
পুরোনো ডায়েরির হলুদ হয়ে যাওয়া পাতাগুলোর নরম স্পর্শ আর কোনো এক আকুল হৃদয়ের তরণী বেয়ে পিছনে চাওয়ার মধ্যে অনিবার্য এক সাযুজ্য লুকিয়ে থাকে। উভয় ক্ষেত্রেই সময়ের স্রোত বেয়ে মন ডুব দেয় স্মৃতির সায়রে | তারপর কোনো অচিন সখি নিঃশব্দে পাশে বসে। আলতো করে জড়িয়ে ধরে, অসম্ভব জেনেও, ফিসফিস করে বলে— “ফিরে চলো… ফিরে চলো, ওগো বন্ধু আমার…”
এই রকমই এক পেলব প্রহরে—মালা হতে খসে পড়া নিঃসঙ্গ ফুলের মতো—জয়দেবের মেলায় দেখা হওয়া , মার্কিনি বোষ্টমী – অনুরাধার ছবি এসে ধরা দিল ভাঙা ল্যাপটপে । স্ক্রিনে জমা ধুলোর আড়ালে যেন হঠাৎই জেগে উঠল সেই মিঠে-রোদ পৌষের দুপুর, সেই কথন উপকথন। কালো চশমাটা কপালের ওপর তুলে, নামাবলী দিয়ে বুকের ঘাম মুছে নিয়ে সে বলেছিল— “তোমাদের ভানুসিংহ ঠাকুর বৈষ্ণব পদাবলীর রাধাকে শুধু পূজার আসনে বসিয়ে রাখেননি। তিনি তাঁর ভেতরে খুঁজে পেয়েছিলেন রক্তমাংসের এক প্রেমময়ী নারীকে। তাঁর কাছে রাধা নিছক আরাধনার প্রতিমা নন—তিনি অনিবার্য আকাঙ্ক্ষা, অতলান্তিক বিরহ, দহনময় প্রেমের অনিবার্য মানবী সত্য।

গাড়ির এসি-টা একটু বাড়িয়ে দিয়ে আমি হালকা হেসে বলেছিলাম,“আমরা তো তাঁকে শুধু প্রেমিকা হিসেবে দেখি না … স্মরণ করি মহাভাবস্বরূপিণী , হল্লাদিনী শক্তির মূর্ত প্রতীক রূপে—যেখানে প্রেম আর ভক্তি একাকার হয়ে যায়।”
সে জানালার কাঁচে মাথা ঠেকিয়ে, তন্দ্রালু চোখে যেন অন্তর্লীন কোনো স্মৃতিস্রোতে ভেসে যেতে যেতে , আনত স্বরে বলতে শুরু করেছিল, “রাধা আসলে একনিষ্ঠ ভালোবাসার মেয়ে। আয়ানের সঙ্গে ঘর বেঁধেও তার ভেতরে থেকে যায় এক অদ্ভুত অভাববোধ—এক দীর্ঘ, নীরব অপূর্ণতা। সংসারে আছে, অথচ মন নেই; প্রাপ্তি আছে, অথচ পূর্ণতা নেই। সেই না-পাওয়ার অন্তর্গত টানই তাকে বারবার প্ররোচিত করেছে মন মানুষের দিকে।
সে ছুটে যায়—ভরা শ্রাবণের ঘন অন্ধকারে, কদমবনের নিবিড় ছায়া পেরিয়ে, যমুনাতীরের সিক্ত বাতাসে । ঝড়, বর্ষা, সামাজিক ভ্রুকুটি, লোকলজ্জা—কিছুই তাকে নিবৃত্ত করতে পারে না। পায়ের নূপুর খুলে ফেলে—পাছে শব্দে ধরা পড়ে যায় অভিসারের গোপন ছন্দ; নীলাম্বরী জড়িয়ে নেয়—যেন রাতের শরীরেই নিজেকে মিশিয়ে দিতে পারে।
দেখো, রাধার এই অভিসারে কেবল আধ্যাত্মিকতা নেই—এখানে বৃষ্টির সিক্ততা আছে, শরীরের কাঁপন আছে, আকাঙ্ক্ষার উত্তাপ আছে, রতিসুখের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত আছে। শৃঙ্গারের সমগ্র রস যেন এখানে এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। এগুলোকে আলাদা করে শুধু ‘ভক্তি’ বা শুধু ‘শরীর’ বললে রাধাকে ছোট করা হয়।
