শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

“ফুল বলে ধন্য আমি মাটির পরে”
অন্তরের গহীনে নিহিত প্রাকৃতিক চেতনার রূপ ব্যক্ত হয়েছে কবির ভাষার স্পর্শে। নির্বাক আঙ্গিক বাচিকের মাধ্যমে এক অব্যক্ত ভাষা রচিত হয়ে চলেছে প্রকৃতির অন্দরে, যার সবাক সাক্ষী আমরা। যার স্পর্শ আছে শব্দ নেই। শব্দের সন্ধান করে চলি আমরা। মানুষের পঙ্গপাল। পঙ্গপালের মানুষ।

মাটির গর্ভস্থিত জলে বীজ ভ্রুণ আকারে নিহিত হয় নিঃশব্দে নীরবে। মাটি ফুঁড়ে সেই ভ্রুণ চারাগাছ আকারে তার প্রাণ সঞ্চারিত করে ডালপালা শাখা প্রশাখার বিস্তারের মাধ্যমে। রূপান্তরিত চারাগাছ রূপ নেয় বৃক্ষের, বৃক্ষ মাটির চেতনার অস্তিত্ব বহন করে চলে তার শতাব্দী প্রাচীন অন্তরের গভীরে। এ এক আত্মিক বন্ধন জলপ্রপাতের ধারায় প্রবাহিত হতে থাকে নদীর মতোই…

পাখি প্রজাপতি ফড়িং মৌমাছি আরো আরো কতো প্রাণের সমষ্টির আধার স্বরূপ আবার তারাও বৃক্ষের আধার স্বরূপ একে অপরের সাহচর্যে সহমর্মিতায় ঋতু পরিবর্তনের কালচক্রে চক্রাকারে ফুল ও ফলের সমাহারে পৃথিবীকে আন্দোলিত করে, সুবাসিত করে তুলছে। কিন্তু সেখানে আমি’র সন্ধান কোথায়!

জল, মাটি, বৃক্ষ, ফুল, ফল, পাখি, মৌমাছি এই একক প্রাণের মিলিত, সমষ্টির জীবজগৎ আমাদের দৃষ্টিতে প্রান্তিক প্রাণ, এবং সকলে একক স্তরে এক এক আমি হয়েও যেন এক আমরা’র চেতনায় সমষ্টিগত ভাবে কখনও সন্ন্যাসী আবার কখনও সংসারী হয়ে নির্বাণের পথে যাত্রা করে চলেছে প্রবাহমান কাল ধরে…

প্রাকৃতিক নির্বাণের গূঢ় তত্ত্বের ভিত্তি ভূমির ওপর দাঁড়িয়েই মানুষ তার নিজস্ব অস্তিত্বের সন্ধান পায়। নিজেকে মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে কিন্তু মনুষ্যত্বের সন্ধান পায় কি! প্রকৃতি তার নিজস্ব ধারাবাহিকতায় অক্লান্ত ভাবেই সংসারের মায়াজালে সম্পূর্ণ জীবজগৎ তথা প্রাণীকূলকে বেঁধে রেখেও মুক্তমনের নির্বাণের পথ দেখিয়ে চলেছে অনন্ত কাল ধরে… মানুষের দৃষ্টিতে প্রান্তিক জীবজগৎ প্রকৃতিকে আধার করেই তারাও তাদের অলিখিত নিয়মগিরির মধ্যেই জীবনাচরণ করে চলেছে সংসারী হয়েও সন্ন্যাসের পথে নির্বাণের ভাবে বাতুলের আঙিনায় নিঃশব্দে নীরবে…

