শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

সেকালের অন্তঃপুরের চালচিত্র এবং বাংলা ছড়ায় ধরা তার কিছু মর্মকথা

অন্তঃপুর শব্দটির অস্তিত্ব আজকাল অভিধানের বাইরে আর তেমন নেই । অন্তঃপুর বলতে ঠিক কি বোঝাতো তা যদি নতুন প্রজন্মের কেউ জানতেই চায়, তাহলে তাকে পুরোনো কালের গল্প উপন্যাস বা সেই সময়ে লেখা কোনো মহিলার আত্মকথা পড়া ছাড়া উপায় নেই। বাঙালির একান্নবর্তী পরিবারকে পটভূমি করে লেখা সেই অনবদ্য গল্প-উপন্যাসগুলো অবশ্য ততদিন বেঁচে থাকবে যতদিন না আমরা বঙ্কিম-শরৎচন্দ্রের যুগ থেকে আশাপূর্ণা-বিমল মিত্তিরদের যুগ অবধি লেখা সব গল্প-উপন্যাসগুলোকে আবর্জনা ভেবে আমরা বিস্মৃতির অন্ধকারে নিক্ষেপ করতে সমর্থ হব । সেই রকম দুর্দিন বাঙালির জীবনে কোনোদিন আসবে কিনা জানিনা । তবে এখন এমন একটা সময় বোধহয় চলেই এসেছে যখন বাঙালির অন্দরমহলের সেই ‘ছোটো প্রাণ ছোটো ব্যথা / ছোটো ছোটো দুঃখ কথা’নিয়ে লেখা, গল্প উপন্যাস গুলো, এই সময়ে পটভূমিতে দাঁড়িয়ে খানিকটা অবিশ্বাস্যই মনে হচ্ছে । আরও কিছুদিন পরে, আগামী প্রজন্মের কাছে সেই সব গল্পগুলো হয়ত একেবারেই প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলবে । কালের গতির কাছে আমরা তো অসহায় ।

বাঙালির ভদ্রাসনের হেঁসেল কবে কিচেন, বৈঠকখানা কবে ড্রইং রুম, চানের ঘর কবে ওয়াশরুম হয়েছে আর অন্তঃপুর কবে একেবারেই অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে তার তো কোনো লিখিত ইতিহাস নেই। তবে মোটামুটি বলা যেতে পারে বিংশ শতাব্দীর চতুর্থ দশক থেকেই অন্দরমহল আর বাহিরমহলের বেড়াটা ক্রমে ভাঙতে শুরু হয়েছে ।

সেই সময়টা যখন বাড়ির অন্তঃপুরকে বাইরের আলো থেকে আড়াল করে রেখে দেওয়াটাই রীতি ছিল, সেই সময়টাকে খুব উজ্জ্বল যুগ তো বলা যাবে না। বরং প্রগতির নিরিখে বেশ পিছিয়ে থাকা সময়ই বলা যাবে। আসলে অন্দরমহল জায়গাটা ছিল একান্ত ভাবে মেয়েদেরই জগৎ। উনিশ শতকে তো বটেই বিশ শতকের প্রথম দিক অবধি সেই অন্তঃপুরে দিনের বেলায় পুরুষদের প্রবেশ একেবারেই নিষিদ্ধ ছিল। সেই সঙ্গে যে কোনো রকমের আধুনিকতার প্রবেশও অলিখিত ভাবে নিষিদ্ধ ছিল ।

রাসসুন্দরী দেবীর আত্মজীবনী

উনিশ শতকের ১৮৬৮ সালের রাসসুন্দরী দেবী যে আত্মজীবনী লিখেছিলেন, তাতে তিনি অন্তঃপুরের যে বর্ণনা দিয়েছেন সেখানে দেখা যাচ্ছে তাঁদের বাড়িতে আটজন চাকরানী ছিল। কিন্তু তারা সবাই ছিল ‘বাহিরের লোক‘। ভিতর বাড়ির কাজ করার জন্য কোনো লোক ছিল না। তাই তাঁর অনেক কটি সন্তানদের সামলে সংসারের সব কাজ একলাই সামলাতে হত। অন্ধকার থাকতে উঠে, বিগ্রহ সেবা করে রান্নার আয়োজন করতে হত। তিনি লিখেছেন সে রান্না বড় কম নয় ‘একসন্ধ্যা দশ বারো সের চাউল পাক করিতে হইত ।’