আর তোমাদের ভানুসিংহ টেগোর—সেই ভুল করেননি। তিনি রাধাকে ধূপধুনোর কাচঘরে বন্দি রাখেননি। ধর্মের অতিরিক্ত নীতিনিষ্ঠ, ছিদ্রান্বেষী মূষিককে যেন যমুনার স্রোতেই ভাসিয়ে দিয়ে প্রেমকে এনে দাঁড় করিয়েছেন এমন এক বিস্তারে, যেখানে পাপ-পুণ্যের কড়াকড়ি, শরীর-সাধনার বিভাজন—সবই ক্রমশ অর্থ হারাতে থাকে।
তারপর হাত থেকে সিগারেটটা আলতো করে তুলে লম্বা এক টান দিয়ে চোখে অন্যমনস্ক দীপ্তি ছড়িয়ে যোগ করেছিল——“সেখানে ভালোবাসা আর কোনো আড়াল রাখে না … তার চপল, আর্দ্র শরীর থেকে খসে পড়ে সমস্ত আবরণ। রতির মধ্য দিয়েই তৈরি হয় এক অদ্বৈত সাঁকো—যেখানে দু’জন আলাদা থাকে না, হয়ে ওঠে এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা…”
গাড়ির ভেতরে তখন কান্ত কবির অন্তর্লীন সুর ভাসছে । ছবি বন্দ্যোপাধ্যায় গাইছেন :
প্রেম শুধিব শুধিব মনেতে করিলাম
বন্দী হইলাম ঋণে ।
তোমার প্রেম-ঋণ আমি শুধিতে নারিলাম ।
এ জনমের মত বিকায়ে রইলাম।
কান্ত কহে, কানু গৌরাঙ্গ হলে খালাস পাইবে ঋণে
যেদিন কালো ছেড়ে গৌর হবে
তুমি খালাস পাবে যেদিন নদে গিয়ে উদয় হবে
সেদিন খালাস পাইবে ঋণে।
সেদিনের স্মৃতির কৌটোতে এইটুকুই ছিল। তবু হারিয়ে যাওয়া কণাগুলো কখনও তো পুরোপুরি হারায় না। গোপন বীজের মতো ভাবনা চিন্তার অনুরণনে আবার অঙ্কুরিত হয়ে ওঠে। নতুন চারা গজায়, উঠে আসে অন্যরকম উপলব্ধি। আমার সঙ্গেও বোধহয় সেটাই হল। কেন্দুলীর সেই খোড়ো দুপুর, অনুরাধা বৈষ্ণবীর স্পষ্ট উচ্চারণ, বাউলের গান — সব মিলিয়ে কোথাও একটা প্রশ্ন – এতদিন কাঠবিড়ালির লুকিয়ে রাখা বীজ হয়ে রয়ে গিয়েছিল। আজ , পরবাসে সে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে যেন স্পষ্ট করে দিলো — আমাদের দুই মহীরুহ, রবীন্দ্রনাথ এবং চৈতন্যদেব — দুজনেই, এক অর্থে, বৈষ্ণব চেতনারই ধারক। দুজনেই বিশ্বাস করেছেন সেই রাধা-প্রেমে, যেখানে প্রেম কেবল পাওয়া নয়, কেবল প্রকাশ নয়— বরং এক অদ্ভুত টানাপোড়েন, উপস্থিতি আর অনুপস্থিতির মাঝখানে দুলতে থাকা এক গভীর অনুভব।

দেখুন, সেই অল্প বয়সে লুকিয়ে রতিশ্রমময় বৈষ্ণব পদাবলীর মাদকতা আস্বাদন থেকে শুরু করে জীবনের অন্তিম পর্ব পর্যন্ত রবীন্দ্র চেতনার গভীরতম অন্তঃপুরে অনবরত দোলা দিয়ে গেছে বৈষ্ণবীয় রসের এক অন্তহীন তরঙ্গ। তাঁর কবিতা, সংগীত, নাটক, এমনকি নিভৃত আত্মভাবনাতেও বারবার ফিরে এসেছে সেই রাধাতত্ত্ব—যেখানে প্রেম কেবল মিলনের পরিতৃপ্তি নয়, বরং বিরহের দীপ্ত যন্ত্রণা, প্রতীক্ষার দীর্ঘ কম্পন এবং অন্তর্লীন আকাঙ্ক্ষার বহুস্বরিক ব্যঞ্জনা।
