শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

আমার সুভাষচন্দ্র:  কৈশোর ও যৌবনস্মৃতির অনুবর্তন

(তৃতীয় পর্ব)

আমার উত্তর-কৈশোর ও প্রাক-যৌবনকালে পড়া আরও কয়েকটি সুভাষবিষয়ক বইয়ের নাম এখানে মনে পড়ছে। যখন স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ি, তখন আমাদের দুজন আত্মীয়ের সংগৃহীত দুটি মূল্যবান বই পড়ার সুযোপেয়েছিলাম। এ দু’টি হচ্ছে সুভাষচন্দ্রের সহকর্মী কবি সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়ের ‘সুভাষচন্দ্র ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র’ আর আজাদ হিন্দ ফৌজের অন্যতম সেনানায়ক শাহনওয়াজ খান রচিত ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ ও নেতাজি‘ (ইংরেজি থেকে অনূদিত)। এই দু’টিই ছিল স্মৃতিচারণভিত্তিক বই এবং এ দুটি বইয়ের অনেক ছবিরই আমি হাতে এঁকে বা ট্রেসিং পেপারের সাহায্যে ছাপ তুলে অনুকৃতি করে রেখেছিলাম।

নরেন্দ্রপুরে কলেজের ও আশ্রমের লাইব্রেরীতে আমার পড়া বইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য শিশিরকুমার দাসের “মহানায়ক সুভাষচন্দ্র’ ও নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের ‘সুভাষচন্দ্র‘। কলেজে থাকতেই নেতাজি ভবনে নেতাজি জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে গিয়ে ১৯৭০ সালে সংগ্রহ করেছিলাম পুস্তিকা আকারে ছাপা বনফুলের একটি বক্তৃতা ‘সত্যনিষ্ঠায় অনন্য নেতাজী-চরিত্র’। লেখকের অন্তর্দৃষ্টির আলোকে সুভাষচরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলির আলোচনার পর এই ভাষণটির শেষে ছিল তাঁরই রচিত একটি মনোজ্ঞ কবিতা! তার শেষাংশটি ছিল এরকম :- “…তমিস্রা বিদীর্ণ করি নিত্য জাগে আলোকের রেখা/ তার মাঝে পাই তব দেখা/ যে প্রেরণা যুগে যুগে উত্তরিবে সুদুর্গম পথ/ বীর্যবলে পার হবে অরণ্যানী সমুদ্র পর্বত/ তুমি সে প্রেরণা/ যে বাণীর তূর্যনাদে ধিক্কৃত হইবে পাপী, সমনস্ক হবে অন্যমনা/ তুমিই সে বাণী/ তারই মাঝে, হে অমর, আছো তুমি, আছো তুমি আছো তুমি জানি।” এই সূত্রে মনে পড়ে যায় নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো প্রকাশিত বিভিন্ন কবির নেতাজি বিষয়ক কবিতার একটি ক্ষীণতনু সংকলন ‘বীরবন্দনা’র কথা। এতে সমকালের ও অতীতের বিভিন্ন বাঙালি কবির রচনা ছাড়াও প্রেসিডেন্সি কলেজের সেই ওটেন সাহেব, জাপানি কবি নোগুচি, সুভাষচন্দ্রের বান্ধবী কিট্টি কুর্তি প্রমুখের কবিতার অনুবাদও সংকলিত হয়েছিল। বর্তমান স্মৃতিচারণার আলোচ্য কালে অর্থাৎ আমার জীবনের প্রথম তিন দশকে আমার সংগৃহীত এসব গদ্য ও পদ্যসাহিত্যের বাইরে নেতাজি সংক্রান্ত আরো কয়েকটি মূল্যবান উপকরণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য শিশির বসু ও বীরেন সিংহ সম্পাদিত নেতাজির একটি চিত্রজীবনী (পিক্টোরিয়াল বায়োগ্রাফি) ও নেতাজির বক্তৃতা ও আই এন এ সঙ্গীতের দুটি ক্যাসেট।

সত্তরের দশকে কলকাতার ময়দানে আয়োজিত বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলন থেকে কিনেছিলাম নন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘নেতাজি থ্রু জার্মান লেন্স’ আর অনিল রায়ের ‘নেতাজির জীবনবাদ’ বই দু’টি (১৯৭২)। শেষোক্ত বইটির মতো নেতাজির জীবনবৃত্তান্তের বাইরে তাঁর মতবাদ ও রচনার সঙ্গে প্রথম পরিচিত হবার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করেছিল তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বলে পরিচিত ‘ভারতপথিক‘ বইটি (যতদূর মনে পড়ে সেটির প্রকাশক ছিল সিগনেট প্রেস)। এর কয়েক বছর পরে আমার হস্তগত হয় সুভাষচন্দ্রের রচিত আরেকটি বই। কলেজের একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছিলাম ‘ভারতের মুক্তিসংগ্রাম‘ বইটির দ্বিতীয় খণ্ড (প্রকাশক নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো)। এটি সুভাষচন্দ্র রচিত বিখ্যাত বই ‘ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’-এর বঙ্গানুবাদ, যদিও ১৯৬৮-৬৯ সালে সাধু বাংলায় এটি কেন অনুবাদ করা হয়েছিল, সেটি আমার বোধগম্য হয়নি! কিন্তু তা সত্ত্বেও একথা অনস্বীকার্য যে, এই বইটির মাধ্যমেই আমি সুভাষচন্দ্রের চমকপ্রদ ও সপ্রতিভ রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সঙ্গে প্রথম পরিচিত হয়েছিলাম। সুভাষচন্দ্রের মূল গ্রন্থটির শেষাংশ ছাড়াও পরিশিষ্ট হিসেবে সংস্করণটিতে সংযোজিত হয়েছিল তাঁর অন্যান্য কিছু রচনা ও সাক্ষাৎকার বিবরণের সঙ্গে তাঁর জীবন ও মতবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক মূল্যবান নথিপত্র।   