মানুষ একমাত্র মানুষই প্রাকৃতিক আধারকে আঁধার স্বরূপ ভাবে পার্থিব সুখ প্রাপ্তির আশায়। প্রকৃতির সহজাত সম বন্টনের ভাবনা হয়ে দাঁড়াল অপ্রাপ্তির অন্তঃসারশূন্য কঙ্কাল নিঃসাড়ে। মৃত্যু ভয়ে কুন্ঠিত হল নির্বাণের পথ। সংসারের পথে রূদ্ধদ্বার সন্ন্যাস আবার সন্ন্যাসের পথে রূদ্ধদ্বার সংসার। নির্বাণ নির্বাসিত মানবিক মনোরাজ্য হতে। প্রাকৃতিক বৌদ্ধিক জ্ঞান চর্যা অধরা আঁধার সর্বস্ব মানবিক জীবন চর্চায়! যাযাবর জীবনের পরিসমাপ্তিতে প্রকৃতির কাছে প্রান্তিক হল মনুষ্যত্বের যূথবদ্ধ পারম্পর্য। গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ সচেতন সাংগঠনিক মানুষ আবিষ্কার করল সম্পত্তির বন্টন প্রথা, যার ওপর নির্ভর করে নির্মিত হল আমি’র প্রাচীর। সহজাত যৌথতা নির্ভার হল আমি’র বস্তুবাদী জড় ভারে। ভাষা আচ্ছন্ন হল গোধূলির কুয়াশায়।


সিদ্ধার্থ আমি’র ভারে ভারাক্রান্ত অবনত অবসন্ন ক্লান্ত শরীরে খুঁজতে শুরু করেছিলেন মানবাত্মার প্রকৃত রূপ। খুঁজতে শুরু করেছিলেন প্রকৃতির গোধূলি ভাষার মাধুর্য সৌন্দর্য। খুঁজতে খুঁজতে পৌঁছেছিলেন কখনও আলার কালামের আশ্রমে কখনও উদ্দক রামপুত্তের আশ্রমে কিন্তু বিফল মনোরথের সারথি হয়ে নিজেকে নিক্ষেপ করলেন অতল নদী সাগর জল জঙ্গলের প্রকৃতির গর্ভে। নিক্ষিপ্ত চেতন শরীরের, আত্ম বিসর্জনের গভীর অবচেতনের পাঁকে খুঁজে পেলেন পঙ্কজের সন্ধান। জল জঙ্গলের নির্মম প্রতিকূলতার অন্তরে দাঁড়িয়ে প্রতিনিয়ত পঙ্কজের নীরব আত্মপ্রকাশ তাঁকে এক বৌদ্ধিক প্রজ্ঞার প্রতিবিম্বের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সিদ্ধার্থের সাক্ষাৎ হয় বুদ্ধের সাথে। নির্ভার নিরাভরণ প্রকৃতি সুজাতার নির্মিত পরমান্নের স্বাদ আস্বাদনে তিনি পান বিশ্ব সংসারের পথে মুক্তির সন্ধান। নির্বাণের পথ…বুদ্ধত্বের মনোরথের সারথি হয়ে তিনি এগিয়ে চললেন মানব পৃথিবীর উদ্দেশ্যে। প্রকৃতির সহজাত অধীত পরমান্নকে তিনি অলিখিতভাবে বিলিয়ে দিতে শুরু করলেন মানবাত্মার মাঝে বিচরণে বিতরণে।

এক একটি সভ্যতার কালাপাহাড় পার করেও, শেষ ঔপনিবেশিক সভ্যতার দুর্লঙ্ঘ্য দেওয়াল ভেঙে, ভগ্ন স্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে, কাঁটা তারের রক্তাক্ত বেড়ায় সিক্ত মনের শরীরেও আমরা পরমান্নের স্বাদ আস্বাদনে ব্যর্থ হলাম। পরমান্ন আমাদের কাছে পরম অমান্যের ভাষা হয়ে উঠল। সাম্যের চেতনায় মানুষ মানুষের প্রাকৃতিক আধার হয়ে উঠতে পারলাম না একে অপরের জন্যে। আঁধারে রয়ে গেল পাঁকে পঙ্কজের প্রকাশিত আত্মার জন্মকথার গূঢ় তত্ত্ব। নিজেদের সভ্যতার যে ইমারত গড়ে তুললাম সেখানে নিজেরাই নিজেদের প্রভু ভৃত্যের দাসত্বে বন্দী করলাম। বস্তুবাদী জড় অবচেতন দাসত্বের শৃঙ্খলিত শরীর যেন বহন করে চলেছে দূরবর্তী অতীতের দাসপ্রথার ক্রীতদাস মনুষ্য প্রাণ আজও। সূদূর অতীতের পরমান্ন অনাস্বাদিত এক মিথ হয়ে রয়ে গেল চেতন শরীরে। চেতনার স্রোত হতে যাযাবরের আদিম সোঁদা গন্ধ চোরাস্রোতে হারিয়ে যেতে যেতে মৃত কবরে মাটি আর জলের সন্ধানে অন্তর্হিত হল।


