
সন্ধ্যার আলো নামত ধীরে ধীরে — ঠিক যেমন নামত আমাদের অপেক্ষা। পুলিনদা’র দোকানের অস্থিসার চেহারার সামনে বসে চা আর বিড়ির ধোঁয়ায় ভিজে থাকত সময়; কাঁচের শিশিরে জমে থাকা বিকেলের ক্লান্তি আমরা গিলতাম চুমুকের পর চুমুক। সেই ধোঁয়ার ফাঁকেই বিপ্লবের কথা মনে পড়ত — কাগজে লেখা স্লোগান নয়, বুকের ভিতরে ধুকপুক করা এক অদৃশ্য অঙ্গীকার। ও বলেছিল আসবে। কথা দিয়েছিল। তাই লাল সাইকেলটার দিকে তাকালেই বুকের মধ্যে এক অকারণ কাঁপুনি উঠত — এই বুঝি সে, এই বুঝি পুলিনদা’র রক্তকরবী হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসে পড়বে। লাল রঙটা যেন তখন আর রঙ থাকত না — হয়ে উঠত রক্তের স্মৃতি, ফুলের প্রতিজ্ঞা, আর ভাঙা রাস্তার উপর ছিটকে থাকা স্বপ্নের ছাপ। দোকানের কাঠের বেঞ্চটা আমাদের শরীরের সঙ্গে মানিয়ে গিয়েছিল, যেন আমরা বসে নেই — বেঞ্চটাই আমাদের ধরে রেখেছে। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠত, বিড়ির ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে বাতাসে এক অদ্ভুত গন্ধ ছড়িয়ে দিত — সেই গন্ধে ছিল ক্লান্তি, ছিল অভ্যাস, আর ছিল না-বলা অনেক কথা। সন্ধ্যার আলো যখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসত, তখনই মনে পড়ত বিপ্লবের কথা। কাগজে লেখা কোনো তত্ত্ব নয়, মাইকে চিৎকার করা কোনো স্লোগানও নয় — বিপ্লব তখন ছিল বুকের ভিতরে জমে থাকা এক চাপা আর্তি, যা শব্দ খুঁজে পায় না।
দোকানের কোনায় চুপিচুপি জাল বুনত সময় — কেউ দেখত না, আমরা টের পেতাম। প্রতিটি সুতোয় জড়িয়ে থাকত না-বলা কথা, ফেলে আসা নাম, আর মুখে আনা যায় না এমন ভয়। বিপ্লব মানে যে শুধু মিছিল নয়, তা তখন বুঝতাম — বিপ্লব মানে এই অপেক্ষা, এই ধৈর্য, এই সন্ধ্যার সাথে সন্ধ্যা বদলানোর অনুশীলন। বিড়ির ছাই ঝরত মাটিতে, আর মনে হতো—এই ছাইয়ের নিচেই বুঝি বীজ লুকিয়ে আছে; ঠিক সময়ে জল পেলে সে ফেটে পড়বে। কবে রঞ্জন আসবে — এই প্রশ্নটা ঘুরত, ঘুরত, থামত না। রঞ্জন যেন কেবল একজন মানুষ নয়, এক ঋতু — যার আসা মানেই রাতের আকাশে দাগ কাটা আলো, আর ভোরে নতুন করে হাঁটার সাহস। ও বলেছিল আসবে। খুব সাধারণভাবে বলেছিল, কিন্তু সেই কথাটাই আমাদের দিনগুলোকে টেনে রাখত। অপেক্ষা তখন আর সময় কাটানোর নাম ছিল না, অপেক্ষা ছিল বেঁচে থাকার একমাত্র অজুহাত। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লাল সাইকেলটার দিকে তাকালেই কেন জানি না মনে হতো — এই বুঝি সে। লাল রঙটা চোখে লাগত না, বুকের মধ্যে গেঁথে যেত। মনে পড়ত পুলিনদার রক্তকরবী — রবীন্দ্রনাথের সেই ফুল, যা শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, প্রতিবাদের জন্য ফোটে। লাল সাইকেলটা তখন আর একটা যানবাহন থাকত না, হয়ে উঠত এক চলমান প্রতীক — যেন সে চেপে এলে আমাদের স্থির হয়ে থাকা দিনগুলো হঠাৎ চলতে শুরু করবে।

কখনও মনে হতো, সে আসবে না। তখন লাল সাইকেলটা নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে থাকত — চাকা দুটোয় ধুলো জমে, ঘণ্টাটায় নীরবতা। তবু আমরা চা শেষ করতাম, বিড়ির শেষ টান নিতাম, কারণ হাল ছেড়ে দেওয়াও তো এক ধরনের পরাজয়। দোকানের কাঠের বেঞ্চে বসে বসে শিখেছিলাম — হার আর জয়ের মাঝখানে যে দীর্ঘ করিডর, তার নাম অপেক্ষা। সেই করিডরে হাঁটতে হাঁটতেই মানুষ বড় হয়, কাঁধে পড়ে ইতিহাসের হালকা হাত, চোখে জমে নরম জল। পুলিনদার রক্তকরবী তখন আর কেবল নাটকের ফুল নয় — সে হয়ে উঠত আমাদের বুকের ভিতরের লাল কথা, যাকে ছিঁড়লে রক্ত বেরোয়, আর আগলে রাখলে আলো। কখনও কখনও খুব জোরে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করত। মনে হতো — আজই আসবে। আজ সন্ধ্যায় লাল সাইকেলটা একটু দুলে উঠবে, ঘণ্টা বাজবে, আর কেউ একজন নেমে এসে বলবে, “চল, অনেক দেরি হয়ে গেছে।” আবার কোনো কোনো দিন হঠাৎই সব বিশ্বাস শুকিয়ে যেত। মনে হতো — সে আসবে না। কেউ আসে না। আমরা শুধু নিজেরাই নিজেদের কথা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখি। সেই দিনগুলোতে দোকানের অস্থিসার চেহারাটা আরও কঠিন লাগত, যেন দেয়ালের ফাটলগুলো আমাদের দিকেই তাকিয়ে হাসছে।