
এ বছর সময় মতই বর্ষা এসেছে এই বঙ্গে। আর আমরা যখন দেখতে পাচ্ছি আকাশে ঠিক তেমনি মেঘেরই আনা গোনা চলছে, যে মেঘ দেখে রবি ঠাকুর লিখেছিলেন – ‘রহিয়া রহিয়া বিপুল মাঠের পরে/ নব তৃণদলে বাদলের ছায়া পড়ে……’, তখন চারিদিকের সব রকম মালিন্য, ক্লেদ, বিপন্নতা উপেক্ষা করে আমাদের পুরাতন হৃদয় একটু হলেও পুলকে দুলে উঠছে বৈকি। আমাদের এই পুলকটুকু তো একান্তভাবে রবীন্দ্রনাথেরই দান। এই ভাবেই আমাদের রুধিরে, শোণিতে, চেতনে, অবচেতনে তাঁর গানকে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে গেছেন তিনি। তার থেকে তো আমাদের পরিত্রাণ নেই। সত্যি কথা বলতে কি পরিত্রাণ আমরা চাইও না।
[নেট ওয়ার্কের কারণে ওপরের ইউটিউব লিঙ্কটি আসতে বিলম্ব হলে, অনুগ্রহ করে একটু অপেক্ষা করুন]
তবে আজ, এই আষাঢ় মাসের মধ্যভাগে, তাঁর অন্য গানের কথা তোলা থাক, আজ বরং আমাদের বিষয় হোক শুধু রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গান।
এই রকম একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে রবীন্দ্রনাথের সব চেয়ে প্রিয় ঋতু বর্ষা। সত্যিই কি আমরা সে রকম একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারি? ব্যাপারটা একটু খতিয়ে দেখা যেতে পারে। শুকনো সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে ২২৩২ টি গানের মধ্যে প্রকৃতি পর্যায়ের মধ্যে বর্ষা উপপর্যায়ের জন্যে চিহ্নিত গানের সংখ্যা ১১২টি। তাঁর আর এক প্রিয় ঋতু বসন্ত পর্যায়ের গানের সংখ্যা থেকে সতেরোটি গান বেশি। সেই হিসেবে বর্ষাগীতির স্থান এক নম্বরে। আর এই ভাগাভাগির কাজটি রবীন্দ্রনাথ নিজেই করেছিলেন। তাই বর্ষার প্রতি রবীন্দ্রনাথের পক্ষপাতের কথা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু একটু খুঁটিয়ে দেখলে আমরা জানতে পারবো প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়স অবধি তিনি সে ভাবে কোনো বর্ষার গান লেখেননি, এটা বলা যায় । খুঁজে পেতে দেখা যাচ্ছে মাত্র সাতটি বর্ষার গান লিখেছিলেন এই সময় অবধি। তার মধ্যে আবার অধিকাংশই কবিতা হিসাবেই প্রথমে লেখা হয়েছে পরে তা থেকে গান হয়েছে। অতএব বর্ষাই রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ঋতু এটা জোর গলায় বলা যাচ্ছে না।
তা ছাড়া তিনি ঠিক কোন বিচারে তাঁর কোন গানকে গীতবিতানের ‘বর্ষা’ নামের উপপর্যায়ে রাখা হবে কি হবেনা, সেটা ঠিক করেছিলেন সেটা নিয়ে আমাদের মনে একটু ধন্দ রয়ে গেছে। আমাদের মনে যদি প্রশ্ন জাগে – ‘এমন দিনে তারে বলা যায় , / এমন ঘনঘোর বরিষায়’ অথবা ‘তোমার গীতি জাগালো স্মৃতি নয়ন ছলছলিয়া/ বাদল শেষে করুণ হেসে যেন চামেলি-কলিয়া’ দুটি গান কেন বর্ষা পর্যায়ে স্থান পেলোনা, তার উত্তর পাওয়া যাবে না। কারণ তার উত্তর রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেউই তা জানেনা ।
আসলে অনেক ঝাড়াই বাছাই করে গানের এই শ্রেণীকরণের কাজটি যখন হচ্ছে, তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স হয়ে গেছে সাতাত্তর। তখন তিনি তাঁর অতীতের সব সৃষ্টিকে নির্লিপ্ত ভাবে দেখার মতো জায়গায় পৌঁছে গেছেন। সেই জায়গা থেকেই হয়ত এই দুটি গানে যথেষ্ট বর্ষার অনুষঙ্গ থাকা সত্বেও এই দুটি গানকে তিনি ‘প্রেম‘ পর্যায়েই রাখার কারণ খুঁজে পেয়েছেন।
