
(পর্ব ১)
১৯০৭ সালের ৬ই মে ‘সন্ধ্যা’ পত্রিকায় একটি ঘোষণা দেখা গেল, যার মর্ম অনেকটা এ-রকমঃ-
“ইহা বড়ই আনন্দের বিষয় যে, একটি চমৎকার ধরনের বোমা তৈয়ার হইতেছে। ইহার নাম ‘কালীমায়ীর বোমা’। ইহা পরীক্ষা করিয়া দেখা হইতেছে এবং পরীক্ষা সফল হইলে ইহা প্রতি গৃহে রাখিতে হইবে। এই বোমা এতই হালকা যে, একজন লোক ইহা এক হাতে লইয়া চলিতে পারে, ইহাতে অগ্নিসংযোগ করিতে হয় না ও অল্প আয়াসেই ইহাকে ভূমিতে নিক্ষেপ করিলে বিকট শব্দে ইহা বিস্ফোরিত হয় ও ধরণীকে প্রকম্পিত করে। … প্রতি গৃহ হইতে একজন সন্তানের প্রয়োজন, যে ক্ষত্রিয় ধর্ম অনুশীলন করিবে। তাহারা কালীমায়ীর বোমা লইয়া ক্রীড়া করিবে। বোম্ কালী কলকাত্তাওয়ালী!”
এই নিবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘কালীমায়ীর বোমা’। পত্রিকাটির সম্পাদক স্বনামধন্য ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় জনপ্রিয় এই পত্রিকাটির মাধ্যমে জ্বালাময়ী ভাষায় উগ্র ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদ প্রচার করতেন। উদ্ধৃত অংশটির ভাষা অবশ্য ব্রহ্মবান্ধবের নিজস্ব নয়, কারণ মূল নিবন্ধটি আমরা দেখবার সুযোগ পাইনি। এটির যে সরকারি তর্জমা আলিপুর বোমার মামলার এগজিবিট হিসেবে উপস্থিত করা হয়, তা থেকে এখানে বাংলায় পুনরনুবাদ করা হয়েছে।

এই নিবন্ধটি যখন ‘সন্ধ্যা’য় ছাপা হচ্ছে, বাঙলাদেশে তখনও বোমার প্রাদুর্ভাব হয়নি। ১৯০৬ সালের আগস্ট মাসেই অরবিন্দ-বারীন্দ্রকুমার ঘোষ পরিচালিত (মুরারিপুকুর) গুপ্তসমিতির হেমচন্দ্র কানুনগো বোমা তৈরির কৃৎ-কৌশল শিক্ষা করতে ফ্রান্সে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাই আক্ষরিকভাবে বোমার আবির্ভাব না হলেও এই মন্তব্যের সমকালে বাঙলাদেশের গুপ্তবিপ্লবী সংগঠনগুলিতে বোমা তৈরির প্রস্তুতি তথা বন্দুক ও বিস্ফোরক-নির্ভর গুপ্তহত্যার কর্মকান্ড শুরু হয়ে গিয়েছিল।
১৯০৬ সালের মে মাসে পূর্ববঙ্গের ছোটলাট ফুলারকে হত্যার জন্য পিস্তল নিয়ে বারীন্দ্রকুমার ঘোষ দুই সঙ্গী সহ যাত্রা করেছিলেন, কিন্তু গুলি করার সুযোগ আর পান নি! ১৯০৭ সালের শেষ ভাগ থেকেই পুলিশের ওপর আক্রমণ, তাদের চর-হত্যা ইত্যাদির মাধ্যমে বাঙলাদেশে সহিংস কার্যকলাপ শুরু হয়ে গিয়েছিল। অক্টোবরে কলকাতায় জনতাকে নিগ্রহের জন্য এক পুলিশের হাত কেটে নেওয়া হয়। নভেম্বরে বাংলার লেঃ গভর্নর অ্যান্ড্রু ফ্রেজারকে হত্যার উদ্দেশ্যে অরবিন্দের গুপ্তসমিতির উল্লাসকর দত্ত নির্মিত মাইনের সাহায্যে চন্দনগর-মানকুন্ডু অঞ্চলের রেললাইনে দুবার চেষ্টা চালানো হয়, কিন্তু ফিউজের গণ্ডগোলে মাইনগুলি কাজ করেনি। শোনা যায়, এই দুটি প্রচেষ্টার একটি হয়েছিল কালীপূজার রাতে ও সেটাই ছিল ব্রহ্মবান্ধবের ‘কালীমায়ীর বোমা’ রচনার প্রেরণা। এর পর ডিসেম্বরে চাংড়িপোতায় রেলস্টেশনে স্বদেশী ডাকাতি হয়। সেদিনই মেদিনীপুরের নারায়ণগড়ে রেললাইনে মাইন পেতে ফ্রেজারের ট্রেন উড়িয়ে দেবার তৃতীয় চেষ্টা হয়, এবার মাইন যথাসময়ে বিস্ফোরিত হলেও সেই ফিউজের গোলমালেই ট্রেনের বিশেষ ক্ষতি হয়নি। এই ডিসেম্বরেই ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট অ্যালেনকে গোয়ালন্দে গুলি করে গুরুতর জখম করা হয়। এ-পর্যন্ত সত্যিকারের বোমার প্রয়োগ কোথাও হয়নি।