তবু আমরা উঠে যেতাম না। চা শেষ করতাম, বিড়ির শেষ টান নিতাম। কারণ উঠে যাওয়া মানে শুধু বেঞ্চ ছেড়ে যাওয়া নয় — উঠে যাওয়া মানে বিশ্বাস ছেড়ে দেওয়া। আর বিশ্বাস ছেড়ে দিলে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা ভরাট করার মতো কিছু আমাদের ছিল না। আমরা তখন বুঝতে শিখেছিলাম — বিপ্লব মানে শুধু রাস্তায় নামা নয়, বিপ্লব মানে দিনের পর দিন নিজের ভিতরের ভয় আর হতাশার সঙ্গে বসে থাকা, আর তবু পালিয়ে না যাওয়া। কবে রঞ্জন আসবে — এই প্রশ্নটা ধীরে ধীরে আমাদের কথাবার্তার অংশ হয়ে গিয়েছিল। কখনও ঠাট্টার মধ্যে, কখনও দীর্ঘ নীরবতার শেষে। রঞ্জন যেন শুধু একজন মানুষ ছিল না, সে ছিল একটা সময়, একটা সম্ভাবনা। তার আসা মানে শুধু কারও ফিরে আসা নয় — তার আসা মানে আমাদের অপেক্ষার সার্থকতা। মনে হতো, সে এলে আমরা প্রমাণ করতে পারব যে এই বসে থাকা, এই ধোঁয়ার মধ্যে দিন কাটানো, সবটাই বৃথা ছিল না। রাত নামত। দোকানের সামনে আলো জ্বলত — ম্লান, হলদেটে। লাল সাইকেলটা তখনও দাঁড়িয়ে থাকত, নিঃশব্দে। এই সাইকেলটাই বুঝি আমাদের মতো চলার ক্ষমতা আছে, কিন্তু কেউ চালাচ্ছে না। ধুলো জমছে, সময় জমছে। আর কোথাও, কোনো অজানা রাস্তায়, হয়তো কেউ হাঁটছে — যার পা আমাদের দিকে আসছে না, তবু আমরা ধরে নিয়েছি আসবে। বছরের পর বছর কেটে গেল। আমরা বদলালাম — চুলে সাদা এল, চোখের কোণে ভাঁজ পড়ল। কিন্তু সেই সন্ধ্যাগুলো বদলাল না। আজও সন্ধ্যা নামলে চায়ের ধোঁয়ার মধ্যে সেই পুরনো প্রশ্নগুলো ফিরে আসে। বিপ্লবের কথা মনে পড়ে, লাল সাইকেলটার কথা মনে পড়ে, রঞ্জনের কথা মনে পড়ে। আর তখন বুঝি — সে আসুক বা না আসুক, এই অপেক্ষাটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কারণ এই অপেক্ষাই আমাদের শিখিয়েছিল কীভাবে না-পেয়েও ধরে রাখতে হয়, কীভাবে হারিয়েও বাঁচতে হয়, আর কীভাবে অস্থিসার এক দোকানের সামনে বসে বসে নিজের ভিতরের মানুষটাকে ধীরে ধীরে চিনে নিতে হয়।
শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যা নামত, আবারও নামত। দোকানের অস্থিসার চেহারা বদলাত না, বদলাতাম আমরা। প্রত্যেক সন্ধ্যায় একটু করে সাহস জমত, একটু করে ভয় ঝরত। আর কোথাও — কোনো মোড়ে, কোনো অচেনা পথে — লাল সাইকেলটা কি সত্যিই থেমেছিল? জানি না। কিন্তু জানি, সেই অপেক্ষার দিনগুলো আমাদের শিখিয়েছিল — আসা না-আসার মাঝেই জীবন, আর বিশ্বাস মানে চোখের সামনে না থাকলেও পথ ছাড়তে না শেখা। তাই আজও সন্ধ্যা নামলে চায়ের ধোঁয়ার ভেতর বিপ্লবের গন্ধ পাই, আর মনে হয় — কবে রঞ্জন আসবে নয়, আমরা কবে পৌঁছোব, সেটাই আসল প্রশ্ন। সেই সন্ধ্যাটা আলাদা করে মনে থাকার কথা ছিল না। আকাশে কোনো অস্বাভাবিক রঙ ছিল না, বাতাসেও নতুন কিছু ছিল না। তবু পরে বুঝেছিলাম — কিছু সন্ধ্যা থাকে, যেগুলো কিছু না ঘটিয়েই সব বদলে দেয়।
পুলিনদার দোকান সেদিনও খোলা ছিল। কাঠের বেঞ্চটা ঠিক আগের মতোই দাঁড়িয়ে — আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে কি না, নাকি আমরা তার জন্য, তা বোঝা কঠিন ছিল। চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছিল, বিড়ির আগুনটা মাঝে মাঝে জ্বলছিল, মাঝে মাঝে নিভছিল। আমরা বসে ছিলাম। শুধু বসে থাকা—এর বেশি কিছু নয়। অথচ সেই “শুধু” শব্দটার ভিতরেই সব ভার জমে ছিল।
লাল সাইকেলটা সেদিন একটু অন্যরকম লাগছিল। না, সে নড়েনি। তবু মনে হচ্ছিল, আজ ওর ওপর কেউ আর চোখ রাখছে না। আগের দিনগুলোতে আমরা সাইকেলটার দিকে তাকাতাম — আজ তাকাচ্ছিলাম না। যেন অজান্তেই বুঝে গিয়েছিলাম, আজ আর কাঁপুনি ওঠার দরকার নেই। আজ আর “এই বুঝি সে” বলার জায়গা নেই।