সুভাষচন্দ্রের জীবনের ঘটনাবলী সরল ও সোজাসুজি ভাবে সংকলন করে রচিত যে সব বইয়ের কথা এতক্ষণ বলেছি, সেগুলি আমার সুভাষ-অধ্যয়নের প্রথম সোপানটি রচনা করেছিল। এর পরবর্তী পর্যায়ে ছিল গবেষণামূলক ও তথ্যভিত্তিক বিভিন্ন সুভাষ-জীবনী। যে- বইটির মাধ্যমে এই সোপানে আমি পা রেখেছিলাম সেটি ছিল পবিত্রকুমার ঘোষ রচিত ‘সুভাষচন্দ্র‘। সুভাষের গড়ে ওঠার পটভূমি হিসেবে তাঁর  জন্মলগ্নের  বাংলাদেশের ইতিহাস ও সমান্তরাল ভাবে সমসাময়িক ভারতের অন্যান্য ঘটনাবলীর যে বিস্তারিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে গ্রন্থটি শুরু করা হয়েছিল তা সুভাষ-জীবনীর ক্ষেত্রেও এক নতুন প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলেছিল। কিন্তু মাত্র তিনটি খণ্ডের পর  দক্ষ জীবনীকারের যোগ্যতাসম্পন্ন এই লেখক কেন এই গ্রন্থটি রচনা বন্ধ করে দিয়েছিলেন তা আজও আমার অজানা।

এর সমসাময়িক কালে সুভাষচন্দ্রের সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ও তৎপরতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই আমার হাতে পড়েছিল। রাসবিহারী এভিনিউয়ের পার্শ্ববর্তী ফুটপাথে এক পুরানো বইয়ের দোকানে পেয়ে গিয়েছিলাম শংকরীপ্রসাদ বসুর একটি মূল্যবান বই ‘ন্যাশনাল প্ল্যানিং ও সুভাষচন্দ্র’। এই বইটির কিছু অংশ অবশ্য আমার আগেই পড়া হয়ে গিয়েছিল সাপ্তাহিক বসুমতী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত লেখকের ‘রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্র’ প্রবন্ধমালা পাঠ করার সময়। (পরবর্তীকালে এই রচনার মুখ্য অংশ দুই খণ্ডে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল সমকালীন ভারতে সুভাষচন্দ্র নামে)। এটি হাতে পেয়ে আমার খুবই উপকার হয়েছিল বলা চলে, কারণ এর নানা তথ্য পরবর্তী জীবনে আমাকে সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে নানা প্রবন্ধ লিখতে সাহায্য করেছিল।

আমার কলেজ ছেড়ে বেরিয়ে আসার পরবর্তী এক দশকে আরেক ধরনের সুভাষ-সাহিত্য বাজারে এসেছিল, যা আমার বয়সী অনেকে এখনও স্মরণ করতে পারবেন। এই ধারাটি ছিল গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ বা বিশ্লেষণের বদলে গল্পকথনের ভঙ্গীতে সুভাষজীবনের ঘটনাবলি আম পাঠকের মনোগ্রাহী করে উপস্থাপনা। এই ধারার প্রথম বইটি ছিল শৈলেশ দে রচিত ‘আমি সুভাষ বলছি‘। এই বইটি পরবর্তীকালে যাকে বলে ‘হট কেক”-এর মতোই বিক্রি হয়েছিল এবং আজকের আগ্রহী পাঠকের কাছেও পরিচিত। মল্লিকা নামে একটি কাল্পনিক নারীকে সম্বোধন করে গল্প বলার শৈলীতে সুভাষচন্দ্রের জীবন ও সমসাময়িক বৈপ্লবিক আন্দোলনের নানা ঘটনা নাটকীয় ঢঙে পরিবেশন করা হয়েছিল এই বইটিতে, যাকে অনায়াসে কোনও সিনেমার চিত্রনাট্য হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তা বলে এটিতে কাল্পনিক কোন ঘটনার স্থান ছিল না, বিভিন্ন বই ও পুরানো সংবাদপত্র থেকে তথ্যনিষ্ঠভাবে নানা ঘটনার উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছিল। সমকালীন ভারতের জাতীয় নেতা ও বিপ্লবীদের ছবির একটি সম্ভার ছিল বইটির অন্যতম আকর্ষণ।

এর কয়েক বছর পরে সাড়া জাগানো আরেকটি বই ছিল নারায়ণ সান্যাল রচিত ‘আমি নেতাজিকে দেখেছি : প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দী’। আজাদ হিন্দ আন্দোলনের ইতিহাসের মূল রূপরেখাটিকে অক্ষুণ্ণ রেখে কয়েকটি কাল্পনিক নাম, পার্শ্বচরিত্র, সংলাপ ও কিছু ঘটনা যোগ করে এটি উপন্যাসের আঙ্গিকে পরিবেশ করা হয়েছিল। তরুণ বয়সে এই আঙ্গিক বা রচনাশৈলী আমাকে যথেষ্ট নাড়া দিয়েছিল এবং আমি লেখককে কয়েকটি চিঠিও লিখেছিলাম বইটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করে। এই পর্বের সুভাষ অধ্যয়নে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই ছিল ‘সুভাষ স্মৃতি‘। এটির সম্পাদক ছিলেন বিশ্বনাথ দে, যিনি এই ‘স্মৃতি’ সিরিজে বিভিন্ন মনীষীর সম্পর্কে বহু লেখকের রচনার অংশ দক্ষতার সঙ্গে সংকলন করেছিলেন। সুভাষচন্দ্র সম্পর্কিত এই সংকলনটিও তার ব্যতিক্রম ছিল না।

এই বইগুলির সমকালে প্রকাশিত আরও তিনটি বইয়ের নাম এখানে উল্লেখ করা যায়। নারায়ণ সান্যালেরনেতাজি রহস্য সন্ধানে’, শ্রী অভিজিৎ রচিত ‘তাইহোকু থেকে ভারতে’ আর শ্যামল বসুরসুভাষ ঘরে ফেরে নাই’। এই তিনটিই ছিল নেতাজির অন্তর্ধান রহস্যসংক্রান্ত নানা জল্পনাভিত্তিক বই। শেষোক্ত বইটি পাতার আকার ছোট হলেও এতে সংকলিত হয়েছিল সুভাষচন্দ্রের সারা জীবনের প্রচুর ছবি এবং সেই আকর্ষণে বইটি প্রচুর সংখ্যায় বিক্রিও হয়েছিল।