মুরারিপুকুর বিপ্লবসমিতির সদস্য উল্লাসকর দত্ত অবশ্য বোমা তৈরির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ১৯০৮ সালের জানুয়ারিতে তাঁর তৈরি বোমার কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে তিনি দেওঘরে যান বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ও সমিতির আরো তিন সদস্যকে নিয়ে। এদের অন্যতম প্রফুল্ল চক্রবর্তী সেখানকার দিঘিরিয়া পাহাড়ের এক নির্জন স্থানে বোমাটি ছুঁড়তে গিয়ে আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। বাংলার বোমাকাণ্ডের ইতিহাসে কার্যত তিনিই প্রথম শহীদ। এ বছরই মার্চ মাসে কুষ্টিয়ার পাদরি হিকেনবোথামকে চর সন্দেহে গুলি করা হয়।
বোমার যথার্থ প্রয়োগ শুরু হল হেম কানুনগো পারিস থেকে বিস্ফোরকবিদ্যা শিখে ফিরে আসার পর। প্রথম পর্যায়ে হেমচন্দ্র তৈরি করেছিলেন তিনটি বোমা। ১৯০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম বোমাটি একটি মোটা বইয়ের মধ্যে খাঁজ কেটে ঢুকিয়ে এটিকে মোড়কবন্দী করে কলকাতায় ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডের বাড়িতে পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি সেই মোড়কটি না খোলায় বিপ্লবীদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়নি। পরের মাসে কিংসফোর্ড বদলি হয়ে যান মজঃফরপুরে ও বই-বন্দি বোমাটিও তাঁর জিনিসপত্রের সঙ্গে সেখানে স্থানান্তরিত হয়, পরে যা পুলিশ উদ্ধার করেছিল। ১১ই এপ্রিল দ্বিতীয় বোমাটি ছোঁড়া হয়েছিল চন্দননগরের মেয়র তার্দিভালকে হত্যার জন্য, কিন্তু তিনি প্রাণে বেঁচে যান। অবশিষ্ট বোমাটি কিংসফোর্ডকে হত্যার জন্য ক্ষুদিরাম-প্রফুল্ল জুটিকে দেওয়া হয়েছিল।
বোমার আবির্ভাব ও বিস্ফোরণ
উপেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন মজঃফরপুরের এক প্রবীণ উকিল, শহরের উকিলদের এক আড্ডায় বসে ১৯০৮ সালের ৩০শে এপ্রিল এক অমাবস্যার রাতে প্রচণ্ড এক শব্দ শুনে চমকে উঠলেন। পরবর্তী কালে তিনি লিখেছেন, “অমন আওয়াজ আর শুনি নাই। কেহ বলিল, রেল স্টেশনে দুই এঞ্জিনে ঠোকাঠুকি হইয়া থাকিবে। কেহ বলিল, কোন বয়লার ফাটিয়া গিয়া থাকিবে।”
পরের দিন অর্থাৎ ১লা মে সকালে কাছারিতে এসে উপেন্দ্রনাথ যা শুনলেন, তার বর্ণনা – “শুনিলাম রাত্রে জজ কিংসফোর্ড সাহেবের গাড়িতে বোমা ফেলিয়া কাহারা পালাইয়া গিয়াছে, সে গাড়িতে ছিলেন আমাদেরই উকিল বন্ধু কেনেডি সাহেবের স্ত্রী ও কন্যা। …জজ-সাহেবের ও কেনেডি সাহেবের গাড়ি দেখিতে একই রকম ছিল। আততায়ীরা জজের গাড়ি নির্বাচন করিতে ভুল করিয়াছিল।”
১লা মে অর্থাৎ বোমা ছোঁড়ার পরের দিনের আরও ঘটনা উপেন্দ্রনাথের কলমে – “শোনা গেল, মজঃফরপুর হইতে ২৪ মাইল দূরে পুশা নামক স্টেশন হইতে একটি বাঙালি ছাত্রকে পুলিশ ধরিয়া আনিয়াছে। দৌড়িয়া স্টেশনে গিয়া শুনিলাম, পুলিশ ছাত্রটিকে লইয়া সোজা সাহেবদের ক্লাবের বাড়িতে গিয়াছে। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব তাহার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করিতেছেন।”
আজ আমরা জানি, এই কিশোরের নাম ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকির সঙ্গে যাকে অরবিন্দ ও বারীন্দ্রকুমার ঘোষ পরিচালিত গুপ্তসমিতির নেতারা পাঠিয়েছিলেন কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে। গোপনীয়তা রক্ষার তাগিদে ওই পরিচালকেরা কিংসফোর্ড হত্যার জন্য প্রফুল্লকে রংপুর এবং ক্ষুদিরামকে মেদিনীপুর থেকে আনিয়েছিলেন। এরা দুজন পরস্পরকে আগে থেকে চিনতেন না এবং নামও জানতেন না। সমিতির কর্তারা ক্ষুদিরামকে দুর্গাদাস ও প্রফুল্লকে