
বর্ণান্ধতা এক ধরনের রোগ, যা সারা পৃথিবীতে পুরুষদের ক্ষেত্রে খুব বিরল রোগ নয়। অনেকে এই রোগ নিয়েই সারাজীবন কাটিয়ে দেয় কিছু বুঝতে না পেরেই। সমস্যাটা বিশেষ করে বোঝা যায় ছবি আঁকতে গেলে। এই রোগ থাকলে সাধারণত লাল বা সবুজ রঙ ঠিক মত দেখতে পাওয়া যায় না। রবীন্দ্রনাথের নিজের ধারণা ছিল তিনি লাল রঙ ঠিক মতো বুঝতে পারেন না ।
নির্মল কুমারী মহালনাবীশের লেখা থেকে আমরা জানতে পারি রবীন্দ্রনাথ ঠাট্টা করে বলতেন –
‘অথচ আমি তোমাদের লাল ফুল ভাল দেখতে পাইনে বলে আমাকে ঠাট্টা করো। নীল রংটা যে পৃথিবীর রঙ, আকাশের শান্তির রঙ, তাই ওটার মধ্যে চোখ ডুবে যায়; আর লাল রংটা হল রক্তের রঙ, আগুনের রঙ অতএব প্রলয়ের রঙ, মৃত্যুর রঙ – কাজেই বেশি দেখতে না পেলে দোষ কি? ’
(Painting of Rabindranath Tagore)
আবার রাণী চন্দ তাঁর স্মৃতিচারণে বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেছিলেন – “দেখেছি গুরুদেবের ছবিতে লালের প্রাচুর্য, তবু নাকি লাল রঙ তাঁর চোখে পড়ত না।”
কিন্তু নন্দলাল বসু তাঁর ‘দৃষ্টি ও সৃষ্টি’ নামের গ্রন্থে লিখেছিলেন – “তদুপরি রবীন্দ্রনাথের বর্ণরুচি এমন অভ্রান্ত আর এত পরিশীলিত যে, বর্ণসংগতিতে তাঁর কোথাও দুর্বলতা দেখা যায় না। “
নন্দলাল বসুর মতো একজন উচ্চমানের শিল্পীর মনে হয়েছে – “বিভিন্ন পর্দায় দুটি ঘোর রঙও তিনি গায়ে গায়ে ব্যবহার করেছেন – গাঢ় নীল রঙের পাশে গাঢ়তর কালিমা। অথচ প্রয়োগনৈপুণ্যের গুণে প্রত্যেকটি চিত্ররূপের স্তরবিন্যাসকে স্পষ্ট করে তুলেছে বৈ একশা করেনি । “
নন্দলাল বসুর মতে বর্ণের উজ্বলতাই ইয়োরোপে তাঁর সাফল্যের কারণ ।

এমন কি বিখ্যাত শিল্পবোদ্ধা এবং কিউরেটার স্ট্রেলা ক্রামরিশও তাঁর লাল ও সবুজের রঙের ব্যবহার করা নিয়ে বলেছেন – “He used them with super command. “
বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ, দার্শনিক, শিল্পবোদ্ধা আনন্দ কুমারস্বামী রবীন্দ্রনাথের ছবির ফর্ম নিয়ে বলেছিলেন – “…genuine example of modern primitive art . “
তাহলে রবীন্দ্রনাথ কি নিজের সম্মন্ধে ভুল ভাবতেন?