মানব শরীর কি প্রাণের সন্ধান পেল! সিদ্ধার্থের মনোরথ আমাদেরও মনোরথ কিন্তু সিদ্ধার্থ তাঁর অধীত বৈদিক শিক্ষা, যুদ্ধ বিদ্যা, রাজনৈতিক প্রকৌশলী আত্মাকে সাংসারিক আবর্ত এবং রাজসিক সুখের জাগতিক জীবনযাপনকে আত্মহত্যায় পর্যবসিত করে, একখন্ড বস্ত্র ধারণে প্রকৃতির মাঝে নিজেকে বিসর্জন করেছিলেন শুধুমাত্র সমষ্টির মধ্যে মানবাত্মার সন্ধানে তা আজ একবিংশ শতকে যাচনাতীত। রাষ্ট্রের সারথির কাছে সমষ্টির জন্যে যাচনা আজ দেশদ্রোহিতার সামিল। আমি আজ বন্দী কারাগারের ঘেরাটোপে। মানব শরীরে প্রাণের সন্ধান আজ কুয়োয় বন্দী ব্যাঙের মতোই গোঙাচ্ছে যার শব্দ আছে ভাষা নেই। মানুষ আছে, মনুষ্যত্ব নেই। শরীর আছে মূক বধির অশরীরী অচেতন আত্মার মতোই।

বস্তুবাদী শরীর বাস্তব সম্মত আত্মার প্রকাশে অসহিষ্ণুতার সহিংসতার যে পথ ধরে হেঁটে চলেছে তা প্রকৃতির কাছে এক অসংবেদনশীল মননের প্রকাশ। সংবেদনশীল প্রকৃতি আজ ক্ষয়িত গলিত এক ভগ্নস্তূপের ধ্বংস ক্ষেত্র। আমি’র মুক্তির পথ কোথায়! আমি আজ প্রান্তিক আমি’র মাঝেই। একক পরিসরে ভারসাম্যহীন, পৃথিবী নামক জনপদ এবং প্রতিটি জনজাতি। বস্তুবাদের খাঁচায় মানুষ ধ্যান জ্ঞান সম্পত্তির চক্রাকার সাংসারিক জীবনে আস্টেপৃস্টে শৃঙ্খলিত, পরাজিত এক নিস্প্রাণ দ্বীপ। দ্বীপে সপ্রতিভ আলো আছে, শব্দ আছে, গন্ধ নেই। ভাষা নেই। মূর্ত জীবনগুলো একই রকম ছন্দে গতিতে লয়ে ভাসা ভাসা। মূর্ত জীবনের দীপ গুলো সবই যেন মৃতবৎ ধূসর আত্মার এক একটি পোড়া সলতে, যাকে চিনতে পারে না প্রকৃতির সহজাত আমি। যাকে স্পর্শ করতে পারে না প্রকৃতির প্রাকৃতিক আমি। যার ভাষা বোধগম্য হয় না প্রাকৃত ভাষার কাছে। তাহলে আমি কে!

প্রকৃতির অধীত জ্ঞানকে অধিগত করে নিজস্ব প্রজ্ঞায় সিদ্ধার্থ খুঁজে পেয়েছিলেন বুদ্ধকে, বিশ্বম্ভর খুঁজে পেয়েছিলেন চৈতন্যকে, নরেন খুঁজে পেয়েছিলেন বিবেকানন্দকে আবার বিশ্বকবি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর ভাষাকে যেখানে প্রকৃতিতে ফুল আজও অক্লান্ত ভাবে বলে চলেছে “ধন্য আমি মাটির পরে”। অথচ মানুষ প্রকৃতির মাঝে নিথর নিস্প্রাণ বস্তু বিশেষ। বুদ্ধ, চৈতন্য বিবেকানন্দ এবং রবি কবি, দার্শনিক, বিপ্লবী, লেখক, সাহিত্যিক, শিল্পী সমষ্টির জন্যে সকল আমি’র বিসর্জনকে একবিংশ শতকের আমরা অযাচিত দানে স্বীকৃত করেছি। প্রকৃতি আজ তার শীতল দৃষ্টির ক্ষুধার্ত শিকারী মনের তীব্র জ্বালায় ধ্বংসের লীলা খেলায় উন্মত্ত অযাচিত ভাবেই। কারণ একে অপরের আধার আজ আলো আঁধারের শরীরি ছায়ায় বিচ্ছিন্ন। একাকীত্বের মায়ায়। আগামীতে হয়তো বিশ্বায়ন নির্ভর উন্নত সভ্যতার একবিংশ শতক মাটির কবরে মিলে মিশে মূক বধির হয়ে যাবে সিন্ধু সভ্যতার সাথেই। সেদিন অনাবিষ্কৃত সিন্ধু লিপির পাঠোদ্ধারে নিমগ্ন হয়ে খুঁজবে আজকের মানবিক একবিংশ শতকের ভাষাকে হয়তো! হয়তো বা!

