শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বাঙালির জীবনচর্চায় ‘উদরবিভাগ’-এর উজ্জ্বল উপস্থিতি

Somen Dey

খুব প্রাচীন কালের বাঙালির খাদ্যাভাস কেমন ছিল তা নিয়ে কোনো সুসংবদ্ধ নথি পাওয়া না গেলেও এটা বোঝা যায় ভাত খাওয়াটা অস্ট্রিক ভাষাভাষী আর আদি-অস্ট্রেলীয় মূল জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি থেকেই প্রবাহিত হয়েছে বাঙালির মধ্যে। অস্ট্রিকরাই এ দেশে প্রথম চাষ-বাসের প্রচলন করেছিল। সেটা প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের কথা। আর্যরা চাষবাস করতে জানত না। তারা মূলত পশুপালক ছিল। পরে অস্ট্রিকদের কাছেই তারা চাষ করতে শেখে। অস্ট্রিকরা কাঠের লাঙলে প্রধানত ধান চাষ করত। বাংলার গ্রামে গ্রামে যা আজও চালু আছে। লাঙল শব্দটিও অস্ট্রিক ভাষা থেকেই নেওয়া। আর মাছ খাওয়াটা বাঙালি শিখেছে এই অঞ্চলে জলা ভূমির প্রাচুর্য্যর কারণে। তবে সেটা ঠিক কবে থেকে তা নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও চন্দ্রকেতুগড়ে মাছের রিলিফ সহ কিছু ফলক পাওয়া গেছে যা চতুর্থ শতকের বলে মনে করা হয়। পাহাড়পুর এবং ময়নামতীতেও এমন ফলক পাওয়া গেছে যাতে মাছ কোটা এবং ঝুড়িতে করে মাছ বিক্রির ছবি আছে। এগুলি অষ্টম শতাব্দীর বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। অতএব তখন থেকেই বঙ্গদেশের লোকেদের কাছে মাছ ভাত প্রধান খাদ্য হয়ে গেছে সেটা ধরে নেওয়া যেতে পারে।

পাহাড়পুর মন্দিরে মাছের রিলিফ (অষ্টম শতাব্দী)

গুপ্ত যুগের আগে বা সেই সময় অবধি আমরা বাঙালির সংস্কৃতি এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ে কিছু বিক্ষিপ্ত তথ্য মাত্র পাওয়া গেছে, তা ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় বাঙালির ইতিহাস লিখতে গিয়ে স্বীকার করেছেন। তবে মধ্যযুগের সময় থেকে বাংলায় যে সব সাহিত্য রচিত হয়েছে তা থেকে বাঙালির খাওয়া-দাওয়া নিয়ে মোটামুটি কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। কারণ সেখানে মঙ্গলকাব্যের কবিরা তখনকার খাওয়া-দাওয়া নিয়ে বেশ বিশদে আলোচনা করেছেন। সে সব পড়লে সেই সময়ের লোকজনদের খাওয়াদাওয়ার বহর দেখে বাঙালিকে জাত হিসাবে গৌরবার্থে ‘ভোজনরসিক’ অথবা নিন্দার্থে ‘পেটুক’ বলা যেতেই পারে।
মধ্যযুগে এসে পদ্মাপুরাণ, মনসামঙ্গল, চন্ডীমঙ্গল কাব্য এবং ভরতচন্দ্র, ঈশ্বর গুপ্তর নানান লেখা থেকে বঙ্গদেশে খাদ্য হিসেবে প্রচলিত যে সব মাছেদের কথা জানতে পারা যায়, সেগুলি হল – আড়, ইচা, ইলিশ, উলকা, এলেঙ্গা, কাতল, কালবসু, কৈ, খয়রা, খরশোলা, খলিশা, গড়ুই, গাগর, গাঙ্গধারা, চাঁচর, চিংড়ি, চিতল, চেং, চেলা, ট্যাংরা, চাঁদা, ডানিকেনা, তাপসে, তেচক্ষা, পাঙ্গাল, পাঙ্গাস, পাবদা, পার্শে, পুঁটি, ফলুই, বাঁশপাতা, বোয়াল, মৌরলা, রিঠা, রুই, শঙ্কর, শাল, সিঙ্গি, মহাশোল ইত্যাদি। এর মধ্যে অনেক মাছই এখন আর পাওয়া যায় না।