“সখী, আঁধারে একেলা ঘরে”—এই উচ্চারণে যেমন নিঃসঙ্গ প্রতীক্ষার গাঢ় আবেশ আছে, তেমনই আছে অভিসারী প্রেমের গোপন শরীরী কম্পন; আবার “আমার যা আছে আমি সকল দিতে পারিনি”—এই স্বীকারোক্তিতে ধরা পড়ে প্রেমের সেই চিরন্তন অপূর্ণতা, যেখানে আত্মসমর্পণের আকাঙ্ক্ষা থেকে যায় অসম্পূর্ণ, অপ্রদত্ত। রবীন্দ্রনাথের এই প্রেমভাবনা তাই একাধারে দেহাত্মক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক—যেখানে ভালোবাসা কখনও সম্পূর্ণ প্রাপ্তি নয়, বরং অনির্বচনীয় আকুলতার এক অন্তহীন যাত্রা।
রবীন্দ্রনাথের প্রেমভাবনা নিছক ব্যক্তিগত আবেগের রোম্যান্টিক উচ্চারণ নয়; এটি বাঙালি জাতিমানসের বহু শতকের সাংস্কৃতিক সঞ্চয়ের এক পরিণত রূপ। বৈষ্ণব পদাবলীর অন্তঃসলিলা ধারা তাঁর সৃষ্টির ভেতরে এসে এমনভাবে মিশে গেছে যে, কখনও তা ভানুসিংহের কিশোর উচ্ছ্বাস হয়ে ফুটে উঠেছে, কখনও বা সুরভরা বিষন্ন গোধূলিতে এসে মিশেছে, যেখানে প্রেম অনুপস্থিতির মধ্যেও দীপ্ত হয়ে জ্বলে থাকে।
অন্যদিকে, চৈতন্যদেব —নবদ্বীপ ও শান্তিপুরের সেই প্রেমাবিষ্ট বৈষ্ণব জাগরণের কেন্দ্রপুরুষ, যাঁকে ভক্তসমাজ রাধা-কৃষ্ণের মিলিত তনু বলেই অনুভব করেছে—রাধাভাবকে আত্মার গভীরে ধারণ করে প্রেমকে এক অভূতপূর্ব সামষ্টিক উন্মোচনের রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর কীর্তনমগ্ন ভক্তবৃন্দ, পদকর্তারা, উদ্বাহু উচ্ছ্বাসে, অশ্রুসজল নৃত্যে গেয়ে উঠেছিলেন— “প্রেম ফুরায়ে না, ফুরায়ে না, কলসে কলসে ভরি তবু না ফুরায়ে।”
এই উচ্চারণে প্রেম কেবল দুই মানুষের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক নয়—তা হয়ে ওঠে এক অনির্বচনীয় মহাস্রোত, যেখানে ব্যক্তি ধীরে ধীরে বিলীন হয় সমষ্টির আনন্দময় উন্মাদনায়। চৈতন্যীয় প্রেম তাই নিভৃত কক্ষের গোপন অনুভব নয়; তা পথের, জনসমুদ্রের, কীর্তনের, সম্মিলিত অশ্রু ও উল্লাসের। সেখানে বিরহও ব্যক্তিগত থাকে না—রাধার আকুলতা সমগ্র মানবসমাজের আকাঙ্ক্ষায় রূপান্তরিত হয়।
আর এই কারণেই, বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে চৈতন্যদেব নিছক একজন ধর্মপ্রচারক নন; তিনি প্রেমকে সামাজিক ও নান্দনিক মুক্তির এক মহোৎসবে পরিণত করা এক চিরন্তন মানসপ্রতিমা।

এই দুই স্রোত—রবীন্দ্রীয় অন্তর্মুখী রসচেতনা এবং গৌরাঙ্গীয় বহির্মুখী প্রেমোচ্ছ্বাস—আসলে একই বৈষ্ণব তত্ত্বের দুই ভিন্ন প্রকাশ। একদিকে নাগকেশরের সুগন্ধময় নিভৃত প্রস্ফুটন, অন্যদিকে স্বর্ণকেতকীর দীপ্ত, উন্মুক্ত বিকাশ।