সেই সময় রবীন্দ্রনাথের সব গানকে একটি জায়গায় এনে শুধু গানের জন্য একটি বই ছাপাবার কথা ভাবা হচ্ছে। যার নাম দেওয়া হবে গীতবিতান। এ পর্যন্ত তাঁর গান যখন সৃষ্টি হত তার কিছুদিনের মধ্যেই প্রকাশিত হত ভারতী বা অন্য পত্র-পত্রিকায়, অনেক সময় স্বরলিপিসহ । অথবা সরাসরি ছাপা হয়েছে কোনো কাব্যগ্রন্থে বা নৃত্যনাট্যে।
এবার ‘গীতবিতান’ প্রকল্পটিতে সম্পাদনার উদ্যোগ নিয়েছেন সুধীরচন্দ্র কর মশাই, রবীন্দ্রনাথের সেই সময়ের সেক্রেটারি এবং লিপিকার।
সেই তেরো বছর বয়স থেকেই তো তাঁর গান লেখা শুরু। কাজেই সেই সব পুরোনো পত্র-পত্রিকা এবং অন্যান্য প্রকাশিত বই থেকে সংগ্রহ করে গানগুলি শ্রেণীবিন্যাস করে সাজানো ছিল এক দুরূহ কাজ। সুধীরচন্দ্র সানন্দে এই কাজ হাতে নিয়েছেন। উপদেষ্টা হিসেবে আছেন অধ্যাপক অমিয় চক্রবর্তী। প্রাথমিক ভাবে অমিয় চক্রবর্তী উপদেশ দিলেও প্রেসকপি ছাপা হলে পাঠানো হত রবীন্দ্রনাথের কাছে । তিনি তাঁর মতামত তো দিতেনই। এমন কি রবীন্দ্রনাথ ১৪৮টি গান গীতবিতান থেকে বাদ দেবার নির্দেশ দিয়েছিলেন । বলা বাহুল্য, সেই মত গানগুলি বাদ পড়েছিল।
মনে রাখতে হবে গীতবিতান প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৩০-৩১ সালে । তখন অবধি কিন্তু ‘রবীন্দ্রসংগীত’ এই শব্দবন্ধটি প্রচলিত হয়নি ।
রবীন্দ্রনাথের গানের এই নাম পাওয়া গেছে অনেকটা অভাবিত ভাবেই। ১৯৩৫ সালের জানুয়ারি মাসে শ্রীমতী কণক দাসের একটি রেকর্ডের ইন-লে কার্ডে প্রথম বার ‘রবীন্দ্রসংগীত’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হয়। তার আগে অবশ্য ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯৩১ সালের লিখিত একটি প্রবন্ধে রবীন্দ্রসংগীত শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু সেটি তেমন ভাবে কেউ নজরে আনেনি।
সত্যি বলতে কি রেকর্ড কোম্পানীর বিপণনের স্বার্থেই এই নামটি দেওয়া হয়েছিল। এবং বাঙালি কালক্রমে এই নামটিকে পরম আদরে শিরোধার্য করে নিয়েছে। কারণ রবীন্দ্রনাথের গান যে অন্য সব বাংলা গান থেকে সব রকম ভাবেই আলাদা সেটা বোঝাবার জন্যে একটি যথাযথ নামের খুব দরকার ছিল ।

গীতবিতানের প্রথম খন্ডটি ছাপা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের কিশোর বেলা অবধি গানগুলি নিয়ে । প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন দ্বিতীয় খন্ডের গানগুলি সাজানো হয়েছিল ‘ভাবের অনুষঙ্গ’ রক্ষা করে, কালানুক্রম মেনে নয়। তাই তিনি অন্য একটি বইতে সব গানকে কালানুক্রমে সাজিয়ে ছিলেন । রবীন্দ্র-গবেষকদের কাছে সেটি একটি বিরাট প্রাপ্তি ।
জীবনের সায়াহ্নে এসে রবীন্দ্রনাথের হয়ত মনে হয়েছে ‘গীতবিতান’ শুধু সংগীতের বই হিসেবে নয়, এটি একটি সাহিত্যের পাঠ্য বই হতেই পারে । তাই ‘গীতবিতান’ সংকলনের সময় গানের সুরের দিকটি ভুলেই থাকলেন । সেই কথা ভেবেই সৃষ্টি হল পূজা, প্রেম এবং প্রকৃতি পর্যায়। এই প্রকৃতি পর্যায়ের মধ্যে আবার রাখতে হল উপপর্ব – গ্রীষ্ম-বর্ষা- শরৎ-হেমন্ত-শীত-বসন্ত। এর মধ্যে বর্ষার গানগুলি সাজাতে গিয়ে ঠিক কোন ভাবের দিকটি মাথায় রাখা হয়েছিল তা অবশ্য খুব নির্দিষ্ট ভাবে বলা কঠিন ।
