শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ক্লাস ফাইভে, ছোটনদার সৌজন্যে। ছোটনদা আমাদের বারো ঘর এক উঠোনের বাড়ির একতলায় থাকত। গরিব মায়ের সন্তান ছোটনদা আমাদের ভাইবোনদের টিউশনি পড়াত। খুবই সংস্কৃত মনস্ক যুবক। ছোটনদা তখন কলেজে পড়ে। আমাদের পাড়ায় প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস পালিত হতো। পাড়ার সকলে গান, আবৃত্তি, নাচ করত, নাটক অভিনয় করত। সেবারে ছোটনদা আমাকে বলল, ‘এবারের স্বাধীনতা দিবসে তুই মঞ্চে দাঁড়িয়ে একটা কবিতা আবৃত্তি করবি।’
আমি বললাম, ‘ছোটনদা আমি পারব না। ভয় করবে।’
ছোটনদা বলল, ‘আমি তোকে শিখিয়ে দেব। ভয় নেই। তুই সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ভালো খাবার’ কবিতাটা আবৃত্তি করবি।’
আমি মুখস্থ করে আবৃত্তি করেছিলাম। খুব ভালো কবিতা। মজার। দারুণ ছন্দ। ছোটনদা আমাকে বুঝিয়েছিল, এই কবিতার শেষ লাইনটা না বুঝলে কবিতার মানেটা কিন্তু ফিকে হয়ে যাবে। ‘সবচেয়ে খেতে ভালো গরিবের রক্ত।’ ছোটনদা আমাকে বুঝিয়েছিল। গরিবের রক্ত আসলে ব্যাপারটা কী? কারা গরিব, কারা বড়লোক। সমাজে শ্রেণি বিন্যাস হয় কেমন করে। আমার মাথায় তখন সবকিছু ঢোকেনি। কিন্তু আমাদের আশপাশের সময় যে তখন অত্যন্ত অশনিময়, সেটা বুঝতে পেরেছিলাম। গলির মোড়ে মাঝে মাঝেই বোমা পড়ে, পুলিসের টহল, পাইপগান হাতে দুই পাড়ার টকাই-বকাইয়ের লড়াই। সকালে পাড়ার নর্দমায় পড়ে থাকে গলাকাটা লাশ। সেই সময়টাকে দেখেছি। সেই সময়ের বজ্রনির্ঘোষে ক্রমেই এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল ছোটনদার ভবিষ্যৎ। পরীক্ষা না দিয়ে একদিন ছোটনদা বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে যায়। অনেক পরে নদীয়ায় কোনও এক কাটা খালের পাড়ে পড়েছিল ছোটনদার গুলিবিদ্ধ দেহ।
বড় হয়ে সেই ছোটবেলার অজানা সুকান্ত ভট্টাচার্যকে নতুন করে চিনেছি। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে বুঝতে পেরেছি, ওই ছোট্ট বুকে কতটা আগুন, কতটা ঝড় তাঁকে অস্থির করে তুলেছিল। নাহলে মাত্র একুশ বছর বয়সের মধ্যে এমন তীক্ষ্ণ শলাকার মতো কবিতা লিখে যেতে পারতেন না। অপরিসীম কাব্যিক মেধা না থাকলে কোনও কিশোর কবি নিজের মাথাটাকে আকাশ ছোঁয়ার স্পর্ধা দেখিয়ে বলতে পারতেন না, ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন’।
সুকান্ত ভট্টাচার্যকে বুঝতে গেলে সেই সময়, সেই পরিপ্রেক্ষিতটাকে বোঝা দরকার। বুঝতে হবে কীভাবে তাঁর বুকের ভিতরে জেগে উঠেছিল স্পর্ধিত আবেগ, যা তাঁর কাব্যে এক বিপ্লবী উদ্ভাস, চিরন্তন সংগ্রামের বার্তা। বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে সারা বিশ্বে এক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের আভাস মিলতে লাগল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন সারা দেশে স্বাধীনতা আন্দোলনের আগুনে ইন্ধন জোগালো। প্রথম শহিদ ক্ষুদিরামের ফাঁসি। বছর কয়েকের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড আমাদের বিবেকি সত্তাকে, আমাদের মানবিক বোধকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘নাইট’উপাধি ত্যাগ করলেন। সেই সঙ্গে নতুন বিশ্বে এক নতুন বিশ্বাসের জন্ম দিয়ে গেল, সেই বিশ্বাসের মূল শক্তিই ছিল রাশিয়ার বিপ্লব। ততদিনে ভারতেও কমিউনিস্ট আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করেছে।

রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা সাহিত্যের পালাবদল


ঠিক এই সময় থেকে বাংলা সাহিত্যে নীরবে একটা পালা বদলের সূচনা হতে শুরু করল। রাবীন্দ্রিক বলয়ের বাইরে এসে নতুন ভাবনায় সৃষ্টিশীল হওয়ার তাগিদ অনুভব করলেন নতুন লেখকরা। পিছিয়ে থাকলেন না রবীন্দ্রনাথ নিজেও। তিনিও চিনতে পেরেছিলেন পরিবর্তনের দায়টাকে। তাই কবি বুদ্ধদেব বসুকে স্বীকার করতে হয়েছিল, ‘রবীন্দ্রনাথের পরেই প্রথম নতুন তো রবীন্দ্রনাথ নিজেই।‘ আঙ্গিক ও ভাবনায় পরিবর্তন আনলেও সবটুকু তিনি পারেননি। সেকথা তো তিনি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন। ‘মাঝে মাঝে গেছি আমি ওপাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে, ভিতরে প্রবেশ করি সে সাধ্য ছিল না একেবারে।’
সাহিত্যে, চিত্রে, সঙ্গীতে যখন ধীরে ধীরে এসে লাগছে পালাবদলের ঢেউ, তখন রাজনৈতিক ভাবনা ও আদর্শে এসে লাগল নতুন রঙের ছোঁয়া। সারা বিশ্বে আতঙ্ক হয়ে দেখা দিল এক অনাকাঙ্ক্ষিত শক্তি। সেই শক্তি ফ্যাসিবাদের শক্তি। রাশিয়ায় বিপ্লবের জয় সারা বিশ্বকে নতুন ভাবনায় অনুপ্রাণিত করল। ভারতেও এসে লাগল সেই ঢেউ। ১৯২০ সালে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের উদ্যোগে প্রথম জন্ম নিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। সেটা অবশ্য বিদেশে। মার্কসবাদী ভাবনা ও দর্শন অনুপ্রাণিত করছিল তৎকালীন সাহিত্যিকদেরও। একদা রেনেসাঁস যেমন নতুন যুগের মানুষকে মানবতার মন্ত্রে, জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল, তেমনই মার্কসবাদী ভাবনা কবি ও সাহিত্যিকদের সাম্যবাদের ভাবনায় অনুপ্রণিত করল। উঠে এল ‘সমাজতন্ত্র’ নামক শব্দটি। সমাজতন্ত্রের মধ্যে কবি সাহিত্যিকরা উদ্বুদ্ধ হলেন সাম্যভাবনা, নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের লড়াইয়ের কথা, তাদের জয়যাত্রার কথা লিখতে। কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার পর কাজি নজরুল ইসলাম মানবতার জয়গান করে লিখলেন,
‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর।।
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়।’
ঠিক এইরকম এক প্রেক্ষাপটে জন্ম নিলেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তিনি রাবীন্দ্রিক ভাবনায় বশবর্তী হননি, আবার কল্লোলের কবিকূলের আসরে গিয়েও বসেননি। তিনি একটা স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করে ফেললেন। খুব যে সচেতন ভাবে করতে পেরেছিলেন, তা নয়। কিন্তু তাঁর ভিতরে যে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা, যে সামাজিক ভাবনার মেলবন্ধন ঘটেছিল, সেটাই তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছে বাংলা সাহিত্যের এক নির্জন প্রান্তরে। প্রতিটি শব্দে বুনে দিয়েছিলেন জীবনের প্রত্যয়, লড়াইয়ের অঙ্গীকার। সমাজভাবনার যে স্তরে গিয়ে তিনি তীক্ষ্ণ ও শানিত শব্দে কবিতার ছন্দ ও কায়া সৃষ্টি করেন, তা যেন হয়ে ওঠে এক একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। পাঠকের চেতনার বারুদে তা যেন দ্রুত অগ্নিসংযোগ করতে সক্ষম হয়। তৈরি হয় ভালো লাগা। একইসঙ্গে বুকের ভেতর সুপ্ত বারুদে অগ্নিসংযোগ করে। নিমেষে পাঠক অনুরক্ত হয়ে পড়েন সুকান্তের কবিতার।

