পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ইতিহাসে ও নাগরিক-মনোজগতে বিগত দেড় দশকে যে শব্দটি পনেরো বছরের ব্যবধানে দুটি বার বিপুল অভিঘাত সৃষ্টি করল, তা হলো ‘পরিবর্তন’। এই অভিঘাতের কারণ একটা স্থবিরতা থেকে উত্তরণ, যা জনগণেরই দ্বারা নির্বাচিত শাসকের ক্ষমতার অপব্যবহারে ও বিবিধ অবিমৃশ্যকারিতায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছেই প্রায় মুক্তির সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। জনপ্রিয়তা রূপান্তরিত হয় জনঘৃণায়। যে রাজনৈতিক শক্তিকে মানুষ বিপুল সমাদরে, নিঃশর্ত ভালবাসায় আবাহন করেছিল, সেই শক্তিকে সেই মানুষই নিক্ষেপ করে আবর্জনার স্তূপে চরম ক্ষোভে, অপরিসীম তাচ্ছিল্যে, চূড়ান্ত অবহেলায়। হাজার দোষ-ত্রুটি, বহু ফাঁক-ফোকর সত্ত্বেও গণতন্ত্রের এই ক্ষমতাটুকু পৃথিবীর কোনো সর্বজনস্বীকৃত শাসন-প্রণালী অদ্যাবধি অস্বীকার করতে পারেনি। সেই দিক দিয়ে পরিবর্তনের প্রকৃত কান্ডারী একটি জনগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, যার রক্ষাকবচ লুকিয়ে থাকে দেশের সংবিধানের বিধিবদ্ধতায় ও মান্যতায়। সে অবশ্য এক অন্যতর ও বহুমাত্রিক প্রসঙ্গ, যা আজকের আলোচ্য বিষয় নয়।
তবে সভ্যতার ইতিহাসের পুনর্দর্শনে ‘পরিবর্তন’ শব্দটির প্রেক্ষাপট এতো সংকীর্ণ পরিসরে দেখবার উপায় নেই। একথা আমাদের অজানা নয় যে নিরন্তর পরিবর্তন ও বিবর্তনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করে এগিয়েছে মানব সভ্যতার ইতিহাস । লক্ষ লক্ষ বছর আগের যাযাবর জীবন থেকে শুরু করে মানুষের সভ্যতা পৌঁছেছে আজকের সময়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মহাকাশ যুগে। শিকারি-জীবনের যাপন-প্রক্রিয়া থেকে মানুষ যখন খ্রিষ্টপূর্ব ১০,০০০ অব্দের দিকে কৃষিকাজ ও পশুপালন শুরু করে, তখন স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠে। ‘নিওলিথিক বিপ্লব’ হিসেবে পরিচিত এটি মানব ইতিহাসের প্রথম বড় বাঁক বা পরিবর্তনের সূচনা। অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে, বহু পরিবর্তনের চৌকাঠ ডিঙিয়ে আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয় ইউরোপে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার ও যন্ত্রপাতির ব্যবহার, যা নিয়ে এলো শিল্প বিপ্লব। ফলে মানুষের শারীরিক শ্রম কমে উৎপাদনের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেলো এবং আধুনিক নগরায়ন ও বিশ্বায়নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলো। এটিই হয়তো সভ্যতার দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য বাঁক-বদল বা পরিবর্তন। তৎপরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আমরা শুনতে পেলাম প্রযুক্তির পদধ্বণি। আজকের সময়কালকে নিঃসংশয়ে চিহ্নিত করা যায় প্রযুক্তির যুগ হিসেবে। কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পুরো পৃথিবী আজ একটি বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত হয়েছে, যা আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক সুরক্ষা ও পরিষেবা, অর্থনীতি এবং সামগ্রিক চিন্তাধারায়। নতুন প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবিষ্কার ও প্রয়োগ যার নবতম সংযোজন। নিঃসন্দেহে আমরা এই সময়টিকে সভ্যতার তৃতীয় উল্লেখযোগ্য ও বৃহৎপরিবর্তনের কাল হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। এই সব কটি পরিবর্তন অগ্রবর্তী করেছে মানব সমাজকে, পরিণতিতে সুফল ভোগ করেছে মানব সভ্যতা।

এ’কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, যে-কোনো ব্যবস্থা বা কাঠামোর পরিবর্তন, সূচনা করে পরিবর্ধনেরও। একটি পরিবর্তন যখন অন্ধকার কাটিয়ে আলোয় ফেরার স্বপ্ন দেখায়, তখন সে সম্প্রসারিত হবার বীজও বুকে ধারণ করে। স্থবিরতা পরিবর্তনের পরিপন্থী, চলিষ্ণুতা পরিবর্তনের ধর্ম। অন্যদিকে তার সফলতা দাবি করে পুরোনো ধ্যানধারণা ও প্রচলিত ব্যবস্থার থেকে মুক্তি, যার জন্য প্রয়োজন হয় চলতি পথের সংস্কারের বা পরিমার্জনের। তাই পরিবর্ধন ও পরিমার্জন, দুটিই পরিবর্তনের আবশ্যিক অনুসারী ও অনুষঙ্গ। এরা সঙ্গী না হলে পরিবর্তন ফলদায়ী হতে পারেনা।
আমাদের আলোচনার সূচনায় ফিরে গিয়ে বলি, স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তনের আলোড়ন ও বিবর্তন শুরু হয়েছিল ষাটের দশকের শেষভাগে। তারপর দীর্ঘ বিরতির পর দুটি পরিবর্তনের দামামা। দুটিতেই আমূল ওলোটপালোট প্রত্যক্ষ করেছে বাঙালি। আশা ও আশাভঙ্গের নৈরাশ্যের বেদনা তার অন্তরে ক্ষতচিহ্নের মতো এখন বিদ্যমান। এই বেদনা সে কাটিয়ে উঠতে পারবে কিনা, এবং কতদিনে সেটা সময় বলবে। এক বৃহদাংশের মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সংগতি রেখে, এই রাজ্যের রাজপাটে দীর্ঘকালীন নৈরাজ্য ও অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে আশায় বুক বেঁধে সাধারণ মানুষ যে পরিবর্তনের স্রোতকে আবাহন করেছেন, নতুন সময়ের কান্ডারী ও কুশীলবরা তাকে তাঁদের কৃতিত্বের অর্জন ও প্রাপ্য জ্ঞানে অবহেলা, অশ্রদ্ধা ও অসম্মানিত করবেন, নাকি পরিবর্তনের হাত ধরে চলতি সংস্কৃতি ও ব্যবস্থার পরিমার্জনের মাধ্যমে মানুষের জীবন ও মনন উন্নত করার ব্রতে উদবুদ্ধ হবেন, তার উত্তর এখনও ভবিষ্যতের জিম্মায়।


রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।
রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত
editor@robichakro.com
Bengali identity and consciousness

