
স্বামী বিবেকানন্দের ভারতপ্রীতি, হিন্দুসংস্কারপ্রীতি ও অন্যান্য চিন্তাধারা সঞ্চারিত হয়েছিল তাঁর প্রিয়তম শিষ্যা নিবেদিতার মধ্যে। তিনি অত্যন্ত স্বাধীনচেতা নারী ছিলেন সন্দেহ নেই কিন্তু স্বামীজির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা এবং আনুগত্য ছিল অপরিসীম। প্রায় সমস্ত বিষয়েই স্বামীজির মতামত তিনি মেনে নিয়েছেন – কখনো স্বেচ্ছায়, সানন্দে – আবার কখনো হয়তো বাধ্য হয়ে। তেমন কোনো প্রতিবাদ বা বিদ্রোহ করেন নি।
নিবেদিতা এদেশে আসার অল্পকাল পরেই বিবেকানন্দ তাঁকে ভবিষ্যৎ কর্ম পরিকল্পনা সম্বন্ধে কিছু নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার মধ্যে একটি বার্তা বেশ বিখ্যাত – ” Make inroads into the Brahmos. ” অর্থাৎ হিন্দু রক্ষণশীলতার বিরোধী, আলোকপ্রাপ্ত ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে মেলামেশা বাড়াতে চেয়েছিলেন বিবেকানন্দ। হয়তো তাঁর ধারণা ছিল যে অতি উচ্চশিক্ষিত, পাশ্চাত্য দেশের এক তরুণীর মাধ্যমে সে কাজ সহজে সম্পন্ন হতে পারবে। বলাই বাহুল্য, বাংলায় ব্রাহ্মসমাজের প্রথম সারিতে ছিল ঠাকুর পরিবার। শিক্ষায় দীক্ষায় রুচিতে সংস্কৃতিতে অনন্য এই পরিবারের সঙ্গে খুব দ্রুত একটি সৌহার্দ্যের সম্পর্ক গড়ে উঠল নিবেদিতার। ভারতে আসার এক বছর পরে বিবেকানন্দের নির্দেশে তিনি জোড়াসাঁকোর বাড়িতে গিয়ে দেখা করেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে। এর কয়েকদিন পরে বিবেকানন্দ নিজেই আসেন শিষ্যাকে নিয়ে – মহর্ষির আগ্রহে এবং তাঁর সঙ্গে পূর্বপরিচয়ের সূত্রে। নিবেদিতার সদ্য -সূচিত কর্মজীবনের জন্য মহর্ষির কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ভাগ্নি সরলা ঘোষাল নিবেদিতার তেজস্বী ব্যক্তিত্ব ও নির্ভীক রাজনৈতিক মতামতের প্রতি গভীর ভাবে আকৃষ্ট হন। স্বদেশী আন্দোলন ও বৈপ্লবিক রাজনীতির সঙ্গে এই দুজনের নিবিড় যোগাযোগের মূলে নিবেদিতার প্রেরণা ছিল অনেকখানি।
এ পর্যন্ত সবই মসৃণভাবে চলছিল। কিন্তু নিবেদিতা প্রথম দ্বিধাগ্রস্ত হলেন ঠাকুরবাড়ির প্রাণপুরুষ রবীন্দ্রনাথের সংস্পর্শে এসে। ব্রাহ্মগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে যে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক উজ্জীবনের তাঁরা পরিকল্পনা করছিলেন তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কোনোরকম যোগ ছিল বলে জানা যায় না। তার কারণ কিছুটা অনুমেয়। বিবেকানন্দের একাধিক মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্বের পেলবতা এবং সাহিত্যের সৌকুমার্য দুটোই তাঁর কাছে চরম অপছন্দের বস্তু ছিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও একথা সত্য যে নিবেদিতাকে তিনি এবিষয়ে নিজের অযৌক্তিক মতামতের দ্বারা প্রভাবিত করতে চেয়েছিলেন। ১৮৯৯ সালের ১২ই মার্চ মিস ম্যাকলাউডকে লেখা চিঠিতে নিবেদিতা ঠাকুর পরিবার বিষয়ে বিবেকানন্দের সাম্প্রতিক অভিমত জানিয়েছেন- ” Remember that that family has poured a flood of erotic venom over Bengal. ‘ রবিজীবনী’কার অনুমান করেছেন এই কঠোর সমালোচনার একমাত্র লক্ষ্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, যদিও