
কতটা দূরে থাকলে দূর মনে হয়?
রজতের জানা নেই। কখনও এমন হয়েছে, কোনদিন হয়তো রাগ করে নীহারিকা পাশের ঘরে গিয়ে দরজা দিয়েছে। একা বিছানায় রজত, ছাদ-পাখা দেখে দেখে ঘুমোনোর চেষ্টা করেছে, অথচ দেওয়াল লাগোয়া ঘরের দূরত্ব অলঙ্ঘ্য মনে হয়েছে। কিন্তু আজ সত্যিসত্যিই ভৌগোলিক দূরত্ব অনেক। এই ব্যবধান কি মনের দূরত্ব বাড়িয়ে তোলে? এখন তো ভিডিও কল খুব স্বাভাবিক ঘটনা। বোতাম চাপলেই সামনে হাজির। সে হাজিরায় মনের খিদে কি মেটে? এই বাইশ তলার ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে রজত, নিচের পৃথিবী দেখে আর সাতপাঁচ ভাবে। ভেবেই চলে। এর চেয়ে নীহারিকাকে একটা ফোন করলেও তো হয়? না, নিজে থেকে ফোন করবে না। কেন করবে? রজত কি ফেলনা? কিন্তু ভিডিও ক্লিপিংগুলো ওকে স্থির থাকতে দেয় না। কেউ একজন সিসিটিভি ফুটেজ জোগাড় করেছে। দুতিন হাত ঘুরে, সেই ছবি রজতের মোবাইলে বাসা বেঁধেছে। শুধু কি মোবাইল? সেই ছবি পাঁজরের ভেতর, মনের ভেতর। মস্তিষ্ক-র ঠিক কোন অংশে এই সব স্মৃতির ভান্ডার থাকে? চিকিৎসকরা বলতে পারবেন। রজত জানে, শুধু অস্থিরতা। ওকে ঘুমোতে দিচ্ছে না। চুপ করে বসতে দিচ্ছে না। চিন্তা করতে দিচ্ছে না।
(Love Story)

ভিডিও ক্লিপটিতে নীহারিকাকে দেখা যাচ্ছে অন্য একটি অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে। ঠিক কোথায় গিয়েছে বোঝা যাচ্ছে না। পরপর তিন চারদিনের ক্লিপ। ভিডিওর মধ্যে তারিখ সময় সব ছাপা রয়েছে। বোঝা যাচ্ছে, ওদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ হয়। অথচ নীহারিকা কখনও এর কথা রজতকে বলেনি।
মাস তিনেক আগে রাগ করে নীহারিকা কলকাতায় ফিরে যাওয়ার পর, এই প্রবাসের ফ্ল্যাটে রজত আর ওর অসুস্থ মা রয়েছে। বছর দুয়েক আগে সেরিব্রাল স্ট্রোকের পর উনি সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী এবং পরনির্ভরশীল। এজেন্সি ঠিক করা আছে। তারাই নিয়মিত দেখাশোনার লোক পাঠায়।
ঝুলবারান্দাটা খুব নোংরা হয়ে আছে। এসি মেশিনের ওপর একজোড়া পায়রা এসে বাসা বেঁধেছে। প্রথম প্রথম ওদের গম্ভীর গলায় বকবকম শুনে রজতের বেশ ভালই লাগত। এই প্রবাসে অন্ততঃ কেউ একজন ওর সঙ্গী হয়েছে। একজন নয়, একটি পরিবার। স্বামী স্ত্রী দুজন এসে, এসি মেশিনটার ওপর খড়কুটো এনে জড়ো করছিল। সপ্তাহান্তে, ওদের কর্মকান্ডর দিকে তাকিয়ে রজতের অনেকটা সময় কেটে যেত। ক্রমে ডিম পাড়লো, ডিমে তা দিল। তার কিছু দিনের মধ্যেই ছোট ছোট পাখির ছানা বেরিয়ে এল। নতুন প্রাণ সৃষ্টির এই ঘটনাটা রজতকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। নীহারিকার সঙ্গেও তো ওর বাসা বাঁধা হল অনেকদিন! কিন্তু ওদের সংসারে না জমল খড়কুটো, না এলো নতুন প্রাণের সন্ধান।

কিন্তু পাখিদের সংসারের দাপটে ঝুলবারান্দার দফারফা। শুধু তো খড়কুটো নয়, ওদের বিষ্ঠার ঠেলায় রজতের এখানে এসে বসার বিলাসিতা লাটে ওঠার জোগাড়। নোংরা বাঁচিয়ে সন্তর্পনে রেলিংএর ধার ঘেঁষে দাঁড়ায়।