‘বাঙালি জাতিমানসে এই দ্বৈত অভিজ্ঞতা—নীরব অন্তর্জাগতিক প্রেম এবং বহির্মুখী সমষ্টিগত প্রেমোচ্ছ্বাস—ত্রিবলী ভাঁজের মতো স্তরে স্তরে জমা হয়ে এক গভীর কালেকটিভ মেমোরি নির্মাণ করেছে। এই স্মৃতি কেবল সাহিত্যিক বা ধর্মীয় নয়; এটি এক সাংস্কৃতিক অভ্যন্তরীণতা, যা বাঙালির প্রেমবোধ, ভাষা, সংগীত, এমনকি আত্মপরিচয়কে নিরন্তর প্রভাবিত করে চলেছে।
প্রসঙ্গক্রমে বলি , প্রেমিক হিসেবে ভারতবর্ষের যে কোনো জাতির তুলনায় বাঙালি অনেক বেশি নিটোল | তার প্রেম যেন এক চলমান চিত্রপট — যামিনী রায়-এর তুলির টানে আঁকা : ডাগর চোখের নিবিড় চাওয়া, সুডৌল গড়নে অন্তর্লীন ছন্দ, স্ফীত বক্ষে স্পন্দিত উচ্ছ্বাস। তার প্রেমভাবে শব্দ কম ইঙ্গিত বেশি –যেমন “আমি তোমাকে ভালোবাসি” ইত্যাদির থেকে একটু চুপ করে থাকা, একটু দূরে সরে গিয়ে আবার ফিরে তাকানো কিংবা চপল চোখের ভঙ্গি বা সংযমী আকাঙ্খার অনুরাগে উন্মুক্ত কোমল দেহরেখা |
আর, এই কারণেই রবীন্দ্র কবলিত বাঙালির প্রেম চৈতন্যের ভাব শৃঙ্খলে বহুমাত্রিক : একদিকে যেমন শারীরিক সৌন্দর্যের রসাস্বাদন, অন্যদিকে মানসিক অনুরাগের সূক্ষ্ম বিন্যাস; একদিকে আকাঙ্ক্ষার উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে সংযমের শিল্প। তার প্রেমিক সত্তা কেবল ভালোবাসে না— ভালোবাসাকে রূপে, ছন্দে নান্দনিক করে তোলে | তার কাছে প্রেম নিছক আবেগের ক্ষণস্থায়ী উত্তাপ নয়; প্রেম এক বিস্তৃত জীবনাচরণ, এক সাংস্কৃতিক সাধনা। সেই সাধনার ক্যানভাসে রবীন্দ্রনাথ অক্লান্ত হাতে রঙ মিশিয়ে গেছেন। ফলে বাঙালির প্রেমে প্রতিটি দৃষ্টি, প্রতিটি নীরব বিরতি, প্রতিটি অনুচ্চারিত শব্দের মূলে থেকে যায় রাধাভাবের গভীর, অমোচনীয় আভা।
আর এই সমগ্র প্রেমঋদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ভিত্তিতেই, কালের যাত্রার রথ এক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে, রবীন্দ্রবিলাসীদের কাছে একটি প্রশ্ন রেখে যেতে ইচ্ছে করে : গৌরাঙ্গচেতনার বিস্তার যেমন “গৌরাব্দ”-কে কেবল একটি কালগণনা নয়, বরং এক গভীর সাংস্কৃতিক ও আত্মিক সময়বোধে পরিণত করেছে, তেমনি কি আমরা কোনোদিন কখনও কি রবীন্দ্রনাথের প্রেমচেতনার অন্তহীন সায়রে ডুব দিয়ে “রবীন্দ্রাব্দ”-এর ধারণাকে সেই গভীরতায় ভেবে দেখেছি? আমরা কি কেবল রবীন্দ্রনাথকে উদযাপন করি, নাকি সত্যিই তাঁকে আচরণে ধারণ করি? আমরা কি শুধু তাঁর গান গাই, নাকি তাঁর বৈষ্ণবীয় প্রেমচেতনার গভীর তরঙ্গকে নিজেদের রক্তস্রোতে অনুভব করি?

