শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

এমন কিছু ঘটনা থাকে, যাদের কোনো বিশেষ তাৎপর্য হয়তো নেই; তবু তারা বিস্মৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করে না। আলোর ক্ষণিক স্ফুলিঙ্গের মতো তারা মনের গভীরে জ্বলে ওঠে, নিভে যায় না। কাশফুলের রেণুর মতো ভেসে বেড়ায়—নিরন্তর । তাদের অর্থ যতটা নয়, তাদের উপস্থিতিই যেন বড়।
পৌষের শেষ বিকেল। আলো ধীরে ধীরে শীতের শরীরে গুটিয়ে আসছে। উদাসীন কোলিয়ারি স্টেশন। ট্রেন থামতেই আচমকা নেমে পড়েছিলাম। চারদিকে এমন এক নীরবতা, শব্দও সেখানে পা টিপে হাঁটে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হয়তো একেই বলেছিলেন—‘হিমানী স্তব্ধতা’।
সেই স্তব্ধতার বুক চিরে দূর থেকে ভেসে আসছিল মাদল, ঝাঁঝ আর ঢোলের তাল। ধান কাটার উৎসবমুখর সুর শীতের বাতাসে মিশে অদ্ভুত আনন্দের জন্ম দিচ্ছিলো।

স্টেশনের গায়ে, শ্যাওলায় ঢাকা বৃদ্ধ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে ‘চন্দ্রা টি স্টল’। টিনের দেওয়ালে সাঁটা রবীন্দ্রনাথের বিবর্ণ ক্যালেন্ডার মুখ। নির্জনতার নীরব প্রহরী। চায়ের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে প্লাস্টিকের মোড়ক ছিঁড়ে বিড়ি ধরাতেই চোখ চলে গেল ফুটব্রিজের দিকে। এক কিশোর ধীরে ধীরে নেমে আসছে।
হাফপ্যান্ট আর মলিন গেঞ্জির ওপর চাপানো পুরোনো জোব্বা। রং প্রায় মুছে গেছে, সোনালি কাজের জায়গায় সুতো বেরিয়ে এসেছে। সন্ধ্যার শেষ আলোয় জোব্বাটা ঝিলিক দিয়ে উঠছিলো | মৃত কোনো রাজ্যের শেষ আলো যেন এখনও কাপড়টার ভাঁজে আটকে আছে। ওর চোখে একরকম ভাসা-ভাসা উদাসীনতা; চুল এলোমেলো । একবার আড়চোখে আমার দিকে তাকাল। মনে হলো, কিছু বলতে চায়।

ঠিক তখনই আকাশের বুকে অস্ত্রোপচার করে উড়ে গেল একটি এরোপ্লেন। শব্দের টানে সে মুখ তুলে আকাশের দিকে চাইল। তারপর পা থেকে শুকিয়ে-আসা পাঁক ঝেড়ে ফেলে রেললাইনের ধার ধরে শিস দিতে দিতে হাঁটতে শুরু করল।

পেছন থেকে দোকানির গলা ভেসে এল— ‘বাবু, চায়ে চিনি চলবে কি?’
-‘অল্প।’
চায়ের ভাঁড়টা হাতে দিতে দিতে সে জিজ্ঞেস করল—‘ইখানে কার বাড়িতে?’
আমি উত্তর না দিয়ে কেবল সেই দূরে সরে-যাওয়া ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললাম , ‘আচ্ছা, ওই ছেলেটি…’
দোকানি একবার তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল— ‘ও তো ঈশানীপাড়ার বোবা কিশোর’
‘মানে সত্যি সত্যি বোবা নাকি – ?’
‘হ্যাঁ গো – বাপ্ মা মরা ছেলে। কথা কইতে পারে না।’
‘আচ্ছা ও ঐরকম আজব পোশাক পরে – ‘ |
‘ওই জোব্বার কথা বলছো ?’
‘হ্যাঁ’ |
‘ওটা ওর বাপের | শিবু ঠাকুর ওই জোব্বা পরে যাত্রায় রাজা সাজতো আর লোমশ ভুঁড়ি দুলিয়ে চিৎকার করে লোকদের পেল্লায় ভয় দেখাতো |’
‘এখানে থাকে কোথায়?’
‘থাকার আবার জায়গা লাগে নাকি উর? কখনও স্টেশনে, কখনও খনির ধারে। কখনও ওই পুরনো রাজবাড়িতে ।’
‘রাজবাড়ি?’
দোকানি এবার চায়ের কেটলিটা নামিয়ে রেখে আমার দিকে তাকাল।
‘সে এখন যক্ষপুরী গো বাবু।’
‘যক্ষপুরী?’
‘হ্যাঁ। মানুষজন বলে—ভূত হাভেলি। একসময় ওই বাড়িতে এক বিকট রাজা থাকত।’
‘ এখানে ?’
‘ এইখানেই। রাজা ছিল, রাজত্ব ছিল, হাতি ছিল, ঘোড়া ছিল, সৈন্য ছিল। রাত্তিরে সাতখানা উঠোনে একসঙ্গে আলো জ্বলত।’
‘তারপর?’
‘তারপর রাজা গেল। রাজত্ব গেল। আলো গেল। শুধু বাড়িটা রইল।’

