শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

মানব সভ্যতায় বেগ ও আবেগ

বিগত শতকের চারের দশকে দিল্লির ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক পটভূমিতে লেখা সাড়া জাগানো গ্রন্থ ‘দৃষ্টিপাত’-এ ‘যাযাবর’ ছদ্মনামের আড়ালে খ্যাতিমান সাংবাদিক-সাহিত্যিক বিনয় মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন – “আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ। তাতে আছে গতির আনন্দ, নেই যতির আয়েস।”

মন্তব্যটি বিগত আট দশক ধরে সাহিত্য-পিপাসু বাঙালির মনের মণিকোঠায় আজও সজীব, যা আলাপে আলোচনায় প্রবন্ধে নিবন্ধে অতি ব্যবহারেও জীর্ণ হয়ে যায়নি। বোঝা যায়, শিক্ষিত বাঙালি পাঠক হৃদয় ও মস্তিষ্ক দিয়ে চেতনে-অবচেতনে উক্তিটির যাথার্থ্যে আস্থা রেখেছে।

বেগ ও আবেগ – শব্দ দুটির যে ধ্বনি-ঝংকার বা অনুপ্রাস, তা বাঙালির কর্ণকুহরে শ্রুতিমধুর। দুটির আভিধানিক অর্থে চোখ রাখলে আমরা দেখতে পাই, বেগ হল কোনো বস্তুর গতির একটি বৈশিষ্ট্য, যা ভর ও বেগের গুণফলের সমান। অন্যদিকে আবেগ হল কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতির প্রতি মানুষের প্রতিক্রিয়া, যার উৎসারণ মনের গহন থেকে। যুক্তি-তর্কের ধার সে বড় একটা ধারে না।

এখন প্রশ্ন হল, “কেড়ে নিয়েছে আবেগ” – যাযাবরের এই শব্দবন্ধের মধ্যে আমরা যা পাই, তা কি শুধু সাহিত্যের ব্যঞ্জনা? নাকি, এর মধ্যে ধরা পড়েছে আবেগের সপক্ষে লেখকের কিঞ্চিৎ পক্ষপাত?

বাঙালি আবেগপ্রবণ জাতি। কোনোকালেই কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকের অভাব ঘটেনি বাংলাদেশে। তাঁরা বাঙালি মননকে লালন করেছেন, জারিত করেছেন, প্রভাবিত করেছেন অক্লেশে। তাই বাঙালির প্রাণের কবি বলতে পেরেছিলেন – “সেদিন যেন কৃপা আমায় করেন ভগবান– / মেশিন-গানের সম্মুখে গাই জুঁই ফুলের এই গান।” চাঁদের সৌন্দর্যে বিভোর কবি লিখলেন – “আজ শুক্লা একাদশী, হেরো নিদ্রাহারা শশী / ওই স্বপ্নপারাবারের খেয়া একলা চালায় বসি।“ – এমন চিত্রকল্প তো মনের ক্যানভাসে কবি আবেগের তুলিতেই এঁকেছিলেন, বিজ্ঞানীর দৃষ্টি তার সন্ধান পায় না।

অন্যদিকে রবীন্দ্র-পরবর্তী সময়ের আধুনিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় আবেগতাড়িত প্রবল আত্মবিশ্বাসে বলতে পেরেছিলেন, “ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত”। রবীন্দ্রনাথের রোম্যান্টিক পেলবতার ভিন্ন মেরুতে ভিন্ন আঙ্গিকের আবেগ নিয়ে সুকান্ত ভট্টাচার্য্য বলে উঠেছিলেন – “পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।“

সাহিত্যের অঙ্গনে এ’ হেন উদাহরণ অযুত নিযুত।

একই প্রসঙ্গে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের আর একটি উক্তি মনে পড়ছে। বিগত শতকের ছ’য়ের দশকের শেষভাগে, তারিখটা ছিল ১৯৬৯ সালের ১৭ জুলাই, সমগ্র পৃথিবী যখন বিমুগ্ধ বিস্ময়ে আলোড়িত, উচ্ছ্বসিত নীল আর্মস্ট্রং-এর প্রথম চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণের চমকপ্রদ সংবাদে, তারই মাঝে কিঞ্চিৎ অন্য সুর শোনা গিয়েছিল কবির গলায়। কিছুটা মজা করেই তিনি বলেছিলেন – মানুষের চন্দ্র বিজয়ের খবর আনন্দের, কিন্তু আজ থেকে আমাদের দেশের ঠাকুমা-দিদিমাদের যুগযুগান্তর ধরে নাতি-নাতনিকে বলে চলা চরখা-কাটা চাঁদের বুড়ির গল্পটা হারিয়ে গেল, এটাই বেদনার। এভাবেই হয়তো বিজ্ঞানের বাস্তবতার বেগ ঢেকে ফেলে আবেগের রূপকথার জগৎকে।

