
***
গীতাঞ্জলি :
স্বর্ণবীণায় নম্র উষার
সুরের রেখা ।
গীতাঞ্জলি :
দগ্ধ নিদাঘ স্তব্ধ বনে
বাতাস একা।।
গীতাঞ্জলি :
আকাশ পথে সায়ন্তনীর
স্বর্ণাভ রথ।
গীতাঞ্জলি :
ঝড়ের রাতে দুয়ার ভাঙা
রিক্ত বসত।।
গীতাঞ্জলি :
ঋতুচক্রের নুপুর নৃত্যে
পদধ্বনি।
গীতাঞ্জলি :
পাহাড় চূড়োর পরমোজ্বল
মুকুটমণি।।
গীতাঞ্জলি :
দিগন্তনীল পারাবারে
সোনার তরী।
গীতাঞ্জলি :
মর্ত কাছে স্বর্গ যা চায়
সেই মাধুরী।।
প্রাসঙ্গিক তথ্য:
গীতাঞ্জলির প্রথম প্রকাশ ২০এ ভাদ্র, ১৩১৭।
১৩১৩ থেকে ১৩১৭র ২৯এ শ্রাবণের মধ্যে রচিত মোট কবিতার সংখ্যা ১৫৭। এর মধ্যে গানের সংখ্যা ৮৫।
কালানুক্রমিক ইতিহাস এই রকম :
১৩১৩ – ৪টি, ১৩১৪ – ৩টি, ১৩১৫ – ৭টি, ১৩১৬ – ৪৫টি, এবং ১৩১৭ – ৯৮টি।
গীতাঞ্জলির ৮৫ টি গানের মধ্যে পর্যায় অনুযায়ী শীর্ষ সংখ্যা:
পূজা : ৬৪, প্রকৃতি : ১৬, প্রেম : ২, স্বদেশ : ১ এবং বিচিত্র : ২ ।

Song Offerings নামে গীতাঞ্জলির কবিকৃত যে অনুবাদটি ইংরেজি ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পায়, তার ১০৩ টি কবিতার মধ্যে গীতাঞ্জলির কবিতা: ৫১ টি, গীতিমাল্যের ২৮ টি, নৈবেদ্য থেকে নেওয়া ১৬টি, খেয়া থেকে ১১টি, শিশু থেকে ১৩টি এবং চৈতালি,স্মরণ , কল্পনা, উৎসর্গ , অচলায়তন থেকে ১টি করে নেওয়া। ৯৫ নং কবিতাটি নৈবেদ্যের দুটি কবিতাকে একত্র করে (৮৯ + ৯০ এর শেষাংশ) অনুদিত ।
বঙ্গাব্দ ১৩১৩ থেকে ১৩১৭ কালপর্বে রচিত এই অবিস্মরণীয় গীতিকবিতাগুলি যখন আবিষ্ট চেতনার অতল থেকে কথায় ও সুরে নির্ঝরের মতো উৎসারিত হচ্ছিল, সে ছিল আবহমানকাল বাঙালির জীবনের এক মহালগ্ন। কবি তাঁর ভাইঝি ইন্দিরাকে ইং ১৯১৩ সালে লিখেছিলেন: “এই কবিতাগুলি আমি লিখব বলে লিখিনি – এ আমার জীবনের ভিতরের জিনিস – এ আমার সত্যকারের আত্ম নিবেদন – এর মধ্যে আমার জীবনের সমস্ত সুখ, দুঃখ,সমস্ত সাধনা বিগলিত হয়ে আকার ধারণ করেছে।” যে লেখাগুলি মূলের ছন্দঝঙ্কার, সূক্ষ্ম কারুকর্ম থেকে রিক্ত হয়ে কবিকৃত ইংরেজি অনুবাদ পড়েই ইয়েটসকে স্বীকার করতে হয় ” Tagore is greater than any of us …” এজরা পাউন্ডকে পোয়েট্রি পত্রিকার হ্যারিয়েট মনরোকে চিঠিতে লিখতে হয় “He (Tagore) has sung Bengal into a nation “.
আবু সয়ীদ আইয়ুব একে বলতেন ভরা সরোবরের কাব্য। শঙ্খ ঘোষের কথায় : “নিজেকে রচনা করে তোলবার গান। এক বিরামহীন আত্মজাগরণের, আত্মদীক্ষার গান।”