‘রাজা মারা গেলেন?’
‘কেউ জানে না।’
‘কী করে?’
‘সেইটাই তো কাহিনি। রাজাকে কেউ কোনোদিন ঠিকমতো দেখেনি।’’
‘মানে?’
‘মানে, রাজা ছিল—কিন্তু রাজাকে দেখার নিয়ম ছিল না। উনি পর্দার আড়াল থেকে কথা কইতেন। হুকুম দিতেন। কার কত মজুরি, কে খনিতে নামবে, কে নামবে না, কার ঘর ভাঙবে—সব।’
‘সে আবার কেমনতরো রাজা গো তোমাদের’?
‘সেইটাই তো কাহিনী ।’
উনুনের আগুনে শুকনো কাঠটা হঠাৎ ফেটে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রেনের চাকা রেললাইনের গায়ে ঘষে এমন এক দীর্ঘ আর্তনাদ তুলল, যেন বহুদিনের ঘুম ভেঙে কেউ হঠাৎ চিৎকার করে উঠেছে। জানলার কাঁচে একে একে মুখ ভেসে উঠল— আলো-আঁধারিতে ভাঙাচোরা রঙ মাখা কোনো পুরনো নাটকের চরিত্রের মতো। তাদের চোখগুলো স্থির, অথচ মনে হচ্ছিল প্রত্যেকেই কোথাও যেন তাকিয়ে আছে—এই স্টেশনে নয়, আরও দূরে, কোনো ভুলে-যাওয়া সময়ের দিকে। ওদের মধ্যে একজনের হাতে ছিল একতারা। সে ধীরে ধীরে দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। একবার আমার দিকে তাকাল। তারপর কিছু না বলে দাঁড়িয়ে রইল। কেউ নামল না। ট্রেনটা আবার হুইসেল দিল। তারপর ধীরে ধীরে অন্ধকারের ভিতর মিলিয়ে গেল। মনে হলো, ট্রেনটি এই স্টেশনে থামার জন্য আসেনি। শুধু তার পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার জন্যই যেন এতদূর এসেছিল—যেন কোনো অদৃশ্য যাত্রার পথে এই পরিত্যক্ত স্টেশনটুকু তার স্মৃতিতে একবার ছুঁয়ে যাওয়া দরকার ছিল।

শেষ কামরার লাল আলোটা কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে যেতে বেশ অনেকটা সময় নিল। অনেকক্ষণ সেই ক্ষীণ লাল বিন্দুটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। একসময় সেটিও হারিয়ে গেল—কুয়াশার ভিতর।
আবার নীরবতা। দোকানি কেটলির ঢাকনা খুলে চায়ের জল দেখল।
‘চা আরেক ভাঁড় দেব?’
আমি মাথা নাড়লাম। বললাম – ‘রাজবাড়িটা কত দূর?’
দোকানি আমার দিকে তাকাল।
‘কেন?’
‘এমনি।’
‘এমনি কেউ ওইদিকে যায় না।’
‘এই যে বললে কিশোর যায়।’
দোকানি চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, ‘কিশোরের হিসেব আলাদা।’
‘কীসের হিসেব ?’
‘সেইটাই তো কাহিনী গো ।’