ফলত, বাঙালির জীবনে মননে আবেগের আতিশয্য। বেগের ভূমিকা সেখানে যেন দ্বিতীয় পংক্তিতে। আদিকাল থেকে বাঙালি যতটা আবেগে ভেসেছে, ততটা বেগের অভাব অনুভব করেনি বাঙালি জীবন। আর, বাঙালি মননের সেই অভিযাত্রায় কবি-সাহিত্যিকরা ছিলেন চালকের আসনে।

কিন্তু এ’ তো অস্বীকার করবার নয় যে মানব-সভ্যতার অগ্রগতির সোপান বিজ্ঞান এবং শাস্ত্রটি বেগের অনুসারী। বাস্তববাদী দর্শনে আবেগের ভূমিকা সেখানে অপাংক্তেয় না হলেও কিছুটা গৌণ বৈকি! লেখক-সাহিত্যিকরা যতই আক্ষেপ করুন না কেন, বিজ্ঞান বেগের রথের সওয়ারি হবেই। এখন তাকে নিয়ে চলতে গিয়ে আবেগকে মানুষ কতটা পাশে রাখবে, কতটা প্রাধান্য দেবে, সেটি ভাববার বিষয়। তবে আমরা তো দেখেছি যে বিশ্ববিশ্রুত বিজ্ঞানীরা শুধুমাত্র বাস্তবের কারবারী না থেকে শিল্প-সাহিত্যের রসেও মন ভাসিয়েছেন। আইনস্টাইনের কাঁধে বেহালা, আচার্য সত্যেন বসুর কাঁধে এসরাজ কিমবা আচার্য জগদীশ চন্দ্রের হাতে লেখকের কলম বেমানান হয়নি!

আসলে আবেগবর্জিত বেগের আধিপত্য – সে তো কাঙ্খিত নয়। নিঃসন্দেহে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রার মানকে উন্নত করেছে। তাকে দিয়েছে সাচ্ছল্য ও বৈভব। দিয়েছে দীর্ঘজীবন ও আরামের আস্বাদ। আজকের দিনে তার দিকে মুখ ফিরিয়ে থাকা অবাস্তব ও অসম্ভব। কিন্তু এও কঠিন বাস্তব যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির রথ থামতে জানে না, নিজের অগ্রগমণকে সে প্রতিনিয়ত অতিক্রম করে এগিয়ে চলে। মানুষ তার চালিকাশক্তির জোগানদার। পরস্পরের চাহিদা পূরণে একে হয়ে ওঠে অপরের পরিপূরক।

আদিকাল থেকে তাই একটা প্রশ্ন উঠেই চলেছে, আজও যা অব্যাহত। এই যে বিজ্ঞানের অগ্রগতির ক্রমবর্ধমান চাহিদা, তার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে মানুষ কি কোনো মোহে আবিষ্ট হয়ে পড়ছে? হারিয়ে ফেলছে তার মানবিক সত্তা, চেতনা? সে কি হয়ে পড়ছে কেজো,স্বার্থান্ধ, অসংবেদনশীল? আর, এই ক্রমবর্ধমান এগিয়ে যাবার তাড়নায় পৃথিবীটা কি ক্রমশ শুধু কেজো লোকেদেরই বাসযোগ্য হয়ে উঠছে? শুধুমাত্র অর্থের বিনিময়মূল্যই স্থির করে দিচ্ছে একটা মানুষের সামাজিক অবস্থান ও কর্মের গুরুত্ব? গতির যে স্পুটনিকে আজ জীবন ছুটছে, সেখানে স্নিগ্ধ ও শান্ত রসের জীবন-রসিকের সত্যি কি কোনো স্থান আছে? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র অনুকরণে ভবিষ্যতের মানব সভ্যতা একদিন মানুষের দরবারে প্রশ্ন তুলবে না তো “তোমার মন নাই, কুসুম?”

রবীন্দ্রনাথ তাঁর একটি ছোটগল্পে মন্তব্য করেছেন – “পূর্বকালে টাকা সস্তা ছিল এবং হৃদয়টাও কিছু সুলভ ছিল, এখন সর্বসম্মতিক্রমে হৃদয়ের বাজে খরচটা একপ্রকার রহিত হইয়াছে।“(প্রতিহিংসা)

কবিকথিত এই “হৃদয়ের বাজে খরচটা”ই বোধহয় মানুষকে বস্তুনিষ্ঠ করে তার সংবেদনশীলতার কোমল ও মানবিক বোধের জগৎ থেকে দূরবর্তী করে দেয়। মনকে গ্রাস করে এক ধরণের একমুখিনতা ও কাঠিন্য।

বিশ্ব-ইতিহাসের গবেষকদের পর্যবেক্ষণে ইউরোপের শিল্পবিপ্লব ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে একটু একটু করে বদলাতে শুরু করেছিল মানুষের মানবিক বিচার-বোধের ধারা, আজ যা প্রতিনিয়ত প্রভাব বিস্তার করে চলেছে উন্নতিশীল, এমনকি পিছিয়ে পড়া দেশগুলির সমাজজীবনে। এই পরিবর্তনের ধারায় ক্ষয়িষ্ণু হয়ে চলেছে মানবিক জীবনপ্রবাহ, এটা সহজেই অনুমেয়। আজকের দুনিয়ায় অর্থবান ও উন্নত দেশগুলি পরিচালিত হয়ে চলেছে সঙ্কীর্ণ ও স্বার্থান্ধ দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা এবং ক্ষুদ্র জাতীয় স্বার্থে, ভবিষ্যৎ পৃথিবীর কাছে যা যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

