শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

হাসির সাতকাহন ও বাঙালি

মানুষের অভিব্যক্তির সর্বোত্তম প্রকাশ হাসিতে। প্রফুল্লতা, আনন্দ, উচ্ছ্বাস হইতে শুরু করিয়া বেদনা, যন্ত্রণা, দুঃখ পর্যন্ত নানা আঙ্গিকের হাসির রকমফেরে আবেগের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র প্রাণী যে হাসিতে জানে, হাসিকে মূলধন করিয়া বন্ধুত্বের বন্ধনীতে বাঁধা পড়ে। হাসির স্বপক্ষে সর্বাপেক্ষা বড় যুক্তি বোধহয় ইহাই যে হাসির আবেদন সার্বজনীন, দেশ-কাল, এমনকি ভাষা-নিরপেক্ষ। দেশ ও সংস্কৃতি নির্বিশেষে হাসির অর্থ বুঝাইতে কোনো দোভাষীর সাহায্য নিষ্প্রয়োজন।


হাসির উৎস-সন্ধান করিলে দেখা যায়, ইহার প্রকারভেদ মূলত দুটিঃ মানসিক প্রফুল্লতা ও কৌতুক। দুটির মধ্যে কৌতুকের বৈচিত্র্য নেহাত কম নহে। রঙ্গ-ব্যঙ্গ, ঠাট্টা-তামাসা, রসিকতা, পরিহাস, বিদ্রুপ ইত্যাদি কৌতুকের শ্রেণীভুক্ত। ইংরাজি ভাষার নিদানে হাসির উৎসস্থলের একাধিক নাম, সূক্ষাতিসূক্ষ তাহাদের ভেদাভেদ। কোনোটি Fun, কোনোটি Humour, কোনোটি Satire, কোনোটি বা Wit।


মনের অভিব্যক্তি হিসাবে মুখে ফুটিয়া ওঠা হাসি একজন মানুষের সুখী ও সফল জীবনের পরিচায়ক এবং মানসিক প্রফুল্লতার প্রতীক। তেমনি মানসিক চাপ কমাইয়া আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি – তাহাও জোগান দেয় ঐ হাসি। সহজে মানুষের আপন হইয়া উঠার মন্ত্র হইল হাসি। অন্যদিকে মানুষের স্বাভাবিক আচরণ হইতে সে যখন বিচ্যূত হইয়া থাকে, তাহার অবচেতনে বা নির্বুদ্ধিতায়, সৃষ্টি হয় অসঙ্গতির, যাহা কৌতুকের অন্যতম উপাদান। হাসির গল্পের লেখকদের তাই পাঠকের হৃদয় ও মস্তিষ্ককে রসসিক্ত করিবার অন্যতম অবলম্বন চরিত্রের অসঙ্গতি।


প্রভাতে পার্কের মধ্যে একসঙ্গে ব্যায়াম করা লোকদের সমবেতভাবে উচ্চৈঃস্বরে হাসিতে দেখা যায়, যে দৃশ্যও বাহিরের জগতের মানুষের কাছে হাসির খোরাক হইয়া উঠে এক প্রকারের অসঙ্গতি হিসাবে। অথচ এই হাসি চমৎকার এক ব্যায়াম। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, হাসিতে মুখের ৫ হইতে ৫৩ ধরনের পেশি সঞ্চালিত হইয়া থাকে; নিঃসৃত হয় এন্ডোরফিন (endorphins)। ইহাতে হৃদযন্ত্র স্থিতিশীল থাকে, শরীর শিথিল হয়, রক্তচাপ কমিয়া যায়। হাসিলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে; মন ভাল থাকার পাশাপাশি আয়ুও বাড়ে। সুতরাং, ভ্রু কুঁচকাইয়া মুখ গোমড়া করিয়া সুকুমার-কথিত রামগড়ুরের ছানার মতো জীবন না কাটানোই ভাল।


হাসি লইয়া কবি-সাহিত্যিক, বিদ্বজ্জনেরাও কম লিখিয়া যান নাই। শান্তিতে নোবেলজয়ী ক্যাথলিক সন্ন্যাসী এবং দরিদ্র-অসহায় মানুষের নিঃস্বার্থ সেবার জন্য পরিচিত মাদার টেরেসা বলিয়া গিয়াছেন, ‘শান্তির শুরু হয় হাসি হইতে। একটি হাসি দিয়া যে কত কী করা সম্ভব, তাহা আমরা ভাবিতেও পারি না।’


