শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

আমাদের সাজ পোশাকে বাঙালিয়ানা- একটি অগোছালো অন্বেষণ

Somen Dey

যখন ইংল্যান্ডে প্রথম রেলগাড়ি চালানোর প্রস্তুতি চলছিল, তখন নানা মহল থেকে নানা রকমের প্রতিবাদ উঠছিল। লোকে নানা রকমের ভয় পাচ্ছিল। তার মধ্যে কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ ইংল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গ্ল্যাডস্টোনকে একটি চিঠি লিখে তাঁর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল এইভাবে এক জায়গার সঙ্গে আর জায়গা জুড়ে দিলে সেই জায়গায় দেশের স্থানীয় বৈশিষ্ট্যগুলি (staple of the country) নষ্ট হয়ে যাবে। কবিদের ভাবালুতাকে রাজনীতির মানুষেরা আর কবেই বা পাত্তা দিয়েছে। গ্ল্যাডস্টোনও দেন নি। তারপর অনেক দিন কেটে গেছে। রেল লাইন ছাড়াও বহু রকম ভাবে পৃথিবীকে জুড়ে দেওয়ার কাজ চলেছে একে একে। একসময় বিশ্বায়ন নামের একটা ঝড় উঠেছে। পৃথিবীর সব স্থানীয় বৈশিষ্ট্য অনেকটাই একাকার হয়ে গেছে। তার মধ্যে একটি হল স্থানীয় পোশাক। জিন্স, টি-শার্ট প্রায় সারা পৃথিবীর পোশাক হয়ে উঠেছে। কিন্তু তবুও কিছু কিছু দেশে বা অঞ্চলে এখনও তারা নিজেদের পোশাক বাঁচিয়ে রেখেছে।

আমাদের দেশে অঞ্চল বিশেষে বহু রকমের সাজ পোশাক আছে। বিশেষ করে মেয়েদের। যেমন অরুণাচলের রক্তলাল ডাকমান্ডা, অসমের স্নিগ্ধ রঙের মেখলা-চাদর, পাঞ্জাবের ফুলকারি করা সালওয়ার-কামিজ মধ্যপ্রদেশের ঝলমলে বন্দেজ, মহারাষ্ট্রের সাধাসিধা নৌভারি, রাজস্থানের রং বাহার লাহাঙ্গা-দাভানি, কেরলের আঁচল-দোপাট্টাবিহীন মুন্ডুম নেরিয়াথুম ইত্যাদি।

ভারতীয় পোষাক-বৈচিত্র্যে নারী

মোটামুটিভাবে আমাদের দেশের সব জাতিরই পুরুষদের এবং নারীদের একটি করে স্বীকৃত পোশাক বা পোশাকরীতি আছে, যা দিয়ে সেই জাতিকে চিহ্নিত করা হয়। সাধারণভাবে বাঙালি নারী এবং পুরুষকে বোঝাতে মেয়েদের জন্যে শাড়ি এবং পুরুষদের জন্যে ধুতি পাঞ্জাবীই বেছে নেওয়া হয়ে থাকে। কারণ প্রচলিত ধারণা এটাই যে ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি জাতির পোশাক মেয়েদের শাড়ি এবং পুরুষদের ধুতি পাঞ্জাবি।

কিন্তু একটু ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করলে বোঝা যাবে বাবু বাঙালি যে ভাবে ধুতি পাঞ্জাবী পরে বা বিবি বাঙালি যে ভাবে শাড়ি পরে সেটা ঠিক ততটা ঐতিহ্যবাহী নয় যতটা আমরা মনে করি। বরং যুগ যুগ ধরে বাঙালির ‘জিন’-এ যেমন নানা জাতি উপজাতির রক্তের মিশ্রণ ঘটেছে বাঙালির পোশাকের ক্ষেত্রেও খানিকটা সেই রকমটাই হয়েছে।

রাজনারায়ণ বসু ১৮৭৪ সালে লেখা ‘সেকাল আর একাল’ বইটিতে দুঃখ করে বলেছিলেন – ‘প্রত্যেক জাতিরই একটি নির্দিষ্ট পরিচ্ছদ আছে। সেইরূপ পরিচ্ছদ সেই জাতির সকল ব্যক্তিই পরিধান করিয়া থাকেন। কিন্তু আমাদিগের বাঙ্গালী জাতির একটি নির্দিষ্ট পরিচ্ছদ নাই। কোন মজলিসে যাউন, একশত প্রকার পরিচ্ছদ দেখিবেন, পরিচ্ছদের কিছুমাত্র সমানতা নাই। ইহাতে বোধ হয়, আমাদের কিছুমাত্র জাতিত্ব নাই।’