এদিকে বাড়ির কর্তাটির আবার স্নান করলেই গরম ভাত চাই। তাই আলাদা করে তার রান্না করে পরে বাকি সবাইকার রান্না করতে হত । তিনি লিখছেন – “এই প্রকার পাক করিতেই প্রায় বেলা তিনটা চারটা গত হইত”, এর মধ্যে আবার কোনো অতিথি এসে পড়লে কখনো কখনো সেই খাওয়াও আর জুটত না ।

রাসসুন্দরী যে সময়ের অন্দরমহলে একটা ছবি তাঁর লেখায় তুলে ধরেছিলেন , মোটামুটি সেই সময়েই , ১৮৭৬ সালের গোড়ার দিকে ইংল্যান্ডের যুবরাজ সপ্তম এডোয়ার্ড এই কলকাতায় এসেছিলেন । তাঁর খুব ইচ্ছে ছিল বাঙালি বাবুদের অন্দরমহলের চেহারাটা ঠিক কেমন হয়, সেটা নিজের চোখে দেখা । সেই সময়ের হাইকোর্টের খুব নামকরা উকিল জগদানন্দ মুখোপাধ্যায় এই কথা জানতে পেরে তাঁকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে অন্দর মহল দেখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন । জগদানন্দের বাড়িতে যুবরাজ এলে বাড়ির মেয়েরা তাঁকে শাঁখ বাজিয়ে, উলু ধ্বনি দিয়ে বরণ করেছিলেন । সেই নিয়ে কলকাতায় সে সময় নিন্দার ঝড় বয়ে যায় । এমন কি গ্রেট ন্যাশানাল থিয়েটারে ‘গজদানন্দ ও যুবরাজ’নামের একটি প্রহসনও মঞ্চস্থ করা হয় ।

রাসসুন্দরীর অন্দরমহলের ছবিটা যদি উনিশশতকের শেষের দিকের হয়, কল্যাণী দত্ত-র ‘সেকালের ভিতরমহল’নামের লেখায় আমরা যে ছবিটা পাই সেটা, বিশ শতকের মোটামুটি প্রথম দিকের। সেটা এই রকম –

“ কলকাতার যৌথ পরিবার অনেক সময় একটি বাড়িতে আবদ্ধ থাকত না , প্রায় গোটা পাড়া জুড়ে শেকড় গেড়ে বসত । সবাই সবাইকার হাঁড়ির খবর রাখত, সুখে দুঃখে ছুটে আসত, নিন্দেমন্দ, ঝগড়াঝাঁটি, কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি সবেরই ভাগাভাগি ছিল । সুগন্ধ বা সৌখিনতা ছিল না, অমার্জিত রূপ ছিল। অধিকাংশ পরিবারের কর্তারা মাস গেলে কিছু টাকা গিন্নির হাতে ধরে দিয়ে বাকি সময় সাংখ্যদর্শনের পুরুষের মতো আড়ালেই থাকতেন । গিন্নিরা কি শীত, কি গ্রীষ্ম রাত চারটেয় উঠে চৌবাচ্চার বাসি জলে স্নান করে, চুলে ঝুঁটি বেঁধে, তুলসি গাছে জল দিয়ে, ঠাকুরঘরে একটা প্রণাম সেরে রান্নাঘরে আসতেন । তখন ভোর পাঁচটা বাজত , বেরোতেন আন্দাজ দুটো । তারপরে ঠাকুরঘরের পালা সাঙ্গ করে বেলা আড়াইটে-তিনটের আগে তাঁদের ভাত খাওয়া ঘটত না । “

এই দুটি বর্ণনা পড়লে মনে হয় রবি ঠাকুরের ‘মুক্তি’ কবিতায় যে তিনি যে এক গৃহবধুর মর্মবেদনা বোঝাতে লিখেছিলেন –

“শুনি নাই তো মানুষের কী বাণী

মহাকালের বীণায় বাজে। আমি কেবল জানি,

রাঁধার পরে খাওয়া, আবার খাওয়ার পরে রাঁধা,

বাইশ বছর এক-চাকাতেই বাঁধা।”

সেই লেখা কোনো কাব্যিক অলঙ্করণ নয়, তৎকালীন বাঙালির অন্তঃপুরের এক অতি বাস্তব প্রতিচ্ছবি ।

