
আমরা হলাম সেই প্রজন্মের মানুষ যারা এক জীবনে দম ঘোরানো গ্রামাফোনের টার্নটেবিলে কালো চাকতির ভিনাইল রেকর্ড বসিয়ে কান পেতে গান শুনেছি আবার এখন এলেক্সাকে ইচ্ছে মত গানের ফরমায়েশ করে ‘ব্লু-টুথ’ ইয়ারফোন লাগিয়েও গান শুনছি। দোয়াতে কলম ডুবিয়ে রয়্যাল ব্লু, সুলেখা কালি দিয়ে রুল টানা ফুলস্কেপ খাতায় লেখায় হাত পাকিয়েছি, আবার এখন বিনা কালি-কলমে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে আঙুল দিয়ে কী বোর্ড টিপে টিপে লিখে যাচ্ছি। পোস্টকার্ডে নিয়ম করে গুরুজনদের আঁকা বাঁকা অক্ষরে বিজয়ার প্রণামী চিঠি লিখেছি আর এখন হোয়াটস অ্যাপে ইমোজি, জি-আই-এফ পাঠিয়ে দিয়েই এখন সেই কাজ সেরে নিচ্ছি। তালিকাটা আ্ররো দীর্ঘায়িত করলে পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটবে। তাই এখানেই থামলাম।
মোটের উপর বলতে চাইছি আমাদের বেড়ে ওঠার সময়টাতে বিজ্ঞান এক একটা প্রযুক্তি নিয়ে এসে আমাদের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছে আর আমাদের জীবনের ছন্দটাও অনেকটা করে বদলে দিয়েছে।
তেমনি আরও একটা বদল নাকি ঝড়ের বেগে এগিয়ে আসছে। এই মূহুর্তে চারিদিকে বেশ খানিকটা আশা ও আশঙ্কার দোলাচল উঠেছে সবার মনে কৃত্রিম মেধা নামের প্রযুক্তি নিয়ে। আমাদের সময়ের মানুষজনদের বেশিরভাগই জীবনে যেটুকু সফলতার মুখ দেখেছেন তা নিজস্ব মেধার জোরে এবং নিজের অভিজ্ঞতায় ভর করে। এমন কি ক্যালকুলেটর বস্তুটি যখন আমাদের হাতে এল, তখন আমাদের মনে হয়েছিল – কি দরকার ছিল কে-সি নাগের বইয়ের জটিল অঙ্কগুলো নিয়ে অত হিমশিম খাওয়ার? এই যন্ত্র একটা হাতে থাকলেই তো বোতাম টিপে টিপে সব অঙ্ক নির্ভুল কষে দেওয়া যাবে। তারপর তো একে একে আরো অনেক কিছুই এল।
এবার শোনা যাচ্ছে ‘এ আই’ তথা আরটিফিসিয়াল ইন্টালিজেন্স নামের এক প্রযুক্তি, যাকে বাংলায় বলা যেতে পারে কৃত্রিম মেধা, তা এসে মানুষের ব্যক্তিগত মেধা এবং অভিজ্ঞতা – এই দুটিকেই অনেকটা গুরুত্বহীন করে দিতে পারে। কি সর্বনেশে কথা বলুন তো!