আসলে ডাক্তারি শাস্ত্রে ‘প্রোটানোপিয়া’ নামের একটি রোগ আছে । একজন সাধারণ মানুষের রেটিনাতে তিন রকমের ‘কোন সেল’ থাকে। এই তিন রকমের সেলের একটি ছোটো তরঙ্গদৈর্ঘের রঙ, যেমন নীল রং সনাক্ত করতে পারে, একটি মাঝামাঝি তরঙ্গদৈর্ঘের রঙ, যেমন সবুজ রঙ সনাক্ত করতে পারে এবং তৃতীয়টি দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্য যেমন লাল রঙ সনাক্ত করতে পারে । প্রোটানোপিয়া রোগীরা দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘের রঙ লালকে ভালো করে সনাক্ত করতে পারে না । রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত আংশিক ভাবে প্রোটানোপিয়া রোগী ছিলেন ।
কেতকী কুশারি ডাইসন এবং শোভন সোম লিখিত “রঙের রবীন্দ্রনাথ” বইতে বলা হয়েছে -‘রবীন্দ্রচিত্রসংগ্রহের সঙ্গে পরিচয় অন্তরঙ্গ হলে আমরা খেয়াল করি যে, এই বিশ্বে লাল যে নেই তা নয় , কিন্তু বিশুদ্ধ ঝলমলে লাল চোখে পড়ে না। যা সাধারণত চোখে পড়ে তা পোড়া লাল, অনেকটা মেরুন ধরনের , যা লাল-কালো বা লাল-খয়েরি মিশে গিয়ে তৈরি হয়েছে বলে মনে হয়। “
এটি হয়ত প্রোটানোপিয়ার কারণেই।’
ছোট বেলায় কবি আঁকা শিখেছিলেন ড্রয়িং শিক্ষকের কাছে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে বসে, আর পাঁচটা বালকের মত। ছবি আঁকায় তাঁর কোন বিশেষ দক্ষতার কথা শোনা যায় নি। মালতী পুঁথি নামে একটি খাতা পাওয়া যায় যেখানে কবির ১৮৭৪ থেকে ১৮৮৬ সালের রচনার সঙ্গে আমরা বেশ কিছু স্কেচ দেখতে পাই। তাতেও তেমন কিছু অসাধারণ পটুত্ব দেখা যায় নি।
ছোট বেলার স্মৃতিতে এক জায়গায় তিনি বলছেন –
‘মনে পড়ে, দুপুরবেলায় জাজিম-বিছানো কোণের ঘরে একটা ছবি-আঁকার খাতা লইয়া ছবি আঁকিতেছি। সে যে চিত্রকলার কঠোর সাধনা তাহা নহে– সে কেবল ছবি আঁকার ইচ্ছাটাকে লইয়া আপনমনে খেলা করা। যেটুকু মনের মধ্যে থাকিয়া গেল, কিছুমাত্র আঁকা গেল না, সেইটুকুই ছিল তাহার প্রধান অংশ। এ দিকে সেই কর্মহীন শরৎমধ্যাহ্নের একটি সোনালি রঙের মাদকতা দেয়াল ভেদ করিয়া কলিকাতা শহরের সেই একটি সামান্য ক্ষুদ্র ঘরকে পেয়ালার মতো আগাগোড়া ভরিয়া তুলিতেছে। জানি না কেন, আমার তখনকার জীবনের দিনগুলিকে যে-আকাশ যে-আলোকের মধ্যে দেখিতে পাইতেছি তাহা এই শরতের আকাশ শরতের আলোক। সে যেমন চাষিদের ধান-পাকানো শরৎ তেমনি সে আমার গান-পাকানো শরৎ– সে আমার সমস্ত দিনের আলোকময় অবকাশের গোলা বোঝাই-করা শরৎ– আমার বন্ধনহীন মনের মধ্যে অকারণ পুলকে ছবি-আঁকানো গল্প-বানানো শরৎ। ‘
এখানে মনে হয় যেন যা মনের মধ্যে থেকে গেল আঁকা গেলনা, তার জন্যে একটা অতৃপ্তি থেকে গেল বালক কবির মনে।