নজরুল ও সুকান্ত


নজরুলের বিদ্রোহের বাণীই যেন একসময় বিপ্লবের বাণী হয়ে প্রকাশ পেল সুকান্তের কবিতায়। নজরুল লিখলেন,

“আমি সেইদিন হব শান্ত
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না—’
সুকান্তে কবিতায় সেই প্রতিবাদ আরও ভয়ঙ্কর হয়ে দেখা দিল। শুধু প্রতিরোধ নয়, ডাক দিলেন চূড়ান্ত প্রতিশোধের।
‘প্রিয়াকে আমার কেড়েছিস তোরা
ভেঙেছিস ঘরবাড়ি
সে কথা কি আমি জীবনে মরণে
কখনও ভুলিতে পারি?
আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই
স্বজন হারানো শ্মশানে তোদের
চিতা আমি তুলবই।’
এই ‘বোধন’ কবিতার শেষ লগ্নে এসে তিনি ডাক দিলেন শ্রেণি সংগ্রামের।

‘টুকরো টুকরা করে ছেঁড়ো তোমার
অন্যায় আর ভীরুতার কাহিনী।
শাসক আর শোষকের নিষ্ঠুর একতার বিরুদ্ধে
একত্রিত হোক আমাদের সংহতি।’

বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক কবিতা লিখে সুকান্ত তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।’ আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এই কথাটা যথার্থ নয়। প্রত্যেককেই এক ঘরানায় সাহিত্যচর্চা করতে হবে তা নয়। হয়তো সুকান্তের ভিতরে সামাজিক দায়বদ্ধতার স্তর বা পরিপ্রেক্ষিত ভিন্নতর ছিল, অনেক গভীর ছিল। সেখান থেকেই তিনি কলম ধরেছিলেন। তাঁর কবিতা লেখার উদ্দেশ্য যে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক, সেটা মোটেই অস্বীকার করা যাবে না। তবে তাঁর কলম ধরার মূল উদ্দেশ্যই ছিল মানুষের মুক্তি। কিশোর কবির কলম এই দায়বদ্ধতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। স্বল্প বয়সে মৃত্যুর কারণে তিনি হয়তো তাঁর প্রতিভার সবটুকু দেখিয়ে যেতে পারেননি। আরও কিছুদিন বেঁচে থাকলে তাঁর কাব্যধারার দিগ্বদল হতেও পারত। বয়স, পরিপক্কতা মানুষকে আরও গভীর প্রত্যয়ে বাঁধতে পারে। কিন্তু কী হলে কী হতে পারত, সেটা বড় কথা নয়। তিনি তাঁর জীবিত অবস্থায় যেটুক সৃষ্টি করে গিয়েছেন, বাংলা সাহিত্যে সেটার মূল্যায়ন করাই জরুরি। তাঁর জন্মের একশো বছর পরেও যে তাঁর কবিতা নিয়ে চারিদিকে আলোচনা চলছে, সেটাই বুঝিয়ে দেয় তাঁর জনপ্রিয়তা।
একটা সময় Art for art’s sake বা ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ কথাটি খুব প্রচলিত ছিল। অর্থাৎ কবিতা বা সাহিত্যকে কেবল শিল্পের দৃষ্টিকোণ থেকেই বিচার করা দরকার। এই নান্দনিক তত্ত্বের বিরুদ্ধে ঊনবিংশ শতাব্দীতে গড়ে ওঠে নানা মতবাদ। বিশেষ করে একটা মতবাদ হল, শিল্প হল জীবনের জন্য, সমাজের জন্য। সে কবিতা, সাহিত্য, শিল্পকলার যে কোনও মাধ্যমই হোক না কেন।