তেমনি আবার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তাঁর ‘বাঙ্গালীর পোশাক’ নিবন্ধে লিখছেন –
“বাঙ্গালীর পোশাক অতি আদিম ও আদমিক (Adamite)। বাঙ্গালীর কোনো পোশাক নাই বলিলেই চলে। যদি জাতি গুটিকয়েক সভ্য শিক্ষিত যুবকে না হয়, যদি জাতির আচার, ব্যবহা্র ভদ্রতা, শিক্ষা কেবল জগতের পঞ্চমাংশের স্বীকৃতের না হয়, যদি অশিক্ষিত লক্ষ লক্ষ কৃষক ও ব্যবসায়ী জাতির মূল হয়, তাহা হইলে দুঃখের সহিত বলিতে হইবে, বাঙ্গালীর কোনো পোশাকই নাই।”

রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৮ খৃষ্টাব্দে লেখা ‘কোট বা চাপকান‘ নামের একটি প্রবন্ধে এই কথাটি একটু ঘুরিয়ে লিখছেন –
“কিন্তু আমরা আশঙ্কা করিতেছি, ইহাদের অনেকেই এই প্রসঙ্গে একটা অত্যন্ত নিষ্ঠুর কথা বলিবেন। বলিবেন, পুরুষের উপযোগী জাতীয় পরিচ্ছদ তোমাদের আছে কোথায় যে আমরা পরিব? ইহাকেই বলে আঘাতের উপর অবমাননা। একে তো পরিবারের বেলা ইচ্ছাসুখেই বিলাতি কাপড় পরিলেন, তাহার পর বলিবার বেলা সুর ধরিলেন যে, তোমাদের কোনো কাপড় ছিল না বলিয়াই আমাদিগকে এই বেশ ধরিতে হইয়াছে, আমরা পরের কাপড় পরিয়াছি বটে, কিন্তু তোমাদের কোনো কাপড় নাই – সে আরো খারাপ।”

একটু যদি আরও পিছন থেকে শুরু করি, মধ্যযুগে বাঙালি নারী ও পুরুষ পরতেন সেলাইবিহীন বস্ত্রখণ্ড। মেয়েরা যেটা পরতেন সেটা হত দৈর্ঘ্যে এবং ঝুলে একটু বড় আর পুরুষদের বস্ত্রখন্ডটি দৈর্ঘ্য এবং ঝুলে খানিকটা ছোটো।

মধ্যযুগে মেয়েদের পোশাক

আমবাঙালি ধুতি কোনো কালেই হাঁটুর নীচে নামত না। ধনীরা চিরকালই আম-আদমিদের চেয়ে খানিকটা বেশি নিয়ে থাকেন। তখনও ধনী পুরুষেরা একটূ বড় মাপের ধুতি পরতেন, তার সামনের দিকটা একটু কোঁচানো থাকত। আর শ্রমিক শ্রেণী ধুতি পরতেন, মালকোঁচা মেরে। প্রাচীন আর মধ্যযুগের যে সব ভাস্কর্য যা এপার এবং ওপার বাংলায় পাওয়া গেছে তাতে দেখা যাচ্ছে পুরুষ এবং নারী দুজনেরই শরীরের উপরের অংশ অনাবৃত থাকত। হয়ত ধনী পুরুষরা পরতেন উত্তরীয় জাতীয় কিছু্। আর ধনী নারীরা পরতেন কাঁচুলি জাতীয় কিছু। আর পুরুষ এবং নারীর উভয়েই গলায় কানে নানা রকমের অলঙ্কার পরতেন।

পাহাড়পুরের মন্দিরে
পাহাড়পুরের মন্দিরে

তবে মধ্যযুগে পুরুষরা মাথায় কেউ টুপি বা পাগড়ি পরতেন না। অথচ উনবিংশ শতাব্দীতে দেখা যাচ্ছে হিন্দু কালেজের ছেলেরা মাথার টুপি পরতেন না বলে ঈশ্বর গুপ্ত দ্বারা বাঙ্গালির সংস্কৃতি ধংস করার জন্যে তারা সমালোচিত হয়েছিলেন। তারপর মুসলমান শাসকদের বঙ্গদেশে আসার বেশ কিছুদিন পর থেকে বলা যেতে পারে ষোড়শ শতাব্দী থেকে বাঙালির পোশাকে পরিবর্তন দেখা গেল। অন্য দেশ থেকে আসা মুসলমানদের অনুকরণে ষোল শতকে বাঙালি পুরুষ উর্ধাঙ্গের পোষাক, মাথার পাগড়ি, কোমরে কোমরবন্ধ পায়ে মোজা জুতো পরতে শিখে যায়। তবে ধুতি তখনও সেই হাঁটু অবধি। এই সময়েই বাঙালি সেলাই করা পোষাক পরতেও শেখে। পুরুষরা পিরান নামের একধরণের ছোটো জামা পরতেন। মেয়েরা শাড়ি এবং ঘাঘরা জাতীয় পোষাক পরতে শেখেন।