কিন্তু এর পর আমরা কোথাও তাঁকে ছবি আঁকতে দেখছি না। অবশ্য যৌবনে শিলাইদহতে থাকাকালীন জগদীশ চন্দ্র বসুকে একটি চিঠি লিখে আবেগভরে জানিয়েছিলেন তিনি ওখানে কিছু ছবি এঁকেছেন। কিন্তু সে ছবির কোন হদিশ পাওয়া যায়নি। তাঁর লেখা পাণ্ডুলিপিতে উনি মাঝে মাঝেই কিছু শৈল্পিক কাটাকুটি করছেন, নিজের খেয়ালে। ওগুলো কি তাঁর অঙ্কন শিল্পী হবার অবদমিত ইচ্ছের প্রকাশ ছিল? তিনি যখন এই সব আঁকিবুকি কাটছেন, তখন সেই জোড়াসাঁকো বাড়ির অন্য কোন ঘরে বসে তাঁর দুই ভ্রাতুষ্পুত্র ভারতীয় শিল্প জগতে বিশাল বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন। আর রবীন্দ্রনাথ যে এই বিপ্লব থেকে একেবারে নির্লিপ্ত বসে ছিলেন এমন মনে করবার কোন কারণ নেই। তবু তিনি নিজে তুলি তুলে নিচ্ছেন না। সংকোচের সঙ্গে ভাবছেন –
‘ঐ যে চিত্রবিদ্যা বলে একটা বিদ্যা আছে তার প্রতিও আমি হতাশ প্রণয়ের লুব্ধ দৃষ্টিপাত করে থাকি – কিন্তু আর পাবার আশা নেই … অনান্য বিদ্যার মত তাঁকে তো সহজে পাবার জো নেই–তাঁর একেবারে ধনুর্ভাঙ্গা পণ।’
কিন্তু ঠিক কবে কোন সময়ে তাঁর মনে মনে হল চিত্রবিদ্যা নামের বিদ্যাটি অতটা অসহজ নয় যতটা তিনি ভেবেছিলেন অথবা সেই বিদ্যাটিকে ধরার একটা তাঁর মতো করে একটা উপায় বার করা যেতে পারে সেটা স্থির করে বলা কঠিন । তবে ১৯২৪ সালে পূরবী কাব্যগ্রন্থ লেখার সময়ে তিনি কিছুটা রেখায় মায়ায় পড়েছিলেন সেটা বোঝা যায় এই বইয়ের পান্ডুলিপিতে কাটাকুটি করতে করতে তিনি যে চিত্রলিপি সৃষ্টি করছেন তাতে মনে হচ্ছিল তিনি ভাবনায় চিন্তায় কিছুটা বিমূর্ততার দিকে ঝুঁকেছেন। আসলে ভাবনাটা বোধহয় আরও কিছুদিন আগে থেকে মাথা চাড়া দিচ্ছিল। অন্তত ‘রক্তকরবী‘ লেখার সময় থেকে তো বটেই । আমরা জানি ‘রক্তকরবী’র খসড়া এগারো বার বদলেছিলেন । এমনকি নামও বদলেছিলেন কয়েকবার । সেই রক্তকরবীর পান্ডুলিপিতে বেশ কিছু জায়গায় কাটাকুটি করতে গিয়ে এমন কিছু চিত্রলিপি এঁকে ফেলেছেন যার অর্থ বোঝা যায় না । যেমন “শেষ রাগিনীর প্রথম ধুয়ো…… “ গানটিকে ঘিরে যে ছবিটি আঁকেন তাতে এক বিকট দর্শন পশুর মুখে যেন এক তীব্র আর্তি ফুটে উঠছে। যখন পুরোপুরি ছবি আঁকা নিয়ে মেতেছেন তখনও তাঁর ছবিতে এমন এক আধুনিক বির্মূততা দেখা গেছে যার তুলনা ইয়োরোপের ছবিতেও ছিল না । বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের মতে – “ … রেখা, আকার, রূপ এই তিনের স্বাধীন সত্তা রবীন্দ্রনাথের রচনায় যে ভাবে পাওয়া যায়, তার তুলনা আধুনিক ইয়োরোপীয় ক্ষেত্রেও বিরল।“