দীনেশ নামে পরস্পরের কাছে পরিচায়িত করেছিলেন। এই গোপনীয়তার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে সমিতির অন্যতম নেতা হেমচন্দ্র কানুনগো পরে শ্লেষাক্ত ভাষায় লিখেছেন, মুরারিপুকুর সমিতির সদস্য প্রফুল্ল চাকীর সঙ্গী হবার জন্য অন্য এক দলের নেতার কাছে একজন ‘হত্যাকারী’ চাওয়া হলে সেই নেতা নির্বাচিত হত্যাকারীকে নিয়ে আসার পর হেমচন্দ্র যখন তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চান, তখন নাকি নেতাটি বিব্রত হয়ে বলেছিলেন যে, তাকে দু’দিনের ছুটি দিতে হবে, কারণ শত্রুনিধনে যাবার আগে “বীরসাজে তার ফটো তুলিয়ে, আত্মীয় বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে বিদায়ভোজে সম্মানিত করে তবে তাকে বিসর্জন দেওয়া হবে।” এই নির্বাচিত হত্যাকারী ক্ষুদিরামই ছিলেন কিনা, হেমচন্দ্র সেটা স্পষ্ট করে না বললেও আমাদের মনে হয়, তা অসম্ভব নাও হতে পারে, কারণ সত্যিই ক্ষুদিরামের মাথায় পাগড়ি ও কাঁধে একটি কুঠার নিয়ে তোলা ওই ধরনের একটি ছবি আমরা দেখতে পাই।
যাই হোক, শেষ পর্যন্ত কিংসফোর্ড বধের ভার পেয়ে প্রফুল্ল ও ক্ষুদিরাম যে ‘কৃতার্থ’ হয়ে গিয়েছিলেন সেকথাও হেমচন্দ্র লিখেছেন। [দ্রষ্টব্য ‘বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা’] চন্দননগরের বিপ্লবসমিতির মতিলাল রায় লিখেছেন, যাত্রার পূর্বে এই দুই যুবক অরবিন্দকে প্রণাম করে তার আশীর্বাদ নিয়ে যান। [‘আমার দেখা বিপ্লব ও বিপ্লবী’] ক্ষুদিরামের জীবনীতে অবশ্য উল্লেখ আছে, তিনি এর আগেও একবার মেদিনীপুরে অরবিন্দের আশীর্বাদ লাভ করেছিলেন। মজ:ফরপুর অভিযানের প্রস্তুতিপর্বের আরেকটি কাহিনীতে পাওয়া যায়, ক্ষুদিরাম যাত্রার আগে মেদিনীপুরে একজোড়া জুতো কিনেছিলেন। পরিচিতজনেরা জুতো কেনার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি নাকি বলেছিলেন, শিগগিরই তিনি বিয়ে করতে যাবেন বলেই এই নতুন জুতোর প্রয়োজন।
‘জজ সাহেবকে মারতে গিয়ে’
মজঃফরপুরে কিংসফোর্ডের গাড়ি ভেবে অন্য একটি গাড়িতে বোমা নিক্ষেপ করে দুই বাঙালি বিপ্লবী বাংলাদেশে তথা ভারতে বোমার রাজনীতির যে প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন, দুর্ভাগ্যবশত তার ফলে মারা গিয়েছিলেন স্বদেশী আন্দোলন সম্পর্কে সহানুভূতিশীল ইংরেজ ব্যারিস্টার প্রিঙলে কেনেডির স্ত্রী ও কন্যা।
পুলিশের কাছে ক্ষুদিরামের জবানবন্দি অনুযায়ী প্রফুল্ল চাকীর সঙ্গে এক ধর্মশালায় কিংসফোর্ড হত্যার সুযোগের অপেক্ষায় পাঁচ ছ’দিন অপেক্ষায় থাকার সময় কয়েকদিন তাঁরা কিংসফোর্ডের বাংলো দেখে আসেন আর ক্ষুদিরাম একবার এজলাসে গিয়েও তাঁকে দেখে আসেন। সঞ্জীবনী পত্রিকায় ক্ষুদিরামের এই জবানবন্দীর যে অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল [৭-৫-১৯০৮], তা থেকে কিছু অংশ :-
“আমরা সর্বদা মিঃ কিংসফোর্ডের খবর লইতাম। আমরা দেখিলাম মিঃ কিংসফোর্ড কুঠি হইতে কয়েক গজ দূরবর্তী ক্লাব ব্যতীত আর কোথাও যান না। একদিন কাছারীতে দেখিলাম তিনি সেসনের বিচার করিতেছেন। একবার মনে হইল, তখনই বোমা নিক্ষেপ করিয়া তাঁহাকে সংহার করি। কিন্তু পরক্ষণে যখন মনে হইল, অনেক নির্দোষের মৃত্যু হইবে তখন ক্ষান্ত হইলাম। ৩০শে এপ্রিল কিংসফোর্ডের গাড়ি যখন ক্লাব হইতে ফিরিয়া আসিবে তাহার প্রতীক্ষায় ছিলাম।”