তাঁর নাম উল্লিখিত হয়নি। এই অনুমান সর্বাংশে সত্য বলে মনে হয়। সুরেন্দ্রনাথ বা সরলার সঙ্গে নিবেদিতার ঘনিষ্ঠতায় বিবেকানন্দের কোনো আপত্তি ছিল না, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নিবেদিতার পরিচয়ের সম্ভাবনা দেখা দিতেই ‘ঠাকুরবাড়ির ‘ স্পর্শদোষ থেকে শিষ্যাকে তিনি দূরে রাখতে চাইলেন। অথচ তার মাত্র দু মাস আগেই ১৮৯৯ সালের জানুয়ারিতে স্বামীজি নিবেদিতাকে তাঁর ব্রাহ্ম বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করে বাগবাজারের বাড়িতে একটি চা পানের আসরের আয়োজন করার অনুরোধ করেন। নিজেও সেই অনুষ্ঠানে আসার জন্য উৎসুক হয়েছিলেন।

ভারি সুন্দর ছিল সেই আয়োজন, মাঘ মাসের মনোরম এক বিকেলে। নিবেদিতার সাক্ষ্য অনুযায়ী সেদিন তাঁর বাগবাজারের বাড়িতে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন সরলা রায়, মহেন্দ্রলাল সরকার, রবীন্দ্রনাথসহ ব্রাহ্মসমাজের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। আর অবশ্যই স্বামী বিবেকানন্দ। কবি তিনটি গান গেয়েছিলেন, যার সুরে আবিষ্ট নিবেদিতা। কিন্তু পরিবেশে একটি চাপা অস্বস্তির ভাব তিনি টের পেয়েছিলেন, যদিও তার কারণ বুঝতে পারেন নি। বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথের পারস্পরিক সম্পর্কের অস্বাচ্ছন্দ্য ছাড়া সেই অস্বস্তির কীই বা কারণ থাকতে পারে। উভয়ের মধ্যে কোনো বাক্যালাপও হয়নি।
রবীন্দ্রনাথ ও নিবেদিতার সম্পর্ক নিয়ে তথ্যগত বিবরণ খুব বেশি নেই, যেটুকু আছে তা এমন কয়েকটি ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাঁদের মধ্যে চিঠিপত্রও প্রায় কিছুই রক্ষিত হয়নি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কন্যার ইংরেজি শিক্ষার দায়িত্ব নিবেদিতাকে দিতে চাইলে তিনি তীব্র অসম্মতি জানান। বলেন, ঠাকুর বংশের ছেলে হয়েও তিনি মুক্ত হতে পারেন নি বিলিতি শিক্ষার মোহ থেকে। এই কথার পক্ষে এবং বিপক্ষে বহু যুক্তি আছে। কিন্তু অজস্র মতপার্থক্য সত্ত্বেও তাঁরা দেশের কল্যাণের জন্য একযোগে কাজ করেছেন এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, যতদিন নিবেদিতা জীবিত ছিলেন। এমন নিঃস্বার্থ সহযোগিতার জন্য যে সদিচ্ছা ও সাহস দরকার তা দুজনের মধ্যেই যথেষ্ট ছিল। তাঁর বাগবাজারের একান্ত নিরাভরণ বাড়িতে নিবেদিতার বন্ধুস্থানীয় অন্য বাঙালি মনীষীরা যেমন এসেছেন, তেমনই রবীন্দ্রনাথ এসেছেন নিয়মিত। কবি হিসেবে নয়, দেশের নানা সংকট সম্বন্ধে আলোচনা করতে। বিশেষ করে শিক্ষাপদ্ধতি সম্বন্ধে নিবেদিতার মতামত তাঁর কাছে মূল্যবান ছিল। জোড়াসাঁকোয় নিজের বাসস্থানটি তিনি নিবেদিতাকে ব্যবহার করতে দিতে চেয়েছিলেন একটি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলার জন্য। শুধু তাই নয়, সদানন্দ স্বামীর নেতৃত্বে অল্পবয়সী বালকদের প্রথম যে দলটি কেদার ও বদ্রীনাথ পর্যটনে যায়, তার সঙ্গে জ্যেষ্ঠপুত্র রথীন্দ্রনাথকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ছোট ছেলেদের এই ভ্রমণ পরিকল্পনাটি ছিল নিবেদিতার। কিন্তু শান্তিনিকেতনে কবির নতুন প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয় দেখার ইচ্ছে নিবেদিতা কি কখনো ব্যক্ত করেছেন? মনে হয় না।