১৯২৪ সালের নভেম্বর মাসে রবীন্দ্রনাথ পৌঁছলেন বুয়েনাস এয়ার্স-এ। সেখানে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর আতিথ্যে রইলেন একমাস কুড়িদিন। ওকাম্পোর চোখে পড়েছিল রবীন্দ্রনাথের সেই খাতাটির প্রতি যেটাতে তিনি পূরবীর কবিতার সঙ্গে সঙ্গে এঁকে চলেছেন কিছু বিচিত্র চিত্রলিপি। সেখানে প্রাগৈতিহাসিক দানব থেকে সরীসৃপ জাতীয় অনেক কিছুই ফুটে উঠছে । তিনি রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করলেন এই রকম কিছু ছবি ক্যামেরাতে ধরে রাখতে চান । রবীন্দ্রনাথ আপত্তি করেন নি। ওকাম্পো লিখেছিলেন – “When Tagore lived in San Isidro I was impressed by the copy-book where writing his Puravi poems in Bengali….. I begged him to let me photograph some of the pages. The permission was granted. That copy-book, I think, was the beginning of Tagore the painter, of his urge to translate his dreams with a pencil or brush. “

ছ’ বছর পরে মূলত ভিকটোরিয়ারই উদ্যোগে প্যারিসের গ্যালারি পিগাল এ রবীন্দ্রনাথের ছবির একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে অনেক আন্তর্জাতিক মানের শিল্পবোদ্ধারা রবীন্দ্রনাথের ছবি দেখে প্রশংসা করলেন। এতে রবীন্দ্রনাথের নিজের ছবির ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস অনেকটা বেড়ে গেল । চিঠিতে সুধীন দত্তকে জানালেন – “ ফ্রান্সের মত কড়া হাকিমের দরবারেও শিরোপা মিলেচে। কিছুমাত্র কার্পণ্য করেনি । “
জীবনের উপান্তে এসে, যখন তিনি অমরত্ব পাবার মত সব কিছু অর্জন করে ফেলেছেন, সব কীর্তি করায়ত্ত, পেয়ে গেছেন পৃথিবীর সব চেয়ে দামী পুরস্কার, দেশ বিদেশে সম্বর্ধিত হয়েছেন, খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে, তখন কবি কেন হঠাৎ লেখার সময় কমিয়ে দিয়ে সেই রঙ নিয়েই ছবি আঁকায় মজেছিলেন, সেটা কিছুটা বোঝা যায় তাঁর একটি উক্তিতে –
“সাহিত্যে একটা খ্যাতি পেয়েছি তার কাছে আমার দায় আছে, সে দায় বাঁচিয়ে চলতে হয়- কিন্তু যদি একখানা কাগজ টেনে একটা ছবি আঁকতে থাকি – তাহলে যা তা আঁকতে দ্বিধা করিনে । লোকে যদি বলে আমি ছবি আঁকতে পারিনে, তবে তাতে সঞ্চিত যশের অপচয় ঘটে না । … তাই আমার জীবন-যাত্রাপথের শেষ প্রান্তে আলো যখন ম্লান হয়ে এসেছে তখন ইচ্ছা হলে ছবি এঁকে সময় নষ্ট করি।’
আসলে সারা জীবন ধরে সমস্ত সত্তা দিয়ে তিনি খুঁজে বেড়িয়েছেন নূতনকে। নূতন ভাষা, নূতন অভিব্যক্তি, নূতন আঙ্গিক। অসুস্থ অবস্থায় জীবনের শেষ জন্মদিনেও চিরনূতনেরে ডাক দিয়েছেন। শেষ বয়সে কি তাঁর মনে হয়েছিল ছন্দের ঘোমটায় আটকে থাকা কবিতায় তাঁর যেমন খুশি খেলা করার স্বাধীনতা অধরা থেকে গেছে?