পনেরো দশকে বাংলার হোসেনশাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা হোসেন শাহর রাজত্বের সময় কবি বিজয়গুপ্তের লেখা ‘পদ্মপুরাণ’-এ পাওয়া যায়, সিংহলরাজ চাঁদ সওদাগরের কাছে পট্টবস্ত্র পেয়ে বাঙালি সেই বস্ত্র পরছেন। কবির কথায় পরার সে ধরনটি ছিল – ‘একখানি কাচিয়া পিন্ধে,
একখানি মাথায় বান্ধে, আর একখানি দিল সর্বগায়।’

মুকুন্দরামের লেখা ‘কবিকঙ্কন চন্ডী’তেও আমরা পাগড়ির উল্লেখ পাচ্ছি। ষোলো শতকের শেষের দিকে মুসলমানদের প্রভাবে হিন্দুরা ইজার ও পাজামা পরা শুরু করে দেয়।
তবে প্রাচীন বাঙালি সমাজে জুতা পরার রীতি ছিল না বললেই চলে। কিন্তু চাকর বাকরেরাও পাগড়ি পরতেন। বাঙালি যে পাঞ্জাবি পরে সেটিও সম্ভবত কামিজ, রামজামা বা লম্বা জামা থেকেই উদ্ভব হয়েছে। তেমনি আবার হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে ধুতি পরারও প্রচলন হয়েছিল। ধুতিকে হিন্দুয়ানি বা লুঙ্গিকে মুসলমানি পোশাক হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস দেখা যায় নি।

প্রাচীন বাংলায় সেলাই-করা কাপড় পরাকে অপবিত্র মনে করা হতো। সেজন্যই নারী-পুরুষেরা শাড়ি ও ধুতির মত পোশাকের চল হয়েছিল। মুসলমানরা এদেশে আসার আগে সেলাই করা কাপড় পরা হতো না। মুসলমানরা ধীরে ধীরে এ রীতি চালু করে এবং সমাজে ‘দর্জি’ নামক এক নতুন পেশার উদ্ভব হয়। এমন কি ১৯০১ সালে ঠাকুর বাড়ির গগনেন্দ্রনাথ যখন তাঁর নয় বছরের মেয়ে সুনন্দিনীকে সম্প্রদান করতে যাচ্ছিলেন তখন বরপক্ষের একজন আপত্তি জানিয়ে বলে সেলাই করা কাপড় পরে কন্যা সম্প্রদান করা যাবে না। গগনেন্দ্রনাথকে দেখিয়ে দিতে হয়েছিল যে তাঁর কন্যা কোনো সেলাই করা কাপড় পরেনি।

অথচ প্রায় একই সময়ে পাশের ব্রাহ্ম ঠাকুর বাড়িতে স্বর্ণকুমারী দেবীর লেখায় পাচ্ছি –
“আমাদের বাড়িতে সেকালে খুব ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েরা সম্ভ্রান্ত ঘরের মুসলমান বালক বালিকার ন্যায় বেশ পরিধান করিত। আমরা একটু বড় হওয়া অবধি তাহার পরিবর্তে নিত্য নতুন পোষাকে সাজিয়াছি। পিতামহ ছবি দেখিয়াছেন, আর আমাদের পোশাক ফরমাশ করিয়াছেন। দর্জি প্রতিদিনই তাঁহার কাছে হাজির, আর আমরাও।”

উনিশ শতকে পৌঁছে আমরা দেখতে পাচ্ছি বাবুরা পরতেন লম্বা কুর্তা, চাপকান, জোব্বা আর মাথায় পাগড়ি বা টুপি। টুপিতে জরির কারুকাজ। নিম্নাঙ্গে কোমরবন্ধ, চুড়িদার পাজামা, পায়ে শুঁড় তোলা জুতো।

রামমোহন রায়, রাধাকান্ত দেব, প্রসন্ন কুমার ঠাকুরের মত বিখ্যাত বাবুদের ছবিতে এঁদের এ
রকম পোষাক পরতেই দেখা যায়। আর প্রগতিবাদী বাঙালিদের মধ্যে চাপ দাড়ি রাখারও প্রচলন হয়। সেই সঙ্গে চেনে ঝোলানো ট্যাঁক ঘড়ি আর ডাঁটিবিহীন প্যাঁশনে চশমা। পায়ে শুঁড় তোলা জুতো আর কাঁধে শাল।

রামমোহন রায়ের পোশাক

কিন্তু ঠিক এই সময়ে দেখা যাচ্ছে অন্দরমহলে মেয়েদের পোশাকের চরম দুর্দশা। রাসসুন্দরীদেবীর লেখা ১৮৭৬ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত আত্মজীবনীমূলক লেখা বইতে পাচ্ছি –