এর বেশি সে আর কিছু বলল না। আমিও আর জিজ্ঞেস করলাম না। মনে হলো কোথাও ভারী কোনো দরজা খুলে গেল। ভাঁড়টা নামিয়ে রাখলাম। প্ল্যাটফর্মের বাতিগুলো কুয়াশার মধ্যে হলুদ ডিমের মতো ঝুলে আছে। দূরে কোলিয়ারির চিমনি থেকে ধোঁয়া উঠে আকাশের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। মাটির গায়ে কয়লার গন্ধ, শীতের স্যাঁতসেঁতে বাতাস, আর কোথা থেকে যেন এখনো ভেসে আসছে মাদলের ক্ষীণ তাল।
আমি জানি না কেন উঠে দাঁড়ালাম। আসলে দাঁড়ানোর মতো কোনো কারণই ছিল না। কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। কেউ আমাকে ডাকেনি। তবু বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর হঠাৎ মনে হলো—এভাবে বসে থাকাটাই যেন অস্বাভাবিক।

দোকানি আমাকে দেখে বলল— ‘ওদিকে যাবেন?’
ফিরে তাকালাম। বললাম,‘হ্যাঁ। একটু দেখে আসি।’
সে কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল— আপনি কি তবে সেই – ?

‘মানে ? কার কথা বলছো ?’

সে উত্তর দিলো না। আমার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। তারপর উনুনে একটা কাঠ ঠেলে দিয়ে বললে – ও রাস্তা সোজা না বাবু। ও রাস্তা মানুষরে নিয়ে যায়, ফেরায় না।’
কথাটা বলেই সে মুখ ফিরিয়ে দোকানের ভিতরে চলে গেলো। এক মরদের গলা শুনতে পেলাম , ‘এই চন্দ্রা মদটা কোথায় লুকিয়েছিস বের করে দে |’ উনুনের আগুন লম্বা হয়ে জ্বলতে শুরু করলো।

স্টেশন ছেড়ে নামতেই বুঝলাম, কুয়াশা এখানে অন্যরকম। যেন বাতাসে নয়, মাটির কাছাকাছি তার বাস। হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঘাস ভেজা। কোথাও কোথাও পুরনো কয়লার স্তূপ, তার ফাঁকে বুনো ফুল। ভাঙা স্লিপার পেরিয়ে একটা সরু পথ চলে গেছে শালবনের ভিতর। আমি হাঁটছি। মনে হচ্ছিল, কেউ যেন সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। তাকে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তার পায়ের শব্দ কানে আসছে। আমি থামলে সেও থামে। হাঁটলে সেও চলতে শুরু করে। হঠাৎ মনে হলো, কিশোর , নাকি ? ডাকতে গিয়েও ডাকলাম না। কী নামেই বা ডাকব? ‘কিশোর’? সে তো বোবা।

শালবন শেষ হতেই রাজবাড়িটা দেখা গেল। বাড়ি বললে ভুল হবে। যেন কোনো মৃত সাম্রাজ্যের কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে। ভাঙা খিলান। শ্যাওলাধরা স্তম্ভ। ছাদের অর্ধেক আকাশে মিশে গেছে। কোথাও বটের শিকড় দেওয়াল ভেদ করে নেমে এসেছে। একসময়ের রাজকীয় সিঁড়ি এখন আগাছায় ঢাকা। ফটক নেই। শুধু দুটি পাথরের স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে— প্রহরীর মতো। তাদের মাঝখান দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। পিছন থেকে কে যেন শিস্ দিয়ে উঠল।

একবার। দুবার। আমি ফিরে তাকালাম। কেউ নেই। অনুভব করলাম রাজবাড়ির ভিতর থেকে যেন মৃদু কোনো আলো এসে পড়েছে আমার পায়ের কাছে। সামনে তাকালাম। দোতলার একটি ভাঙা জানালায় সত্যিই আলো জ্বলছে। ভিতরে অদ্ভুত টান অনুভব করলাম। বহুদিনের চেনা কোনো জায়গায় ফিরে আসার মতো। যেন এই বাড়ির ভিতরে এমন কিছু পড়ে আছে, যা আমার নয় অথচ আমাকে ছাড়া তার গল্প সম্পূর্ণ হবে না।

