শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

আমার নয়ন-ভুলানো এলে

সকলের সঙ্গে নিজের অনুভূতি ভাগ করে নেবার জন্য আজ বেছে নিলাম শরতের একটি পরিচিত গান : আমার নয়ন-ভুলানো এলে। দীর্ঘ এই গানটি নিয়ে সংহত কোন বিশ্লেষণ আজ করব না, শুধু ইতস্তত, বিক্ষিপ্ত “মনের কথার টুকরো আমার” তুলে দিলাম। সহৃদয় পাঠক নিজের মত করে “আমার মনের প্রলাপ জড়ানো” সেই কথা বুঝে নেবেন।

আমার নয়ন-ভুলানো এলে,
আমি কী হেরিলাম হৃদয় মেলে।।
শিউলিতলার পাশে পাশে ঝরা ফুলের রাশে রাশে
শিশির-ভেজা ঘাসে ঘাসে অরুণরাঙা চরণ ফেলে
নয়ন-ভুলানো এলে।।
আলোছায়ার আঁচলখানি লুটিয়ে পড়ে বনে বনে,
ফুলগুলি ওই মুখে চেয়ে কী কথা কয় মনে মনে।।
তোমায় মোরা করব বরণ, মুখের ঢাকা করো হরণ,
ওইটুকু ওই মেঘাবরণ দু হাত দিয়ে ফেলো ঠেলে।।
বনদেবীর দ্বারে দ্বারে শুনি গভীর শঙ্খধ্বনি,
আকাশবীণার তারে তারে জাগে তোমার আগমনী।
কোথায় সোনার নূপুর বাজে, বুঝি আমার হিয়ার মাঝে
সকল ভাবে সকল কাজে পাষাণ-গালা সুধা ঢেলে—
নয়ন-ভুলানো এলে।।

এই গানটির নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলির উপর আলোকপাত করা যাক:
১) পুনরাবৃত্তি : (শব্দ, বা শব্দবন্ধের)
২) ধ্বনিগত গঠন
এরপর “সাতকাহন” নামাঙ্কিত শেষাংশটি পাঠক নিছক হালকা রসিকতা বলেই ধরে নিতে পারেন। সিরিয়াস পাঠকেরা রাগ করবেন না।

পুনরাবৃত্তি

প্রথম পাঠেই এই গানের যে বৈশিষ্ট্য দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাহলে যুগ্মশব্দের বহুল প্রয়োগ — পাশে পাশে/ রাশে রাশে / ঘাসে ঘাসে / বনে বনে /মনে মনে / তারে তারে / দ্বারে দ্বারে। কিন্তু শব্দদ্বিরুক্তি এখানে আমাদের আলোচ্য নয়, আমরা আলোচনা করব গানের একাধিক অংশে একই শব্দের বা বাক্যের পুনরাবৃত্তি। প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় “নয়ন-ভুলানো এলে” বাক্যটির পুনরাবৃত্তির কথা। এরপর আসে “ফুল” —তৃতীয় ও ষষ্ঠ কলিতে। তারপর “মুখ”— সপ্তম ও অষ্টম কলিতে। প্রথম অংশে এই পুনরাবৃত্তির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করব।

আমার নয়ন ভুলানো এলে

এই গানে সর্বাধিক ব্যবহৃত হয়েছে ক্রিয়া “আসা”(এলে) এবং তার কর্তা — বিশেষ্যরূপে ব্যবহৃত বিশেষণীয় পদগুচ্ছ “নয়ন-ভুলানো”। দুইয়ের সমন্বয়ে গঠিত বাক্যটি তিনবার ব্যবহৃত হয়েছে। পার্থক্য প্রথম ক্ষেত্রে সম্বন্ধপদের ব্যবহারে (“আমার” নয়ন-ভুলানো এলে –– প্রথম কলি) এবং পরবর্তী দুটি ক্ষেত্রে সম্বন্ধপদের অনুপস্থিতিতে (নয়ন-ভুলানো এলে — পঞ্চম ও শেষ কলি)। গানের শুরু ও শেষ সেই নয়ন-ভুলানোর আগমনে ; গানের অভ্যন্তরে এবং অন্তরার শেষ কলিতেও সেই আগমনবার্তাই ঘোষিত হয়েছে। কে এই আগন্তুক ? যাকে ঘিরে এই গান সে হল শারদ শোভারই নারীরূপ। তার আগমনকে কেন্দ্র করেই একের পর এক রূপকল্পগুলি নির্মিত হয়েছে। কিন্তু কোন কোন পাঠকের ভাবনায় সেই শারদসৌন্দর্যস্বরূপিণীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতে পারেন শারদা। রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাসের প্রশ্ন এখানে অপ্রসাঙ্গিক, তাঁর ধর্মবিশ্বাস কখনই তাঁর নান্দনিক সৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করে নি, নান্দনিক প্রয়োজনে দেবদেবীর রূপকল্প ব্যবহার করতে তিনি দ্বিধা করেন নি। এই আলোকে পাঠ করলে এই গানের একাদশ কলিতে ব্যবহৃত “আগমনী” শব্দটি ভিন্ন মাত্রা লাভ করে। মনে হয় যেন এই একটি শব্দের মধ্যেই নিহিত অছে গানের মর্মবাণী। শরতের গান যেন হয়ে ওঠে আগমনী গান।

