
ন্যাথিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড সাহেবের ‘ অ্যা গ্রামার অফ দি বেংগলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ ছাপা হয়েছিল ১৭৭৮ সালে। বইটি ইংরেজিতে হলেও তাতে রামায়ন, মহাভারত, বিদ্যাসুন্দর ইত্যাদি বাংলা বই থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছিল বাংলা হরফে। সেই হরফ তৈরি করেছিলেন উইলকিনসন নামের এক সাহেব। কিন্তু তারও বছর পাঁচেক আগে উইলিয়াম বোলটস নামের এক সাহেব অনেক পরিশ্রম করে বাংলা হরফ তৈরি করেছিলেন। তবে তাঁর তৈরি করা প্রতিলিপি প্রচারিত হয়নি বলে তাঁকে তেমন করে মনে রাখা হয় নি। এই ১৭৭৮ সালকে প্রথম বাংলা ছাপার বছর ধরে ১৯৭৮ সালে বাংলা ছাপাখানার দুশো বছর উদযাপিত হয়ে ছিল মূলত আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর উদ্যোগে।


তবে বাংলা বইয়ের সত্যিকারের পথচলা শুরু হয়েছিল আরো কিছুদিন বাদে। উনিশ শতকের একেবারে গোড়ায় এসে ।
আমাদের জানা আছে বাংলা বইয়ের আঁতুড়ঘর কলকাতা নয়, শ্রীরামপুর। তখনকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসকরা উইলিয়াম কেরি সাহেবকে কলকাতার চৌহদ্দির মধ্যে খৃস্টান ধর্ম প্রচারের অনুমতি দেয় নি বলে তিনি চলে যান শ্রীরামপুরে। শ্রীরামপুর তখন ছিল ড্যানিশদের দখলে। তাই তা ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আওতার বাইরে। ওখানকার তৎকালীন ড্যানিস গভর্নর তাঁকে সাহায্যই করেছিলেন নানা ভাবে। মূলত ধর্মপ্রচারের উদ্দেশেই তিনি সেখানে একটি ছাপাখানা খোলেন। খিদিরপুরের একটি নিলাম থেকে কেরি সাহেব একটি কাঠের ছাপাখানা কিনেছিলেন মাত্র ছেচল্লিশ পাউন্ড দিয়ে। প্রথম দিকে সেই ছাপাখানা থেকে যা ছাপা হয়েছে তা মূলত খৃস্টান ধর্ম প্রচারের সুবিধার্থে। অথবা রাজকর্মের সুবিধার্থে। কিন্তু সেই ভাবেই বাংলা ভাষাতে বই ছাপা শুরু হল।
১৮০০ সালের আগস্ট মাসে এই ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হল রামরাম বসু ও টমাস অনুদিত “মঙ্গল সমাচার মতীয়ের রচিত“। বাংলা হরফে। তারপর থেকে প্রতিবছরেই এখান থেকে ছাপা বই বেরোতে লাগল। বাংলায় বাইবেল ছাড়া রামায়ন, মহাভারত সহ পুরাণের কিছু গল্পও এখান থেকে ছাপা হয়েছিল। এদিকে কলকাতায় ঐ ১৮০০ খৃস্টাব্দেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। সেখানেও পাঠ্য বইয়ের প্রয়োজন হতে শুরু হল। কলকাতার মানুষের একটু করে ছাপা বইয়ের পাঠাকাঙ্খ্যা বাড়তে লাগলো। কলকাতা শহর পুঁথির দুনিয়া ছেড়ে বইয়ের দুনিয়ার সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করলো। ওদিকে শ্রীরামপুর থেকে প্রচুর বই ছাপা হতে লাগলো। জানা যাচ্ছে ১৮০১ থেকে ১৮৩২ সালের মধ্যে শ্রীরামপুর থেকে ছাপা হয়েছিল চল্লিশটি ভাষায় দু লক্ষ বারো হাজার বই। এর মধ্যে বেশির ভাগই অবশ্য ধর্ম প্রচারেই উদ্দেশে ছাপা বই, আইনের বই আর পাঠ্য পুস্তক। কিন্তু কেরি সাহেবই ছিলেন এই কর্মযজ্ঞের মূল পুরোহিত। কেরি সাহেবের প্রয়াণ ঘটে ১৮৩৪ সালে। শ্রীরামপুর মিশন প্রেস নানান সমস্যায় ভুগছিল। ১৮৩৭ সালে সরকারী ভাবে শ্রীরামপুরের প্রেস বিলুপ্ত হয়ে যায়।



ততদিনে অবশ্য কলকাতায় অনেক ছাপাখানা খুলে গেছে। ওদিকে ইংল্যান্ডেও ছাপাখানার প্রসার কিছুদিন আগেই ঘটেছে। ইংরেজরা তাদের নিজেদের দেশে ছাপা বইয়ের সুফল পেতে আরম্ভ করেছে। ছাপার যন্ত্র অবশ্য আবিস্কার হয়েছে জার্মানিতে। ইংরেজ সেই যন্ত্রই প্রথমে নিজেদের দেশে তারপর এ দেশে নিয়ে এলেন এখানে তাদের ধর্ম প্রচার এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কাজের সুবিধের জন্যে।