রুশ সাহিত্যিক চেরনিশেভস্কি


রুশ সাহিত্যিক চেরনিশেভস্কি বললেন, তাহলে তো বলতে হয় সম্পদের জন্য সম্পদ, কিংবা বিজ্ঞানের জন্য বিজ্ঞান। সাহিত্যকে শুধু নন্দনতত্ত্বের নিরিখে বিচার করলে চলবে না, সমাজে এবং মানুষের কল্যাণের জন্য তার দায়বদ্ধতা কতখানি, সেটাও বিচার করে দেখা দরকার। সুকান্ত ভট্টাচার্যও এই দায়বদ্ধতাকে স্বীকার করে নিয়েই সাহিত্য রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন।
১৯২৬ সালের ১৫ই আগস্ট তাঁর জন্ম। একেবারে কৈশোরে তিনি দেখেছেন ফ্যাসিবাদের সন্ত্রাস এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই সময়ে সুকান্ত ক্রমেই মার্কসবাদী চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত হন। সারা বিশ্ব এবং ভারতবর্ষের পরিপ্রেক্ষিতটাকে সেই ভাবনার অনুসারী করে তোলেন। পড়তে থাকেন একের পর এক বই। যোগ দিতে থাকেন বিভিন্ন সভা সমিতিতে। বেলেঘাটায় কমিউনিস্ট পাঠচক্র জনরক্ষা সমিতির অফিসে বসত নানা আলোচনার আসর। সেখানে যোগ দিতেন সুকান্ত। সংগঠিত করছেন ছাত্র ধর্মঘট। পরিচয় হল কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ১৯৪২ সালে ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘ থেকে পয়লা এপ্রিল প্রকাশিত হল কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘জনযুদ্ধ’। সম্পাদনায় ছিলেন বঙ্কিম মুখার্জি। এই টুকরো টুকরো মন্তাজগুলি সুকান্তের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করল এবং তাঁকে কলম ধরতে উদ্বুদ্ধ করল। এখান থেকে প্রকাশিত হল সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় তিরিশটি গানের সংকলন ‘জনযুদ্ধের গান’। সেখানে প্রকাশিত হল সুকান্তের ‘জনগণ হও আজ উদ্বুদ্ধ গানটি।

‘জনগণ
হও আজ উদ্বুদ্ধ
শুরু করো প্রতিরোধ জনযুদ্ধ,
জাপানী ফ্যাসিস্টদের ঘোর দুর্দিন
মিলেছে ভারত আর বীর মহাচীন।
সাম্যবাদীরা আজ মহাক্রুদ্ধ
শুরু করো প্রতিরোধ, জনযুদ্ধ।।’
১৯৪২ সালে পরপর ঘটে গেল কয়েকটি ঘটনা। ৯ আগস্ট গান্ধীজির ভারত ছাড়ো আন্দোলন, ৮ ও ৯ মে চট্টগ্রামে এবং ১৬ই সেপ্টেম্বর বোমা পড়ল চট্টগ্রাম এবং ফেণীতে। ২০ ডিসেম্বর কলকাতায় পড়ল জাপানি বোমা। এই সময় তাঁর বন্ধু কবি অরুণাচল বসুকে লেখা তাঁর চিঠি থেকে বোঝা যায়, তৎকালীন বাস্তব পরিস্থিতিতে তিনি কী নিদারুণ যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছিলেন। মানুষের অস্তিত্বের সঙ্কট দেখে তাঁর হাতের মুঠো দৃঢ় হয়ে উঠেছিল। কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি তার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। বিপ্লবের আগুনে তিনি বারবার হাত সেঁকেছেন শব্দের জ্বলন্ত অঙ্গারে। চট্টগ্রাম: ১৯৪৩ কবিতায় তিনি লিখলেন,

‘হে অভুক্ত ক্ষুধিত শ্বাপদ—
তোমার উদ্যত থাবা, সংঘবদ্ধ প্রতিটি নগর
এখনো হয়নি নিরাপদ।
দিগন্তে দিগন্তে তাই ধ্বনিত গর্জন
তুমি চাও শোনিতের স্বাদ—
যে স্বাদ জেনেছে স্তালিনগ্রাদ।’

