শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

ক্ষণিকম ক্ষণিকম সর্বং ক্ষণিকম!

দেশভাগ এক নির্মম সত্য। এই সত্যকে মানিয়া লইয়া ভারতীয়রা নিজনিজ অস্তিত্বকে পুনর্গঠন করিয়া উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের পথে আগুয়ান। তন্মধ্যে দুরারোগ্য ব্যাধির ন্যায় বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি হানা দিয়া দেশের সুস্থিতি চূর্ণ করিয়া দিতেছে। সেই শক্তিকে নিয়মিত ইন্ধন যোগাইতে প্রস্তুত বিভাজিত অপর অংশটি। তাহাদের মনে শত্রুতা ভিন্ন বিকল্প কোন ভাবনা বিকশিত হইতে পারে নাই। পুরাতনকে বিগত ভাবিতে তারা অপারগ। তাহারা ক্রমান্বয়ে বিদ্বেষের আবাদ করিয়া থাকে। ইহাতে সর্বাপেক্ষা যে নিজেদেরই ক্ষতি সাধিত হইতেছে, তাহা বুঝিবার ন্যায় স্বচ্ছতা হারাইয়া ফেলিয়াছে। ঋণাত্মক অভিসন্ধির ফল হয়তো সাময়িকভাবে ভারতবর্ষকে আঘাত করিয়াছে, তাহা হইতে অধিকতর আঘাতে জর্জরিত উহারা নিজেরা। 

ব্রিটিশ পরবর্তী সময়ে একটি ভূখন্ড তিনটি ভাগে ভাগ হইয়া গেল। তন্মধ্যে দুইটি দেশ একটি বিশেষ রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করিয়া পথচলা শুরু করিল। মধ্যভাগে ভারতবর্ষ একাকী ধর্মনিরপেক্ষ নামক এক অভূতপূর্ব পরিচয় লইয়া অগ্রসর হইতে মনস্থ করিল। আজ এতগুলি বৎসর অতিক্রান্ত। ভারতবর্ষের শত সমস্যার পঙ্কিল আবর্তের মধ্যস্থলে একটি স্থির নিরপেক্ষ পঙ্কজরূপে বিশ্বের দরবারে পরিস্ফূট। বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির পৌনঃপুনিক প্ররোচনা সত্বেও এক শাশ্বত বন্ধনে অভগ্ন।  

ভগবান বুদ্ধের অমোঘ বাণী, “ক্ষণিকম ক্ষণিকম সর্বং ক্ষণিকম!” আমাদের সম্মুখে এক সত্যের উন্মোচন করে। পৃথিবীর যাবতীয় সময়মালিকা একেকটি মুহূর্ত গাঁথিয়া সৃষ্ট। এক মুহূর্ত পরে কী ঘটিবে যেমত আমাদের নিকট অজ্ঞাত, সেইমত এক মুহূর্তে পূর্বে কী ঘটিয়াছিল, তাহা পুরাতনে পরিণত হইয়াছে। এ তথ্য কাহারও অজানা নয়, তথাপি মনুষ্যজাতি ভবিষ্যতকে করায়াত্ত করিতে ধাবিত হয়, এবং পুরাতনকে বিগত জানিয়াও নিরাসক্ত হইতে পারে না। মহামানবের পক্ষে যাহা উন্মীলিত সত্য, সাধারণের ক্ষেত্রে তাহা মজ্জাগত করা সহজকার্য্য নয়।  

উপনিষদীয় বীক্ষায় সম্পৃক্ত রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে বারংবার ভগবান বুদ্ধ প্রভাব বিস্তার করিয়াছেন। চন্ডালিকার আনন্দ হইতে, পূজারিনী সহ আরও বহু লেখায় তাঁর সশ্রদ্ধ উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়।

ভারতবর্ষ এই সত্যকে হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিলেও প্রতিবেশীরা পারে নাই। তাহাদের নিজস্ব রাষ্ট্রধর্ম পরিচিতি তাহাদের উদার হইতে দেয় নাই। আর সেখানেই উহাদের পতনের সূত্রপাত। আজ তাহাদের বিশ্বের দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষার ঝুলি লইয়া বাহির হইতে হয়, আর দেশের অভ্যন্তরে আপন নাগরিককে ভুলাইয়া রাখিতে সেই ঋণাত্মক শক্তির আশ্রয় লইতে হয়, যা ক্রমান্বয় তাহাদের মাদকাসক্ত ক্লীবে পরিণত করে।

