“অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ–পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই, প্রীতি নেই, করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
– জীবনানন্দ
কবি তাঁর সময়কালের পৃথিবীর এক জ্বলন্ত সত্যের মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করিয়েছিলেন, যে সত্য আজও বহমান। একথা সর্বজনবিদিত যে মানব সভ্যতার উন্মেষ থেকেইযুদ্ধ মানুষের নিত্যসঙ্গী।সভ্যতার সেই ঊষাকালে মানুষের সংসারজীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রগঠনের ভাবনা ছিল সুদূরপরাহত। বহুকোটি বছরের ঘাত-প্রতিঘাত ও অভিজ্ঞতার কষ্টিপাথরে যাচাই হতে হতে পরিবর্তন ও পরিমার্জনে বিকশিত হয়ে উঠেছিল সভ্যতা। সেই আদিকালে মনুষ্য প্রজাতির মধ্যে প্রাথমিক স্বার্থের সংঘাতের শুরু জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক চাহিদাগুলি, অর্থাৎ ক্ষুণ্ণিবৃত্তি নিবারণ, বাসস্থানের ব্যবস্থা ও নারীর ওপর অধিকারবোধকে কেন্দ্র করে। কালের বিবর্তনে ক্রমশ মানুষের সম্পদের লোভ ও চাহিদা যত প্রসারিত হয়েছে, একে অপরের ওপর, একটি জনগোষ্ঠীর আর একটি জনগোষ্ঠীর ওপর, একটি রাষ্ট্রের আর একটি রাষ্ট্রের ওপর প্রভুত্ব বিস্তারের বাসনা জেগেছে, ততই সংঘাত থেকে সংঘর্ষ, সংঘর্ষ থেকে যুদ্ধবিগ্রহ শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে মানবেতিহাসের অনতিক্রম্য এক বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রমবিকাশের দীর্ঘ ইতিহাসে সশস্ত্র সংঘাতের মাধ্যম রূপ বদলেছে প্রস্তরখন্ড থেকে পারমানবিক ও রাসায়নিক অস্ত্র এবং সাম্প্রতিকতম কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালিত ক্ষেপনাস্ত্রে। স্মরণাতীত কাল থেকে ইতিহাস জুড়ে অসংখ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। আমরা জানি যে যুদ্ধের ইতিহাস মানে অন্ধকারের ইতিহাস, মৃত্যুমিছিলের ইতিহাস, ধ্বংসের ইতিহাস। যুদ্ধ এমন একটি সংঘটনা, যা সীমানা এবং সংস্কৃতি অতিক্রম করে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি জাতি এবং মানুষের কাছে দুঃখজনক অভিজ্ঞতা। ইতিহাস-সচেতন মানুষ মাত্রেই জানেন যে যুদ্ধ মানেই ধ্বংস, যুদ্ধ মানেই মৃত্যু এবং এই মৃত্যুর অধিকাংশই নিরাপরাধ মানুষের। তাই শান্তিকামী পরিণামদর্শী মানুষ যুদ্ধকে কোনোদিনই সমস্যা সমাধানের উপায় বলে মনে করেন না, তাকে আহবান জানান না।
তবু যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক ফলাফলের ভয়ংকরতা ও সত্যতা জেনেও কেন মানুষের মনে জাগে যূদ্ধের স্পৃহা ও উন্মাদনা? বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক ও পন্ডিতপ্রবর এরিস্টটল বলেছিলেনঃ “শান্তিতে বসবাস করার জন্যেই আমরা যুদ্ধে লিপ্ত হই।“ – বলা বাহুল্য, এটি যুদ্ধের যথার্থতার একটি সত্য হলেও যুদ্ধের স্বপক্ষে বলা কোনো কথন নয়। অন্যদিকে মানব ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত যুদ্ধবাজ অ্যাডলফ হিটলারের উক্তিতে আমরা পাইঃ “একজন খ্রিস্টান হিসেবে প্রতারিত হওয়া আমার কর্তব্য নয়, কর্তব্য হলো সত্য এবং ন্যায়ের জন্য যুদ্ধ করা।” – এখন প্রশ্ন হল, এই সত্য ও ন্যায়ের ব্যাখ্যা আমরা কার কাছ থেকে শুনব? একজন আগ্রাসী স্বৈরতন্ত্রী ও যুদ্ধপ্রিয় মানুষের কাছ থেকে? এর সমতুল্য কোনো উক্তি কোনো মহান খৃষ্টান ধর্মযাজক বা মাদার টেরিজার মতো ধর্মপ্রাণা সমাজসেবীর কাছে অবাস্তব শুধু নয়, কল্পনাতীত। অথচ, সত্য ও ন্যায়ের এই অপব্যাখ্যাকে মূলধন করে পৃথিবীতে অসংখ্য যুদ্ধের দামামা বেজে চলেছে। কোটি কোটি নিরীহ মানুষের প্রাণ চলে যাচ্ছে। কত কত ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিনষ্ট হয়ে মানব ইতিহাস ও সভ্যতার অপূরণীয় ক্ষতিসাধন হয়ে চলেছে।