সমগ্র গানটি জুড়ে প্রচ্ছন্ন আছে এক অবয়বনির্মাণপ্রক্রিয়া। প্রথমে দৃষ্টিগোচর হয় সেই শারদসৌন্দর্যরূপিণীর চরণ, ( চতুর্থ কলি), তারপর ফুটে ওঠে তার আঁচল (ষষ্ঠ কলি), তার মুখ (সপ্তম কলি), তার অবগুন্ঠন ( অষ্টম ও নবম কলি)। অবশেষে তার সোনার নুপূর — দৃষ্টির অন্তরালে থাকলেও তার ঝঙ্কার থেকে তার অস্তিত্ব অনুমান করা যায়। এমনি করে সমাপ্ত হয় প্রতিমানির্মাণ।

ফুল

প্রথম সঞ্চারীর সঙ্গে অন্তরার যোগসূত্র — ফুলের চিত্রকল্পের প্রয়োগ। অন্তরায় ছিল ভুলুন্ঠিত ছিন্ন ফুলদল (ঝরা ফুলের রাশে রাশে…) — যারা সেই পথচারিণীর চরণে দলিত হয়ে তার চলার পথ সুগম করে দিয়েছে। এরপর সঞ্চারীতে দেখা যায় ফোটা ফুলের মেলা (ফুলগুলি ওই মুখে চেয়ে…) ।
যদিও এই গানের বর্ণনীয় বিষয় শারদপ্রকৃতির শোভা, আলোচ্য অংশে যেন প্রচ্ছন্ন রয়েছে এক গভীরতর, চিরন্তন সত্যের সঙ্কেত। শারদসৌন্দর্যের দৃশ্যপটের অন্তরালে ধরা পড়ে নিখিল বিশ্বচরাচরব্যাপী চিরপ্রবহমান প্রাণধারারই এক ছবি। তাই ঝরাফুলের পর আবার ফোটাফুল — “ আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু” গানটির সেই কলিটিই কি মনে আসে না ?
কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে…

মুখ

প্রথম সঞ্চারী ও প্রথম আভোগের মধ্যে যোগসূত্র। ফুলেরা যে মুখ অবলীলাক্রমে দেখতে পায়, সৌন্দর্যপিয়াসী মানবের দৃষ্টিতে সেই মুখ ধরা পড়ে না, মাঝে থাকে আবরণ — “মুখের ঢাকা” “মেঘাবরণ”। এইস্থানে সেই কলিটি মনে আসে :
মনে হয় যে পাব খুঁজি ফুলের ভাষা যদি বুঝি…

ফুলের ভাষা মানুষ তো আয়ত্ত করতে পারে না। তাইতো নিসর্গসৌন্দর্যলীন অরূপ মাধুরীর সন্ধানে নিরত মানুষকে প্রাণপণ প্রয়াস চালিয়ে যেতে হয়। তবে সেই প্রচেষ্টা যে সফল হবে তেমন কোন নিশ্চয়তাও নেই। পরম প্রাপ্তির ক্ষণে, একান্তভাবে কাছে পাওয়ার মুহূর্তেও যেন একটা দূরত্ব, একটা সূক্ষ্ম ব্যবধান থেকে যায় — এই মুখের ঢাকা বা মেঘাবরণকে সেই ব্যবধানের প্রতীক বলে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। মেঘাবরণ “ওইটুকু” কিন্তু তাকে ঠেলে ফেলতে “দুহাত” লাগাতে হয়, সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে হয়। এই অংশ অবগুণ্ঠন মোচনের প্রার্থনায় শেষ হয়, কিন্তু সেই প্রার্থনা পূর্ণ হবে কিনা এই গানের কোথাও তার কোন ইঙ্গিত মেলে না।