অবশ্য রবীন্দ্রনাথের নিজের বাড়ির অন্দরমহলের অবস্থাটাও খুব একটা উন্নত ছিল না ।

প্রথম যুগের জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি

চিত্রা দেবের বর্ণনায় আমরা পাই –

“মনুর বিধান এবং মুসলমানী আবরু রক্ষার তাগিদ অনেকদিন থেকেই মেয়েদের একেবারে ঘরের আসবাবে পরিণত করেছিল । ঠাকুরবাড়িতেও এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেনি । অন্দরমহলে নিঃসম্পর্কিত পুরুষ প্রবেশ করতেন না, বাইরে বেরোতে হলে মেয়েরা চাপতেন ঘেরাটোপ-ঢাকা পালকি । হাতে সোনার কাঁকন, কানে মোটা মাকড়ি, গায়ে লাল রঙের হাতকাটা মেরজাই-পরা বেহারার দল কাঁধে নিয়ে যেত। সঙ্গে ছুটত দারোয়ান, হাতে লাঠি নিয়ে।”

কিন্তু এত কান্ড করে তাঁরা যেতেন কোথায়? যেতেন বড়জোর গঙ্গা স্নানে, বা কালে কস্মিনে আত্মীয় কুটুম্বের বাড়িতে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে ।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে কলকাতার খুব কিছু ধনীদের বাড়িতে দেখা যেত বৈষ্ণবীরা বাড়ির অন্দরমহলে গিয়ে মেয়েদের লেখা পড়া শেখাবার চেষ্টা করছে । কিছু পরে বৈষ্ণবীদের জায়গায় ইংরেজ শিক্ষিকাদের নিয়োগ করতেও দেখা গেল কিছু বাবুদের বাড়িতে । রাধাকান্ত দেব , নবকৃষ্ণ , প্রসন্ন কুমার ঠাকুর , কেশবচন্দ্র সেনের মত কিছু মানুষ বাড়ির মেয়েদের নিভৃতে লেখা পড়া শেখাবার উদ্যোগ নিলেও মেয়েদের বাইরে নিয়ে আসার ব্যবস্থা নেন নি ।

অন্দরমহলে বাইরের লোকের প্রবেশ তো নিষিদ্ধ ছিলই, এমনকি বাড়ির পুরুষমানুষদেরও দিনের বেলায় প্রবেশ নিষেধ ছিল । ঠাকুরবাড়ির মতো আলোকপ্রাপ্ত বাড়িতেও যখন এই রকম ব্যবস্থা ছিল, তখন অন্যান্য বাড়ির অবস্থা যে এর থেকেও খারাপ ছিল এ কথা অনুমান করা যেতেই পারে ।

ঠাকুর বাড়ির মেয়ে বউরা মাঝে সাঝে নিজেদের বাড়ির ছাতে যেতেন । তা অন্য লোকেদের চোখে পড়ায় , দেবেন্দ্রনাথকে কথা শুনতে হয়েছিল । দেবেন্দ্রনাথের পিসতুতো ভাই তাঁকে বলেন – “দেখো দেবেন্দ্র , তোমার বাড়ির মেয়েরা বাহিরে খোলা ছাতে বেড়ায় । আমরা দেখিতে পাই । আমাদের লজ্জা করে । তুমি শাসন করিয়া দাও না কেন ?”

জ্ঞানদানন্দিনীকে তাঁর স্বামী চেয়েছিলেন তাঁর যোগ্য সহধর্মিনী করে তুলতে । তিনি পদে পদে বাধা পেয়েছেন বাড়ির গুরুজনদের কাছ থেকেই । সেই বাড়িতেও দেখা যাচ্ছে একই সময়ে ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা যে সুযোগ পাচ্ছে, সেই সুযোগ সেই বাড়ির বউদের দেওয়া হচ্ছে না। প্রথমবার বোম্বাইগামী জাহাজে চড়ার সময় ঠাকুরবাড়ি থেকে যাত্রা করতে হয়েছিল ঢাকা পালকি চড়ে । সত্যেন্দ্রনাথের ইচ্ছে ছিল ঠাকুরবাড়ির দেউড়ি থেকেই গাড়িতে করে যাওয়ার । কিন্তু তাতে বাড়ির সবার, এমন কি দেবেন্দ্রনাথেরও অনুমতি পাওয়া যায় নি।

