতে প্রতিষ্ঠিত হলেও রবার্ট ফ্রস্ট বিশ্বজুড়ে পাঠকের মন জয় করেছেন তার অসাধারণ ও কালজয়ী কবিতার মাধ্যমে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রনায়ক সবার প্রিয় এ কবির একটা কবিতার লাইন ‘অ্যান্ড মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ’ সব কবিতা পাঠকের জানা। মৃত্যুর ২০ বছর আগেই চতুর্থবারের মতো পুলিৎজার জেতেন। নোবেল কমিটি কি ওই ২০ বছরেও তার নাম শোনেনি?

Vladimir Mayakovosky (1893-1930)


নোবেল পান নি Vladimir Mayakovosky (1893-1930), Guillaume Apollinaire (1880-1918), Sylvia Plath (1932- 1963), Jack Kerouac(1922- 1969), Federico Garcia Lorca (1898-1936)-র মতো প্রতিভাবান লেখকেরা। হতে পারে তাঁদের স্বল্পায়ু তাঁদের সৃষ্টির মূল্যায়নের পক্ষে অনুকূল ছিল না কিন্তু, Anna Akhmatova, Donald Hall, Allen Ginsberg, Max Jacob, Blaise Cendrars, Henry Michaux, Francis Ponge, Jacques Prevert, Rene Char, Leopold Sedar Senghor, Chinua Achebe, Milan Kundera বা Miroslav Holub এর মতো বিশ শতকের আলোড়ন সৃষ্টিকারী কবি সাহিত্যিকগণ? যে কোনো দীক্ষিত সাহিত্য অনুরাগীর বইয়ের তাকে যাঁদের উজ্জ্বল উপস্থিতিই কি প্রমাণ করে না তাঁদের কালোত্তর প্রতিভা?

জীবনানন্দের (তিনিও না পাওয়ার দলে!) জন্মবছর জন্ম নেওয়া ভ্লাদিমির নবোকভ রুশ ভাষায় কিছু কবিতা লিখলেও গত শতকের সেরা ১০০ ঔপন্যাসিকের সব তালিকাতেই তার নাম একেবারে ওপরের দিকেই থাকে। পান নি Of Human Bondage, The Moon and Sixpence, Cakes and Ale, The Razor’s Edge এর মতো বিশ্ববিখ্যাত ঔপন্যাসিক এবং ছোট গল্পকার W.Samerset Maugham, কিংবা T.S.Eliot এর সঙ্গে এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত আধুনিক কবিতার প্রবাদপুরুষ Ezra Pound । পান নি E.M.Forster যদিও রহস্যজনক কারণে ১৯৫৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পান Winston Churchill গোটা কয়েক জীবনীমূলক রচনা এবং বাগ্মীতার কারণে! ‘মন শুধু বলে, অসম্ভব এ অসম্ভব।’

এ ছাড়া আরও কয়েকজন সাহিত্যিকের নাম বলি, যাদের কপালে নোবেল না জুটলেও জুটেছে বিশ্বজোড়া মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান। আন্তন চেখহ্ব, মার্ক টোয়েন, ম্যাক্সিম গোর্কি, থমাস হার্ডি, জন আপডাইক, বের্টল্ট ব্রেখ্ট, অগুস্ত স্ট্রিন্ডবার্গ, জোসেফ কনরাড, ডি এইচ লরেন্স, হেনরি জেমস, হোর্হে লুই বোর্হেস, গ্ৰাহাম গ্ৰীন, Malgudi Days খ্যাত আর. কে. নারায়ণের নাম এই তালিকাটাকে কেবল দীর্ঘই করবে। এই প্রসঙ্গে The Life Divine এবং মহাকাব্য Savitri খ্যাত শ্রীঅরবিন্দের নামও দু দুবার মনোনীত হয়েছিল – ১৯৪৩ এ সাহিত্যের জন্য , ১৯৫০ সালে শান্তি পুরস্কারের জন্য , কিন্তু প্রত্যাখ্যাত হয়।(সম্ভবত নির্বাচকমণ্ডলীর পক্ষেও সেগুলি ছিল বোধের অতীত, এমন কি যে শান্তি অরবিন্দের কাঙ্ক্ষিত ছিল , সেও ছিল তাঁদের ধারণাতীত যদিও তিনি ইংরেজের চেয়েও বিশুদ্ধ ইংরেজিতেই লিখেছেন।) বিখ্যাত ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও উল্লেখ করতে হয় ,১৯৭১ সালে তাঁর নাম মনোনয়ন পেলেও ওই বছরই ওঁর প্রয়াণে সে সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। ইউরোপীয় ভাষায় লেখা হলে আমি নিশ্চিত সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’ নিঃসন্দেহে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত বইয়ের তালিকাকে সমৃদ্ধ করত। নোবেল পুরস্কার কমিটির বিরুদ্ধে অনেকগুলো সমালোচনার একটি হচ্ছে তারা ‘ইউরোসেন্ট্রিক’ বা ইউরোপকেন্দ্রিক। যাদের কথা বলা হলো নোবেল না হলেও তাদের কোনো ক্ষতি হয় না। তাদের গৌরবের কোনো ঘাটতি হয় না; বরং নোবেল পুরস্কারটাই গৌরবহীন , রিক্ত হয়ে পড়ে।