কেউ রঞ্জনের নাম নিল না। এটাই ছিল সবচেয়ে অস্বস্তির। এতদিন যে নামটা ঘুরে ঘুরে বাতাসে ভাসত, সেদিন সেটা হঠাৎ মাটিতে পড়ে গেল। নাম না নিলে মানুষটা নেই — এই অদ্ভুত নিয়মে আমরা সবাই চুপ করে রইলাম। চুপ থাকাটা তখন আর কৌশল ছিল না, ছিল স্বীকারোক্তি।
চায়ের স্বাদ কেমন যেন বেশি তেতো লাগছিল। হয়তো চিনি কম ছিল, হয়তো কিছুই কম ছিল না—আমাদেরই মুখ বদলে গিয়েছিল। দোকানের ভেতর থেকে পুলিনদা একবার তাকাল। কিছু বলল না। বড়রা অনেক সময় কিছু না বলেই সব বুঝিয়ে দেয়।
সন্ধ্যার আলো নামল। কিন্তু সেদিন নামার মধ্যে কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না। আলোটা যেন শুধু দায়িত্ব পালন করে সরে গেল। আমরা কেউ বললাম না—“আজ দেরি হচ্ছে।” কেউ বললাম না—“আজ আসবে না মনে হয়।” কারণ ওই কথাগুলো বলার মানে হতো — এখনো আমরা অপেক্ষার খেলায় আছি। অথচ সেদিন মনে হচ্ছিল, খেলাটা শেষ হয়ে গেছে, আমরা শুধু মাঠে বসে আছি।
লাল সাইকেলটার ঘণ্টায় ধুলো জমেছিল। আগে সেটা চোখে পড়ত না। সেদিন পড়ল। ধুলো জমানো জিনিসগুলো হঠাৎ খুব বাস্তব হয়ে ওঠে—তারা আর প্রতীক থাকে না, বস্তু হয়ে যায়। সাইকেলটা তখন আর সম্ভাবনা নয়, একটা পড়ে থাকা জিনিস। সেই বদলটা খুব ধীরে হলেও ভেতরে ভেতরে ভাঙচুর করে দেয়।
একসময় কেউ উঠে দাঁড়াল। আগে কখনো এমন হয়নি। উঠে দাঁড়ানোটা ছিল অপ্রস্তুত, প্রায় অপরাধের মতো। কেউ কিছু বলল না। বেঞ্চটা হালকা শব্দ করল — কাঠের একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো। তারপর আরেকজন উঠল। তারপর আরেকজন। আমরা বুঝলাম, আজ উঠে যাওয়াটা পরাজয় নয়। আজ বসে থাকাটাই অকারণ হয়ে গেছে।
আমি শেষ পর্যন্ত বসে ছিলাম। কেন জানি না। হয়তো অভ্যাস, হয়তো জেদ। দোকানের সামনে তখন আমি একাই। আলো, বেঞ্চ, লাল সাইকেল—সবকিছু ঠিক আগের মতো, শুধু মানুষগুলো নেই। প্রথমবার বুঝলাম, অপেক্ষা আসলে মানুষের তৈরি। মানুষ না থাকলে অপেক্ষাও থাকে না।
রাত নামল। দোকানের আলো জ্বলল। লাল সাইকেলটা তখনো দাঁড়িয়ে। আমি তাকালাম। বুকের ভেতর কোনো কাঁপুনি উঠল না। এই না-ওঠাটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। মনে হলো, কিছু একটা শেষ হয়েছে — কিন্তু কী শেষ হয়েছে, তা বলা কঠিন।

হয়তো রঞ্জনের আসার সম্ভাবনা শেষ হয়েছে। হয়তো আমাদের বসে থাকার বয়স শেষ হয়েছে। হয়তো বিপ্লবের সংজ্ঞাটাই বদলে গেছে। আমি জানি না। শুধু জানি, সেই সন্ধ্যায় কিছুই এল না — আর সেই না-আসাটাই আমাদের ভিতরের অনেক কিছু নিয়ে চলে গেল।
আমি উঠলাম। বেঞ্চটা ছেড়ে। দোকানের সামনে শেষবারের মতো তাকালাম। লাল সাইকেলটার দিকে নয় — আকাশের দিকে। অদ্ভুতভাবে হালকা লাগছিল। ভয়ও ছিল, আবার সাহসও ছিল। বুঝলাম, অপেক্ষা শেষ মানে শূন্যতা নয়। অপেক্ষা শেষ মানে — এবার হাঁটার পালা।
পিছনে আর তাকাইনি।
রঞ্জনের পর সময়টা প্রথমে বোঝা যায়নি। কোনো হঠাৎ পরিবর্তন হয়নি। সূর্য উঠেছে, সন্ধ্যা নেমেছে, দোকান খুলেছে, বন্ধ হয়েছে। শুধু একটা জিনিস নিঃশব্দে সরে গিয়েছিল—অপেক্ষার অভ্যাস। আমরা সেটা টের পেয়েছিলাম অনেক পরে, ঠিক যেমন শরীর থেকে জ্বর নামার পর বোঝা যায়, কতদিন ধরে শরীরটা গরম ছিল।
পুলিনদার দোকানের সামনে আর কেউ বসত না। বেঞ্চটা খালি পড়ে থাকত। মাঝে মাঝে কোনো পথচারী বসে পড়ত, আবার উঠে যেত। তারা জানত না, এই বেঞ্চটা একসময় কত ভার বইত। লাল সাইকেলটা একদিন আর দেখা গেল না। কেউ বলল না কে সরাল, কেন সরাল। হয়তো বিক্রি হয়ে গেছে, হয়তো ভেঙে গেছে, হয়তো কোথাও অন্য রাস্তায় চলে গেছে। অদ্ভুতভাবে, সেটা জানার প্রয়োজনও আর মনে হয়নি।
রঞ্জনের পরের সময়টা প্রথমে খুব হালকা লাগত। বুকের ভেতর আর সেই ধুকপুক শব্দ নেই, সন্ধ্যা নামলে আর কোনো কাঁপুনি ওঠে না। হালকাপনার মধ্যেই একটা ভয় ছিল—এত হালকা হওয়া কি ঠিক? এতদিন ধরে যে ভারটাকে নিজের বলে জেনেছি, সেটাকে হারালে মানুষ কি সত্যিই স্বস্তি পায়, নাকি শুধু অসাড় হয়ে যায়?