আমি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। প্রথম ধাপে পা রাখতেই কোথা থেকে একটা শুকনো পাতা উড়ে এসে আমার পায়ের কাছে পড়ল। পাতার ওপর কালো কয়লার দাগ। খানিকটা আরো উঠতেই শুনলাম খুব ক্ষীণ একটি শব্দ। কেউ যেন বলল—‘এসেছ?’ আমি থেমে গেলাম। চারদিক নিস্তব্ধ। আবার সেই — ‘এসেছ?’ চমকে উঠলাম। ভাঙা দেওয়াল, শ্যাওলা ধরা সিঁড়ি, অন্ধকার ঘর— সব মিলিয়ে পুরো বাড়িটাই কি আমাকে জিজ্ঞেস করছে —‘এসেছ?’ আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। হাওয়ায় ছাতিমফুলের গন্ধ | এই শীতের সন্ধ্যায়, এই পরিত্যক্ত রাজবাড়ির ভিতর ছাতিমের গন্ধ কোথা থেকে আসে? সিঁড়ির বাঁদিকে একটি ভাঙা বারান্দা। চাঁদের আলো সেখানে এসে পড়েছে। আলোয় ধুলো উড়ছে। সেই ধুলোর মধ্যে এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, কারও অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। লাল শাড়ি। খোলা চুল। আমি মোবাইলের টর্চ জ্বাললাম। কেউ নেই। শুধু পাথরের কোটরে উল্টে পড়ে থাকা মরা ব্যাঙ । তার পাশে একগুচ্ছ করবী। আশ্চর্য, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ফুলগুলো এখনও টাটকা। ব্যাঙটাও কিরকম অনিবার্যরকম ভাবে টিঁকে আছে | চাঁদের আলোয় তাদের রং প্রায় কালো দেখাচ্ছে।

আমি হাত বাড়িয়ে ছুঁতে গিয়েও থেমে গেলাম। তাকিয়ে রইলাম। কেন জানি না, সেই মুহূর্তে আমার ভিতরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিল— আমি যেন এই বাড়িতে আজ প্রথম আসিনি। বরং বহুদিন আগে এখানে আসার কথা ছিল | এতদিন পরে আজ এসে সেই অসমাপ্ত পথের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েছি। কে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে? জানি না । মানুষ এমন অনেক কিছুই করে যার ওপর তার পূর্ণ কর্তৃত্ব অনেক সময়ে থাকে না | ফিরে যেতে চাইলেও পারলাম না। বরং মনে হচ্ছিল, বাড়িটার ভিতর থেকে কোনো অদৃশ্য অমোঘ টান আমাকে ক্রমশ নিজের জঠরের দিকে টেনে নিচ্ছে। যেমন শিকলে বাঁধা কোনো পশু বারবার একই দিকে ছুটে যায়— জানে না সেখানে মুক্তি আছে, না ফাঁদ; আমি আরও এগোলাম। হঠাৎ পায়ের নিচে কী যেন জড়িয়ে গেল। সামলে উঠতে পারলাম না।

সিঁড়ির ধারে পড়ে থাকা কোনো লোহার শিকল, না কি গাছের গুঁড়ি —বুঝে ওঠার আগেই পড়ে গেলাম। মনে হলো যেন কেউ আমাকে সামনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কালের চোরাগলি দিয়ে । চোখ খুলে দেখি, একটা বিশাল হলঘরের মাঝখানে পড়ে আছি। চারদিকে উঁচু দেয়াল আর মরা হাড়ের স্তুপ। ভাঙা জানালা। ছাদে কালো কাঠের কাঠামো। মেজেতে ছেঁড়া জাজিম । কোথাও আর কোনো আসবাব নেই। হঠাৎ , ঝনঝন করে ওপর থেকে একটা শব্দ উঠল। মাথা তুললাম। এক মুহূর্তে হলঘরের সমস্ত ঝাড়বাতি জ্বলে উঠল। এত আলো যে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। আলোয় হলঘরটাকে আর পরিত্যক্ত লাগলো না। মনে হলো, এইমাত্র এখানে সভা বসেছিল। কোনো একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে | বাইরে কোনো এক প্রান্ত থেকে বুনো কর্কশ হাসি অন্ধকারের ওপর আছড়ে পড়লো |

