
— আরে, এবার গাড়িটা ছাড়ুন, সবাইতো এসে গেছে।
–না দিদি, সেই টুপি পরা মহিলা উধাও। আচ্ছা বলুন তো, উনি যে এত গাছ সংগ্রহ করছেন, বাড়ি পর্যন্ত বাঁচবে?
এই গাছ-মানবী হলেন আমাদের গ্রুপের আমলকিদি। যে বাঁকটি হাইওয়ে দিয়ে জুড়ে রিং রোড তৈরি হয়েছে, সেই দৃশ্য-বিন্দুতে যখন দলের সবাই ভূমি-দৃশ্য বা ল্যান্ডস্কেপ দেখতে ব্যস্ত ছিল তখন আমাকে বিরস বদনে পাহাড়ি ধাপে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘সঙ্গে আমলকি আনেননি?’
পাহাড়ি পথে আমার গা গুলোয়। এতখানি উচ্চতায় গরমও লাগছিল। অথচ সেই ছোটবেলার পাহাড় মানে এই ভরা গ্রীষ্মেও দুখানা সোয়েটার গায়ে জুবুথুবু। পিয়া বলল, ‘বুঝলে, ব্যাপারস্যাপারও সব অফবিট।’ তারপর থেকেই ‘অফবিট’ শব্দটা আমার ভয় অথচ অন্যরকম আনন্দেরও প্রকাশ হয়ে উঠল। এই দূরত্ব কমানোর পন্থা দেখে আরও বমি পেল। পাহাড় কেটে ধূলিসাৎ। তিস্তা অববাহিকায় আছড়ে পড়ছে হত্যালীলার নীরব আর্তনাদ, আমরা যা উপভোগ করছি। আমলকিদি আপন খেয়ালে আনাড়ি পথে পা বাড়ালেন হয়তো কোনো গাছ গাছড়ার খোঁজে। পাহাড় জুড়ে এত হোমস্টে, কংক্রিটের আধিক্য দেখতে দেখতেও ক্লান্ত হয়ে গেছি। আমলকিদি যেন তারই ফাঁকে একটু ছায়া।

আমলকি দি
যাচ্ছি বার্মিক। লোটাকম্বল নিয়ে আমরা দুজন নয় নম্বর প্ল্যাটফর্মে হাজির হলাম। আমাদের ট্যুর ম্যানেজার সেরকমই বলেছিলেন। তাঁর তৈরি ওয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও আমাদের ছবি পোস্ট করলাম, চিনতে যাতে অসুবিধা না হয় ভেবে। নির্দ্ধারিত সময়ের প্রায় ঘণ্টা খানেক পেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও বাকি পর্যটকদের তথা ম্যানেজারের দেখা না পেয়ে ফোন করলাম। তিনি অবশ্য ফোনটি ধরেই বললেন, ‘ট্রেন তো অনেকক্ষণ প্ল্যাটফর্মে দিয়ে দিয়েছে, আপনারা ওঠেননি কেন? অন্যেরাও তো উঠে পড়েছে।’ একটু হতভম্ব হলাম বটে তবে ঘড়ি দেখে এগারো নম্বরের দিকে তড়িঘড়ি ছুটে গেলাম। নির্দিষ্ট আসন খুঁজেও পেলাম, সঙ্গে ম্যানেজারকেও। আমার বান্ধবীর সিট ছিল পাশের কম্পার্টমেন্টে। অনুরোধ করায় ট্যুর ম্যানেজার অবশ্য নিজের সিটখানি তাঁকে ছেড়ে দিল। প্রবল গরমে স্লিপার ক্লাসে আমাদের যাত্রা শুরু হল। তারপর পিয়া-পতির ঘন ঘন ফোন, ‘তোমরা সব ঠিক আছো তো ? দলের লোকজনকে কেমন বুঝছ?’
এসব শুনে আমার হাসি দেখে পিয়া বলল, ‘প্রথমবার পরিবার ছেড়ে এভাবে বেরোচ্ছি তো, তাই।’
আমি বললাম, ‘শুধু তাই কি? ভালোবাসার দায় কি কিছুই নেই!’