কিন্তু কেরি সাহেব যদি পঞ্চানন কর্মকারের মত হরফ তৈরির কারিগর বা গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের বাংলা বই সম্পাদনার করার মত লোক না পেতেন তা হলে তাঁরা বাংলা ভাষায় বই ছাপার কাজ এত দ্রুত করে উঠতে পারতেন না। এঁদের দুজনের কথা আমরা পরে আসব।
উনিশ শতকের শুরুর দিক থেকেই কলকাতা শহরে ব্যাক্তিগত উদ্যোগে এখানে ওখানে ছাপাখানা খুলতে লাগল। বলা বাহুল্য, সেই সময় একদল বাঙালি যারা এর আগে যে কোনো রকমের অপরিচিত আলোকে প্রথমেই বাধা দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করেছে, তারা ছাপা বইয়ের ক্ষেত্রেও তাই করলো। কিছু ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, কিছু জমিদার, কিছু রাজা মহারাজা ছাপা বই বিশেষ করে ধর্ম পুস্তক ‘অশাস্ত্রীয়’ পদ্ধতিতে ছাপা হচ্ছে, এই দোহাই দিয়ে ছাপাখানার বিরোধিতা করতে লাগলেন। যেহেতু গোড়ার দিকে খৃস্টান ধর্মগ্রন্থই বেশি ছাপা হত, তাই কিছু লোক ছাপাখানাকে পাদরীদের হিন্দুদের উপর ধর্মীয় ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করতে লাগলো। কিছু সংস্কারচ্ছন্ন ব্যাক্তি আবার কাগজে ছাপা কোনো কিছু চোখে পড়লে, বা ভুল করে ছাপা বই স্পর্শ করে ফেললে তিনবার গঙ্গায় ডুব দিয়ে আসতে লাগলো। এর মধ্যে কোথাও একটা তখনকার পেশাদার লিপিকারদেরও কিছুটা হাত হয়ত ছিল হয়তো। ছাপাখানা চালু হলে তারা যে কাজ হারাবেন এমন একটা ভয় তাঁরা পাচ্ছিলেন ।
১৮২৯ সালে প্রকাশিত বঙ্গদূত পত্রিকায় লেখা হয়েছিল – ‘পূর্বে অস্মদেশীয় লোক কোনো পত্র ছাপা অক্ষরে দেখিলে নয়ন মুদ্রিত করিতেন, যেহেতু সাধারণের সাধারণবোধে ইহাই নিশ্চয় ছিল যে বর্ণান্তরীয় লোক ছাপায় কেবল আমাদিগের ধর্ম ছাপায়।’
শোনা যায় ভবানীচরণ বন্দোপাধ্যায় যখন তাঁর অনুবাদ করা ‘শ্রীমদভাগবত’ ছেপেছিলেন তখন তাঁকে বিজ্ঞাপনে লিখতে হয়েছিল – ‘বিশুদ্ধ হিন্দুমতে’ ছাপা। ছাপার কালি তৈরি হয়েছিল গঙ্গাজল ব্যবহার করে এবং কারিগররা ছিল গোঁড়া ব্রাহ্মণ সন্তান। সে বইয়ের চেহারাও ছিল অনেকটা পুঁথির মত। তবে কলকাতায় মানুষের বইয়ের খিদে এতটাই জেগে উঠতে লাগল, যে এই সব কুসংস্কার আর বেশীদিন ধোপে টিঁকলো না। আর তাছাড়া রামমোহন, বিদ্যাসাগর, ডিরোজিও এবং তাঁর দলবল সমাজ সংস্কারের সব চেয়ে বড় হাতিয়ার করলেন মুদ্রিত পুস্তককে। কারণ সেই সময়ে জনসভায় বক্তৃতা করার রেওয়াজ শুরু হয় নি। সমাজসংস্কারমূলক প্রচারের কাজে ছাপা বইকেই কাজে লাগানো হলো।
তখন নতুন শহরে ধানকল, পাটকল, কাপড়কল এ সব কিছুই বসেনি, না হয়েছে ভালো রাস্তা ঘাট। মশা, মাছি, প্লেগ ম্যালেরিয়া নিয়ে জর্জরিত কলকাতার বসবাসকারীরা। কিন্তু সে রকম সময়েই শোভাবাজারের বিশ্বনাথ দেবের প্রেস, মির্জাপুরের হেতায়তুল্লার প্রেস, চোর বাগানে রামকৃষ্ণের প্রেস, শাঁখারিটোলায় বদন পালিতের প্রেস, এন্টালির পিয়ার্স সাহেবের প্রেস, আরপুলির হরচন্দ্র রায়ের প্রেস, ধর্মতলায় স্বয়ং রামমোহন রায়ের প্রেসে প্রচুর বই ছাপা হওয়া শুরু হয়ে গেল, এবং সে সব বইয়ের এত চাহিদা দেখা দিল যে অনেকেই নিজেদের জাত ব্যবসা ছেড়ে বই ছাপার ব্যবসায় নামলেন।
১৮১৮ সাল নাগাদ শোভাবাজার চিৎপুরের একটা অঞ্চল জুড়ে দেখা গেল বই ছাপা এবং বই কেনাবেচার একটা ‘হাব’ তৈরি হয়ে গেল। এখান থেকেই ‘বটতলার বই” কথাটির উৎপত্তি হয়েছে । সুকুমার সেনের কথায় – “ শোভাবাজার বালখানা অঞ্চলে একটি শান বাঁধানো বটগাছ ছিল , সেখানে আড্ডা দেওয়া হত, গান বাজনা হত , বিশ্রাম নেওয়া হত , আর বসত বইয়ের পসরা। অনুমান করা হয় এই ঐ বটতলা অঞ্চলে ছাপাখানা বসানো বিশ্বনাথ দেবের ছাপাখানায় ছাপা।”