ঠাকুরবাড়ির বধূ জ্ঞানদানন্দিনী ও অন্যান্যরা

তবে অন্তঃপুর যে শুধুই নারীদের কাছে কারাগারস্বরূপ একটি জায়গা ছিল এমনটা বোধহয় নয়। প্রগতির আলো সেখানে যতটা পৌঁছানোর কথা ততটা না পৌঁছালেও, যৌথপরিবারের অন্তঃপুরে ,সহস্র কাজের মধ্যে মধ্যে মেয়েরা নিজেরাই খুঁজে নিতেন নিজেদের ভালো রাখবার মতো কিছু উপকরণ । সকালে বাড়ির ছেলে পিলেরা ইস্কুলে এবং পুরুষেরা অফিস কাছারিতে রওনা দিলে, তারপর তো অন্তঃপুরে মহিলা-রাজ শুরু হয়ে যেত। কাজকম্ম শেষ হলে কেউ বসতেন নভেল , বা পত্রিকা নিয়ে। কেউ করতেন সেলাই ফোঁড়াই । কুরুশের লেশ বুনতেন, চটের উপরে সুতো দিয়ে আসন বানাতেন , নক্সী কাঁথা বানাতেন, পুরো শাড়ির পাড় দিয়ে বাক্সো প্যাঁটরার ঢাকা বানাতেন। উল দিয়ে সোয়েটার বুনতেন ।

কয়েকজন মিলে তাস খেলাও হত, গাব্বু, বিন্তি, গাধা পিটাপিটি ইত্যাদি। গল্প করতে করতে জাঁতি দিয়ে সুপুরি কুচানো, নানা রকমের জর্দা দিয়ে পান সাজা, সেও চলত। সাধারণত আইবুড়ো মেয়েদের রান্না শেখার প্রথম ধাপ হত পান সাজা শেখা । চুন আর খয়েরের ব্যালান্স করা শেখা থেকেই পরের নুন মিষ্টি ঝালের মাপ করার হাত তৈরি হত। অবশ্য রান্না শেখার আগে শিখতে হত কুটনো কোটা । হাতে দাগ না লাগিয়ে কি করে থোড়, এঁচোড় ডুমুর এ সব কুটতে হয় তা বয়ঃজেষ্ঠরা শেখাতেন বয়ঃকনিষ্ঠদের। এ ছাড়া বড়ি দেওয়া, আমসত্ব, আচার বানানো এই সব তো ছিলই । ছিল নানা রকম ব্রত পালন, লৌকিক দেব দেবীর পুজো, বারো মাসে তেরো পার্বন তো শুধু কথার কথা নয়, অন্তঃপুরে সেই সব লেগেই থাকত। মায়েরা সন্তানের কল্যাণে বারো মাসে তেরো ষষ্ঠী, ইতু পুজো, উনুন পুজো, অরন্ধন, ভূত চতুর্দশী, গোটা সেদ্ধ, পৌষ সংক্রান্তি, একাদশী, পূর্ণিমা চক্রাকারে এই সব আসতেই থাকত। আর ছিল মাঝে মাঝে কুটুম বাড়িতে তত্ত্ব পাঠানো । সেই তত্ত্ব সাজানোর মধ্যে চলত কুটুমে কুটুমে এক ধরণের অঘোষিত প্রতিযোগিতা । এই সবের মধ্যে দিয়ে , ধর্মকর্ম পালনের তাগিদ যতটা ছিল তার চেয়ে বেশি ছিল বোধহয় অন্তঃপুরে আবদ্ধ জীবনের খানিকটা একঘেয়েমি কাটানোর, খানিকটা আনন্দের কণিকা খুঁজে নেওয়ার ছুতো।

অন্তঃপুরের মেয়েরা

এই অন্তঃপুরে পুরুষদের সাহায্য ছাড়াই যে সব শিল্পকর্ম সৃষ্টি হত তাতে কিন্তু পাওয়া যেত তাদের উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয়।
যেমন একান্ত ভাবে অন্তঃপুরের মেয়েদের তৈরি নক্সী কাঁথা বাঙালির অন্তঃপুরের নিজস্ব ভাবনা, রুচি, স্বকীয়তার প্রকাশ ছিল। তাদের অন্তঃপুর-আবদ্ধ বৈচিত্র‍্যবিহীন জীবনে অনেক কিছু দেখার, বা জানার তো সুযোগ ছিল না । ওই অন্তঃপুরের একফালি জানলা দিয়ে দেখা বাইরের জীবন অথবা গৃহস্থালীতে ছড়িয়ে থাকা নানান উপকরণ, বা কথক ঠাকুরের মুখে শোনা, বা পাঁচালিতে পড়া উপকথায় চরিত্ররাই এই শিল্পের বিষয় হয়ে উঠত ।