পটচিত্রে মাছরান্না

মাছ পাওয়া গেলেই তো হবে না। বাঙালি যে মাছের স্বাদ ও গুণাগুণ বিচার করে এক এক মাছের এক এক রকমের রন্ধন প্রণালী নির্ণয় করেছে তাতে সেকালের নারীদের যথেষ্ট উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। মাছের রেসিপির এমন বিচিত্র কম্বিনেশন, পৃথিবীর আর কোথাও আছে বলে মনে হয় না। এই যেমন মাগুর মাছ দিয়ে গিমা শাক, কুমড়ো আলু বড়ি দিয়ে রুই মাছের ঝোল, মরিচ দিয়ে কৈ মাছের ঝোল, শোল মাছের কাঁটা বার করে আমের সঙ্গে রান্না, লাউ চিংড়ি, মাগুরের হিঙ্গি, রুইয়ের পোটলি, মৌরলার বাটি চচ্চড়ি, কইয়ের তেল-কই, ভেটকির পাতুরি, ইলিশের ভাপা ইত্যাদি ইত্যাদি।
বিভিন্ন মাছের আলাদা আলাদা রন্ধন পদ্ধতি নিয়ে মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলে আমরা যা পাচ্ছি, তা এই রকম –
“কটু তৈলে রান্ধে রামা চিতলের ঝোল।
রূহিতে কুমড়া বড়ি আলু দিয়া ঝোল।।
কটুতৈলে কই মৎস ভাজে গণ্ডা দশ।
মুঠো নিঙ্গাড়িয়া তথি দিল আনারস।।
সদরি শকুল মীন রসাল মুশরি।
পদ চারি ভাজে রামা সরল-সফরি।।
কতগুলি তোলে রামা চিংড়ির বড়া
ছোটো ছোটো গোটা চারি ভাজিল কুমুড়া।।”

একটি প্রাচীনকালের প্রচলিত শ্লোকে বলা হয়েছে কলা পাতায় গরম ভাত, গাওয়া ঘি, মৌরলা মাছের ঝোল, এবং নালিতা শাক যে নারী তার স্বামীকে রোজ পরিবেশন করতে পারে তাহার স্বামী অত্যন্ত পুণ্যবান। এটা বোধহয় একালেও খুব একটা মিথ্যে নয়।
বিদ্যাপতির মতে বাংলাদেশের সেরা জিনিষ ছিল ঘি। তাই বাংলাকে তিনি বলেছিলেন ‘আজ্যসার গৌড়’। আজ্য মানে ঘি। এখন অবশ্য বাংলার সেই খাঁটি ঘিয়ের গৌরব আর আজ নেই।
বিয়ের ভোজে কি খাওয়ানো হত তার বিবরণ পাওয়া যায় দময়ন্তীর বিয়ের বিবরণে। এর মধ্যে ছিল হরিণ, ছাগ, এবং কিছু পাখির মাংস। নানা রকমের মাছের ব্যঞ্জন, প্রচুর মশলা যুক্ত আরো অনেক রকমের ব্যঞ্জনাদি, দই এবং সুমিষ্ট পিষ্টক। এবং শেষে এক খিলি পান।

আর নল রাজার বিয়েতে বরযাত্রীদের খাওয়ানো হয়েছিল অভিনব সব খাবার। এমন কিছু ‘আকালিক বস্তু’ খাওয়ানো হয়েছিল যা দেখে মনে হচ্ছিল অন্য ঋতুর ফল। কিছু নিরামিষ খাবার মনে হয়েছিল আমিষ খাবার। অর্থাৎ শুধু রন্ধনে নয়, পরিবেশনের সঙ্গেও তখন শিল্পবোধ জড়িত ছিল।
আর এক ভোজের বর্ণনা পাচ্ছি নৈষধকাব্যে। চাঁদ সদাগরের ছেলের বিয়ে। বেহুলার শ্বশুরালয়ে আগমন উপলক্ষে যে ভোজসভার আয়োজন হয়েছে সেখানে রান্না হয়েছে বেসন দিয়ে চিতল মাছের কোল ভাজা, জিরে আর লবঙ্গ মাখিয়ে কই মাছ ভাজা, লঙ্কা দিয়ে মাগুর মাছের ঝোল, আম দিয়ে কাতলা মাছ, মহাশোলের অম্বল, চিংড়ি মাছের রসালাস, পাবদা মাছ ও আদা দিয়ে শুক্তুনি, তেঁতুল লংকা দিয়ে বোয়াল মাছের ঝাঁটি, পুঁটি মাছ ভাজা এই রকম সব মিলে মোট আঠারো রকমের মাছের পদ। এর সঙ্গে ছিল হরিণ, পাঁঠা, ভেড়া, পায়রা ও কচ্ছপের মাংসও।
জানা যাচ্ছে সেই সময়ে একটু অবস্থাপন্ন বাঙালির বিয়ে বাড়িতে এত রকমের ব্যাঞ্জন হত যে তা সব কিছু খাওয়া তো দূরের কথা গুনেও শেষ করা যেত না। বলা বাহুল্য, এতে প্রচুর অপচয় হত।
আমিষ খাওয়া নিয়ে বাঙালির বিশেষ কোনো ধর্মীয় সংকোচ ছিল না। যদিও আর্য্য সভ্যতা বাঙালির আমিষ প্রীতিকে ভালো চোখে দেখত না। আর্য্য ব্রাহ্মণ্য ভারতবর্ষ ক্রমশ নিরামিষ আহারের পক্ষপাতী হয়ে উঠলেও বাংলার প্রথম এবং অন্যতম প্রধান স্মৃতিকার ভট্ট ভবদেব সুদীর্ঘ যুক্তির উপস্থাপনা করে বলেছেন কিছু বিশেষ বিশেষ তিথি ছাড়া অন্য সব দিনে বাঙালির আমিষ খাওয়াতে কোনো সমস্যা নেই। আসলে হয়ত সেইসময়েও বাঙালির মাছ মাংস প্রীতি এতটাই প্রবল ছিল যে ভট্ট ভবদেব জনগণের আমিষ-খাদ্য প্রীতিকে গুরুত্ব না দিয়ে পারেন নি।