এমনিতেই একুশ শতকের শুরু থেকেই যে ডিজিট্যাল প্রযুক্তিগুলি আমাদের জীবনে এসে ঢুকে পড়ছে সেগুলির হাবভাব অনেকটা সেই রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতার সেই ধাবমান কালের মত। আমরা চাই বা না চাই, সেই সব প্রযুক্তি আমাদের তার দ্রুতরথে তুলে নিয়ে এগিয়ে যাবেই এক ‘দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে’।এবং নিয়ে যাবে এমন এক জগতে সেখান থেকে আর “ফিরিবার পথ নাহি”।

সেই আদিকাল থেকে মনুষ্য জাতির ইতিহাসে অনেকবার আমাদের জীবনের ছন্দ পালটিয়ে দেবার কাজ করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। তবে সেই মানব-সভ্যতার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া প্রযুক্তির আগমনের ঘটনাগুলো একই রকম গতিতে আসে নি। যত দিন যাচ্ছে বিজ্ঞানের যুগান্তকারী নতুন প্রযুক্তিগুলো আরো অনেক তাড়াতাড়ি এসে পড়ছে। কারণ সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অর্জিত জ্ঞানের ভান্ডার আরো অনেক সমৃদ্ধ হয়ে চলেছে। এক প্রজন্মের লব্ধ জ্ঞান পরের প্রজন্ম উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে বিজ্ঞান আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জয়রথ দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির এগিয়ে যাবার কয়েকটি ঐতিহাসিক তথ্য দিলে ব্যাপারটা খোলসা হয়ে যাবে।
খৃষ্টপূর্ব ৭৩০০০ বছর আগে যখন মানুষ অরণ্যচারী, গুহাবাসী ছিল, তখন মানুষ একটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছিল – পাহাড়ের পাথরের গায়ে তার দেখা কোনো প্রাণীর বা দৃশ্যের ছবি আঁক কেটে ফুটিয়ে তোলা। স্পেনের বা ইন্দোনেশিয়ার কিছু গুহায় এই রকম কিছু গুহাচিত্র আবিষ্কৃত হয়েছে যা ৬৫০০০ বছর আগের বলে মনে করা হয়।
সেটাই ছিল মানুষের সব চেয়ে আদি প্রযুক্তি। সেখান থেকে মানুষের চাষবাস শিখতে লেগে গেল ৬০,০০০ বছর।

সেখান থেকে অক্ষর দিয়ে লিখতে শেখা এবং চাকা আবিষ্কার করতে লাগল আরো ৫০০০ বছর। সেখান থেকে জমির মাপ করতে শিখে তাকে সীমানা দিয়ে বেঁধে ফেলতে শিখে দেশ শহর গ্রাম এই রকম অঞ্চলভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থাকে গুছিয়ে নিতে লাগল আরো ২৫০০ বছর। সেখান থেকে মানুষ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পদ্ধতি আবিষ্কার করতে লাগল ১৯০০ বছর। সেখান থেকে শিল্পায়ন শুরু করতে লাগলো সাড়ে তিনশো বছর। সেখান থেকে বিদ্যুৎ, টেলিফোন এবং রেডিও আবিষ্কার করতে লাগলো ৯৫ বছর, সেখান থেকে প্রথম ভ্যাকুয়াম টিউব কমপিউটার আবিষ্কার করতে লাগলো ৬৫ বছর। আদিম কমপিউটার থেকে আধুনিক ল্যাপটপে আসতে লাগল ২৫ বছর। এবং সেখান থেকে ইন্টারনেট আবিষ্কার করতে লাগল ১৫ বছর, সেখান থেকে স্মার্ট ফোন, ক্লাউড প্রযুক্তি এবং মোবাইল কমপিউটিং-এ আসতে লাগল প্রায় ১২ বছর। প্রযুক্তির এই বিবর্তনের পিছনে মানুষের মেধাই প্রধান উপাদান ছিল।