অন্তঃপুরের আর একটি সৃষ্টির উজ্বল ধারা ছিল মেয়েদের মুখে মুখে তৈরি করা ছড়া । অবশ্য যেহেতু অনাদি কাল থেকে মুখে মুখে ফেরা এই ছড়ার রচনাকারদের সম্মন্ধে কিছুই জানা যায় না , তাই এই সব ছড়া সব কটিই অন্তঃপুরের মেয়েদের দ্বারাই রচিত হয়েছে এমন কথা জোর করে বলা যায় না । তবে অনেক ছড়াতেই যে ভাবে উঠে এসেছে একান্তভাবে মেয়েদের গৃহস্থালির পরতে পরতে জড়ানো সুখ, দুঃখ আনন্দ বেদনার কথা তাতে এটাই মনে হয় ছড়ার জগতটা আসলে মেয়েদের নিজস্ব অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্র ।

অবনীন্দ্র নাথ ঠাকুর লিখেছিলেন –

“ছড়ার মধ্যে খেলার ছলে বাংলার ছেলেমেয়ে ও মায়ের জীবনের একটা দিক নিখুঁতভাবে ধরা পড়ে গেছে এবং সেই সঙ্গে বাংলার দৃশ্য পশুপক্ষী ঘরবাড়ি অশন-বসন, আচার-ব্যবহার সবই কোনোটা ছবির মতো আঁকা, কোনোটা পুতুলের মতো গড়া, কোনোটা গল্পের মতো নাটকের আকার।”

আর এক জায়গায় তিনি লেখেন –

“এই সব ছড়ার মধ্য দিয়ে তাদের প্রাণের সুর,তাদের চোখের দেখা সুপষ্ট এসে পৌঁছায় এখনো আমাদের কাছে ! আমাদের মায়ের চোখের দেখার মধ্য দিয়ে, মুখের কথার মধ্য দিয়ে । কত কালের কত মাসি-পিসির, মামা-মামীর, দাদা-দিদির কত খবর, কতকালের দেখা ষষ্টিতলা, রথতলা, অপার নদী তেপান্তর মাঠ, কত দুঃখের দিনের, সুখের দিনের ঘরের বাইরের ছবি যে এসে যায়, তার ঠিকঠিকানা নেই – পুরো ছবি, ছেঁড়া ছবি,পুরো সুর, ভাঙা সুর ।”

অবনীন্দ্রনাথকে ছড়ার বিষয়ে লেখার উৎসাহ দেন তাঁর ‘রবিকা’।

আসলে ছড়ার জগতটা যে একটা ভাবার মতো বিষয়, আবিষ্কার করার মতো জায়গা, সেটা রবীন্দ্রনাথই সকলকে জানান। তিনিই প্রথম শুনতে পেয়েছিলেন ছড়ার মধ্যে – “স্নেহার্দ্র সরল মধুর কন্ঠ-ধ্বনিত সুর-স্নিগ্ধ সুরটুকু । “

তাঁরই প্রথম মনে হয়েছিল, “সামাজিক পটপরিবর্তনের স্রোতে ছোটো বড় অনেক জিনিস অলক্ষিতভাবে ভাসিয়া যাইতেছে । অতএব জাতীয় পুরাতন সম্পত্তি সযত্নে সংগ্রহ করিয়া রাখিবার উপযুক্ত সময় উপস্থিত হইয়াছে । …

আমাদের বাংলা ছড়াতে এমন এক ধরনের সামাজিক ইতিহাসও ধরা আছে , যা আর কোথাও এত অকৃত্তিম ভাবে ধরা নেই । একেবারে গ্রাম্য ভাষায় শতধা-বিক্ষিপ্ত হয়ে মেয়েদের প্রাত্যহিক জীবনের দ্বন্দ্ব কলহ , হিংসে , ঈর্ষাকাতরতা , সঙ্কীর্ণতা , অবসাদ , তৃপ্তি , অতৃপ্তি , স্নেহ , ভালোবাসা , মায়া , মমতা সবই প্রায় অমার্জিত ভাবেই উঠে আসে এই সব ছড়ার মধ্য দিয়ে । ভালো মন্দ নিয়ে সংসারের জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া নারীদের গেরস্থালীর মর্মকথা যতটা নিখুত ভাবে ছড়ায় ধরা আছে, তেমনটা আর কোথাও নেই।

রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী মহাশয়ের মতে –

“কোন ঐতিহাসিক সত্যের আবিষ্কার এই অবজ্ঞাত ছড়া-সাহিত্য হইতে সম্ভবপর না হইলেও , অন্যবিধ সত্যের পরিচয় এই সাহিত্যের মধ্যে পাওয়া যায় । মনস্তত্ববিদ ও সমাজতাত্বিক এই সাহিত্য হইতে বিবিধ সত্যের আবিষ্কার করিতে পারেন । মনুষ্যজীবনের একটা বৃহৎ অংশ দুর্জ্ঞেয় রহস্য এই অনাদৃত সাহিত্যের মধ্যে নিহিত রহিয়াছে ।”