এই বর্ষার ১১২টি গানে তো শুধু বর্ষা বন্দনাই করা হয় নি। কি যে নেই সেখানে । অনাদিকালের বিরহবেদনা থেকে আনন্দের অপূর্ব উদ্ভাস । নিরুদ্দেশের পথিকতা থেকে বন্দিত্বের বেদনা । বেদনার্ত স্মৃতিরোমন্থন থেকে অচেনা বিদ্রোহের ডাক । গানের গঠনে কখনো গ্রাম্য সরলতা থেকে কখনো দুর্বোধ্য বিমূর্ততা । এক ঋতুকে ঘিরে এমন গান পৃথিবীতে কোথাও কখনো রচিত হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই ।
এ দেশে বর্ষার গান অবশ্য রবীন্দ্রনাথের বহু আগে থেকেই রচিত হত। বর্ষার রাগ ‘মলহার একটি ‘সময়-রাগ’ এবং এই রাগের অন্তত ত্রিশটি রকমফের আছে বলে শোনা যায় । দেশমলহার, জয়ন্তীমলহার, গৌড়মলহার, মেঘমলহার, মিয়া কি মলহার , সুরদাসী মলহার, রামদাসী মলহার ইত্যাদি। নাম শুনলেই বোঝা যায় ভারতের নানান প্রান্তেই মলহার রাগ একটু আধটু বদল করে গাওয়া হত বর্ষার সময়। তবে মলহার রাগকে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন আকবর বাদশার নবরত্নের অন্যতম রত্ন মিয়া তানসেন । উত্তর ভারতের লোক গান কাজরী মূলত বর্ষা ঋতুর গান। জোড়াসাঁকোর বাড়িতে যে সব ওস্তাদ গায়কদের আনাগোনা হত , ছোটোবেলায় রবীন্দ্রনাথ তাদের কাছে মলহার রাগের এই সব বৈচিত্র্য সম্মন্ধে নিশ্চয় জানতে পেরেছিলেন । আর তিনি তো চিরকালই এ বিশ্বের যেখানে যা কিছু ভালো লেগেছে তা নিজের মত করে নিজের সৃষ্টির মধ্যে রূপ বদল করে নিয়ে এসেছেন। তাই বর্ষা ঋতুর সঙ্গে তাঁর গানের সম্পর্কটা হয়ত অবচেতনেই তাঁর মনে চলে এসেছিল।
তবে ষোলো বছর বয়সে যখন তাঁর প্রথম বর্ষার গান ‘শাঁঙন গগনে ঘোর ঘনঘটা’ লিখলেন এবং সুর করলেন তখন রবীন্দ্রনাথের মাথায় যত না বর্ষার রূপ ভর করেছিল তার চেয়ে বেশি বোধহয় কবি বিদ্যাপতি ভর করেছিল। জোড়াসাঁকোর দালান কোঠার মধ্যে দিয়ে কতটুকু আকাশই বা দেখা যেত, যে তা দেখে উদ্বেল হয়ে উঠবেন তিনি । বরং সেই সময়ে পড়া বিদ্যাপতির পদাবলীর ঝংকৃত শব্দমালা আর সুললিত ছন্দ তাঁকে অনেক বেশী টেনেছিল ।
[নেট ওয়ার্কের কারণে ওপরের ইউটিউব লিঙ্কটি আসতে বিলম্ব হলে, অনুগ্রহ করে একটু অপেক্ষা করুন]
এ গানের বিষয়ে, তিনি অনেকটাই চিরাচরিত ভারতীয় বর্ষাগানের প্রচলিত ধারাটিকে অনুসরণ করলেন । রাধার বিরহ, দুর্গম পথে অভিসার, আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুতের চমক এই সব অনুষঙ্গই তাঁর গানে এলো। বেশির ভাগ কাজরি গান বা অন্যান্য বর্ষার গানে এসবই বিষয় থাকত । এই গান রচনা করার কিছুদিন আগেই তিনি বৌঠানের অনুরোধে বিদ্যাপতির একটি পদ ‘এ ভরা ভাদর, মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর’এ তিনি মিশ্র মল্লার সুর বসিয়ে একটি গান রচনা করেছেন। সে গান বৌঠানের খুব পছন্দ হয়েছিল। ‘শাঙন গগনে’ গানেতেও তিনি মল্লার রাগই বেছে নিলেন। কিন্তু সেই ষোলো বছর বয়সে করা সুরটির মধ্যেই সুরকার রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার স্পষ্ট ছাপ ছিল । সে সময়ে রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে এই গান শুনে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বন্ধুবান্ধবদের এতটাই পছন্দ হয়েছিল যে তারা বেসুরো গলাতেও এই গান গেয়ে থাকত। আর অনেক দিন পেরিয়ে কণিকা বন্দোপাধ্যায় থেকে লতা মঙ্গেসকর, কবিতা কৃষ্ণমূর্তি থেকে হরিহরণ যখনই কেউ এই গান গেয়েছেন তখনই সে গান শ্রোতাদের মন মজিয়েছে। এই কৃতিত্ব অবশ্যই সেই কিশোর সুরকারের।