মানুষের মন জয় করিবার কত সহজসাধ্য একটি হাতিয়ার এই হাসি। মুখে হাসি রাখিতে কোনো অর্থ খরচ করিতে হয় না। এই প্রসঙ্গে ঔপন্যাসিক টম উইলসন বলিয়াছেন, ‘হাসির সুখ আপনি নাকের গোড়াতেই খুঁজিয়া পাইবেন।’ মার্কিন সঙ্গীতশিল্পী স্টিভ ওয়ান্ডারের বিশ্বাস, ‘হাস্যোজ্জ্বল মুখ একটি নক্ষত্রের মতো।’ আর মার্কিন অভিনেত্রী ফিলিস ডিলারের কথায় ‘হাসি একটি বক্ররেখা, যাহা সবকিছুকে সরল করিয়া দেয়।’


হাসিকে হাতিয়ার করিয়া মানুষকে আনন্দ দিয়াছেন, জীবনভর মানুষের জীবনযন্ত্রণা ও শাসকের নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মূর্ত প্রতীক বিশ্বখ্যাত অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন। তিনি বলিয়াছেন – “The most lost day in life is the day we don’t laugh.”। চার্লি বলেছেন – “You will find that life is still worthwhile, if you just smile.”। হাসি তাই এমন এক অভিব্যক্তি যাহা জীবনকে মহিমান্বিত করে।


রবীন্দ্রনাথের কথায়, “জীবনটাকে কেঁদে ভাসিয়ে দেবার থেকে হেসে উড়িয়ে দেওয়া অনেক ভাল।“ এ’ ব্যাপারে কবির নিজের জীবনই বোধহয় সর্বোত্তম উদাহরণ। আর জীবনের আনাচে-কানাচে হরেক রকমের হাসির অবিকল্প সন্ধানী সুকুমার রায় অজানা হাসি, অকারণ হাসিকেও তুচ্ছ জ্ঞান করিতে নারাজ। তিনি লিখিয়াছেনঃ
“হাসতে হাসতে আসছে দাদা আসছি আমি আসছে ভাই,
হাসছি কেন কেউ জানে না, পাচ্ছে হাসি হাসছি তাই ৷
ভাবছি মনে, হাসছি কেন ? থাকব হাসি ত্যাগ ক’রে,
ভাবতে গিয়ে ফিকফিকিয়ে ফেলছি হেসে ফ্যাক ক’রে ৷
পাচ্ছে হাসি চাইতে গিয়ে, পাচ্ছে হাসি চোখ বুজে,
পাচ্ছে হাসি চিম্টি কেটে নাকের ভিতর নোখ গুঁজে ৷”
– (আহ্লাদী / আবোল তাবোল)

সুকুমার বর্ণিত হাসির এ’হেন ফিরিস্তি পড়িয়া তাঁহারই জবানিতে হাসি যে ভসভসিয়ে সোডার মতন পেট হইতে বাহির হইবে, ইহাতে আর আশ্চর্য কি?

কিন্তু এ’ যুগের বাঙালিকে দেখিয়া-শুনিয়া মনে হয় যে চলচ্চিত্র, সাহিত্য, সঙ্গীত হইতে সংসার ও সমাজজীবনে হাসির যেন বর্তমানে বড় আকাল চলিতেছে। গড় জনগণ বলিবে, ‘কেন? আমরা তো দিব্যি রসেবশে হাসি-গান-মোচ্ছবের ফূর্তিতে আর রাজা-গজার অনুগ্রহের অনুপ্রেরণার মৌতাতে কাল কাটাইতেছি। দেদার হাসিতেছি, গাহিতেছি, নাচিতেছি। ঘাটতি কোথায় মহাশয়?’‘


আমরা মাথা চুলকাইয়া কিঞ্চিৎ ইতস্তত করিয়া বলিব, ‘আজ্ঞে, মোটাসোটা হাসির কথা এই হিসেবের বাহিরে থাক। সে তো চিরকালই বলশালী, মোটা বুদ্ধির মানুষের হাসিয়া কুটোপাটি হইবার অবলম্বন। কিন্তু সূক্ষ্ম রসের বুদ্ধির গোড়ায় সুড়সুড়ি দেওয়া হাসির জোগান? ওই ইংরেজরা যাহাকে বলে Wit কিম্বা Humour?– এ’কালে বাঙালি সমাজে কোথায় সেই গোত্রের হাসির উপকরণ? সে তো প্রায় অবলুপ্ত হইতে বসিয়াছে। সেই কুশলতা বোধহয় শেষ দেখাইয়া গিয়াছিলেন গড়পাড়ের মানিক বাবু।