“বিশেষতঃ তখন মেয়েছেলের এই প্রকার নিয়ম ছিল, যে বউ হইবে, সে হাতখানেক ঘোমটা দিয়া ঘরের মধ্যে কাজ করিবে, আর কাহারো সঙ্গে কথা কহিবে না । তাহা হইলেই বড় ভালো বৌ হইল। সে কালে এখনকার মত চিকন কাপড় ছিল না, মোটা মোটা কাপড় ছিল। আর যে সকল লোক ছিল কাহারো সঙ্গেই কথা কহিতাম না। সে কাপড়ের মধ্য হইতে বাহিরে দৃষ্টি হইত না । যেন কলুর বলদের মত দুই চক্ষু ঢাকা থাকিত। আপনার পায়ে পাতা ভিন্ন অন্য কোনো দিকে দৃষ্টি হইত না। এই প্রকার সকল বিষয়ে বৌদিগের কর্মের রীতি ছিল। আমিও ঐ রীতিমতেই চলিতাম।”

এই রকম সময়ে বামাবোধিনী পত্রিকায় সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল –
“এ দেশের স্ত্রীগণ যে রূপ পরিচ্ছদ পরিধান করেন, এ দেশে চলিত বলিয়া তাহাতে কেহ দোষ বোধ হয় না। কিন্তু একটু বিবেচনা করিয়া দেখিলে প্রতীত হইবে, ইহা কেবল উলঙ্গ অবস্থায় না থাকিয়া, গায়ে একটি আবরণ দিয়া রাখা মাত্র।”

অথচ এই সময়ে বিলেতফেরত বাবুদের মধ্যে বা ইংরেজদের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করা বাঙালিদের সাহেবি পোশাকের প্রচলন দেখা দেয়। খুব সম্ভবত মাইকেল মধুসূদন দত্তই হিন্দু কালেজে সবার আগে ইংরেজি ধরণের পোষাক পরে সকলকে চমকে দিয়েছিলেন। তারপর অনেকেই তাঁকে অনুসরণ করেন। তবে একজন বিলেত ফেরত ডি এল রায় এই বিলেতি পোষাক
পরাকে ব্যঙ্গ করে গান লেখেন।

মাথায় শামলা টুপি বা পাগড়ি পরাটা ঠিক ফ্যাশন স্টেটমেন্ট ছিল, নাকি চাকরির প্রয়োজনে
পরা হত তা নিয়ে একটু সংশয় থেকে যায়। হুতোম বলছে, যাঁরা পাগড়ি পরতেন তারা
ছিলেন আসলে সরকারি কেরানী। দফতরে যাওয়ার সময়ে পাগড়ি পরার রীতি ছিল। যেটাকে
বলা হত শামলা। কিন্তু আমরা রামমোহন, দ্বারকানাথ, বঙ্কিম, রাধাকান্ত দেব এই রকম
সম্ভ্রান্ত বাঙালিদের পাগড়ি পরা ছবি দেখতে পাই। পরে রবীন্দ্রনাথকেও টুপি এবং পাগড়ি
পরতে দেখা গেছে।

যৌবনে রবীন্দ্রনাথের পোশাক

হুতোমের লেখায় পাই উৎসব পার্বণে যাওয়ার সময় বাঙালির পোষাক ছিল – কোঁচানো ধুতি, ধোপদুরস্ত কামিজ, শান্তিপুরি উড়ুনি, নেটের চাদর। ইংরেজ শাসনের আমলে অনেক পুরুষ বাঙালি পোষাক ছেড়ে সাহেবী পোশাক-আসাক পরতে শুরু করলেন।

এক ইংরেজের আঁকা বাঙালি কেরাণীর ব্যঙ্গচিত্র

কিন্তু মহিলারা যেহেতু তখনো মূলত অন্তঃপুরবাসিনী, তাই তাদের পোশাকে পশ্চিমের কোনো প্রভাব পড়লোনা। বরং অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের পোষাক বাইরে বেরোবার মত যথেষ্ট ভব্য ছিলনা।
কোনো রকমে একটা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে নেওয়াটাই রীতি ছিল। সায়া সেমিজের বালাই ছিল না।

কালিঘাটের পটে বাবুর পোশাক
কালিঘাটের পটে বিবির পোশাক

১৮৭১ খৃষ্টাব্দে বামবোধিনী পত্রিকা অগ্রণী ব্রাহ্ম পরিবারের মহিলাদের ভিতর একটি সার্ভে চালান। তারা মেয়েদের আদর্শ পোশাক কেমন হবে সেই বিষয়ে মতামত সংগ্রহ করে। সেই মত তারা তাদের পত্রিকায় একটি পোষাক বিধি প্রকাশিত করে। সেটি এই রকম –

“বাটিতে – ইজার পিরান শাটী অথবা লম্বা পিরান ও শাটী
বাহিরে গমন কালে – ইজার ।পিরান, শাটী
চাদর, পাজামা, জুতা
জুতা যাহারা পছন্দ করেন না, পরিতে পারেন না। “

জ্ঞানদানন্দিনী দেবী যখন তাঁর স্বামীর কর্মস্থল বোম্বাইয়ে যাবেন বলে স্থির হল,
তখন তিনি কি পোষাক পরে যাবেন তা নিয়ে একটা সমস্যা দেখা দেয়। তাঁর জন্যে
ফরাসী ডিজাইনারকে দিয়ে ওরিয়েন্টাল ড্রেস বানানো হয়েছিল।