এইক্ষেত্রে শব্দচয়ন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথম কলির “মুখের ঢাকা” পরবর্তী কলিতে হয়ে যায় “মেঘাবরণ”। “মুখের ঢাকা” শব্দগুচ্ছটি একান্তভাবেই প্রতিদিনের কথ্যভাষার অন্তর্গত। কিন্তু সমাসবদ্ধ তৎসম শব্দ “মেঘাবরণ” সম্পূর্ণভাবেই সাহিত্যভাষার অঙ্গ, দৈনন্দিন জীবনের কথোপকথনে এই প্রয়োগ স্বাভাবিক নয়। আপাতদৃষ্টিতে যা একান্ত কাছের, একমুহূর্তে তা দূরের হয়ে যায়, ব্যবধান যত সূক্ষ্ম হোক না কেন তা দুরতিক্রম্য — একই দৃশ্যকল্পের জন্য প্রথমে কথ্যভাষা এবং পরক্ষণেই পরিশীলিত ভাষার প্রয়োগের মধ্যে সেই ইঙ্গিতই যেন নিহিত আছে।

ধ্বনিগত গঠন

অন্তরা : ধ্বনির স্তরে এই অংশে “শ” ধ্বনির প্রাধান্য দেখা যায় পাশে পাশে / রাশে রাশে / ঘাসে ঘাসে — তার মধ্য দিয়ে যেন ধ্বনিত হয় সেই পথিক আগন্তুকের পদপাতে ছিন্নকুসুমদলে শিশিরসিক্ত তৃণদলে সঞ্চারিত মর্মরধ্বনি। উল্লিখিত যুগ্মশব্দগুলির শেষে আছে “আশে/ আসে : এই ধ্বনিগুচ্ছের পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়ে সেই আগমনীর সুরটি আরও গভীর হয়ে বেজে ওঠে :
ওই যে আসে, আসে আসে (তোরা শুনিস নি কি শুনিস নি তার পায়ের ধ্বনি)
এই অংশের দ্বিতীয় কলির দ্বিতীয়ার্ধে সেই পথিকের চরণপাতের দৃশ্য। এই অংশের সঙ্গে পূর্ববর্তী তিনটি অংশের ধ্বনিগত গঠনের স্তরে একটা পার্থক্য রয়েছে। পূর্ববর্তী প্রতিটি ক্ষেত্রেই মুক্তদলের (open syllable) প্রাধান্য; প্রতিটি ক্ষেত্রে একবার মাত্র রুদ্ধদলের ( closed syllable) প্রয়োগ ঘটেছে।
শি-উ-ল-ত-“লার্”-পা-শে-পা-শে
ঝ-রা-ফু-“লের্”- রা-শে-রা-শে
শি-“শির্”-ভে-জা-ঘা-সে-ঘা-সে
আমাদের আলোচ্য অংশে মুক্তদলেরই প্রাধান্য থাকলেও রুদ্ধদলের ব্যবহার দুইবার।
অ-“রুণ্”-রা-ঙা-চ-“রণ্”-ফে-লে
রুণ্- রণ্ — মুক্তদলের মধ্যে রুদ্ধদলের এই পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়ে যেন তালযন্ত্রের ধ্বনি শোনা যায়। সেই লীলায়িত চরণসম্পাত যেন তালে ছন্দে বেজে ওঠে। ব্যবহৃত ব্যঞ্জনধ্বনিগুলি লক্ষণীয় : “র্” এবং “ন্”। এই ধ্বনিদুটির মিলিত প্রয়োগে যেন নূপুরনিক্কনের আভাস পাওয়া যায়। এই অংশে অরুণ রাঙা চরণ নিরাভরণ, কিন্তু দ্বাদশ কলিতে সেই চরণ ঘিরেই সোনার নুপূর বাজে। ঝরা ফুল, শিশিরভেজা ঘাসে যে স্বর্ণমঞ্জীর ঢাকা পড়ে যায়, দৃষ্টির অন্তরালে থেকে যায়, “রুণ্- রণ্”ধ্বনিগুচ্ছের পুনরাবৃত্তিতে তারই অদৃশ্য উপস্থিতি যেন শ্রতিচেতনায় রূপ নেয়।
প্রথম আভোগ : ধ্বনিগত গঠনের বিচারে এই অংশটি এই গানের মধ্যে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র । এখানে আমরা দেখি এর বিভিন্ন আভ্যন্তরীণ অংশের ব্যঞ্জনান্ত মিল বা রুদ্ধদলের মিল : …… বরণ্ / …… হরণ্ / …… মেঘাবরণ্ ।