তবে বটতলা ক্রমশ আকারে এবং আয়তনে বাড়তে লাগল। মোটামুটি শোভাবাজার, গরানহাটা, কূমোরটুলি, আহেরিটোলা, সিমলা, দর্জিপাড়া, শ্যামবাজার, বাগবাজার, টালা বাগান লেন, চোরবাগান, জোড়াবাগান, জোড়াসাঁকো, ঝামাপুকুর থেকে শিয়ালদহ এই বিস্তীর্ন অঞ্চর জূড়ে নানা ছাপাখানায় ছাপা বই বটতলা্র বই বলেই বলেই পরিচিত হতে লাগল। অনেক নাক উঁচু বাঙালি বইয়ের বিষয় এবং ছাপার মানের নিকৃষ্টতা বোঝানোর জন্য জন্য ‘বটতলার বই’ কথাটি ব্যবহার করতেন। আসলে কিন্তু খ্যাত, অখ্যাত নানান লেখককূল মিলে তারা নিজেদের অজান্তেই একটি লোকপ্রিয় সাহিত্যের বিরাট ভান্ডার তৈরি করে উঠতে লাগলেন এই বটতলা ঘিরে।
বটতলার বইয়ের দাম খুব কম রাখা হত। সেটা সম্ভব হত তিনটি বিশেষ কারণে – এক, ছাপার জন্য যে কাগজ ব্যবহার হত তা সস্তা দামের। দুই, বইগুলির ডিজাইন পুরোনো ধাঁচের হত। অনাধুনিক ছাপাই যন্ত্রে ছাপা এটা দেখলেই বোঝা যেত। এবং তিন, রঙিন এক ধরণের পাতলা কাগজে বইগুলির মোড়ক থাকত। কিন্তু বিষয়ের দিক দিকে সব বইই যে খুব নিচু স্তরের বা কুরুচিকর হত এমন কথা মোটেই বলা যাবে না। পঞ্জিকা থেকে রামায়ন, মহাভারত, পৌরাণিক উপকথা, জীবনী, পরামর্শ ম্যানুয়াল, নাটক যাত্রা, কবিতা, ছড়া, কৃষি ও পশুপালন থেকে ফোটোগ্রাফির ম্যানুয়াল কোনো কিছুই বাদ ছিল না।
১৮৫৭ সালে জেমস লং একটি লেখাতে জানিয়েছেন দেশীয় লোকেদের ছাপাখানা থেকে বিক্রির জন্য বই ছাপা হয়েছিল ৩২২ টি। এর মধ্যে ইতিহাস ও জীবনী – ১৫ টি, নাটক – ৮টি, শিক্ষা বিষয়ক – ৪৬ টি, খ্রিস্টীয় ধর্ম পুস্তক – ৮টি এবং পঞ্জিকা – ১৯ টি। আর বাকিগুলির মধ্যে বেশির ভাগই আদিরসাত্মক ।
শ্রীপান্থ তাঁর বইতে লিখেছেন – “সত্যি বলতে কি বিষয়বৈচিত্র্যে বটতলার কোনো তুলনা নেই। ধর্ম, পুরান, মহাকাব্য, কাব্য, সঙ্গ, নাটক, কাহিনি, যাত্রার বই (পরে থিয়েটার বইও) পত্রিকা, সাময়িকপত্র, শিশুপাঠ্য, চিকিৎসা, জ্যোতিষ, অভিধান, ভাষাশিক্ষা, কারিগরিবিদ্যা – এমন কোনো বিষয় নেই যা বটতলার কাছে অজানা। সংস্কৃত, ফারসি, উর্দু, ইংরেজি – নানা উৎস থেকে কাহিনি সংগ্রহ করত বটতলার লেখক ও প্রকাশকরা। … বটতলা সেদিক থেকে সাধারণ বাঙালির কাছে যেন এক খোলামেলা বিশ্ববিদ্যালয়, আজকের ভাষায় যাকে বলে ওপেন হিন্দু ইউনিভারসিটি।”

বটতলার সীমানার বাইরে অবশ্য আরও একটি ছাপাখানার নাম উল্লেখযোগ্য । সেটি অবাঙালি বাবুরাম ও লললুর দ্বারা স্থাপিত ‘সংস্কৃত যন্ত্র’ প্রেস, যেটি খিদিরপুরে স্থাপিত হয় ১৮০৬-০৭ সালে। এখানে সংস্কৃত এবং হিন্দি দেবনাগরী অক্ষরে ছাপা হত। উনিশ শতকের প্রথম দিকে লেখা একটি চিঠিতে সরকারী প্রেসের সুপারিটেনডেন্ট কেরি সাহেবকে জানাচ্ছেন যে ঐ সময়েই কলকাতা শহরের কিছু ছাপখানা নাকি প্রেস খুলে দু হাতে টাকা রোজগার করছে। তাদের মধ্যে কারো কারো আয় নাকি কাউন্সিলের মেম্বারদের সমান। এদের মধ্যে প্রেসের মালিক সংস্কৃত বাবুরামও নাকি কয়েক বছরের মধ্যে কয়েক লাখ টাকার মালিক হয়েছিলেন ।
বটতলার বইতে যে ভাষা ও বানান ব্যবহৃত হত তা তখনকার উচ্চারণকে অনুসরণ করে করা হত। তাতে সাধারণ লোকেদের সঙ্গে একটা ভালোরকম সংযোগ স্থাপিত হল।
এবং বই ব্যবসায়ীরা এটাও বুঝলেন শুধু বাংলা অক্ষর ছাপলে তো হবে না সে সঙ্গে ছবি না ছাপলে বই ভালো বিকোবে না। তাই লেখার সঙ্গে ছবিও দেওয়া শুরু হল।


