‘বই’ আবিষ্কারের পর সেই আদ্যিকাল থেকে এই ছোট্ট দু’বর্ণের শব্দটির মধ্যে লুকিয়ে থেকেছে পাঠক-হৃদয়ের যাবতীয় কৌতূহলের উদ্দীপনা, জ্ঞানস্পৃহা, ভালবাসার আবেগ, বৌদ্ধিক চর্চার উপকরণ। বই যেন এক গুপ্তধনের ভান্ডার, যা আবহমানকাল ধরে হাতছানি দিয়ে ডেকে চলেছে পাঠককে, ঝড় তুলে চলেছে উৎসুক মানুষের মনোবীণার তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে। মনের গভীরে বিষয়কে দ্রব করতে, মস্তিষ্কে ও মননে নিষিক্ত করতে, স্থায়িত্ব দিতে বইয়ের আজও কি কোনো বিকল্প আছে?
একালের বিশিষ্ট লেখক, চিন্তাবিদ এবং ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অকালপ্রয়াত অধ্যাপক ডঃ স্বপন চক্রবর্তী (১৯৫৪-২০২১) তাঁর ‘বইয়ের ভবিষ্যৎ’ প্রবন্ধের সূচীমুখে বলেছিলেন, “ধ্বংস ও ধ্বসের সামনে বই সবচেয়ে বড়ো প্রতিরোধ। বই আমাদের মৌলিক চিন্তাভাবনার শানিত অস্ত্র”।
যুগ বদলেছে। আমাদের যাপন প্রক্রিয়ার স্তরে স্তরে এখন বিজ্ঞানের অনুপ্রবেশ ও ব্যবহার। আধুনিক প্রযুক্তির সৌজন্যে মানুষ জ্ঞান আহরণ থেকে বিনোদনের সহজ ও বিকল্প পথ, যাকে আমরা ভার্চুয়াল বা অপ্রাকৃত পথ বলে অভিহিত করতে পারি, সেই পথের পথিক হয়েছে। তারা অনেকাংশে বইবিহীনও হয়েছে। আজকের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা বইয়ের সহায়তা ব্যতিরেকে বা যৎসামান্য বইয়ের সাহায্য নিয়ে আন্তর্জালিক মাধ্যম থেকে জ্ঞান আহরণ করে পরীক্ষার গন্ডী পেরোচ্ছে। প্রশ্ন জাগছে, তবে কি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বইবিহীন সমাজের ওপরেই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে? এই ভাবনা থেকে পাশ্চাত্যের সমাজ ও বিজ্ঞান সচেতন গবেষকরা কেই কেউ বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশও করছেন।
তবু বই ছিল, আছে এবং থাকবে বলেই আমাদের ধারণা। বৌদ্ধিক চর্চায় রসদ জোগানোর জন্য থাকবে। হালকা বিনোদনের স্রোতের বিপ্রতীপে দাঁড়ানো মানুষের জন্য থাকবে। মানব সভ্যতার ইতিহাসের ধারাভাষ্যকারের ভূমিকায় থাকবে। অতীতকে বুকে করে আগলে রাখার জন্যে থাকবে। পাঠককে কাগজ ও মুদ্রণের আঘ্রাণে আসক্ত করে পাঠে নিমগ্ন করে তোলার জন্যে থাকবে। লেখক ও পাঠকের মধ্যে সেতু-বন্ধনের জন্যে থাকবে। তাৎক্ষণিকতার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদে মুখর হয়ে চিরন্তন ধারার মতো থাকবে, মনকে অতলস্পর্শী গভীরতায় পৌঁছে দেবার জন্যে থাকবে।
পাশাপাশি আমাদের বিশ্বাস, নব নব প্রযুক্তির ব্যবহার বইয়ের জগতের সহায়ক শক্তি হবে। মুদ্রণ শিল্পে, বইয়ের সম্ভারের রক্ষণাবেক্ষণে, তথ্যের সহজলভ্যতায় প্রযুক্তির ব্যবহারে সমৃদ্ধ হবে বইয়ের জগৎ। বইয়ের ভুবনকে সে গ্রাস করবে না।
তাই এই প্রতিপাদ্যে আমরা উপনীত হতেই পারি, যেমন মেলা বই থাকবে, তেমনি বই-মেলাও থাকবে। ব্যক্তি থেকে সার্বজনীনতা, সমাজের সবটাকে নিয়ে, সবটুকুকে নিয়ে বইয়ের দুনিয়ার অস্তিত্ব, পক্ষবিস্তার ও বহমানতা।
এবার একটু চোখ রাখা যাক পৃথিবীর বইমেলার ইতিহাসের পাতায়।
বইয়ের ক্রয়-বিক্রয়ের শুরুটা হয়েছিল ১২শ শতাব্দীতে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে। এই বই কেনা-বেচা একটা সার্বজনীন রূপ পেল ১৪৬২ সালে। ওই বছর ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরেই অনুষ্ঠিত হল মুদ্রণ ও প্রকাশনার একটি মেলা, যেটিকে ইতিহাস প্রথম বইমেলার তকমা দিয়েছে। সুতরাং পৃথিবীতে বইমেলার সূচনার বয়স হোল কিঞ্চিদধিক ৫৬০ বছর।