ঘর ঝাড়ু মোছা, রান্না আর অসুস্থ মায়ের সেবা যত্ন, সবকিছুর জন্যই এজেন্সিকে বলা রয়েছে। প্রতিদিন এইসব কাজের জন্য, লোক পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু তারা পাখির নোংরা পরিস্কার করতে চায় না। প্রথম প্রথম রজত অবাক হয়ে যেত, অনুরোধ করত। কিন্তু পরিচারিকারা অবলীলায় কাজ না করে চলে যায়। এজেন্সিকে ফোন করেও কোন সুরাহা হয় না। ওদের বক্তব্য খুব সহজ, “মানুষের ঘর পরিষ্কার করা কাজ। পশু পাখি পুষলে, সে কাজ আপনাকে নিজেকে করতে হবে।”
ইদানিং সবিতা বলে একজন মাঝবয়সী বাঙালি মহিলা কাজ করতে আসে। এই প্রবাসে বাংলাভাষী মানুষ পাওয়া সৌভাগ্যের। তবে ইদানিং সেটা কিছু দুর্ভাগ্যর কারণও হচ্ছে। হঠাৎ করে বাংলাদেশী সন্দেহে বেশ কিছু লোকজনকে ধরপাকড় করা হয়েছে। অনেকে শহর ছেড়ে পালিয়েও গেছে।
নীহারিকা চলে যাওয়া ইস্তক রজত একা মানুষ। পক্ষাঘাতগ্রস্ত মা সংসারের কোন কাজ করতে পারে না। তাই সবিতা-নির্ভর রজতের জীবন। সকালবেলা আপিস যাওয়ার আগে, সবিতা ঘরের অনেকটা কাজ করে ফেলে, রান্না করে, মায়ের যত্ন নেয়। শুধু পায়রাদের জন্য ঝুলবারান্দায় হাত ছোঁয়ায় না।
জীবনে অনেক কিছু মেনে নিতে হয়। রজত পায়রাদের উৎপাত মেনে নেয়। ছুটির দিন, নিজেই কিছুটা সাফসুতরো করার চেষ্টা করে। এর মধ্যে পাশের ফ্ল্যাটের বরুণবাবু পায়রার অপকারিতা নিয়ে লম্বা বক্তৃতা দিয়েছেন। পায়রা থেকে নাকি, কী সব ভয়ঙ্কর রোগ হয়েছে। ওদের হোয়াটস্যাপ গ্রুপে এই বিষয়ে অনেক গবেষণাপত্র ফরোয়ার্ড হয়েছে। রজত এই সব বিষয়ে কোন উত্তর দেয় না। ঘাড় কাত করে শুনে যায়। আজকাল বেশিরভাগ মানুষের কাছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষ বা সেমিনার রুম নয়, সমাজমাধ্যমের পাতাই হয়ে উঠেছে জ্ঞান আহরণ ও বিতরণের প্রধান স্থান। রজত পাখিদের দিকে তাকিয়ে ভাবে, ওদের নিয়ে মানুষের এত মাথা ব্যথা কেন? পৃথিবীটা যে পাখিদেরও, সেটা মানুষকে কে বোঝাবে?
পাখিরা জন্মসূত্রে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি অধিকার ভোগ করে। পাখিদের বেঁচে থাকার জন্য টাকা রোজগার করতে হয়না। পৃথিবী ওদের নিজেদের শর্তে বেঁচে থাকার অনুমতি দিয়েছে। পাখিদের ই-এম-আই নেই, স্যালারি নেই, সঙ্গীনীর জন্য মন খারাপ নেই। সঙ্গী পাখি উড়ে গেলে, নতুন বছরে নতুন পাখি খুঁজে নিতে কোন সমস্যা হয় না। সন্তানদের জন্য হয়তো কিছুদিন আটকা পড়ে থাকে। তাদের খাওয়ার জোগান দিতে পরিশ্রম করতে হয়, কিন্তু মোটামুটি ডানাটুকুতে জোর আসতে যতটা সময়, তারপর তারা নিজেদের মতো উড়ে যায়। আর সেই ছানাদের নজর রাখার কোন প্রয়োজন হয় না।
আজ সাতটা বেজে গেল, এখনও সবিতা আসেনি। ঘড়ি দেখে রজত। প্রতিদিন সাড়ে ছটার মধ্যে চলে আসে, কিন্তু এখনও না এলে ওর প্রাতরাশ হবে না। তাছাড়া মায়ের ঘড়ি ধরে বাথরুম, ওষুধ, স্নান খাওয়া আছে। সবিতাকে ফোন করে, “তুমি কি আজ আসছো?”