পত্রপত্রিকার পাতায় নেতাজি অধ্যয়ন

নেতাজি বিষয়ক বিভিন্ন বইয়ের বাইরে পঞ্চাশ-ষাট দশকের বাংলা পত্রপত্রিকাগুলি ছিল আমার সুভাষ-অধ্যয়নের একটি প্রশস্ত ক্ষেত্র। বলা বাহুল্য যে, কৈশোর-পর্বের শুরুতেই বা বলা চলে একেবারে বালকবেলাতেই আমার সামনে এই ক্ষেত্রটি উন্মোচিত হয়েছিল আনন্দবাজার ও যুগান্তর পত্রিকার সাপ্তাহিক ছোটদের পাতা যথাক্রমে ‘আনন্দমেলা’ ও ‘ছোটদের পাততাড়ি’ বিভাগগুলির মাধ্যমে। এছাড়াও বাড়িতে আসত দেব সাহিত্য কুটীরের কিশোর-পত্রিকা শুকতারা। প্রথমোক্ত দুটি পত্রিকার ছোটদের পাতায় নানা মনিষীর জন্মদিনের সময় তাঁদের স্মরণে নানারকম সচিত্র কাহিনী ও কবিতা শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে ছাপা হত। নেতাজির জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিত এরকম কয়েকটি কবিতা আজও স্মৃতিতে গাঁথা হয়ে আছে। এইসব চমৎকার কবিতিকাগুলির কিছু নমুনা আজকের পাঠকের সামনে উপস্থিত করার লোভ সংবরণ করতে পারছি না।

আনন্দমেলায় নির্মলেন্দু গৌতম রচিত কবিতার অংশ:- “হিমালয়ের তুহিন শিখর পেরিয়ে গেল যারা/ সত্যি জেনো সুভাষ বসুর দেশের ছেলে তারা!/ শত্রুকে ভয় পায় না যারা মরণকে দেয় ঠেলে,/ তারাই জেনো সুভাষ বসুর সোনা মায়ের ছেলে।”

শিশুদের উপযোগী ভাষায় রচিত অনিলশঙ্কর রায়ের কবিতার একটি অংশ :- “ডাকাত ছেলে ডাকাত ছেলে, দেশের মাকে দেশেই ফেলে তেরো নদীর পার।/ দেশের প্রভু চমকে ওঠে পরান কাঁপে তার!” কবিতাটির শেষের দিকে অনিবার্যভাবেই এসেছে সেই বেদনা :- “জন্মদিন এসেছে বারেবার,/ ডাকাত ছেলে হারিয়ে গেছে ঠিকানা নেই তার।/ সে নামে কাঁদে দেশের মাটি, কাঁদে দেশের প্রাণ,/ সে নামে আজও বুকটা কেন করে যে আনচান!/ ডাকাত ছেলে প্রণাম নিও আজি-/ তোমার নামে গগন ভরে শঙ্খ ওঠে বাজি!”

এরকম আরেকটি কবিতা :- ‘নেতাজি একটা দীপ্ত কঠোর সংকল্পের নাম,/ চলতে চলতে দুর্গমপথে জানে না যে বিশ্রাম।” [প্রভাকর মাঝি] এগুলির পাশাপাশি মনে পড়ে যায় ছোটদের পাততাড়ি বিভাগের পরিচালক স্বপনবুড়োর (অখিল নিয়োগী), একটি কবিতার ছত্র:- ”নেতাজি তোমার পুণ্য ও নামে আমরা আরতি করি/ ঘুমের দেশেতে সবারে জাগালে অভয় মশাল ধরি।/ জপমালা হল তোমার ও নাম/ দলে দলে মোরা করি যে প্রণাম/ অশ্রু-আখরে তর্পণ করে নেতাজি তোমারে স্মরি!”

আমাদের কৈশোরকালে শিশুসাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় দিকপাল সুনির্মল বসু শুকতারা-য় প্রকাশিত একটি কবিতায় লিখেছিলেন, “যার রণভেরী জীবন জাগালো মরণ-মহোৎসবে/ হিন্দুকুশ ও কুমারিকা কাঁপে জয় হিন্দের রবে!/ সেই হিন্দ-বীর জয় নেতাজীর, কে তাঁরে মারিতে পারে,/ মরণ তাঁহার চরণে প্রণাম করে যায় বারে বারে!”

সে-সময়ের শিশু ও কিশোরসাহিত্যে সুভাষচন্দ্রের প্রসঙ্গটি যে কত বিচিত্র রূপে বিভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থিত হয়েছিল, তার কয়েকটি নমুনা এই সূত্রে উপস্থিত করা যায়। পূর্বোক্ত শুকতারা পত্রিকাতে আজাদ হিন্দ ফৌজের ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াইকে উপজীব্য করে কয়েকটি কাল্পনিক কাহিনী লিখেছিলেন সে যুগের আরেকজন সুপরিচিত এবং বর্তমানে বিস্মৃত লেখক সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় (গায়িকা সুচিত্রা মিত্রের বাবা)। এই গল্পগুলির নায়ক ছিল অজয় নন্দী নামে এক আজাদ হিন্দ সৈনিক। ‘নেকড়ের গুহায় অজয় নন্দী‘ কিম্বা ‘অজয় নন্দীর গান্ধী টুপি‘ — এই জাতীয় নাম হত এই আকর্ষণীয় গল্পগুলির। একটি গল্পে যুদ্ধে আজাদ হিন্দ ফৌজের সংকটের সময় নেতাজিকে নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর টুপির সঙ্গে নিজের হেলমেট বিনিময় করেছিল এই অজয় নন্দী।

এই সূত্রে দেব সাহিত্য কুটীর প্রকাশিত দুটি গল্প সংকলনে শিশু ও কিশোর পাঠকদের সামনে নেতাজি প্রসঙ্গ উপস্থাপনার দুটি অসাধারণ উদাহরণের উল্লেখ জরুরী মনে হল, কারণ আজকের পাঠক সেগুলির লেখকের নামের সঙ্গে পরিচিত হলেও গল্পগুলির বিষয়ে জানেন না। প্রথম রচনাটি রূপকথার আঙ্গিকে লেখা সুভাষচন্দ্রের জীবনালেখ্য, নাম  — ‘অভীক কুমার (একালের রূপকথা)। রাধারানী দেবীর ‘গল্পের আলপনা. নামে জনপ্রিয় একটি গল্পসংকলনের অন্তর্গত ছিল এটি। গল্পটি শুরু হয়েছ এমন এক দেশের বর্ণনা দিয়ে, যে-দেশে এত অঢেল সম্পদ যে মানুষ খেয়ে পরে ভোগ করে বিলিয়ে ছড়িয়ে দান করেও যেন শেষ করতে পারেনা বিধাতা পুরুষ খেয়ালের ঝোঁকে বসে বসে সেই সোনার দেশটি নির্জনে একমনে নিখুঁত সুন্দর করে করেছিলেন ইত্যাদি।বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এ ভারতবর্ষ ছাড়া আর কোন দেশ নয়।