আমরা আলাদা আলাদা পথে হাঁটতে শুরু করেছিলাম। কেউ দূরে চলে গেল, কেউ কাছেই রয়ে গেল, কেউ আবার নিজের ভিতরের দিকেই ঢুকে পড়ল। আর কেউ আর সন্ধ্যার সময় কাউকে খুঁজে বের করত না। সন্ধ্যা তখন আর প্রতিশ্রুতি ছিল না, ছিল কেবল দিনের শেষ। সাধারণ একটা সময়—এই সাধারণ হয়ে যাওয়াটাই ছিল সবচেয়ে বড় বদল।
মাঝে মাঝে মনে হতো, রঞ্জন আসলে কখনো আসেনি বলেই এতটা জায়গা দখল করে ছিল। যে মানুষগুলো আসে, তারা জায়গা নেয়; যে মানুষগুলো আসে না, তারা জায়গা হয়ে যায়। রঞ্জন ছিল সেই জায়গাটা—ফাঁকা, অথচ ভরাট। তার অনুপস্থিতিতেই আমরা নিজেদের দাঁড় করিয়েছিলাম।
রঞ্জনের পর আমরা শিখেছিলাম কথা বলতে। আগে যেসব কথা শুধু ধোঁয়ার মধ্যে ভাসত, এখন সেগুলো মুখে আসত—অসম্পূর্ণ, ভাঙা, তবু সত্যি। কেউ বলত, “তখন ভয় পেতাম।” কেউ বলত, “আমি তখন বিশ্বাস করতাম।” কেউ কিছু বলত না, শুধু মাথা নেড়ে দিত। নীরবতাও বদলে গিয়েছিল—আগের মতো চেপে ধরা নয়, একটু ঢিলেঢালা।
বিপ্লব শব্দটা তখন আর খুব জোরে শোনা যেত না। তবু তার মানে হারায়নি। বিপ্লব তখন আর বসে থাকার নাম ছিল না; বিপ্লব মানে হয়ে উঠেছিল—নিজের জায়গা বদলানো, নিজের ভয়টার চোখে চোখ রাখা, আর কাউকে না আসার জন্য দায়ী না করা। আমরা বুঝেছিলাম, বিপ্লব সবসময় বাইরে ঘটে না; অনেক সময় সে ঘটে অপেক্ষা ফুরিয়ে যাওয়ার পর।
কখনও কখনও সন্ধ্যার আলো ঠিক আগের মতোই নামত। তখন হঠাৎ বুকের ভিতর একটা পুরনো স্মৃতি নড়েচড়ে বসত। লাল রঙ, কাঠের বেঞ্চ, চায়ের ধোঁয়া—সব এক মুহূর্তে ফিরে আসত। কিন্তু এবার সেই স্মৃতির সঙ্গে কোনো প্রশ্ন জুড়ে থাকত না। “কবে আসবে”—এই বাক্যটা আর মনে আসত না। আসত শুধু—“আমরা তখন এমন ছিলাম।”
রঞ্জনের পরের সময় আমাদের শিখিয়েছিল, সব অপেক্ষা শেষ হলে শূন্যতা আসে না। আসে জায়গা। সেই জায়গায় কেউ কেউ নিজের জন্য একটা চেয়ার টেনে নেয়, কেউ জানালা খুলে দেয়, কেউ আবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। আমরা সবাই নিজের নিজের মতো করে সেই জায়গাটার ব্যবহার শিখেছিলাম।
আর একদিন হঠাৎ বুঝলাম — রঞ্জনের দরকার আর নেই। তার না-আসা আমাদের অসম্পূর্ণ করেনি, বরং চলতে শিখিয়েছে। সে ছিল একটা দরজা — যেটা খুলে যায়নি, কিন্তু যার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা বুঝে গিয়েছিলাম, ভেতরে ঢোকার জন্য দরজা সবসময় খোলা থাকার প্রয়োজন হয় না।
রঞ্জনের সঙ্গে দেখা হবে — এটা কখনো ভাবিনি। আবার ভাবলেও, যেভাবে ভাবা হয় সেভাবে নয়। কোনো প্রস্তুতি ছিল না, কোনো পূর্বাভাসও না। সে এসেছিল হঠাৎই — ঠিক যেমন অনেক কিছু আসে, যেগুলো আসার কথা ছিল একসময়, কিন্তু আসে যখন আর দরকার থাকে না।
বিকেলটা তখন গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে যাচ্ছিল। শহরটা বদলে গেছে — নাম একই, কিন্তু হাঁটার শব্দ আলাদা। আমি রাস্তা পার হচ্ছিলাম, মাথা নিচু করে, নিজের চিন্তার ভিতর ঢুকে। তখনই ওর কণ্ঠটা শুনলাম। নাম ধরে ডাকেনি। শুধু বলেছিল,
“এই—”

এক মুহূর্তে চিনতে পারিনি। অনেক বছর পেরিয়ে গেলে মানুষকে চিনতে দেরি হয় না—চিনতে দেরি হয় স্মৃতিটাকে ঠিক জায়গায় বসাতে। আমি তাকালাম। দাঁড়িয়ে ছিল রঞ্জন। চেনা, অথচ অচেনা। মুখে বয়সের দাগ, চোখে ক্লান্তি। সেই চোখ—যার দিকে তাকিয়ে একসময় কত সন্ধ্যা পার করেছি, আজ সেগুলো কোনো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল না।
আমরা দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম। এই নীরবতাটা অস্বস্তির ছিল না। বরং খুব প্রয়োজনীয়। যেন শব্দ আসার আগে একটু জায়গা পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার।
“তুমি এখানে?”— আমি বললাম।
“হ্যাঁ”— ও বলল। আর কিছু যোগ করল না।
আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। কোথায় যাচ্ছি, সেটা কেউ জানত না। পাশাপাশি হাঁটা — এই অভ্যাসটা আশ্চর্যভাবে শরীর ভুলে যায় না। এত বছর পরেও পা দুটো যেন নিজের থেকেই তালে তালে পড়ছিল।