বুদ্ধগয়া ভ্রমণ সম্ভবত তাঁদের সম্পর্কের উজ্জ্বলতম পরিচ্ছেদ। নিবেদিতা ও সস্ত্রীক জগদীশচন্দ্র সেখানে যাবার কথা কবিকে জানালে তিনি সাগ্রহে তাঁদের সঙ্গী হন। শেষ পর্যন্ত ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার, কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ, সন্তোষচন্দ্র মজুমদার এবং আরো কয়েকজন তাঁদের সহযাত্রী হয়েছিলেন। সেটা ১৯০৪ সালের অক্টোবর মাস। নিবেদিতার বুদ্ধগয়ায় যাবার একটি অন্য উদ্দেশ্যও ছিল। সেখানে শৈব মহান্তকে স্থানচ্যুত করে বৌদ্ধদের অধিকার ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন উঠেছিল। নিবেদিতার সহানুভূতি ছিল মহান্তের দিকে। রবীন্দ্রনাথের মনোভাব তার বিপরীত। কিন্তু এতজন বরণীয় মানুষের সম্মিলনে বুদ্ধগয়াতে তখন সকল তর্ক বিতর্কের অতীত এক আনন্দের পরিবেশ। বৌদ্ধধর্ম নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা, সকালে বৌদ্ধ মন্দির দর্শন, বোধিবৃক্ষতলে সন্ধ্যাযাপনের শান্তি।

সেদিনের স্মৃতিচারণ করে নিবেদিতা সম্বন্ধে যদুনাথ সরকার লিখেছেন – “ভারতীয় শাস্ত্র, শিল্প, লোকগাথা ও সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর অন্তর্ভেদী ব্যাখ্যার শক্তিতে চমকিত হয়েছিলাম। রবীন্দ্রনাথ নিবেদিতার এই ক্ষমতার সবিশেষ প্রশংসা করেন। কবির নিজস্ব সুন্দর প্রকাশক্ষমতা অবশ্যই ছিল, কিন্তু তিনি বলেছিলেন, নিবেদিতা বস্তুর অন্তর্দেশে সরাসরি পৌঁছে যাবার ক্ষমতা ধরেন এবং তাদের চমৎকারভাবে উদ্ঘাটনও করেন। “
রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লেখায় এই ভ্রমণের এবং নিবেদিতার দৃপ্ত চরিত্রের মুগ্ধ বিবরণ রেখে গেছেন।
তবে কাজের সূত্রে এবং সামাজিক পরিসরে মেলামেশার অনেক সুযোগ সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নিবেদিতার যোগাযোগ কখনো অন্তরঙ্গতায় পৌঁছয় নি, যে অন্তরঙ্গতা দেখি জগদীশচন্দ্র বসু, দীনেশচন্দ্র সেন বা অরবিন্দ ঘোষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে। জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে নিবেদিতার শুধু গভীর বন্ধুত্ব ছিল না, তিনি তাঁর আন্তরিক শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। তাঁর বিজ্ঞান বিষয়ক অনেক প্রবন্ধ লেখায় তিনি সহযোগিতা করেছেন, বিদেশে অসুস্থতার সময়ে শুশ্রূষার দায়িত্ব নিয়েছেন। জগদীশচন্দ্র ও অবলা বসুর সঙ্গে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণেও গিয়েছেন নিবেদিতা। দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর ভীরুস্বভাবের জন্য নিবেদিতার কাছে তিরস্কৃত হলেও বাংলা সাহিত্যের বিষয়ে তাঁর গবেষণাধর্মী কাজের ফলে এই বিদেশিনীর অকুণ্ঠ প্রশংসা অর্জন করেছেন। আর স্বদেশী আন্দোলনের অশান্ত দিনগুলিতে অরবিন্দের অতি বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন নিবেদিতা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে একটি অনতিক্রম্য দূরত্ব থেকে গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর কারণ ছিল রাজনৈতিক বা অন্যান্য মতান্তর। রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত স্বদেশী সমাজের ধারণার সঙ্গে নিবেদিতা একমত ছিলেন না, জানিয়েছেন প্রসিদ্ধ গবেষক গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী। এখানে নিবেদিতার মতই সম্ভবতঃ বেশি যুক্তিসঙ্গত ছিল। বিদেশী শাসনের অধীনে একটি সমান্তরাল স্বদেশী সামাজিক ব্যবস্থা খুব বাস্তবনির্ভর হয়তো নয়। তবে ১৯০০ সালের আগস্ট মাসে লেখা একটি চিঠিতে নিবেদিতা পরাধীন ভারতের আদর্শ শাসনব্যবস্থা সম্বন্ধে যে ধারণা ব্যক্ত করেন তার সঙ্গে “স্বদেশী সমাজ” কল্পনার কিছু সাদৃশ্যও রয়েছে। এই চিঠি লেখা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের “স্বদেশী সমাজ” প্রবন্ধের চার বছর আগে।

বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নিবেদিতার সক্রিয় নেতৃত্ব দেওয়া নিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে যেভাবে সমালোচনা করেছিলেন, তাও তাঁর কাছে অপ্রীতিকর মনে হতে পারে – “তোমার বিশ্বাস আছে, শক্তি আছে। তুমি হিংসাত্মক বিপ্লবের কথা বলিতে পার, কিন্তু তোমার চারিদিকে যে যুবকদল আসিয়া জুটিয়াছে, তাহাদের বিশ্বাসও নাই, শক্তিও নাই।… তুমি না থাকিলে তাহারা কিছুই করিতে পারিবে না।” গিরিজাশঙ্করের উদ্ধৃত এই মন্তব্য কতটা আক্ষরিক ভাবে রবীন্দ্রনাথের কথা, সেটা বলা কঠিন। সত্যিই কি বাংলার বিপ্লবী তরুণদের এতটা অকর্মণ্য মনে করতেন রবীন্দ্রনাথ?
তবে নিবেদিতার সঙ্গে তাঁর দূরত্বের কিছু অনির্ণেয় ব্যক্তিগত কারণও ছিল। তার একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। ১৯০৪ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষে জগদীশচন্দ্র ও অবলা বসুর সঙ্গে নিবেদিতা শিলাইদহে পদ্মাতীরে রবীন্দ্রনাথের অতিথি হয়ে যান। কিন্তু কবির সান্নিধ্য তাঁর বেশিদিন ভালো লাগে নি। তিনি মিস ওলি বুলকে লেখেন -“With all our trust and regard for the Poet – and I am grateful to him for having been born! – so tenderly does he love the Bairn (Jagadischandra ), and so assiduously does he serve him! – we are learning now to understand what it was that Swamiji felt about them all. Gradually as we exhausted what we had taken with us on Friday, we both felt the pressure of an atmosphere in which all had become commonplace… by Monday now, I had nothing left in me to say, either to him or to GOD. “
এখানে নিবেদিতার বক্তব্য সত্যিই আমাদের বিস্মিত করে। রবীন্দ্রনাথকে তাঁর ভালো লেগেছে শুধু জগদীশচন্দ্রের প্রতি তাঁর সেবা ও যত্নের জন্য! কয়েকদিন পরেই তিনি শ্রান্ত বোধ করছেন এবং বুঝতে পারছেন কবির প্রতি স্বামীজির অনুভূতি ঠিক কেমন ছিল। এর সপক্ষে কোনো যুক্তি দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন নি নিবেদিতা। আসলে প্রচন্ড কর্মক্ষমতা সত্ত্বেও তিনি স্বভাবে অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ; হৃদয়াবেগ যুক্তির নিয়মে কমই চলে।