মুম্বাইয়ে গিয়ে জ্ঞানদানন্দিনী তার জবরজং ওরিয়েন্টাল ড্রেসটি বর্জন করে পার্শী মেয়েদের শাড়ি পড়ার মিষ্টি ছিমছাম রীতিটি তুলে নিলেন, একটু নিজের রুচি মতো অদল–বদল করে। তার শাড়ি পরার এই রুচিসম্মত কায়দাটি অনেকেরই নজর কাড়লো, ঠাকুরবাড়ির অনেক মেয়েই শাড়ি পড়ার এই পদ্ধতিটিকে গ্রহণ করলেন। বোম্বাই থেকে আনা বলে ঠাকুরবাড়িতে এই শাড়ি পরার ঢংয়ের নাম ছিল ‘বোম্বাই দস্তুর’ কিন্তু বাংলাদেশের মেয়েরা একে বলতো ‘ঠাকুরবাড়ির শাড়ি’।

জ্ঞানদানন্দিনী মুম্বাই থেকে ফিরে মেয়েদেরকে এই শাড়ি পড়া শেখানোর জন্য কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। অনেক সম্ভ্রান্ত বাড়ির মেয়েরা এসেছিলেন এই ঢংয়ের শাড়ি পরাটি শিখতে, তাদের মধ্যে ব্রাহ্মিকার সংখ্যাই ছিল উল্লেখযোগ্য। সর্বপ্রথম এসেছিলেন বিহারী গুপ্তের স্ত্রী সৌদামিনী, অবশ্য তখনও তিনি অবিবাহিতা ছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য শাড়ির সঙ্গে জ্ঞানদানন্দিনী শায়া-সেমিজ-ব্লাউজ-জ্যাকেট পরাও প্রচলন করেন। সেই সময়ে আস্তে আস্তে নারীদের জাগরণ আরম্ভ হয়েছিল, আশপাশ থেকে একটা একটা করে জানালাগুলো খুলতে শুরু হয়েছিল। মেয়েরা নানারকম সমালোচনা, ব্যঙ্গবিদ্রুপ সহ্য করেও আস্তে আস্তে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসছিলেন। তাই বাইরে বেরোবার একটি রুচিশীল বেশ মেয়েদের তখন খুব দরকার হয়ে পড়েছিল। সর্বপ্রথম বাইরে বেরোনোর সূচনা করেন ধরতে গেলে ঠাকুরবাড়ির মেয়েরাই। বাঙালি মেয়েদের মধ্যে প্রকাশ্যে সভায় যোগদান বলতে জ্ঞানদানন্দিনী লাটভবনে গিয়েছিলেন নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে, তারপর অবশ্য তিনি বিলেতেও যান।

জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর শাড়ি পরা

তিনি ছাড়াও সে সময় রাজকুমারী বন্দ্যোপাধ্যায় বিলেত-ভ্রমন করেন। সনাতনপন্থীরা এ নিয়ে ভীষন হৈ চৈ করেন। ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের সঙ্গে যোগ দিলেন ব্রাহ্ম মেয়েরা। ব্রাহ্ম মেয়েরা তখন মন্দিরে চিকের আড়ালে বসে প্রার্থনা করতেন। ১৮৭২ সালে কয়েকজন আচার্য জানালেন তারা আর স্বতন্ত্র বসবেন না। অন্নদাচরন খাস্তগীর ও দুর্গামোহন দাস তাঁদের স্ত্রী ও মেয়েদের নিয়ে এসে বাইরে বসলেন সাধারণ উপাসকদের সঙ্গে।
কেশব সেন বাধ্য হয়েই তখন পর্দা ছাড়াই মেয়েদের উপাসনা মন্দিরে বসবার অনুমতি দিলেন। সেই ছিল প্রকাশ্যে পর্দা প্রথার বিরোধিতা। ‘বোম্বাই দস্তুর’ নতুনত্ব, রুচিশীলতা ও পরিধানের সুবিধার জন্য সবার দৃষ্টি আকর্ষন করেছিল। তবে এতে মাথায় আঁচল দেওয়া যেত না বলে প্রগতিশীলরা মাথায় একটি ছোট টুপি পরতেন। সামনের দিকটা মুকুটের মতো, পেছনের দিকে একটু চাদরের মতো কাপড় ঝুলত। জ্ঞানদানন্দিনীর মেয়ে ইন্দিরা শাড়ির আচল দিয়ে মাথায় ছোট্ট ঘোমটা টানার প্রচলন করেন।

রক্ষণশীলতার মাত্রা চিরকাল একই রকম থাকে না। প্রাথমিক আপত্তিগুলো ধীরে ধীরে শক্তি হারায় সময়ের সঙ্গে। মেয়েদের জুতো-মোজা চালু হতে আরো কিছুদিন লেগেছিল। মেয়েদের জন্যে বেথুন স্কুল শুরু হবার সময়ে ঈশ্বর গুপ্তর মত মানুষ মেয়েদের জুতো পরা নিয়ে বিদ্রুপ করে কবিতা লিখেছিলেন।