এখানে তিনি দেখালেন লড়াইয়ের পথ, মুক্তির দিশা। স্তালিনগ্রাদের বিজয় মানুষের লড়াইয়ে মধ্যে বুনে দিয়েছিল বিশ্বাসের বীজ। তাই বুক ভরা সাহস আর বিশ্বাসে উচ্চারণ করেন, ‘এবার নতুন জোরালো বাতাসে / জয়যাত্রার ধ্বনি ভেসে আসে.’
সুকান্তের কথা বললে পাশাপাশি আর একজনের কথাও বলতে হয়। দু’জনেই একই আদর্শ এবং বিশ্বাসে জারিত হচ্ছিলেন। দু’জনের কাছে কবিতা ছিল লড়াইয়ের অস্ত্র। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, সাহিত্যের যে শক্তি আছে, তাই দিয়ে বিপ্লব সার্থক হয়ে উঠতে পারে। এই দু’জনের একজন ছিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য এবং অন্যজন সোমেন চন্দ। রালফ ফক্স, ক্রিস্টোফার কডওয়েল, জন কনফোর্ড এবং ফেদেরিকো লোরকা সহ প্রমুখ সাহিত্যিককে খুন করেছিল ফ্যাসিস্ট শক্তি। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে সোমেন চন্দ লিখেছিলেন তাঁর ‘শুভদিনের সংবাদ শোন’ কবিতাটি।
‘রালফ ফক্সের নাম শুনেছো?
শুনেছো কডওয়েল আর কনফোর্ডের নাম?
ফ্রেদরিকো গার্সিয়া লোরকার কথা জানো?
এই বীর শহিদেরা স্পেনকে রাঙিয়ে দিল,
সবুজ জলপাই বন হল লাল,
মার- বুক খালি,
তবু বলি, সামনে আসছে শুভদিন।’

সোমেন চন্দ

২১ বছর বয়সি সোমেন চন্দ খুন হলেন ঢাকার রাজপথে। তিনি ছিলেন রাজনৈতিক হিংসার বলি। প্রতিবাদে গর্জে উঠল ১৬ বছর বয়সি সুকান্তের কলম।

‘বিদেশী চর ছুরিকা তোলে দেশের হৃদ্-বৃন্তে
সংস্কৃতির শত্রুদের পেরেছি তাই চিনতে।
শিল্পীদের রক্তস্রোতে এসেছে চৈতন্য
গুপ্তঘাতী শত্রুদের করি না আজ গণ্য।’

এক একটা ঘটনা, এক একটা ইতিহাসের জন্ম বারবার সুকান্তের কবিসত্তাকে জাগিয়ে তুলেছে। প্রতিবাদের মধ্যেও কখনও নিরাশা তাঁকে গ্রাস করেনি। নতুন আশার উদ্দীপনে জেগে উঠেছে তাঁর বিশ্বাসের মশাল। তেরোশো পঞ্চাশের মন্বন্তর কবিকে বিশাল ধাক্কা দিয়েছিল। একদিকে ক্ষুধার্ত মানুষের আর্ত চিৎকার, মৃত্যুর সংবাদ, অন্যদিকে মজুতদারদের অমানবিকতা, পুঁজির লোভ— সুকান্তকে উদ্বুদ্ধ করল শব্দে শব্দে আগুন জ্বালিয়ে তুলতে। ‘আকাল’ কবিতায় তিনি লিখলেন,

‘আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি,
প্রত্যহ দুঃস্বপ্ন দেখি, মৃত্যুর সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
আমার বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়
আমার বিনিদ্র রাতে সতর্ক সাইরেন ডেকে যায়।’

‘বোধন’ কবিতায় যুদ্ধ ঘোষণা করলেন মজুতদারদের বিরুদ্ধে
‘শোনরে মজুতদার
ফসল ফলানো মাটিতে রোপন
করব তোকে এবার।’

তারপরই আমরা ‘বিবৃতি’ কবিতায় পেলাম শপথের দৃঢ়তা।

‘তবুও প্রতিজ্ঞা ফেরে বাতাসে নিভৃত,
এখানে চল্লিশ কোটি এখনো জীবিত,
ভারতবর্ষের ’পরে গলিত সূর্য ঝরে আজ—
দিগ্বিদিকে উঠেছে আওয়াজ,
রক্তে আনো লাল,
রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল।’

সুকন্তের কবিতা ও রাজনীতির এই যে হাত ধরাধরি করে চলা, এটাই পছন্দ হয়নি বুদ্ধদেব বসুর। এই প্রসঙ্গে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় চমৎকার বলেছেন।