বাংলা সাহিত্যে হাসির কারবারিদের ধারাবাহিক রমরমা নেহাত কম দেখা যায় নাই। কবি ঈশ্বর গুপ্ত, ভারতচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন, বিদ্যাসাগর হইতে দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, তস্য ভ্রাতা রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায়, প্রমথ চৌধুরী, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়, রাজশেখর বসু, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা আলি, শিবরাম চক্রবর্তী থেকে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় – হাসির লেখকদের যে বর্ণময় মিছিল বাংলা সাহিত্য দেখিয়াছে, ভারতবর্ষের কোনো ভাষার সেই সৌভাগ্য হইয়াছে বলিয়া আমাদের জানা নাই। অথচ আজকের বাংলাসাহিত্য আজ বোধহয় হাস্য়রসের ঘরের চাবিটাই হারাইয়া বসিয়া আছে।


বাংলার রঙ্গমঞ্চ হইতে চলচ্চিত্রেও সেই একই সমৃদ্ধি দেখিয়াছেন বাঙালি দর্শকমন্ডলী। সামান্য আগে-পরে বা একই সঙ্গে মঞ্চ ও পর্দা কাঁপাইয়াছিলেন নৃপতি চট্টোপাধ্যায়, তুলসী চক্রবর্তী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, রবি ঘোষ, চিন্ময় রায়, তরুণকুমার, অনুপ কুমার, সন্তোষ দত্ত – মনে করিয়া একটিবার দেখুন, এই নবরত্নসভার বাহিরে থাকা ‘কমেডিয়ান’ উৎপল দত্ত ও উত্তমকুমারকেও ভোলা অসম্ভব বোধ হইবে। যেমন ভোলা অসম্ভব হইবে রাজলক্ষ্মী দেবী, মলিনা দেবী, ছায়া দেবী, গীতা দে’র মতো প্রমীলা অভিনেত্রীদেরও। রসরাজ ও রানিদের এমন মহাসম্মেলন কবে কোথায় ঘটিয়াছে? আজ মঞ্চ ও পর্দা – দুটিতেই যেন স্থূলতার মালিন্য।


এক সময় হাসির গান বাংলা গানের একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাইয়াছিল। গত শতাব্দীতে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, কাজী নজরুল ইসলাম, রজনীকান্ত সেন, শরৎচন্দ্র পন্ডিত (দাদাঠাকুর) তাঁহাদের হাসির গানে আসর জমাইতেন। তৎপরবর্তীতে রামকুমার চট্টোপাধ্যায় বিবিধ হাসির গানে বাঙালিকে মাতোয়ারা করিয়া গিয়াছিলেন। আজ বাঙালির নিজস্ব হাসির গান পাঁচমিশালি চটুল গান নামক গোলযোগের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করিয়াছে। কোথায়ই বা হারাইয়া গেল বাংলা প্যারোডি গানের মজার দুনিয়া?
আক্ষরিক অর্থেই সর্বহারা আজকের বাঙালি কি তবে সূক্ষ, নির্মল বা দম-ফাটা হাসির দুনিয়ার ঠিকানাটাও হারাইয়া ফেলিল? রাজনীতির কুনাট্যরঙ্গের নির্বোধ ভাঁড়ামির ধারাবাহিক প্রদর্শনীই তাহাদের হাস্যরসের মূল জোগানদার হিসাবে অদূর ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠা পাইবে?

[ছবি ও তথ্যঋণ – আন্তর্জাল]

(পুনশ্চঃ সমসাময়িক কালে বহুল প্রচলিত চলিত ভাষার পরিবর্তে এই সংখ্যার সম্পাদকীয়টি বর্তমানে প্রায় পরিত্যাজ্য সাধু ভাষায় রচিত হইল, যাহার অনুসরন রবিচক্রের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা নীতি অনুসারে ঘটে নাই এবং ইহা নিতান্তই পরীক্ষামূলক। যদিও বাংলা সাধু ভাষার সৌন্দর্য্য অনস্বীকার্য, তথাপি ভবিষ্যতের সম্পাদকীয়গুলিতে পুনরায় চলিত ভাষায় প্রত্যাবর্তন সম্পাদকীয় লেখকের ভাবনা ও বিষয়বস্তুর উপর নির্ভরশীল। বিষয়টিতে পাঠকদের মতামত স্বাগত।)  

রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।

রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত

editor@robichakro.com

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x