
আমার মেজকার মেয়ে বিন্দি দিদি। সেই আমাদের পরিবারের তথা গ্রামের আদর্শ। বিন্দিদি পড়তে বসলে, আমাদেরও পড়তে বসতে হয়, বিন্দি ভালো রেজাল্ট করলে আমাদের তাঁর গু পর্যন্ত খেয়ে খারাপ রেজাল্টের খেসারত দিতে হয়। যেদিন মাধ্যমিকের রেজাল্ট বের হল, মা বলল, ‘যা বিন্দির গু খেয়ে আয়, মেয়েটাকে দেখেও তোর কোনো শিক্ষা হয় না।’
তাই বলে রসগোল্লার বদলে মেধাবী বিষ্ঠা ? ছিঃ, ম্যা গো !
বিন্দিদি আমাদের মতো অপগন্ডদের সঙ্গে খুব প্রয়োজন না পড়লে তেমন মেশে না। একবার স্কুল থেকে ফেরার পথে হঠাৎ কালবৈশাখী তেড়ে এলে বিন্দিদির ছাতা উড়ে গেল। বিন্দিদির তখন বাবা’রে, মা’রে অবস্থা। আমরাও যে কী খুশিতে এই উড়ন্ত ছাতার দিকে চেয়ে মনকে মেঘের সঙ্গে উড়িয়ে দিয়েছিলাম জানি না, কিন্ত ব্যাপারটা ঘটেছিল। ছাতাখানি দমকা হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে, উড়তে চেয়েও পারছে না কিন্তু চলতি হাওয়াকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা বিন্দির চরিত্রের মতোই। সেই বয়সে কবিত্ব বোধ ছিল না কিন্তু এ দৃশ্য বেশ হাসির উদ্রেক করেছিল। বিন্দিদি ফার্স্ট গার্ল বলে কথা, তাঁর বিপদে এ হেন হাসি যেন তাঁকে চরম হুল ফুটিয়ে দিল। তখন তাঁকে আর পায় কে!
এই তোরা হাসছিস যে, যা ছাতা ধরে আন।
সঙ্গে সঙ্গে আমার মতো হাবলা ক্যাবলা গাবলাদের সে কী আনন্দ-ছুট ! গু খেতে না পারলেও তাঁর ছাতার জন্য মাঠে পড়ে থাকা বিষ্ঠা মাড়াতেও কেউ দ্বিধা করিনি। স্কুলের সেরা ছাত্রীর বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ার মধ্যেও বেশ একটা গর্বের ব্যাপার থাকে।
সে আমাদের মনুষ্য পদবাচ্য না মনে করলেও আমাদের পরিবার থেকে গ্রাম – সকলের চোখে বিন্দিদির জন্য ছিল অপার সমীহ। ছিল বলব না, আজও আছে। তাঁর কটু ব্যবহার নিয়ে মুখে আত্মীয় পরিজনেরা যতই নিন্দা করুক না কেন, অন্তরে যতই বিদ্বেষ থাক না কেন, ভোট কিন্তু আমাদের তাঁর দিকেই আছে এবং থাকবে। কিছু মানুষের স্বভাব হল তাদের নির্ধারিত যাবতীয় সেরাকে বশীভূত রাখা। সেই সেরাগুলি সরবরাহের দায়িত্ব যেমন আমাদের পরিবারের ছিল, তেমনি তাঁকে ঘিরে থাকা স্কুলের ছাত্রছাত্রী থেকে শিক্ষক শিক্ষিকা প্রত্যেকেরই। এই সুযোগে বিন্দিদিও নিখুঁত জিনিসটি না পেলে কীভাবে কেঁদে কেটে অথবা তীব্র জেদ ধরে তা আদায় করতে হয়, সে বিষয়েও পোক্ত ছিল। এমনটি শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ মেলানোর ক্ষেত্রেও খাটে। এক্ষেত্রে তিনি নিদেনপক্ষে দশটি দোকান ঘুরে তবেই কিনতেন। তাঁর বাজার-সঙ্গী অবশেষে ক্লান্ত হয়ে বিরক্তির সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করে ঝগড়া পর্যন্ত না গড়ালে শ্রীমতীর ব্লাউজ অভিযান ক্ষান্ত হত না। প্রবল গুনমুগ্ধেরও অভিজ্ঞতা একই। একবার তাঁর ক্লাসের দ্বিতীয় স্থানাধিকারী ছেলেটি ইতিহাসে দশ নাম্বার বেশি পাওয়ায় আমাদের বাড়িতে দশ দিনের অশৌচ পালন চলেছিল। মাছ ডিম মাংসের কথা উচ্চারণ পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল, তাই প্রত্যেক বিষণ্ণ সদস্যকে প্রায় একপাকে রাঁধা হবিষ্যান্নস্বরূপ সেদ্ধপক্ক খেয়ে থাকতে হয়েছিল। তাঁর শোক থেকে আনন্দ সবই এমন মূল্যবান।