বাঙালির আমিষ প্রীতি

তরকারীর মধ্যে বেগুন, লাউ, কচু, কাঁকরোল, কুমড়ো, ঝিঙ্গে এবং নানা রকমের শাক, চিরকালই বাঙালি খেত। কালকেতুর মাকে গর্ভাবস্থায় সাধভক্ষণ উপলক্ষে যে সব পদ খাওয়ানো হয়েছিল আর মধ্যে ছিল পাকা চালতের ঝোল, হেলেঞ্চা, কলমি, গিমা, পলতা শাক। পুঁই ডগা, মুখী-কচু আর ফুলবড়ি দিয়ে মরিচের ঝাল। মুলো, বেগুন, শিম, উড়ুম্বের ফল দিয়ে রান্না ইত্যাদি।
প্রাচীনকালে আলুর প্রচলন ছিল না। মধ্যযুগে সম্ভবত পর্তুগীজদের প্রভাবে আলু আমাদের তরকারির তালিকার ঢুকে পড়েছে।
আর ডাল খাওয়ার প্রচলন প্রাচীনকালের বাঙালিদের মধ্যে ছিল না। ডাল খাওয়াটা আর্য্যদের আসার পরে মধ্যযুগের কোনো সময়ে শুরু হয়েছে।
এ ছাড়া ফলের মধ্যে আম, কাঁঠাল, নারকেল, তাল, আখ এবং কলা খাওয়ার চল ছিল। আখের রস থেকে গুড় বানানো হত প্রাচীন কাল থেকেই।
গৌড়ীয় মদের খ্যাতি ছিল সারা ভারতে। ভাত, গম, মধু, ইক্ষু, তালরস ইত্যাদি গাঁজিয়ে মদ তৈরি হত এবং তা খুবই জনপ্রিয় ছিল। ভট্ট ভবদেব যদিও দ্বিজদের জন্য মদ্যপান নিষিদ্ধ বলে নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু সবাই মেনে চলতেন বলে মনে হয় না। অনেক চর্যাগীতির মধ্যে শুঁড়িখানার উল্লেখ আছে। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য্যদের মধ্যে মদ খাওয়া খুব গর্হিত কাজ মনে করা হত না।

তবে সাধারণ গৃহস্থ ছা’পোষা বাঙালির প্রাচীনতম ব্যঞ্জন হল শাক। শস্য শ্যামলা নদী-জপমালা-ধৃত প্রান্তরের বঙ্গদেশে চারিদিকে শাক পাতার এই প্রাচুর্য্য থেকেই বাঙালির শাক খাওয়ার প্রচলন হয়েছে। মধ্যযুগে রচিত মঙ্গলকাব্যগুলিতে নানা রকমের শাকের উল্লেখ পাওয়া যায়। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চন্ডীমঙ্গল কাব্যে পাওয়া যাচ্ছে এক পরিচারিকা শাক তুলতে গিয়ে সংগ্রহ করছে নানা রকমের শাক –
“নটে রাঙ্গা তোলে শাক পালং নলিতা
তিক্ত ফলতার শাক কলতা ফলতা।
সাঁজতা বনতা বন পুঁই ভদ্র পলা
হিজলি কলমি শাক জাঙ্গি ড়াঁড়ি পলা।
নটিয়া বেথুয়া তোলে ফিরে ক্ষেতে ক্ষেতে
মহুরী শূলকা ধন্যা ক্ষীর পাই বেতে।“ …

দ্বিজ বংশীদাসের মনসামঙ্গল কাব্যে আবার শাক রান্নারও পদ্ধতি বলা আছে।
“প্রথমে নালিতা শাকে রান্ধিলেক ঘৃতপাকে
কদুশাকে নারিকেল বাটি।
সাঞচা-শাক ঘৃতে ভাজে আদা দিয়া তার মাঝে
মাটা-শাক জিরা লং বাটি।
পালই-শাক বস্যায়া ভাজে ভাজে তারে ঘৃত দিয়া।
পরে দিল মরিচ লবঙ্গ।”
চৈতন্যদেবের মা তাঁর জন্যে কুড়ি রকমের শাক রান্না করেছিলেন বলে উল্লেখ আছে চৈতন্যচরিতামৃতে। এর মধ্যে ছিল অচ্যুতা, কলমি, নটে, নালিতা, নিম,পটোল, পাট শাক, পালং, পুঁই, পোর লতার শাক, বেতাগ, বেনাতি, লাউয়ের ডগা, হেলেঞ্চা ইত্যাদি।