এমন কি ঠাকুরবাড়িতেও মেয়েদের জুতো পরার প্রচলন অনেক পরে হয়। মেয়েদের ব্লাউজ পরার প্রচলনও জ্ঞানদানন্দিনী দেবীই করেন। প্রথমে পুরো হাতা আর কলার দেওয়া ব্লাউজের প্রচলন হয়, তার পর ডিজাইনে নানা পরিবর্তন দেখা দেয়। সত্যজিৎ রায় ‘চারুলতা’ সিনেমায় চারুকে যে লেশ দেওয়া থ্রি কোয়াটার ব্লাউজ পরতে দেখা গেছে সেটি সম্ভবত জ্ঞানদা দেবীর চালু করা ব্লাউজের প্রথম ডিজাইনের পরবর্তী পর্যায়ের। যুগ পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে এই ব্লাউজের হাতা ছোটো হতে হতে একসময় স্লিভলেসে গিয়ে পৌঁছায়। শাড়ি পরার ধরণ ঢিলেঢালা থেকে স্কিনটাইট হয়ে যায়।

ষাট সত্তরের দশক অবধি ঠাকুরবাড়ির প্রচলন করা শাড়ি পরাই বাঙালি মেয়েদের প্রধান পরিধান ছিল।

সত্যজিতের চারুলতার পোশাক

তবে পুরুষদের পোষাক নিয়ে তেমন কোনো দিশা ঠাকুর বাড়ি দেখান নি। ছবিতে ঠাকুর
বাড়ির বিখ্যাত সব ব্যাক্তিত্যকেই জোব্বা পরিহিত দেখা যায়। এই গরম দেশে, যখন
এয়ার কন্ডিশনের বালাই ছিল না, তখন এই রকমের পোষাক কেন পরতেন কে জানে।
রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতার অমিত রায় যাকে রবীন্দ্রনাথ নতুন কালের প্রতীক হিসেবে
দেখিয়েছেন তার মুখে একটি উক্তি এখনো বাঙালিদের মুখে মুখে ফেরে। সেটি হল –
ফ্যাশানটা হল মুখোশ, স্টাইলটা হল মুখশ্রী। এমন যে অমিতরয় – তার ফ্যাশনটা কেমন ছিল?
রবীন্দ্রনাথ তা দেখিয়েছেন এই ভাবে –

“ধুতিসাদা থানের যত্নে কোঁচানো, কেননা ওর বয়সে এরকম ধুতি চলতি নয়। পাঞ্জাবি পরে, তার বাঁ কাঁধ থেকে বোতাম ডান দিকের কোমর অবধি, আস্তিনের সামনের দিকটা কনুইপর্যন্ত দু-ভাগ করা; কোমরে ধুতিটাকে ঘিরে একটা জরি-দেওয়া চওড়া খয়েরি রঙের ফিতে, তারই বাঁ দিকে ঝুলছে বৃন্দাবনী ছিটের এক ছোটো থলি, তার মধ্যে ওর ট্যাঁকঘড়ি;”

জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর দেখানো শাড়ি বাঙালি মেয়েদের মধ্যে টিঁকে গেলেও বাঙালি পুরুষদের
কাছে এই রবীন্দ্রকল্পিত পোষাক একেবারেই জনপ্রিয় হয়নি।
আর দিন যত এগোতে লাগল বাঙালি ধড়াচুড়োগুলি, মানে পাগড়ি, টুপি, শামলা,
জোব্বা, চাপকান, কোমরবন্ধ এই সব একটু করে ছাড়তে লাগল। কলকাতার গরমের সঙ্গে
মোকাবিলা করার জন্যে পুরুষদের পোষাক ক্রমশ হালকা হয়ে গেল । আর বাবুয়ানির যুগ
শেষ হওয়ার পর বাঙালি মধ্যবিত্তদের মধ্যে চাকুরিজীবির সংখ্যা বাড়তে লাগল। ট্রামে বাসে
যাতায়াত করার জন্যে তাদের কাছে ইংরেজদের কাছে শেখা প্যান্ট-সার্ট অনেক বেশি
সুবিধের পোশাক বলে মনে হল।

আমরা আর একটু এগিয়ে গিয়ে বিংশ শতাব্দীতে চলে আসলে দেখতে পাই বাঙালি
বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে লম্বা ঝুলের পাঞ্জাবীর সঙ্গে চওড়া ঘেরের পাজামা পরার একটা চল ছিল। এই পোষাক সম্ভবত পারস্য দেশ থেকে এসেছিল। সত্যেন বোস, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়,
উৎপল দত্ত, সত্যজিৎ রায়, অজিতেশ বন্দোপাধ্যায়ের মতো অনেককেই এ রকম
ঢিলেঢালা পোষাকে দেখা যেত। তার পর একসময় পাজামার ঘের কমতে লাগল আর
সাদামাটা পাঞ্জাবীর বদলে পাঞ্জাবী নিয়ে নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হল। তা
এখনো চলছে।