এ ছাড়া বটতলার বই জনপ্রিয় হবার আর একটি কারণ এর বিজ্ঞাপনের বিশেষ ধরণ। তারা প্রচলিত ধারার শিষ্ট বিজ্ঞাপনের পথ ছেড়ে একটু অশিষ্ট পথ ধরলেন। ছাপা পঞ্জিকা তখন শুধু শহরের নয় গ্রামে গঞ্জেরও প্রতিটি বাড়িতে পৌঁছে যেত। এই পঞ্জিকার পাতাকেই তারা বিজ্ঞাপনের কাজে লাগাতে লাগলেন।পাঁজির পাতায় বিজ্ঞাপন দেখে দূর দূরান্তের পাঠকের মনে বইটি কিনবার ইচ্ছা তো জাগল, কিন্তু তারা বইটি কিনবেন কি ভাবে! তখন বইয়ের দোকান তো খুব অল্প। সে কথা ভেবে বটতলার বই ব্যবসায়ীরা একটি নতুন পন্থা আবিষ্কার করলেন। ভ্রাম্যমান ক্যানভাসার এবং বইওয়ালাদের মাধ্যমে বই পাঠকদের দুয়ারে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করলেন।
এই সময়ের এই বাংলা বই ব্যবসার জগতে যাঁর অবদান না বলেই নয়, তিনি ছিলেন গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য্য। তিনি বাংলা ভাষায় প্রথম প্রকাশক।
গঙ্গাকিশোর যুক্ত ছিলেন শ্রীরামপুরের ঐতিহাসিক ছাপাখানার সঙ্গেই। আগেই বলা হয়েছে গঙ্গাকিশোর এবং পঞ্চানন কর্মকার এই দুজনকে না পেলে শ্রীরামপুরের তিন পাদরি সাহেব উইলিয়াম কেরি, উইলিয়াম ওয়ার্ড এবং জোশুয়া মার্শম্যানদের সম্ভব হতনা বাংলা বইয়ের জগতে ঢুকে পড়ার। তবে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সাহেবদের সঙ্গে একসময় তাঁর মতের অমিল ঘটায় তিনি শ্রীরামপুরের চাকরি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন।
কলকাতায় এসে তিনি স্বাধীন ভাবে প্রথম বাঙালি হিসেবে বই প্রকাশনার ব্যবসায় নামেন। ছাপার জন্যে প্রথম বইয়ের বিষয় হিসেবে বেছে নেন অন্নদামঙ্গল। তিনি আর একটি দিকেও প্রথম হলেন। শুধু অক্ষর নয় সঙ্গে ছবিও ছাপলেন তাঁর বইতে। কাজটা ঠিক সহজ ছিল না। আঁকা ছবিকে ছাপার কাজে লাগানোর কৃৎকৌশল জানা লোক তখন কলকাতায় ছিল না। গঙ্গাকিশোর চিৎপুরের পাশে গরানহাটা অঞ্চলের স্বর্নশিল্পীদের দিয়ে সমতম প্লেটে ছাপার উপযোগী খোদাইয়ের কাজ শেখালেন। এই কাজ তিনি শ্রীরামপুরে থাকাকালীন শিখেছিলেন পাদরী ল’সনের কাছে। বইটি ছাপা হল ফেরিস কোম্পানির ছাপাখানায়। ১৮১৬ সালের গভর্ণমেন্ট গেজেটে এই বইটির একটি অভিনব বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। সেটি ছিল এই রকম –
“মেক্ক এস ফেরিস কোম্পানি সাহেবের ছাপাখানায় সিঘ্র প্রকাষ হইবেক। অন্নদা মঙ্গল ও বিদ্যাসুন্দর অনেক পন্ডিতের দ্বারা শোধিয়া শ্রীযুত পদ্মলোচন চুড়ামনি ভট্টাচার্য্য মহাসয়ের দ্বারা বর্ন্ন সুদ্ধ করিয়া উত্তম বাঙ্গালা অক্ষরে ছাপা হইতেছে পুস্তকের প্রতি উপক্ষণে এক২ প্রতিমূর্তি থাকিবেক মূল্য ৪ টাকা নিরূপণ হইল জাহার লইবার ইচ্ছা হয় আপন নাম ঐ ছাপাখানায় কিম্বা এই আপিষে শ্রীযুত গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের নিকট পাঠাইবেন ইতি –”
‘বর্ন্ন সুদ্ধ’ ব্যাপারটা কি এটা হয়ত অনেকেই বুঝতে পারবেন না। এই নিবন্ধে আগেই উল্লেখ করা হয়েছে ছাপা বই নিয়ে তখনকার কুসংস্কারের কথা। এটি তার একটি বাস্তব উদাহরণ। গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য্য মশাইকে বিজ্ঞাপন দিয়ে ঘোষনা করতে হয়েছিল তিনি গঙ্গা জল মেশানো কালি দিয়ে বইটি ছেপেছেন। এবং তখনকার নদীয়ার বিখ্যাত পন্ডিত পদ্মলোচন চুড়ামণি ভট্টাচার্য্যকে দিয়ে বর্ণশুদ্ধির কাজটি করেছেন। অন্নদদামঙ্গল ছাপার কাজ শুরু হয় ১৮১৪ সালে, আর সম্পূর্ণ হয় দু’ বছর পরে। বইটি খুব ভালো বিক্রি হয়। এতে উৎসাহিত হয়ে গঙ্গাকিশোর আরো কয়েকটি বই পর পর ছাপেন। এবং তাঁকে দেখে আরও অনেকে সচিত্র বই ছাপতে শুরু করেন।