আমি লাল সাইকেলটার কথা ভাবছিলাম। বেঞ্চটার কথা। পুলিনদার দোকানের কথা। কিন্তু কিছুই বললাম না। কিছু কথা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন হওয়া ছেড়ে দেয় — সেগুলো আর জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে না।
রঞ্জনই প্রথম বলল,
“আমি জানতাম… তোমরা অপেক্ষা করছ।”
আমি তাকালাম না। শুধু হাঁটতে হাঁটতে বললাম,
“আমরাও জানতাম… তুমি জানো।”
ও হালকা হাসল। সেই হাসিতে লজ্জা ছিল না, ছিল ক্লান্তি।
“আমি আসতে পারিনি,” বলল সে।
এই বাক্যটা একসময় আমাদের ভেঙে দিতে পারত। আজ সেটা শুধু একটা তথ্য।
আমি বললাম,
“জানি।”
এই ‘জানি’ শব্দটার মধ্যে কোনো অভিযোগ ছিল না। ছিল না ক্ষমাও। শুধু গ্রহণ। অনেক পরে মানুষ কিছু কথা ক্ষমা করে না, অতিক্রম করে।
আমরা এক জায়গায় দাঁড়ালাম। রাস্তার আলো জ্বলছিল। সন্ধ্যা নামছিল—ঠিক আগের মতোই। আমি হঠাৎ বুঝলাম, রঞ্জনের উপস্থিতি আমার ভিতরে কিছু বদলাচ্ছে না। না কাঁপুনি, না উত্তেজনা। একটা অধ্যায় বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ আর সেই পাতায় ফিরে যায় না।
“তোমরা ঠিক ছিলে,” – রঞ্জন বলল হঠাৎ।
আমি তাকালাম।
“কিসে?”
“অপেক্ষা না ছেড়ে।”
আমি মাথা নেড়ে বললাম,
“না। আমরা ঠিক ছিলাম না। আমরা শুধু তখনকার মতো ছিলাম।”
রঞ্জন কিছু বলল না। হয়তো বুঝল। হয়তো না। তাতে কিছু আসে যায় না।
বিদায়ের সময় কোনো নাটক হলো না। হাত মেলানোও না। আমরা শুধু দাঁড়িয়ে ছিলাম — দু’জন মানুষ, যাদের মাঝে একসময় একটা সময় ছিল।
ও চলে গেল। আমি অন্যদিকে হাঁটলাম।
সন্ধ্যা তখন পুরো নেমে গেছে। আমি একা হাঁটছিলাম। বুকের ভিতর কোনো শূন্যতা নেই। কোনো পূর্ণতাও নেই। শুধু একটা স্থিরতা।

বুঝলাম — রঞ্জনের মুখোমুখি হওয়া দরকার ছিল না আমাদের জন্য। দরকার ছিল সময়টাকে ঠিক জায়গায় রেখে দেওয়ার জন্য। আজ সেটা হয়ে গেল।
আর লাল সাইকেল?
ওটা আর কোনো দিন চোখে পড়েনি।
কিন্তু এখন জানি — কিছু জিনিস হারিয়ে গেলে ফেরে না।
আর কিছু জিনিস ফেরে — শুধু এই বোঝাতে, যে আমরা আর সেখানে নেই। এর পর আর কিছু ঘটেনি — এটাই ঘটনার সবচেয়ে সৎ বর্ণনা। কোনো খবর আসেনি, কোনো চিঠি নয়, কোনো ফোন নয়। শহর নিজের মতো চলেছে, আমিও। দিনের পর দিন কেটে গেছে এমনভাবে, যেন তারা কাউকে কিছু বোঝাতে চায় না।
পুলিনদার দোকানটা একদিন বন্ধ হয়ে গেল। খুব সাধারণভাবে। এক সকালে দেখলাম শাটার নামানো, তালা ঝুলছে। কোনো ভিড় হয়নি, কোনো স্মরণসভা নয়। দোকান বন্ধ মানে শুধু দোকান বন্ধ — এই সরল সত্যটা আগে বুঝতাম না। বেঞ্চটা নেই, লাল সাইকেলটার কোনো চিহ্ন নেই। জায়গাটা এখন অন্য কিছুর জন্য ব্যবহার হচ্ছে। মানুষ হাঁটে, থামে না।
সন্ধ্যা নামা বন্ধ হয়নি। কিন্তু সন্ধ্যা আর ডাক দেয় না। আগে সন্ধ্যা মানে ছিল ফিরে তাকানো — এখন সন্ধ্যা মানে শুধু আলো বদলানো। আকাশ ফ্যাকাসে হয়, তারপর অন্ধকার। এর মধ্যে কোনো প্রতীক খুঁজতে ইচ্ছে করে না।
মাঝে মাঝে মনে পড়ে — আমরা কতটা সময় অপেক্ষায় কাটিয়েছিলাম। এখন বুঝি, সেই অপেক্ষা নষ্ট হয়নি। কিছু অপেক্ষা ফল দেয় না, কিন্তু মানুষকে তৈরি করে। আমাদেরও করেছিল। আমরা শিখেছিলাম বসে থাকতে, আবার উঠে দাঁড়াতেও।
রঞ্জনের কথা আর বিশেষ মনে পড়ে না। নামটা মাঝে মাঝে কোথাও চোখে পড়ে — খবরে, কারও কথায়, বা হঠাৎ কোনো ভিড়ে। তখন মনে হয়, একসময় এই নামটা আমাদের জীবন ছিল। এখন সে শুধু একটি নাম। এই বদলটাই সবচেয়ে গভীর।
আমি হাঁটি। কোনো নির্দিষ্ট দিকে নয়। হাঁটা এখন আর পালিয়ে যাওয়া নয়, খোঁজাও নয়। হাঁটা শুধু হাঁটা। পায়ের নিচে রাস্তা থাকে, এটুকুই যথেষ্ট।
আর একদিন বুঝলাম — বিপ্লবের কথা আর আলাদা করে মনে করতে হয় না। সে কোনো স্মৃতি নয়, কোনো স্বপ্নও নয়। সে একধরনের স্বাভাবিকতা — ভয় থাকলেও থেমে না যাওয়া, না-আসাকে নিজের ব্যর্থতা না ভাবা, আর সময়কে শত্রু না করা।