সত্যজিতের প্রিয় পোশাক

এমব্রয়ডারি, এপ্লিক, বাটিক, হাতছাপাই, কোলাজ, ব্লক প্রিন্ট, মধুবনী, কাঁথাস্টিচ, বাংলা আখর, জ্যামিতিক মোটিফ, ফুলেল মোটিফ, আদিবাসী দেয়াল-চিত্র, কালিঘাটের পটচিত্র, শান্তিনিকেতনী সূচীশিল্প, যামিনীরায়ের নারী ইত্যাদি যা কিছু মূর্ত বা বিমূর্ত ছবি, সবই দেখা দিচ্ছে পাঞ্জাবীর শরীরে।

শর্বরী দত্তর ডিজাইন করা বিয়ের পোশাক

ভারতের অন্যান্য প্রদেশের লোক যাকে কুর্তা বলে তাকে বাঙালিরা হঠাৎ পাঞ্জাবী নাম দিলেন
কেন সেটা খুব স্পষ্ট নয়। তবে সপ্তদশ শতাব্দীতে উত্তর ভারতে দু ধরনের কুর্তা চালু
ছিল। মুঘল কুর্তা এবং পাঞ্জাবী কুর্তা। পাঞ্জাবী কুর্তার ধরণটি আসাম মণিপুর হয়ে
বঙ্গদেশে আসে বলে অনেকে মনে করেন। পাঞ্জাবী কুর্তা অপভ্রংশে শুধু পাঞ্জাবী হয়ে গিয়ে
থাকবে।

বছর পঞ্চাশ আগেও পাঞ্জাবীর এত বৈচিত্র‍্য ছিলনা। কাপড়ের দোকান থেকে কাপড় কিনে
দর্জির কাছে নিয়ে গিয়ে মাপ দিয়ে সেলাই করারই চল ছিল। ঝুলের কম বেশি ছাড়া
তাতে আর ডিজাইনে পরিবর্তনের বিশেষ সুযোগ ছিল না। সত্তরের দশক অবধি পাঞ্জাবী পরার যে রকম কয়েকটি স্টাইল দেখা যেত তা এই রকম। কলেজ-ইনিভারসিটির ছাত্র,
কফিহাউসের আড্ডাধারি, বাম রাজনীতির শিক্ষানবিশ, উঠতি-কবি, আঁতেল ছবি
আঁকিয়ে, একনিষ্ঠ নাট্যকর্মী এদের জন্যে বরাদ্দ ছিল খদ্দর বা হ্যান্ডলুম। রঙ সবজে, লালচে, কালচে,‌ হলদেটে এই সব রঙের রকমফের। খুব বেশি উজ্বল রঙ ছেলেদের পরার চল ছিল না।

বিয়ে বাড়ি হলে সে পাঞ্জাবীর হাতাতে গিলে করা হত। কোঁচানো মিহি ধুতির সঙ্গে পরা
হত সেই পাঞ্জাবী। বাবুয়ানির শেষ প্রহর।

বয়স্ক মানুষরা ঢোলা-হাতা পাঞ্জাবী পরতেন । সঙ্গে মোটা ধুতি আর পাম্পশু জুতো।
পাঞ্জাবী আর সার্টের ফিউসন করে একধরনের লম্বা ঝুলের সার্ট প্রচলিত ছিল মোটামুটি
ষাটের দশক অবধি। ধুতির সঙ্গে পরা হত। সিনেমায় উত্তম কুমার, অসিতবরন,
বিকাশ রায়, নির্মল কুমার, রবীন মজুমদার, অনুপ কুমার, অনিল চ্যাটার্জি বহু
সিনেমায় এই ধরনের সার্ট পরে বিস্তর ছবিতে অভিনয় করেছেন। হেমন্ত মুখার্জী ও দ্বিজেন
মুখার্জি তো সারা জীবন এমন সার্ট আর ধুতি পরেই কাটিয়ে দিলেন।
মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, অখিল বন্ধু ঘোষ, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় সাধারণত আদ্দির
পাঞ্জাবীই পরতেন। প্রথম দুজন বোধহয় সিল্কের পাঞ্জাবীও পরতেন।

ধুতি শার্ট পরা উত্তম কুমার

রাজনীতির মানুষদের মধ্যে প্রফুল্ল সেন, অতুল্য ঘোষ, জ্যোতি বসু, সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এঁরা সবাই আদ্দির পাঞ্জাবী পরতেন। সে সময়ের আর সব প্রথম সারির
বাঙালি নেতারা ধুতির সঙ্গে সাদা পাঞ্জাবীই পরতেন।