এই গল্পে ভারতে ইংরেজের আগমন ও গান্ধীজীর আবির্ভাবের কথা এসেছে রূপকের মাধ্যমে। ব্রিটিশ শাসককে দেখানো হয়েছে এক মায়াবী দৈত্য হিসেবে, যে তার রূপেগুণে বশ করে আর মায়াজাল বিস্তার করে এই সোনার দেশের মানুষকে ছাগল গরু ভেড়া আর কুকুর বানিয়ে রেখেছে। এরপর গান্ধীর বর্ণনা:- ” মায়া-কুয়াশায় ঘুমন্ত দেশের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন একজন জাগ্রত মানুষ, মহাযোগী পুরুষ তিনি।” মানুষকে দৈত্যের মায়াজাল থেকে মুক্ত করার জন্য তিনি হিমালয়ে গিয়ে তপস্যয় বসেন, যজ্ঞের আগুনে আহুতি দিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করেন। তখন যজ্ঞের আগুন থেকে বেরিয়ে আসেন ঘোড়ায় চড়া ‘সুগঠিত সুদৃঢ় দেহ সুকুমার মুখশ্রী এক কিশোর বালক’, এক হাতে তার ইস্পাতের তরবারি অন্য হাতে সোনার বল্লম, মাথায় লোহার পাগড়ি, গায়ে স্বর্ণখচিত বর্ম। সন্ন্যাসী তাকে আশীর্বাদ করে বলেন তুমি অভীক, তুমি ভয়হীন, মৃত জন্মভূমিকে তুমি বাঁচিয়ে তুলবে।’

পরিণত পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ,এই অভীককুমারই হচ্ছেন সুভাষচন্দ্র। এরপর তিনি সমস্ত বাধাবিঘ্ন ঠেলে সাদা ঘোড়া ছুটিয়ে চললেন, দেশ দেশান্তর পার হয়ে। ”কখনো আকাশে উড়ে কখনো সাগরে ভেসে অভীককুমার পৃথিবীর অন্য সীমায় দুর্দান্ত দৈত্যের বাড়ি গিয়ে হাজির হলেন।” সহজেই বোঝা যায়, এই দুর্দান্ত দৈত্য হচ্ছে নাৎসি জার্মানি, যে তাঁকে পাঠিয়ে দেয় এক বেঁটে দৈত্যের কাছে অর্থাৎ জাপানে। অভীক কুমার ভুলিয়ে ভালিয়ে এদের কাছে মায়াবী দৈত্যকে জব্দ করার মন্ত্রগুলি শিখে নেন। তারপর – “সেই মন্ত্র তিনি নিজের মুখে উচ্চারণ করে করে নীল আকাশে ছুঁড়ে দিতে লাগলেন সাত সমুদ্রের ওপার থেকে। বাতাস তার ঢেউয়ে ঢেউয়ে নাচিয়ে এই মন্ত্র ঘুমন্ত দেশের চারিদিকে ছড়িয়ে ফেলতে লাগলো।” এইভাবে ঘুমন্ত দেশের জানোয়ার-মানুষদের কানে সেই মন্ত্র গিয়ে পৌঁছবামাত্র তারা জেগে উঠে দাঁড়াতে লাগলো শত বছরের ঘুম ভেঙে। ঘুমন্ত রাজ্যে মহাবিপ্লব উপস্থিত হল। অগত্যা মায়াবী সোনার দেশ ছেড়ে পালাবার আয়োজন করতে করতে তার কুমন্ত্রের বিষের ধোঁয়া ছড়িয়ে দিল জানোয়ার মানুষদের মধ্যে। ফলে তারা নিজেদের মধ্যে হানাহানি শুরু করে দিল। হানাহানি থামাতে সন্ন্যাসী সমস্ত দেশে ঘুরতে লাগলেন, শেষে ব্যর্থ হয়ে বললেন, “আমার জীবন দিয়ে আমার বুকের হাড়ে আমি তোমাদের এমন বজ্রশক্তি দিয়ে যাব, যে শক্তি নিয়ে তোমরা বিশ্ব-দুনিয়াকে জয় করতে পারবে।” অনন্য এই রূপকথাটি শেষ হয়েছে এইভাবে :- ”অগস্ত মুনির মতো অভীককুমার আজও আসেন নি। দধীচি মুনির মতো মহা সন্ন্যাসী আপন প্রাণ উৎসর্গ করে অজেয় শক্তি দিয়ে গিয়েছেন ঘুমন্ত দেশের হাতে। কিন্তু সে দেশের সমস্ত মানুষ এখনো সেই বজ্র-শক্তিকে হাতে তুলে নেবার সামর্থ্য পায়নি। তারা সাধনা করছে।”

আমার কৈশোরের মানসপটে ছাপ রেখে যাওয়া সর্বশেষ গল্পটির নাম ‘নেপথ্যে‘, লেখক বনফুল। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৯ সালে দেব সাহিত্য কুটীরের পূজাবার্ষিকী ‘দেব দেউল’-এ। এটি আমাদের কিশোরবেলারই বাঙালি জনমানসের একটি বিশ্বস্ত ছবি, যে যুগে ছেলে বুড়ো সবাই এই আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে বসে থাকত যে, যেকোনো মুহূর্তে হয়তো তাদের প্রাণের দুলাল সুভাষ ফিরে আসবেন তাদের মধ্যে। এই গল্পের কুশীলব একটি স্কুলের থার্ড মাস্টারমশাই ও তার দুই ছাত্র এবং এক অপরিচিত আগন্তুক। এই দুই ছাত্র তিনু ও মনি একদিন রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে এক ভদ্রলোককে বসে থাকতে দেখে চুপিসারে এসে তাদের মাস্টারমশাইকে সেই খবর দেয়। মাস্টারমশাই অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে ও তাদের যে ভুল হয়নি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে একটি ফুলের মালা কিনে তাদের নিয়ে স্টেশনের ওয়েটিং রুমে গিয়ে উপস্থিত হন। তারপর গল্পের কিছুটা অংশ :-