খ্রিষ্টাব্দ-বঙ্গাব্দ-শকাব্দের পাশাপাশি, খ্যাতি ও প্রচারে গৌরাব্দ খানিকটা পিছিয়ে থাকলেও , বৈষ্ণব সমাজের ঐতিহ্যের মূল অংশ। চৈতন্যদেবকে ঘিরেই এর সূত্রপাত। ১৪৮৬ খ্রিষ্টাব্দে, চৈতন্যদেবের জন্মের দিনটি থেকে গৌরাব্দের গণনা শুরু হয়। বলা হয়, জন্মের দিনটি ছিল দোল পূর্ণিমা। তার পরের দিন, অর্থাৎ প্রতিপদ থেকে চান্দ্রমাস অনুযায়ী বৈষ্ণব পঞ্জিকা তৈরি হয়। আর তখনই আসে গৌরাব্দ। যেমন, ২০২৬ -২৭ বর্ষের গৌরাব্দ হবে ৫৪১ । গৌরাব্দেও বারোটা মাস, কিন্তু প্রতিটা মাস বিষ্ণুর ১২টা নাম নিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন— বিষ্ণু, মধুসূদন, ত্রিবিক্রম, বামন, শ্রীধর, হৃষীকেশ, পদ্মনাভ, দামোদর, কেশব, নারায়ণ, মাধব, গোবিন্দ। এছাড়াও রয়েছে একটি অধিমাস, যার নাম পুরুষোত্তম।
সেই ভাবনা থেকেই তো আমরা চাইলে এক নতুন “রবীন্দ্রাব্দ”-এর কালক্রমিক জাল বুনতেই পারি—এক এমন সময়চেতনা, যা কেবল দিন-তারিখের হিসাব নয়, বরং রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিমানস, প্রেমতত্ত্ব ও নান্দনিক উত্তরাধিকারের এক সাংস্কৃতিক পঞ্জিকা হয়ে উঠবে; যেখানে সময়ের দীর্ঘ প্রবাহকে শুধু সূর্যচক্রে মাপা হবে না, বরং ধরা হবে অনুভবের নিবিড়তায়।
এই অব্দের সূচনা হোক ১২৬৯ বঙ্গাব্দে—কবির জন্মের এক বছর পূর্তির দিন থেকে। অর্থাৎ, সালগণনা শুরু হবে জন্মের পরবর্তী দিনার্থে—২৬শে বৈশাখ থেকে। এই “রবীন্দ্রাব্দ”-এ থাকুক বারোটি মাস, আর একটি প্রতিমাস – পঁচিশ দিনের—কবির পঁচিশে বৈশাখ জন্মস্মৃতির প্রতীকরূপে। সেই পঁচিশ দিনের ক্ষুদ্র অথচ নিবিড় সময়পর্বের নাম হতেই পারে— “ক্ষণিকা”।
প্রথম মাসের নাম স্বাভাবিকভাবেই— “রবি” : আলোক, উৎস, সৃজন ও প্রাণময়তার সূচনা : “তুমি হে প্রেমের রবি আলো করি চরাচর , যত করো বিতরণ অক্ষয় তোমার কর” | তারপর পরবর্তী মাসগুলি একে একে বহন করতে পারে রবীন্দ্রসৃষ্টির বিভিন্ন মানসঋতুর নাম— চণ্ডালী ; চপলা ; শ্যামলী ; মানসী ; বলাকা ; হৈমন্তী ; মহুয়া ; পূরবী ; আনমনা ; আর চৈতালি : যে মাসে সমস্ত সুর এসে মিশবে অস্তরাগের দিকে। এই পঞ্জিকায় ঋতু মানে কেবল জলবায়ুর পরিবর্তন নয়— এখানে ঋতু মানে মানসিক অবস্থা, প্রেমের পর্ব, সৃষ্টির রং। “রবি” থেকে “চৈতালি”— এ হোক মানুষের জীবনযাত্রা, কবিমানসের অভ্যন্তরীণ আবহমান পরিবর্তন, বাঙালি জাতিচেতনার নন্দন-পরিক্রমা।

একবার শুধু ভাবুন তো ‘আজি হতে কতেক বর্ষ পরে’, কোনো এক রবীন্দ্রাব্দের প্রেমাবিষ্ট পদকর্তা বর্ষমাঙ্গলিকি উৎসব উপলক্ষে লিখছেন –