আমার এক দিদি, রোমিতার বর তো স্বীকারই করে নিল, ‘এই বয়সে একা ওকে কোথাও পাঠাতে চান না।শত হোক, বিয়ের পর দিদির ভালো মন্দের দায়িত্ব তো তাঁরই।’
পিয়া ও আমি বাড়ি থেকে বয়ে আনা মুড়ি মাখা চিবতে চিবতে নিজেদের জীবনের ঝাঁপি খুলে বসলাম। কিছু গল্প হারিয়ে গেল গঙ্গায়। সন্ধ্যার দক্ষিণেশ্বর তখন আমাদের নয়ন জুড়ে। ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে শুরু করল হৃদয়ের উত্তাপ। জীবনের যত অভিযোগ অন্ধকার কাটাতে কাটাতে এক একটা স্টেশনের আলোয় ঝলমল করে উঠল। আমরা পেরেছি। আমরা বেরতে পেরেছি, ছাড়তে পেরেছি, নিজেদেরকে শৃঙ্খল মুক্ত করতে পেরেছি। পিয়ার আয়নাতে আজ অন্য আরেক পিয়া হাজির।
–ভাবতে পারছ, এই বয়সে নতুন করে শুরু করা কতটা কঠিন? আমি একটা নার্সারি স্কুলে কাজ শুরু করেছি। বয়স পঞ্চাশ। চাকরির বাঁচাবার জন্য প্রতিদিন বাসি রুটি খেয়ে ছুটতে হয়। মেয়ে বলছে, ‘তাও ছোটো, বাড়ি থেকে বেরোও, নইলে তুমি পাগল হয়ে যাবে।’ তবে ছোট ছোট শিশুদের ওপর আমাকে অত্যাচার করতে হয়। যে বয়সে ওদের খেলাধুলা করার সময় সেই বয়সে ওদের জবরদস্তি তথ্যে ঠাসা মগজ তৈরি করে বলাতে হয়, ‘দ্যাখো, আমি বাড়ছি মামি।’
ওঁর কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছিল যে আমি খুব ভাগ্যবান যে আমি একটা অতি সাধারণ সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত ইস্কুলে পড়েছি যেখানে আমাকে যন্ত্র বানানোর কোনো চেষ্টা করা হয়নি। আমাদের ইস্কুল ছিল মাটির চালাঘর। ঘণ্টা পড়লেই জল ছিটিয়ে আমাদের ঝাঁট দিতে হত, গাছের ঝরা পাতা জড়ো করতে হত। সেই কাজে আমাদের সাংঘাতিক আনন্দ হত। মা বাবারা কেউ কখনও ছুটে আসেনি এই বলে যে আমাদের ছেলেমেয়ে ইস্কুলে ঝি গিরি করতে এসেছে, না পড়তে। একসঙ্গে সবাই মিলে সুর করে ছড়া ও নামতা শিখেছি। মাষ্টারমশাইরা পড়াতে পড়াতে ঘুমিয়েও পড়তেন। শরীরও তো যন্ত্র নয়, সুখ দুঃখ রোগ ব্যাধি চাকরি করছে বলে কি থাকতে নেই ? তাই বলে শিক্ষকদের হেনস্থার শিকার হতে হয়নি। পার্টির লোকজন ইস্কুলে পরিদর্শনও করতে আসেনি। মাস্টারমশাইরা তখন গরিব হলেও সম্মানিত ছিলেন, আমাদের গ্রামের লোকজনের পরামর্শদাতা ছিলেন। ইংরেজি অঙ্ক জ্ঞান বিজ্ঞানে আমরা তেমন পারদর্শী ছিলাম না বটে কিন্ত মাটি জল বনবাদাড়, ছোটলোকের ছেলে ভদ্রলোকের ছেলে প্রত্যেকে প্রত্যেকের কখন যে শিক্ষক হয়ে উঠেছিলাম তা আজ টের পাই। আজকে এমন অফ বিট স্কুলগুলো প্রায় ফাঁকা। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেশিরভাগ শিশুরা এখন বেসরকারি স্কুলে।
বার্মিক গ্রামটি কালিংপঙের কাছে। অফবিট পাহাড়ি গ্রামে ভ্রমণের বিজ্ঞাপনী আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই যাত্রা। পিয়া আমার ডাকেই সাড়া দিয়েছে। তাই আমার একটু চিন্তাও ছিল। বেড়ানোর জায়গাটি যেমন অফবিট, আমিও ঠিক তেমনই। ট্যারা ব্যাঁকা পথের টানে প্রায়শই বেরিয়ে পড়ি। সে সব পথ কখনও আশা জোগায়, কখনও বা ক্লান্তি। ঝুঁকি অবশ্য থেকেই যায়। গল্প করতে করতে কখন যে বোলপুর পৌঁছে গেলাম বুঝতেই পারলাম