যে প্রশ্নটা প্রায়শই আমাদের মনে ভাবনার উদ্রেক করে তা হল, দেশের রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও শিক্ষাব্যবস্থার সম্পর্কটা ঠিক কী রকম হওয়া কাঙ্খিত? আমরা জানি, এই দুটিই জাতির পক্ষে অপরিহার্য এবং আপাতদৃষ্টিতে ধারা দুটির চলন সমান্তরাল রেখার মতো হওয়াই কাম্য। কিন্তু অন্য দিক দিয়ে অস্বীকার করার উপায় নেই যে দেশের শিক্ষা পরিকাঠামো দেশের শাসনব্যবস্থার অঙ্গ। শিক্ষাব্যবস্থার আধার ও সহায়ক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শাসক। বলা বাহুল্য, দুটি ধারাই দেশ ও দশের জন্য অপরিহার্য। রাজনৈতিক কর্মকান্ড অপরিহার্য দেশ পরিচালনা, সামাজিক উন্নয়ন ও জনসেবার জন্য। অন্যদিকে শিক্ষাব্যবস্থা অপরিহার্য জাতি-গঠনে, যা সমাজকে পুষ্ট করে শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞানে সৃষ্টিশীল কর্মকান্ডের মাধ্যমে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের দুটি মিলিত রূপের সমন্বয় একটি সার্থক রাষ্ট্রের ভিত্তি ও চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। এই ব্যবস্থা পুঁথিগত বা দর্শনগত ভাবনার ফসল, যা যুগ যুগ ধরে ইতিহাসের বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থায় মান্যতা পেয়েছে।
এখন প্রশ্ন হল, তাহলে কি একটা স্বাধীন ও স্বশাসিত শিক্ষাব্যবস্থা রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্বাভাবিক নিয়মেই প্রতিষ্ঠিত হয়, যুক্তিগ্রাহ্য নিয়মেই যার পত্তন ও নিয়ন্ত্রণের ভার ন্যস্ত থাকে দেশের বিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ ও বিদগ্ধ পন্ডিত সমাজের ওপর? কিন্তু যতই যুক্তিসঙ্গত হোক না কেন, বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ঘটে না, কারণ, শিক্ষাব্যবস্থা সহ রাষ্ট্রের দায়িত্ব থাকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকারের নিয়ন্ত্রণে। তাই শিক্ষাব্যবস্থার স্বাধীন সত্তার বিকাশ ও পরিচালন ঘটাতে গেলে চাই রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শাসকের সদিচ্ছা, সংযম, উদারতা ও উদ্যম। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে এই উদারতা ও সংযম অবলম্বন করা খুব দুরূহ, কারণ শক্তির একটা নিজস্ব চরিত্র আছে, যা যে-কোনো ক্ষেত্রকে নিজস্ব ভাবনার ছাঁচে ঢালাই করে দেখতে চায়। এই ঔদ্ধত্যের প্রদর্শনে সে নিজেকে সর্বজ্ঞ বলে মনে করে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রবল প্রতাপান্বিত রাষ্ট্র বা তার প্রতিভূ প্রশাসন তাদের ধ্যান-ধারণা অনুযায়ী দেশের বা রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর স্থূল হস্তাবলেপন করে থাকে। গণতান্ত্রিক দুনিয়ার উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থায় ক্ষমতার এই অত্যুগ্র প্রভাব অনেকাংশে কম। কিন্তু সাম্যবাদী দুনিয়ার বজ্রকঠিন কাঠামো যেমন জন্ম দেয় একটি বিশেষ ছাঁচের শিক্ষাব্যবস্থার, তেমনি দুর্বল গণতন্ত্রিক ব্যবস্থায় সেটি হয়ে দাঁড়ায় শাসকের অবাধ চারণক্ষেত্র।
ভারতের মতো সুবৃহৎ গণতন্ত্রের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় রাষ্ট্রের অঙ্গুলিহেলন আমরা প্রায়শই প্রত্যক্ষ করি। ছাত্র-ছাত্রীরা কী পড়বে, আর কী তাদের দৃষ্টির বাইরে থাকবে সেই লক্ষণরেখা টেনে দেন বিদগ্ধ বিশেষজ্ঞজনেরা নন, স্বল্প বা অর্ধ-শিক্ষিত শাসক বা শাসকের প্রতিনিধিরা, যাঁরা স্থির করে দেন জাতির ইতিহাসের ধারা ও গতিপথ, নির্ধারণ করে দেন জাতির ইতিহাসে কে কতটা গুরুত্ব পাবেন বা পাবেন না। পাঠ্যক্রমে অধরা বা দূরবর্তী থাকে সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষজনের পৃথিবী। ফলতঃ অধীত বিদ্যার সঙ্গে তাঁদের একাত্মবোধ সম্ভব হয় না অধিকাংশ সময়েই।