বিন্দিদি আমাদের সকলকে টপকে যেদিন আমেরিকাতে গবেষণা করতে গেল, তারপর থেকে তাঁর উচ্চতা ট্রোপো সফিয়ার ছাড়িয়ে আয়নোসস্ফিয়ার পর্যন্ত পৌঁছে গেল। আমরা কেবল বছরের কয়েকটা দিনের জন্য অপেক্ষা করতাম, কখন তিনি আসবেন। সে বার তাঁর আগমন ছিল অন্য কারণেই। প্রায় শ খানেক পাত্র দেখার পর অবশেষে তিনি পছন্দ করলেন আমাদের ঠিক তিনটে স্টেশন পরেই সন্ধ্যাপুর গ্রামের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ককে। তাঁরা চার ভাই, যেন সন্ধ্যাপুরের চারটি উদীয়মান নক্ষত্র। বিন্দিদির কপালে জুটল বড়ো মানিক। যেমন রাজপুত্রের মত চেহারা, তেমনি খ্যাতনামা ডাক্তার । বিন্দিদির পাত্র পছন্দের ইতিহাসও আরেক গল্প। এক ডাক্তার পাত্রের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁর দাঁতে সামান্য কালো ছোপ দেখতে পেয়ে বিন্দিদি বাতিল করেছিল। তাঁদের এলাকার জল প্রচুর লৌহমিশ্রিত, এবং সেটিই ছিল অপছন্দের কারণ।
বিন্দিদি যদিও তথাকথিত সুন্দরী নন তবে মুখখানি মিষ্টি, গায়ের রঙ শ্যামলা, উচ্চতাও কম ,বেঁটে বললেই চলে। এই একটি ব্যাপারেই আমাদের পাড়ার সুনন্দাদি তাঁর চেয়ে এগিয়ে। সুনন্দাদির মতো ঘরোয়া সাধারণ গ্র্যাজুয়েট মেয়ের যখন ডাক্তার পাত্রের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হল, সে বিয়েতে বিন্দিদি এলই না এবং তারপর থেকে সুনন্দাদির সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবের আদানপ্রদানটুকুও বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু সুনন্দাদির সুখ বেশিদিন সহ্য হল না, অ্যাক্সিডেন্টে ওঁর বর মারা গেল। বিন্দিদি খবর পেয়ে সুনন্দাদিকে ফোন করে বলল যে শ্রাদ্ধের সময় সে আসবে। এমনকি সুনন্দাদিকে আদেশ করল বাড়ির আত্মীয়স্বজনদেরকেও নেমন্তন্ন করতে যাতে এই গেট টুগেদারে একযোগে সকলের সঙ্গেই দেখা সাক্ষাৎ সেরে ফেলা যায়। সুনন্দাদি মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে সেই শ্রাদ্ধের ঘটা আর হয়ে ওঠেনি।
হ্যাঁ, বিন্দিদি নিজের জন্য পাত্র পছন্দ করল বটে, কিন্ত সেই এক ঘড়া গঙ্গা জলে গোমূত্র ফেললেন পাত্রের জ্যাঠা। ভাইয়ের জন্য তাঁর দরদ উথলে উঠে সটান পৌঁছে গেল পাঁচ লাখে।

বললেন, ‘বুঝতেই পারছেন ভাইয়ের এই সামান্য চাকরিতে ছেলেদের এমন লেখাপড়া শেখাতে খরচ তো কিছু কম হয়নি। তাই পণ হিসেবে নয়, বিয়ের প্রীতিভোজের অনুষ্ঠান করার জন্য যদি আপনারা সামান্য সহায়তা করেন, তাহলে আমরা খুবই উপকৃত হই।’
বিন্দিদির হবু শ্বশুর এই সময় খুবই লজ্জিত মুখে মাথা নিচু করে দাদার ইচ্ছের প্রতি সম্মান জানিয়েছিলেন। বিন্দিদির হবু বর তখন পাশের ঘরে তাঁর সঙ্গে মিঠে আলাপে ব্যস্ত ছিল।
পরিবারের সবাই খুব ভীত ছিল যাতে বিন্দির কানে এই পণ সংক্রান্ত খবর না যায় ! এত ভালো পাত্র হাতছাড়া হলে আবার পাত্র অভিযান খুবই কষ্টের। তাছাড়া মা দিদিমা পিসিদের বিয়েতেও যৌতুক পাত্রপক্ষ দাবি না করলেও, মেয়েকে কেউ খালি হাতে শ্বশুরবাড়ি পাঠাননি।