এইভাবে এগিয়ে যেতে যেতে ১৯৯৭ সালের ১১ মে একটি অভাবনীয় ঘটনা ঘটল। সেদিন যাকে বলা হত সর্বকালের সেরা দাবাড়ু, সেই গ্যারি কাসপারভ দাবা খেলায় হেরে গেলেন ‘আই বি এম’ নির্মিত ‘ডিপ ব্লু’ নামের এক কমপিউটার প্রযুক্তির কাছে। একটি সেরা মনুষ্য-মস্তিস্ককে-চ্যালেঞ্জ
জানালো মনুষ্য উদ্ভাবিত একটি প্রযুক্তি। বলা যেতে পারে ওখানে থেকেই শুরু হল কৃত্তিম মেধার জয়যাত্রার সূচনা।

এই সফলতা অবশ্য হঠাৎ করে আসেনি। এর পিছনে একটা দীর্ঘ দিনের ধারাবাহিক গবেষণা ছিল। সেখান থেকে ধাপে ধাপে এগিয়ে আজ আমরা আমাদের চারিদিকে শুনতে এবং জানতে পাচ্ছি – ‘চ্যাট জিপিটি’, ‘চ্যাট বট’, ‘মেশিন লারনিং’, ‘বিগ ডেটা’, ‘ডিপ ফেক’ এই সব প্রযুক্তির রমরমার কথা। আমরা অনেকেই এগুলির সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেছি। মজা করে এগুলো কাজেও লাগাচ্ছি। তবে এগুলো এখন আপাতনিরীহ মনে হলেও এগুলো হয়ত গুগলের মত সার্চ-ইঞ্জিন নির্ভর কোম্পানিগুলোর জন্যে বিপদ ডেকে আনছে। এই ‘এ আই’ কোম্পানিগুলো পুরোনো ‘চ্যাট বট’ বা সংবাদমাধ্যম বা সাইটগুলো থেকে তাদের গোগ্রাসে গিলে নেওয়ার ক্ষমতা রাখবে। যারা এই সব মাধ্যমে কষ্ট করে কন্টেন্ট বানিয়েছিল তারা এর বিনিময়ে কিছুই পাবে না।
এখন আমরা এমন সব ভেলকি দেখতে পাচ্ছি, যা কিছুদিন আগে অবধি আমাদের কাছে অকল্পনীয় ছিল। ‘ডিপ ফেক’ প্রযুক্তি দিয়ে যে গোলমেলে ভুয়ো ভিডিও বা ভুয়ো কণ্ঠস্বর তৈরি করা হচ্ছে, তাতে আমরা প্রায়শই যা নিজের চোখে দেখছি, যা নিজের কানে শুনছি, তার কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যে,
সেই ধন্দ্বে পড়ে যাচ্ছি। তাতে চারিদিকে কেমন যেন একটা অবিশ্বাস বা সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে, সেটা মোটেই সুখের কথা নয়।
প্রশ্ন উঠতে পারে আমরা তো এমন অনেক প্রযুক্তিই দেখলাম যেগুলো আমাদের জীবনশৈলীকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। তাহলে আর একটা নতুন প্রযুক্তি যখন আসছেই তখন তা নিয়ে এত হৈ চৈ করার কি দরকার আছে?
এ ক্ষেত্রে আছে, কারণ এই প্রযুক্তি আগের সব প্রযুক্তি থেকে অনেকটাই আলাদা। আসলে এখন অবধি আমরা ‘এ আই’-এর যা কেরামতি দেখেছি তা একেবারে প্রাথমিক স্তরের। অদূর ভবিষ্যতে কি হতে পারে তা নিয়ে অনেক কথা শোনা যাচ্ছে।
এখন পর্যন্ত যা শোনা যাচ্ছে এবং বোঝা যাচ্ছে এই প্রযুক্তি কোনো মানুষের করা প্রোগ্র্যামিং ছাড়াই নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে এবং মানুষের সাহায্য ছাড়াই সময়ের সঙ্গে নিজের দক্ষতায় উন্নতি করতে থাকবে। কিন্তু এমন দিন আসতে পারে তখন হয়ত মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই ‘এ আই’ নিজে নিজেই সিদ্ধান্তও নিতে পারবে। এবং হয়ত একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এবং অনেক বেশি কাজ অবিশ্বাস্য কম সময়ে করে ফেলতে পারবে। সব মিলে ‘এ আই’-এর মধ্যে এমন বিশাল মাত্রায়, বিশাল দক্ষতায়, বিশাল গতিতে কার্যকরী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, যে আমাদের জীবনযাত্রার উপর, আমাদের