এতো গেল না-নোবেল প্রাপকদের আপাতধূসর কাহিনীর ইতিবৃত্ত। তা বলে নোবেল প্রাপকদের ইতিবৃত্ত যে কম গৌরবোজ্জ্বল তা কিন্তু নয়। দু’একটা ব্যতিক্রম ছাড়া প্রত্যেকেই স্ব স্ব দ্বীপ্তিতে ভাস্বর এবং সমকালীন সাহিত্যে তাঁদের ব্যাপক অবদান এবং মানব অস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্নগুলি সম্বন্ধে তাঁদের গভীর অন্বেষণ যা মানুষকে যেমন সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে ভাবতে শেখায় তেমনি দিকনির্দেশকের ভূমিকা সার্থকভাবে পালন করে। ১৯০১সাল থেকে আজ পর্যন্ত ১২২জন সাহিত্যিক নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন । তাঁদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য নামগুলির দিকে চোখ বোলালেই মাথা আপনি নত হয়ে আসে। কী গভীর, কী বৈচিত্র্যময়, কী যুগান্তকারী সৃজনশীলতা! এ কথা সত্যি যে তাঁদের সমগ্ৰ সৃষ্টি এমন কি একজন সর্বগ্ৰাসী পাঠকের পক্ষেও অনধিগম্য থেকে যায়। আমরা বড়জোর তাঁদের প্রতিনিধিত্বমূলক দু’একটি লেখার স্বাদ গ্ৰহণ করতে পারি , তাও ভাষান্তরে। ওঁদের সমগ্ৰ লেখার সঙ্গে পরিচিতি দূরের কথা, চোখের দেখাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাধারণ পাঠকের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাঁদের সৃষ্টির প্রাচুর্য এবং বিপুলতাই তাঁদের কাছে পৌঁছুনোর সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা, অথচ তাঁদের দু’একটা লেখা পড়েই তাঁদের শ্রেষ্ঠতা মেনে নিতে কোনোরকম দ্বিধা জন্মায় না। একবার তাঁদের নাম গুলির দিকে চোখ ফেরানো যাক :
Selma Lagerlöf, Maurice Maeterlinck, Rabindranath Tagore, Romain Rolland,
Knut Hamsun, Anatole France,
W. B. Yeats, G. B. Shaw, Henri Bergson ,
Thomas Mann, John Galsworthy,
Ivan A. Bunin, Luigi Pirandello,
Eugene O’Neil, Pearl Buck,
Gabriela Mistral, Hermann Hesse ,
André Gide, T.S. Eliot, William Faulkner,
Bertrand Russell, Pär Lagerkvist,
Ernest Hemingway, Juan Ramón Jiménez,
Albert Camus, Boris Pasternak (declined),
Salvatore Quasimodo, Saint-John Perse,
John Steinbeck, George Seferis,
Jean-Paul Sartre (declined), Mikhail A. Sholokhov,
Samuel Beckett, A. I. Solzhenitsyn,
Pablo Neruda, Eugenio Montale, Saul Bellow,
Czesław Miłosz, Gabriel García Márquez,
William Golding, Octavio Paz ,
Derek Walcott, Dario Fo, José Saramago,
Günter Grass, Toni Morrison, V. S. Naipaul,
J. M. Coetzee, Harold Pinter, Orhan Pamuk,
Doris Lessing, Tomas Tranströmer,
Bob Dylan, Kazuo Ishiguro,
Laszlo Krasznahorkai.

নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা :
বিজ্ঞানী লিনাস পাউলিং ১৯৫৪ সালে রসায়নে নোবেল পান এবং ১৯৬২ সালেও পান নোবেল শান্তি পুরস্কার। দুটি পুরষ্কারই তিনি এককভাবে কোনো অংশিদার ছাড়াই পেয়েছিলেন যা নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা।
জাঁ-পল সার্ত্র (১৯৬৪, সাহিত্য পুরস্কার):
তিনি এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তিনি মনে করতেন একজন লেখককে সরকারি স্বীকৃতি গ্রহণ করা উচিত নয়।
বলিস পস্তেরনাক তাঁর ডক্টর জিভাগো উপন্যাসের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেও অবশ্য রাষ্ট্রীয় চাপে পুরষ্কার নিতে যান নি ।
Lê-Dú’c-Tho (লে-দুক্-থ) নোবেল শান্তি পুরস্কার (১৯৭৩) আদর্শগত কারণে প্রত্যাখ্যান করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯১৩, নোবেল পুরস্কার) এবং বব ডিলান (২০১৬, নোবেল পুরস্কার) দুজনের কেউই পুরস্কার গ্রহণ করতে অনুষ্ঠানে যেতে পারেন নি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর নোবেল বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন ১৯২১ সালের ২৬ মে, স্টকহোমের সুইডিস অ্যাকাডেমিতে। বব ডিলানের বক্তৃতা অবশ্য অন্য একজন পাঠ করে দেন।পরে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি এই পুরস্কারকে যথাযথ মর্যাদায় স্বীকৃতি দেন। এই দুটি ব্যতিক্রমী ঘটনার একটা আশ্চর্য সমাপতন লক্ষ করা যায়: উভয়েই তাঁদের লেখা গীতিকবিতার মাধ্যমে সাহিত্যে অবদান রাখার জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন এবং দুজনেই ছিলেন অত্যন্ত উন্নত মানের সুরকার এবং গানের মাধ্যমে ঐতিহ্যের মধ্যে নতুন কাব্যিক অভিব্যক্তি তৈরী করে শুধু সমসাময়িক নয় ভবিষ্যত প্রজন্মের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। সে সুরের আগুন কখনো ছড়িয়ে যায় সবখানে, আবার কখনো সে হয়ে ওঠে সুরের সুরধুনী, তখন পাগল হাওয়া বয় ধেয়ে যেখানে আমাদের অস্তিত্বের সকল প্রশ্ন ধ্বনিত আর আমরা কান পেতে শুনি :
“The answer is blowin’ in the wind.
যার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রয় আঁধারের যত তারা।

তথ্যসূত্র :
১) রবিজীবনী (৬,৮) : প্রশান্তকুমার পাল
২) আনন্দবাজার.কম
৩) Rolland : Introduction to the French edition of Young India.
৪) Einstein’s letter to Gandhi on his 70th birthday.
৫)Bob Dylan : Blowin’ in the wind – lyric
৬)) অন্তর্জাল তথ্যভান্ডার।

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Swapan Kumar Upadhyay
Swapan Kumar Upadhyay
2 months ago

অনেক কিছু অজানা তথ্য জানতে পারলাম।
গভীর উপলব্ধি ও নতুন দৃষ্টিকোণ দিতে সাহায্য করেছে।

Somnath Dasgupta
Somnath Dasgupta
2 months ago

চমৎকার লিখেছেন। শুধু রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির কথা ছাড়াও আরও অনেক বিষয় লেখাটাতে ধরেছেন। রবীন্দ্রনাথের বিষয়ে ডি এল রায়ের নানা বিরূপ মন্তব্যের কিছু উল্লেখ আছে।পড়লে খারাপ লাগে।আপনার পরবর্তী লেখার অপেক্ষায় রইলাম।

Shibashis Bhattacharya
Shibashis Bhattacharya
2 months ago

এই লেখাটি খুব সহজভাবে দেখিয়ে দেয় যে প্রকৃত সাহিত্যিক মহত্ত্ব কোনো পুরস্কারের ওপর নির্ভর করে না, সময়ই তার আসল বিচারক। নোবেল যারা পেয়েছেন আর যারা পায়নি—দু’দলের কথাই মনে করিয়ে দিয়ে লেখাটি আমাদের ভাবতে শেখায় পুরস্কারের সীমাবদ্ধতা নিয়ে।

Last edited 2 months ago by Shibashis Bhattacharya
3
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x