এর পর দ্বিতীয় বর্ষার গানটি রচনা করলেন পাঁচ বছর পরে ‘কালমৃগয়া’ নাটকের জন্যে। গহন ঘন ছাইল গগন ঘনাইয়া ।/ স্তিমিত দশদিশি, স্তম্ভিত কানন / সব চরাচর আকুল কী হবে কে জানে…। এ গানের বর্ণনায় বর্ষার রূপের মুগ্ধতা নেই, বরং আছে একধরণের আশঙ্কা। এ গান বাঁধলেন মেঘমল্লারে ।
[নেট ওয়ার্কের কারণে ওপরের ইউটিউব লিঙ্কটি আসতে বিলম্ব হলে, অনুগ্রহ করে একটু অপেক্ষা করুন]
আশ্চর্যের বিষয় হল এর পরে তেরো বছর আর একটিও বর্ষার গান রচনা করলেন না। ইতিমধ্যে তিনি বিয়ে থা করে ঘোর সংসারী হয়েছেন । শিলাইদহের জমিদারী দেখাশোনার ভার নিয়েছেন । চারটি সন্তানের পিতা হয়েছেন। সেই সঙ্গে অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । প্রায় সাড়ে পাঁচশো গানও রচনা করে ফেলেছেন। নানা পত্র পত্রিকাতে সে সব প্রকাশিত হয়েছে। এমন কী সোনার তরী গ্রন্থও প্রকাশিত হয়ে গেছে ।
ইন্দিরা দেবীকে লেখা একটি চিঠিতে জানতে পারছি একদিন গোরাই নদীর উপরে স্টিমারের ছাতের উপরে , প্রবল বৃষ্টিতে যখন তাঁর রেশমি আলখাল্লা ভিজে সপসপে, চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে গেছে, তখন চরাচর জুড়ে বৃষ্টি পড়া দেখতে দেখতে তাঁর মনে হল – ‘আমিও এই ঝড়- বৃষ্টি-বাদলের সুবিশাল গীতিনাট্যের একজন প্রধান অভিনেতার মধ্যে দাঁড়িয়ে গেলুম।’
এই রকম অবস্থাতেই তৃতীয় বর্ষার গানটি রবীন্দ্রমানসে জন্ম নিল –
‘ঝরঝর বরিষে বারিধারা। হায় পথবাসী, হায় গতিহীন, হায় গৃহহারা … ’
[নেট ওয়ার্কের কারণে ওপরের ইউটিউব লিঙ্কটি আসতে বিলম্ব হলে, অনুগ্রহ করে একটু অপেক্ষা করুন]
আগের গানের কথার মত এ গানেও বর্ষা সুন্দর নয়, বরং কিছুটা ভয়ঙ্কর । এ গানও বাঁধা হল মেঘমল্লারে ।
কয়েক মাস পরে শিলাইদহ থেকে সাজাদপুর যাবার পথে ইছামতী নদীর বুকে নৌকোতে বসেই রচনা করলেন তাঁর চতুর্থ গান– ‘হেরিয়া শ্যামল ঘন নীল গগনে /সেই সজল কাজল আঁখি পড়িল মনে ।’ এই প্রথম রবীন্দ্রনাথের গানে বর্ষার সঙ্গে মানবিক প্রেমের মিলন ঘটল ।বলা যেতে পারে এটি আসলে প্রেমের গান , পটভূমিতে আছে বর্ষা। এ গান বাঁধলেন গৌড়মলহারের ছায়ায় ।
আবার বলছি যারা বলে থাকেন রবীন্দ্রনাথের গানে বসন্ত হল রাজা আর বর্ষা হল রাণী, তারা জানলে আশ্চর্য হবেন গোটা উনিশ শতকে তাঁর রচিত বর্ষার গান মাত্র চারটি, অথচ এই সময়ে তাঁর মোট রচিত গানের সংখ্যা ৬৩৯টি । অর্থাৎ বলা যেতে পারে তখন অবধি বর্ষা বিশেষ বিষয় হিসেবে তেমন করে তাঁকে টানেনি।
এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের জীবননদী সব চেয়ে বড় বাঁকটি নিল, রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকো ছেড়ে বাসা বাঁধলেন শান্তিনিকেতনে। নিজের মত করে যে উন্মুক্ত পৃথিবীটির তাঁর দরকার ছিল, তা তিনি পেয়ে গেলেন শান্তিনিকেতনে এসে। কিন্তু তাও এখানেও তিনি বর্ষা নিয়ে তেমন কিছু মাতলেন না। তাঁর পঞ্চম গানটি রচিত হল ১৯০৯ সালে। মানে, চতুর্থ আর পঞ্চম গানের মধ্যে দশ বছরের ব্যাবধান । এই দশ বছরে শারীরিক এবং মানসিক ভাবে রবীন্দ্রনাথের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। একটার পর একটা মৃত্যুশোক পেয়েছেন । পিতা, দুই স্নেহাষ্পদ ভ্রাতুষ্পুত্র, স্ত্রী এবং এক কন্যা এবং এক পুত্রকে হারিয়েছেন তিনি। আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়েও