Painting of Rabindranath Tagore
তাই কি তাঁকে বলতে হয় –
‘এই টলমলে অবস্থায় এখন দুটো পাকা ঠিকানা পেয়েছি আমার বানপ্রস্থের – গান আর ছবি।
গানে সৃষ্টির স্বাধীনতা খোঁজা চলেছে অনেক দিন ধরেই। কিন্তু সেখানেও পাওয়া হয়নি ‘পাগলামি করার অবিমিশ্র স্বাধীনতা ।’
মাত্র তিন চার বছরের মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার ছবি এঁকে ফেলাটা বোধহয় অবিমিশ্র স্বাধীনতারই প্রকাশ।
আমরা দেখলাম তেষট্টি বছর বয়সে তিনি শুধু লেখার মায়ায় আবদ্ধ না থেকে ধরা দিচ্ছেন রেখার মায়ায়, রঙের বর্ণচ্ছটায়।
প্যারিসের পরে রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রদর্শনী হয় বারমিংহাম, লন্ডন, বার্লিন, মিউনিখ, ড্রেসডেন, কোপেনহেগেন, জেনেভা, মস্কো, বস্টন, নিউ ইয়র্ক আর সব শেষে ফিলাডেলফিয়াতে।

তাঁর ছবি দেখে ইয়োরোপ ও আমেরিকার দর্শকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হল। তবে প্রশংসাই বেশি শোনা গেল। বার্লিন ন্যাশানাল গ্যালারি তাঁর পাঁচটি ছবি কিনলেন।
কবির নিজের চিত্রবিদ্যায় পারদর্শিতার উপর আরও একটু আস্থা জন্মাল।
দেশে তাঁর ছবিকে তখন অবধি কেও তেমন করে গুরুত্ব দেয়নি।কিন্তু বিদেশে ছবি দেখে অনেকেই মুগ্ধ হলেন। বিখ্যাত ফরাসি কবি পল ভ্যালেরি বললেন –
“ …your pictures will be a lesson to our artists.”
স্টেলা ক্রেমরিশ লিখলেন –
‘Training of the hand is one thing, guidance by the spirit another. The work of Rabindranath Tagore, singularly free from conventions and schooling, is subject to a discipline of its own. It does not stop short at design and composition. Each of the hundreds of drawings and paintings is a living and balanced artistic organism.
তবে ছবির মর্ম যে তাঁর নিজের দেশের লোকের কাছে সঠিক ভাবে পৌঁছাবে না এবং যাঁরা তার সাহিত্যকেও বার বার কঠোর সমালোচনায় বিদ্ধ করেছে, তারা যে তাঁর ছবি দেখে যে সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠতে পারে এমন একটা আশঙ্কা তাঁর মনে ছিল। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মৈত্রেয়ী দেবীকে বলেছিলেন –
“আমার ছবি এ দেশকে দেখাইনি । এখানে অধিকাংশ লোকেই দেখতে জানে না, প্রথমেই দেখে এর চেহারাটা ভালো দেখতে কিনা। দেখতে হয় এটা ছবি হয়েছে কিনা, সে দেখা এমন করে দেখা তা বুঝিয়ে দেওয়া যায় না । একটা নিয়মিত অভ্যাস আর instrinctive দৃষ্টি থাকা চাই, ছবি দেখা সকলের সকলের কাজ নয় । এই জন্যেই আমি এখানে ছবি প্রকাশ করতে চাই নে, প্যারিসে ওরা দেখেছিল আমার ছবি , দেখার মত করে । আমার ছবি এ দেশের নয়।”
প্যারিসে প্রদর্শনী শুরু হবার কিছুদিন আগে ফ্রান্স থেকেই সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে ঠিক একই রকমের মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন – “পণ করেছি “আমার জন্মভূমি”-তে ফিরিয়ে নিয়ে যাবো না – অযোগ্য অভাজনদের স্থূল হস্তাবলেপ অসহ্য হয়ে উঠেছে।”
আসলে রবীন্দ্রনাথ এমন ছবি আঁকলেন যা কোনো প্রচলিত ধারায় পড়ে না। তিনি নিজে একদিকে জাপানী শিল্পকলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন, আবার জার্মানি ‘ব্লু রেডার ‘ গোষ্ঠীর কাজের প্রশংসক ছিলেন। গ্রীক ভাস্কর্যের সমঝদার ছিলেন, কিন্তু যখন নিজে ছবি এঁকেছেন তা একান্তই তাঁর নিজের স্টাইলে। কেউ তাঁকে বলেছেন ইমপ্রেশনিস্ট, কেউ বলেছেন অ্যাবস্ট্রাক্ট, কেউ বলেছেন আদিম আধুনিক।

আবার তিনি নিজে এ সব ধারণাকে উড়িয়ে দিয়ে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে লেখা একটি চিঠিতে লিখেছেন –
“আমি কোন বিষয় ভেবে আঁকিনে – দৈবক্রমে একটা অজ্ঞাতকুলশীল চেহারা চলতি কলমের মুখে খাড়া হয়ে ওঠে।”
এই কারণেই অনেকেই তাঁর ছবিকে অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন naive বা childlike বলেছেন। তবে আনন্দ কুমারস্বামী বলেছেন-
“…Childlike, but not childish.”