পৃথিবীর যে কোন মহামনবের প্রকৃত সত্যোপলব্ধি তাহাদের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলনে শোচনীয় ভাবে ব্যর্থ। তাহারা ভগবান বুদ্ধের শান্তিবাণী, এবং ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথের দর্শনকে দূরে সরাইয়া বিষময় বিদ্বেষ বায়ু ছড়াইতে ব্যস্ত।

সুখের কথা, এই ধারাবাহিক নীচতার প্রত্যুত্তরে ভারতবর্ষ যোগ্য জবাব প্রস্তুত করিয়াছে। বীর ভারতীয় সৈনিকদের রণকুশলতায়, শত্রু আত্মসম্বরণ করিতে বাধ্য হইয়াছে। শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইহাই আমাদের দৃঢ় পদক্ষেপ। তবে কিনা বিষবৃক্ষ মরে নাই। তাহা কখন যে আবার ফলবতী হইয়া কীরূপ ধ্বংসবীজ রোপন করিবে, তাহা বর্তমানের পক্ষে জানা নাই। নিরন্তর প্রবাহিত মুহূর্তর কথা ভাবিয়া, আজ প্রতিটি সুনাগরিকের অন্তরে সকল দুর্যোগকে সহন করিবার শক্তি লাভ করিবার প্রার্থনা প্রতিফলিত হইতেছে।      
.

[ছবি ও তথ্যঋণ – আন্তর্জাল]

এবারের রবিচক্রের রবীন্দ্র সংখ্যা পড়তে পড়তে মনে হল যদি একে আন্তর্জাল থেকে মুক্ত করে দু’মলাটের মধ্যে সাজিয়ে রাখা যেত তবে রবীন্দ্রপ্রেমী এবং রবীন্দ্র উৎসাহীদের কাছে একটা সংগ্ৰহযোগ্য বই হিসেবে হাতে তুলে দেওয়া যেত। প্রত্যেকটি লেখা এত উন্নতমানের যে পাঠক হিসেবে বিশেষ কোনো একজনকে আলাদা করার কোনো পথই আমার কাছে খোলা নেই, যেন একটা বহুতন্ত্রীযুক্ত বীণা নিখুঁত সুরে বেজে চলেছে। এই সার্থক সংকলনের জন্য সম্পাদকের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তিনি শুধু আমাদের প্রত্যাশাই বাড়িয়ে চলেছেন, তাই নয়, তিনি আমাদের প্রতি মুহূর্তে ঋদ্ধ করে চলেছেন। এই জন্যই তিনি আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন।
ধন্যবাদান্তে,
চন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য

রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।

রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত

editor@robichakro.com

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


5 1 vote
Article Rating
4 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Chandan Sen Gupta
Chandan Sen Gupta
9 months ago

ভারতবাসীরা তাদের ঐতিহ্য মেনে পুরনো পথেই থাকুক,এই কামনাই করি সবসময়।

সৌরভ হাওলাদার
সৌরভ হাওলাদার
Reply to  Chandan Sen Gupta
9 months ago

তাই যেন হয়। এই আমাদের সকলের সমবেত ইচ্ছে।

Sulata
Sulata
9 months ago

মনের মধ্যে কেবলই ধ্বনিত হয় উপনিষদের একটি উপদেশ ” মা হিংসীঃ” অর্থাত্ হিংসা কোরণা। কিন্তু পদে পদে জীবজগতে এই হিংসাবৃত্তির আবর্তন ঘটে চলেছে। আত্মরক্ষার্থে দেশরক্ষার্থে অথবা জাতির নিরাপত্তার জন্য কিংবা আরও গভীীরতর বহুতর কারণে যুদ্ধের বিকল্প কোন পথ আশ্রয় করা এই আধুনিক যুগে প্রায় অসম্ভব শোনাবে। তাই ভারতবর্মষেতো পরমতসহিষ্ণু একটি দেশকেও যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়। তা সত্ত্বেও মনে রাখতে হবে জানতে হবে কোথায় ইতি টানতে হবে। বিপক্ষকে উপেকষা না করে নিজেদের শক্তির প্রদর্শন অবশ্যই কাম্য।
কিন্ত যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি সকল ক্ষেত্রেই স্মরনীয়।

সৌরভ হাওলাদার
সৌরভ হাওলাদার
Reply to  Sulata
9 months ago

ধংস আর সৃষ্টি একই সুতোয় বাঁধা পড়ে যায়। শত শান্তির বাণী ব্যর্থ হয়। ‘ধর্মস্থাপনায়’ রক্তাক্ত হয় ইতিহাস যুগে যুগে।