এই প্রতীক্ষার পরবর্তী কাহিনীর সারাংশ আমরা উপস্থিত করছি ক্ষুদিরামের সেই মূল বিবৃতি থেকে অনুবাদের মাধ্যমেঃ- “আমি টিনের বাক্সসুদ্ধ বোমাটা নিয়ে গিয়েছিলাম। গতরাত্রিতে সুযোগ পাওয়া গেল, তখুনি বোমা ছুঁড়লাম। আমি ও দীনেশ গাছের নীচে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দেখলাম গাড়িটা ক্লাব থেকে আসছে। ভাবলাম, এটা নিশ্চয় কিংসফোর্ডের গাড়ি। তাই আমি বোমাটা ছুঁড়ে মারলাম। এখন বুঝতে পারছি, ভুল করে ফেলেছিলাম।…তখন বেশ অন্ধকার।…আমি প্রথমে বোমা ছোঁড়ার জন্য ছুটে গেলাম। দীনেশ যে আমার পেছনে কীভাবে এল, তা খেয়াল করিনি। দীনেশের কাছে একটা রিভলবার ছিল, সেটা তার হাতে ছিল কিনা লক্ষ করিনি।… যখন আমরা দৌড়ে ধর্মশালার কাছে এলাম তখন এক কনস্টেবল আমাদের ডাকল। আমরা সেদিকে না তাকিয়ে দৌড়তে লাগলাম। বোমাটি যদিও দীনেশের ছিল, আমিই সেটি ছুঁড়েছিলাম, কারণ ছোঁড়ার ইচ্ছে আমারই বেশি ছিল।”- এই বিবৃতি থেকে বোঝা যাচ্ছে, সঙ্গী প্রফুল্ল চাকিকে, যিনি ধরা পড়েছেন বলে ক্ষুদিরাম তখনও জানেন না, তিনি বাঁচাবার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।

নিচে : (১) রেল স্টেশনে পুলিশের মুখোমুখি প্রফুল্ল চাকী (২) বিহারের পুশা রেল স্টেশনে প্রফুল্ল চাকীকে ঘিরে পুলিশবাহিনী (৩) চলচ্চিত্রে প্রফুল্ল চাকীর চরিত্রাভিনেতা
বোমানিক্ষেপের পর ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্লের একসঙ্গে পালাবার পরের কাহিনির জন্য আমরা আবার সাহায্য নেব উপেন্দ্রনাথ সেনের বিবরণীটির। ক্ষুদিরামের থেকে তিনি শুনেছিলেন যে, বোমা ছোঁড়ার পর তাঁরা দু’জন রেলের রাস্তা ধরে ৩২ মাইল দূরে সমস্তিপুরের দিকে যান। সকালবেলা লুকিয়ে থাকেন পুশা স্টেশনের কাছে এক নির্জন আমবাগানে। রাতেই সব স্টেশনে সাদা পোশাকে পুলিশের লোক পাঠানো হয়েছিল। এর পরের ঘটনা উপেন্দ্রনাথের ভাষায় :- “ক্ষুধায় কাতর হইয়া প্রফুল্ল ক্ষুদিরামকে পাঠাইয়াছিল স্টেশন সংলগ্ন দোকান হইতে মুড়ি আনিবার জন্য। ক্ষুদিরাম হিন্দি বলিতে পারিত না। মুদীর দোকানে গিয়া বলিল, মুড়ি দে। বলিতেই পাশে দাঁড়ানো কনস্টেবল তাহাকে গ্রেপ্তার করিল। ক্ষুদিরাম আমাদের বলিয়াছিল যে, ধৃত হইবার পর সে কি একটা চীৎকার করিয়াছিল, উদ্দেশ্য – প্রফুল্ল আসিয়া তাহাকে উদ্ধার করিবে। কেন না সে নিজে পিস্তল চালাইতে জানিত না, যদিও সঙ্গে বেশ বড় একটা পিস্তল ছিল। কিন্তু প্রফুল্ল আসিল না। ক্ষুদিরাম বলিয়াছিল, প্রফুল্লের আসা উচিত ছিল, আসিলে আমরা উভয়েই পলাইতে পারিতাম। প্রফুল্ল রিভলবার চালনায় সিদ্ধহস্ত ছিল। কনস্টেবল কি অন্য লোকদের তাড়ানো তাহার পক্ষে কষ্টসাধ্য ছিল না।” – ক্ষুদিরাম ধরা পড়েছিলেন ওয়াইনি স্টেশনের কাছে।
প্রফুল্ল চাকি – ক্ষুদিরামের অগ্রগামী শহিদ
পরদিন, অর্থাৎ ১লা মে এই অপর বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকি সারারাত হেঁটে যখন সমস্তিপুরে পৌঁছন, তখন বোমা-কাণ্ডের খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। দুপুরের কাছাকাছি সমস্তিপুরে প্রফুল্ল ত্রিগুণা ঘোষ নামে এক রেলকর্মচারীর বাড়িতে আশ্রয় নেন। এই বাঙালি বাবুটি তাঁকে স্নানাহার করিয়ে ও নতুন জামা জুতো কিনে দিয়ে কলকাতার টিকিট কেটে ট্রেনে উঠিয়ে দেন। সংযোগবশত ট্রেনের ঐ কামরাতেই যাচ্ছিলেন পূর্বকথিত সিংভূম পুলিশের দারোগা নন্দলাল ব্যানার্জি। এই লোকটি সন্দেহবশত প্রফুল্লের সঙ্গে ভাব জমিয়ে তার বিশ্বাস উৎপাদন করে। কোনো কোনো বিবরণ অনুযায়ী প্রফুল্ল মোকামঘাট স্টেশনে নেমে হাওড়ার টিকিট কাটেন। রেলযাত্রায় প্রফুল্লর সহযাত্রী ও সমস্তিপুরের বাঙালি অধিবাসীদের থেকে শুনে উপেন্দ্রনাথ তাঁর সম্পর্কে যা লিপিবদ্ধ করেছেন, তা থেকে এই সংবাদগুলি জানা যায়।