ছড়াতে প্রকাশিত মেয়েদের চিরন্তন অবহেলার দুঃখ দিয়েই শুরু করি । অনেকযুগ পেরিয়ে আজ হয়ত ছবিটা একটু বদলেছে, কিন্তু সম্পূর্ণটা তো নয়।

“মেয়ের নাম ফেলি
পরে নিলেও গেলি
যমে নিলেও গেলি”

অন্তঃপুরের মহিলাদের পাঁচালি পাঠ

আবার ওপার বাংলার এক অভাগিনীর দুঃখের পাঁচালি শোনা যায় এই ছড়ায় –

“সারাদিন চিড়া কুটলাম চিড়া পাইলাম না,
একখান চিড়া মুখে দিলাম শান্তি পাইলাম না।
একখান চিড়া মুখে দিলাম শাশুড়ি মাইল ঠোক্কা,
ঘরের পাছে কানতে গেলাম ভাতারে মারল চাক্কা।
গোয়াইলে গেলাম গোবর ফালতাম,
ষাঁইড়ে মাইল গুঁতা।
গাঙ্গে গেলাম হাত ধুইতাম কুমীরে মাইল যাতা,
যাতা মারাইয়া নিদয় কুমীর ঠেঙ্গায় দিল টান।
পরের অভাগিনীর উড়াইয়া গেল জান।”

তবে সবসময় যে সরাসরি দুঃখের পাঁচালী শোনানো হত তা নয় । যেমন বড় সংসারের গৃহিণীদের যে অকুলানকে কুলিয়ে দিতে গিয়ে হিমসিম খেতে হত হত চমৎকার স্যাটায়ের ফরম্যাটে এই ছড়ায় বলা হয়েছে –

“এক পো দুধে কী হবে তা বল না
ক্ষীর হবে , সর হবে , ছানা হবে , মাখন হবে ।
হারু খাবে, গুপী খাবে ।
বংশীধারী কেশোরুগী
তারে এট্টু দিতে হবে
মেজো বৌয়ের কোলের কচি
না দিলে সে খাবেই বা কী ?
কালাচাঁদের সঙ্গে বুড়োর
দুধ নইলে জমে না ।
সোহাগের টিয়েপাখি
সর না পেলে বকাবকি ।
পোড়ারমুখে আমার আবার
ক্ষীর নইলে চলে না
ও বড় বৌ,আর কী হবে বল না ।“

অনেকটা একই রকম ভাবে সংসারের টানাটানিতে নাজেহাল হয়ে যাওয়ার কথা কৌতুকের ছলে বলা হয়েছে এই ছড়ায় –

“এক পয়সার তৈল
কিসে খরচ হৈল?
তোর চুলে, মোর পায়ে
আরো দিছি ছেলের গায়ে
ছেলে মেয়ের বিয়ে গেছে

সাত রাত গান হয়েছে
কোন আবাগি ঘরে এলো
বাকি তেলটা ঢেলে নিল।“

মেয়েদের অন্দরমহলে আটকে রাখাটা পুরুষশাষিত সমাজব্যবস্থারই একটা প্রতিফলন ছিল । তবে বাঙালির অন্দরমহলে পর্দাপ্রথার বাড়াবাড়িটা অনেকদিন মুসলমান শাসনে থাকার কারণেও হতে পারে ।অন্দরমহল যেমন একদিকে পুরুষদের তর্জনীসংকেতে শাসিত হত , তেমনি আবার বাড়ির বৌরা আবার শাশুড়ির দমননীতির শিকারও হতেন ।

“ছড়াতে সে কথাও উঠে এসেছে , যেমন –
তুমি কাট কুমড়ো আমি কাটি লাউ।
গতরখাকি বউকে দাও চালতা মোচার ফাউ।“

অথবা –

“গিন্নি ভেঙ্গেছে নাদা
ও কিছু নয় দাদা
ঝি ভেঙ্গেছে কাঁসা
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসি
বৌ ভেঙ্গেছে সরা
তা পাড়ায় বলে বেড়া ।
ছোটো সরাটি ভেঙ্গেছে বৌ
বড় সরাটি আছে ।
লপর চপর করিস না লা
হাতের আটকল আছে ।“