না। বেশ খানিকক্ষণ ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকায় নজরে পড়ল এই আমাদের শান্তিনিকেতন যেখানে অন্ধকারে আলো হাতে একলা দাঁড়িয়ে থাকেন রবীন্দ্রনাথ। এই অফবিট ট্যুর আমাকে নিয়ে চলল বোলপুর থেকে মংপুর রবিঠাকুরের দিকে। পাহাড় আমাকে তেমন ভাবে টানেনা। পাহাড়ি বাঁকে গা গুলোয়। তবে প্রাথমিকের বইতে রবি কবির হিমালয় ভ্রমণ বৃত্তান্তটি আমাকে হিমালয় দেখার আগ্রহ জুগিয়েছিল।
প্রথম দার্জিলিং গেলাম ক্লাস সেভেনে পড়তে। বেলা দশটায় সাঁইথিয়া স্টেশন থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস। ছোটবেলায় যখন ট্রেনে চেপে মামারবাড়ি মল্লারপুর যেতাম তখন কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস স্টেশনে ঢোকার সময় লোকজনকে একটু দূরে সরিয়ে দেওয়া হত। আমাদের চোখের সামনে দিয়ে ঝড়ের বেগে মিলিয়ে যেত। সেই ট্রেনে চড়ে হিমালয় দেখতে যাব ভেবেই অদ্ভুত রোমাঞ্চ হল। এবারে আর ট্রেনটি আমাদেরকে অহংকার দেখিয়ে ছেড়ে চলে গেল না। মা বাবা মেজো মাসি, মেসোমশাই সুব্রত দাদা, বোন সহ সকলে মিলে হৈ হৈ করে গেছিলাম হিমালয় দেখতে। মাঝপথে পড়ল মালদা। মা মাসিরা কিনে ফেলল আমের আচার। অবশ্য বাড়ি ফিরে দেখা গেল উপরে কয়েকটা আম ছাড়া বাকিটা এঁচোড়। এরকম অদ্ভুত অফ বিট আচার প্রথম চাখলাম। পিয়া হেসে বলল, ‘অফবিট কথাটা দেখছি তোমার খুব মনে ধরেছে।’
মালদা পেরিয়ে একটা আমবাগানের কাছে ট্রেনটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। আমাদের সহযাত্রী ছিলেন কয়েকজন আসামের ফুটবল খেলোয়াড়। তাঁরা লাফ মেরে কাঁচা আম পেড়ে আনল। মা ভাত আলু পোস্ত কই মাছের ঝোল রান্না করে নিয়েছিল ট্রেনে খাবার জন্য কিন্তু সেসব ছেড়ে আমরা ছোটরা তাকিয়ে রইলাম রেল থেকে কেনা ডিম ভাতের দিকে। তখন আধখানা ডিম খেতে পাওয়া আমাদের এই জোড়া ডিম ভাতের প্রতি অদম্য আকর্ষণ ছিল। খাওয়া শেষ হতেই সমানে জানালার দিকে তাকিয়ে মেসোমশাইকে জিজ্ঞেস করতাম, ‘আর কতক্ষণ পরে হিমালয় দেখব?’ আমরা ছোটরা এই প্রশ্নটা বারবার করছিলাম হিমালয় দেখবার এক আশ্চর্য আগ্রহে। মেসোমশাই দূরের মেঘ দেখিয়ে বলত, ‘ওই মেঘ পেরোলেই কাঞ্চনজঙ্ঘা।’ তারপর টয় ট্রেন। ধীরে ধীরে এগিয়ে পিছিয়ে পৌঁছে গেলাম হিমালয়ের ভিতরে। টাইগার হিল থেকে প্রথম সূর্যের আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখে মনে হল জন্ম সার্থক। তারপর সেই যে সমতলে নামলাম, দার্জিলিং হিমালয় থেকে গেল শুধু স্মৃতিতে।

কাঞ্চনজঙ্ঘা
আমি ও পিয়া দুজনেই রাত্রে খাবার জন্য বাড়ি থেকে ভাত পোস্ত নিয়ে এসেছি, সঙ্গে আবার মুসুর ডালের বড়ার টক। পোস্ত ছাড়া কয়েকদিন কাটাতে হবে, সেই ভেবে। আমাদের বীরভূমের দেশ গাঁয়ে তো যতই ভালো ভালো আইটেম মেনুতে থাক না কেন, পোস্ত রাখতেই হয়। ট্যুর কোম্পানিরাও কাস্টমার পেতে আগে থেকে বলে দেয়, ‘ রাত্রে কিন্তু আমাদের পোস্ত ভাত থাকছেই।’ কিন্তু আমাদের এই অফবিট ট্যুরে কী যে জিতবে, আমরা জানি না। পিয়ার বর তো আশঙ্কা করছেন, ‘এসব জায়গায় খাবার দাবার ঠিকমতো জোগাতে পারবে তো?’