কিন্তু খবর পৌঁছে গেলই। আমার খুড়তুতো বোন মুন্নি বিন্দিদি’র কাছে অধিক প্রিয় হবার লোভ সামলাতে না পেরে কানে তুলেই দিল। সেই শুনে বিন্দিদি’র সে কী চিৎকার,
“ওদের আমি জেল খাটিয়ে ছাড়ব।”
না ব্যাপারটা কয়েদখানা অব্দি গড়ায়নি কারণ আমাদের হবু জামাইবাবু তখন দিদির প্রেমে টলোমলো। সেই সুযোগটিকে হাতছাড়া করতে নারাজ দিদিও। তখন মোবাইল ফোন ছিল না , সব গ্রামে সাধারণ টেলিফোনও ছিল না। বিন্দিদি তাঁর হবু বরকে জম্পেশ করে একখানা প্রেমপত্র লিখলেন। সেখানে লিখলেন, এ বিয়ে যদি পাঁচ লাখের জন্য ভেঙে যায় তাহলে সে আত্মহত্যা করবে।
এমন চিঠির কথা মুন্নি ছাড়া আমাদের বাড়ির কারো জানা ছিল না। এই এক চিঠিতে বিন্দির বর এবং শ্বশুরবাড়ি এখনও কাবু। ও বাড়িতে বিন্দির কথাই শেষ কথা, তাঁর ভয়ে সকলেই তটস্থ।
বিন্দিদি যেবার জামাই ষষ্ঠীতে বাপের বাড়িতে ল্যান্ড করত, সেইদিনগুলো ছিল আমাদের পরম প্রাপ্তির দিন। এমন অনুষ্ঠানে একদিন অথবা হাফ বেলার জন্য যে কেউ একগাদা ভাড়া খরচা করে আসতে পারে, এমন নমুনাও বিন্দিদির তৈরি। বাজারের সেরা সব্জি মাছ মাংস মিষ্টি ফল আমাদের ঘরে আসত। জামাইবাবু বড়দের প্রণাম করে সেই যে দোতলার দখিন খোলা ঘরটিতে প্রবেশ করতেন, নিতান্ত প্রাকৃতিক প্রয়োজন ছাড়া বেরোতেন না। বিন্দিদিও সবসময় তাঁকে সঙ্গ দিতেন। আমরা ছোটরা কেবল মা কাকীমাদের তল্পিবাহক ছিলাম। বিন্দিদির নির্দেশমতো জলখাবার থেকে সুসজ্জিত ভাতের থালা পৌঁছে দিতাম। সে যে কত রকম ভাজাভুজি তরিতরকারি সহযোগে জামাই আদর, আমরা কেবল অপেক্ষায় থাকতাম কখন না খাওয়া অথবা অর্ধেক খাওয়া সুখাদ্যগুলি ডাস্টবিনে না গিয়ে আমাদের পাতে এসে পড়বে। আরে বাবা, এসব বিন্দিদির বিষ্ঠার চাইতে তো ঢের ভালো।

আগেই বলেছি, বিন্দিদি’র দেওররাও এক একটি হীরে জহরত। কেউ বিখ্যাত মোক্তার, কেউ বা কেউকেটা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। বিন্দিদি তাঁদেরকে এমন মধুরভাবে ভাই বলে ডাকে যে সেখানে আমরা নিজেদের বড়োই বঞ্চিত অযোগ্য হতভাগা অনাত্মীয় মনে করি। এমনিতেও খুব প্রয়োজন না পড়লে দিদি আমাদের সঙ্গে দূরত্বই বজায় রাখে। উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণতা শুধু ভূগোলেই কমে না, জীবনেও কমে। কিন্তু সময় বড়ো দায়, সেই দায়েই উঁচু নীচু কখনও কখনও একসূত্রে মেলে। তেমনই একদিন একটা ফোন আসা মাত্রই সারা বাড়ি থমথমে হয়ে গেল। পর্বতসমান মেধাক্রান্ত বিন্দিদির সমুদ্রসম দুঃখের বিস্তারে আমরা সকলেই মুহ্যমান। আমার স্কুলের ম্যাগাজিনে কবিতা প্রকাশিত হবার আনন্দটিও কেউ সানন্দে গ্রহণ করল না। সত্যিই তো, এসব লিখেটিখে তো খুব বড়ো লেখক না হলে পেট ভরে না। দুঃখ আনন্দ সবই কেবল তাঁর। বিন্দিদির মা, যিনি আমাদের স্কুলেরই শিক্ষিকা, অর্থাৎ আমার মেজো কাকীমা স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসেই মাকে হুকুম করলেন, ‘তুহিনা, তাড়াতাড়ি ব্যাগ গোছাও। তোমার এয়ার টিকিট কেটে নিয়েছি। বিন্দির পা মচকে গেছে, একমাস বেড রেস্ট।’ মা কোনোদিন প্লেনে চড়েনি, তাই ভয়ে ভয়ে বলল, ‘মেজো, তুমি তরুর টিকিট কেটে দিলে আমার সুবিধা হত। ওরা আজকালকার ছেলেমেয়ে, সঙ্গে থাকলে সাহস পাই।’ তরু আমারই ডাক নাম। কাকীমা মুখ ঝামটে নিদান দিলেন, ‘তুমি বোধহয় ভাবতে পারছ না, প্লেনে তৎকাল টিকিটের দাম কত বেশি।’ মেজো কাকীমা যেহেতু স্কুলের শিক্ষিকা আমার মা তাই তাঁকেও মাথায় তুলে রাখেন। এই আনন্দেই সংসারের জন্য হাসিমুখে জীবনভর তিনি খাটছেন, এমনকি দেওরের মেয়ের মেধার গৌরবে গৌরবান্বিত হয়ে নিজের ছেলেমেয়েদের শুধুই শাসনকলেই আবদ্ধ করে ফেলেছেন।
একমাসের জায়গায় দেড় মাস গড়িয়ে মা ফিরলেন ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণিতে। বিন্দিদির প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আমার ঠাকুমা এবার আর সহ্য করলেন না। গায়ে জ্বর নিয়ে ক্লান্ত মা ঘরে ঢুকতেই মেজো কাকা ও কাকীমাকে উদ্দেশ্য করে জীর্ণ মানুষটি চিৎকার করে উঠলেন, ‘অনেক সহ্য করেছি তোমাদের শিক্ষার বাড়াবাড়ি। এক একটা অসভ্য স্বার্থপর ।’
মেজো কাকীমা মারফত সে খবর বিন্দিদি’র কাছেও পৌঁছেছিল, কিন্তু তাতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তন হয়নি মায়েরও। এরপর ওরা জার্মানি চলে গেল। বিন্দিদির বরাবরের ইচ্ছেও ছিল বিদেশে বসবাস করার। কিন্ত প্রজেক্ট শেষ হতেই জামাইবাবুকে আবার হায়দরাবাদ ফিরতে হল।ইতিমধ্যে বিন্দিদির বাবা, অর্থাৎ মেজো কাকা হঠাৎ মারা গেলে, ওরা বিদেশ থেকে এ দেশে এল। খুব কান্নাকাটি করছিল বাবার সেবা করতে না পারার জন্য। কিন্ত কাকীমা যখন বলল, ‘বিন্দি, তুই যদি কয়েকটা দিন বাড়তি থেকে যেতে পারতিস তাহলে আমি চোখটা অপারেশন করে নিতাম।’ বিন্দিদি বলল যে তাঁর ছেলের সামনে পরীক্ষা, এখন এসব অসুবিধা সৃষ্টি করা চলবে না। তাছাড়া টিকিটও আর ক্যান্সেল করতে পারবে না, অযথা পয়সা গচ্চা যাবে। ও হ্যাঁ, বিন্দিদির ছেলেমেয়ে আমাদের সঙ্গে তেমন মিশত না কারণ আমরা ছিলাম লক্ষ্যহীন উদভ্রান্তের দলে।
পুত্র শোকাতুর শয্যাশায়ী আমার ঠাম্মা কীভাবে যেন সব বুঝতে পারেন। মেজো কাকীমাকে বিন্দিদির সামনেই বললেন, ‘তোমার অন্ধ হয়ে যাওয়াই ভালো বৌমা, তুমি বরং বিন্দির সঙ্গেই যাও। আমি ওকে বলে দিচ্ছি, যত অসুবিধাই থাক তোমাকে তাকে নিয়ে যেতেই হবে। ডেকে আনো তাকে।’
মেজো কাকীমা মাকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদতে লাগল। বিন্দি দিদি এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বাধ্য হয়ে তাঁর মাকে নিয়ে হায়দরাবাদের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিল। আমার মায়ের ক্লান্ত শরীরটা এখন একটু জিরিয়ে নেবার সময় পায়। কতদিন পরে মাকে আবার কপালে মেরুন বড়ো বিন্দি পরে সিনেমা যেতে দেখলাম। শাড়ি গয়না ছাপিয়ে মায়ের অদ্ভুত মায়াময় শ্রীমন্ডিত অবয়বে জ্বলজ্বল করছে এই টিপটি। পাড়ার বৌদের সঙ্গে দিব্যি খোশগল্প জুড়ে বকবক করে চলেছে, ‘জানিস, আমাদের বিন্দি রাষ্ট্রপতির হাত থেকে কী সব পুরস্কার পেয়েছে ! ‘
মেজো কাকীমা আমাকে হোয়াটসাপ করেছিল।’
আর চোখ অপারেশন?
