শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বঙ্গদেশে শীত আসিয়া পড়িল। সম্বৎসর উষ্ণতা ও আর্দ্রতা লইয়া বিব্রত বাঙ্গালী, আবহাওয়ার এই তৃপ্তি উপভোগ করিবার উপলক্ষে, তাহার যাবতীয় গরম পোশাক জমাইয়া রাখিয়াছেন। কিছুকাল পূর্বেও গৃহস্থ বাড়ির অঙ্গনে প্রাক শীতের দ্বিপ্রাহরিক রৌদ্রকরজ্জ্বল অঘ্রাণ সুখ গায়ে মাখিয়া, তোরঙ্গ উদ্ঘাটিত রঙিন পশমের রকমারি শাল, সোয়াটার, কমফর্টার, দস্তানা, হনুমানটুপি ইত্যাদি শোভা পাইত। ধুনুরিদের টঙ্কারে পুরান লেপ, নূতন হইত। ন্যাপথলিন ঘ্রাণের এক অনন্য সমীকরণে এক বৎসর পূর্বকার ব্যবহৃত কোন গরম পোশাক, যেন স্মৃতির দূত রূপে নিজেকে প্রকাশ করিয়া রাখিত।

বর্তমান শহরাঞ্চলে ফ্ল্যাট বাড়ির প্রকোষ্ঠতে অঙ্গনের প্রসারতা ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র ব্যালকনি বা ঝুলবারান্দায় পর্যবসিত হইয়াছে। সেখানে না আছে রৌদ্রের উদারতা, না আছে বাতাসের ব্যস্ততা। নিতান্ত অকিঞ্চিতকর অস্তিত্বের ন্যায় তাহার সঙ্কীর্ণ প্রাচীরগাত্রে, গৃহিণী লেপ কিম্বা কম্বলটিকে রৌদ্রস্নানার্থে মেলিয়া ধরেন বটে, তাহাতে নিয়মরক্ষা অতিরিক্ত ফল লাভ, অধরাই থাকিয়া যায়।

তথাপি কালের অমোঘ নিয়মে শীত আসিয়া জানান দিয়া যায়, বৎসরকাল অতিক্রান্ত। কালখন্ডের নিজ নিজ অংশে আমাদিগের বিচরণ, তাহা হইতে আরও একটি বৎসর খসিয়া পড়িবার সন্দেশ লইয়া আসে, এই শীত। পোশাক তোরঙ্গ উদ্ঘাটনের ন্যায় সালতামামিও এই সময়ের অবশ্য চিহ্নরূপে জাগ্রত।

বৎসরের প্রারম্ভেই, পৃথিবীর শক্তিমান দেশটির সর্বোচ্চ পদাধিকারী নবনিযুক্ত ব্যক্তিটি, তাহার নানাবিধ কর্মকান্ডে সকলকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিলেন। তাহার ভিতর, ইউ-এস-এইড হইতে অগ্রগণ্য বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি সকল মানবিক কর্ম হইতে সরকারি সাহায্যর দরাজ হস্ত সরাইয়া কেবল মুনাফার প্রতি নজর রাখিলেন। কাটা পড়িল এইচ-ওয়ান-বি জাতীয় ভিসা।

অতঃপর ভারতবর্ষের মাটিতে সংগঠিত হইল এক ঘৃণ্য আক্রমণ। কাশ্মীরে নিরীহ পর্যটকদের উপর বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি প্রাণঘাতী নির্মম আঘাত করিল। ভারতীয় সেনার প্রতিশোধমূলক আক্রমণে একটি প্রত্য়ুত্তরও নির্মিত হইল। দেশজুড়ে আঘাত ও প্রত্যাঘাতের নূতন সংজ্ঞা সৃষ্টি হইল।

বিগত বৎসরের ন্যায় ইউক্রেন রাশিয়া এবং ইজরাইল প্যালেস্তাইন সংঘাত তীব্র হইল। সংবাদ মাধ্যমের পর্দা জুড়িয়া রহিল রক্ত ও আধুনিক শহরের সমূলে বিনষ্ট হইয়া যাওয়া রাশিকৃত কংক্রিট। তাহার ভিতর ছুটিয়া যায় ক্ষুধার্ত, রক্তাক্ত মানব শিশু, নারী, বৃদ্ধ। যুদ্ধ কেবল, জয় অথবা প্রতিশোধের বার্তা লইয়া আসে না, তাহার সহিত ব্যাস্তানুপাতে বহিয়া যায় হাহাকার আর মানবতার ক্রন্দন। তথাপি এই ক্রন্দন শুনিবার কেহ নাই। ত্রাণ কার্য নির্বাহ করিতে আসা স্বেচ্ছাসেবক সংস্থার কর্মী হইতে সাংবাদিক অথবা চিকিৎসক, এই বিধ্বংসী মারণযোগ্য হইতে কাহারও নিস্তার নাই।