নতুন করে স্মৃতিকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে নাম লেখালাম বার্মিক অভিযাত্রীদের সঙ্গে। বর্মিক হল কালিম্পং শহরের দশ কিলোমিটারের মধ্যে ছোট্ট একটি পার্বত্য গ্রাম। মাত্র কয়েক ঘর বাসিন্দা। অফবিট ভ্রমণের বিজ্ঞাপনী কৌশলে ডুব দিয়ে পর্ণাদিকে সঙ্গে নিয়ে উঠে পড়লাম উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেসে। পিয়াকে সঙ্গি হিসেবে পাবার আগে কয়েকজন বান্ধবীকেও অনুরোধ করেছিলাম। তাঁদের একজন শোনা মাত্র খুব উত্তেজিত হল কিন্ত পরে জানালো মহিলা গ্রুপ ছাড়া তাঁর পতিদেব ছাড়তে রাজি নয়। পিয়া এই প্রথম পরিবার ছাড়া বেরোচ্ছে। সংসার করতে করতে সে ক্লান্ত। তাঁর একমাত্র মেয়ে ছাড়পত্র দিয়েছে, ‘মা, এত ভেবোনা, নিজের সঙ্গে অনেক বঞ্চনা করেছ, এবার বের হও। পিয়াও বাড়িতে বলেছে যে এটা লেডিস গ্রুপ কিন্তু কয়েকজন তাঁদের পরিবারসহ যাবে। ইশারা করে বোঝানোর চেষ্টা করল, দলে যুবক যুবতী না থাকলে বয়স্করা পড়ে-টোড়ে গেলে টেনে তোলবারও তো লোক চাই। ওই জন্যই সে মহিলা ট্রাভেলারদের দলে যায়নি। মৌমিতা ও খুব নাচানাচি করেছিল এই ট্যুরে যাবার জন্য, ওই বিজ্ঞাপন দেখে আমাদের জানিয়েছিল কিন্তু পরে বোধোদয় হওয়াতে ত্যাগ করল। যুক্তি ছিল, ছেলে, বরকে ছেড়ে এভাবে একা একা আনন্দ ফুর্তি করা চাকরি করা মেয়েদের সাজে, গৃহবধূদের সাজে না। চাকুরিরত মহিলাদের নাকি সংসারপ্রীতি কম থাকে। আমাদের সংসারে অবশ্য প্রত্যেকেরই পাহাড়প্রীতি কম, তাঁদের নিখরচায় নিয়ে গেলেও যাবে না। কিন্তু আমি পিয়ার সঙ্গ পেয়ে পা বাড়িয়েই ফেললাম। সঙ্গে যেহেতু জুড়ে গেল মংপু ও রবীন্দ্রনাথ।
নিউ ময়নাগুড়ি স্টেশনে যখন পৌঁছলাম ঝিপঝিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। চারিপাশে নিঝুম সবুজ। মেঘলা আকাশ ছাড়িয়ে কিছুটা পথ এগোতেই চওড়া রাস্তা। পথের ধারেই পরোটা ছোলার ডাল খাবার খানিকক্ষণ বিরতি। একটা মিষ্টির জন্য মন হাঁকপাঁক করছিল, কিন্তু না, বরাদ্দ এর বেশি নয়। ডায়াবেটিক তাই কাঁটাতার পেরোলাম না। তারপর শুধুই পথ আর পথ। তিস্তাকে সামনে রেখে পাহাড়ি পথে উন্নয়নের ক্ষত। পাহাড় কাটতে কাটতে পাইনের শিকড় হতে মাটি যাচ্ছে আলগা হয়ে। স্বাভাবিক ড্রেনেজ নষ্ট করে রাস্তার একপাশ ধরে কংক্রিটের নর্দমা।
তিস্তার বুকের থেকে যত্রতত্র নুড়ি পাথর তোলা হচ্ছে। কোথাও কোথাও পাহাড় ভেঙে নির্মাণ করা হচ্ছে দীর্ঘ উড়ালপুল। পাহাড় হাসছে না কাঁদছে, কেই বা বুঝতে চায়। আমরা কেবল নিজেদের সন্তুষ্ট করতে প্রাণপণ ছুটে চলেছি।

তিস্তা
বার্মিক পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় চারটে বেজে গেল। এ তো শহরের রাস্তা নয়, সদ্য তৈরি হওয়া নয়া গ্রামীণ পার্বত্য পর্যটন কেন্দ্র। প্রায় চার হাজার আটশ মিটার উচ্চতা। ছোট্ট হোমস্টে থেকে থেকে আকাশ পানে তাকালেই কাঞ্চনজঙ্ঘা ভিউ পয়েন্ট এবং নীচ পানে তাকালে পাহাড়ি নদী। ওপারে সিকিম। বিকেলের ঝরঝরে আবহাওয়ায় এত সুন্দর দৃশ্য আমাকে টানতে পারছিল না কারণ অসম্ভব খিদেতে তখন পৃথিবী গদ্যময়। ভাত ডাল আলু ভাজা, ডিমের ঝোল পাঁপড় এই হল সেই চেনা রোজকার মেনু। হাজির হতেই উধাও। তারপর