গেরুয়া পাঞ্জাবী পরার মধ্যে এক ধরনের রাবীন্দ্রিক ব্যাপার ছিল। পঁচিশে বৈশাখের সকালে রবীন্দ্রসদনের গানের অনুষ্ঠানে গেলে অনেক গেরুয়া পাঞ্জাবী দেখা যেত।
বিখ্যাত সাহিত্যিকদের মধ্যে প্রায় সবাই সাদামাটা পাঞ্জাবীই পরতেন। বিমল মিত্র, বিমল
কর, রমাপদ চৌধুরী, সুবোধ ঘোষ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এঁরা সবাই ধুতির সঙ্গে সাদা পাঞ্জাবীই পরতেন। এর মধ্যে
সমরেশ বসু একটু শৌখীন পাঞ্জাবী পরতেন। কাজ করা পাঞ্জাবীর সঙ্গে আলিগড়ি পা
জামা পরা অবস্থায় দেখা যেত। শিব্রাম চক্রবর্তী, যদিও পোষাক সম্বন্ধে উদাসীন ছিলেন, তবু সিল্কের পাঞ্জাবী পরতে ভালবাসতেন ।

শক্তি চট্টোপাধ্যায়, ঋত্বিক ঘটক, রামকিঙ্করদের বোতামবিহীন পাঞ্জাবীতে ছিল, তাঁদের
সৃষ্টির মতই, স্পর্ধিত স্বাধীনতার উচ্চারণ।

বিয়ের সময় বরেরা সাধারণত গরদের পাঞ্জাবীই পরত। বিয়ের দিন বর কনের বাবা
কাকারা পরতেন গরদ, তসর, বাফতা, মুগা সিল্ক বা র সিল্কের পাঞ্জাবী। এই সব
পাঞ্জাবীতে বেশ একটা রাশভারি ব্যাপার থাকত।

সত্তর দশকের শেষের দিকে, মানে যখন বোঝা গেল এ দশক আর মুক্তির দশক হচ্ছেনা,
চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান হচ্ছেনা, তখন বিপ্লবের স্বপ্নকে চিতেয় তুলে
বাঙালি আবার একটু একটু করে তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে গেল। জিনস যাকে নাকি নকশাল আমলে ইয়াঙ্কি কালচারের প্রতীক বলে মনে করা হত, তা প্রবল বেগে ঢুকে পড়ল
কোলকাতায়। মোটা হ্যান্ডলুমের পাঞ্জাবী বামপন্থী হোলটাইমাররা ছাড়া সকলেই বর্জন করল। পাঞ্জাবীতেও নানা ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা আরম্ভ হল। লাল আর সবুজ রঙ রাজনীতির ক্ষেত্রে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও এই দুই রঙের বিভিন্ন প্রকার দেখা গেল যুবকদের পাঞ্জাবীর গায়ে ।

পুরুষদের পাঞ্জাবীর ডিজাইনে নেমে পড়লেন শর্বরী দত্ত, গোষ্ঠ কুমারের মত মেয়েদের নামী দামী ফ্যাসন জগতের শিল্পীরা। সেই সঙ্গে অনেক অজ্ঞাতকুলশীল পোষাক শিল্পীরাও লেগে পড়লেন এই শিল্পে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, বিয়েবাড়িতে, নববর্ষে, দুর্গা পুজোয় বাঙালি ধুতি পাঞ্জাবী বা পাজামা পাঞ্জাবী পরে থাকে। কিন্তু বাঙালির রোজকার পোশাক এখন বাকি ভারতের সঙ্গে একই হয়ে গেছে। মেয়েদেরও তাই হয়েছে।

সিনেমাকে যদি সময়ের এক রকমের দলিল বলে ধরা হয় তাহলে সবাক চিত্র শুরু হওয়া থেকে এখন অবধি নায়িকাদের পোশাক লক্ষ করলে মেয়েদের ফ্যাশনের বিবর্তন কিছুটা বোঝা যাবে।

১৯৩০ সালে কাননদেবীর শাড়ি পরা
আধুনিক ঢংয়ে শাড়ি পরা সুচিত্রা সেন

অতএব ছেলেদের ধুতি-পাঞ্জাবী বা মেয়েদের শাড়ি কোনোটাই বাঙালির সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতীক নয়। তবে যদি কোনো পোশাককে বাঙালিয়ানার অভিজ্ঞান বলে ধরে নিতে হয় তা হলে এই পোশাককে মান্যতা দিতে অসুবিধে থাকার কথা নয়।

যদিও নতুন প্রজন্মের বাঙালি ছেলেমেয়েদের কাছে functional পোশাক হিসেবে শাড়ি এবং ধুতি দুইই বাতিল হয়ে গেছে। তবুও ইতিহাস তো বাতিল হবার নয়।

তথ্যসূত্র

  • উনিশ শতক -বাঙালি মেয়ের পোশাক ভাবনা (প্র)- অর্ণব সাহা
  • বাঙ্গালীর ইতিহাস – সুভাষ মুখোপাধ্যায়
  • হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি – গোলাম মুর্শেদ
  • নানান পত্র পত্রিকা এবং অন্তর্জাল

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x