মেঘমন্দ্রিত গহন আকাশ, সেদিন শ্যামলী মাস, চুম্বনে কেঁপে উঠেছিল ঝড়ে আমার সর্বনাশ। বলেছিলে তুমি বৃষ্টি পড়ুক আজকে শ্রাবনী রাতে ভাঙা গল্প সে চকিতে জুড়ুক সঘন অশ্রুপাতে।
কিংবা, দিগন্তজোড়া নীলের বুকে যখন ফুলের আগুন জ্বলে উঠেছে , আনন্দী তখন রক্তকমল বুকে চেপে বলছে :
আনমনা মাস তোর পেখমে, বাঁশির সুরগন্ধ চোখের খেলায় ছিঁড়ে ফেলে দিলি পূরবীর দ্বিধা দ্বন্দ্ব। উষ্ণ গোপন স্পর্শে, মুখ তোলো – ‘ফিরে পাওয়া’, নিশি ফুরাতেই যাস নে রে তুই, কৈছে চৈতি হাওয়া।
কিংবা গ্রীষ্মের দগ্ধ মরুপ্রান্তে হোমাগ্নির মতো জ্বলে ওঠা রৌদ্রের মধ্যে, কোনো অমিত একাকী বসে আবিষ্ট কণ্ঠে পাঠ করে চলেছে—
চন্ডালী তোর ঝলসানো চোখে জ্বলছে শ্মশান শিখা গরানের ফাঁকে চেয়ে দেখি শুধু চপলার মরীচিকা। নর্তকী তোর জটার জটে নেই কি আষাঢ় ছায়া নিষ্ঠুর তুই চিরকাল কেন প্রেমকে বলিস মায়া !
কিংবা – হলুদ ঢালা বিকেলে জাজিম বিছানো বারান্দায় কোনো লাবণ্য লিখছে :
হৈমন্তী তুই সই করেছিস শিউলিকে কাছে ডেকে শ্বেতকরবীর ঘুম নেই আর কাঁদছে থেকে থেকে। ঝরাপাতাদের শব্দমালা ভাসছে নিঝুম বনে, কার বিরহের আগুন জ্বলে বিস্মরণের ক্ষণে।
ও হ্যাঁ, আরও দু-একটি জরুরি কথা। এই আলোচিত পাঁজি অনুযায়ী প্রত্যেক পূর্ণিমা শুধু তিথি হয়ে থাকবে না— হবে স্মৃতি, প্রেম ও পুনরাবিষ্কারের এক বিশেষ রাত্রি। সেদিন বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া প্রেমিক-প্রেমিকারা হয়তো নিঃশব্দে নিজেদের বারান্দায় এসে দাঁড়াবেন। গাইবেন – বিরহ মধুর হলো আজি মধু রাতে | কিংবা – চাঁদের আলোয় ভিজে থাকা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কেউ মনে করবে শ্রাবণের সেই ভেজা সন্ধ্যা, সেই কাঁধে মাথা রেখে গান – আজ শ্রাবণের পূর্ণিমাতে কি এনেছিস বল ; কিংবা কোনো অশীতিপর বৃদ্ধা ধীরে বারান্দার গ্রিলে হাত রেখে ভাববেন— “লোকটা শেষ পর্যন্ত আমায় ভালোবেসেছিল… শুধু বলতে পারেনি।”
আর অমাবস্যার রাতগুলো থাকবে সম্পূর্ণ অন্যরকম। সেইসব অন্ধকার তিথিতে শ্রেয়সী হয়তো একা বসবে, চুল খোলা, সামনে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপ,গুনগুনিয়ে গাইবে – ‘সে যে মনের মানুষ কেন তারে বসিয়ে রাখিস”। মনের ভিতর বয়ে যাবে কোনো নদী ঢেউ যার অকারণে ভিজিয়ে দেবে চোখ। পাঁজিতে পূর্ণিমা যেখানে স্মৃতির পুনর্মিলন, অমাবস্যা সেখানে হবে আত্মসমীপে প্রত্যাবর্তনের সময়