কত বড়ো চাকরি, ছুটি নেওয়া সম্ভব নয়।
বিন্দি দিদির হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইলে পাহাড়চুড়ো থেকে সূর্যোদয়ের ছবি। ফেসবুকের প্রোফাইল তালা দেওয়া, যাতে ওঁর সাফল্যে কারোর নজর না পড়ে, তাই। তাঁর মতে ফেসবুকের লোকজনরাও ঠিকঠাক মেধাসম্পন্ন নন। বেশিরভাগ ফেক।
এত সব কথা মেজো কাকীমাই বলেছিল।
বিন্দিদি এখন বেশ ঝাড়া হাত পা। তাঁর বিভিন্ন প্রজেক্টের কাজ শেষ। ছেলেদুটিও লেখাপড়া নিয়ে বিদেশে। মাঝে মধ্যে তাঁর আমাদের মতো সাধারণ হতে ইচ্ছে করে ইদানীং। জামাইবাবু অর্থাৎ বিন্দিদির বরই নাকি বলেছে এখন থেকে দেশ গাঁয়ের আত্মীয়দের সঙ্গে হৃত সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে। জিজুর কাছ থেকেই জেনেছিলাম ‘ফোকাস ‘ শব্দটা জীবনে সঠিক ভাবে প্রয়োগ করতে পারলে সাফল্য অবধারিত। নইলে ওই গণ্ডগ্রাম থেকে একেবারে নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে তাঁর উচ্চপদে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সম্ভব হত না। আর কয়েক বছর পর তাঁর অবসর। অবসর জীবন তিনি গ্রামেই কাটাতে চান। নিজের যোগ্যতা প্রমাণে এতদিন যা কিছু পালা-পার্বণ তাঁকে হারাতে হয়েছে, তখন তিনি তা প্রাণভরে উপভোগ করতে চান। বিন্দিদির অবশ্য তেমন কোনো ইচ্ছা নেই,বরং বিদেশেই কাটাবার পরিকল্পনা ছিল। কর্তার ইচ্ছেতেই এবারের ভাইফোঁটা অনুষ্ঠানে এসেছিল। আমরা ভাইয়েরা ফোঁটা নি সুনন্দাদির কাছেই।
সুনন্দাদি বাবা মার একমাত্র মেয়ে। স্বামী মারা যাবার পর হাসপাতালে সামান্য একটি চাকরি করে। ছুটি পেলেই গ্রামে মা বাবার কাছে আসে। আমাদের পাড়ার ছোটখাটো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব সে এখন নিজেই নিয়েছে। পাড়াভর্তি মেয়ের দল বিবাহসুত্রে সবাই অন্যত্র চলে গেছে। নিজ নিজ সংসার সামলে কেই বা আর আসতে পারে ! ভাইফোঁটা উপলক্ষে কেউ কেউ আসে। তাদের নিয়েই আমাদের অনুষ্ঠান জমে ওঠে। বিন্দিদি বিয়ের পর এই প্রথম আমাদের অনুষ্ঠানে গান গাইবে বলেছিল। কিন্তু যেই শুনল রুমিদির মেয়ে তিস্তা দারুণ লোকগীতি গায়, অমনি নিজের নাম কেটে দিল। তবে আমরা ঠিক করেছিলাম, বিন্দিদিকে সম্বর্ধনা দেব। সেইসময় আমাদের বাড়ির সকলের মতো আমারও খুব গর্ব হচ্ছিল। নিজেকে বিন্দিদির ভাই হিসেবে পরিচয় দিতে গিয়ে নিজের ফোকাসহীনতা সাময়িক উধাও হয়ে গেছিল।