প্রধানত জলরঙেই ছবি আঁকতেন তিনি। নিকষ কালো চাইনিজ ইঙ্কও ব্যবহার করতেন। কখনো আবার ফুল থেকে তৈরি রঙ ব্যবহার করেছেন। এ ছাড়া রঙ পেন্সিল, ক্রেওন – এসবও ব্যবহার করেছেন। একবার তেলরঙে ছবি আঁকার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তেলরঙ তাঁর ভাল লাগেনি। আবার ফিরে গেছেন জলরঙেই। যতটুকু জানা যায় তিনি একটি মাত্র তুলি ব্যবহার করতেন। রঙ নির্বাচনে বিশেষ ধৈর্য্য দেখাতেন না। অনেকসময় পেনের উল্টো দিক এবং আঙুল ব্যবহার করতেন ছবি আঁকার জন্য। বেশির ভাগ ছবি এক সিটিং-এই শেষ করেছেন। তাঁর আঁকা নারীমুখগুলিতে একটি চাপা বিষণ্ণতা সব সময় থাকতো। একবার নন্দলাল বোস কে বলেছিলেন তাঁর আঁকা নারীমুখগুলির মধ্যে কাদম্বরী দেবীর মুখ হয়ত ছায়া ফেলেছে।

তিনি ছবিতে সূক্ষ্মতার চেয়ে জোরের প্রয়োজনীয়তার কথা বলতেন। রথীন্দ্রনাথকে তাই চিঠিতে লেখেন –
“আমাদের নববঙ্গের চিত্রকলায় আর একটু জোর সাহস এবং বৃহত্ত দরকার আছে। এই কথাটা আমার বার বার মনে হয়েছে। আমরা অত্যন্ত ছোটখাটোর দিকে মন দিয়েছি।“
এই জোর আমরা রবীন্দ্রনাথের ছবিতে বার বার দেখি। তাঁর ছবিতে অনেক সময়ে দুঃসাহসী রঙের প্রয়োগ দেখা যায় যা প্রথাগত ভাবে খুব স্বাভাবিক নয়। উজ্জ্বল হলুদ রঙ তাঁর খুব প্রিয় ছিল। যখন ভ্যান গগকে বিশেষ কেউ চিনতেন না তখন তিনি ভ্যান গগের ছবির ভক্ত ছিলেন। তার প্রমাণ, তিনি কাউকে কখনো অনুকরণ করেন নি, কিন্তু ভ্যান গগের একটি ছবি নকল করেছিলেন ভালবেসে। হয়ত ভ্যান গগের ছবির জোরালো ভাবটাই তাঁকে টেনে ছিল। নন্দলাল বোসের ছবিতেও উজ্বল রঙের ব্যবহার ছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ছবিতে ছিল একধরনের দ্যুতি। তাঁর শুধু কালো আর বেগুনী কালিতে আঁকা ছবিতেও ছিল এক আশ্চর্য জমক, যা হয়ত কিছুটা প্রথাবহির্ভূত।
Painting of Rabindranath Tagore

শেষ বয়সে ছবির নেশা যে তাঁকে গ্রাস করছে এবং কাব্য চর্চার বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সেটা তিনি বুঝতেন। নিজেই বলেছেন –
“ছবির নেশায় আমার কাব্যের উপর কিছু উৎপাত বাধিয়েছে। অধিক বয়সে তরুণী ভার্যা মানুষকে অভিভূত করে এমন একটা প্রবাদ আছে। আমার প্রাচীনাটি তরুণীর সঙ্গে পেরে উঠছে না”‘
জীবনের উপান্তে এই তরুণী ভার্যার প্রতি প্রেম তাঁকে আরও একবার অস্থির করেছে।