“এই যে তিনি। থার্ড মাস্টারও অবাক হয়ে গেলেন। সত্যিই তো। …. মণির হাত থেকে মালাটি নিয়ে তিনু তাঁকে পরিয়ে দিলে সেটি। তারপর প্রণাম করলে। মণিও করলে। থার্ড মাস্টারমশাইও করলেন। ভদ্রলোক হাসিমুখে প্রতি-নমস্কার করলেন কেবল, আর কিছুই বললেন না। তিনু তখন তার অভিনন্দপত্রখানা খুলে পড়তে লাগল। ‘হে নেতাজী, হে ভারতবরেণ্য বাংলাদেশের সুসন্তান, আজ যে এমন অপ্রত্যাশিতভাবে আপনার দেখা পাব তা আমাদের সুদূরতম কল্পনারও অতীত ছিল। আপনি যে এখনও জীবিত আছেন, একথা আমাদের দেশের অনেকে বিশ্বাস করেন, আমরাও করতাম। আজ তার চাক্ষুষ প্রমাণ পেয়ে কৃতার্থ হলাম।

“আজ বাংলাদেশের বড় দুর্দিন। স্বাধীনতা দেবার ছুতোয় ইংরেজ আবার বাংলাদেশকে দ্বিখণ্ডিত করে চলে গেছে। অসংখ্য বাঙালি পথে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্যহীন অন্নহীন গৃহহীন বাঙালির হাহাকারে চতুর্দিক পরিপূর্ণ …”   ইত্যাদি।

এরপর গল্পের সেই আগন্তুক তিনুর দিকে চেয়ে বললেন, ‘তুমি যা লিখেছ তা ঠিক। স্বাধীনতা নামে দেশে নানারকম অনাচার অবিচার অত্যাচার চলছে একথা মিথ্যা নয়। কিন্তু তোমরা একদিকটা মাত্র দেখেছ … তোমরা নিজেদের দোষের কথা কিছু বলনি। বলনি যে তোমরা দুর্বল বলেই নানারকম মারাত্মক রোগের বীজাণু তোমাদের আক্রমণ করেছে। তোমরা যদি জীবনীশক্তিতে বলীয়ান হতে কেউ তোমাদের কিছু করতে পারত না। … যদি আত্মপ্রকাশ করি, তাহলে একটিমাত্র ফলই হবে, দলাদালি। … বুঝতে পারছি আমার আদর্শকে রূপ দেবার মতো যথেষ্ট লোক নেই দেশে, তোমরা যেদিন বড় হয়ে উপযুক্ত হয়ে আমাকে ডাক দেবে, সেই দিনই আমি আসব তোমাদের কাছে। তোমরা নিজেদের তৈরি করো।’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর ভদ্রলোক ছেলে দুটিকে বাইরে যেতে বলে তাদের মাস্টারমশাইকে একান্তে বলেন যে, তিনি নেতাজি নন, তিনি একজন সামান্য লোক । নেতাজির সঙ্গে অদ্ভুত সাদৃশ্যের জন্য লোকে তাঁকে নেতাজি বলে ভুল করে। বয়স্ক লোকদের ভুল তিনি ভাঙিয়ে দিলেও কিশোর-বয়সীদের ভুল তিনি ইচ্ছে করেই ভাঙান না, এই ছাত্র দুটিকে যা বললেন সেসব কথাই তাদের বলেন। মাস্টারমশাইকে তিনি বলেন, ”আপনিও যেন তাদের ভুল ভাঙিয়ে দেবেন না। নেতাজিকে ফিরে পাবার আশায় তারা নিজেদের ভালো করে গড়ে তুলুক। আর আপনারা তাদের সে গঠনে সহায়তা করুন।” এরপর ভদ্রলোক তাঁর ছোট পুঁটুলিটি নিয়ে ট্রেনে চড়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যান। তার আগে মাথায় একটা টুপি পরে মুখের নীচের দিকটা চাদর দিয়ে ঢেকে নেন, যাতে তাঁর মুখটা কেউ দেখতে না পায়।  এমন অসাধারণ এক গল্প বনফুলের মত লেখকের পক্ষেই সৃষ্টি করা সম্ভব।

এর পরবর্তী পর্যায়ে আমার সুভাষ-অধ্যয়ন প্রসঙ্গে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত নানারকম প্রবন্ধের কথা বলতে হয়, যা আমার উন্মেষ-উন্মুখ মনটিকে চিন্তাভাবনা, বিশ্লেষণের জন্য ধীরে ধীরে প্রস্তুত করে তুলছিল। সে সময় যেসব পত্রপত্রিকা হাতে পেতাম, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশ, অমৃত, সাপ্তাহিক বসুমতী, হিন্দি ধর্মযুগ ও ইংরেজি ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অফ ইন্ডিয়া ইত্যাদি। বাংলা পত্রিকাগুলিতে নেপাল মজুমদার শংকরীপ্রসাদ বসুর মতো গবেষকদের বিভিন্ন নিবন্ধ পাঠ করে আমার সুভাষচেতনার ভিতটি বেশ মজবুতভাবেই গড়ে উঠেছিল। সাপ্তাহিক বসুমতীতে শংকরীপ্রসাদের ‘রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্র’ শিরোনামে ধারাবাহিক রচনাটি পড়ার জন্য আমি এক প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে ওই সংখ্যাগুলি নিয়ে আসতাম এবং সেগুলি আবার ফেরত দিতে হত বলে একটি খাতায় তার প্রথম দিকের বেশ কিছু অংশ হাতে লিখে রেখেছিলাম। একই বিষয়ে নেপালবাবুর রচনাগুলি প্রকাশিত হয়েছিল দেশ পত্রিকার কয়েকটি সংখ্যায়। নিজের বাড়িতে দেশ আসত বলে অবশ্য এই রচনাগুলি সেখান থেকে কেটে নিয়ে ফাইলবন্দি করে রাখতে আমার কোন অসুবিধা হয়নি, যা আজও আমার সংগ্রহে রয়েছে। এই ধারাবাহিক রচনাগুলি যখন পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়, তখন আমার কৈশোরপর্ব পার হয়ে গেছে এবং সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে পুরোদস্তুর পড়াশোনা ও লেখালেখি শুরু হয়েছে। তখন আমি ওই বইগুলো কিনে নিতে দেরি করিনি।