যা-ই হোক, এই মোকামাতেই ট্রেন বদলের সুযোগে নন্দলাল তারবার্তা মারফত প্রফুল্লকে গ্রেপ্তারের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটর অনুমতি সংগ্রহ করে কিছু পুলিশ কর্মচারী নিয়ে ফিরে আসে। উপেন্দ্রনাথ লিখেছেন, “নন্দলাল কোথায় যেন গা ঢাকা দিল। একটু পরে পাঁচটি কনস্টেবল লইয়া আসিয়া প্রফুল্লকে বলিল, আমি তোমাকে গ্রেপ্তার করিতেছি। ক্রুদ্ধ সিংহের মত গর্জন করিয়া উঠিল প্রফুল্ল, ‘তুমি বাঙালি হইয়া গ্রেপ্তার করিতে চাও আমাকে! আচ্ছা, তবে এই নাও দণ্ড।” বলিয়া রিভলবার ছুঁড়িল। নন্দলালের আরও কয়েকমাস আয়ু ছিল, তাই মাথা নীচু করিয়া এ যাত্রা রক্ষা পাইল। তখন পুলিশ উহাকে ঘিরিয়া ফেলিলে প্রফুল্ল একবার নিজের কপালে আর একবার বুকে গুলি করিয়া প্লাটফর্মে পড়িয়া গেল।”
এই লড়াইয়ের আর একটি বিবরণ আমরা পেয়েছি পুলকেশ দে সরকারের একটি লেখাতে, যা থেকে শর্মা নামে মজঃফরপুরের এক সাব ইনস্পেক্টরের বিবৃতি আমরা এখানে তুলে দিচ্ছি :- “নন্দলাল ঐ বাঙালি যুবকটিকে বলল, ‘আমি তোমাকে সন্দেহ করি, তোমাকে গ্রেপ্তার করলাম। বলতেই যুবকটি ডাউন প্লাটফর্ম বরাবর পশ্চিম দিকে ছুটল। আমি ও আমার কনস্টেবল শিউশঙ্কর তার পিছু ধাওয়া করলাম, শিউশঙ্কর তাকে ধরেও ফেলল এবং হাতের মোটা লাঠিটা দিয়ে তার কাঁধে বাড়িও মারল। একটা গুলির শব্দ শুনলাম, চেয়ে দেখি বাঙালিটির হাতে পিস্তল। জমির আমেদ (আর এক কনস্টেবল) পেছন থকে যুবকটিকে ধরল, শিউশঙ্করও জড়িয়ে ধরল। সেই অবস্থাতেই সে ঘন ঘন দুটি গুলি ছুঁড়ল। যুবকটি মারা গেল।” (এ ব্যাপারটি নিয়ে অবশ্য কিছুটা দ্বিমত আছে। কারও কারও মতে পুলিশরাই প্রফুল্লকে হত্যা করে সেটিকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়)। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, পরে এই দুই কনস্টেবলও ইনস্পেক্টর নন্দলালের সঙ্গে পুরস্কৃত হয়েছিল প্রফুল্লকে ধরার উদ্যোগের জন্য।

এর পর মোকামাঘাট স্টেশনে একবার আর বরৌনি জংশনে আর একবার প্রফুল্লের মৃতদেহের ছবি তোলা হয়। সে ছবি পরে পেশ করা হয় ক্ষুদিরামের মামলায়, বগুড়ায় প্রফুল্লের বাড়িতেও পাঠানো হয় শনাক্ত করার জন্য। উপেন্দ্রনাথ সেন লিখেছেন, “বাংলার এই প্রথম বীর পুণ্যতোয়া গঙ্গার তীরে দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করিল। পুলিশ মৃত প্রফুল্লর ফোটো তুলিয়া লইল। শুনিয়াছি, ক্ষুদিরামকে দিয়া সনাক্ত করিবার অভিপ্রায়ে তাহার ছিন্নমুণ্ড মজঃফরপুরে লইয়া আসিয়াছিল। বিচারকালে প্রফুল্লর সেই অবস্থার ফোটো আমি দেখিয়াছি। কপালের ঊর্ধ্ব দিকে একটি ও বুকের উপর দিকে একটি গুলি প্রবেশের চিহ্ন পরিষ্কার দেখা যাইতেছিল। এখনও বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই যে, কি অমিতবীর্য ও মনের বল থাকিলে মানুষ নিজের শরীরে দুইবার গুলি লাগাইতে পারে! কি প্রশস্ত নিটোল ললাট ছিল প্রফুল্লর। আর বক্ষদেশ কি উন্নত ও বিস্তৃত! বাঙালী হইয়া এই প্রথম দেখিলাম বাঙালী বীরের প্রকৃত মূর্তি।” দীঘারিয়ার পাহাড়ে প্রফুল্ল চক্রবর্তীর আত্মদানের পর তিনি দ্বিতীয় এবং ব্রিটিশ নিধনপ্রচেষ্টায় তিনিই বাঙলার প্রথম শহিদ।
সেই আশ্চর্য কিশোর – আদালতের কাঠগড়ায়
২রা মে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উডম্যান নিজের এজলাসে শহরের উকিলদের ডেকে পাঠালেন। এজলাসে উপস্থিত হয়ে তাঁরা কী দেখলেন, তার বর্ণনা শোনা যাক উপেন্দ্রনাথের নিজের ভাষায় :-
