ভিড় বাসে হঠাৎই একটা গন্ধ এসে নাকে সজোরে আঘাত করে। বৃদ্ধা ঘুমোচ্ছিলেন। গন্ধের ডাকে পলকা ডিমের খোলার মতো ঘুম ভেঙে যায়। ভিতরের নরম কুসুমের স্বপ্নটা আঠালো অনুভব নিয়ে জড়িয়ে যায়। বৃদ্ধা বোঝার চেষ্টা করে গন্ধটা কীসের? না, কাঁচা ডিম নয়, এ গন্ধ কাঁচা তেঁতুলের। ধারণাটা মনে আর প্রাণে মিলতেই একরাশ জল এসে জিভে ভর করে। নিম্ন বুনিয়াদী স্কুলে বিরতির ঘন্টি বাজতে থাকে, সঙ্গে সঙ্গে ক্লাসরুম থেকে ছাত্রীদের দল সিঁড়ি দিয়ে নেমে, দৌড়! সে দৌড়ের মাহাত্ম্য বৃদ্ধাকে বয়স, সময়, ভিড়-বাস সব কিছুকে তুচ্ছ করে এক নিমেষে নিয়ে হাজির করে, ওর ছোটবেলার স্কুলের প্রধান ফটকের সামনে। লোহার গারদের অন্যদিকে আচারওয়ালা, আলুকাবলি, আইসক্রিম কাকু-রা দাঁড়িয়ে। সেই আচারের গাঢ় ঘ্রাণের শক্তি, এত বছর পরেও মন কে মুগ্ধ করে।
মানুষের মস্তিষ্কের কোঠায় কোঠায় জমা থাকে সময়ের ছাপ। তার মধ্যেও আবার অনেক ভাগ রয়েছে, যেমন অ্যামিগডালা, হিপ্পোক্যামপাস, সেরিবেলাম, প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স ইত্যাদি।
অন্য দিকে ভারতীয় দর্শনে এ সমস্ত, সূক্ষ্ম শরীরের অন্তর্গত, স্থূল শরীরের মত এর ওপরেও আমাদের কোন স্থায়ী মালিকানা নেই। আদি শঙ্করাচার্যের কথায়,
ওঁ মনোবুদ্ধি অহংকার চিত্তানি নাহং
ন চ ব্যোম ভূমির্ণ তেজো ন বায়ু
সচ্চিদানন্দ শিবোহহম।।
আমি সৎ চিত আনন্দ, আমিই সে। আকাশ মাটি আলো বা বায়ু-র মতো, মন বুদ্ধি অহংকার চিত্ত কোনটাই আমি নই। চালক যতক্ষণ গাড়ি চালাচ্ছেন, ততক্ষণ সে গাড়ির অংশ। যেই গাড়ি থেকে নেমে গেলেন তখন তিনি আর গাড়ি ভিন্ন। শুনতে বা পড়তে যতটা সহজ, নিজের ব্যক্তি পরিসরে তাকে অনুধাবন করা কঠিন। বহু সাধনায় এই ধারণা যাঁরা অর্জন করতে পারেন, তাঁরাই হয়ে ওঠেন মহামানব।

আমরা সাধারণ মানব, শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট নানা রসায়নে, আমাদের আনন্দ বেদনা কষ্ট উচ্ছাস ইত্যাদির অনুভূতিকে নিজের বলে মেনে নিতে কিছুমাত্র দ্বিধা হয়না। কর্টেক্স-এর কুলুঙ্গীতে স্মৃতি আর অভ্যাসের স্থায়ী বাসা বাঁধা থাকে, জীবনের যেকোন বাঁকে ইন্দ্রিয়বাহিত ধরতাই-এ ভর করে সে উড়াল দেয় সুনির্দিষ্ট নির্ভুল লক্ষ্যে।
এই ইন্দ্রিয়টি শুধুমাত্র ঘ্রাণ শক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়, চক্ষু, কর্ণ, জিহ্বা, ত্বক যে কেউ হতে পারে। একটা বিশেষ স্বাদ, দৃশ্য, স্পর্শ অথবা শব্দ আমাদের মনের কুঠুরিতে আঘাত করে জাগিয়ে দিতে পারে ঘুমিয়ে থাকা সময়কে। তার বয়স বাড়ে না, যদিও মস্তিষ্কের ধারক শরীরটির আয়ু প্রতি বছর নতুন সংখ্যায় উন্নীত হয়।
উপরোক্ত ঘ্রাণেন্দ্রিয়র অভিজ্ঞতাটি যদি হয় নিতান্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক, শ্রবণেন্দ্রিয়র কিছু অভিঘাত হয় সমষ্টির। সেক্ষেত্রে কেবলমাত্র একজন মানুষ নয়, সময়ের নির্দিষ্ট পরিধিতে থাকা গোটা সমাজের কর্টেক্স-এ স্থায়ীভাবে রোপন হয়ে থাকে যাপনের স্বরলিপি। সুরে, কথায়, গানে, গায়ক গায়িকার কন্ঠমাধুর্যে সেই ভালোলাগা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সময় নয়, কালোত্তীর্ণ হয়ে ভিজিয়ে দেয় উত্তরপ্রজন্মের শ্রোতাকেও। এভাবেই তৈরি হয় স্বর্ণযুগ। অসামান্য গীতিকার, সুরকার, কন্ঠশিল্পী, যন্ত্রশিল্পী সহ সমস্ত সঙ্গীত প্রকৌশলীর মিলিত পারদর্শীতা এক হয়ে, সেই যুগকে করে তোলে আক্ষরিক অর্থেই অবিস্মরণীয়।
আজ ইউটিউব বাহিত হয়ে যখন সেই সঙ্গীত ভেসে আসে, তখন শ্রোতার মন চলে যায় কোন এক পাহাড়ের ঢালে ফেলে আসা সময়ের কাছে, যেন পাইনের জঙ্গলের আড়ালে বাঁক ঘুরলেই সেই লাল রঙা কাশ্মীরী শাল পরিহিতার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে আবার। বৃদ্ধা নিজেই বিশ্বাস করতে পারবেন না, ওই যুবতী আর কেউ নয়, স্বয়ং তিনিই! সুরের বাক্সে সযত্নে ধরে রাখা আছে তাঁর সোনার দিন।
এবারের সংখ্যায় তেমন এক সময় প্রদক্ষিণের অছিলায় পরিবেশিত হল কিছু মনোজ্ঞ রচনা আর স্বর্ণযুগের গান।
[চিত্র ঋণ- আন্তর্জাল]


রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।
রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত
editor@robichakro.com
চমৎকার!