এবার এই আলোচনার মুখবন্ধে ফিরে গিয়ে বলি, শুধুমাত্র ‘যাযাবর’ কথিত বিজ্ঞানের অগ্রগতি সৃষ্ট বেগ নয়, মানবিক চেতনার এই অবক্ষয়ের চালিকা-শক্তি কিন্তু মানুষের অপরিসীম লোভ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বিশ্ব-অর্থনীতির নিত্য-নব রসায়নেও নিহিত।

আমরা আশা রাখব, ভবিষ্যতের বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ শেষ পর্যন্ত হয়তো শিক্ষা নেবে ইতিহাসের পাতা থেকে। চিরন্তন মানব সভ্যতার রথ ছুটে চলবে বেগ ও আবেগের দুটি রশিকেই নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে। আবেগের স্পর্শ থেকে বেগ বঞ্চিত হবে না মানুষের স্বার্থে।

[ছবি ও তথ্যঋণ – আন্তর্জাল]

রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।

রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত

editor@robichakro.com

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
5 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Ashish Sen
Ashish Sen
11 months ago

খুব সময়োপযোগী লেখা। বর্তমান পৃথিবীর চেহারা দেখে বিজ্ঞানের তথাকথিত অগ্রগতি দেখে মনে হয় এবার একটু থাম, আমাদের একটু জিরোতে দে। সীমাহীন লোভের রসদ যোগান দেওয়ার কাজ থেকে একটা প্রজন্ম একটু দূরে থাকুক। আমরা আবার ফিরে যাই সে রূপকথার রাজ্যে, অল্প কিছু পেলে খুশিতে উদ্বেল হয়ে উঠতে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় বিছানার পাশে রাখা নতুন পাওয়া জুতোর গন্ধ শুঁকতে।

Tanmay Banerjee
Tanmay Banerjee
Reply to  Ashish Sen
10 months ago

যথার্থ বলেছেন। অতিরিক্ত প্রাপ্তি আমাদের মনোজগৎকে অনেকটাই নিঃস্ব ও রিক্ত করে দিয়েছে। যে আনন্দ আমাদের ছেলেবেলাকে রঙিন করে রাখত, আজও যার সুরভি আমরা পাই, এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা তার থেকে বঞ্চিত।

Himadri Kumar Das Gupta
Himadri Kumar Das Gupta
10 months ago

‘দৃষ্টিপাত’ আমার কৈশোর-যৌবনের দিনগুলির শয়নে-স্বপনে প্রায় কোলবালিশের মতো অনিবার্য অবলম্বন ছিল। এখনও ফাঁক পেলে পাতা ওলটাই। ভাল লাগার রেশটা রয়েই গেছে। তন্ময়বাবুও দেখছি আমার গোত্রীয়। তবে এখানে তিনি সেই বেগ-আবেগের দ্বন্দ্বে পাক খেতে খেতে আমাদের বিচার-বুদ্ধিকে উস্‌কে দিতে চেয়েছেন।আবেগকে অস্বীকার করার শক্তি তন্ময়বাবুর নেই, আমার তো নেই-ই। বিনয়বাবুরও কি ছিল? তা না হলে কোন শক্তিতে ১৯৪২-৪৩ সালে বাংলা সাহিত্যে তিনি জন্ম দিলেন শীর্ণকায় অথছ মৃত্যুঞ্জয় এক সন্তানের! আজকে আর একটা ‘দৃষ্টিপাত’ লিখলে হয়তো তিনি তাঁর একই ভাবনার গোড়ায় জল ঢালতেন আরও। তবু, ত সত্ত্বেও, বিজ্ঞানের বেগের মধ্যেই তো তিনিই খুঁজে পেয়েছেন সেই আপ্তবাক্য – ‘দূরকে নিকট এবং দুর্গমকে সহজাধিগম্য করেছে যে বিজ্ঞান, তার জয় হোক’। এখানে কমলালেবুর বদলে ভিটামিন সি-এর পসঙ্গ তোলাটা অতিসরলীকরণ হয়ে যাবে। তা হলে সেই বেগ যে তাগিদ থেকে উৎসারিত হয়ে আজকে সুনীতি উইলিয়ামদের জন্ম দেয় তারই synonym তো আবেগ।

Tanmay Banerjee
Tanmay Banerjee
Reply to  Himadri Kumar Das Gupta
10 months ago

আপনার মন্তব্যটি খুব ভাল লাগল। সম্পাদকীয় নিবন্ধটির এটি একটি চমৎকার সংযোজন।

Himadri Kumar Das Gupta
Himadri Kumar Das Gupta
Reply to  Tanmay Banerjee
10 months ago

ধন্যবাদ