একবিংশ শতকের ধ্বংসের পর মানুষ মানুষের সন্ধান পাবে কি! প্রকৃতির রূপান্তর বিভাজন পরিবর্তন পরিমার্জন এবং পরিবর্ধনে নতুন কোনো প্রাণের অস্তিত্বের সন্ধান আবার আসবে হয়তো! বিজ্ঞান তাই বলে। কিন্তু মানুষ হিসেবে মনুষ্যত্বের অস্তিত্ব আদৌ আর পাওয়া সম্ভব হবে কি! মৃত্যু ভয় মানুষকে যত না অস্তিত্বহীন করে তোলে তার থেকেও বোধহয় বেশি মানুষ তার মনুষ্যত্বের অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ! প্রকৃতির মাঝে অসহায় মানুষ আদৌ আর মানুষ হয়ে ফিরে আসতে পারবে কিনা, জানি না! হয়তো জীবজগতের অন্য কোন প্রাণ মানুষের অধিকারের অস্তিত্বে বাঁচবে নতুন কোন সভ্যতার অঙ্গনে। অন্তরে। দালানে। উঠোনে। বৈঠকখানায়। কুঁড়েতে। বস্তিতে। ফুটপাথে।


তবে আজ মনুষ্যত্বের চরম অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক একক দ্বীপের মনোরাজ্য হতে কোথাও যেন সেই করুণ শব্দ ভেসে আসছে, যে শব্দের স্রোতে জনজাতি উপজাতি ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ জাত পাত শ্রেণী বৈষম্য নির্বিশেষে আমরা পঙ্গপালের মতোই একসাথে ভেসে যাচ্ছি, তলিয়ে যাচ্ছি আবার খড়কুটোর মতো একে অপরের হাতে হাত ধরে মিলে মিশে যাচ্ছি এক বানভাসি সময়ের ডাকে। বিসর্জিত হচ্ছি কোনো এক অচেতন উষ্ণ গহ্বরের জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মাঝে, নতুন কোনো সময়ের সন্ধানে। যেখান থেকে সমষ্টির সমুদ্রের জলের ধারার শব্দ এগিয়ে আসছে ক্রমশ, ক্রমশই এগিয়ে আসছে, কাছে আরো আরো কাছে…

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
সৌরভ হাওলাদার
সৌরভ হাওলাদার
1 month ago

মানুষ পৃথিবীর একক অধীশ্বর নয়, একথা আমরা অনুভব করিনা। সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা জীব এবং জড়ের অধিকারেই বৃহৎ ‘আমি’-র পরিচয়। সুলিখিত রচনাটি পড়ে ভাল লাগল।

Dwaipayann Goswami
Dwaipayann Goswami
1 month ago

“সভ্যতার সংকট” পড়তে পড়তে বিলীন হলাম ধ্বংসের স্রোতে। ভাবছিলাম বিপন্ন প্রজাতির জীবকূলের অস্তিত্ব আরও বেশি করে সংকটে পরবে। লেখিকাকে ধন্যবাদ জানাই এরকম একটি প্রবন্ধ লেখার জন্য।

শৌভিক দে
শৌভিক দে
1 month ago

লেখাটির বিষয় কঠিন, ভাষা কঠিনতর। বাংলা ভাষার ঝঙ্কার রয়েছে ছত্রে ছত্রে , ভাল লাগে। কিন্তু আরেকটু সহজ হতে পারে কি বাকভঙ্গী? পাঠ প্রতিক্রিয়া সহজ হত তবে। অবশ্য এ মতামতের বেশি গুরুত্ব দেওয়া অপ্রয়োজনীয়।

3
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x