যা-ই হোক, এই সূত্রে পত্রপত্রিকার পাতায় পড়া নানা মূল্যবান রচনার মধ্যে যে কটি মনে পড়ছে সেগুলি ছিল শিশিরকুমার বসুর ‘মহানিষ্ক্রমণ’, কৃষ্ণা বসুর :ইতিহাসের সন্ধানে’ ‘চরণরেখা তব’,  আর ‘সৈনিকের স্মৃতি’, মিহির বসুর ‘নেতাজির সহধর্মিনী’ ইত্যাদি।

কিশোর পত্রিকা মাসিক আনন্দমেলায় ১৯৮০ সাল থেকে প্রায় বছর তিনেক ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল শিশিরকুমার বসুর স্মৃতিকথা ‘বসু বাড়ি‘। যেহেতু কৈশোর পার হয়ে গেছে, অনেকদিন,  তখন ছোটদের পত্রিকা আসা আমাদের বাড়িতে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই লেখাটির জন্য আবার আনন্দমেলা বাড়িতে আসতে থাকল। কী চমৎকার লেখার হাত শিশিরকুমারের, সেইসঙ্গে আগে কখনো না দেখা বসু পরিবারের ও সুভাষচন্দ্রের নানা ছবি! এগুলি সবই পরে বই হয়ে বেরিয়েছিল। এগুলি ছাড়া দেশ পত্রিকাতেই পড়েছিলাম নেপাল মজুমদারের ‘সুভাষচন্দ্রের ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’ এবং কৃষ্ণা বসুর ‘হিটলার ও নেতাজী’, ‘হে বিদেশি ফুল’, ‘সমরে চলিনু আমি’, ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে‘ ইত্যাদি অনেক ছোট কিন্তু তথ্যসমৃদ্ধ লেখা, যেসব তথ্য  লেখিকা বিভিন্ন দেশে নেতাজি-ঘনিষ্ঠ মানুষজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সংগ্রহ করেছিলেন।

সাময়িকপত্রের পাতায় পড়া নেতাজিবিষয়ক লেখার তালিকায় অমৃত পত্রিকায় শিবব্রত ঘোষের ‘অচেনা সুভাষ’, দ্বিজেন্দ্রনাথ বসুর ‘নেতাজীর অন্তর্ধানের অকথিত কাহিনী’, যুগান্তর সাময়িকীতে নেহরু ও সুভাষচন্দ্রের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে লেখা দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের ধারাবাহিক ‘দুই নায়ক’ ইত্যাদি রচনাগুলিও ছিল তথ্যপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য। সাপ্তাহিক বসুমতীতে যাদের লেখা পড়ে উপকৃত হয়েছি তাদের কয়েকজন  প্রমোদরঞ্জন সেনগুপ্ত ,ভূপেন্দ্র কিশোর রক্ষিত রায় ও নির্মল বসু।

অন্যান্য পত্রিকার প্রকাশিত রচনার মধ্যে মনে পড়ছে সানডে পত্রিকায় শিশির বসুর ‘নেহরু অর নেতাজি — হু ওয়াজ গ্রেটার’, ইলাস্ট্রেটেড উইকলি-তে প্রকাশিত কৃষ্ণা বসুর ‘ইম্পরট্যান্ট উওমেন ইন নেতাজি’স লাইফ’ ও হিন্দি ধর্মযুগ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত ভারতী চৌধুরীর ‘আশা সান কী সুভাষ ডায়েরি’ ইত্যাদি। এখানে উল্লেখযোগ্য যে আশা ওরফে ভারতী ছিলেন আজাদ হিন্দ সরকারের সচিব আনন্দমোহন সহায়ের কন্যা, যিনি আজাদ হিন্দ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন ও রচনাটি ছিল তাঁর সেই সংক্রান্ত স্মৃতিকথা। (তখন অবশ্য জানতাম না যে, এর বেশ কিছু বছর পরে স্বয়ং সহায়জির সঙ্গে আমার পত্রালাপের সুযোগ হবে এবং তারও বহু বছর পরে নবতিপর আশাজির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ হবে তাঁর পুত্র সঞ্জয় চৌধুরীর মাধ্যমে।)

বাংলা সংবাদপত্রগুলোর সাময়িকী বিভাগে ও বিশেষ ক্রোড়পত্রে সবচেয়ে বেশি লিখতেন সমকালের রাজনীতিক নেতা সমর গুহ, এ ছাড়া ছিলেন ফরওয়ার্ড ব্লকের নির্মল বসু। অন্যান্য লেখকদের মধ্যে মনে পড়ছে ধীরেন ভৌমিক, পুলকেশ দে সরকার, মধুসূদন চক্রবর্তী, পরেশ সাহা, নন্দ মুখোপাধ্যায় প্রমুখের নাম।

এছাড়া সে সময়ে কিছু পত্রপত্রিকা নেতাজির বিষয়ে বিশেষ সংখ্যা বের করত তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য নেতাজির সহকর্মী লীলা রায়ের প্রতিষ্ঠিত  জয়শ্রী ও কংগ্রেস নেতা প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি সম্পাদিত দক্ষিণী বার্তা। এই পত্রিকাগুলি আমি কলকাতায় গিয়ে সংগ্রহ করতাম।

এই সময়ে জয়শ্রী সম্পাদনা করতেন সুনীল দাস। এই পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যায়ই সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য রচনাদি থাকত। এই পত্রিকার একটি নিজস্ব লেখকগোষ্ঠী ছিল, এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পবিত্রকুমার ঘোষ, অশোক মুস্তাফি, সুনীল দাস, বিজয় নাগ, ক্ষণেশ্বর ঘোষাল, পঞ্চানন চক্রবর্তী প্রমুখ। এছাড়া যাঁদের উল্লেখযোগ্য রচনা পড়েছি তাঁদের মধ্যে ছিলেন নির্মলেন্দুবিকাশ রক্ষিত, পবিত্রকুমার গুপ্ত, পুলকেশ দে সরকার, নন্দ মুখোপাধ্যায়, গোপাললাল সান্যাল প্রমুখ। যাঁরা বিভিন্ন সংখ্যায় ইংরেজিতে গুরুত্বপূর্ণ রচনা লিখতেন, তাদের মধ্যে হরি বিষ্ণু কামাথ, প্রভুদয়াল হিম্মৎসিংকা, অমিয়নাথ বসু প্রমুখের নাম মনে পড়ছে। নেতাজিকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে এই পত্রিকায় নিয়মিত কবিতা লিখতেন শান্তশীল দাশ, এছাড়া আরো দুই সুপরিচিত কবি নচিকেতা ভরদ্বাজ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতাও পড়েছি। এই পত্রিকা ও অন্যান্য বিভিন্ন পত্রিকায় সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে যাঁর কবিতা খুব চোখে পড়ত,  সেই অপরাজিতা গোপ্পীর নামটিও মনে আছে।