‘এইইই – দেখো! দেখো …. হা হা হা হা— !’ হাসিটা হলঘরের চার দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। উঠে দাঁড়াতে চাইলাম। পারলাম না। কেউ যেন আমার পা আটকে রেখেছে। কে ? সর্দার নাকি মোড়লের দলবল ? মেঝের ওপর লম্বা একটা ছায়া বর্শাফলকের মতো দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আমায় ক্রমশ গ্রাস করতে এগিয়ে আসছে । ছায়াটার সঙ্গে কোনো মানুষের শরীর মিল নেই । আবার সেই অট্টহাসি। হঠাৎ কোথা থেকে একটি লাল কাপড় উড়ে এসে আমার গায়ে জড়িয়ে গেল। আমি হাত দিয়ে সরাতে গেলাম। কাপড়টা যেন আরও শক্ত হয়ে জড়িয়ে ধরল। ঠিক তখনই খুব কাছে একটি নারীকণ্ঠ কেঁপে উঠল— ‘না… না… ওকে ছেড়ে দাও।’

‘না। ওকে আজ আমি আবার ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দেব। ওর যৌবনকে আমি লেহন করব না—ছিন্নভিন্ন করে দেব। ওর প্রতিবাদের শেষ চিহ্নটুকুও আমি মুছে দেব।‘
‘তোমাকে আর ভয় করি না, । তুমি যতই ভয়ংকর হয়ে ওঠো— ও ফিরে এসেছে। সেদিন তোমায় বলেছিলাম মনে আছে –’
‘কি বলেছিলে সেদিন ? বলো – এক্ষুনি বলো !’
‘বলেছিলাম বেঁচে উঠবেই , ও কখনো মরতে পারে না | আজ সে ফিরে এসেছে | তোমার ভয় দেখানোর ব্যবসা বন্ধ করবে। তোমার এই জুজুর পুতুলের সাজ— ক্ষমতার এই মিথ্যে মুখোশ— সে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দেবে |’

হাসি থেমে গেল। চারদিকটা যেন আচমকাই থমকে দাঁড়াল। এতক্ষণ যে অন্ধকারের ভিতর দিয়ে তার কণ্ঠস্বর ভেসে আসছিল, সেই অন্ধকারই এবার ধীরে ধীরে ঘন হয়ে এসে আমাকে ঘিরে দাঁড়াল। রাজা আর কিছু বলল না। শুধু কোথাও থেকে তার দৃষ্টি যেন আমার ওপর এসে স্থির হয়ে রইল। দূরে, রাজবাড়ির কোনো অদৃশ্য প্রান্তে, আচমকা তীব্র শব্দে একটি লোহার দরজা ভেঙে পড়ল। তারপর নিস্তব্ধতা। শুধু বাতাসে ছাতিমফুলের গন্ধ। এই গন্ধের কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। শুধু মনে হলো, এ গন্ধ আমি কোথাও ফেলে এসেছিলাম |
আর তখনই গায়ে আস্তেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা লাল শাড়ির ভাঁজের ভিতর থেকে যেন একটি হাত বেরিয়ে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল। সেই স্পর্শকে অস্বীকার করার আর কোনো উপায় রইল না। আমি চমকে উঠলাম। এ যেন সেই পুরনো স্মৃতি—যে স্মৃতি বহুদিন ধরে অন্ধকারে বসে ছিল, আর আজ আমাকে দেখতে পেয়ে হঠাৎ সমস্ত শক্তি দিয়ে বেঁধে ফেলতে চাইছে |

কোথা থেকে একটি লাল বিন্দু অন্ধকার কেটে নেমে এল। মেঝেতে পড়তেই বুঝলাম— করবী। তারপর আর-একটি। তারপর আরও -একটি। তারপর ফুল পড়তেই থাকল।মেঝেটা ভরে গেলো | অনুভব করলাম অন্ধকারের ভিতর থেকেই কেউ মুঠো মুঠো লাল স্মৃতি ছুড়ে দিচ্ছে। আমি যেন ধীরে ধীরে রক্তকরবীর মধ্যে ডুবে যাচ্ছি। খুব কাছ থেকে সেই নারীকণ্ঠ পুনর্বার ভেসে এলো |

‘সময় হয়েছে শেষ আঘাতের | ওরা এখনও অপেক্ষা করে।’

‘কার জন্য?’