রামমোহন রায়ও তখন বই লিখতে শুরু করেছেন। তিনি গঙ্গাকিশোরের প্রখর ব্যবসায়িক বুদ্ধি এবং প্রকাশন বিদ্যায় তাঁর পারদর্শিতা সম্মন্ধে জানতে পারেন। গঙ্গাকিশোরের প্রকাশনায় ফেরিস কোম্পানি থেকে রামমোহনের বেদান্ত গ্রন্থ, বেদান্তসার, দায়ভাগ ইত্যাদি বই ছাপা হয়েছিল। এই সব বইয়ের ভালো কাটতি ছিল। পরের দিকে গঙ্গাকিশোর নিজে ছাপাখানা কেনেন। নিজের উদ্যোগে ‘বাঙ্গাল গেজেটি’ নামের একটি সংবাদপত্রও ছাপতে শুরু করেন। সুকুমার সেন তাঁকে বাংলা প্রকাশনার জগতের ব্রহ্মা বলে উল্লেখ করেছেন।
বইয়ের দাম তখন বেশ বেশি হওয়াতে বই কেনা সবার সাধ্যের মধ্যে ছিল না। তাই অনেকেই একটি সাধারন গ্রন্থাগারের প্রয়োজন অনুভব করলেন। ১৮৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারিতে “কতিপয় বিশিষ্ট ধনী মহাশয়েরা স্বদেশীয় লোকেদের উপকারার্থে সাধারণ এক পুস্তকালয় স্থাপন করিতে নিশ্চয়” করলেন। এই সাধারণ গ্রন্থাগারে প্রায় ১৮০০ বই রাখা হল। এর মধ্যে কতগুলি বটতলায় ছাপা বই ছিল সে তথ্য অবশ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
বাংলা বইয়ের জন্ম ও হামাগুড়ি দিতে শেখা যদি শ্রীরামপুরে ঘটে থাকে তার ছুটতে শেখা হল কলকাতাতে এসেই। এবং সেটার পিছনে বটতলার অবদান অনেকটাই। তবে একেবারে অনিয়ন্ত্রিত খোলা মাঠ পেয়ে বটতলার আচরণে খানিকটা বখা ছেলের প্রবণতা চলে এলো। শোভা বাজার রাজবাড়ির প্রশ্রয়ে শোভাবাজারের জোড়া বটতলার ছায়ায় নীচে গুপ্তকথা, রতিশাস্ত্র, কেচ্ছা-কাহিনি ছাপার একটু বাড়াবাড়ি দেখা দিল।
একদিকে যেমন ছাপা হতে লাগল ব্যবসা শিক্ষা, চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষা, জ্যোতিষী, গেরস্থালি শিক্ষা, ব্যায়ামশিক্ষা, ঘড়ি-সারানো শিক্ষা, ফটোগ্রাফি শিক্ষা, আতশবাজি তৈরি শিক্ষা, শুদ্ধভাবে নাম লেখার শিক্ষা, কলকাতা স্ট্রিট গাইড, ধাঁধা-ম্যাজিক ইত্যাদি সেই সঙ্গে ছাপা হতে লাগলো – “ইন্দ্রিয় সম্মন্ধীয় যৌবন পাঠ্য গ্রন্ত” , “হুড়কো বৌয়ের বিষম জ্বালা”, “কলির বৌ ঘর ভাঙ্গানি”, “লুকয়ে পীরিত কি লাঞ্ছনা”, এই জাতীয় বইও বিস্তর ছাপা হতে লাগলো ।
তবে অনেকের ধারণা ছিল যে বটতলা কুখ্যাত ছিল এই জাতীয় রগরগে শ্লীলতার মাত্রা ছাড়ানো বইয়ের জন্যই, যদিও পাওয়া তথ্য থেকে তেমনটা মনে হয় না।
১৮৫৭ সালে রেভারেন্ড লং-য়ের দেওয়া একটি তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে – সেই অবধি বটতলা থেকে সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বই হচ্ছে পঞ্জিকা (১,৩৬,০০০ কপি)। বিভিন্ন ধরণের শিক্ষা বিষয়ে বই বিক্রি হয়েছে ১,৪৫০০০ কপি। পুরাণ ও হিন্দু ধর্মের উপর বই বিক্রি হয়েছে ৯৬৯৫০ কপি, নীতিকথা বই ৩৯,৭০০ কপি, জীবনী ও ইতিহাস বিক্রি হয়েছে ২০১৫০ কপি। সেই তুলনায় যৌনতা বিষয়ক বই ছাপা হয়েছে ১৪২৫০ কপি মাত্র।
কিন্তু তবুও বটতলার বই সমাজে সম্মানজনক জায়গা পায় নি। বটতলার বেস্টসেলার বইয়ের লেখকরা বাংলা সাহিত্যের ‘হুজ’হু’ -তে স্থান পায় নি। পাঁচকড়ি দে, ভোলানাথ মূখোপাধ্যায়, মহেশ চন্দ্র দাস দে, হরিশ চন্দ্র মিত্র, প্যারিমোহন সেন, লোকনাথ নন্দী – সে সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখক হলেও বাঙালি তাদের মনে রাখেনি।
বটতলার বইয়ের প্রতি এলিট বাঙালির যে কি রকম অবজ্ঞা ছিল তা রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘আকাশপ্রদীপ’ কাব্যগ্রন্থের যাত্রাপথ নামের কবিতায় কিছুটা আঁচ পাওয়া যায়। এই কবিতাতে আছে কবির একেবারে ছোটোবেলার স্মৃতি , সেই তখন যখন -’ … ছেলেবেলায় যে বই পেতাম হাতে/ ঝুঁকে পড়ে যেতুম পড়ে তাহার পাতে পাতে। তিনি লিখেছেন –