ঠিক যেমন তরুণ রবি সদর স্ট্রিটের বাড়ীর জানলা দিয়ে সূর্যোদয় দেখে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ লিখে ফেলেছিলেন তেমনি আরও একবার নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হল অস্তাচলের রবির চেতনায়।
সে রকম আভাস পাই তাঁর নিজের লেখায় –
“আমার বয়স সত্তর হয়ে এলো। আজ তিরিশ বছর ধরে যে দুঃসাধ্য চেষ্টা করেছি আজ মনে হচ্ছে যেন ভিত পাকা হবে। ছবি কোনোদিন আঁকিনি, আঁকবো বলে স্বপ্নেও বিশ্বাস করিনি। হঠাৎ দু তিন বছরের মধ্যে হু হু করে এঁকে ফেললুম … এর মানে কি? জীবন গ্রন্থের সব অধ্যায় যখন শেষ হয়ে এলো তখন অভূতপূর্ব উপায়ে আমার জীবনদেবতা এর পরিশিষ্ট রচনা উপকরণ জুগিয়ে দিলেন।”
কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে একটি চিঠিতে সুন্দর ভাবে লিখছেন তাঁর রেখার মায়ার ধরা পড়ার কথা –
“পড়েছি আজ রেখার মায়ায়।
কথা ধনীঘরের মেয়ে,
অর্থ আনে সঙ্গে করে,
মুখরার মন রাখতে চিন্তা করতে হয় বিস্তর।
রেখা অপ্রগল্ভা, অর্থহীনা,
তার সঙ্গে আমার যে ব্যবহার সবই নিরর্থক।
গাছের শাখায় ফুল ফোটানো ফল ধরানো,
সে কাজে আছে দায়িত্ব;
গাছের তলায় আলোছায়ার নাট-বসানো
সে আর-এক কাণ্ড।”
আমরা বহুবার তাঁকে অস্থির হতে দেখেছি। নিজেকে ভেঙেছেন বারবার। এক জায়গায় থিতু হন নি কোন কালে। ছুটে বেড়িয়েছেন সুরুল থেকে রামগড় পাহাড়, কুষ্টিয়া থেকে মংপু, শিলাইদহ থেকে বোলপুর। এ ছাড়া সারা পৃথিবীর অজস্র দেশ তো ছিলই। শান্তিনিকেতনে বার বার পালটেছেন নিজের বাড়ি। কি জানি কিসের সন্ধানে নোবেল পুরস্কার পাবার কয়েক মাস পরেই তিনি নিজেকে এক জন ব্যর্থ মানুষ বলে রথী ঠাকুরকে চিঠি লিখছেন, বলছেন জীবনে কিছুই করা হল না। তাঁর কাছে সফলতার সংজ্ঞাটা ঠিক কি ছিল কে জানে।
তাই ছবি আঁকার ইচ্ছের সঙ্গে অন্তত যশ লাভের আকাঙ্ক্ষার কোনো সম্পর্ক ছিলো বলে মনে হয় না।
গাছের তলার আলোছায়ার নাট বসানো শুধু এক খেয়াল খেলা নয়। তার চেয়ে অধিক কিছু। তিনি গানে বলেছেন সীমার মাঝে অসীমের কথা। সে অসীমকে ধরতে যাওয়ার জন্যে রঙ তুলিকে আশ্রয় করার ভাবনা তাঁকে তাড়া করেছিল হয়ত। এক জায়গায় তিনি বলছেন –
“ছবিতে যে আনন্দ, সে হচ্ছে সুপরিমিতির আনন্দ – রেখার সংযমে সুনির্দিষ্টকে সুস্পষ্ট করে দেখি – মন বলে ওঠে, নিশ্চিত দেখতে পেলুম।“
এই সুনির্দিষ্টকে সুস্পষ্ট করে দেখার তাঁর এই অন্তর্দৃষ্টির বিশ্লেষণ করা আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে তো সম্ভব হবেই না। এমন কি গণেশ পাইনও বলছেন –