কন্যাকে বিয়ে দিয়ে পরের বাড়ি পাঠানোর সময় চিরকালই কন্যার মায়েরা দোলায়িত হতেন সাধ-আহ্লাদ -আকাঙ্ক্ষা এবং বিষাদ-ভয়-আশংকায় মধ্যে। আর আগে তো মেয়ের বিয়ে হত পুতুল খেলার বয়েসেই । তাই আদরের কন্যাটির যাতে কোনো কষ্ট না হয় সেই চিন্তা মাথায় থাকত মায়ের । এক মায়ের অন্তরে লালিত ইচ্ছে ফুটে ওঠে এই ছড়ায় –

“খুকু যাবে শ্বশুর বাড়ী,
সঙ্গে যাবে কে?
ঘরেতে আছে হুলো বেড়াল,
কোমর বেঁধেছে।
আম কাঠালের বাগান দেবো
ছায়ায় ছায়ায় যেতে;
শান বাঁধান ঘাট দেবো,
পথে জল খেতে।
ঝাড় লন্ঠন জ্বেলে দেবো,
আলোয় আলোয় যেতে;
উড়কি ধানের মুড়কি দেবো,
শাশুড়ি ভোলাতে ।
শাশুড়ি ননদ বলবে দেখে,
বৌ হয়েছে কালো!
শ্বশুর ভাসুর বলবে দেখে,
ঘর করেছে আলো!”

প্রায় একই রকম মেয়েকে সব রকমের বিরূপ পরিস্থিতি থেকে আড়াল করে রাখার ইচ্ছে ফুটে ওঠে এই ছড়ায় –

“হলদি গাছে হলুদ ফুল
মেয়ের বাড়ি কাঞ্চনপুর
বাড়ির কাছে কাচারি
পুঁটি মাছের ব্যাপারি
মাছ কুটবো কি করে
বঁটি নিল চোরে
খুকুমণিকে রাজার ঘরে বিয়া দিব যে রে ।
আসবে জামাই বসবে কাছে,খাবে পান পাতা
খুকুমণিকে বললে কিছু কাটবো জামাইয়ের মাথা।“

কিম্বা এই ছড়াতে নিজের কন্যার প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং পরের বাড়ি থেকে আগত বৌ-এর প্রতি একচোখোমি ধরা পড়ে এই ছড়ায় –

“পদ্মমুখী ঝি আমার পরের বাড়ি যায়।
খেঁদোনাকী বউ এসে বাটায় পান খায় ।।“

তবে ছেলের বিয়ে দিয়ে তো কিছু হারাবার নেই । সেখানে ছেলের মায়ের আকাঙ্খা অন্য রকম –

“খোকা যাবে বিয়ে করতে হস্তিরাজার দেশে
তারা রূপোর খাটে পা রেখে সোনার খাটে বসে ।
ঘন আওটা দুধের উপর ঘন সর ভাসে ।
খোকামণিকে সোহাগ করে যোতুক দেবে কী?
শাল দিবে, দোশালা দিবে রূপবতী ঝি।“

মায়ের প্রতি সন্তানের টান অবশ্য চিরকালের, মেয়ে এবং ছেলে তাতে কোনো তফাৎ নেই ।

খুব অকৃত্রিম ভাবে, অলঙ্কারবিহীন ভাষায় সেই কথা বোঝানো হয়েছে এই ছড়ায় –

“চিঁড়ে বল মুড়ি বল ভাতের বাড়া নেই ।
মাসী বল পিসি বল মায়ের বাড়া নেই ।।
কিসের মাসী, কিসের পিসি কিসের বৃন্দাবন।
মরা গাছে ফুল ফুটেছে মা বড় ধন ।।
মা নেই যার না নেই তার ।।
ঘাটে মাঠে ঘুরে এলাম, ঘাটে নেই না ।
রণে বনে ফিরে এলাম ঘরে নেই মা ।।
অশথের ছায়াই ছায়া, মায়ের মায়াই মায়া ।।“

রবীন্দ্রনাথের “লোকসাহিত্য”

শেষ করা যাক রবীন্দ্রনাথকে দিয়েই । তিনি “লোকসাহিত্য” সংকলনে তাঁরও নিজের সংগৃহীত অনেক কটি ছড়া নিয়ে আলোচনা করেছেন ।বুঝিয়ে দিয়েছেন এই ছড়ার মধ্যে লুকিয়ে থাকা বাঙালির একান্ত আপন মর্মবেদনার কথা । তিনি এই কাজটি না করলে হয়ত বাঙালি তার এই সম্পদের কথা ভুলেই বসত । তাঁর থেকে পরবর্তীকালে উৎসাহিত হয়ে অনেকেই ছড়া সংগ্রহ এবং তা নিয়ে গবেষণা করেছেন । তাঁদের মধ্যে ছিলেন যোগীন্দ্রনাথ সরকার , রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, অবনীন্দ্র নাথ ঠাকুর , আচার্য সুকুমার সেন ,মুন্সী আবদুল করিম , কমল কুমার মজুমদার ,ভবতারণ দত্ত সহ আরও অনেকেই ।

