পুরাকালে, যেন বহু জন্মের আগে, সুর ও অসুর, সৎ ও অসৎ, দু’টি পক্ষ ক্ষীরসমুদ্র মন্থন করেছিল অমৃত কুম্ভের সন্ধানে। সেই মহামন্থনের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল হলাহল, যা ধারণ করে নীলকণ্ঠ হলেন মহাশিব। আর অমৃত? সে যে শত সাধনার ধন! সবটুকু কালকূট কেবল মহাদেবের জন্য নির্ধারিত হলেও মৃত সঞ্জীবনী সুধা অমৃতের ভাগ ছাড়তে তো দিতি বা অদিতির সন্তানেরা কেউই রাজি ছিলেন না। তাই সে অমৃতকলস দৈত্যদের হাত থেকে রক্ষা করবার উদ্দেশ্যে সকল দেবতা হলেন শ্রীবিষ্ণুর শরণাপন্ন। আর বিষ্ণুর পরামর্শেই মন্থন শেষে অমৃতকলসের আবির্ভাব হওয়া মাত্র তার উপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে দেবরাজ ইন্দ্রের পুত্র জয়ন্ত অমৃতকুম্ভ নিয়ে দিলেন আকাশপথে পাড়ি। পথে অসুরেরা তাঁকে ধাওয়া করলে মাঝরাস্তায় বারো দিন ধরে দেবতা ও অসুরের মধ্যে চলল রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। আর সেই প্রাণান্তকর সংঘর্ষ চলাকালীনই পৃথিবীর চারটি স্থানে কলস থেকে ক্ষরিত হল বিন্দু বিন্দু অমৃত। জগতের বুকে এই মহান সংযোগের উদযাপন করতেই ঐ চার স্থান, প্রয়াগ, হরিদ্বার, উজ্জয়িনী ও নাসিকে আজও মহাসমারোহে পালিত হয় অমরত্বের মহোৎসব কুম্ভমেলা। বছরভেদে কখনও তার নাম হয় কুম্ভ, কখনও অর্ধকুম্ভ, কখনও পূর্ণকুম্ভ, আর কখনও বা মহাকুম্ভ।

কুম্ভমেলার এই যে পৌরাণিক বৃত্তান্ত, তার সংক্ষিপ্তসার আমাদের সকলেরই কম-বেশি জানা। সমুদ্রমন্থন ও তৎপরবর্তী অমৃতকলস সংক্রান্ত কাহিনিটি হিন্দু পুরাণে উল্লিখিত সর্বাধিক জনপ্রিয় শ্রুতি বিশেষ। ভাগবত পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ, তথা চিরপরিচিত মহাকাব্য মহাভারত – সর্বত্রই এ কাহিনির বিস্তৃতি অবাধ। এমনকি ভারতবর্ষ নামক হিন্দু-অধ্যুষিত দেশটির বাইরেও সমুদ্রমন্থন ও অমৃতকুম্ভের উপাখ্যান যথেষ্ট জনপ্রিয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডের সুবর্ণভূমি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট বা কম্বোডিয়ার আঙ্কোরভাট মন্দিরের সুদৃশ্য দু’টি সমুদ্রমন্থন সংক্রান্ত ম্যুরাল অন্তত সেই ঐতিহ্যই বহন করে আসছে।
অতএব, দেশ-কাল-সাহিত্য সর্বত্রই এই সমু্দ্রমন্থনোপাখ্যানের উপস্থিতি অপ্রমেয়। তথাপি ভারতবর্ষের সাম্প্রতিকতম ঘটনাবলীর নিরিখে এই প্রায় সর্বজনবিদিত পৌরাণিক প্রেক্ষাপটটিকে একটু ছুঁয়ে যাওয়ার প্রয়োজন যেন অনুভূত হয়।