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়


‘আজ যাঁরা সুকান্তের কবি প্রতিভাকে এই বলে উড়িয়ে দিতে চান যে , সুকান্তর কবিতায় স্লোগান ছিল— তাঁদের বলতে চাই, সুকান্তর কবিতায় শ্লোগান নিশ্চয়ই ছিল। কবিতার জাত যাবার ভয়ে শ্লোগানগুলোকে রেখে ঢেকেও সে ব্যবহার করেনি। হাজার হাজার কণ্ঠে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত যে ভাষা হাজার হাজার মানুষের মনে নানা আবেগের তরঙ্গ তুলেছে, তাকে কবিতায় সাদরে গ্রহণ করতে পেরেছিল বলেই সুকান্ত সার্থক কবি। কবিতায় রাজনীতি থাকলেই যাঁদের কাছে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়, তাঁরা ভুলে যান— অরাজনৈতিক কবিতায়ও জিগির কিছু কম নেই। আসলে আপত্তিটা বোধহয় শ্লোগানে নয়, শ্লোগান বিশেষে— রাজনীতিতে নয়, রাজনীতি বিশেষে।’

সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সময়ের ধারাকে মাথায় নিয়ে তিনি যে কবিতা লিখেছেন, তার বার্তা অবশ্যই রাজনৈতিক, কিন্তু তা কখনোই কাব্যের নান্দনিকতাকে সেভাবে স্পর্শ করেনি। রুশ আন্দোলনের সময় রাশিয়ার অসংখ্য কবি এই সুরেই কবিতা লিখেছেন এবং সে সব কবিতা শিল্পের শর্ত মেনে, মানুষের ভালোলাগার বিচারে আজও বেঁচে আছে। ভ্লাদিমির মায়কোভস্কি, আনা আখমাতোভা প্রমুখের কবিতায় রুশ বিপ্লবের লড়াইয়ে কথা উঠে এলেও তার শিল্প ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে কেউ অভিযোগ করেননি।

সুভাষ মুখোপাধ্যায় সুকান্ত সম্পর্কে সঠিক মূল্যায়ণ করে গিয়েছেন। সুকান্তর কবিতা বিচার করতে গেলে এই মূল্যায়ণটুকু জানা দরকার। তিনি লিখেছেন, ‘কবিতাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে আমাদের যেমন রাজনীতির আসরে ঢুকতে হয়েছিল, সুকান্তের বেলায় তা হয়নি। সুকান্তের সাহিত্যিক গুণগুলোকে আন্দোলনের কাজে লাগানোর ব্যাপারে অন্নদার (ছাত্রনেতা অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্য) যথেষ্ট হাতযশ ছিল। সুকান্তের আগের যুগের লোক বলে আমি পার্টিতে এসেছিলাম কবিতা ছেড়ে দিয়ে; ফলে কবিতাকে সে সহজেই রাজনীতির সঙ্গে মেলাতে পেরেছিল।’

শুধু কবি নয়, তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় কর্মীও, অ্যাক্টিভিস্ট। কমিউনিস্ট পার্টির কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে নিয়মিত ‘জনযুদ্ধ বিক্রি করছেন, পোস্টার লিখছেন, ফ্যাসিস্ট বিরোধী প্রচার নাটিকা লিখছেন।
সুকান্ত তাঁর জীবন দিয়ে বুঝেছিলেন, ‘আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ
স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি।

মাত্র একুশ বছরের একটা জীবন বুঝিয়ে দিয়ে গেল, জীবন বয়সে বেঁচে থাকে না, কর্মের মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকে। সেই সঙ্গে এক কিশোরের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখলে অবাক হতে হয়। সুকান্ত ভট্টাচার্য তো শুধু একজন কবি নন, একজন মানুষ। মানবতাবাদী একজন মানুষ। যিনি সমাজের মার খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ অনুভব করেন, শোষক ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠতে পারেন। মাত্র একুশটা বসন্তের সাক্ষী ছিলেন তিনি, কিন্তু বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ বার্তা তাঁর কাছ থেকে পেয়ে গিয়েছিল বাংলা সাহিত্য।
জীবনের কমিটমেন্ট আসলে ঠিক কী, সেটা তাঁর কাছে প্রথম থেকেই স্পষ্ট ছিল। কী আশ্চর্য জীবনের সত্য ও লক্ষ্যকে অসাধারণ প্রজ্ঞার মধ্য দিয়ে ব্যক্ত করে গিয়েছেন। ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় সেই শাশ্বত বার্তা আমরা পেয়ে যাই।