সবিতার যেন একটু চড়া মেজাজ, “আসছি তো। এত ফোন করার কী আছে?”
“এতবার কোথায়? আমি তো একবারই ফোন করলাম। তাও আধঘন্টা অপেক্ষার পর।”
রজতের কথা শেষ হয় না, সবিতা ঝাঁজিয়ে ওঠে, “এত খবর্দারি করলে, এজেন্সিকে বলুন অন্য লোক খুঁজে দিতে।”
রজত ঘাবড়ে যায়। এখন যদি কাজ ছেড়ে দেয়, ওর সম্পূর্ণ রুটিন গন্ডগোল হয়ে যাবে। বিশেষ করে অসুস্থ মা রয়েছে। নীহারিকা চলে যাওয়ার পর সবিতার ওপরেই পরিচর্যার দায়িত্ব আছে। নিজের প্রাতরাশের চিন্তা করে না। আপিসে খেয়ে নেবে, কিন্তু মায়ের দায়িত্ব কে নেবে? নিজেকে করতে হলে, আপিস ছুটি নিতে হবে। রজতকে চুপ করে থাকতে দেখে, সবিতা আবার বলে ওঠে, “দেখুন কাজ করতে যেতে, দুপাঁচ মিনিটের এদিক ওদিকের জন্য এত কথা শোনা পোষায় না। আপনার বাড়িতে আমি যাচ্ছি না। আপনি এজেন্সিকে যা খুশি বলে দিন। আমার কিছু যায় আসে না। আমি ফোন অফ করে রাখছি, আর জ্বালাবেন না।”
(Love Story)

রজতের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। এবারে ঠিক কী করবে, বুঝতে পারে না। স্নান করতে যাওয়ার আগে, মা-র ঘরে ঢোকে। দুবছর হল সেরিব্রাল স্ট্রোকের পর শরীরের ডানদিকটা অকেজো হয়ে আছে। বাকশক্তিও নেই। সকাল সকাল ছেলেকে দেখে চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রজত অসহায় বোধ করে, এজেন্সিকে ফোন করে, “একজন কেয়ার গিভার যদি এমন আচরণ করে, তাহলে আমাদের কী করে চলবে?”
অন্যদিক থেকে কিছু আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করে। রজত বুঝতে পারেনা, ঠিক কী হবে? ওর স্নানের সময় হয়ে গেছে। চানঘরে ঢুকে পড়ে। কিছুক্ষণ পর কলিংবেল-এর শব্দ পায়, কোন রকমে তোয়ালে জড়িয়ে দরজা খুলে সবিতাকে দেখতে পায়। রজতকে পাশ কাটিয়ে হনহন করে মায়ের ঘরের দিকে চলে যায়। রজতও নিশ্চিন্ত হয়ে চানঘরে ফিরে যায়।
ঘরের সঙ্কট থেকে আপাত নিষ্কৃতি পেয়ে, রজত আপিসের পথে রওনা দেয়। এবার ওর মাথার মধ্যে আবার ঘুরে আসে ভিডিও ক্লিপ। কে ছিল ওই পুরুষটি? তার সঙ্গে এত ঘন ঘন কোথায় যায় নীহারিকা? ছবিগুলো ওকে কুরে কুরে খেতে থাকে। কাউকে বলতেও পারছে না। নীহারিকা যে কলকাতা ফিরে গিয়েছে, সহকর্মীদের কাউকে জানায়নি। আর এই প্রবাসে, রজতের ঘনিষ্ঠ কোন বন্ধু নেই, যার সঙ্গে ব্যক্তিগত দুঃখ কষ্ট ভাগ করে নিতে পারে। এক অসহনীয় মানসিক অস্থিরতা রজতকে গ্রাস করতে থাকে। কোন কাজে মনসংযোগ করতে পারেনা। আজ আপিসেও দুটো পরিচিত কাজে ত্রুটি রয়ে গেল। রজতের দলের একটি অল্পবয়সী ছেলে সেই ভুল ধরে দিয়েছে, তাই এবেলা রক্ষা পেল। রজত দৃশ্যতঃ মুষড়ে পড়েছে। দুপুরে ক্যান্টিনে একজন সহকর্মী প্রশ্ন করে ফেলে, “ইজ এভরিথিং অলরাইট রজত?”