আমরা যেটার জন্য বসে ছিলাম, সেটা আসেনি।
কিন্তু আমরা যে মানুষ হয়ে উঠেছি, সেটা এসেছে।
আর তাই এখন আর কোনো সন্ধ্যা নেই—
শুধু দিন থেকে রাত,
আর মানুষের নিজের পথে এগিয়ে যাওয়া। সন্ধ্যা আর নামে না — এই কথাটা প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। শহরের আকাশ তো রোজই অন্ধকার হয়, ল্যাম্পপোস্ট জ্বলে, দোকানের শাটার নামতে নামতে কোলাহল থামে। তবু ওইদিন থেকে আমার ভেতরে আর কোনো সন্ধ্যা নামে না। রঞ্জনের পরের সময়টা যেন সকাল আর রাতের মাঝখানে আটকে থাকে — একটা দীর্ঘ, স্বচ্ছ আলো, যেখানে স্মৃতি আর বর্তমান পাশাপাশি বসে থাকে, চা ঠান্ডা হয় না, কথাও ফুরোয় না।
রঞ্জনের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়াটা হঠাৎ ছিল, কিন্তু অযথা নয়। এত বছর পরে হঠাৎ দেখা — এটা কাকতালীয় বললে নিজের কাছেই মিথ্যে বলা হয়। আমরা দুজনেই জানতাম, এই শহরের কোন কোণে গেলে একদিন না একদিন ধাক্কা লাগবেই। সেই ধাক্কাটা লাগল রেলওয়ে বুকস্টলের সামনে। আমি একটা বই নামাচ্ছিলাম, সে ঠিক পাশের তাক থেকে। একই সঙ্গে হাত বাড়ানো —দু টো হাত থমকে গেল। চোখ উঠল। সময় থেমে গেল।
রঞ্জন আগের মতোই — তবে আগের মতো নয়। চোখের কোণে রেখা পড়েছে, হাসিটা কম শব্দ করে। কণ্ঠে সেই পুরনো দৃঢ়তা নেই, আছে একধরনের নরম স্থিরতা। আমরা কেউই বলিনি, “অনেকদিন পর।” কথাটা তখন অপ্রয়োজনীয় ছিল। শুধু বলেছিলাম, “চা?” সে মাথা নেড়ে হেসেছিল। সেই হাসিতে ছিল না কোনো দাবি, ছিল না কোনো অভিযোগ — শুধু সম্মতি।
চায়ের দোকানটা বদলায়নি। পুলিনদা নেই, তার ছেলেই বসে। বেঞ্চটা আগের মতোই কাঠের, তাতে আমাদের নাম খোদাই করা নেই — কখনো করিনি। ধোঁয়ার গন্ধ কম, শব্দও কম। আমরা মুখোমুখি বসলাম। কথার আগে দীর্ঘ নীরবতা — সেটা ভারী নয়, বরং স্বস্তির। নীরবতা যে কখনো কখনো সবচেয়ে ভদ্র ভাষা, সেটা আমরা তখন বুঝেছিলাম।
রঞ্জন বলল, “সব ঠিক আছে?”
আমি বললাম, “ঠিক-ভুলের হিসেব বন্ধ করেছি।”
সে মাথা নেড়ে চায়ের কাপটা তুলল। চুমুকের শব্দে একটা যুগ ভেঙে পড়ল।

আমরা কথা বলিনি। সেইসব সন্ধ্যার কথা — যেখানে লাল সাইকেলটা দাঁড়িয়ে থাকত, বিপ্লবের কথা বলা হতো, আর আমরা বিশ্বাস করতাম কাল সকালেই সব বদলে যাবে। বলিনি রক্তকরবীর কথা, বলিনি প্রতীক্ষার কথা। সে সব কথা বলা মানে ছিল আবার সন্ধ্যা নামানো। আমরা কেউই আর সন্ধ্যা চাইনি।
রঞ্জন বলল, সে এখন অন্য শহরে থাকে। কাজ আছে, পরিবার আছে, মাঝে মাঝে নদীর ধারে হাঁটে। আমি বললাম, আমি এখানেই আছি — কিছু বদলায়নি, অনেক বদলেছে। আমরা দুজনেই হাসলাম। এই হাসি কোনো বিজয়ের নয়, কোনো পরাজয়েরও নয় — এটা টিঁকে থাকার হাসি।
চা শেষ হলো। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। রঞ্জন বলল, “চলো, হাঁটি।” আমরা হাঁটলাম। রাস্তার আলো আমাদের পায়ের ছায়া লম্বা করল। কোথাও কোনো তাড়াহুড়ো নেই। হাঁটার মধ্যে কথা কম, শ্বাসের শব্দ বেশি। মনে হলো, এই শহরটা অবশেষে আমাদের কথা শুনছে — কিন্তু কিছু জানতে চাইছে না।
একটা মোড়ে এসে রঞ্জন থামল। বলল, “এখানেই।”
আমি বললাম, “হ্যাঁ।”
কোনো আলিঙ্গন নেই, কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। শুধু একটা দৃঢ় হাত মেলানো। হাত ছাড়ার সময় বুঝলাম, কিছু ছেড়ে দিচ্ছি না — বরং কিছু স্থির করে রাখছি।
সেদিন রাতে ঘুম এল সহজে। স্বপ্নে কোনো সন্ধ্যা নামেনি। সকালে উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখলাম — আলো। শুধু আলো। মনে হলো, এতদিন ধরে আমরা সন্ধ্যার জন্য অপেক্ষা করেছি, অথচ দরজার বাইরে সকাল দাঁড়িয়ে ছিল।
পরের দিনগুলো স্বাভাবিক। তবু স্বাভাবিকের ভেতরে একটা নীরব পরিবর্তন। রাস্তায় হাঁটলে মনে হয়, কারও সঙ্গে ধাক্কা লাগলেও আর ক্ষত হবে না। দোকানে বসে চা খেলেও সময় আর গলে যায় না। স্মৃতিগুলো থাকে, কিন্তু তারা আর ডাক দেয় না — শুধু পাশে বসে থাকে।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি, যদি তখন আমরা অন্যরকম সিদ্ধান্ত নিতাম — কিছু বদলাত? হয়তো না। কারণ সময় নিজেই একধরনের সম্পাদক। সে অপ্রয়োজনীয় বাক্য কেটে দেয়, ভারী বিশেষণ ঝরিয়ে দেয়। শেষে থাকে শুধু প্রয়োজনীয় সত্যগুলো — যেগুলো চুপচাপ টিকে থাকে।