দোতলার বারান্দা থেকে দূরে অপলক চেয়ে থাকা। ধীরে ধীরে উপত্যকা জুড়ে অন্ধকার বুকের উপর মিটমিট করে জ্বলে ওঠে আলোর মালা। আমরা পথের ক্লান্তি ভুলে অন্য আরেক পৃথিবীতে প্রবেশ করলাম যে পৃথিবীতে আমি পিয়া ও দুর্গাদি। আমাদের পাশের ঘরে মালাদি ও তাঁর হিরো। কয়েকদিনের জন্য এই আমরাই আমাদের আপনজন। এরকম ভাবেই এক সংসার থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে অপরিচিতির আড়াল ভেঙে গড়ে ওঠে টুকরো টুকরো কত সংসার বাসে ট্রেনে কর্মক্ষেত্রে বেড়াতে গিয়ে, এমনকি ডিজিট্যাল সমাজ মাধ্যমেও।
দুর্গাদি বছরে ছোট বড়ো তিন চারটে ট্যুর করেই থাকেন বিভিন্ন গ্রুপে। তাঁর স্বামী সেনাবাহিনীতে ছিলেন। ফলে দুর দূরান্তে ঘর বাড়ি ছেড়ে থাকতে হয়েছে। তাই অবসরের পর শিকড় ছেড়ে বেরতে চান না। ছেলেমেয়েরাও নিজেদের কর্মক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। সচরাচর কয়েকজন মহিলা একত্রিত হলে পতিনিন্দা গল্পের অংশ হয়ে যায় কিন্তু দুর্গাদি তাঁর পতিদেবের সুন্দর সাহচর্যের কথা শোনালেন। দুর্গাদি বিয়ের আগে নাটকের দলে অভিনয় করতেন। কিন্তু আমাদের বাবা মায়েরা যেমনটা ভাবতে থাকেন যদি মেয়ের অভিনয়কেন্দ্রিক ভালোবাসা সত্যি হয়ে যায় ! তাই দেরি না করেই অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিলেন তাঁকে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তাঁর স্বামী কোনোদিন তাঁকে বিয়ের পরেও নাটক অথবা যাত্রা করতে বাধা দেননি। দুর্গাদি বলছিলেন, ‘জানো তো, এইসব অভিনয় করে তো আমি রোজগার করিনি, কিন্তু তবুও উনি ছেলেমেয়েদের ও ঘর সামলে শো করতে কখনও বাধা দেননি।’ আসলে যা কিছু সুন্দর তা কেউ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারে, সমাজের এই অচেনা পথ আমাদের গল্পে যেন অফবিট।
অনেক রাত অব্দি আমরা গল্প করলাম। পিয়া বলছিল, ‘জানো, গাড়িতে আসার সময় এক ভদ্রলোক তাঁর বউয়ের প্রত্যেক জিজ্ঞাসায় এমন খেঁকিয়ে উত্তর দিচ্ছিল, যা আমার মোটেও ভালো লাগেনি। আমার টুবাইয়ের বাবা কিন্তু এমন নয়। খুব মাথা ঠান্ডার মানুষ। সেইজন্যই ওঁর দিদিরা নিজেদের সব থাকতেও ওকেই শুধু ব্যবহার করে। তখন আমার খুব কষ্ট হয়। মনে হয়, টুবাইয়ের বাবা বিপদে পড়লে, শরীর খারাপ করলে তবেই আমার, তখন ওরা কেউ তাঁর পাশে থাকে না। কী যে আতঙ্কে ভোগে আমার সঙ্গে কোথাও ঘুরতে যেতে! ননদদের সঙ্গে না গেলে শাশুড়ির কাছে, এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। দুজনের একসঙ্গে কোথাও যাওয়া মানে সেই ননদদের ফ্ল্যাট। বুঝলে, টুবাই ব্যাঙ্গালোর চলে যাবার পর আমার আর ভালো লাগে না এভাবে ভয়ে ভয়ে বাঁচতে। ‘ এবার চিকেন ভাত খাবার ডাক এসে গেল। সেই একই – দিনে ডিম, রাতে মুরগি।
–চলো, আমরাও রিল বানাই। তুমি বলবে এখানে এসে কেমন লাগছে।
–ধুর, এসব ছেলেমানুষি।
–আরে ছেলেমানুষি খুঁজে পেতেই তো আশা।
আমাদের দলের একটি ছেলে ঘুরতে ঘুরতে আমাদের পাগলামি দেখে বলল, ‘আপনারা দাঁড়ান, ছবি তুলে দি।’
তারপর আমাকে নির্দিষ্ট করে বলল, ‘আচ্ছা, আপনি কি ফেসবুকে কবিতা লেখেন?’
–হ্যাঁ তো, তুমিও লেখ নাকি? কী নামে রিকোয়েস্ট পাঠাবো?