সকলেই জানেন, বিগত ১৩ই জানুয়ারি থেকে উত্তরপ্রদেশের অন্যতম প্রাচীন শহর প্রয়াগরাজ বা পূর্বতন এলাহাবাদে শুরু হয়ে গিয়েছে মহাকুম্ভ মেলা, ২০২৫। গণমাধ্যমে কথিত, এই বিশেষ মহাকুম্ভ সুদীর্ঘ ১৪৪ বছর পর অনুষ্ঠিত। “দেশে দেশে দিশে দিশে” এ মহান সংযোগের উপাখ্যান ফলে-ফুলে হয়েছে পল্লবিত। ইতিমধ্যেই প্রায় ষাট কোটি মানুষ গঙ্গা-যমুনা ও পৌরাণিক নদী সরস্বতীর পুণ্য ত্রিবেণী সঙ্গমে সম্পন্ন করেছেন অমৃতস্নান। অন্যদিকে এই মহামেলার অর্থনৈতিক দিকটিও উপেক্ষণীয় নয়। এই মেলাকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের অতিথি সমাগমে সরকার বাহাদুরের ঘরে রাজস্ব জমা পড়েছে প্রভূত। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগও বেড়েছে বহু গুণ। পাশাপাশি বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতির মানুষের এই দেশে একটি বিশ্বাসকে অবলম্বন করে এমন বর্ণময় সমাবেশ হয়তো হাজার বিরোধ ও বৈচিত্র্যের মধ্যে নিহিত একটি ঐক্যেরও সন্ধান দেয়।
কিন্তু ভক্তি ও বিশ্বাসের এই মহাসমারোহেই সংঘটিত হয়ে গেল এক চূড়ান্ত ভয়াবহ, অমানবিক গণপদদলনের দুর্ঘটনা। ২৯শে জানুয়ারির সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তে, মৌনী অমাবস্যার পুণ্য লগ্নে সঙ্গমের জলে স্নান করার বাসনায় যখন অসংখ্য মানুষ মত্ত মাতঙ্গের মতো ছুটে গিয়েছিলেন ত্রিবেণী সঙ্গমের উদ্দেশ্যে, তাঁদের পায়ের নীচে কারা শুয়েছিলেন, অপরের পেষণে-পীড়নে তাঁরা আর্তনাদ করে উঠেছিলেন কি না, তাতে ভ্রূক্ষেপ ছিল না কারো। “কে পড়ে থাকবে, কে মরবে, সেটা কথা নয়। আমি যাব। সামনে পড়ে আছে যেন… জীবন-যৌবন, আজন্মলালিত কাম্যবস্তু,… ধ্যানধারণা।” (অমৃত কুম্ভের সন্ধানে/ কালকূট)
আর এই নির্মম হঠকারিতার পরিণাম যা হওয়ার, ঠিক তাই হয়েছিল। মোটা দাগের সরকারি হিসেবেই মৃতের সংখ্যা ছুঁয়েছিল ত্রিশ। অমৃতলাভের সন্ধানে এসে ‘সকলি গরল ভেল’-এর এমন ট্র্যাজিক পরিণতি এই বিশ্বে ধর্মস্থানগুলির সঙ্গে যেভাবে সম্পৃক্ত, তার নিদর্শন অন্যান্য ক্ষেত্রে আর খুব বেশি পাওয়া যায় কি? পুণ্যলোভাতুর সাধারণ থেকে অতি সাধারণ মানুষ আবেগের বশবর্তী হয়ে ভুল করতেই পারেন, কিন্তু যাঁদের ওপর প্রশাসনের ভার ন্যস্ত ছিল, তাঁদের কৈফিয়ৎ তলব করবে কে? আদৌ সেটা সম্ভব কি আমাদের মতো দেশে, যেখানে ঠিক বা বেঠিক, ন্যায় বা অন্যায়, যা-ই হোক না কেন, সংখ্যাগরিষ্ঠই সবসময় শেষ কথা বলে?