বাংলার শাকপাতা

বাঙালির রান্নার প্রাথমিক পদ্ধতি মধ্যযুগ থেকে খুব একটা বদলায় নি। ভাজা, পোড়া, শুক্তো, সিদ্ধ, ঘন্ট, ছেঁচকি, ছ্যাঁচড়া, চচ্চড়ি, ছক্কা, ছোকা, ঘ্যাঁট, লাবড়া, ঝাল, ঝোল, ডালনা এবং অম্বলের উল্লেখ আমরা মধ্যযুগের সাহিত্যে পাই। আর এখনও নেই নেই করে এ সব টিকে আছে। তবে বাড়িতে রান্না না করেও অনলাইনে নাকি এসব আনিয়ে নেওয়া যাচ্ছে। যেমন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী শুক্তো রান্নার যে বিবরণ দিয়েছেন তা আজও মেনে চলা হয়।
“বেগুন কুমড়া কড়া, কাঁচকলা দিয়া শাড়া
বেশন পিটালী ঘন কাঠি।
ঘৃতে সন্তলিল তথি হিঙ্গু জিরা দিয়া মেথি
শুক্তা রন্ধন পরিপাটী। “
বাঙালি যে রন্ধনবিদ্যাকে যথেষ্ট মর্যাদা দিয়ে দেখত তার প্রমাণ উনিশ শতকে বিশ্বেশ্বর তর্কালঙ্কার মশাই নব্যন্যায়ের চর্চা ছেড়ে মন দিয়েছিলেন রন্ধন বিদ্যায়। ১৮৩১ সালে তিনি বাংলায় প্রথম রন্ধন শিল্প নিয়ে একটি বই লেখেন। বইটির নাম ‘পাক রাজেশ্বর’। এটা অনেকটা নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত এম আই টির অর্থনীতির অধ্যাপক অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যারের রান্নার বই (কুকিং টু সেভ ইয়োর লাইফ) লেখার মত ব্যাপার।
এর সাতাশ বছর পরে আর এক ন্যায় শাস্ত্রের পন্ডিত গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশও একটি রান্নার বই লেখেন, যার নাম ছিল ব্যাঞ্জন রত্নাকর। এই দুটি বইতেই মাংস রান্নার অনেক রকমের পদ্ধতির কথা আছে যা আজকের বাঙালির কাছে একেবারেই অপরিচিত। আছে ভেড়া, কচ্ছপ, হরিণ, খরগোসের মাংস রান্নার নানা রকমের রেসিপি। যেমন বিশ্বেশ্বর তর্কালঙ্কারের বইতে আছে তিলের তেল ছাগলের মাথা ও নাড়িভুড়ি রান্নার রেসিপি। গৌরীশঙ্করের বইতে আছে মাংস দিয়ে করলা ও বেগুনের শুক্ত প্রলেহ।

বাংলায় প্রথম রান্নার বই

এর পরে বিপ্রদাস মুখার্জি, যিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক ছিলেন, কিন্তু তার সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে গবেষণাও করতেন, তিনি পাঁচ খন্ডে লিখলেন ‘পাক-প্রণালী’ এবং সঙ্গে লিখলেন দুই খন্ডে ‘মিষ্টান্ন পাক’। এর শেষ খন্ড প্রকাশ পায় ১৮৯৩ সালে। এই বইয়ে তিনি উল্লেখ করলেন উনপঞ্চাশ রকমের সন্দেশের কথা এবং আঠারো রকমের ক্ষীরের মিষ্টির কথা।
নিরামিষ খাবারের তালিকায় ছিল একুশ রকমের লুচি, চৌত্রিশ রকমের রুটি আর একত্রিশ রকমের পরোটার কথা। এর অনেক কিছুর এ যুগে নামই আমরা শুনিনি।
এ ছাড়া কদম ফুলের অম্ল, ডিমের মোহন ভোগ, কমলালেবুর পোলাও, গলদা চিংড়ি মাছের রসবড়া, বাঁশের কোঁড়ার ডাল্লা জাতীয় বিচিত্র পদের সম্পূর্ন রেসিপি দেওয়া আছে। বিপ্রদাস এত সব রান্নার রেসিপি কোথা থেকে এবং কী ভাবে সংগ্রহ করেছিলেন সে বিষয়ে অবশ্য তিনি কিছুই লিখে যান নি।
এর পরে এক অসামান্য কাজ করেছেন এক ঠাকুর বাড়ির মেয়ে। তাঁর নাম প্রজ্ঞাসুন্দরী। তিনি ছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের তৃতীয় পুত্র হেমেন্দ্রনাথের কন্যা। হেমেন্দ্রনাথের নিজের রন্ধন বিদ্যা নিয়ে প্রচুর আগ্রহ ছিল। তিনি কয়েকটি রসায়ন শাস্ত্রের বই লিখেছিলেন। রন্ধনবিদ্যাকে তিনি উচ্চ ধরণের আর্ট বলে করতেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল একটি রান্নার বই লেখার, কিন্তু হয়ে ওঠেনি। তবে একটি খাতায় রান্না বিষয়ে অনেক কিছু লিখে গেছলেন। সেটি পেয়েছিলেন প্রজ্ঞা। ১৮৯১ সালে প্রজ্ঞার বিয়ে হয় আসামের লক্ষ্মীনাথ বেজবড়ুয়ার সঙ্গে। বিয়ের পর স্বামীর সহযোগিতায় রন্ধনবিদ্যা নিয়ে রীতিমত গবেষণা করেন। এবং প্রচুর পরিশ্রম করে লেখেন তিন খন্ডের – আমিষ ও নিরামিষ আহার।
তিনি যে শুধু রান্না নিয়ে লেখালেখিই করতেন তা নয় তিনি নিজে একজন রন্ধন-পটীয়সীও ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের পঞ্চাশতম জন্মদিনে তিনি একটি কপির বরফি রেঁধেছিলেন খোয়াক্ষীর, বাদাম কিসমিস, জাফরান পাতা, সোনা রূপার তবক দিয়ে। সেটা যে কপি দিয়ে তৈরি সেটা কেউ বুঝতেই পারেনি। তিনি তাঁর বইতে শুধু নানা রকমের পদের রান্নার রেসিপিই দেননি, ভাত রান্নার ফ্যান গালা থেকে, উনুন তৈরি করা, রান্না ঘর কেমন হওয়া উচিত, সেখানে কি কি উপকরণ, বাসন পত্র ইত্যাদি থাকা দরকার সবই বিশদ ভাবে লিখে গেছেন।