ক্রমে ক্রমে ফ্রাঙ্কফুর্টে অনুষ্ঠিত মুদ্রণ ও প্রকাশনার মেলাটি পরিচিতি লাভ করল ইউরোপের বৃহত্তম ও প্রধান বই বাজার হিসেবে। ১৭শ শতকে পূর্ব জার্মানির স্যাক্সনি রাজ্যে অবস্থিত লিপজিগ বইমেলা ব্যাপ্তিতে ও ব্যবসায়িক সাফল্যে ফ্রাঙ্কফুর্টকে ছাড়িয়ে যায়। এর প্রায় দু’শতক পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা ফিরে পায় তার হৃতগৌরব।
ক্রমে ক্রমে পৃথিবীর দেশে দেশে বিস্তার ঘটেছে বইমেলার। ১৯শ শতকে গড়ে উঠেছিল উল্লেখযোগ্য কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলা এবং তেহরান আন্তর্জাতিক বইমেলা (১৯৬৯)। কলকাতার আন্তর্জাতিক বইমেলা (পূর্বনাম পুস্তকমেলা) শুরু হয় ১৯৭৬ সালের ৫ মার্চ তারিখ এবং তা আন্তর্জাতিক বইমেলার স্বীকৃতি অর্জন করে ১৯৮৪ সালে। কলকাতা বইমেলা বিশ্বের বৃহত্তম অবাণিজ্যিক বইমেলা। উল্লেখ্য, ফ্রাঙ্কফুর্ট বা লন্ডন বইমেলার মতো কলকাতা বইমেলায় গ্রন্থপ্রকাশনা, পরিবেশনা ও অনুবাদ সংক্রান্ত চুক্তি বা ব্যবসাবাণিজ্য চলে না। বরং এখানে প্রকাশক ও পুস্তকবিক্রেতারা সাধারণ মানুষের কাছে তাদের প্রকাশিত অথবা পরিবেশিত বইয়ের প্রচার ও বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে এই মেলায় যোগ দিয়ে থাকেন।
বৎসরান্তে বর্ণাঢ্য ও বৃহদায়তন বইমেলার আয়োজন যদি একটি শহরের জনসাধারণের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও বৌদ্ধিক চর্চার মাপকাঠি হয়, তাহলে স্বীকার করতেই হবে, কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ এই নিরিখে ভারতবর্ষের বহু রাজ্যকেই পেছনে ফেলে দিয়েছে।

কলকাতা বইমেলা ২০২৬, রবিচক্র-এর প্রথম মুদ্রিত বই, মেলায় প্রাপ্তিস্থান- পরম্পরা প্রকাশন, স্টল নম্বর ৩৫৫
বইমেলা বাঙালির সম্বৎসরের উৎসবের তালিকায় ঢুকে পড়েছে অনেককাল। সাধারণ বাঙালির বই পড়ার অভ্যাস ক্রমহ্রাসমান – এরকম একটা অভিযোগ প্রায়শই শোনা যায়। আমাদের চারপাশের অভিজ্ঞতাও সেই অভিযোগকেই কিছুটা মান্যতা দেয়। কিন্তু প্রতি বছর বহরে ও আয়তনে ক্রমবর্ধমান কলকাতা বইমেলা তার সাক্ষ্য বহন করে না। এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, যে সংখ্যায় মানুষ কলকাতা বইমেলায় অংশগ্রহণ করেন, মূল্যের বিচারে সামগ্রিক বই বিক্রি তার তুলনায় আশানুরূপ নয়।
পরিশেষে, ‘বই কেনা’ প্রবন্ধে সৈয়দ মুজতবা আলির একটি মন্তব্য দিয়ে আজকের সম্পাদকীয় নিবন্ধের পরিসমাপ্তি টানি। রসজ্ঞ পন্ডিতপ্রবর মুজতবা লিখেছেনঃ
”পৃথিবীর আর সব সভ্য জাত যতই চোখের সংখ্যা বাড়াতে ব্যস্ত, আমরা ততই আরব্য-উপন্যাসের এক-চোখ দৈত্যের মত ঘোৎ ঘোৎ করি আর চোখ বাড়াবার কথা তুললেই চোখ রাঙাই।
চোখ বাড়াবার পন্থাটা কি? প্রথমত-বই পড়া, এবং তার জন্য দরকার বই কেনার প্রবৃত্তি।
মনের চোখ ফোটানোর আরো একটা প্রয়োজন আছে। বারট্রান্ড রাসেল বলেছেন, ‘সংসারে জ্বালা-যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে, মনের ভিতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদকালে তার ভিতর ডুব দেওয়া। যে যত বেশি ভুবন সৃষ্টি করতে পারে, যন্ত্রণা এড়াবার ক্ষমতা তার ততই বেশি হয়।’
অর্থাৎ সাহিত্যে সান্ত্বনা না পেলে দর্শন, দর্শনে কুলিয়ে উঠতে না পারলে ইতিহাস, ইতিহাস হার মানলে ভূগোল—আরো কত কি।
কিন্তু প্রশ্ন, এই অসংখ্য ভুবন সৃষ্টি করি কি প্রকারে?
বই পড়ে। দেশ ভ্ৰমণ করে। কিন্তু দেশ ভ্ৰমণ করার মত সামৰ্থ্য এবং স্বাস্থ্য সকলের থাকে না, কাজেই শেষ পর্যন্ত বাকি থাকে বই।“


রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।
রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত
editor@robichakro.com
Bengali identity and consciousness