সামাজিক কাঠামোর উপর এর প্রভাব ঠিক কতটা এবং কেমন ভাবে পড়বে, তা এখন অনুমান করা বেশ কঠিন ব্যপার।
ইতিমধ্যেই উন্নত দেশে দৈনন্দিন জীবনে যা যা ব্যবহার করি তার মধ্যে কৃত্রিম মেধার প্রভাব ঢুকে পড়েছে। এতকাল আমরা যে গ্যাজেটগুলিকে চালিত করতাম সেগুলি হয়ত এবার আমাদেরই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে চালিত করবে।
ধরা যাক, সকালবেলায় যতক্ষনে আড়মোড়া ভেঙে আপনি বিছানা থেকে উঠছেন ততক্ষণে আপনার কফি মেশিন অন হয়ে এক কাপ কফি আপনার জন্যে তৈরি করে দেবে। কফি খেয়ে নিম্নচাপ অনুভব করে আপনি যখন বাথরুমে যাবেন বাথরুমের গিজার আপনার চান করার জন্যে জল গরম করে দেবে। আপনার যদি সর্দি হয়ে থাকে, তাহলে সেই বুঝে আপনার শাওয়ারের জলের উষ্ণতা ঠিক করে নেবে। আপনার দাড়ি কামানোর যন্ত্রটি আপনাকে মনে করিয়ে দেবে আপনার আজকে যে ক্লায়েন্ট মিটিং আছে, সেখানে কি ধরনের পোষাক পরে যাওয়া ঠিক হবে। এমন আপনি চাইলে সেই মিটিং আপনার কি কথা বলা উচিত তাও বলে দেবে, আপনার হাতের মুঠোফোনটি। আপনার স্নান হয়ে গেলে আপনি বাথরুম থেকে বেরোলেই টোস্টার আপনার জন্যে গরম গরম টোস্ট বানিয়ে দেবে। তার পর জুসার ফ্রূট-জুস বানিয়ে দেবে। আপনার ফ্রিজ আপনাকে মনে করিয়ে দেবে কি কি জিনিষের expiry date এগিয়ে
আসছে। আপনার ওয়ার্ড্রোব আপনাকে পোশাক বেছে নিতে সাহায্য করবে। আপনার ড্রেসিং টেবিলের আয়না আপনাকে জানিয়ে দেবে আজ কোন কোন বন্ধুকে বার্থডে উইশ করতে হবে। অফিসে বেরোবার সময় আপনার ফ্রিজ মনে করিয়ে দেবে আপনার দুধ মাখন মাছ মাংসর স্টক কতটা। অফিস থেকে
ফেরার পথে কি কি জিনিস নিয়ে আসতে হবে। কিম্বা আরও এক পা এগিয়ে সেই দোকানে নির্দেশ দিয়ে দেবে বাড়িতে এ সব জিনিস পৌঁছে দেবার জন্যে।
এক ধরণের Bio-stamp আসছে যা শরীরে লাগিয়ে রাখলে অনেকটা ট্যাটুর মত দেখাবে। এই নিরীহ দর্শন ট্যাটুটি কিন্তু নীরবে অনেক কাজ করে যাবে। যার শরীরে লাগানো থাকবে তার যাবতীয় বায়োমেট্রিক তথ্য – যেমন রক্ত-চাপ, সমস্ত পেশীর কার্যকলাপ, হৃদয় স্পন্দন, মস্তিষ্ক তরঙ্গ ইত্যাদি, সংগ্রহ করবে এবং তা ডাক্তারকে জানাতে থাকবে। আপনাকেও সাবধান করতে থাকবে। আর, অফিসে যাবার পর আপনার দৈনন্দিন কাজে ‘এ আই’ আপনার বস হবে, না আপনি ‘এ আই’-এর তা এখন বলা মুশকিল ।
মনে হতে পারে এ পর্যন্ত যা শুনলাম তাতে তো মনে হচ্ছে প্রাথমিক ভাবে কৃত্রিম মেধা আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজতর করে দেবার কাজই করবে।
কিন্তু প্রশ্ন হল, হাতে হাতে এতটা তৎপর হয়ে যন্ত্র রকম সাহায্য করতে থাকলে মানুষের মধ্যে সমস্যা মোকাবিলার যে সহজাত দক্ষতা আছে, সেটা কি ধীরে ধীরে লোপ পেয়ে যাবে না?