প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী

প্রজ্ঞাসুন্দরীর পরে আমরা আর এক লেখিকাকে পাই ১৯২১ সালে। কিরণলেখা রায় একটি বই লিখলেন – “বরেন্দ্র রন্ধন”।এটি একটি সুসংবদ্ধ তিনশও পাতার গ্রন্থ। মূলত একান্ত বাংলার ঘরোয়া রান্না নিয়ে লেখা। বরেন্দ্র বলতে তিনি উত্তর বঙ্গে প্রচলিত রান্নার কথাই বলেছেন। তবে এর বাইরেও কিছু অন্য রান্নার কথা লিখেছেন। প্রচুর পরিশ্রম করে বইটি লেখা সমাপ্ত করলেও বইটির প্রকাশ তিনি দেখে যেতে পারেন নি। বইয়ের ভূমিকাটি তাঁর স্বামী শরৎকুমার রায় লিখে দিয়েছেন। ভূমিকার শেষে তিনি যা লিখেছেন তার সঙ্গে এই বইয়ের পাঠক নিঃসন্দেহে একমত হবেন – “ আমাদের পরিবারে পত্নীর রন্ধন নিপুনতার যে একটু খ্যাতি জন্মিয়াছিল তাহার কারণ জিজ্ঞাসু হইলে তিনি হাসিয়া কহিয়াছিলেন- “পাচিকার প্রধানতঃ দুইটি গুণ থাকা প্রয়োজন; একটি রন্ধনের প্রতি আন্তরিক অনুরাগ বা শ্রদ্ধা, অপর, রন্ধনকালে তৎপ্রতি গভীর মনোসংযোগ।” আমার পত্নীর অটল ধৈর্যশীলতা দেখিয়া আমার বোধহয় সুপাচিকার তৃতীয় গুণ ধৈর্যশীলতাও বটে।”
অনেক পরে ঠাকুর বাড়ির আর এক বৌও ঠাকুর বাড়ির রান্না নিয়ে একটি বই লেখেন। তাঁর নাম পূর্ণিমা ঠাকুর। পূর্ণিমার দুই তরফেই ঠাকুর বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। তাঁর মাতা ছিলেন দেবেন্দ্রনাথের পৌত্র দ্বিপেন্দ্রনাথের কন্যা। আর তাঁর বিয়ে হয়েছিল সত্যেন্দ্রনাথের পুত্র সুরেন ঠাকুরের পুত্র সুবীরেন্দ্রনাথের সঙ্গে। সেকালের শান্তিনিকেতনে তিনি শিক্ষকতার কাজ করতেন। সেই সময় রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ভাইঝি ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ইন্দিরাদেবী নিজে রান্না করতেন না। কিন্তু কোনো রান্না ভালো লাগলেই সেই রান্নাটি একটি খাতায় লিখে রাখতেন। ইন্দিরা দেবীর মৃত্যুর পর সেই খাতাটি পান পূর্ণিমাদেবী। মুলত সেই খাতা থেকেই এই বইটি তিনি লিখেছিলেন। এতে উনপঞ্চাশ রকমের মাছের রেসিপি, উনত্রিশ রকমের ডালের রেসিপি, এবং একত্রিশ রকমের মাংসের রেসিপি আছে। ঠাকুরবাড়ির লোকেরা (রবীন্দ্রনাথ সহ) যে একটু বেশি মাত্রায় খাদ্যরসিক ছিলেন তাতে আর সন্দেহ কী!