যেতে হয়েছে। দেশের অবস্থাও তখন বেশ অশান্ত হয়ে উঠেছে। নিজের শরীরেও নানান বিপত্তি দেখা দিচ্ছে। এর মধ্যে কিন্তু তাঁর কলম থামেনি। তিনি গীতাঞ্জলি রচনায় হাত দিয়েছেন। বড়পুত্র রথীন্দ্রনাথ জানেন, শিলাইদহে গেলে তাঁর পিতা শারীরিক এবং মানসিক ভাবে ভালো থাকেন । গীতাঞ্জলি রচনার জন্যে তাঁর এই ভাল থাকা খুব দরকার। তাই তিনি ব্যবস্থা করে সেখানে পাঠালেন। মূলত গীতাঞ্জলির জন্যেই ছটি গান লিখলেন, যা তিনি পরে গীতবিতানের বর্ষা পর্যায়ে অন্তর্গত করেছেন।
‘আজি শ্রাবনঘন গহন মোহে’ আর ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’ এই দুটি গান লিখলেন শান্তিনিকেতনে বসেই। প্রথম গানে গৌঢ়মল্লারে নির্ভর করলেও, পরের বর্ষার গানে তিনি প্রথমবার বেরিয়ে এলেন মল্লারের গন্ডি থেকে। এ গান বাঁধলেন মিশ্র সাহানাতে ।
আর শিলাইদহে গিয়ে লিখলেন – ‘আষাঢ় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল’, ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার’, ‘আজি বারি ঝরে ঝরঝর’, আর ‘এসো হে এসো সজলঘন’ এই চারটি গান ।
[নেট ওয়ার্কের কারণে ওপরের ইউটিউব লিঙ্কটি আসতে বিলম্ব হলে, অনুগ্রহ করে একটু অপেক্ষা করুন]
প্রথম গানটি বাঁধলেন ইমন রাগে, দ্বিতীয়টি মল্লারে, তৃতীয়টি আবার ইমনে। চতুর্থটিতে সম্ভবত সুরারোপ করা হয় নি।
এর পরের বছর ১৯১০ সালে গীতাঞ্জলির জন্যেই তিনটি বর্ষার গান রচনা করেন। ‘আমারে যদি জাগালে আজি’, ‘আবার এসেছে আষাঢ়’, ‘আজ বরষার রূপ হেরি’।
কিন্তু এর পরের দশ বছরে মাত্র চারটি বর্ষার গান লিখলেন। ১৯১২-তে লিখলেন ‘উতল ধারা বাদল ঝরে’, ১৯১৪-তে ‘শ্রাবণ হয়ে ফিরে এলে’, ১৯১৭-তে ‘কাঁপিছে দেহলতা থরথর’, ১৯২০-তে ‘আমার দিন ফুরালো, ব্যাকুল বাদল সাঁঝে’।
অনেক দিন ধরেই রবীন্দ্রনাথের মাথায় শান্তিনিকেতনে প্রত্যেক ঋতুতে একটি করে উৎসবের আয়োজন করার কথা ঘুরছিল। এর আগে দু’এক বার এরকম উৎসব হয়েছে বটে , কিন্তু তেমন বিশেষ পরিকল্পনা করে কিছু হয় নি। ১৯০৮ সালে শারদোৎসব করা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতিতেই । ১৯১৩ সালে একবার বর্ষা উৎসব আয়োজিত হয়েছিল, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তখন শান্তিনিকেতনে ছিলেন না । ১৯২১ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন প্রায় আটমাস ধরে ইয়োরোপ ও আমেরিকা সফর করে ফিরে এসেছেন, তখন শান্তিকেতনের অনেকের মনে হল রবীন্দ্রনাথকে একটি সম্বর্ধনা দেওয়ার কথা। আর কবিকে সম্বর্ধনা তো তাঁর গান ছাড়া হতে পারে না। তখনই ঠিক হল, বর্ষা উৎসব পালন করেই সম্বর্ধনা দেওয়া কথা ।
এই উৎসবের জন্যে দশটি বর্ষার গান বাছা হয়েছিল। অনুষ্ঠান এতটাই সর্বাঙ্গ সুন্দর হয়ে উঠল যে ঠিক করা হল কলকাতায় এই রকম একটি অনুষ্ঠান করা হবে।
১৯২১ সালের ২রা ও ৩রা সেপ্টেম্বর জোড়াসাঁকো বাড়ির মধ্যেই প্যান্ডেল করে বর্ষামঙ্গল অনুষ্ঠানটি করা হয়। এই উৎসবের জন্যে রবীন্দ্রনাথ পাঁচটি নতুন গান রচনা করলেন। ‘বাদল মেঘের মাদল বাজে’, ‘ওগো আমার শ্রাবণ খেয়াতরীর মাঝি’, ‘তিমির অবগুণ্ঠনে বদন তব ঢাকি’, ‘এই শ্রাবণের বুকের ভিতর আগুন আছে’, ‘মেঘের কোলে কোলে যায় যে চলে বকের পাঁতি’ ।
[নেট ওয়ার্কের কারণে ওপরের ইউটিউব লিঙ্কটি আসতে বিলম্ব হলে, অনুগ্রহ করে একটু অপেক্ষা করুন]