আজকের পৃথিবী ও সভ্যতা প্রযুক্তির দ্রুতগামী রথে চড়ে ছুটে চলেছে। বিগত প্রজন্মগুলি তাঁদের জীবৎকালে সভ্যতার যে অগ্রগামিতা দেখে গেছেন, আমাদের প্রজন্ম দেখে যাচ্ছে তার থেকে অনেক গুণ বেশি। পৃথিবীর সময় ও দূরত্ব এখন ক্রমহ্রাসমান। সিকি শতাব্দীর ব্যবধানে দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা মানব সভ্যতার যা হরণ করেছে, তার থেকে আমরা সত্যিই কি কিছু আহরণ করতে পেরেছি? মনে তো হয়না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন মানুষের যুদ্ধের ইচ্ছার প্রশমন তো ঘটাতে পারেইনি, বরং যুদ্ধের প্রকরণ বদলে মানুষের জীবন ও সভ্যতার বৃহত্তর ক্ষতিসাধনের কারণ হয়েছে।
রাজতন্ত্র থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, সেই আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত চিরকালই রাজা-রাজড়া, দেশ-পরিচালক বা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ক্ষমতালিপ্সা, প্রতিস্পর্ধা, ঔপনিবেশিক ও ধর্মীয় সম্প্রসারণবাদ যুদ্ধকে তাঁদের ইচ্ছাপূরণের হাতিয়ার করেছেন। ফলাফলস্বরূপ এর জন্য চরম মূল্য দিয়েছেন নিরীহ সাধারণ মানুষ।
পাশাপাশি, যুদ্ধের বিপক্ষে দাঁড়িয়েও পরিস্থিতির ঘোর বাস্তবতা আমাদের স্বীকার করতে বাধ্য করে যে, কোনো দুর্দমনীয় ও উচ্ছৃঙ্খল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অদম্য শত্রুতার বিরুদ্ধে যুদ্ধই শেষ পর্যন্ত একটি শান্তিকামী রাষ্ট্রেরও অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায় এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে জড়িয়ে পড়তে হয় একটি অনাকাঙ্খিত যুদ্ধের আবর্তে। এই সত্যকে আমরা অস্বীকার করতে পারিনা। স্বাধীনোত্তর সময় থেকে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত বহুবার ভারতবর্ষের ইতিহাস সেই সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বহু মহামানবের স্বপ্নলালিত শান্তির ললিত বাণীকে বারবার ব্যর্থ পরিহাস করে দিয়ে আজ পর্যন্ত মানব সভ্যতা সংঘাত বা যুদ্ধ থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পায়নি। এই দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ পরিকীর্ণ পৃথিবীতে কোটি কোটি বছর ধরে যুদ্ধের জন্য যতটা শক্তি, সম্পদ ও প্রাণের অপব্যয় হয়েছে, সে তুলনায় শান্তির জন্য উদ্যম নগন্য বললেও বোধহয় অত্যুক্তি করা হয়। যিশুখৃষ্ট, গৌতম বুদ্ধ, শ্রীচৈতন্য, টলস্টয়, গান্ধী, রবীন্দ্রনাথেরা শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে জনমানসে বিপুল আলোড়ন তুললেও আজকের ব্যবহারিক পৃথিবীর বুকে তাঁরা ভিন্ন গ্রহের মানুষই থেকে গেছেন। আজও তাঁরা ঈশ্বরপ্রতিমরূপে পূজিত, কিন্তু নিজেদের জগতে যেন বড় নিঃসঙ্গ এই মানুষগুলি।



রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।
রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত
editor@robichakro.com
Bengali identity and consciousness