তারপর সেইসব ছবি আমি ফেসবুকে পোস্টও করেছিলাম। একটা কবিতাও লিখেছিলাম ক্যাপশনে। বিন্দিদি নিজের প্রোফাইল লক করে যে আমার প্রোফাইল এবং পাড়ার সকলের প্রোফাইলে নজরদারি চালায় সেটা আমি ঠিকই বুঝেছিলাম। বিন্দিদির অনেক ক্লাসমেট আমার ফ্রেন্ড লিস্টে আছে। তাঁরা পোস্ট দেখেই নানান মন্তব্য শুরু করে দিল। দু একটি মহিলার মন্তব্যে সন্দিগ্ধ হয়ে জিজ্ঞেসও করেছিল, ‘কী রে, গল্প লিখে বেশ মেয়ে পটাতে শিখেছিস।’ হঠাৎ একদিন দেখি আমার হোয়াটসঅ্যাপে বিন্দিদি তাঁর লেখা একটি কবিতা পাঠিয়ে লিখেছে , ‘পড়ে দ্যাখ, কেমন হয়েছে।’ সারাজীবন তাঁর গু খেতে খেতে মনের গহীনে কোথাও আমারও একটা জেদ চেপে বসেছিল ওকে হারাবার। আমি দেখেও দু’দিন কোনো উত্তর দিলাম না। তৃতীয় দিন লিখলাম, ‘আরো লেখা প্র্যাকটিস করতে হবে। চেষ্টা করো।’ তারপরেও মাঝে মধ্যে পাঠাত কিন্ত গোল বাঁধাল এই গল্পটা , যেটা আমি কোনো একটি গল্পের গ্রুপে পোস্ট করেছিলাম। আমি জানতাম না যে এমন ছোটখাটো গ্রূপেও সে আমার সন্ধান চালায়।

তারপর থেকে আমি স্বস্তিতে। শুনছি নাকি এখন তিনি ডিপ্রেশনে। তবে এসব আমাদের বেশ সয়ে গেছে। জামাইবাবু ও তাঁর ভাইবোনেরা আমাদের কাছে অভিযোগ করে তার নানাবিধ স্বার্থপরতার কথা শোনায়। আমরা মন দিয়ে শুনি, তবে ব্যাপারটাকে ফোকাসে রাখি না বরং ‘ইগনোরান্স ইস দি বেস্ট পলিসি’ ভেবে আড়াল করি। সবই বুঝি তবু নিজেদের বাড়ির মেয়ে তো,কোথাও যেন দুর্বলতা রয়ে যায়। মা কাকীমারাই তো তাঁকে শিখিয়েছিল বিয়ের পরে মেয়েদের শ্বশুরবাড়িই সবচেয়ে আপন। তাই বোধহয় সে আমাদের পর করেছে। মেজো কাকীমা আমাদের কাছেই ফিরে এসেছেন। কিছুদিন হল, চোখটা অপারেশন করালাম। জামাইবাবুর পরিচিত ডাক্তারের কাছেও যেতে চাইলেন না, বললেন ওদের নাকি তাতে বিড়ম্বনা বাড়ে, টেনশন বাড়ে, ছেলেমেয়েদের কেরিয়ারে ক্ষতি হয়। আমার মা আগের মতোই সেবাযত্ন করেছেন। যতই হোক কপালের টিপ তো, না পরলে সুন্দর দেখায় না, কী রকম যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে।
মেজকা মারা যাওয়ার পর থেকে কাকীমাও টিপ পরা ছেড়ে দিয়েছিলেন। মা আজ তাঁকেও সেই বড়ো খয়েরি লাল বিন্দি পরিয়ে দিয়েছেন।



এমন চরিত্র আমাদের চারদিকে ঘোরে। সভ্যতার ফতোয়ায় সযত্ন অন্যমনস্কতায় সে সব আমরা অপ্রকাশ্য রাখি। লেখিকা প্রকাশ করেছেন। অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে এগিয়ে নিয়ে গেছেন আখ্যান মালা। আমাদের অগোচরে আমাদের বসিয়ে দিয়েছেন চরিত্রদের মুখোমুখি। সেখানেই তার সার্থকতা।
চরিত্র চিত্রণ খুব সুন্দর। তাই গল্পটি খুব ভালো লাগল।