যে রবীন্দ্রনাথ গোটা উনিশ শতকে চারটি বর্ষার গানে লিখেছিলেন তিনিই, ২৬-এ আগস্ট থেকে ২-রা সেপ্টেম্বর এই এক সপ্তাহের মধ্যে পাঁচটি বর্ষার গান রচনা করে ফেলেছিলেন।
এই সময় দেশে অসহযোগ আন্দোলনের ঢেউ উঠেছিল। তাই অনেকেই রবীন্দ্রনাথের এই ঋতুর উৎসব নিয়ে মেতে থাকাটাকে ভাল চোখে দেখেনি। তাঁর নিজের ভাগ্নী সরলা দেবী সহ সমালোচনাও করেছেন অনেকে । তাতে অবশ্য রবীন্দ্রনাথ ক্ষান্ত হন নি। ভাগ্যিস হন নি।
এর পর থেকে প্রতি বছর বর্ষা উৎসবের জন্যেই তিনি নতুন গান রচনা করেছেন। আর কি অনবদ্য সে সব গান। পৃথিবীর কোনো কবি, কোনো কম্পোজার এমন করে বর্ষা বন্দনা করেন নি বা করতে পারেন নি। যেখানে প্রকৃতি, ঈশ্বর, ব্রহ্মাণ্ড, পূজা, প্রার্থনা, মুগ্ধতা, ভালোবাসা , মিলন, বিরহ সব মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে।
এতদিন রবীন্দ্রনাথের গান শান্তিনিকেতনের পরিশীলিত পরিসরেরই চর্চিত হচ্ছিল ।তার বাইরের বাংলাদেশ তেমন ভাবে আপন করে নিতে পারেনি তাঁর গান। কলকাতায় বর্ষামঙ্গল উৎসবটি হওয়ার পর কলকাতার অনেক শিল্পীর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে আগ্রহ জন্মাল। অনেক শ্রোতার কাছেও রবিবাবুর গান পৌঁছানো শুরু হল। কলকাতার কিছু ছেলেমেয়েকে রবীন্দ্রনাথ নিজে তালিম দিলেন তাঁর গান গাইবার জন্যে। এর মধ্যে অনেকেই পরে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রথম সারির শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন, চিত্রলেখা সিদ্ধান্ত, সাহানা দেবী ও মালতী ঘোষালের মত শিল্পীরা। কলকাতায় তখন সাধারণত গানের অনুষ্ঠান যা হত ধ্রুপদী গানের আসর বা আখড়াই জাতীয় গানের মজলিশ। রবীন্দ্রনাথই গানের বাংলা আধুনিক গানের জলসার concept নিয়ে এলেন। ১৯২২ সালের ৭-ই আগষ্ট রামমোহন লাইব্রেরির হলে বর্ষামঙ্গল অনুষ্ঠান হল। তখনও মাইকের প্রচলন হয়নি। তাই জলসাতে বেশির ভাগ গান সম্মিলিত ভাবে, কোরাসে এবং অনেকটা গলা ছেড়ে গাইতে হত যাতে হলের শেষ সারির শ্রোতার কান পর্যন্ত পৌঁছানো যায়। তাতে হয়ত গানের আবেদন কিছুটা ক্ষুণ্ণ হত। তবে এই অনুষ্ঠান যে শ্রোতাদের মন জয় করেছিল সে কথা অনেকের স্মৃতিকথাতে পাওয়া যায়। সেদিন রবীন্দ্রনাথ যখন নিজেই গাইছিলেন ‘আজ আকাশের মনের কথা ঝর ঝর বাজে/ সারা প্রহর আমার বুকের মাঝে’ তখন সত্যিই আকাশ থেকে ঝর ঝর বৃষ্টি নেমে এসেছিল । আর রবীন্দ্রনাথ শুধু গানই করেন নি । গানের মাঝে তিনি ঝুলন, বর্ষামঙ্গল আর নিরুপমা কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। একই আসরে গান এবং কবিতার যুগলবন্দী, এও রবীন্দ্রনাথেরই শুরু করা।
[নেট ওয়ার্কের কারণে ওপরের ইউটিউব লিঙ্কটি আসতে বিলম্ব হলে, অনুগ্রহ করে একটু অপেক্ষা করুন]
এই অনুষ্ঠানের সাফল্যের কারণেই হোক অথবা তাঁর নিজের মনীষার বিচিত্রগামিতার জন্যেই হোক, বলা যেতে পারে বর্ষার গান রচনার ঝোঁক তাঁকে পেয়ে বসল। কিছুদিন পরে কলকাতার ম্যাডান থিয়েটার (যেটি পরে নাম হয়েছিল চ্যাপলিন থিয়েটার এবং কিছুদিন আগে সেটি ভেঙে একটি মল বা ওই জাতীয় কিছু একটা করা হয়েছে) । জানা যাচ্ছে এই অনুষ্ঠানের টিকিটের দাম রাখা হয়েছিল চল্লিশ, পঞ্চাশ টাকা অবধি । সে সময়ে এই অঙ্ক অনেকটাই বেশি ছিল। তাও বহু মানুষ টিকিট না পেয়ে ফিরে গিয়েছিল।