রজত একটু বোকা বোকা হাসি হেসে প্রশ্নটা সামাল দেয়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে টের পায়, কিছু ঠিক নেই। উপদ্রুত এলাকায় পরিচালিত কার্ফ্যু-র মতো, আপাত শান্তির ভেতর, রজতের মনে মধ্যেও অশান্তির চোরা স্রোত বয়ে চলেছে। ছবিটা কার? কার সঙ্গে দিনের পর দিন ঘুরে চলেছে নীহারিকা। অথচ এতদিন হয়ে গেল, ফিরে আসার কোন সম্ভবনার কথাও বলছে না। এর মাঝে যে ফোন করেনি, তা নয়, সে সব নেহাতই কেজো কথা। ব্যাঙ্ক কর্মীরা যেমন বিভিন্ন অফার জানিয়ে কথা বলে, তেমনই সেসব কথা।
মনের মধ্যে অশান্তি নিয়েই বাড়ি ফেরে রজত। ঘরে এসে একবার মায়ের কাছে যায়। মা কথা বলতে না পারলেও, রজতের উপস্থিতি উপলব্ধি করতে পারে। তার চোখের ভাষা পাল্টে যায়, মুখ দিয়ে নানা রকম উৎসাহ ব্যঞ্জক শব্দ করতে থাকে। মা-র কাছে কিছুক্ষণ কাটিয়ে নিজের কোটরে ঢুকে পড়ে। স্নান সেরে চুমুক দেয় হুইস্কির গ্লাসে। কাল শনিবার, সকালে ওঠার তাড়া নেই।
ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মতে, সন্তানাদি নেই বলে সম্পর্কের আঠা নেই। রজত তো চেষ্টার ত্রুটি করেনি, যদি না হয়, ও কী করবে? আঠা নেই বলেই কি দুজনে এমন আলাদা আলাদা থাকতে পারছে? এই সব আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে প্রায় ভোর হতে চলল।
এমন সময় ফোনে একটা টিঙ করে শব্দ হল। নীহারিকার কাছ থেকে একটা ভয়েস মেসেজ। একলা প্রবাসে, একটা আকাশ ছেঁড়া বাড়ির বাইশ তলায় রজতের কাছে অনেক আলোকবর্ষ পার করে, সত্যিই যেন সুদূর নীহারিকা থেকে একটা বার্তা ভেসে এলো। কে যে ওর নাম নীহারিকা রেখেছিল? রজতের জানতে ইচ্ছে করে। নিজের মনের মধ্যেই এমন অনতিক্রম্য দূরত্ব জমিয়ে রাখতে পারে! সার্থক নামকরণ।
“শ্যামলদাকে তুমি চেন না। আমাদের আগের পাড়ায় থাকে। ওদের একটা সমাজ কল্যাণ সংস্থা আছে। ওরা অনাথ শিশুদের দায়িত্ব নেয়। তার মধ্যে একজনকে আমি দত্তক নিতে চাই। তোমাকে প্রয়োজন। কবে আসতে পারবে জানিও।”
(Love Story)

বুকের ওপর জমতে থাকা অশান্তির পলি যেন এক হড়কা বানের দাপটে ধুয়ে যাচ্ছে। ঝুলবারান্দার এসি মেশিনের ওপর থেকে কচি কচি ঠোঁটে চিঁচিঁ করে শব্দ শোনা যায়। পায়রা দম্পতি, ছানাদের জন্য খাবার সংগ্রহ করতে বেরিয়ে পড়ছে। রজত পায়ে পায়ে ঝুলবারান্দায় আসে। রাতের পানমাত্রার জন্য মাথা ইষৎ টলমল করছে। পূব আকাশে আলোর রেখা ফুটে উঠছে। রজত ফোনের বোতাম চাপে, ওকে অযুত আলোকবর্ষ পার করে নিজস্ব নীহারিকার কাছে পৌঁছতে হবে, এখুনি।

[লেখকের রবিচক্রে পূর্ব প্রকাশিত রচনা]
ঠাঁই – ছোট গল্প
গয়না – ছোট গল্প
ছোটদের গল্প: পুজো আসছে
শাড়ি
পূর্বাভাস
অভিযোগ
জঙ্গলের প্রতিশোধ
গল্পঃ ঘুড়ি
মানুষ