মালাদি এতক্ষণ চুপচাপ আমাদের গল্পগাছা শুনছিলেন। ওঁর জন্ম কর্ম সবই রাজস্থানে। ভি আর এস নিয়ে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে ফিরেছেন। দাল বাটি চুরমার গল্প শুরু হতেই হোমস্টের মালিকের ছেলে অংশু প্লেটে প্লেটে মোমো নিয়ে হাজির। আকাশে গোধূলির রঙ লেগেছে। সূর্যাস্তের আলোয় পাহাড় নতুন জন্মের অপেক্ষায়। অংশু আমাদের বাইরের ব্যালকনি থেকে প্রকৃতির সেই সন্ধ্যা আরতি দেখার চোখ খুলে দিল। ঠিক এরকম ভাবেই ডুয়ার্সের হোটেলের এক রাঁধুনি আমাকে বাইরের বাগানে ডেকে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছিলেন অসংখ্য জোনাকিভরা এক আলোকমালার অফবিট রূপকলা। ইতিমধ্যেই মালাদির মেয়ের ফোন এল। তিনি ভিডিও কলে দেখাতে লাগলেন বার্মিকের সন্ধ্যাবেলা।
কিন্তু সন্ধ্যা গড়াতেই কোথা থেকে মেঘ এসে ঝরিয়ে গেল বৃষ্টি। মালাদি বললেন, তাঁর ছোট্ট নাতনির জীবনযুদ্ধের গল্প। জন্ম থেকে যে মেয়ে ক্রমাগত নানান গঠনগত সমস্যার সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে। এই এক একটা জীবনের আলো অন্ধকারে পাহাড় কখনও আমাদের চড়াই এর দিকে নিয়ে যাচ্ছে আবার কখনও নামাতে নামাতে এমন একটা বাঁকে হাজির করছে যেখানে জীবন এবং মৃত্যুর ভিতর কোনো আড়াল নেই।
পরদিন ছিল অরেঞ্জ হোমেস্টে অভিযান। সে এক অভিযানই বটে। সাড়ে দশটায় বেরিয়ে বিভিন্ন ভিউ পয়েন্ট ঘুরে, পড়লাম এক ভয়ানক রাস্তায়। পুরো রাস্তাটা অত্যন্ত এবড়োখেবড়ো, পিচের লেশমাত্র নেই। কোথাও কোথাও আবার ধ্বস নেমে এমন অবস্থা যে গাড়ি থেকে নেমে ঠেলা মেরে গাড়িকে তুলতে হচ্ছে। পিয়া বলল, ‘এইজন্যই ইয়ং ছেলেদের দরকার। আমাদের দলের প্রবীণ নবীন সকলেই অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন। পূর্ববর্তী সরকার ও নতুন সরকার নিয়ে নানান তর্কবিতর্কের মধ্যে খিদে বাগ মানল না। পিয়া তাঁর ঝুলি থেকে বাড়ি থেকে বয়ে নিয়ে আসা মুড়ির কৌটোটি খুলে আমাদের দিকে বাড়িয়ে দিতেই গরম তর্ক নরম হয়ে পুনরায় সকলকে ঐক্যবদ্ধ করল। এরপর হঠাৎ আমাদের চারটি কনভয় আরও জঘন্য একটি বাঁক দিয়ে ক্রমশ গড়াতে গড়াতে যেখানে থামল সেখানে দেখি অজস্র কমলালেবুর গাছের পাতায় চিকন রোদের ছোঁয়া। বাইরের প্রশস্ত লনে দোলনা। পিয়া ও আমি গাড়ি থেকে নেমেই সটান ছেলেমানুষের মতো সেখানে দোল খেতে শুরু করলাম। ঘর সংসারে তো আমরা এমন ছেলেমানুষি করার সুযোগ পায় না। সং সাজতে সাজতে কবেই আসল আমিকে হারিয়ে ফেলেছি। মালাদির মুখটা একটু মেঘলা। কে যেন বলেছে, ‘সক্ষম না হলে আসেন কেন?’ তাঁর হাঁটু জোড়া নতুনভাবে প্রতিস্থাপিত। দীর্ঘ ধকলে নিজেকে ঠিক রাখতে কিছু চড়াই উতরাই এড়িয়ে গেছেন। আমারও মনে হচ্ছিল, ‘কেন যে এলাম!’ বেড়াতে গিয়ে এত ধকল নিতে ভালো লাগে না। একটা দলে অবশ্য সবাই একরকম হয় না। কেউ সময়ের আগেই বেড়াবার জন্য প্রস্তুত, কেউ আবার বরাদ্দ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও নিজের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মাঝেমধ্যেই ট্যুর ম্যানেজারের অপ্রত্যাশিত নিয়ম ভঙ্গ অথবা নতুন কোনো গাইডলাইন। এইসমস্ত পাহাড়ি বাঁক, উচ্চতা, মেঘাচ্ছন্নতা কাটিয়ে আবার ঝলমলিয়ে রোদও উঠছে। এসব দেখেই লিখে ফেললাম,
খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে দেখছি
পার্বত্য ধারার মতো বয়ে চলেছে
আমার ছেলেমানুষি….
যে পথ বলে গেল, ‘সক্ষমতা না থাকলে আসেন কেন?’
কিছু দূর এগোতেই –
সে পথের ধারাতেই ভেসে উঠছে তাঁরও প্রতিচ্ছবি
উথালপাথাল
নাম যার যৌবন।
এখন কেবল চুপচাপ দেখার পালা
বিজ্ঞাপনী কৌশলে নিজেকে নিয়ে খেলা
ভুল তো আমারই
ময়দান হাতছাড়া
খেলতে খেলতেই তোমাদের দলে এসে পড়া
আমারই গড়ে তোলা খাদের কিনার ধরে
তোমাদের পাগলা ঝোরা
শৈশব থেকে যৌবন
যৌবন থেকে মোহনা
কেবল ভুলভাল গতির দোটানা …..