এই অনুষ্ঠানের জন্যে রবীন্দ্রনাথ ১৯২২ সালের জুন মাস থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে তিনি পনেরোটি গান রচনা করলেন। এই পনেরোটি গানই আজও প্রতি বর্ষাতেই নানান অনুষ্ঠানে গীত হয়ে থাকে। এর মধ্যে আছে , ‘বহু যুগের ওপার হতে’, ‘আজ নবীন মেঘের সুর লেগেছে’, ‘এ কী গভীর বাণী এলো’, ‘আজি বর্ষা রাতের শেষে’ ইত্যাদি । এর পর যতদিন বেঁচেছিলেন প্রতি বর্ষামঙ্গলের অনুষ্ঠানের জন্যই রবীন্দ্রনাথ বর্ষার গান লিখেছেন এবং সুর করেছেন । তবে বর্ষার গান শুধু যে বর্ষাকালেই লিখেছেন, এবং শান্তিনিকেতনে বসেই লিখেছেন এমনটা নয়। কখনো রেলগাড়িতে যেতে যেতে লিখেছেন, কখনো পাহাড়ের দেশে বসে প্রবল শীতের মধ্যেও লিখেছেন।
প্রতিবার শান্তিনিকেতনের বর্ষামঙ্গল অনুষ্ঠানে কিছু নতুনত্ব আনার চেষ্টা করতেন। ১৯২৭ সালের পরে গানের সঙ্গে নাচও সংযোজিত হল।
মাঝে মাঝে নানা জায়গায় অনুষ্ঠান করে কিছু অর্থসংগ্রহও হতে থাকল। সেই অর্থ, অর্থাভাবে জর্জরিত বিশ্বভারতীর খুব কাজে লাগত ।
এর পরের প্রত্যেক বছরে বর্ষামঙ্গল অনুষ্ঠানে রচিত সব গানের তালিকা দিতে থাকলে হয়ত পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটবে। তার চেয়ে আমরা চলে যাই ১৯৩৯ সালে। রবীন্দ্রনাথের বয়স প্রায় উনআশি। শরীরে নানা অসুবিধা লেগেই থাকে। শান্তিনিকেতনে ঠিক হল গুরুদেবের পুরোনো গান দিয়েই বর্ষামঙ্গল অনুষ্ঠান হবে। কিন্তু গানের দলের ছেলে মেয়েরা আবদার করল, নতুন গান চাই। তাদের শিক্ষক শৈলজারঞ্জন সে আবদার গুরুদেবের কাছে পৌঁছে দিলেন। গুরুদেব একটু গম্ভীর হয়ে বললেন – আমার তো অন্য অনেক কাজ আছে , এই অল্প সময়ের মধ্যে কি আর নতুন গান লেখা যায় ! কিন্তু সরাসরি না করলেন না।
পরের দিন সকালে শৈলজারঞ্জনকে ডেকে একটি গান দিলেন – ‘ওগো সাঁওতালি ছেলে’ । মিশ্র ভৈরবীতে বাঁধা।
এর পরের দিন আর একটি গান দিলেন – ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’। এটি মল্লারে বাঁধা।
শৈলজারঞ্জনের মাথায় একটি দুষ্টু বুদ্ধি এলো। তিনি জানতেন বেহাগ রবীন্দ্রনাথের প্রিয় রাগের মধ্যে একটি।
পরের দিন ভোর বেলা গুরুদেবের ভৃত্য বলমালির সঙ্গে যোগাযোগ করে একটা সাদা কাগজে ‘বেহাগ’ লিখে বললেন এটি গুরুদেবের টেবিলে রেখে দাও ।
গুরুদেবের চোখে পড়তেই বনমালীকে ডেকে বেশ বকুনি দিয়ে বললেন তুই যাকে তাকে এখানে আসতে দিস কেন? আমাকে কি এবারে ফরমাইসি গান লিখতে হবে নাকি?
বনমালী তার মনিবকে বিলক্ষণ চেনে । সে একটু মুচকি হেসে চলে গেল।
সে দিন বেহাগ রাগেই একটি গান পাওয়া গেল – ‘আজি তোমায় আবার চাই শোনাবারে …’।
শৈলজারঞ্জন সাহস পেয়ে পরের দিন একই ভাবে কাগজে লিখে এলেন – ‘ইমন’ ।
গান পেলেন – ‘এসো গো, জ্বেলে দিয়ে যাও প্রদীপখানি।’
তার পরের দিন আবার কাগজে লিখে এলেন ‘তান দেওয়া গান’ ।
পরের গান পেলেন – ‘শ্রাবণের গগনের গায়…’
[নেট ওয়ার্কের কারণে ওপরের ইউটিউব লিঙ্কটি আসতে বিলম্ব হলে, অনুগ্রহ করে একটু অপেক্ষা করুন]
পরের দিন গুরুদেব নিজের থেকেই লিখলেন – ‘আজি ঝর ঝর মুখর বাদর দিনে…’। কাফি রাগে বেঁধেছিলেন সে গানের সুর। এই ভাবে কদিনের মধ্যেই ছেলেমেয়েদের এবং তাদের শিক্ষকমশাইয়ের আবদার রেখে পনেরোটি নতুন গান রচনা করে দিলেন । আবার মনে করিয়ে দিই, তাঁর বয়স তখন উনআশি। এর মধ্যেই একটি গানের বাণী ছিল ‘শেষ গানেরই রেশ নিয়ে যাও চলে/ শেষ কথা যাও বলে।’