“দেখি কাঠগড়ায় দাঁড়াইয়া রহিয়াছে একটি ১৫/১৬ বছরের প্রিয়দর্শন বালক। এতগুলি বাঙালি উকিল দেখিয়া ছেলেটি মৃদু মৃদু হাসিতেছে। কি সুন্দর চেহারা ছেলেটির! রঙ শ্যামবর্ণ, কিন্তু মুখখানি এমনই চিত্তাকর্ষক যে, দেখিলেই স্নেহ করিতে ইচ্ছা হয়। কাঠগড়ার একদিকে পুলিশ কলার পাতায় কিছু মিষ্টান্ন ও এক ঘটি জল এবং গেলাস রাখিয়া গেল। ছেলেটি তাহা স্পর্শও করিল না।”

ম্যাজিস্ট্রেট উডম্যানের কাছে দেওয়া ক্ষুদিরামের জবানবন্দি এজলাসে পাঠ করে শোনানো হয়। উপেন্দ্রনাথের এই লেখা থেকে বোঝা যায়, ক্ষুদিরাম তাঁর ঐ বিবৃতিতে কলকাতার গুপ্তসমিতির নেতাদের কারো নাম বলেন নি ও শেষ পর্যন্ত তাঁদের বাঁচানোর চেষ্টাই করেছিলেন। (যদিও দুর্ভাগ্যবশত কলকাতাবাসী সেই হিসেবী নেতারা নিজেদের বাঁচাতে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, দূরদেশে দুর্দশাগ্রস্ত ক্ষুদিরামের ব্যাপারে মাথা ঘামানো তাঁরা প্রয়োজন মনে করেন নি!)
৮ই জুন পুলিশ পাহারায় বন্দী ক্ষুদিরামকে আদালতে নিয়ে আসা হয়। উকিলেরা অন্যরকম পরামর্শ দিলেও তিনি আদালতে অপরাধ স্বীকার করেন। ১১ ই জুন আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেন প্রফুল্ল চাকীকে প্রতারণাকারী কুখ্যাত সেই পুলিশ দারোগা নন্দলাল ব্যানার্জি। এদিন উকিলের প্রশ্নের উত্তরে ক্ষুদিরাম জানান, তাঁর কোন দুঃখ নেই। তাঁর মনে ভয় আছে কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “কেন ভয় করব, আমি কি গীতা পড়িনি !”
এই মামলায় শেখানো সাক্ষীদের দিয়ে সম্ভব অসম্ভব নানা কথা বলিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এদের সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিচারকও কোন প্রশ্ন তোলেন নি! আবার ফীটনের সহিস বিস্ফোরণের আগে একজনকে শুধু বোমা ছুঁড়তে দেখেছিল, কিন্তু তার মুখ দেখতে পায়নি বললেও তার এই সাক্ষ্যকে কোনও গুরুত্বই দেওয়া হয়নি! অন্য সব সাজানো সাক্ষ্য বিবেচনা করে বিচারক বার্থউড ক্ষুদিরামকে দায়রা বিচারের জন্য আদালতে সোপর্দ করেন। তাঁর এজলাসে বিচার চলাকালীন উপেন্দ্রনাথের উল্লিখিত আর একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য – “বিচার শেষ হইলে নীলকুঠির একটি সাহেব তাঁহার পাশে উপবিষ্ট এক বাঙালি যুবককে প্রশ্ন করেন, “Are you a Bengali youth?” যুবকটি বলিল, “Yes”। সাহেব বলিলেন, “Try to follow the footsteps of your brother.” এই কাহিনী যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে বলতে হবে সব ইংরেজের চিন্তাধারাই তাদের শাসক জাতভাইদের মতো ছিল না।
১৩ই জুন সরকারপক্ষের উকিল ম্যানুক এক দীর্ঘ বক্তৃতায় বাঙালিদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে ‘বিশাল ষড়যন্ত্রের’ পটভূমি বর্ণনা করেন ও বয়সের দোহাই দিয়ে অপরাধীর সাজা যেন হ্রাস না করা হয়, এই সুপারিশ করেন। এর পর ক্ষুদিরামের হয়ে তাঁর প্রধান উকিল কালিদাস বসু বলেন যে, সঙ্গীকে বাঁচাবার জন্য ক্ষুদিরাম নিজের ওপর হত্যার দায় নিয়ে যে-স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন, তা তাঁকে প্রত্যাহার করার সুযোগ দেওয়া উচিত। কেউ তাঁকে হত্যা করতে স্বচক্ষে দেখেনি। তা ছাড়া অভিযুক্তের বয়স বিবেচনা করে তার শাস্তি নির্ধারণ করা উচিত। এরপর জজ কর্নডাফ তাঁর বক্তৃতায় ক্ষুদিরামকে দোষী সাব্যস্ত করেন।