সত্তরের দশকে নেতাজি অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে যখন খোসলা কমিশনের তদন্ত চলছে, তখন এ-ব্যাপারে জয়শ্রী-তে নিয়মিত নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হত। তাছাড়া ‘চারণিক‘ ছদ্মনামে এক বা একাধিক লেখকের একটি নিয়মিত বিভাগে ও পত্রিকার সম্পাদকীয়তে সমকালের প্রেক্ষিতে নেতাজির আদর্শ সম্পর্কে বিভিন্ন মন্তব্য থাকত। চারণিক লিখিত কলমটিতে মহাকাল নামে এক ব্যক্তির কথাবার্তার বিবরণ থাকত, ইঙ্গিতপূর্ণ রহস্যময় ভাষায় লেখা এইসব কথাবার্তার মর্ম  আমার বিশেষ বোধগম্য হত না। তখন আমার জানা ছিল না যে, এই ব্যক্তি একজন গোপনচারী মানুষ, যাকে জয়শ্রী গোষ্ঠীর পরিচালকেরা সন্ন্যাসীর বেশে জীবিত নেতাজি বলে বিশ্বাস করতেন। এখানে সংক্ষেপে শুধু এটুকু জানিয়ে রাখা যায়, মৃত্যুর পরে এই সন্ন্যাসী গুমনামি বাবা নামে বিখ্যাত হন। যা-ই হোক, এই সূত্রে জানানো অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, সত্তরের দশকের শুরুতে এই পত্রিকার লেখকসূচিতে আমার নামও যুক্ত হয়েছিল। (এই পত্রিকাতে আমি নেতাজির জীবন ও আদর্শ নিয়ে নিবন্ধ ও কদাচিৎ কবিতা লিখলেও নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে কোন আলোচনা কখনও করিনি।)

দক্ষিণী বার্তা পত্রিকার রচনাগুলি নানা গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও চিঠিপত্রের প্রতিলিপি সহ বেশ যত্ন করে সংকলিত হত। সমকালের বিশিষ্টজনদের শুভেচ্ছাবাণী সহ নানা ধরনের লেখকের রচনাই এখানে থাকত। সেগুলি বিষয়গৌরবে সবসময় হয়তো ততটা মূল্যবান হত না, কিন্তু সতীশচন্দ্র সামন্ত, হরিদাস মিত্র, প্রতাপচন্দ্র চন্দ্র, সত্যরঞ্জন বক্সী, বিজয় সিংহ নাহার, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি, নির্মল বসু, অশোক ঘোষ, শম্ভু ঘোষ প্রমুখ অতীতের ও সমকালের রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব, প্রবোধচন্দ্র সেন, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, মনকুমার সেন, গোপালচন্দ্র রায়, শৈলেশ দে ও বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের মত নামী লেখক/ সাংবাদিক কিংবা গোপাললাল সান্যাল, কমলা দাশগুপ্ত, সন্তোষকুমার বসুর মতো নেতাজির সান্নিধ্য পাওয়া মানুষজনের রচনা এই সংকলনে দেখতে পাওয়া যেত। প্রতিবছর প্রকাশিত এই পত্রিকার ‘নেতাজি বিশেষ সংকলন’গুলিতে দিনেশ দাস, প্রেমেন্দ্র মিত্র, তারাপদ রায়, মণীন্দ্র রায়, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রমুখ যশস্বী কবিদের রচনাও পড়ার সুযোগ হয়েছে আমার। এগুলির মধ্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মুক্তি নামে একটি অনবদ্য কবিতা এখানে উদ্ধার করার লোভ হচ্ছে :-   “একজন মানুষ মুক্তি ফল আনতে গিয়েছিল/ সে বলেছিল আমি ফিরে আসবো/ প্রতীক্ষায় থেকো।/ জানিনা সে কোথায় গেছে/ কোন হিম নিঃসঙ্গ অরণ্যে/ বা কোন নীলিমা-ভুক পাহাড-চূড়ায়/ জানি না তার সামনে কত দুস্তর বাধা/ জানি না সে সংগ্রাম করছে কোন/ অসহনীয়ের সঙ্গে।/ সে মুক্তিফল আনবে বলেছিল/ সে বলেছিল প্রতীক্ষায় থাকতে/ আমি দ্বাদশ বৎসর থাকবো তার অপেক্ষায়।/ তার পরেও সে না ফিরলে/ আমাকে যেতে হবে/ আমিও না ফিরলে যাবে আমার সন্তান-সন্ততিরা।।” আমার পড়া নেতাজি সম্পর্কিত অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা এটি।

এই দক্ষিণী বার্তা পত্রিকাটি প্রসঙ্গে একটি বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথাও মনে পড়ে গেল। ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত এই পত্রিকার নেতাজি বিশেষ সংকলন টি পড়তে গিয়ে আমার চোখে পড়ে বিবেকানন্দ ও সুভাষচন্দ্রের বাণী ও ভাবাদর্শের তুলনা করে ছ’ সাত বছর আগে কলেজ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত আমার একটি লেখা (আমাদের বর্তমান রচনার দ্বিতীয় পর্বে উল্লিখিত) এখানে ছাপা হয়েছে, শুধু শিরোনাম ও ভাষাটি একটু অদলবদল করে দিলেও লেখাটির কাঠামো ও বক্তব্য মোটামুটি একই রকম আছে, আমার উদ্ধৃত বাণীগুলি এখানেও একই ক্রমানুসারে এসেছে এবং মন্তব্যগুলিও দু-একটি ক্ষেত্রে আমার লেখাটি থেকেই ‘কাটা ও সাঁটা’ বলা চলে। লেখকের নামটি দেখেও তাকে আমার কলেজের এক সহপাঠী বলে শনাক্ত করতে পারি। সত্যি কথা বলতে কি অপরিণত বয়সে লেখা সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে আমার ওই প্রথম প্রকাশিত রচনাটি যে এমন কুম্ভীলকবৃত্তির শিকার হবে, তা অবশ্য আগে কখনো ভাবিনি। এভাবে সুভাষ-জীবনের অধ্যয়ন প্রক্রিয়ার মধ্যেই আমার মানবজীবনের নানারকম পাঠগ্রহণও চলতে থাকে।