সমস্ত গানের কোথাও এমন মিল দেখা যায় না। অন্য সব ক্ষত্রেই কলির শেষে মুক্তদলের ব্যবহার রয়েছেঃ (এলে /মেলে /ফেলে/ ঢেলে ; বনে / মনে ;ধ্বনি/আগমনী)। আর যে ক্ষেত্রে দুটি কলির আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অংশের মিল দেখা যায় সেই মিলও স্বরান্ত বা মুক্তদলের মিল। যেমন : পাশে পাশে / ……. রাশে রাশে/ ঘাসে ঘাসে (অন্তরা), …মনে মনে /… বনে বনে (প্রথম সঞ্চারী); দ্বারে দ্বারে /…তারে তারে ( দ্বিতীয় সঞ্চারী) … বাজে/…মাঝে / …কাজে (দ্বিতীয় আভোগ)।
সমগ্র গান জুড়ে স্বরান্ত বা মুক্তদলের মিল বিস্তৃতির ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। শারদসৌন্দর্যমাধুরীধারা পরিব্যাপ্ত হয়ে যায় সর্বত্র — শিউলিতলায়, বনে বনে, মনে মনে, আকাশে আকাশে। পক্ষান্তরে এই অংশের রুদ্ধদলের মিল বাধাপ্রাপ্তির অনুভূতি জাগায়। আমরা “মুখের ঢাকা” বা “মেঘাবরণ”কে পরম প্রাপ্তির মুহূর্তেও এক সূক্ষ্ম কিন্তু দুরতিক্রম্য ব্যবধানরূপে ব্যাখ্যা করেছিলাম। এই অংশের ধ্বনিগত চরিত্র সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। যে ধ্বনিগুচ্ছের পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে তার তাৎপর্য বিশ্লেষণযোগ্য। “রন্” ধ্বনিগুচ্ছের অনুপ্রাসের মধ্য দিয়ে কোন ধাতব বস্তুর সঙ্গে সংঘাতের ধ্বনি শোনা যায়। এই ধ্বনি কখনই বস্ত্রের স্পর্শজনিত ধ্বনি নয়। ওই মুখের ঢাকা কোন চিকন বস্ত্রখণ্ড নয়, তা ধাতব বস্তুর মতই কঠিন হয়ে উঠেছে। সেই শারদসৌন্দর্যস্বরূপিণীর স্বরূপ উন্মোচনের প্রয়াস যেন সম্পূর্ণ সফল হয় না ; সেই অবগুন্ঠনের দূরত্ব যেন ঘোচার নয়।
দ্বিতীয় সঞ্চারী : ব্যতিক্রমী অন্ত্যমিল। গানের বাকি অংশে অষ্টম কলি ভিন্ন আর সব কলির সমাপ্তি হয়েছে “এ” ধ্বনিতে। (এলে /মেলে/ রাসে /ঘাসে / এলে/ বনে /মনে/ ঠেলে/ মাঝে/ ঢেলে)। সবক্ষেত্রেই অন্ত্যমিল “এ” স্বরধ্বনির ব্যবহারে — ব্যঞ্জনধ্বনি এক এক ক্ষেত্রে এক একটি। শুধুমাত্র দ্বিতীয় সঞ্চারীতে অন্ত্যমিল “ই”স্বরধ্বনিতে (… ধ্বনি / আগমনী)। অন্ত্য “এ” ধ্বনির স্থানে “ই” ধ্বনির প্রয়োগ একটা পরিবর্তিত অভিমুখের সঙ্কেত। এই গানে বারবার স্থানগত বিস্তারের চিত্রটি এসেছে (শিউলিতলার পাশে পাশে/ ঝরাফুলের রাশে রাশে/ …ঘাসে ঘাসে/…বনে বনে)। “এ” ধ্বনির পৌনঃপুনিক প্রয়োগ সেই অনুভূমিক ক্রমবিস্তারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। পক্ষান্তরে “ই” ধ্বনির ব্যবহারে একটা উর্ধ্বগতির চিত্র ফুটে ওঠে। এর অংশ পর্যন্ত পটভূমি মর্তলোক— শিউলিতলা, বন, মানবসংসার। তারপর এই অংশেই প্রথম আসে আকাশ; এখানেই দ্যুলোক ভূলোকের মিলন। তাই গতিপথের পরিবর্তন ; শঙ্খরব বনে বনান্তরে ধ্বনিত হয়ে উর্ধ্বে আকাশের প্রতি ধাবিত হয় আকাশবীণার ঝঙ্কারের সঙ্গে মিলেমিশ এক ঐকতান সৃষ্টির জন্য। “ই” ধ্বনির ব্যবহার সেই আকাশমুখী গতিকে রূপায়িত করে।