রঞ্জনের পরের সময় মানে শূন্যতা নয়। এটা পূর্ণতা — যেখানে আর প্রমাণ দিতে হয় না। যেখানে বিশ্বাস মানে চোখ বুজে থাকা নয়, চোখ খুলে থাকা। যেখানে বিপ্লব মানে চিৎকার নয়, দায়িত্ব। যেখানে ভালোবাসা মানে আঁকড়ে ধরা নয়, জায়গা দেওয়া।
এক সন্ধ্যায় — না, সন্ধ্যা নয় — এক বিকেলে আমি আবার সেই চায়ের দোকানে গেলাম। পুলিনদার ছেলে চা দিল। বেঞ্চে বসলাম। সূর্যটা ধীরে নামছিল, কিন্তু ভেতরে কোনো অন্ধকার জমছিল না। মনে হলো, জীবনটা অবশেষে নিজের গতিতে হাঁটছে।

আমি জানি, এই গল্প এখানেই শেষ করা যায়। কোনো বড় ঘটনার দরকার নেই। কোনো নাটকীয় বিদায়ও নয়। কারণ শেষটা আসলে শুরু — একটা নীরব, পূর্ণ শুরু। যেখানে আর কোনো সন্ধ্যা নেই। তখন আমরা বুঝেছিলাম — রাজনীতি শুধু মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাত তোলা নয়। রাজনীতি মানে কোন বেঞ্চে বসে থাকা, আর কোন বেঞ্চ ছেড়ে উঠে পড়া। কোন সন্ধ্যায় চুপ থাকা, আর কোন সন্ধ্যায় চুপ থাকাটাকেই অস্বীকার করা। পুলিনদার দোকানের সামনে বসে আমরা কোনো দল গড়িনি, কোনো পতাকা তুলিনি—তবু আমাদের শরীর ধীরে ধীরে শিখে নিয়েছিল ক্ষমতার ভাষা। কে আসে না, কেন আসে না, আর কার না-আসার দায় কাকে নিতে হয় — এই প্রশ্নগুলোই ছিল আমাদের প্রথম রাজনৈতিক পাঠ।
লাল সাইকেলটা তখন আর কেবল প্রতীক ছিল না; সেটা ছিল রাষ্ট্রের মতো — চলার ক্ষমতা আছে, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকে। তার ঘণ্টা বাজে না, কারণ শব্দ করলে কেউ শুনবে না। আমরা বুঝেছিলাম, অনেক সময় বিপ্লব আটকে থাকে শুধু একজনের না-আসায় নয়, একটা ব্যবস্থার ইচ্ছাকৃত দেরিতে। রঞ্জন তখন ব্যক্তি ছিল না—সে ছিল সেই বিলম্ব, সেই প্রতিশ্রুতি, যেটা বারবার বলা হয়, কিন্তু পালন করা হয় না।
আমরা যারা বসে ছিলাম, তারা কোনো নিরীহ দর্শক ছিলাম না। আমাদের বসে থাকাটাই ছিল রাজনীতি — কারণ আমরা জানতাম, উঠে গেলে প্রশ্ন হারাবে। আবার উঠে যাওয়াটাও একদিন রাজনীতি হয়ে উঠল—কারণ তখন আর প্রশ্ন করার জায়গা ছিল না। সেই সন্ধ্যায়, যেদিন আমরা বেঞ্চ ছেড়ে উঠেছিলাম, সেদিন কোনো স্লোগান ওঠেনি, কোনো সংঘর্ষ হয়নি। তবু সেদিনই বুঝেছিলাম — রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ভয় মিছিল নয়, মানুষ যখন আর অপেক্ষা করে না।
রঞ্জনের না-আসা আমাদের ভেঙে দেয়নি; আমাদের নাগরিক বানিয়েছিল। আমরা শিখেছিলাম, বিশ্বাস মানে অন্ধ আনুগত্য নয়, আর ধৈর্য মানে চিরকাল সহ্য করা নয়। আমরা বুঝেছিলাম, ক্ষমতা শুধু যারা আসে তাদের হাতে থাকে না —যারা আর ডাক দেয় না, তাদের হাতেও ক্ষমতা থাকে।
আজ যখন সন্ধ্যা নামে, তখন আর বিপ্লবের কথা আলাদা করে মনে করতে হয় না। কারণ বিপ্লব এখন অভ্যাস — ভোট দেওয়ার সময় নয় শুধু, প্রতিদিনের সিদ্ধান্তে। কাকে আর অপেক্ষা করব না, কাকে আর নেতা বানাব না, কোন প্রতিশ্রুতিকে আর ইতিহাস বলে মেনে নেব না — এই ছোট ছোট না-বলাগুলোই আমাদের রাজনীতি।
রঞ্জন একদিন এসেছিল। কিন্তু রাষ্ট্র তো রোজ আসে — কাগজে, নোটিশে, দামের তালিকায়, পুলিশের বাঁশিতে। আমরা তখন বুঝেছিলাম, ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হওয়া সহজ; ব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়াই আসল সাহস। আর সেই সাহস কোনো সন্ধ্যায় হঠাৎ নামে না — সে জমে, ঠিক যেমন জমেছিল পুলিনদার দোকানের সামনে, চায়ের ধোঁয়ার ভিতরে, নীরব অপেক্ষার মধ্যে।
তাই এখন আর কোনো সন্ধ্যা নেই। আছে দায়িত্ব। আছে স্মৃতি।
রঞ্জনের পর সময়টা অদ্ভুতভাবে হালকা ছিল। বুকের ভেতর আর কোনো ধুকপুক নেই, সন্ধ্যার কোনো ডাক নেই। প্রথমে ভয় হয়েছিল — এই হালকাপনা কি অসাড়তা?