এর একটা অন্য দিকও আছে। তা হল, আমাদের আর অজ্ঞাপনীয় বলে কিছু থাকবে না। আমার দেহ ও মনের যে সব তথ্য আমাকে ভালো রাখার জন্যে ব্যবহার করা হবে, সে সব তথ্য অপব্যবহার করার রাস্তাটাও খুলে যাবে।
তবে এর সব চেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা হচ্ছে এ আই প্রযুক্তি যত উন্নতি করবে, ততই বেশি করে চাকরি হারাতে হবে কিছু কিছু পেশার মানুষজনকে। যেমন কলসেন্টারের কর্মীরা, সাংবাদিকরা, স্বাস্থ্য-কর্মীরা, শিক্ষকেরা, আইনজ্ঞরা, রেডিওলজিস্টরা, গাড়ি-চালকেরা এবং এরকম আরো অনেক বৃত্তির মানুষেরা। পৃথিবীতে আর্থিক বৈষম্য যা এমনিতেই বাড়ছে তা আরো বেড়ে যাবার সম্ভাবনা দেখা দেবে।
১৭৬০ সালে ইংল্যান্ডে শুরু হওয়া শিল্প বিপ্লবের প্রভাব ধীরে ধীরে সারা পৃথিবীতেই পড়েছিল। তাতে সমাজের শ্রেণিবিন্যাস অনেকটা পালটে গিয়েছিল। সমাজে বুদ্ধিজীবী এবং শ্রমজীবী দুটি আলাদা শ্রেণির জন্ম হয়েছিল। যন্ত্রের জয়যাত্রা শুরু হলেও শিক্ষক, চিকিৎসক, উকিল, স্থপতি, কবি, শিল্পী, দার্শনিক, এই জাতীয় কাজগুলি ছিল বুদ্ধিবৃত্তির আওতায়। আবার অন্য দিকে অনেক কাজ ছিল শ্রমভিত্তিক। এর মধ্যে মানুষের নিজস্ব উদ্যোগ, পরিশ্রম, নিষ্ঠা, অনুশীলন এবং পরম্পরা দ্বারা অর্জিত স্কিল বা দক্ষতার একটা মূল্য ছিল। প্রযুক্তির যত অগ্রগতি হল এই অনেকদিন ধরে অনুশীলন করা স্কিল বা দক্ষতার দাম ক্রমশ কমে আসতে লাগল। সমাজে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়
শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের চেয়ে কিছুটা সুবিধেজনক অবস্থায় থাকতে লাগল। এমন কি ডিজিটাইজেশন শুরু হওয়ার পরেও এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাগাভাগিটা বজায় ছিল। কিন্তু এবার প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে কৃত্রিম মেধার ব্যাপক ব্যাবহার শুরু হলে সেটা কি আর থাকবে?