সুকান্ত ভট্টাচার্য্য

‘চলে যাব— তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
অবশেষে সব কাজ সেরে,
আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে
করে যাব আশীর্বাদ,
তারপর হব ইতিহাস।’
সুকান্ত তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলি লিখেছেন মূলত ১৯৪১ থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যে। সেই সব কবিতার মধ্যে আছে সংগ্রামের কথা, রয়েছে সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে, হাতে হাত মিলিয়ে লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস। কবিতা তো চিরকাল আমাদের নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে। স্বাধীনতা আন্দোলনে মানুষকে জাগিয়ে তুলতে বহু কবি কবিতা লিখেছেন, গান বেঁধেছেন। ঠিক সেভাবেই ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে, মজুতদারদের বিরুদ্ধে সুকান্ত লড়াইয়ের কথা বলেছেন। সঙ্ঘবদ্ধ প্রলেতারিয়েত মানুষের জয়গান গেয়েছেন।

সেই সুকান্ত আবার রোমান্টিক কবিতাতেও অসাধারণ নজির রেখেছেন। তাঁর রোমান্টিসিজমের মধ্যেও কিন্ত দায়বদ্ধতা হারিয়ে যায়নি। চে গেভারা বারবার বলেছেন, ‘রোমান্টিসিজম ছাড়া বিপ্লব হয় না। বিপ্লবের সংগ্রামটাই তো একটা রোমান্টিক ভাবনা।’ সুকান্ত তাঁর চিরদিনের কবিতায় লিখলেন সেই গ্রামজীবনের ভালোলাগার কথা।
‘এখানে বৃষ্টিমুখর লাজুক গাঁয়ে
এসে থেমে গেছে ব্যস্ত ঘড়ির কাঁটা….’
এই কবিতাটি পড়তে পড়তে মনে পড়ে যেতে পারে পরবর্তীকালে লেখা সলিল চৌধুরীর ‘কোনো এক গাঁয়ের বধূ’ গানটির কথা। সুকান্তের ‘প্রিয়তমাসু’, ‘আঠারো বছর বয়স’ ইত্যাদি কবিতার মধ্যে সেই রোমান্টিক চেতনাকে খুঁজে পাওয়া যায়। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বহু কবিতার মধ্যেও আমরা এই ধরনের রোমান্টিসিজমকে খুঁজে পাই। কিংবা লেনিন কবিতা, সেখানেও তো এক সদ্য তরুণের বুকে জমে লেনিন হয়ে ওঠার আত্মবিশ্বাস। শুধু তাই নয়, সেই রোমান্টিসিজমের মধ্যে মিশে থাকে এক আশাবাদ।

‘লেনিন ভেঙেছে বিশ্বে জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ,
অন্যায়ের মুখোমুখি লেনিন জানায় প্রতিবাদ।
মৃত্যুর সমুদ্র শেষ, পালে লাগে উদ্দাম বাতাস
মুক্তির শ্যামল তীর চোখে পড়ে আন্দোলিত ঘাস।
লেনিন ভূমিষ্ঠ রক্তে, ক্লীবতার কাছে নেই ঋণ,
বিপ্লব স্পন্দিত বুকে, মনে হয় আমিই লেনিন।’

যে বন্দিদের জন্য একদিন সুকান্ত লড়াই করেছিলেন, তাঁরা যেদিন মুক্ত হলেন, সুকান্ত তখন হাসপাতালে ভর্তি। অসুস্থতা বাড়তেই লাগল। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় লিখলেন কবিতা, ‘বসন্তে কোকিল কেশে কেশে রক্ত তুলবে / সে কিসের বসন্ত।’

মৃত্যুশয্যায় শুয়েও তিনি বারবার ছুটে যেতে চেয়েছিলেন বাইরে। পার্টির বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করার জন্য দিন গুনছিলেন। কী গভীর প্রত্যয়! সেই প্রত্যয় শুধু মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর। তাঁর বুকে ছিল মানুষের প্রতি ভালোবাসা। সেই ভালোবাস থেকে ছোট্ট জীবনে অসংখ্য স্ফুলিঙ্গের মতো কবিতা লিখে গিয়েছেন। তা আজও মানুষকে আন্দোলিত করে। সুকান্ত ছিলেন যেন এক চারণ কবি, এক বিবেকী সত্তা। তিনি যেন সমাজের এক বাতিওয়ালা। সব ঘরে বাতি জ্বালানোর প্রয়াসটুকু জারি ছিল আমৃত্যু। কিন্তু তিনি নিজেই ভেসে গেলেন এক হিমশীতল অন্ধকারে, এক অনন্ত আকাশগঙ্গায়।

[লেখকের পূর্ব রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x