
এখন কি শরৎ কাল? ঋতুবদলগুলোও আজকাল পালটে যাচ্ছে। নিয়মমতো কিছুই আর হয় না। আর কয়েকদিন পরেই পুজো, অথচ আকাশে মেঘের ঘনঘটা। এমন আকাশ তো আষাঢ়ে হয়, অথচ এখন আশ্বিন। দুনিয়া যত এগোচ্ছে বিশ্বায়ন, ডিজিটাল দুনিয়া এইসব গালভরা নামে, অনেক কিছুই তেমন পিছিয়ে যাচ্ছে। এই দেখ না, আশ্বিন পিছিয়ে কেমন আষাঢ় হয়ে গেছে! নিভাননী নিজের মনেই বিড়বিড় করছেন। তাঁর বয়স প্রায় আশি। জরাগ্রস্ত শরীর, কোমরে ব্যথা, হাঁটুর জোর কমে গেছে। নাতনি মিষ্টু নিভাননীকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে রেখে গেছেন। এই আবহাওয়ায় বৌমা আবার তার বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়েছে পুজোর বাজার করতে। কী যে এত কেনাকাটা! পুজোর দুদিন আগেও শেষ হয় না।
আহা! নিভাননীদের সময়কালে পুজোর বাজার! ফুলিয়া থেকে তাঁতিরা এসে শাড়ি দিয়ে যেতেন। কী সব নকশা! কী রঙ! খোল কী মসৃণ! বিষ্ণুপুর থেকে তাঁতিরা নিয়ে আসতেন বালুচরী শাড়ি। নতুন শাড়ির গন্ধে ম-ম করত বাতাস। গা- ভরা গয়নায় সেজে বাড়ির বৌ-রা মেতে উঠতেন পুজোয়। নিভাননীর শ্বশুরবাড়িতেই পুজো হত। দেড়শো বছরের প্রাচীন পুজো। বংশানুক্রমে চলে আসছে। ষোল বছর বয়সে বৌ হয়ে শ্বশুরবাড়িতে এসেছিলেন নিভাননী। শুধু সাজগোজ নয়, নিষ্ঠা ভরে পুজো, মন্ত্রোচ্চারণ, শঙ্খ ও হুলুধ্বনি, আলপনা, চন্দন, ফুল, ধূপ আর ধুনোর গন্ধ ভেসে যেত শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের সঙ্গী হয়ে। নিভাননীদের বাগানেই কাশের ঝোপ হালকা বাতাসে কাঁপত তিরতির। ঢাকের আওয়াজে গমগম করে উঠত চারধার।

Pic. 2
ওমা! ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে এলো যে। মিষ্টুও তো বেরিয়েছে। নিভাননী কি এখন ভিজবেন বৃষ্টিতে বসে? ঠান্ডা লাগলে ওদেরই তো ভোগান্তি। তিনি গলার স্বর উঁচু করে ডাকলেন, ও কমলা, কোথায় গেলি? আমাকে ভেতরে নিয়ে যা।
কমলার সাড়া নেই। বিষণ্ণ এই ব্যালকনিতে হুইলচেয়ারে বসে নিভাননী দেখছিলেন এক ঝলমলে প্রাচীন দুর্গাপুজো। পাজি বৃষ্টিটার তাও সহ্য হল না। অকেজো এই শরীরটা নিয়ে বড়ো অসহায় বোধ করছেন নিভাননী। কমলা আসছে না দেখে অগত্যা নিজেই চেষ্টা করে ঘুরিয়ে নিলেন হুইলচেয়ারের মুখ।
কমলা ছুটে এসেছে। “ও দিদা, তোমার না তর সয় না। গ্যাসটা নিভিয়ে তবে আসব তো। নিজেই চেয়ার ঘুরিয়ে নিলে?”
শান্ত নিরুদ্বেগ গলায় নিভাননী বললেন, তবে কি তুই না আসা পর্যন্ত বৃষ্টিতে ভিজব?