এখনকার সময়ে দাঁড়িয়ে আপনি হয়তো ভাবতেও পারছেন না যে সামনের দশ বছরে দুনিয়া কতটা পাল্টে যেতে পারে! এবং আজকের ৭০%-৯০% চাকরিই সামনের ১০ বছরে সম্পুর্নভাবে বিলুপ্ত হতে চলেছে। আমরা ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছি “চতুর্থ শিল্প বিপ্লব”-এর যুগে।

অবশ্য ইতিমধ্যেই আমাদের চোখের সামনেই ব্যবসা-পত্তরের ধরণটাই অনেকটাই বদলে গেছে অন-লাইনের ধাক্কায় ।
উবের, ওলা জাতীয় কোম্পানিগুলো নিজস্ব কোনো গাড়ি না রেখেও শুধু সফটওয়ারের কেরামতিতে গাড়ি ভাড়ার ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করছে।
তেমনি একটাও হোটেলের মালিক না হয়েও শুধু হোটেল বুকিং এর ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে এয়ারবিএনবি, ওয়ো জাতীয় কোম্পানিগুলি।
আর কিছুদিন পরে গাড়িতে আর চালক লাগবেনা। তখন এই সব অ্যাপ দিয়ে বুকিং করলে চালকবিহীন গাড়ি এসে পড়বে আমাদের দুয়ারে। হয়ত চালকবিহীন গাড়ি হলে দুর্ঘটনার সংখ্যাও কমে যাবে । ট্রাফিক পুলিশের দরকারই পড়বে না।
এই রকম ওকালতির পরামর্শ দেবার জন্য, মনুষ্য দেহের রোগ নির্ধারন করার জন্যে সফটওয়ার বাজারে আসতে চলেছে। এতে ডাক্তার, উকিলদের প্রয়োজন কমবে।
এখন প্রায় সব বুদ্ধিজীবিকাই AI এর আওতায় এসে পড়বার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত আমরা যা জেনেছি কৃত্রিম মেধার প্রযুক্তি প্রয়োগ করে প্রাথমিক কিছু তথ্য দিলেই যে কেউ একজন নিজস্ব দক্ষতা না থাকা সত্বেও একটি বিশেষ বিষয়ের উপর একটি রচনা লিখে ফেলতে, ছবি এঁকে ফেলতে পারবে, নতুন সুর রচনা করে ফেলতে পারবে, অথবা কিছু প্রাথমিক সফটওয়ার কোডও লিখে ফেলতে পারবে।
ভবিষ্যতে মানুষের সৃষ্টিশীলতা, যা মানুষকে অন্য প্রাণীদের থেকে অনন্য করে রেখেছে তার কোনো মূল্য থাকবে কিনা সে রকম একটা আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে।
এ ছাড়াও যে বিপদগুলি নিয়ে শঙ্কা দেখা যাচ্ছে সেগুলি হল – ব্যাক্তিগত এবং পেশাগত জীবনের গোপনীয়তা আক্রান্ত হওয়া, ভ্রান্তিমূলক তথ্য থেকে বিপজ্জনক একপেশে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়া, অস্ত্র-শস্ত্রের জগতে ব্যাপক স্বয়ংক্রিয়করণ হয়ে যাওয়া, মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক ধরণের স্ব-সচেতন ‘এ আই’-এর
শক্তিশালী হয়ে ওঠা।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইউভান নোয়া হারারি ভয় পাচ্ছেন ভবিষ্যতে এ আই প্রযুক্তি আমাদের এই গ্রহের ইকোলজিক্যাল সিস্টেম বলতে আমরা যা বুঝি, সেটাই হয়ত বদলে দেবে।
দার্শনিক এবং কগনিটিভ সায়েন্টিস্ট ড্যানিয়েল ডেনেট আশঙ্কা করছেন যন্ত্রকে মানুষের সমকক্ষ করে তোলার চেষ্টা আমাদের মনুষ্যত্বের জন্যে একটি মৌলিক বিপদ দেকে আনতে চলেছি।
টেসলা কোম্পানির সি-ই-ও ইলন মাস্ক প্রশ্ন তুলেছেন – “ If the computer and robots can do everything better than you, does your life have meaning?”
বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিন্স একটি আরো সাংঘাতিক আশঙ্কা করেছেন – “ The development of full artificial intelligence could spell the end of the human race… It would take off on its own,
and re-design itself at an ever increasing rate. Humans, who are limited by slow biological evolution, couldn’t compete, and would be superseded.”