আমাদের মতো সাধারণ কারো কারো কাছে মনে হতেই পারে এ যেন ‘অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো’।
অন্ধকারই তো! যখন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে দুঃখের আঁধার সর্বগ্ৰাসী। ঘরে-বাইরে বিপন্ন, বিপর্যস্ত কবি। বিগত কয়েক বছরের মধ্যে হারিয়েছেন বেশ কয়েকজন নিকটতম প্রিয়জনকে। অকালে চলে গেছেন পাখির মতন সুরেলা কন্ঠের অধিকারিনী ভাইঝি অভিজ্ঞা, প্রিয়তম ভাইপো নীতীন্দ্রনাথ এবং স্বপ্নদর্শী বলেন্দ্রনাথ, স্ত্রী মৃণালিনী দেবী, মেজো মেয়ে রেণুকা, পিতৃদেব মহর্ষি, এ ছাড়া ভাইপো গগনেন্দ্রনাথের পুত্র গেহেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথের কন্যা অতসী দেবী এবং সর্বোপরি প্রিয়তম কনিষ্ঠ পুত্র মাত্র ১১ বছর বয়সী শমীন্দ্রনাথ। হারাবেন পরিবারের গৃহবধূ ধৃতিময়ী দেবী, ভাইপো সমরেন্দ্রনাথের পুত্র সমীরেন্দ্রনাথ, এবং আরেক ভাইপো হিতেন্দ্রনাথকে। এ সবই ঘটছিল শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার প্রথম দশ বছরের মধ্যেই যখন তিনি রচনা করছেন তাঁর বিখ্যাত গীতাঞ্জলি কাব্যগ্ৰন্থখানি, যা পরে ইতিহাস হবে।
এ যেন মৃত্যুযজ্ঞের সাধনপীঠ! তা নইলে শমীর মৃত্যুতে কিভাবে তিনি লিখতে পারেন “ঈশ্বর আমাকে বেদনা দিয়াছেন, কিন্তু তিনি তো আমাকে পরিত্যাগ করেন নাই – তিনি হরণও করিয়াছেন, পূরণও করিবেন। আমি শোক করিব না – আমার জন্য শোক করিও না।”

এই সেই পর্ব যখন রবীন্দ্রনাথ জীবনের সেই স্তরকে ছুঁলেন যেখানে বেদনার অভিঘাতেও আনন্দের সুর জেগে উঠল।
প্রিয়তম পুত্রের মৃত্যুর ২০ দিনের মধ্যেই তিনি লিখে ফেললেন তাঁর এমন দুটি গান যেখানে তিনি দাঁড়ালেন মৃত্যুর অনেক ওপরে, পরে ঘোষণা করবেন – আমি মৃত্যুর চেয়েও বড়। গান দুটিঃ ১) অন্তর মম বিকশিত করো … ২) প্রেমে প্রাণে গানে গন্ধে আলোকে পুলকে .. এবং দুটি গানেরই মূল সুর ভৈরবী। কোনো মর-মানুষের পক্ষে এ সম্ভব কিনা সংশয় থেকেই যায়। অনেক পরে দৌহিত্র নীতীন্দ্রনাথের অকালমৃত্যুতে কন্যা মীরাকে লিখেছিলেন “শমী যে রাত্রে গেল, তার পরের রাত্রে রেলে আসতে আসতে দেখলুম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কোথাও কিছু কম পড়েছে তার লক্ষণ নেই। মন বললে কম পড়ে নি, সমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারি মধ্যে।”
বন্ধু জগদীশ চন্দ্রকে লেখেন “আমদের চারিদিকেই এত দুঃখ, এত অভাব, এত অপমান পড়িয়া আছে যে নিজের শোক লইয়া অভিভূত হইয়া এবং নিজেকেই বিশেষরূপ দুর্ভাগ্য কল্পনা করিয়া পড়িয়া থাকিতে আমার লজ্জা বোধ হয়।”
পরে বলবেন “আমি কোনো দেবতা সৃষ্টি করে প্রার্থনা করতে পারি নে, নিজের কাছ থেকে নিজের সেই দুর্লভ মুক্তির জন্য চেষ্টা করি। সে চেষ্টা প্রত্যহ করতে হয়, তা না হলে আবিল হয়ে ওঠে দিন।”