পরে বুঝলাম, এটা আসলে দায়মুক্তি নয়, দায়বোধের শুরু।
আমরা আলাদা হয়ে গেলাম—কেউ শহর ছাড়ল, কেউ নিজেকে। কিন্তু একটা জিনিস বদলে গেল স্থায়ীভাবে: আমরা আর কাউকে আমাদের সময়ের মালিক হতে দিলাম না।
রঞ্জন তখন আর মানুষ নয় — একটা অভিজ্ঞতা।
সে আমাদের শিখিয়ে দিয়েছিল, না-আসাও একধরনের উপস্থিতি। আর সেই উপস্থিতিকে মেনে নিয়েই মানুষ নিজের ভিতর জায়গা বানায়। সেদিন বুঝলাম, closure বলে আলাদা কিছু নেই। সময় নিজেই বন্ধ করে দেয় দরজা — আমরা শুধু একদিন খেয়াল করি। পুলিনদার দোকান এখন নেই। বেঞ্চ নেই। লাল সাইকেল নেই।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে, কিছুই হারায়নি।
কারণ আমরা যেটার জন্য বসেছিলাম, সেটা আসেনি—
কিন্তু বসে থাকতে থাকতে আমরা যে মানুষ হয়ে উঠেছিলাম, সেটা রয়ে গেছে। এখন সন্ধ্যা নামলেও আমি আর তাকাই না।
কারণ সন্ধ্যা এখন আর প্রতিশ্রুতি নয়। সে শুধু সময়ের একটি অংশ। বিপ্লবও আর কোনো বড় শব্দ নয়। সে এখন ছোট ছোট সিদ্ধান্তে থাকে।
আর অপেক্ষা করব না, কোন প্রতিশ্রুতিকে আর বিশ্বাস করব না, কখন উঠে দাঁড়াব।
আমরা একসময় ভেবেছিলাম, কেউ এসে আমাদের নিয়ে যাবে।
এখন জানি — কেউ আসে না।
আর সেটাই সবচেয়ে জরুরি সত্য।বিপ্লব মানে কারও আসার অপেক্ষা নয়।
বিপ্লব মানে—
একদিন নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ানো,
চারপাশের সব ভয়, সব সন্দেহ, সব বাঁধনকে পেছনে ফেলে
নিজের পা দুটোকে প্রথমবারের মতো সত্যি করে বিশ্বাস করা।
বিপ্লব মানে—
কারও হাত ধরে ওঠা নয়,
কারও আশ্বাসের অপেক্ষায় বসে থাকা নয়,
কেউ এসে পথ দেখাবে—এই স্বপ্নে নিজেকে বেঁধে রাখা নয়।
বিপ্লব মানে—
অন্ধকার ভেদ করে নিজেই আলো হয়ে ওঠা,
বারবার পড়ে গিয়েও আবার উঠে দাঁড়ানোর জেদ,
নিজের ভেতরের কাঁপুনি আর ভয়কে সঙ্গী করেই এগিয়ে যাওয়া।
বিপ্লব মানে—
যেদিন বুঝবে,
তোমার পথ তোমাকেই বানাতে হবে,
তোমার যুদ্ধ তোমাকেই লড়তে হবে,
আর তোমার পা দুটোই তোমার সবচেয়ে বড় শক্তি।
বিপ্লব মানে—
অপেক্ষা নয়, বিপ্লব মানে শুরু—
নিজেকে বিশ্বাস করার,
নিজের পথ নিজেই হাঁটার।


গল্পটি পড়লাম একবার তাড়াতাড়ি। পরে আর একবার কিছুটা সময় নিয়ে। ভাল লেগেছে লিখে দিলে হত কিন্তু …। আমার মত ‘মুচিরাম গুড়ের’ মন্তব্যে কিছু যায় আসে না তবু… বলি … বুঝলাম না – এই রচনাটি প্রবন্ধ ছলে গল্প না কি গল্প ছলে ইস্তেহার। বজ্রসেন শেষে কেঁদে ছিল ‘ ক্ষমিও মম দীণতা’। আমিও মাপ চাইছি।
গল্পটিকে নিজের জীবনের অনুভূতিগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছি।গল্পের আইডিয়া আর নির্মাণে নতুনত্ব আছে।কিন্তু বলাটা আরো একটু সংক্ষিপ্ত হলে ভাল হতো।শেষ অবধি আসতে বেশ কিছুটা অধৈর্য্য হয়েছি।সব মিলিয়ে ভালই লেগেছে।