আমাদের বর্তমান আলোচ্য পর্ব অর্থাৎ আমার জীবনের মোটামুটি তিন দশক পর্যন্ত পত্রপত্রিকার বাইরে আমার সুভাষ -অধ্যয়ন প্রসঙ্গে কোন বিশেষ ঘটনা বা অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকাশিত কয়েকটি বিশেষ সংকলনের কথাও বলতে হয়। পশ্চিমবঙ্গে ষাটের দশকের শেষে যখন দীর্ঘদিনের কংগ্রেসের শাসনের অবসান ও বামপন্থীদের সরকার গঠন হয় সেই সময়টিতে নেতাজি চর্চার বৌদ্ধিক বাতাবরণটিতে কিছুটা পরিবর্তনের হাওয়া লক্ষ করা যেতে থাকল। সুভাষচন্দ্রের কীর্তি ও মতবাদকে স্বীকৃতিদান বা প্রচারের ব্যাপারে  এতদিন কংগ্রেসী সরকারের ঔদাসীন্য বা কুণ্ঠিত কার্পণ্যের পরিচয় এর আগে কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরে পাওয়া গিয়েছিল, যা আমরা বর্তমান রচনাটির প্রথম দিকেই উল্লেখ করেছি। সত্তরের দশক থেকে দুটি স্তরেই কিছুটা উল্টো হওয়া বইতে শুরু করেছিল। এই প্রেক্ষাপটে কলকাতায় ১৯৭০ সালে আয়োজিত হয়েছিল নেতাজি প্রদর্শনী (প্রথম পর্বে উল্লিখিত)। কলকাতায় তখনো বইমেলা শুরু না হলেও বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনের মতো একটি বার্ষিক মেলা ইতিপূর্বেই সাড়া জাগিয়েছিল। শুধুমাত্র নেতাজিকে উপজীব্য করে একটি গোটা মেলা পশ্চিমবঙ্গ এর আগে কখনো দেখেছে বলে মনে হয় না।

এই মেলার মূল তোরণটি তৈরি হয়েছিল লালকেল্লার আদলে। বই, পত্রপত্রিকা, নাট্যাভিনয়, বক্তৃতা মাটির মূর্তিতে জীবন – আলেখ্য প্রদর্শনী — সব কিছুরই থীম নেতাজি! এই প্রদর্শননীর উদ্বোধন করতে এসেই যুক্তফ্রন্ট সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু অতীতে নেতাজি সম্পর্কে কমিউনিস্টদের মূল্যায়ন ভুল ছিল বলে সেই ঐতিহাসিক স্বীকারোক্তি করেছিলেন, যা খবর কাগজের শিরোনাম হয়েছিল। যা-ই হোক, এই মেলার আয়োজকরা এই উপলক্ষে একটি সচিত্র স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন যা আজও আমার সংগ্রহে আছে। এটি সম্পাদনা করেছিলেন অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়। সমকালের অনেক সুপরিচিত লেখক ও রাজনীতিকের ছোট ছোট লেখা এটিতে সংকলিত হয়েছিল, তবে তথ্যপূর্ণ লেখা হিসেবে উল্লেখযোগ্য ছিল অধ্যাপক নির্মল বসু, শঙ্করীপ্রসাদ বসু ও সম্পাদক অরুণবাবুর রচনা। সংকলনটিতে একটি মাত্র কবিতা ছিল অপরাজিতা গোপ্পীর,তার কিছুটা এরকম :- “অসমুদ্র হিমাচল/ একটি আবির্ভাবের প্রতীক্ষায় অধীর,/ নিষ্পেষিত মানবাত্মা আজ/ মুক্তি-যন্ত্রণায় অধীর।/ হে বিপ্লবী হে মন্ত্রদ্রষ্টা,/ মহা-ভারতের রক্তরঞ্জিত/ দ্বিখণ্ডিত বুকের তলে/ প্রতিদিন পুঞ্জীভূত বেদনার আর্ত হাহাকার/ তোমার স্বপ্নরঞ্জিত ভারততীর্থের রেণুতে রেণুতে/ লাঞ্ছিত হয়ে চলেছে।/…. আসমুদ্র হিমাচল আজ তাই/ তোমার প্রতীক্ষায় অধীর,/  অধীর-নিষ্পেষিত মানবাত্মা/ মুক্তি-পিপাসায়।/ দুঃসহ রাত্রির সমুদ্র মন্থিত করে  তোমার অমর আত্মা বাঙ্ময় হোক।/ অন্ধকার থেকে আমাদের/ আলোয় নিয়ে যেতে/ মৃত্যু থেকে উত্তীর্ণ করে দিতে অমৃতে –/ তুমি ফিরে এসো নেতাজী।” (‘নেতাজী: একটি নাম’)

[লেখকের পূর্ববর্তী রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
শৌভিক দে
শৌভিক দে
3 months ago

কোনো গুরুত্বপুর্ণ লেখা পর্বে পর্বে লেখা হলে একটু মুশকিল। এই বিলম্বিত প্রকাশের বিড়ম্বনা হল আগের দড়ি দড়া স্মৃতি থাকে না , কাজেই পাল তুলে ভেসে যাওয়াও হয় না। আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হয়। তাতে মন্তব্য করতে একটু দেরি হল। অবশ্য আমার মত পুন্টিকার মন্তব্যে কি বা আসে যায়।ইনি মোটের উপর নানা মাধ্যমে নিয়মিত লেখক। এত পরিশ্রম করে একটি লেখা ? ইনি যদি শুধু নেতাজীতেই এত সময় নিবেদন করেছেন – তাহলে অন্যান্য লেখাগুলির রসদ সংগ্রহ করেন কখন? দিন সেই চব্বিশ ঘন্টারই তো? এ প্রশ্ন অবশ্য এই পত্রিকার অনেক লেখকেই করা যায়। একটি খেদও জাগে। হাতে হাতে ‘সেলফি’ এসে যেমন ডি,এস, এল,আর ক্যামেরা প্রায় অগস্ত যাত্রায় গেছে – এই সব মহা মুল্যবান প্রবন্ধ – সেও কি …?