‘যে একদিন ফিরে এসে দরজা খুলবে। যে দরজা মানুষকে আটকে রাখে, সে দরজা ভাঙতেই হবে তোমায়।’

কোথাও যেন লোহার শিকল নড়ে উঠল। মেঝের নীচে কোথাও যেন হাজার হাজার পায়ের শব্দ উঠছে। ধীরে। তারপর দ্রুত। আরও দ্রুত। যেন এতদিন মাটির তলায় চাপা পড়ে থাকা কোনো বিশাল জন্তু হঠাৎ তার শরীর নাড়িয়ে জেগে উঠেছে। দূর থেকে চিৎকার ভেসে এল। সেই নারীকণ্ঠ, এবার যেন সমস্ত অন্ধকারের কণ্ঠ হয়ে, বলছে — ‘ফিরে এসো, রঞ্জন। ফিরে এসো | তারপর শত শত কণ্ঠ এক সঙ্গে স্লোগান – ফিরে এসো, রঞ্জন। দরজা খোলো!’
একজন লোহার দরজা ভেঙে বেরিয়ে এল। তার কপাল ফেটে রক্ত ঝরছে। হাতে এখনও শিকলের একটা অংশ। তার পেছনে আরও অনেকে। কেউ খালি হাতে, কেউ গাঁইতি শাবল নিয়ে, কারু হাতে কোদাল ।

প্রাসাদের উত্তর দিক থেকে প্রচণ্ড শব্দ হল। আরও একটি বিশাল দরজা ভেঙে পড়ল। ধুলোয় ঢেকে গেল করিডর। তার ভিতর দিয়ে মানুষের ঢল নেমে এল।যে প্রাসাদ এতদিন তাদের কাঁদার শব্দ গিলে খেয়েছিল, সেই প্রাসাদ আজ তাদের পদধ্বনিতে কেঁপে উঠছে। কোথাও কাঁচ ভাঙছে। কোথাও লোহার সিঁড়ি কাঁপছে। তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে মানুষের চিৎকার, শিকল ভাঙার আওয়াজ, দরজা ভাঙার শব্দ। পুরো যক্ষপুরী যেন আর প্রাসাদ নেই। একটি যুদ্ধক্ষেত্র।

আর সেই বিশৃঙ্খলার মাঝখানে হঠাৎ তাকে দেখা গেল। কোথা থেকে সে এসে দাঁড়িয়েছে, কেউ জানল না। চারদিকে তখন ধোঁয়া, ছাই, ভাঙা লোহার শব্দ, ছুটে চলা মানুষের পায়ের ধুলো। সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে সে যেন আগুনের ভিতর থেকে উঠে আসা কোনো অবিনাশী প্রতিমা। তার চুল বাতাসে উড়ছে, মুখে কোনো আতঙ্ক নেই। হাতে অস্ত্র নেই—তবু সমস্ত অস্ত্রধারীর চেয়ে তাকে বেশি শক্তিশালী মনে হচ্ছে। সে সামনে দাঁড়িয়ে হাত তুলল। তার কণ্ঠস্বর এবার আর কোনো নারীর কণ্ঠস্বর বলে মনে হলো না। বহুদিন নীরব নিষ্পেষিত নিরন্ন মানুষের বুকের ভিতর থেকে একসঙ্গে উঠে এল— আর পিছিয়ে যেও না! যে আগুন আমাদের পুড়িয়েছে, সেই আগুনেই আজ পথ তৈরি হবে। সামনে এগিয়ে চলো। আজ আর থামার সময় নেই। । ওর গলায় মালা দেখে , মনে হলো ধ্বংসের শেষ প্রান্তেই হয়তো জন্ম নেয় বিদ্রোহের প্রথম করবী ফুল।
কোনো এক সম্মোহনী শক্তি আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরল। মনে হলো, আমি আর নিজের ইচ্ছায় দাঁড়িয়ে নেই—কোনো বিস্মৃত সময়, কোনো অসমাপ্ত ইতিহাস আমাকে ভেতর থেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তার দিকে। কত মানুষের পদধ্বনি, কত চাপা আর্তনাদ, কতদিনের জমে থাকা আকাঙ্ক্ষা যেন এক মুহূর্তে এসে আমার বুকের মধ্যে জেগে উঠল।