ঠিক বলেছ, অপরাধ ছাড়া কাউকে আঁকা যায় না।।
মেঘ বৃষ্টিতে আমাদের প্রকৃতির আরতি দেখা ভেস্তে গেলেও স্বয়ং আরতি আমাদের কাছে এল রাত্রে খাবারের অর্ডার নিতে।
–এই যে শুনুন দাদা দিদিরা, রাত্রে যারা রুটি খাবেন তারা হাত তুলুন, আর যারা ভাত খাবেন তারা পা।
আমরা হাসতে শুরু করলাম।
এদিকে তিনি চা পরিবেশন ও শুরু করে দিয়েছেন, সঙ্গে মুচমুচে পেঁয়াজি।
–দাদারা , এদিক ওদিক না ঘুরে আগে খেয়ে নাও, ঠান্ডা হয়ে যাবে। আমার কিন্তু অনেক কাজ আছে, সেই ভোর পাঁচটায় উঠেছি, ঘুমোতে দুটো বেজে যায়।
ওর এই হাঁকডাকের ভিতর কোথাও যেন লুকিয়ে আছে মায়ের ঘ্রাণ। ছোটখাটো চেহারার প্রাণচঞ্চল মহিলার জীবন কাহিনি শুনে ওর হাসির আড়ালে বেদনার চাবিটি খুঁজে পেলাম। মালাদি বললেন, ‘জানো , মাত্র একবছর আগে হৃদরোগে আরতির স্বামী মারা গেছে। দুটো মেয়ে। মাস গেলে বারোহাজার টাকা পায়।’
–শোনো, আমার মন ঠিক নেই তাই, নইলে তোমাদের খাতির যত্ন আরো অনেক বেশি করতাম।
তারপর আমাদের দলের প্রবীণ ভদ্রলোকটিকে আদেশ করলে, ‘তোমাকে এতদূর আসতে হবে না, রুমে চুপটি করে বোসো, আমি চা দিয়ে আসছি।’
অন্ধকারে পাহাড়ি ফুল দেখছি। কমলাগাছে কুঁড়ি এসেছে। একটু পাতা টেনে গন্ধ নিলাম। আরতি বলল, ‘ শীতে এলে পেতে। কত লেবু আমরা বিলিয়ে দি তবু ফুরোয় না। প্রকৃতির দান এমনই, তাকে ভালোবাসলে সে ভালোবাসা এমনি ভাবেই ফিরে আসে। যে ভালোবাসতে জানে সে ছাড়া আর কাকেই বা বোঝাই! হাইড্রেনজিয়া ফুলের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে দুর্গাদি ভিডিও করছেন, ‘ বন্ধুরা, কেমন আছ? আমরা এখন পাহাড়ি সন্ধ্যা উপভোগ করছি। ফোনের ক্যামেরাটা ঘুরিয়ে বলছেন, ওই দেখো বন্ধুরা, পাহাড়ের কোলে কী সুন্দর চাঁদ উঠেছে। গোলাপের পাপড়ির উপর আছড়ে পড়ছে জ্যোৎস্না।’
আজ আর আমলকিদিকে দেখলাম না। হয়তো পথের ধকলে ক্লান্ত। চুপচাপ মানুষটি সকলের হাসি ঠাট্টাকে সঙ্গি করে তাঁর যাবতীয় ব্যথাকে আড়াল করে চলেছেন গাছ গাছড়া সংগ্রহের নেশায়। ধীরে ধীরে সবার নজর কাড়ল যুবক যুবতীদের গান কবিতা। চাঁদের আলোয় সুর জাগল, অফবিট গ্রামটি যেন অচেনা ছন্দে ফিরে নিজেকে হারিয়ে ফেলল আমাদের শহুরে মুন্সিয়ানায়।
জীবন মরণের সীমানা ছাড়িয়ে পরদিন দুপুরে আমরা হাজির হলাম আমার সেই বহুকাঙ্খিত গন্তব্য মংপুতে । চারপাশের পরিবেশ দেখে উপলব্ধি করার চেষ্টা করছিলাম কোন অচেনা ফুলের গন্ধ তাঁকে এই নিরালায় আচ্ছন্ন করেছিল। না, কোনো অচেনা নয়, অফবিটও নয় , চারপাশে অজস্র গন্ধরাজে ভরে আছে মৈত্রেয়ী দেবীর এই ঠিকানাখানি। ঘরের ভিতরের চেয়ে বাইরেটা দেখলাম প্রাণভরে। ইতিহাস আঁকড়ে বাঁচতে বাঁচতে কবেই মুঠো আলগা হয়ে ছিটকে গেছে ধুলো মাটি। এখন শুধুই কাঠগড়া ও বিচার। সিঙ্কোনা গাছের আড়ালে আড়ালে ,পাতায় পাতায় তাঁকে খুঁজলামও। মিউজিয়ামের বাইরে একটি কোণায় তাঁকে পেলাম যেখান থেকে তিনি আমাদের সর্বনাশ দেখছেন। তাই এই অফবিট কথাগুলোকে লিখে তাঁর চরণে নিবেদন করেছিলাম।

মংপু