রবীন্দ্রসাহিত্যের প্রসঙ্গে নিবেদিতার একটি অবদান উল্লেখযোগ্য। ১৯০০ সালে বসু দম্পতির সঙ্গে ইংল্যান্ডে থাকার সময়ে জগদীশচন্দ্রের একান্ত উৎসাহে তিনি রবীন্দ্রনাথের তিনটি ছোটগল্প – ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘ছুটি’ ও ‘দানপ্রতিদানে’র ইংরেজি অনুবাদ করেন। এর মধ্যে প্রথম গল্পটি ‘The Cabuliwallah’ নামে Modern Review পত্রিকার জানুয়ারি ১৯১২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় নিবেদিতার মৃত্যুর পরে। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের প্রথম ইংরেজি অনুবাদিকা হিসেবে তাঁর এই কাজ গুরুত্বপূর্ণ।
অতিরিক্ত পরিশ্রমে নিবেদিতার শরীর অকালেই ভেঙে গিয়েছিল। মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে বেশ কয়েকদিন কঠিন রোগভোগের পর তাঁর মৃত্যু হয় দার্জিলিংঙে, ১৯১১ সালের ১৩ই অক্টোবর। নিবেদিতার প্রয়াণে বন্ধু জগদীশচন্দ্রের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ যে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন, তা কোনো সাধারণ শ্রদ্ধার্ঘ্য নয়। বলা যেতে পারে এই লেখা এক মহীয়সী নারীর সামগ্রিক মূল্যায়ন, যার প্রথম দিকে নিবেদিতার চরিত্রের সঙ্গে তাঁর সংঘাতের জায়গাটি অব্যর্থ ভাবে চিহ্নিত করেছেন তিনি – “তাঁহার সর্বতোমুখী প্রতিভা ছিল, সেই সঙ্গে তাঁহার আর একটি জিনিস ছিল, সেটি তাঁহার যোদ্ধৃত্ব।… যেখানে তাঁহাকে মানিয়া চলা অসম্ভব সেখানে তাঁহার সঙ্গে মিলিয়া চলা কঠিন ছিল। আমার নিজের দিক দিয়া বলিতে পারি তাঁহার সঙ্গে মিলনের নানা অবকাশ ঘটিলেও এক জায়গায় অন্তরের মধ্যে আমি গভীর বাধা অনুভব করিতাম। সে যে ঠিক মতের অনৈক্যের বাধা তাহা নহে, সে যেন একটা বলবান আক্রমণের বাধা। “
কিন্তু এই সমস্ত মতের অমিল, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ দূরে সরিয়ে রেখে ভারতবর্ষের জন্য নিবেদিতার আত্মদানকে রবীন্দ্রনাথ যে ভাবে অভিনন্দিত করেছেন, সে দিক দিয়ে বিচার করলে এই রচনা তাঁর প্রবন্ধসাহিত্যের একটি রত্নবিশেষ। এর কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হল – “মানুষের সত্যরূপ, চিৎরূপ যে কী, তাহা যে তাঁহাকে জানিয়াছে সে দেখিয়াছে।… ভগিনী নিবেদিতা আমাদিগকে যে জীবন দিয়া গিয়াছেন তাহা অতি মহৎজীবন, তাঁহার দিক হইতে তিনি কিছুমাত্র ফাঁকি দেন নাই -… সেজন্য মানুষ যত প্রকার কৃচ্ছ্রসাধন করিতে পারে সমস্তই তিনি স্বীকার করিয়াছেন।….
….. আমরা বলিতেছি তিনি অন্তরে হিন্দু ছিলেন, অতএব আমরা হিন্দুরা বড়ো কম লোক নই। তাঁহার যে আত্মনিবেদন তাহাতে আমাদেরই ধর্ম ও সমাজের মহত্ত্ব।… বস্তুতঃ তিনি কী পরিমাণে হিন্দু ছিলেন তাহা আলোচনা করিয়া দেখিতে গেলে নানা জায়গায় বাধা পাইতে হইবে – অর্থাৎ আমরা হিন্দুয়ানির যে ক্ষেত্রে আছি তিনিও ঠিক সেই ক্ষেত্রেই ছিলেন এ কথা আমি সত্য বলিয়া মনে করি না। তিনি হিন্দুধর্ম ও হিন্দুসমাজকে যে ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে দেখিতেন -….. আমরা যদি সে পন্থা অবলম্বন করি তবে বর্তমানে যাহাকে সর্বসাধারণে হিন্দুয়ানি বলিয়া থাকে তাহার ভিত্তিই ভাঙিয়া যায়।”
এর অনেক বছর পরে অবশ্য E. J Thompson এর প্রশ্নের উত্তরে নিবেদিতা সম্বন্ধে বিরূপ মন্তব্য করেন রবীন্দ্রনাথ – “I didn’t like her. She was so violent. She had a great hatred for me & my work, especially here,… ” তাছাড়া, ” She used to say the most wrong & foolish things. “