এ তো গেল ঘরের কথা। বাইরের পরিস্থিতিটা কী ছিল তখন?
১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন এখন স্তিমিত, নেতৃত্ব দিশাহারা। একদিকে তীব্রতর হচ্ছে ইংরেজ শাসকদের অত্যাচার, অন্যদিকে চরমপন্থীদের আত্মোৎসর্গের আগুন এখানে-ওখানে জ্বলে উঠে চোখ ঝলসে দিয়ে আরো গাঢ় অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। সে ছিল ইতিহাসের এক চরম ক্রান্তিকাল। ক্ষুদিরামের ফাঁসি, প্রফুল্ল চাকীর আত্মহত্যা, অরবিন্দের জেল, বারীন,উল্লাসকর সহ বহু বিপ্লবীর হয় যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর, নয় ফাঁসি – এ সবই তো এই সময়কার ইতিহাসের ট্রাজিক হাহাকার।
কিছুদিন আগেও তাঁর মনে হচ্ছিল “আকাশ যেন ঘনিয়ে এল ঘুমঘোরের মতো / দিঘির কালো জলে।” সবে শেষ করেছেন তাঁর সবচেয়ে তমসাচ্ছন্ন বই খেয়া যেখানে অন্ধকার প্রসঙ্গ এবং অনুষঙ্গ বিস্তার করে রয়েছে। বসে আছেন ঘাটের কিনারায় দিনশেষের শেষ খেয়ার জন্য। দিনের আলো ফুরিয়ে গেছে অথচ সাঁঝের আলো জ্বলে ওঠে নি – এক সার্থক নৈরাশ্য!
ঠিক এই পর্বেই তাঁর জীবনবীণায় বাজল সেই গান আঁদ্রে জীদের ভাষায় যা ‘প্রাণের বেগে নিশ্বসিত ও স্পন্দমান ‘। কোনো কোনো কবিতায় (Song Offerings 40,45,46,47) তিনি শুমানের মেলোডি এবং বাকের ক্যানটাটার স্পন্দন অনুভব করেছিলেন, ৬৯ নং কবিতায় পেয়েছিলেন গ্যয়টের Second Faust এর তুল্য স্বগতোক্তি। সেই সহজ , সরল অথচ গভীর গীতিময়তা ইয়েটসকে নিয়ে যায় “কোনো চিত্রশিল্পীর অনুভবী এক মহত্তর প্রগাঢ়তার কাছে – যিনি অঙ্কন করে চলেছেন ধূলি ও সূর্যাস্ত। আমরা চলি সেই অভিমুখে একটি স্বরের মতো St. Francis থেকে Wlliam Blake এর সমীপে, আমাদের হিংস্র ইতিহাসে আজ যারা বিবিক্ত।”

গীতাঞ্জলির প্রথম গানেই শুরু হল সেই যাত্রা যার অভিমুখ অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, বেদনা থেকে আনন্দের দিকে, যার পরতে পরতে লেগে রয়েছে হৃদয়ের শুদ্ধতম স্বর, আত্মনিবেদনের, নিবেদন চোখের জলে, যাতে ডুবে যায় অহংকারের সমস্ত কালিমা আর ধীরে ধীরে অন্ধকারের ভিতরে জাগতে থাকে আনন্দের শতদল শিখা:
“আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার/ চরণ ধূলার তলে ।”
খেয়াতে লিখেছিলেন:
“তুমি এ পার ও পার কর কে গো, / ওগো খেয়ার নেয়ে।
আমি ঘরের দ্বারে বসে বসে/দেখি যে তাই চেয়ে,
ওগো খেয়ার নেয়ে।”

কবি যার জন্য দ্বারে এসে বসেছিলেন, সেই খেয়াই এখন তাকে পারাপারের যাত্রী করে নিল – এ যেন এক অন্তহীন পারাপার, আনন্দ এবং বেদনা, আলো এবং অন্ধকার, মর্ত্য এবং অমর্ত্যকে দুইপারে রেখে তাঁর কবিতাও হয়ে উঠল অনন্ত সঞ্চরণশীল, বুদ্ধদেব বসু যেমন বলেছিলেন “এই দোলাচলের জন্যই কবিতাগুলি এত আনন্দঘন … কবির ‘সকল রসের ধারা’ এখানে এসে মিলে গেলো, কিন্তু একটি ধারাও অন্তর্হিত হ’লো না।”
তথ্যসূত্র:
১) ইংরেজি গীতাঞ্জলির ভূমিকা -W.B.Yeates
2) ফরাসি গীতাঞ্জলির ভূমিকা -André Gide
৩) রবিজীবনী: ৫ম এবং ৬ঠ খণ্ড প্রশান্ত কুমার পাল
৪)অন্য প্রমা : গীতাঞ্জলি শতবর্ষ স্মারক সংখ্যা,২০১০
৫) বুদ্ধদেব বসুর কবি রবীন্দ্রনাথ
৬) শঙ্খ ঘোষের গদ্য সংগ্ৰহ ,৬ঠ খণ্ড।
৭) রবীন্দ্রনাথ ও পাউন্ড্ : উজ্জ্বলকুমার মজুমদার, লা পয়েজি, জানুয়ারি -মার্চ-মে১৯৭৩ রবীন্দ্রনাথ ও এজরা পাউন্ড সংখ্যা।
৮) খেয়া এবং গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।