“মনে হচ্ছে, তিনি আমাদের সঙ্গেই ঘুরে দেখছেন তাঁরই স্মৃতি। এই পাহাড় নদী আকাশ বাতাস সুস্থ থাক। আমরা যেন অপরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে এই পূণ্যাত্মা হিমালয়ের বিরাগভাজন না হই। পরবর্তী প্রজন্ম ভালোবাসতে শিখুক কবিকে, কবির প্রকৃতিকে।”
– ঝুমা বন্দ্যোপাধ্যায়
মংপুতে, ২৯.০৫.২০২৬
আজ লাঞ্চ এল বেলা চারটেতে। সকালে তিনটি লুচি খেয়ে বেরিয়েছি। রাত্রে শিলিগুড়ি থেকে ট্রেন। মাঝপথে আমরা আর কোনো ঝুঁকি না নিয়ে চিমনি পয়েন্টে পেটপুরে মোমো ভক্ষণ করেছি যাতে প্রত্যেকদিনের মতো খিদের জ্বালা সহ্য করতে না হয়। দুপুর তিনটেতে লাঞ্চ করার কথা বলতে মন্মথবাবু খিঁচিয়ে উঠলেন, ‘রাজস্থানে আমরা প্রত্যেকদিন বেলা পাঁচটায় ভাত খেতাম, একটু তো মানিয়ে নিতেই হবে।’ বিদ্যুৎ বাবু কোনো কথা না বলে গটগট করে বেরিয়ে গেলেন পার্কের দিকে। বৌদি বললেন, ‘যাই দেখিগে, কোথায় কি খাবার পাওয়া যায়।’ অবশেষে চারটের সময় মাছ ভাত ডাল সবজি হাজির। আমরা তো রাস্তার ধারেই একটি দোকানের বেঞ্চে বসে খেতে শুরু করলাম। বিদ্যুৎ বাবু ভাত ডালের প্যাকেট বৌদির হাতে ধরিয়ে দিয়ে তারস্বরে চিৎকার শুরু করলেন, ‘এই তোমার জন্য আমাকে চুপ করে থাকতে হচ্ছে, তুমিই খাও, আমি খাব না।’
বৌদি আমাদেরকে বললেন, ‘কি করি বলোতো, এত রাগ করলে চলে?’
আমি তাঁকে প্যাকেটটি ব্যাগে রেখে দিতে বললাম যাতে রাগ পড়লে দাদা খেতে পারেন। ফেলে দেওয়ার কোনো মানে হয় না। এতদিন মাছ না খেয়ে আজ বাড়ির মতো ডাল ভাত সবজি পেয়ে রাগ উবে গেল।
আমলকিদি তখনও গাছ সংগ্রহ করে চলেছেন। তাঁর সাদা বব কাট চুলের চারপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে পাহাড়ি ম্যাগপাই। বড়ো বড়ো পাতাওয়ালা ফার্ন আনন্দে নাচছে, আর দূরের পাইন বনের থেকে ছুটে আসছে আলো ছায়ার দ্বন্দ্ব।
–কী লিখছিস, অফ বিট কিছু?
–একদম তালকাটা, উদ্ভট, মাথা মুণ্ডহীন ভ্রমণকাহিনি।
অফবিট ব্যাপারটা এভাবেই ধরা থাক।
চার ঘণ্টা দেরিতে চলছে আমাদের ফেরার ট্রেন কাঞ্চনকন্যা। মালদা যখন ঢুকলাম তখন ভোর প্রায় পাঁচটা। পিয়া আমাকে উপরের বার্থ থেকে নামতে দেখে বলল, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেল না।’
–ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কি সেই স্বপ্নই দেখছিলিস? আরে, কাঞ্চনজঙ্ঘা নাই দেখতে পেলি, তার কন্যাদের তো দেখলি, একসঙ্গে থাকলি।
মানুষ তো শুধু চেতনে বাঁচে না, অবচেতনও তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে। যা না পাওয়া, তা অন্যভাবে পাবার জন্যও ছুটে চলা। যখন কঠিন ভয়ংকর পথে বাঁক নিচ্ছিলাম, পিয়া বলেছিল, ‘চোখ বন্ধ রাখ, তাহলে একটু স্বস্তি পাবি।’ আমি তখন হরি গুরু স্মরণ করিনি আমার অতিনিকট জনেদের জন্য হাহাকার করছি। চোখ বন্ধ করলে হয়তো প্রলয় থেমে থাকে না, কিন্তু কিঞ্চিৎ উপশম সেই মুহুর্তে দরকারও ছিল।
ট্রেনটা এখন প্রায় খালি। আমি আপার বার্থ থেকে সাইড লোয়ারে গিয়ে বসলাম। চায়ের হাঁকডাক। লোকজন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে এগিয়ে চলেছে। সেই ভিড় কাটিয়ে প্যাকেট ভর্তি সবুজ হাতে এগিয়ে চলেছেন আমাদের অফবিট মানবী আমলকীদি – কাঞ্চনকন্যা – হাত ব্যাগ থেকে উঁকি দিচ্ছে সবুজ সবুজ ডালপালা, আমাদেরই জীবনের।