Where is the light, where is the light!
এবার ভাবা যাক, আজ আমরা কী দেখছি ভারতবর্ষের একটি অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গে, যে রাজ্যটির সঙ্গে অনতি-অতীতে নিবিড় যোগ ছিল পঠন-পাঠনের? বুদ্ধির দীপ্তি ও মেধার বিচ্ছুরণে যে রাজ্যটি সমগ্র ভারতবর্ষে ছিল অগ্রগণ্য, কী দেখছি আমরা সেই রাজ্যটির শিক্ষার অঙ্গনে? পতনোন্মুখ এক জাতির শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে আজ অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত হয়ে গেছে নগ্ন দলীয় রাজনীতি এবং অবাধ সরকারী দুর্নীতি ও নৈরাজ্য। মন্ত্রী থেকে তাঁদের ভৈরব বাহিনী, নিয়ামক সংস্থা থেকে শিক্ষার কারবারিরা – সকলেই অনৈতিক অর্থ উপার্জনের মাধ্যম করেছেন রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থাকে, যার ফলশ্রুতিতে হাজার হাজার নিরপরাধ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন উন্মুক্ত রাজপথে। শিক্ষা-দুর্নীতির চাপিয়ে দেওয়া দায় মাথায় নিয়ে চাকরি হারিয়েছেন কাতারে কাতারে যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা। রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ শিক্ষা আধিকারিকদের দীর্ঘকালীন আবাসস্থল আজ কারাগারের অন্ধকার কুঠুরির ভূমিশয্যা। একদিকে সরকারি ভ্রান্ত নীতি এবং অন্যদিকে দুর্নীতি ও অবহেলায় আজ ধংসপ্রাপ্ত রাজ্যের বুনিয়াদি শিক্ষাব্যবস্থা। এই নৈরাজ্যের আবহে সংবাদ সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী গত এক দশকে বন্ধ হয়ে গেছে রাজ্যের ৮০০০-এর বেশি বুনিয়াদি বিদ্যালয় (গত দু’ দশকে প্রায় ২৪০০০)। সরকারি বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় আজ আক্রান্ত ও কবলিত রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতার নাগপাশবন্ধনে।
এই পরিস্থিতিতে যাঁদের কাছ থেকে একটা কার্যকরী ভূমিকা কাঙ্খিত ছিল, পশ্চিমবঙ্গের সেই বিদ্বৎসমাজ আজ অবিশ্বাস্যভাবে নীরব ও শীতল। ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ, শাসকের অত্যাচারের ভয় ও ব্যক্তিগত লোভ বাসা বেঁধেছে তাঁদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সামনে কোনো ছিদ্রপথেও আশার আলো দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। যে দিকে চোখ মেলা যায়, সর্বত্রই যেন এক আদিগন্ত হতাশা।
দুর্নীতিগ্রস্ত এক প্রশাসন অজগর সাপের মতো গ্রাস করে চলেছে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থাকে। প্রশাসন ও শিক্ষা পরিকাঠামোর কাঙ্খিত দু’টি সমান্তরাল ধারার অস্তিত্ব ও পবিত্রতা রক্ষা দূরের কথা, দুর্নীতির কালসমুদ্রে একভূতে যেন লীন তাদের দ্বৈত সত্তা। আজ আমাদের মনে রবীন্দ্রনাথের বাণীর হাহারব ধ্বনিত হয়ে চলেছে –
“কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো!
বিরহানলে জ্বালো রে তারে জ্বালো।
রয়েছে দীপ না আছে শিখা,
এই কি ভালে ছিল রে লিখা–
ইহার চেয়ে মরণ সে যে ভালো।“
Light it up in the separation, light it up. There is no lamp, no flame, Was this the writing that was good–Death is better than this.
[crime against woman]


রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।
রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত
editor@robichakro.com


যথাযথ সম্পাদকীয়। এ আমাদের সকলের মনের কথা। খুব অসহায় লাগে।