“কৃত্তিবাসী রামায়ন সে বটতলাতে ছাপা
দিদিমায়ের বালিশ-তলায় চাপা ।
আলগা মলিন পাতাগুলি, দাগি তাহার মলাট
দিদিমায়ের মতই যেন বলি-পড়া ললাট।
মায়ের ঘরের চৌকাঠেতে বারান্দার এক কোনে
দিন-ফোরানো ক্ষীণ আলোতে পড়েছি এক মনে” ।
তবে অভিজাত, এলিট শ্রেণির বাঙালির অবজ্ঞা সয়েও বটতলা তার অল্পশিক্ষিত বাঙালির কাছে জনপ্রিয় হয়ে বটতলা টিকে ছিল প্রায় ১৮৭০ অবধি।
বটতলার কাল হল আদিরসাত্মক বই বেশি ছেপে মুনাফা কামানোর লোভ করতে গিয়ে। ১৮৫৫ সালে জেমস লং সাহেব মামলা করলেন লেফটেন্যান্ট জেনারলের কাছে। তিনজন প্রকাশক গ্রেফতার হলেন অশ্লীল লেখা ছাপার জন্য। লং সাহেবের প্রভাবে এরপর তৎকালীন বিদ্বৎসমাজ অশ্লীলতা নিয়ে সজাগ হলেন। কেশব সেনের মত প্রভাবশালী লোকেরাও বটতলার উপর খড়্গহস্ত হলেন। ১৮৭০ সাল নাগাদ বটতলার দিন ফুরিয়ে এলো। প্রকাশকরা একে একে পাততাড়ি গোটালেন।
কলকাতায় তখন বইয়ের দোকান উনিশ শতক শুরু হবার আগে থেকে কলকাতায় সেন্ট আন্ড্রিউজ নামে একটি মাত্র বইয়ের দোকান ছিল লাল দিঘীর পারে। সেখানে সাহেবদের বইই বিক্রি হত। জাহাজে করে নতুন বইয়ের আমদানী হলেই সাহেব মেম সাহেবরা এই দোকানে গিয়ে ভিড় জমাত বই কিনবার জন্যে। শ্রীরামপুর প্রেস থেকে যে সব বই ছাপা হত তা পাওয়া যেত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের গ্রন্থাগারে। ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজের পাশেই স্কুল বুক সোসাইটি একটি বইয়ের দোকান খোলে। সেখানেই সবাই শ্রীরামপুরে ছাপা বাংলা বই কিনতে আসত। আর বটতলায় ছাপা বই বিক্রি হত বই ফেরিওয়ালাদের মাধ্যমে। স্কুল বুক সোসাইটি মূলত স্কুলের পাঠ্যপুস্তক বিক্রি করত। এরা শিক্ষার প্রচারের জন্যে সস্তায় বই বিক্রি করত। ঠিক ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে নয়। একই সঙ্গে মুদ্রক, প্রকাশক এবং বিক্রেতার ভূমিকায় কলকাতা শহরে এদেরই দেখা গেল।
এদিকে কলকাতায় একে একে নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা হতে থাকলো। হিন্দু কলেজ এবং সংস্কৃত কলেজের পরে মেডিক্যাল কলেজ, প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, সেন্ট পলস কলেজ ইত্যাদি কলেজে পঠন-পাঠন শুরু হয়ে গেল। অনেক স্কুলও খুলতে লাগল। প্রচুর বইয়ের দরকার হতে লাগল।
ভাবলে অবাক লাগে বাঙালিকে যিনি অক্ষরজ্ঞান করাবার উদ্যোগ যিনি নিয়েছিলেন সেই বিদ্যাসাগর মশাইয়ের হাত ধরেই কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের ব্যবসাও শুরু হয়েছিল ১৮৪৭ সালে। তিনিই বই প্রকাশনা ও বই-য়ের ব্যবসায় নামলেন। তিনি আর্মহার্স্ট স্ট্রিটে সংস্কৃত যন্ত্রালয় নামে একটা কাঠের প্রেস কিনলেন এবং আরপুলি লেনে একটা বইয়ের দোকানও খুলে ফেললেন। নাম রাখলেন সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরি। যেহেতু নাম ‘ডিপজিটরি’ তাই তাঁর নিজের লেখা বই ছাড়াও অন্যের বইও ছাপা হত এখানে। তাঁর বইয়ের দোকানে নিজের প্রেসের বই ছাড়াও অন্য অনেক লেখক তাঁদের বই বিক্রির জন্য রেখে যেতেন। বই বিক্রি হলে কমিশন কেটে টাকা দেওয়া হত। তাঁর তৈরি করা মডেলটি আজও কলেজ স্ট্রিটে চলছে। যথাসময়ে ন্যায্য প্রাপ্য টাকা বুঝিয়ে দেওয়া আর যথাযথ হিসেবের জন্য বিখ্যাত হয়েছিল ‘বিদ্যাসাগরের বইয়ের দোকান’। সৎ পুস্তক বিক্রেতা হিসেবেও আদর্শ স্থাপন করেছিলেন তিনি। তিনি একদিকে যেমন স্কুল ও কলেজের সিলেবাসের বইও ছাপতেন অন্য দিকে তিনি অন্নদামঙ্গলের মত বইও ছাপতেন ।