তাহলে কেনই বা নিবেদিতার এত প্রশংসা করে প্রবন্ধ লিখেছিলেন একদিন, প্রশ্ন টমসনের। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী – “Well”, he said. “It was this way, Mr T. She was so full of love -” “Except for Englishmen. “He smiled, ” Except for Englishmen. Well, she was simply full of love for my country & I have seen her many a time working amid the most dreadful privations, especially for a woman brought up as she was. ” রবীন্দ্রনাথের এই সমালোচনা বেদনাদায়ক, কিন্তু অস্বাভাবিক নয়। নিবেদিতার দেশানুরাগের বাড়াবাড়ি, তাঁর কাছ থেকে পাওয়া কিছু অস্বীকৃতি রবীন্দ্রনাথকে আহত করেছিল নিশ্চয়ই।
নিবেদিতার প্রতি রবীন্দ্রনাথের মনোভাবে এই স্ববিরোধ চোখে পড়ার মতো। ব্যক্তিত্ব এমন এক জিনিস যা সহজ সমীকরণকেও জটিল করে তোলে। তবে আজকের নতুন করে জেগে ওঠা দেশাভিমানের দিনে, তাঁদের দুজনের মধ্যে এই বিতর্ক এবং রবীন্দ্রনাথের সংযত সমালোচনা ভীষণ ভাবে প্রাসঙ্গিক।

বাগবাজারে নিবেদিতার প্রাক্তন বাসভবনটির সম্প্রতি সংস্কারসাধন করে সেই বাড়িতে একটি সংগ্রহশালা খোলা হয়েছে। বিভিন্ন কক্ষে সযত্নে রাখা আছে, নিবেদিতার ছবি, অসংখ্য চিঠিপত্র, এবং তাঁর স্মৃতিবিজড়িত অনেক জিনিসের সংগ্রহ। সেবাড়ির স্বল্পায়তন আঙিনাটি দেখলে হয়তো কোনো দর্শকের মনে পড়বে, এখানে একশো সাতাশ বছর আগের এক শীতের গোধূলি বেলায় একটি চায়ের আসরের আয়োজন করা হয়েছিল। সরলা রায় নিবেদিতাকে চা তৈরি করতে সাহায্য করেছিলেন; পাশাপাশি এসে বসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ, যদিও হৃদয়ের দিক থেকে মিলিত হতে পারেন নি।
হয়তো সেই বিচ্ছেদকেই সারা জীবন জেনে বা না জেনে বহন করলেন নিবেদিতা।


প্রিয় এবং অপ্রিয় প্রসঙ্গকে কোনো বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে না বিচার করে শুধু অনুসন্ধানীর নজর দিয়ে দেখে সবটা লিখেছেন লেখিকা । একদিকে যখন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তখন সেই কাজটি কঠিন ছিল। লেখিকা সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
আপনার মন্তব্য পড়ে খুব আনন্দ পেলাম।
আলোচ্য দুই অসাধারণ ব্যক্তিত্বের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে নির্মোহ বিশ্লেষণটি মুগ্ধ করল।
ধন্যবাদ আপনার মূল্যবান মতামতের জন্য।
I felt like the article is a Thesis & anti thesis about Rabindranath & Vagini Nivedita.No doubt I am enlightened by the analysis in an erudite Personality.
Thank you
অসাধারণ একটা লেখা পড়লাম এবং মুগ্ধ হলাম।
অনেক ধন্যবাদ।
তথ্যসমৃদ্ধ এই লেখাটি পড়ে ঋদ্ধ হলাম। লেখিকাকে ধন্যবাদ।
দুই বরণীয় ব্যক্তিত্ব কার্যক্ষেত্রে মিলিত হতে পেরেছিলেন কিন্তু অন্তরের মিলনের পথটি রুদ্ধ রয়ে গেল কি কারণে তারই তন্নিষ্ঠ অণ্বেষণ শ্রীমতী পূর্ণার সুুচারু আলোচনায়। রবীন্দ্রনাথ ও ভগিনী নিবেদিতার মহত্ত্বকে খর্ব নাকরেও উভয়ের চারিত্রিক
বৈশিষ্ট্যের দিক্ গুলি নির্বাচিত উদ্ধৃতিসহযোগে বিবৃত করায় পাঠকগণের কাছে লেখাটি কিছুুটা বেদনার হয়েও পরম রমণীয়তায় নিলীন। ধন্যবাদ পূর্ণা।