সম্প্রতি বাঙালির জাতিসত্তা ও বাঙালি অস্মিতা শব্দবন্ধদুটি প্রায়শই উঠে আসছে সংবাদের শিরোনামে। বলা বাহুল্য, কারণটা মূলত রাজনৈতিক। বর্তমান সময়ে বাঙালির জাতিগত সফলতা-অসফলতা ও সুনাম-দুর্নামকে সামনে রেখে ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা।
এই প্রসঙ্গে বিশেষত দুটি প্রশ্ন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। প্রথমত, জাতিসত্তা ও অস্মিতা কি? দ্বিতীয়ত, আজকের সময়ে এই শব্দ দুটি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর কাছে বাঙালিকে কতটা দীপ্তিময় করছে বা কতটা সম্মানের আসনে তাকে প্রতিষ্ঠিত রেখেছে?
কোনো জাতি যখন আত্মপরিচয়ের গরিমা অর্জন করে এবং সেটি বৃহত্তর জনমানসে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই একটি জাতিসত্তা গড়ে ওঠে। এই আত্মপরিচয়ের নির্মাণ একটা দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়া, যার পেছনে থাকে ভাষা ও সংস্কৃতি গড়ে তোলার ধারাবাহিক অনুশীলন, শেকড়ের অনুসন্ধান ও সেই জাতির মধ্যে আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার আকুলতা। যে কোন জাতিসত্তা গঠনে ভাষা ও সংস্কৃতির অবদান সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভাষার মধ্যে দিয়ে একটা জাতির প্রতিষ্ঠা এবং ভাষাই সংস্কৃতির বাহন ও ভিত্তিভূমি।
এই বিকশিত জাতিসত্তা জাতির অন্তর্গত সচেতন জনগোষ্ঠীকে গর্বিত করে। অন্যদিকে আত্মপরিচয়ের এই গরিমাবোধ জন্ম দেয় জাতির অস্মিতার, যা তাদের আত্মপরিচয়ের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।
এবার ফেরা যাক বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির দিকে তার ঐতিহাসিক পটভূমির প্রেক্ষাপটে। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে আমরা দেখতে পাই, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি পৃথিবীর বহু ভাষা ও সংস্কৃতির থেকে তুলনামূলকভাবে নবীন। তার বিকাশের শুরু দশম শতাব্দী থেকে। অর্থাৎ, এই ভাষার বয়স প্রায় এগারো শ’ বছরের সময়কাল। এর মধ্যেই পর্বে পর্বে তার নির্মাণ-বিনির্মাণ, উত্থান-পতন, উন্নতি-অবনতি। এই সময়কালের মধ্যেই বাঙালি জাতিসত্তার গড়ে ওঠা ও পরিচিতি। তার সংগ্রাম, গৌরব অর্জন ও প্রসার। বলা বাহুল্য, এই জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে বহু উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের প্রতিভার হিরন্ময় স্পর্শ ও নিরলস প্রয়াস।
প্রকৃতপক্ষে শ্রী চৈতন্যের আবির্ভাব-পূর্ববর্তী সময়ে বৈষ্ণব পদাবলীর প্রভাবে মৈথিলি ও তদানীন্তন বাংলার মিশ্রণে জন্ম নিয়েছিল এক নতুন ভাষা ‘ব্রজবুলি’ । এটি একটি কৃত্রিম বা সাহিত্যের ভাষা, যা মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে ব্যবহৃত হতো। মিথিলার কবি বিদ্যাপতি এই ভাষার উদ্ভাবক। এই ব্রজবুলি ভাষাতেই আধুনিক সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’। ষোড়শ শতকে চৈতন্যদেবের আবির্ভাব গোটা বঙ্গসমাজ ও জাতিকে নতুন করে উদ্দীপ্ত করে তোলে। সাহিত্য, শিল্প, দর্শন সর্বত্র এক নতুন যুগের সূচনা হয়, যদিও ইতিহাসের নানান টানাপোড়েনে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠেনি।
এর প্রায় দু’শতক পরে বৃটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা ও সভ্যতার যে আলো বাংলায় এসে পড়ল, তাতে বাঙালির সামগ্রিক জাতীয় জীবনে ঘটল সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন। উনিশ শতকের বাঙালি জাতির এই সর্বাত্মক জাগরণ উনিশ শতকীয় রেনেসাঁ নামে পরিচিত। এই নবজাগরণের প্রথম পুরোহিত রাজা রামমোহন রায়। এরপর একে একে এলেন বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, শ্রীরামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, জগদীশচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, চিত্তরঞ্জন, সুভাষচন্দ্র, নজরুল প্রমুখ দিকপালেরা। একের পর এক কালজয়ী নক্ষত্রের দীপ্তিতে বাংলার আকাশ তখন আলোকিত। এঁদের প্রতিভার স্পর্শে বাংলার সাহিত্য, শিল্প, রাজনীতি, দর্শন, বিজ্ঞান, সামাজিক বিকাশের প্রতিটি ক্ষেত্র পত্রে পুষ্পে পল্লবিত হয়ে উঠল। এক আশ্চর্য সময়ের স্রোত বইতে লাগল বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতির কাঠামো নির্মাণে। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের এই গৌরবজ্জ্বল প্রক্রিয়া কম-বেশি অব্যাহত ছিল স্বাধীনতা-পূর্ব সময় পর্যন্ত।