এই রায় শুনে আসামি পক্ষের উকিল কালিদাস বসু সন্দেহের অবকাশ থাকায় [বেনিফিট অফ ডাউট] আবার ক্ষুদিরামের জন্য লঘু দণ্ডের আবেদন করেন। ক্ষুদিরামকে নির্দোষ বলে দাবি করে তিনি ন্যায়বিচারের স্বার্থে অভিযুক্ত বালকটিকে তার স্বীকারোক্তি প্রত্যাহারের সুযোগ দিয়ে মামলাটি নতুনভাবে বিচার করার প্রার্থনা জানান। এসব যুক্তিতে জুরিরা স্বভাবতই কর্ণপাত করেননি। বিচারক কর্ণডাফ তাঁর রায়ে জানান যে, তিনি ক্ষুদিরামকে হত্যাপরাধে দোষী সাব্যাস্ত করে প্রাণদণ্ড দিচ্ছেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপীল করবার জন্য ক্ষুদিরামকে সাতদিন সময় দেওয়া হয়।
ক্ষুদিরাম কিন্তু তাঁর রায় শুনে অবিচলিত ছিলেন, কারো মতে ‘মৃদু মৃদু’ হাসছিলেন। এ-বিষয়ে ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকায় ১৮ই জুন যা লেখা হয়েছিল, তার কিছুটা এ-রকমঃ-
“একেবারে নির্বিকার ভাবে ক্ষুদিরাম দণ্ডাজ্ঞা শুনিলেন। … মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞার পর ক্ষুদিরামকে সম্পূর্ণ অবিচলিত দেখিয়া এবং তাহার নির্বিকার ভাব লক্ষ করিয়া বিদেশী রাজার স্বজাতীয় বিচারকের মনে সম্ভবত এইরূপ ধারণা জন্মিয়াছিল যে, আসামীর প্রতি যে চরম দণ্ড হইয়াছে তাহা সে বুঝিতে পারে নাই। এই ধারণার বশবর্তী হইয়া ফাঁসির হুকুমের পর জজ ক্ষুদিরামকে জিজ্ঞাসা করিলেন :- ‘তোমার প্রতি যে দণ্ডের আদেশ হইল তাহা বুঝিতে পারিয়াছ?’ ক্ষুদিরাম হাস্যমুখে মাথা নাড়িয়া জানাইল, ‘হ্যাঁ, বুঝিয়াছি।’ …” প্রাণদণ্ডের আদেশ শোনার পর ক্ষুদিরামের প্রতিক্রিয়ার যে বিবরণ উপেন্দ্রনাথ সেন দিয়েছেন, তা অবশ্য একটু অন্যরকম। দীর্ঘদিন পরে লিপিবদ্ধ তাঁর স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন, “আদেশ শুনিয়া ক্ষুদিরাম জজকে বলিল, একটা কাগজ পেন্সিল দিন, আমি বোমার চেহারা আঁকিয়া দেখাই। অনেকের ধারণা নাই ও বস্তুটি কি রকম দেখিতে। জজ ক্ষুদিরামের এ অনুরোধ রক্ষা করিলেন না।”
এর পর ক্ষুদিরামের দিদি অপরূপা দেবী ও উকিল কালিদাস বসুর চেষ্টায় কলকাতা হাইকোর্টে আপীল করা হয়। এই মামলার শুনানি হয় ৮ই ও ৯ই জুলাই। ক্ষুদিরামের পক্ষে নরেন্দ্রনাথ বসু সওয়াল করেন। উপেন্দ্রনাথের স্মৃতিকথা অনুযায়ী এই আপীলের প্রস্তাব ক্ষুদিরামের পছন্দ ছিলনা :- “জেলে তাহাকে এ প্রস্তাব করিতেই সে অসম্মতি জানাইল, বলিল, চিরজীবন জেলে থাকার চাইতে মৃত্যু ভাল। কালিদাসবাবু বুঝাইলেন, ‘দেশে এমন একটি ঘটনা হয়তো ঘটিতে পারে যে, তোমায় বেশিদিন জেলে থাকিতে নাও হইতে পারে।‘ অবশেষে সে সম্মত হইল। কলিকাতা হাইকোর্টের আপীলে প্রবীণ উকিল শ্রীযুক্ত নরেন্দ্রনাথ বসু ক্ষুদিরামের হইয়া খুব হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতা দিলেন। কিন্তু ফাঁসির হুকুম বহালই রহিল।”

“হাসি হাসি পড়ব ফাঁসি …”
প্রথমে ২১শে জুলাই ফাঁসির দিন ধার্য হয়েছিল। ক্ষুদিরামকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি তাঁর যে-সব শেষ ইচ্ছার কথা জানান, সেগুলি হলঃ- হবিবপুরের চতুর্ভুজা কালীর চরণামৃত পান, দিদি ও ভাগ্নে-ভাগ্নিদের দেখা, একবার শেষবারের মতো মেদিনীপুর শহর দেখা ও ভাগ্নির বিয়ে হয়েছে কিনা জানা। তাঁর এই সব ইচ্ছাগুলির প্রায় কোনটিই পূরণ হয়নি। পরে ফাঁসির দিন ঠিক হয় ১১ই আগস্ট। তার আগের দিনের বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে ১২ই আগস্টের ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকায়ঃ- “কালিদাসবাবু