রবীন্দ্রনাথের ছবি বিশ্লেষণ করা তাঁর সাধ্যাতীত।

এমন করে পৃথিবীর কোন চিত্রী হয়ত ভাবেন নি। তাই তাঁর ছবি একান্ত ভাবে তাঁরই। তাঁর ছবির কোন ঘরানা তৈরি হবেনা কোনোদিন। কোন ‘ইজম’এর ছকে ফেলা যাবেনা তাঁর ছবিকে। তবু তিনি অনন্য হয়েই থাকবেন চিরকাল।
একটা সময়ে দেখা যাচ্ছে ছবি আঁকার প্রতি এতটাই আবিষ্ট হয়ে পড়ছে যে সারাটা জীবন পদ্যে, গদ্যে, প্রবন্ধে, গানে, চিঠিপত্রে যে অসামান্য বাক্য সৃষ্টি করেছেন সেই বাক্যের ক্ষমতার উপরই তি্নি সন্দিগ্ধ হয়ে উঠছেন ।
আমাদের অবাক লাগে যখন তিনি অমিয় চক্রবর্তীকে লেখেন – “বাক্যের সৃষ্টির উপর আমার সংশয় জন্মে গেছে “
আশ্চর্য লাগে যখন দেখি ‘পথে ও পথের প্রান্তে’ বইয়ের ৪৯ নং চিঠিতে তিনি বলেন-
“কবিতা যখন লিখি তখন বাংলার বাণীর সঙ্গে তার ভাবের যোগ আপনি জেগে ওঠে । ছবি যখন আঁকি তখন রেখা বলো রঙ বলো কোনো বিশেষ প্রদেশের পরিচয় নিয়ে আসে না । অতএব এ জিনিসটা যারা পছন্দ করে তাদেরই , আমি বাঙালি বলে এটা আপন হতেই বাঙালির জিনিস নয় । এই জন্যে স্বতঃই আমি এই ছবিগুলি পশ্চিমের হাতে দান করেছি। আমার দেশের লোক বোধহয় একটা জিনিস জানতে পেরেছে যে আমি কোনো বিশেষ জাতের মানুষ নই ; এই জন্যেই ভিতরে ভিতরে তারা আমার প্রতি বিমুখ, কটুক্তি করতে তাদের একটুও বাধে না। আমি শতকরা একশো হারে বাঙালি নই , আমি যে সমান পরিমানে ইয়োরোপীয়ও, এই কথাটাই প্রমাণ হোক আমার ছবির দিয়ে।” (আগস্ট, ১৯৩০)
আমরা জানি রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন তাঁর গান বাঙালিকে মনে রাখতেই হবে। কিন্তু অনেকেই জানেন না তাঁর আঁকা ছবি নিয়েও একটি ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন। সেটা এ রকম –
‘আমার মৃত্যুর পর ওর (তাঁর ছবির) আবরণ মোচন কোরো – তখন ওর মূল্য হবে ঐতিহাসিক দিক থেকে।”
ঠিক তাই হয়েছে। এ দেশে তো বটেই বিদেশেও তাঁর ছবির মূল্যায়ন হয়েছে নতুন করে।
২০১৮ সালে লন্ডনে বিখ্যাত নীলাম সংস্থা Sotheby’s রবীন্দ্রনাথের বারোটি ছবি নীলামে তুলেছিল। আমরা জানতে পারি বারোটি ছবি নীলাম করে পাওয়া যায় 1.6 মিলিয়ন পাউন্ড। পৃথিবীর যে কোনো চিত্রশিল্পীর কাছেই এই অর্থমূল্য ঈর্ষণীয়।
আমরা তাঁর ছবির সঠিক মর্মোদ্ধার করতে পারি বা না পারি অবন ঠাকুরই তাঁর ছবি সম্বন্ধে সার কথাটি বলেছিলেন –
“রবি কাকার ছবি ,এক একটা ভলকানিক ইরাপশনের মতো।”