প্রতিবেশী নেপালে ঘটিয়া গেল এক অভাবনীয় রাষ্ট্রবিপ্লব, যাহা গতবৎসরের ঘটিয়া যাওয়া বাংলাদেশের গণঅভ্যুথ্থানকে মনে করাইয়া দেয়। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ব্যতীত, আকস্মাৎ ঘটিয়া যাওয়া এক তীব্র সামাজিক আন্দোলেনের যে ভয়ঙ্কর পরিণতি আজকের বাংলাদেশের অধিকাংশ স্তরে পরিলক্ষিত হইতেছে, নেপালের গন্তব্য সেদিকেই কিনা আমাদিগকে নজর রাখিতে হইবে।

রাশিয়া হইতে তেল ক্রয় করিবার অপরাধে, আমেরিকা সরকার, তাহার শুল্ক অস্ত্র লইয়া ভারতবর্ষকে আঘাত করিল। এই আঘাত ভারতকে দৃঢতর হইতে সহায়তা করিবে কিনা, তাহা ভবিষ্যত বলিবে, আপাততঃ আমেরিকা যে পরম মিত্রপদ হইতে ভারতকে অক্লেশে সরাইয়া দিয়াছে, তাহা সহজেই অনুমেয়।

ইত্যাকার খবরের ভিতর, ভারতীয় কন্যাদিগের ক্রিকেটে বিশ্বজয়, এক অসামান্য কৃতিত্বরূপে পরিগণিত হইল। নারীশক্তির দৃঢ়তা আজ দেশকে এই অনন্য উচ্চতায় লইয়া গিয়াছে। সাধারণ ভারতীয়দের কাছে, এ এক অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয়।
অবশেষে দেশজুড়ে নির্বাচক তালিকার নিবিড় সংশোধন প্রণালীর সূচনা হইল। তাহা লইয়া বঙ্গদেশে উত্তেজনার শেষ নাই। পক্ষে ও বিপক্ষের রাজনৈতিক তরজায় জনগণেশের প্রাণ ওষ্ঠাগত হইয়া পড়িয়াছে। এমন নানাবিধ জটিলতা পার করিয়া আমরা আশা রাখিব, এক নূতন বৎসরে বিশ্ব বিভেদ ভুলিয়া সকলের বাস যোগ্য হইয়া উঠিবে। কিন্তু কোন শুভেচ্ছা বাণীতে কখনও কাহারও উদ্ধার হয় নাই, অগত্যা আমাদিগকে অপেক্ষা করিতে হয়, কখন অশুভ শক্তির যবনিকা পতন হইবে। কালখন্ডে বিরাজ করিয়াও, আমাদিগের নিজস্ব ইচ্ছানুসারে খুব কম সংকল্পই বাস্তবরূপ পরিগ্রহ করে। জগৎ যেন তাহার নিজ নিয়মেই চালিত, মনুষ্যজাতি কতক সম্মোহিত ক্রীড়নকের ন্যায় লম্ফঝম্ফ করিয়া ভাবিয়া বসে, খুব কসরৎ দেখাইলো যাহোক।

শীতের শোভা সর্ষে ক্ষেত ভরা পীত পুষ্পের অপরূপ সমারোহ, ভোরের শিশিরবিন্দু মাখিয়া অপেক্ষায় থাকে, তাহার সহিত নলেন গুড়ের মনকাড়া সুবাস বাঙ্গালীকে ভিন্ন এক জন্মের প্রতি ইঙ্গিত করিয়া ডাকিয়া লইয়া যায়। সেস্থলে সীমান্ত কলহ, অবিরল যুদ্ধ ও যুদ্ধ-বিরতি সকলই কেমন অর্থহীন হইয়া পড়ে। মায়ের বোনা বালাপোষে গায়ে, স্মৃতির অতলে ঘাই দিয়া যায়, সেই স্নেহময়ীর পরশ। সীমাহীন বিলাস সামগ্রী ও ভুবনায়নের পথবাহী সংস্কৃতি ব্যতিরেকে আশ্বাস বাণী ধ্বনিত করে যে, আমরা আছি! আরও একটি বৎসর পার করিবার শক্তি সংগ্রহ করিয়া, আমরা দিব্যি টিঁকিয়া রহিলাম।

রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।

রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত

editor@robichakro.com

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x