সংস্কৃত কলেজের সম্পাদকের চাকরি ছেড়ে যখন তিনি বইয়ের দোকান খুলেছিলেন তখন তিনি বন্ধু নীলমাধব মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে ছশো টাকা ধার করেছিলেন। বইয়ের ব্যবসা করে তিনি সেই ধার শোধ করলেন তো বটেই, ১৮৫৫ সালে বইয়ের ব্যবসা করে তিনি মাসে তিন থেকে চার হাজার টাকা আয় করতেন। প্রসঙ্গত বলা যায়, সংস্কৃত কলেজে তাঁর বেতন ছিল মাসে তিনশো টাকা। পরে স্কুল পরিদর্শকের কাজ করতেন বলে আরো মাসিক দুশো টাকা করে পেতেন।
একটি হিসাবে দেখা যাচ্ছে ঐ সময়ে কলকাতায় ছেচল্লিশটি প্রেস থেকে ছাপা বইয়ের সংখ্যা ছিল ৫৭১৬৭০টি । সেখানে শুধু বিদ্যাসাগর মশাইয়ের ছাপাখানা থেকে বইয়ের সংখ্যা ছিল ৮৪২২০টি। অর্থাৎ সেই সময়ের বাংলা দেশের বইয়ের বাজারের অনেকটাই ছিল বিদ্যাসাগর মশাইয়ের দখলে।
সম্ভবত বয়সের কারণেই ১৮৮৫ সালে বিদ্যাসাগর মশাই সংস্কৃত ডিপোজিটারি থেকে তাঁর সমস্ত বই তুলে নিয়ে ব্রজনাথ মুখোপাধায়কে স্বত্ব দান করে তিনি ২৫ নং সুকিয়া স্ট্রিটে ‘কলিকাতা পুস্তকালয়’ নামে একটি বইয়ের দোকান খোলেন। তখন থেকে তাঁর নিজের লেখা বই এখান থেকেই প্রকাশ করতে থাকেন।

অবশ্য বিদ্যাসাগর মশাই ছাড়াও বেশ কয়েকজন বাংলা ভাষার লেখক ও মণীষী নিজের লেখা বই নিজেরাই ছাপবার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে ভবানী চরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রামমোহন রায়, রাধাকান্ত দেব, ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত, কালীপ্রসন্ন সিংহ এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন। বঙ্কিম চন্দ্র তাঁর বই প্রকাশের জন্য ১৮৭৩ খৃষ্টাব্দে কাঁটালপাড়াতে নিজস্ব প্রেস স্থাপন করেছিলেন।
মাইকেল মধুসূদনের ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ ছাপাবার জন্যে কোনো প্রকাশক পাওয়া যায় নি। দিগম্বর মিত্রের অর্থানুকূল্যে ঈশ্বর চন্দ্র বসু সেই বই প্রকাশ করেছিলেন। মাইকেলের ‘একেই কি বলে সভ্যতা’, ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ দুটি বই প্রকাশিত হয়েছিল পাইকপাড়ার রাজার অর্থানুকূল্যে। শর্মিষ্ঠা নাটক এবং তিলোত্তমা সম্ভব কাব্য প্রকাশিত হয়েছিল যতীন্দ্র মোহন ঠাকুরের অর্থ সাহায্যে।
রবীন্দ্রনাথকেও প্রথম দিকে তাঁর বই ছাপতে হয়েছিল নিজের উদ্যোগেই। পরের দিকে অনেক ক্ষেত্রেই প্রকাশকদের নিয়ে তাঁর নানান অভিযোগ ছিল। বিশ শতকের প্রথম দিকে এলাহাবাদের ইন্ডিয়ান প্রেস যত্ন নিয়ে তাঁর বই ছাপতে শুরু করে। ১৯২৩ সালে বিশ্বভারতী প্রেস প্রতিষ্ঠিত হবার পর ইন্ডিয়ান প্রেস সব বইয়ের স্বত্ব বিশ্বভারতীকে দান করে দেয়।
শরৎ চন্দ্রের ক্ষেত্রে অবশ্য প্রকাশকরা প্রথম থেকেই তাঁর লেখা বই ছাপতে আগ্রহ দেখান। শরৎবাবুর বইয়ের কাটতি খুব ভালো ছিল। তাঁর অধিকাংশ বই ছাপা হত ‘এম সি সরকার’ থেকে।
বিদ্যাসাগর মশাইয়ের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে কলেজ স্ট্রিটে অঞ্চলে একে একে পুস্তক ব্যবসায়ীরা আসতে লাগলো। প্রথম দিকে গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় নামের একজন ব্যক্তি যিনি একসময় হিন্দু হস্টেলের সিঁড়ির তলায় মেটিরিয়া মেডিকা বেচতেন, পরে তিনি নিজস্ব দোকান খুললেন বেঙ্গল মেডিক্যাল লাইব্রেরি নাম দিয়ে। শরৎ কুমার লাহিড়ি, রামতনু লাহিড়ির পুত্র, ‘এস কে লাহিড়ি অ্যান্ড কোম্পানি’ নামের একটি দোকান খোলেন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে একে একে খুললো দাশগুপ্ত এন্ড কোম্পানি, ‘বি ব্যানার্জি অ্যান্ড কোম্পানি, সোমপ্রকাশ ডিপোজিটরি। আশুতোষ দেব (এ টি দেব) নামলেন অভিধানের ব্যবসায় ।