যে কোনো রবীন্দ্রাব্দেই অতি অবশ্য থাকবে— “নন্দিনী দিবস”। সেই দিনে ঘরের জানালাগুলো একটু বেশি খুলে দেওয়া হবে। মেয়েরা সেদিন চুলে রক্তকরবী গুঁজবে। অফিসফেরতা ক্লান্ত সন্ধ্যায় কেউ বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনে মনে বলবে— “আমি শুধু নিয়ম মানতে আসিনি, আমি বাঁচতে এসেছি।” আর যারা বহুদিন ধরে নিজেদের ভেতরের নন্দিনীকে চেপে রেখে বেঁচে আছে, তারা নিয়ম করে সেই দিনটিতে বলবে, “জীবন শুধু হাঁসেদের মতো শৃঙ্খল মেনে নির্বিঘ্নে বেঁচে থাকা নয়; জীবন মানে অন্তরের সমস্ত জানালা খুলে দিয়ে ভালোবাসতে পারার দুঃসাহস, স্বাধীনভাবে স্বপ্ন দেখার অধিকার, আর কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠা।
পাঠক, রবীন্দ্রসায়রে এতক্ষণ যে প্রেম, বিরহ, বৈষ্ণব রস আর স্মৃতির তরঙ্গ ছড়িয়ে ছিল—এবার তাকে ধীরে ধীরে শান্ত হতে দেওয়া যাক। এতক্ষণ যে কথার তরী বেয়ে চলেছিলাম, তার বৈঠা এবার আপনাদের হাতেই সমর্পণ করলাম। শুধু সুরটি ছুঁয়ে দিলাম, অনুরণন বহন করার দায় এবার আপনাদের।
দেখুন “রবীন্দ্রাব্দ” সত্যিই হয়তো কোনোদিন তৈরি হবে না। কোনো রাষ্ট্র তার স্বীকৃতি দেবে না, কোনো পঞ্জিকাবিদ তার হিসাব কষবেন না। তবু ধারণা হিসেবে, অনুভব হিসেবে, এটি থেকে যেতে পারে—বাঙালির অন্তর্জাগতিক এক গোপন সময়চেতনা হয়ে; যেখানে “রবি” মাসে কেউ নতুন আলো খুঁজবে, “ক্ষণিকা”য় পুরোনো প্রেমের গন্ধ ফিরে পাবে, “আনমনা”-র সন্ধ্যায় হয়তো বহুদিন বাদে, হারিয়ে যাওয়া দুই মানুষ একই আকাশের দিকে তাকিয়ে আলাদা শহরে দাঁড়িয়ে একই গান গুনগুন করবে।
রবীন্দ্রনাথ ও চৈতন্যদেব —এই দুই মহাস্রোত আজও বাঙালির চেতনায় মিলেমিশে আছেন। একজন প্রেমকে দিয়েছেন অন্তর্জাগতিক ভাষা, অন্যজন উন্মুক্ত উল্লাস। একজন নিভৃত জানালার পাশে বসে গেয়েছেন— “দাও হে হৃদয়ভরে দাও …” , অন্যজন – বিকল শরীর , বিবশ মন, গাইছেন , “রূপ লাগি আঁখি ঝুরে, গুণে মন ভোর, প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে, প্রতি অঙ্গ মোর”| এই দুইয়ের মাঝখানেই বাঙালির হৃদয় চিরকাল দুলতে থাকবে।
আপাতত যাই। উল্টোদিকের বারান্দায় অন্যমনস্কা গাইছে – “আমার তরী ছিল চেনার কূলে, বাঁধন যে তার গেল খুলে; তারে হাওয়ায় হাওয়ায় নিয়ে গেল কোন্ অচেনার ধারে ।” আমি তার দিশেহারা রাতের বিশু পাগল। রঞ্জন হতে পারলাম কই ! সে তো রবি ঠাকুর: “দিক ভোলাবার পাগল আমার হাসে অন্ধকারে”।