কমলা বুঝতে পারল নিভাননী রাগ করেছেন, তাই হেসে বলল, রাগ কোরো না দিদা। আজ কী রান্না করেছি, শুনলেই তুমি খুশি হয়ে যাবে।
কমলা নিভাননীকে ঘরে ঢুকিয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছে দিল মুখ, মাথার চুল। গায়ের হালকা শালটা ভিজে গেছে। সরিয়ে দিল। নিভাননীকে হুইলচেয়ার থেকে উঠিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিল।
এটুকু সাহচর্যেই নিভাননীর রাগ গলে জল। হেসে বললেন, কী রান্না করলি কমলা?
–“ওমা, খিচুড়ির গন্ধ পাওনি? এরপর বেগুন ভাজব, পাঁপড় ভাজব।”
–“খিচুড়ির গন্ধ? কই না তো। আমি যে শিউলিফুলের গন্ধ পাচ্ছি রে। গাছটায় বুঝি ঝেঁপে শিউলিফুল ফুটেছে?”
–“কী যে তুমি বল না দিদা, শিউলিফুলের গন্ধ কোথায় পাবে? শিউলিগাছটা তো দাদাবাবু কবেই কেটে ফেলেছে। খুব শুঁয়াপোকা হচ্ছিল। জানলা বেয়ে ঘরে ঢুকে যেত।”
নিভাননী বললেন, ও। কেটে ফেলেছে? কই, আমাকে কেউ বলেনি তো?
কমলা জবাব না দিয়ে রান্নাঘরে ফিরে গেছে।
মহীতোষ পৈতৃক ভিটে ছাড়ার পর কলকাতার উপকন্ঠে একতলা বাড়ি বানিয়েছিলেন। বিশাল বাগান। তাঁর মৃত্যুর পর মনীশ সেই বাড়ি ভেঙে দু-তলা এই ফ্ল্যাট বাড়িটি বানালো। নিভাননী চোখের জল গোপন করে বলেছিলেন, খোকা, শিউলিগাছটা কাটিস না। গাছটা তোর বাবা নিজের হাতে লাগিয়েছিলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস নিভাননীর বুক থেকে বেরিয়ে মিশে গেল ঘরের বাতাসে।
আজ সপ্তমী। যা বৃষ্টি গেল এই ক’দিন। এই তো শরতের আকাশ কেমন ঝলমল করছে। কয়েক টুকরো সাদা মেঘও ভেসে যাচ্ছে। পাড়ার পুজোমন্ডপ থেকে ঢাকের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছেন নিভাননী। বৌমারা পুজো দেখে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে প্রসাদ নিয়ে বাড়ি ফিরবে। কলিং বেল বেজে উঠল। এইসময় আবার কে এলো! যাক, কমলা দরজা খুলে দেবে। নিভাননী জানালা দিয়ে আকাশ দেখায় মন দিলেন।
-” ঠাম্মা”
নিভাননী মুখ ফেরালেন। এ কী দেখছেন তিনি! সামনে দাঁড়িয়ে আছে সপ্তদশী নিভাননী। পরনে লাল ঢাকাই শাড়ি, গা ভরা গয়না। শুধু কপালে সিঁদুরের টিপ আর সিঁথিতে সিঁদুর নেই। দু- হাত বাড়িয়ে দিল মিষ্টু। অঞ্জলি ভরে শিউলি ফুল।
–” তোমার জন্য এনেছি ঠাম্মা। পাড়ার সকলে তো আর শিউলিগাছ কেটে ফেলেনি।”
নিভাননীর চোখের জল বাধ মানছে না। হাত ভরে মিষ্টুর অঞ্জলি গ্রহণ করলেন তিনি। কতদিন বাদে শিউলিফুলের সুবাস তিনি বুক ভরে টেনে নিচ্ছেন।