কিছুদিন পরে এলবার্ট হল ভাঙা হয়ে কফি হাউস হল। তার আশে পাশে প্রচুর বইয়ের দোকান গজিয়ে উঠলো। চল্লিশের দশকে কলেজস্ট্রিট ছেয়ে গেল বইয়ের দোকান এবং প্রকাশনা সংস্থার অফিসে।
নানান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রকাশকদের অফিস, নতুন এবং পুরো বইয়ের দোকান, কফিহাউস সহ নানান বুদ্ধিজীবিদের আড্ডার ঠেক গড়ে উঠলো এই অঞ্চলে। সব মিলে এই অঞ্চল হয়ে উঠল বইয়ের এবং বিদ্যাচর্চার স্বর্গরাজ্য। বিশ শতকের প্রথম দিকে একে একে বসুমতী বিদ্যা মন্দির, এম সি সরকার, দেব সাহিত্য কুটির, সিগনেট প্রেস এই অঞ্চলে এসে জমিয়ে ব্যবসা করতে লাগলেন।


যদিও এখন মুদ্রণশিল্পের প্রযুক্তির আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে, ডিজিট্যাল ছাপাই শুরু হবার পরে সাবেকী ছাপাখানাগুলির অনেককটাই বিলুপ্তি ঘটে গেছে। তবুও কলেজ স্ট্রিট এখনও তার পুরোনো ঐতিহ্য বজায় রেখে বইয়ের তীর্থক্ষেত্র হয়ে রয়ে গেছে।
বটতলা বিলুপ্ত হয়ে গেলেও বাংলা বই ও কলেজস্ট্রিট প্রায় সমার্থক হয়ে বিরাজ করছে আজও। শ্রীরামপুর মিশন প্রেস, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, ক্যালকাটা বুক সোসাইটি, ভার্নাকুলার লিটারেচর সোসাইটি এবং বিদ্যসাগরের সংস্কৃত প্রেস ডিপোজিটরি বাংলা বই ব্যবসার যে ধারাটি প্রবর্তন করেছিল আজকের কলেজ স্ট্রিট মোটামুটি সেই ধারাটিই বহন করে চলেছে।
এই নিবন্ধ শেষ করা যাক বিনয় ঘোষ মশাইয়ের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে ।
“কলেজ স্ট্রিট ও আজকের বটতলার মধ্যে আসলে ক্রস-কাজিনের সম্পর্ক থাকলেও তাদের মধ্যে মুখ দেখাদেখি নেই। বিশ্ববিদ্যালয়াশ্রিত কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলের কালচার—অভিযান আজ সমুদ্যত। তার কাছে বটতলা আজ অবজ্ঞাত। যে-কোনো কুৎসিত সাহিত্য ও কদর্য ছাপা আজ কলেজ স্ট্রিটের কালচারবাগীশরা ‘বটতলার সাহিত্য’ বলে বিদ্রুপ করে থাকেন। কিন্তু কলেজ স্কোয়্যার অঞ্চলে হরেক রকমের ‘যৌন সাহিত্য’ ও পত্রিকাদির দিকে চেয়ে বটতলা শুধু মুচকি হাসে, বোবার মতন চুপ করে থাকে, কোনো উত্তর দেয় না। কলেজ স্ট্রিট থেকে বটতলা বেশি দূর নয়, কিন্তু মানসিক দূরত্বটা আজ অনেক বেশি। কলকাতার মধ্যবিত্ত কালচারের স্তরে স্তরে অনেক পলেস্তারা জমেছে, তারই তলার স্তরে বটতলা, উপরের স্তরে বর্তমান কলেজ স্ট্রিট। কলেজ স্ট্রিট যে বটতলারই বংশধর, আজও তার প্রমাণ পাওয়া যায়। বটতলা তাই শুধু বিদ্রুপের পাত্র নয়, তার একটা ইতিহাস আছে এবং একটা বিশেষ কালের সাহিত্যের ইতিহাসে তার একটা ভূমিকাও আছে। বিদ্রুপ করবার আগে কলেজ স্ট্রিটের ‘কালচার্ডদের’ সেটা জানা উচিত নয় কি?”
তথ্যসূত্র:
• মুদ্রণ সংস্কৃতি ও বাংলা বই – স্বপন চক্রবর্তী সম্পাদিত
যখন ছাপাখানা এলো – শ্রীপান্থ
• বাংলায় নবচেতনার ইতিহাস – স্বপন বসু
• উনিশ শতকের সমাজ ও সংস্কৃতি – অমিতাভ মুখোপাধ্যায়
• বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনা – চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত
• বটতলার সাহিত্য – বিনয় ঘোষ
• বটতলার বেসাতি – সুকুমার সেন
এবং অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত কিছু তথ্য।