অন্যদিকে কৃত্রিম মেধার সমর্থনেও অনেক মত উঠে আসছে। বলা হচ্ছে, যদি আমরা আমাদের মূল্যবোধ এবং নীতিবোধের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কৃত্রিম মেধার ব্যবহারকে উৎসাহ দিই তাহলে আমরা তা থেকে আমাদের আগামী দিনের জীবনযাত্রার মানকে আরও উন্নত করে তুলতে পারব।
স্বাস্হ্যক্ষেত্রে, শিক্ষাক্ষেত্রে, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে, যোগাযোগের ক্ষেত্রে ‘এ আই’-এর প্রয়োগে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়ে যাবে। মেডিক্যাল ইমেজিং-এর সাহায্যে পারসোনালাইজড মেডিসিন তৈরি করা সম্ভব হবে। একজন অভিজ্ঞ রেডিওলজিস্ট যেভাবে ক্যান্সার রোগের প্রকোপ নির্ণয় করতে পারেন, একটি দক্ষ ‘এ আই সিস্টেম’ তার চেয়েও নির্ভুলভাবে ক্যান্সার শনাক্ত করবার ক্ষমতা রাখবে। শিক্ষার ক্ষেত্রে ‘চ্যাট–জিপিটি’, ‘স্টাডি-জিপিটি’ এই জাতীয় ‘এ আই টুল’ গবেষণার কাজকে আর সহজ করে দেবে। শিক্ষাকে গেমিং-এর সাহায্যে আকর্ষনীয় এবং গতিশীল করে তুলবে। যে কোনো ভাষার রিয়াল টাইম অনুবাদের সাহায্যে সারা পৃথিবী জুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করে
তুলবে।
আশাবাদী মানুষেরা আশা করছেন AI প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে নিতে পারবে। পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার নামই হল সভ্যতা। মানুষের উদ্ভাবন করা যন্ত্রের সঙ্গে শ্রমের স্থানান্তর করে নেওয়া, এইটা তো চিরকালই হয়ে এসেছে। নতুন কিছু নয়। এবার AI প্রযুক্তির সঙ্গে সেটাই করতে হবে ।
কিন্তু এবার সংকটের সম্ভাবনাটা একেবারে অন্যরকমের। কয়েক হাজার বছর ধরে মানুষ যে মানবীয় বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে অনেক অসম্ভব সম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে, সেই মানবিক বুদ্ধিকে গুরুত্বহীন করে দিতে পারে অ-মানবীয় বুদ্ধি। এই সময়ের অনেক বিশিষ্ট চিন্তাবিদরা মনে করছেন, মানুষের সৃষ্ট হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়ত একসময় মানুষের হাত থেকে রাশ ছিনিয়ে নিয়ে মানুষকেই তার পরাধীন করে দেবে। তখন এই ‘এ আই’ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

কিছু ‘এ আই’ গবেষনাগারে কিছু মানুষ অবশ্য রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করছেন যাতে ভবিষ্যতে ‘এ আই’ মানুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের মাপকাঠিগুলি মেনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখে। কিন্তু মানুষের মুনাফার লোভ বড় সাংঘাতিক জিনিস। এই মূহুর্তে পৃথিবীর অনেক বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানিগুলির মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা চলছে ‘এ আই’ কে কাজে লাগিয়ে কে আরো বেশি মুনাফা কামাতে পারে। হাজার হাজার প্রকৌশলী এবং গবেষকদের এরা মোটা মাইনে দিয়ে কাজে লাগাচ্ছেন এই উদ্দেশ্যে। আর কে না জানে কর্পোরেট জগতে নৈতিকতার দাম খুবই সামান্য।
এ আই প্রযুক্তি খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। গবেষকরা বলছেন প্রতি দশ এগারো মাসে নাকি ‘এ আই’-এর কম্পিউটেশন্যাল দক্ষতা দ্বিগুন হয়ে যাচ্ছে।
নতুন প্রযুক্তিকে আটকে রাখা হয়ত যাবে না। যেটা প্রয়োজন, সেটা হল এই প্রযুক্তির অপব্যবহার বা অতিব্যবহারকে আটকানোর সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া।
সুখের কথা, এই নিয়ে যখন বিশ্বব্যাপী একটা ভাবনা চিন্তার আলোড়ন দেখে দিয়েছে, আশা করা যেতে পারে মানুষের অকৃত্রিম শুভবুদ্ধি, যা মানুষকে যুগ যুগ ধরে সঠিক পথ দেখিয়ে এসেছে, সেই শুভবুদ্ধিই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সংহত এবং সংযত করে রাখতে সক্ষম হবে।