সেইদিন ক্ষুদিরামের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন। তিনি দেখিলেন, পীড়াবশত ক্ষুদিরাম কৃশ ও বিবর্ণ হইয়া গিয়াছে, কিন্তু তাহার আত্মা বিন্দুমাত্র ম্লান হয় নাই। রাত্রি প্রভাতে তাহার প্রাণদণ্ড হইবে, তবু তাহার প্রফুল্লতার খর্বতা হয় নাই। ক্ষুদিরাম কালিদাসবাবুকে দেখিয়া হৃষ্টচিত্তে বলিল, ‘পুরাকালে রাজপুত রমণীরা যেমন নির্ভয়ে অগ্নিকুণ্ডে ঝম্প প্রদানপূর্বক প্রাণত্যাগ করিতেন, আমিও সেইরূপ নির্ভয় চিত্তে প্রাণদান করিব।’ …“
১১ই আগস্ট মঙ্গলবার ভোর পাঁচটার সময় উপেন্দ্রনাথ জেলের প্রবেশপথে এসে দেখেন চারিদিকে তখন জনারণ্য, বহু লোক ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর বিবরণীতে সেই ঐতিহাসিক আত্মদানের বর্ণনাঃ- “আমরা জেলের আঙিনায় প্রবেশ করিলাম। দেখিলাম ডানদিকে একটু দূরে প্রায় পনেরো ফুট উঁচুতে ফাঁসির মঞ্চ। …একটু অগ্রসর হইতে দেখিলাম ক্ষুদিরামকে লইয়া আসিতেছে চারজন পুলিশের লোক। কথাটা ঠিক বলা হইল না। ক্ষুদিরামই আগে দ্রুতপদে অগ্রসর হইয়া যেন সিপাহীদের টানিয়া আনিতেছে। আমাদের দেখিয়া একটু হাসিল। স্নান সমাপন করিয়া আসিয়াছিল। শেষে শুনিয়াছি, খুব প্রত্যূষে স্নান সমাপন করিয়া কারাবাসকালীন বর্ধিত চুলগুলি আঙুল দিয়া বিন্যস্ত করিয়া নিকটবর্তী দেবমন্দির হইতে প্রহরী কর্তৃক সংগৃহীত চরণামৃত পান করিয়া আসিয়াছিল।
“ক্ষুদিরাম আমাদের দিকে আর একটিবার চাহিল। তারপর দৃঢ় পদক্ষেপে মঞ্চের দিকে অগ্রসর হইয়া গেল। মঞ্চে উপস্থিত হইলে তাহার হাত দুইখানি পিছনে আনিয়া রজ্জুবদ্ধ করা হইল। একটি সবুজ রঙের পাতলা টুপি দিয়া গ্রীবামূল অবধি ঢাকিয়া দিয়া গলায় ফাঁসি লাগাইয়া দেওয়া হইল।”
ফাঁসিমঞ্চে বাঙালির প্রথম শহিদের প্রাণবলিদানের এই হচ্ছে একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ বাঙালি সাংবাদিকের কলমে। ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকায় ফাঁসির পরের দিন লেখা হয় :- “প্রত্যূষে বহুসংখ্যক পুলিশ বেষ্টিত হইয়া ক্ষুদিরাম বধ্যস্থানাভিমুখে রওনা হইল। তাহার দুই হস্ত পশ্চাদ্দিকে শৃঙ্খলাবদ্ধ, তাহার চক্ষু বস্ত্রাবৃত, ক্ষুদিরাম হাস্যমুখে প্রফুল্লচিত্তে বধ্যমঞ্চে আরোহন করিল। কিন্তু একটি কথাও কাহাকে কহিল না। নীরবে বীরপুরুষের ন্যায় মঞ্চোপরি দন্ডায়মান হইল। … জল্লাদ ক্ষুদিরামের কন্ঠে ফাঁস পড়াইয়া দিল। কারাধ্যক্ষ ফাঁসির হুকুম পাঠ করিলেন। ইঙ্গিতমাত্র মঞ্চ অপসারিত হইল- ক্ষুদিরামের দেহযষ্টি পলকে ভূপৃষ্ঠাভিমুখে পতিত হইয়া ঝুলিতে লাগিল। নিমেষে তাহার প্রাণবায়ু বহির্গত হইল।” ১২ই আগস্ট প্রকাশিত ‘দি এম্পায়ার’ কাগজের সংবাদের অংশঃ- “Khudiram Bose was executed this morning. …It is alleged that he mounted the scaffold with body erect. He was cheerful and smiling.”
পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়


তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। অনেক কিছুই জানা ছিল না। লেখক তথ্যসহ সুন্দর বিবরণ দিয়েছে। পরবর্তীর অপেক্ষায়।
এই অদ্বীতিয স্বাধীনতা সংগ্রামী কে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা.ও প্রণাম।
স্বাধীনতার শহীদদের নিয়ে অধিকাংশ লেখাই আবেগবাহুল্য দোষে দুষ্ট। এই লেখাটি সেদিক থেকে ব্যতিক্রমী।
স্বাধীনতার শহীদদের নিয়ে অধিকাংশ লেখাই আবেগবাহুল্য দোষে দুষ্ট। এই লেখাটি সেদিক থেকে ব্যতিক্রমী।