এলো স্বাধীনতা, দেশবিভাগের মর্মান্তিক অধ্যায়কে সঙ্গী করে। বৃটিশ শক্তির দ্বারা সৃষ্ট বিভেদ ও বিদ্বেষের বীজ মহীরূহে পরিণত হয়ে ভারতকে করল দ্বিখণ্ডিত। অবিভক্ত বাংলায় উপর্যুপরি মন্বন্তর ও জাতিদাঙ্গার পর কাতারে কাতারে পূর্ব সীমান্ত পেরোনো বাঙালি জীবনে নেমে এল দুর্যোগের করাল বিভীষিকা। বাঙালি জীবন, সমাজ ও অর্থনীতি হল বিপর্যস্ত। এমতাবস্থায় বাঙালির সৃষ্টিশীল জীবনপ্রবাহ স্তিমিত হয়ে পড়লেও বিগত প্রায় অর্ধ শতাধিক বছরের সৃষ্টিশীলতার রেশ অব্যাহত ছিল আরও প্রায় দু’ দশক, যার পর বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে ঘনিয়ে এলো এক নিঃসীম অন্ধকার। ইতিউতি দুটি-একটি দীপশিখা দেখা গেলেও রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয়ে জীর্ণ বাঙালি জীবন ধীরে ধীরে প্রথমে অবনমিত, পরে প্রায় সর্বস্বান্ত হোল।
আজ সেই ধারা ক্রমবর্ধমান। নীতি ও মূল্যবোধহীন তার ভাবনার পৃথিবী, নেতা ও পরিচালকহীন তার রাজনীতির জগৎ, দ্রষ্টাহীন তার সমাজ। হিংসা ও দুর্নীতি কবলিত তার নির্বাচন ব্যবস্থা। দিশাহীন তার ভবিষ্যৎ।
বাঙালির সৃষ্টিশীলতার জগতে আজ বড়োই মধ্যমেধার আস্ফালন।
এই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে ফেলে আসা উজ্জ্বল অতীতের স্মৃতিরোমন্থনের মাধ্যমে বর্তমান বাঙালির জাতিসত্তা ও অস্মিতার বাগাড়ম্বর যেন ঢক্কানিনাদে পরিণত, যা শুধু হৃদয়বিদারক নয়, হাস্যকরও বটে।
এখন থেকে প্রতি মাসের ১৫ তারিখে পত্রিকা প্রকাশিত হবে
Bengali identity and consciousness


রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।
রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত
editor@robichakro.com


Aro Valo hoto lanthty hola