সে বছর কিছু দিন পরে আরো একটি বর্ষামঙ্গল অনুষ্ঠান হয়েছিল। গুরুদেব সে অনুষ্ঠানের নাম দিয়েছিলেন ‘বাসি বর্ষামঙ্গল’। এই অনুষ্ঠানের দিন সকালে রবীন্দ্রনাথ শৈলজারঞ্জনকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, এখন যদি তোমাকে একটি নতুন গান শিখিয়ে দিই , তুমি ছেলেমেয়েদের দিয়ে সন্ধেবেলায় তা গাওয়াতে পারবে? শৈলজানন্দের অবস্থা তো মেঘ না চাইতেই জলের মত। এককথায় রাজী তিনি। সেই গানটি ছিল – ‘রিমিকি ঝিমিকি ঝরে বাদলের ধারা।’
এরপর আর একটি মাত্র বর্ষার গান লিখেছিলেন, ১৯৪০ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর তারিখে ‘এসো এসো ওগো শ্যাম ছায়া ঘনদিন।’
[নেট ওয়ার্কের কারণে ওপরের ইউটিউব লিঙ্কটি আসতে বিলম্ব হলে, অনুগ্রহ করে একটু অপেক্ষা করুন]
এর ঠিক দশ মাস পঁচিশ দিন পরে তিনি শেষ বারের মত শান্তিনিকেতন ছেড়ে কলকাতায় এলেন চিকিৎসার প্রয়োজনে। তার তেরোদিন পরে সাতই অগাস্ট, বাইশে শ্রাবণ দুপুর ১২ টা বেজে ১০ মিনিটে তিনি অমৃতধামের উদ্দেশে পাড়ি দিলেন ।
‘শাঙন গগনে’ থেকে ‘ওগো শ্যাম ছায়া ঘনদিন’, পঁয়ষট্টি বছরের সময়কালে একশো বারোটি বর্ষার গান । প্রতিটি গান তাদের তাদের নিজস্ব স্বাতন্ত্রে উজ্জ্বল।
উনআশি বছরে রচিত একটি গানে তিনি প্রত্যয়ের সঙ্গে কদম্ব বৃক্ষকে বলেছিলেন – তোমার ফুলের ডালও হয়ত একদিন রিক্ত হয়ে যাবে, কিন্তু আমার শ্রাবণের গান বিস্মৃতিস্রোতের প্লাবনে ফিরে ফিরে আসবে।
সেই গান লেখার পর চুরাশিটি শ্রাবণ পেরিয়ে গেছে। এখনো আমরা বার বার নতুন করে আঁকড়ে ধরতে চাইছি তাঁর গানকে। কদম ফুল আজও ফোটে বটে, সে গাছের ডাল এখনো বর্ষাকালে একেবারে রিক্ত হয় না। কিন্তু আমাদের চারিধারে অনেক কিছুর মধ্যে, যা যা একদা আমাদের বোধকে সঞ্জীবিত করে রাখত তার মধ্যে রিক্ততার ছাপ প্রকট হয়ে উঠছে। রবীন্দ্রনাথ বাঙালিকে যে সার্বিক উজ্জীবনের নিশানা দিয়ে গিয়েছিলেন, তা থেকে আমরা ক্রমশই সরে আসছি ।
তবু এখনো দক্ষিন-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বঙ্গদেশে প্রবেশের খবর পেলেই, আকাশে কৃষ্ণবর্ন মেঘের আনাগোনা দেখলেই, পূব দিক থেকে ঈষৎ আর্দ্র হাওয়া ভেসে এলেই, প্রায় প্রাকৃতিক নিয়মে রবীন্দ্রনাথের বর্ষাগীতিগুলি বিস্মৃতিস্রোতের প্লাবনে আমাদের কাছে ফিরে ফিরে আসে। অন্তত এখন অবধি রবীন্দ্রনাথের ভবিষ্যৎবাণী সঠিক ছিল তা প্রমাণিত। আগামী দিনের বাঙালির ক্ষেত্রে তা হবে কিনা সেটা ভবিষ্যৎই বলবে ।



অনেক অজানা তথ্য জানা গেল। ভালো লাগল।
রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গানের এমন আনুপূর্বিক ইতিহাসের সঙ্গে গীত গানগুলোর মালা গাঁথা, এ এক পরিশ্রমসাধ্য কাজ, যা মননশীলতাও দাবি করে। আপনি এ ব্যাপারে অত্যন্ত পারদর্শী। এমন একটি লেখা পেয়ে আমরা কৃতজ্ঞ।
অপূর্ব লেখা। এত তথ্য সংগ্রহের জন্য আপনার পরিশ্রমকে কুর্নিশ জানাই। বাঙালীর জীবনে বর্ষা আর রবীন্দ্রনাথ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আকাশে মেঘের ঘনঘটা দেখলে যে কোনো সংস্কৃতিমনষ্ক বাঙালীর মনে রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গান অনুরণণ তুলবে না, এমনটা হওয়ার নয়।
এমন একটি রবীন্দ্রনাথের বর্ষাসঙ্গীতের
ইতিহাস উপহার পেয়ে বিস্মিত।অনেক ধন্যবাদ।