সুতরাং গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সরকারকে “of the people, by the people, for the people” হিসেবে কল্পনা করা হলেও বাস্তবের কঠিন মাটিতে দাঁড়িয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তো সে আশা পূর্ণ হয় না। তবে দিনের শেষে মনে প্রশ্নের কাঁটা বিঁধে থাকে যাঁদের মননের বিকাশ নিয়ে, তাঁরা ‘ভারতভাগ্যবিধাতা’ জনগণ বৈ আর কেউ নন। মহাকুম্ভ মেলা হিন্দুধর্মের অতি বৃহৎ এক উৎসব, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে একই সঙ্গে তা তো মানুষের মিলনমেলাও বটে। আর সেই মানুষেরই হৃদিকুম্ভে সঞ্চিত অমৃতের সন্ধান করে উঠতে না চাইলে, তা না পারলে; কেবল ত্রিবেণী সঙ্গমের পুণ্যসলিলে অবগাহন আদৌ মানবসন্তানকে অমরত্বের আশিস প্রদান করতে পারে কি? আমরা উত্তর খুঁজে পাই না।
এ সম্পাদকীয়-র উদ্দেশ্য অকারণে কারো ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করা নয়। আবার একই সঙ্গে কেবল ধর্মের দোহাই দিয়ে কোনো অনৈতিক আচরণের সমর্থন করাও নয়। আর সেই আকাঙ্ক্ষা নিয়েই আমরা কামনা করি, ভারতভাগ্যবিধাতা জনগণ ভারতকে যেন সেই স্বর্গে জাগরিত করতে সক্ষম হন, যেখানে দাঁড়িয়ে “এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে” উপস্থিত মানুষ উদার ছন্দে, পরমানন্দে ‘নর-দেবতা’র বন্দনা করতে পারবেন। সেদিন সেই তীর্থযাত্রায় তাঁদের মনের গ্রন্থির উন্মোচন হবে। বাড়ির কাছে আরশিনগরে যে পড়শি বসত করেন, তাঁর পরিচয় লাভ করে তাঁরা প্রকৃত অমৃতকুম্ভের সন্ধান পাবেন। অনুভব করবেন, “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই…”


রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।
রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত
editor@robichakro.com
এই যে দেশের পঞ্চাশ কোটি মানুষের বিশ্বাস যাত্রা, কোটিপতি থেকে হ্যাভ নটসকে এক অমোঘ টানে এক পংক্তিতে নিয়ে এলো, এটাই মনে হয় কুম্ভর সবচেয়ে বড় অমৃতলাভ।
ভাল বলেছেন, ম্যাডাম। কুম্ভমেলা উচ্চকোটি থেকে সর্বহারা, সব শ্রেণির মানুষের এক মিলনমেলা প্রাঙ্গণই বটে। হিন্দু ধর্মে বর্ণিত অমৃত সন্ধানের, অমৃত লাভের ও অমৃতত্ব উদযাপনের ‘ সেই ট্র্যাডিশন এখানে সমানে চলেছে’। তবে একই সঙ্গে যদি হিন্দু শাস্ত্রে বর্ণিত শিব জ্ঞানে জীব সেবা-র আদর্শটুকুও মেনে, ভবিষ্যতে তাঁদের পায়ের নীচে পিষে দিয়ে পুণ্যার্জনে ছুটে যাওয়ার পরিবর্তে নরনারায়ণের সেবার কথাও কিছু মানুষ একটু আন্তরিকতার সঙ্গে ভাবেন, এবং সরকারও এ অন্যায় প্রতিরোধে সদর্থক ভূমিকা পালনে ইচ্ছুক ও সক্ষম হন, ঐতিহাসিক কুম্ভমেলা সেদিন ‘সবার মিলনে পূর্ণ, তীর্থ’ নিশ্চয়ই আরো সর্বাত্মকভাবে হয়ে উঠবে।
খুব সুন্দর বলেছো।