পূর্ণিমা ঠাকুর লিখিত রান্নার বই

মধ্যযুগে আমরা যে সব রান্নার বিবরণ আমরা সেই সময়ের সাহিত্য থেকে পাই তার মধ্যে বেশির ভাগের মধ্যেই মুসলমানী খাবারের প্রবেশ ঘটেনি। এমন কি পেঁয়াজ রসুনও বাঙালির রান্না ঘরে ঢোকেনি। বিশেষ করে রসুন তো বাঙালির কাছে বহুদিন অবধি অস্পৃশ্য ছিল। এমন কি বিশ শতকের চতুর্থ দশকে যখন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা অভিধান লিখছেন তখন তিনি রসুনকে ‘লোসুন’ বলে উল্লেখ করছেন। অবশ্য উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ঈশ্বর গুপ্তের লেখায় পোলাও, কালিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মুসলমান শাসন কালে রাজকর্মচারি হিসাবে হিন্দুদের কাজ করার সময় তাঁদের মুসলমান খাবারের সঙ্গে পরিচয় ঘটে থাকবে। তার থেকে ধীরে ধীরে হিন্দু বাঙালির রান্নায় মুসলমানী প্রভাব চলে এসেছে। একদা যে বাঙালির হেঁশেলে মুরগির মাংস তো দূরের কথা মুর্গির ডিমও ঢুকবার অধিকার পায় নি সেই মুর্গি ছাড়া তো বাঙালির দিন চলে না। আর এখনকার বাঙালির কাবাব ও বিরিয়ানির প্রতি আকর্ষণ দেখে খেতো স্বয়ং ওয়াজেদ আলি শাহও লজ্জা পেতেন।
বাঙালি যে ভোজনরসিক একথা কন্ঠভরে জানিয়ে দিতে বাঙালি কোনোদিনই দ্বিধা বোধ করেনি। আমাদের মঙ্গল কাব্যে তো খাওয়াদাওয়ার প্রসঙ্গ বার বার উঠেছে। রাজা মহারাজা বৈভব বোঝাতে অথবা ব্যাধ পত্নী ফুল্লরার দুঃখের বারমাস্যা বোঝাতে খাবারের প্রসংগ এসেছে বারে বারে। এমন কী রবীন্দ্রনাথও ইঙ্গিতে বলেই দিয়েছেন –
“তথাপি পষ্ট বলিতে নাহিতো দোষ
যে কথা কবির গভীর মনের কথা –
উদরবিভাগে দৈহিক পরিতোষ
সঙ্গী জোটায় মানসিক মধুরতা।”
বাঙালির নবজাগরণের কারিগর যে সব অনন্য ব্যাক্তিদের আমরা চিরপ্রণম্য বলে মনে করি তাঁদের অনেকেই তাঁদের অনেক মহৎ কাজের ফাঁকে তাঁদের উদরবিভাগটি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন এমন খবর আমরা পেয়েছি। তার কিছু উদাহরণ থাকলো এখানে।
মধ্যযুগের শেষ পর্বের বাংলা ভাষার প্রথম আধুনিক কবি এবং বাংলা ভাষার প্রথম সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত যে ভোজনরসিক ছিলেন সে কথা তাঁর শিষ্য বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা থেকেই জানতে পারি – “ ঈশ্বরচন্দ্রের বাটীর দ্বার অবারিত ছিল। দুই বেলাই ক্রমাগত উনুন জ্বলিত, যে আসিত সেই আহার পাইত। তিনই প্রায়ই ভোজের অনুষ্ঠান করিয়া আত্মীয়, মিত্র এবং ধনী লোকদিগকে আহার করাইতেন।”
আর ঈশ্বর গুপ্তের কাব্যেও উঠে এসেছে তাঁর ভোজনরসিকতার কথা –
“সুঁটির খিচুড়ি করে, খেয়েছে যে জন
ভুলিতে না পারে আর, তার আস্বাদন।”…
“এই শীতে মুগের খিচুড়ি যেই খায়
সে জন ভোজনে আর কিছু না চায়”