নিজের অজান্তেই তার দিকে ছুটে যেতে যেতে আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এল— নন্দিনী!

আমার বুকফাটা সেই আবেগের চিৎকার যেন মুহূর্তেই শিবিরের গোপনীয়তা ভেঙে দিল। নিমেষে সব আলো নিভে গেল। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার চিরে দুটো তীক্ষ্ণ টর্চের আলো এসে সরাসরি মুখের ওপর পড়ল।চোখ ধাঁধিয়ে গেল। তারপর—

‘Sir, এই তো এখানে! শালা লুকিয়ে আছে’ |
‘Okay. Cordon him. পালাতে যেন না পারে।‘
চারদিক থেকে বুটের শব্দ এগিয়ে এল। টর্চের আলো এদিক-ওদিক ছুটতে লাগল। এতক্ষণ যে অন্ধকারকে ইতিহাসের কোনো গভীর গোপন দরজা বলে ভেবেছিলাম, হঠাৎ মনে হলো—তারও নিজস্ব পুলিশি ব্যবস্থা আছে।
তারপর আরও কিছুক্ষণ পরে,মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে একজন অফিসার গোছের হোমরাচোমরা বললে — ১৯৭১—You are under arrest.
‘For what ?’
‘আপনি anti-national ?’
‘প্রমাণ ?’
‘ওয়ারেন্ট ’|

তারপর , অনেক পর , ভোরের দিকে, পুলিশের গাড়িটা যখন গ্রামের কাদামাখা পথ ধরে এগোচ্ছিল, চাকার নিচে জমে থাকা জল ছিটকে জানলার কাচে এসে পড়ছিল। কোথাও কোথাও গাড়ি এমনভাবে দুলে উঠছিল যে মনে হচ্ছিল, সে-ও যেন রাতের সেই ঘটনার ভার সামলাতে পারছে না।
একসময় পুলিশের গাড়িটা কাদাজলে আটকে গেল | চাকা ঘুরছে, কাদা ছিটকে চারদিকে উড়ছে, কিন্তু গাড়ি একচুলও এগোচ্ছে না। বন্দুক আছে। গুলি আছে। হাতকড়া আছে। আইন আছে। হুকুম আছে। শুধু গাড়িটাই আর কিছুতেই এগোতে চাইছে না। সেই সময় চোখে পড়ল— রাস্তার ধারে উঁচু একটা ডালে বসে আছে কিশোর। কানে গোঁজা নীলকণ্ঠ পাখির পালক। পরনে জোব্বা | ভোরের কুয়াশায় তার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না | সে এমনভাবে হাসছিল, যেন সে জানে—যে ক্ষমতা এতক্ষণ ধরে সবাইকে ভয় দেখিয়ে এসেছে, পাকে পড়লে তারও হাঁটু কেঁপে ওঠে ; যেন সে জানে – ক্ষমতার গায়েও কাদা লাগে আর তখন তাকে সার্কাসের ক্লাউন ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না |
একজন সেপাই তার দিকে তাকিয়ে বলল—
— আচ্ছা, ও ওরকম হাসছে কেন?
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
তারপর বললাম—
— সেইটাই তো কাহিনি।

কি বুঝলো জানিনা । বন্দুকটা কাঁধ বদলি করে আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বললে –
‘আপনি তো মশাই আচ্ছা বেওকুফ । এইতো সময় । পালাচ্ছেন না কেন ?’
আমি বললাম – ‘সেটা আরেক কাহিনী । চলুন যেতে যেতে বলবো ।’

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x