সাতকাহন

আমরা উল্লেখ করেছি এই গানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল যুগ্ম শব্দের প্রয়োগ : পাশে পাশে/ রাশে রাশে / ঘাসে ঘাসে / বনে বনে /মনে মনে / তারে তারে / দ্বারে দ্বারে । প্রযুক্ত যুগ্ম শব্দের মোট সংখ্যা সাত।
এই গানে সর্বাধিক অন্ত্যমিল “এলে”ধ্বনিগুচ্ছে — এলে / মেলে / ফেলে / এলে / ঠেলে/ ঢেলে / এলে। এর সংখ্যাও সাত।
এই গানে উপস্থাপিত দুটি জগৎ — কবির জগৎ ও নিসর্গজগৎ। এই বিভাজনের মানদণ্ড সর্বনাম উত্তমপুরুষের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি। যেখানে উত্তমপুরুষ উপস্থিত (আমি, আমার, মোরা) সেখানে কোন নৈসর্গিক রূপকল্প নেই ; আবার যেখানে নৈসর্গিক রূপকল্প সেখানে উত্তমপুরুষ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। চৌদ্দকলি বিশিষ্ট এই গানে কবির জগৎ এবং নিসর্গজগৎ দুইয়ের উপস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট আছে সাতটি কলি :
কবির জগৎ : আস্থায়ী (২ কলি) প্রথম আভোগ(৩ কলি) দ্বিতীয় আভোগ (২কলি ) — ২+৩+ ২ = ৭
নিসর্গজগৎ : অন্তরা ( ৩ কলি) প্রথম সঞ্চারী ( ২ কলি) দ্বিতীয় সঞ্চারী (২কলি ) — ৩+২+ ২ = ৭
গানে কলি ও বাক্যবিন্যাসের পর্যায়েও এই একই সংখ্যার উপস্থিতি। সাতটি কলিকে একটি শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা যায় : আস্থায়ীর দুটি কলি (গানের প্রথম ও দ্বিতীয় কলি), প্রথম সঞ্চারীর দুটি কলি (গানের ষষ্ঠ ও সপ্তম কলি) প্রথম আভোগের শেষ কলি (গানের নবম কলি) এবং দ্বিতীয় সঞ্চারীর দুটি কলি (গানের দশম ও একাদশ কলি)। এই কলিগুলির প্রত্যেকটি এক একটি সম্পূর্ণ বাক্য। ‘এক কলি এক বাক্য’ এই গঠনরীতি গানে সাতটি ক্ষেত্রে অনুসৃত হয়েছে। বাকি সাতটি কলির ক্ষেত্রে এক বাক্য একাধিক কলিতে বিস্তৃত অথবা একই কলিতে দুটি বাক্যের সহাবস্থান। উক্ত দুটি গঠনরীতির প্রত্যেকটির দুটি করে উদাহরণ এই গানে রয়েছে। তিনকলিবিশিষ্ট সমগ্র অন্তরা অংশটি একটি একক বাক্য। এছাড়া দ্বিতীয় আভোগের শেষ দুটি কলিতে গঠিত একটি বাক্য। দ্বিতীয় গঠনরীতির দুটি দৃষ্টান্ত প্রথম আভোগের প্রথম কলি (গানের অষ্টম কলি) এবং দ্বিতীয় আভোগের প্রথম কলি (গানের দ্বাদশ কলি)।
দেখা যাচ্ছে এই গানের নির্মাণের বিভিন্ন স্তরে “সাত” সংখ্যার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তার কোন তাৎপর্য আছে কিনা সে বিচারের ভার আমি পাঠকের উপর ছেড়ে দিচ্ছি। কেঊ একে নিছক সমাপতন ভাবতে পারেন, আবার নিউমেরোলজিতে ব্যুৎপন্ন পাঠক এর মধ্যে হয়তো চিন্তার খোরাক পেতে পারেন। আমার নজরে আসা একটি বৈশিষ্ট্য শুধুমাত্র নির্দেশ করলাম মাত্র।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x