মুখে মুখে ভেসে আসা সব ছড়া সংগৃহীত না হয়ে থাকলেও, যা সংগৃহীত হয়েছে সেই সম্ভারটিও বিরাট ।

আপাতত রবীন্দ্রনাথের নির্বাচিত একটি ছড়া তাঁর মন্তব্য সমেত উদ্ধৃত করেই এবং এই নিবন্ধ শেষ করা যাক –
“আমরা পূর্বেই বলিয়াছি, এই ছড়াগুলিকে একটি আস্ত জগতের ভাঙা টুকরা বলিয়া বোধ হয়। উহাদের মধ্যে বিচিত্র বিস্মৃত সুখদুঃখ শতধাবিক্ষিপ্ত হইয়া রহিয়াছে। যেমন পুরাতন পৃথিবীর প্রাচীন সমুদ্রতীরে কর্দমতটের উপর বিলুপ্তবংশ সেকালের পাখিদের পদচিহ্ন পড়িয়াছিল–অবশেষে কালক্রমে কঠিন চাপে সেই কর্দম পদচিহ্নরেখা-সমেত পাথর হইয়া গিয়াছে–সে চিহ্ন আপনি পড়িয়াছিল এবং আপনি রহিয়া গেছে, কেহ খোন্তা দিয়া খুদে নাই, কেহ বিশেষ যত্নে তুলিয়া রাখে নাই–তেমনি এই ছড়াগুলির মধ্যে অনেক দিনের অনেক হাসিকান্না আপনি অঙ্কিত হইয়াছে, ভাঙাচোরা ছন্দগুলির মধ্যে অনেক হৃদয়বেদনা সহজেই সংলগ্ন হইয়া রহিয়াছে। কত কালের এক টুকরা মানুষের মন কালসমুদ্রে ভাসিতে ভাসিতে এই বহুদূরবর্তী বর্তমানের তীরে আসিয়া উৎক্ষিপ্ত হইয়াছে; আমাদের মনের কাছে সংলগ্ন হইবামাত্র তাহার সমস্ত বিস্মৃত বেদনা জীবনের উত্তাপে লালিত হইয়া আবার অশ্রুরসে সজীব হইয়া উঠিতেছে।

“ও পারেতে কালো রঙ।
বৃষ্টি পড়ে ঝম্‌ ঝম্‌॥
এ পারেতে লঙ্কা গাছটি রাঙা টুক্‌টুক্‌
গুণবতী ভাই আমার মন কেমন করে॥
এ মাসটা থাক্‌ দিদি কেঁদে ককিয়ে।
ও মাসেতে নিয়ে যাব পাল্‌কি সাজিয়ে।’
হাড় হল ভাজা-ভাজা, মাস হল দড়ি।
আয় রে আয় নদীর জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ি॥“

এই অন্তর্ব্যথা, এই রুদ্ধ সঞ্চিত অশ্রুজলোচ্ছ্বাস কোন্‌ কালে কোন্‌ গোপন গৃহকোণ হইতে, কোন্‌ অজ্ঞাত অখ্যাত বিস্মৃত নববধূর কোমল হৃদয়খানি বিদীর্ণ করিয়া বাহির হইয়াছিল! এমন কত অসহ্য কষ্ট জগতে কোনো চিহ্ন না রাখিয়া অদৃশ্য দীর্ঘ-নিশ্বাসের মতো বায়ুস্রোতে বিলীন হইয়াছে। এটা কেমন করিয়া দৈবক্রমে একটি শ্লোকের মধ্যে আবদ্ধ হইয়া গিয়াছে।

ও পারেতে কালো রঙ বৃষ্টি পড়ে ঝম্‌ ঝম্‌।

এমন দিনে এমন অবস্থায় মন-কেমন না করিয়া থাকিতে পারে না। চিরকালই এমনি হইয়া আসিতেছে। বহুপূর্বে উজ্জয়িনী-রাজসভার মহাকবিও বলিয়া গিয়াছেন–

মেঘালোকে ভবতি সুখিনোহপ্যন্যথাবৃত্তিচেতঃ।

কলকাতা বইমেলা ২০২৬, প্রাপ্তিস্থান- পরম্পরা প্রকাশন, স্টল নম্বর ৩৫৫

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x