ঈশ্বর গুপ্ত, কবি এবং বাংলার প্রথম সম্পাদক

যাঁর হাত ধরে বাংলার নবজাগরণের সূচনা হয়েছিল বলে মনে করা হয়, সেই রামমোহন রায় নাকি একটি আস্ত পাঁঠার মাংস একাই খেয়ে ফেলতে পারতেন। তাঁর প্রতিদিনের অন্যান্য খাবারের সঙ্গে তালিকায় থাকত ৫০টা আম, ১২টা নারকেল আর ১২ সের দুধ। তিনি প্রকাশ্যে মুসলমানদের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া না করলেও, তাঁর বাড়িতে নিজস্ব মুসলমান বাবুর্চি ছিল বলে জানা যায়।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর যে ভ্রমণপিপাসু ছিলেন এ তো আমাদের সবার জানা। কিন্তু খাওয়াদাওয়ার ব্যপারেও তিনি বেশ শৌখিন ছিলেন। দুধ খেতে খুব ভালোবাসতেন। রোজ দশ বারো সের করে দুধ খেতেন। তিনি একবার ঘুরতে যাওয়ার সময় সঙ্গে গরু নিয়ে যান। দুধের স্বাদ যাতে মিষ্টি হয় সেই জন্যে প্রতিদিন প্রচুর গুড় আর ঘাস খাওয়ানো হত গরুকে।
সমাজসংস্কারক, শিক্ষাবিদ এবং বাঙালিদের জন্য প্রথম ইংরেজি শিক্ষার টেক্সট বইয়ের রচনা করেছিলেন যে প্যারীচাঁদ সরকার তাঁর খাওয়াদাওয়া নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত আছে। শোনা যায়, বারাসতে নবকৃষ্ণ মিত্রের বাড়িতে পাঁঠার মাংস রান্না হলে প্যারীচরণ সেই রান্না মাংসের অর্ধেক খেতেন আর বাকি অর্ধেক খেতেন তাঁর অভিন্নহৃদয় বন্ধু বিদ্যাসাগর মশাই।
বিদ্যাসাগর মশাই শুধু যে খেতেই ভালোবাসতেন তা নয়, তিনি খাওয়াতেও ভালোবাসতেন। এমন কি ক্ষেত্র বিশেষে নিজে রান্না করেও খাইয়েছেন। আর তাঁর ভোজনরসিকতার দুটি গল্প খুব প্রচলিত। একটি, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তখন সংস্কৃত কলেজের ছাত্র। তাঁদের কাব্যশাস্ত্রর অধ্যাপক ছিলেন জয়গোপাল তর্কালংকার। সরস্বতী পুজো উপলক্ষে ছাত্রদের তিনি একটি শ্লোক লিখতে বললেন। ছাত্রদের তিনি এই রকম শ্লোক মাঝেমাঝেই লিখতে বলতেন। ছাত্র ঈশ্বরচন্দ্র জয়গোপালের কথায় শ্লোক লিখলেন :-
‘লুচী কচুরী মতিচুর শোভিতং
জিলিপি সন্দেশ গজা বিরাজিতম্।
যস্যাঃ প্রসাদেন ফলারমাপ্রুমঃ
সরস্বতী সা জয় তান্নিরস্তরম্।’
যার অর্থ হল – ‘লুচি কচুরি মতিচুর, জিলেপি, সন্দেশ, গজা এই সব চমৎকার খাবার যার পুজোয় আমরা খেতে পাই, নিরন্তর জয় হোক সেই দেবী সরস্বতীর।
আর দ্বিতীয়টি, একটি শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে যারা পরিবেশন করে তাদের উদ্দেশ্যে লুচি কি ভাবে নিমন্ত্রিতদের কাছে যাচতে হয় সেটা বোঝাতে বলেছিলেন –
“হুঁ হুঁ দেয়ং হাঁ হাঁ দেয়ং দেয়ঞ্চ করকম্পনে
শিরসি চালনে দেয়ং ন দেয়ং ব্যাঘ্রঝম্পনে।”

যার মানে হুঁহুঁ করলেও দেবে, হাঁ হাঁ করলেও দেবে, মাথা নাড়লেও দেবে। শুধু দেবে না যখন তারা বাঘের মত ঝাঁপিয়ে দিতে না করবে।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

প্রসঙ্গত বলা যায় লুচি ঈশ্বর চন্দ্রের খুব প্রিয় খাদ্য ছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে তার নানা বিষয়ে অমত থাকলেও এক ব্যপারে কোনো অমিল ছিল না, সেটা হল এই লুচি।
বঙ্কিমবাবু লুচির প্রশস্তিতে বলেছিলেন –
‘যেখানে, পাচকরূপী বিষ্ণুকর্তৃক, লুচিরূপ সুদর্শন চক্র পরিত্যক্ত হয়, আমার মন সেইখানেই গিয়া বিষ্ণুভক্ত হইয়া দাঁড়ায়। অথবা যে আকাশে লুচি-চন্দ্রের উদয় হয়, সেইখানেই আমার মন-রাহু গিয়া তাহাকে গ্ৰাস করিতে চায়। অন্যে যাহা বলে বলুক, আমি লুচিকেই অখণ্ড মণ্ডলাকার বলিয়া থাকি।’
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ স্বল্পাহারী ছিলেন। কিন্তু খেতে ভালোবাসতেন। মিষ্টির মধ্যে নারকেল নাড়ু আর জিলিপির উপর পক্ষপাত ছিল। ইলিশ মাছের প্রতি দুর্বলতা ছিল। ইলিশ মাছ খেলে পেট গরম হয়, একথা কেউ মনে করিয়ে দিলে তিনি তাঁর স্বভাবচিত গভীর দর্শনের কথা সহজ ভাবে যে ভাবে বলতেন সেই ভাবে বলেছিলেন – ‘ডাব মাটির ত্রিশ হাত ওপরে সর্বক্ষণ রোদ যাচ্ছে, কিন্তু খেলেই শরীর ঠান্ডা। কিন্তু ইলিশ গঙ্গার দশ হাত গভীর অন্ধকারে ঘুরে বেড়ায়, অথচ খেয়েছ কি পেট গরম।
বরাহনগরে সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরের কাছে ‘ফাল্গুর দোকান’ নামের একটি দোকান ছিল। ওই দোকানের বিখ্যাত কচুরি ঠাকুর খেয়েছেন আশ মিটিয়ে, গিরিশ ঘোষসহ তাঁর ভক্ত শিষ্যদের কাউকে খাওয়াতে বাকি রাখেননি তিনি।
কচুরি জিনিসটি তাঁর প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দেরও এতটাই প্রিয় ছিল যে তিনই ঠাট্টা করে বলতেন – আমি হলাম কচুরি সম্প্রদায়ভুক্ত সন্ন্যাসী। এ ছাড়া খিচুড়ি, ভাজাভুজি, চপ কাটলেট, এসব খেতেও ভালবাসতেন। বিদেশে গেলে সঙ্গে নিয়ে যেতেন মুগডাল, পাঁচফোড়ন আর কাঁচা লঙ্কা। কাঁচা লঙ্কা তাঁর অতি প্রিয় বস্তু ছিল। মিষ্টি খেতেও ভালবাসতেন। তবে ডায়বিটিস থাকার কারণে মিষ্টি খাওয়া বারণ হয়ে গেছল। নিজে ভাল রান্না করতে পারতেন এবং রান্না করাটাকে এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে একবার বাগবাজারের বলরাম বসুর বাড়িতে ভুরি ভোজ খাওয়ার পর তামাক খেতে খেতে বলেছিলেন – ‘যে ভাল রাঁধতে পারে না, সে ভাল সাধু হ’তে পারে না-মন শুদ্ধ না হ’লে ভাল সুস্বাদু রান্না হয় না।’

স্বামী বিবেকানন্দ

সেই সময়ের আরো অনেক মনীষীদের নিয়ে যে সব গল্প প্রচলিত আছে তার বিবরণ দিয়ে এই নিবন্ধ দীর্ঘায়িত না করে বরং চলে যাওয়া যাক বেঙ্গল রেনেঁসার যাঁকে শেষ প্রতিভূ বলা হয় সেই সত্যজিৎ রায়ের কথায়।
লেখক শঙ্কর তাঁকে তাঁর পছন্দের খাবারের কথা জিজ্ঞেস করাতে তিনি বলেছিলেন –
“আমার প্রিয় খাবার অঢ়র ডাল, সোনা মুগের ডাল। আগে মাংস খুব খেতাম — এখন সপ্তাহে একদিন। আগে মুরগি খুব ভাল লাগতো, এখন গা-সওয়া। ভাল ইলিশ, কিংবা ভাল রুই — অন্য কোনো মাছের ভক্ত নই। স্যরি, ভেটকি মাছের ফ্রাই আলাদা একটা ব্যাপার। সব্জির ভক্ত নই, বড় জোর কড়াইশুঁটি। মিষ্টি বলতে বর্ধমানের মিহিদানা, শক্তিগড়ের ল্যাংচা, জয়নগরের মোয়া, রাজস্থানের জিলিপি। মোস্ট ফেভারিট : নতুন গুড়ের সন্দেশ — বোথ কড়া অ্যান্ড নরম পাক। দইও ভাল লাগে, ছানার গজা। একটা জিনিস আজকাল পাই না, বোধ হয় উঠে গিয়েছে — মুগের নাড়ু। চায়ের সঙ্গে
কেক-ফেক নয় — হয় লঙ্কা দিয়ে মুড়ি, না হয় চিড়েভাজা। দিনে চার-পাঁচ কাপ চা।”

সত্যজিতের চলচ্চিত্রে বাঙালির অন্দরমহলের চিরকালীন আহার-চিত্র

আসলে লক্ষ করলে দেখা যাবে আগেকার দিনের বড় মাপের বাঙালি ব্যক্তিত্বের কাছে খাওয়াদাওয়াটাও ছিল অনেকটা তাঁদের বাঙালিয়ানার একটা প্রকাশ ভঙ্গী, যা তাঁদের কাজের মধ্যেও খুব স্পষ্ট ভাবে প্রতিফলিত হয়েছে নানা ভাবে।
আর এখন যেমন বাঙালির শিল্প-সাহিত্য এবং অন্য সব রকমের প্রকাশ মাধ্যমে বাঙালিত্বের চিহ্ন খুব কষ্ট করে খুঁজে পাওয়া যায়, তাদের খাদ্যরুচিতেও যে তেমনটাই যে হবে তাতে আর আশ্চর্যের কি আছে!

তথ্যঋণ –
বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব) – নীহাররঞ্জন রায়
বাঙালির ইতিহাস – সুভাষ মুখোপাধ্যায়
বাঙালির খাদ্যকোষ – মিলন দত্ত
বাঙালির খাওয়াদাওয়া – শঙ্কর
মিষ্টান্নপাক – বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়
পাক-প্রণালী – বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়
পাক রাজেশ্বর – বিশ্বেশ্বর তর্কালঙ্কার
আমিষ ও নিরামিষ আহার- প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী
বরেন্দ্র রন্ধন – কিরণলেখা রায়
ঠাকুর বাড়ির রান্না – পুর্ণিমা ঠাকুর
হাজার বছরের বাংলা সংস্কৃতি – গোলাম মুরশিদ
থোড় বড়ি খাড়া – কল্যাণী দত্ত
চিত্রিত পদ্মে – অরুণ নাগ
পিঞ্জরে বসিয়া – কল্যাণী দত্ত
এবং অন্তর্জাল থেকে পাওয়া কিছু তথ্য।

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.