শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

ছোটকেইর ছত্রধর

Shibanshu Dey

টিকরপাড়ায় পাহাড়ি গর্জের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়া গা শিরশির নদী। জায়গাটি রয়েছে সাতকোসিয়া টাইগার প্রজেক্টের মাঝখানে। প্রকৃতি সেখানে নিজেকে যে কীভাবে দান করে যায় একতরফা, না দেখলে প্রত্যয় হয়না। সেই অভয়ারণ্যের মাঝখানে চারদিকে পাহাড়ঘেরা একটি ছোট্টো গ্রাম ছোটকেই। পঞ্চায়েত, পুরানাকোট, জিলা অনুগুল। জিলা শহর অনুগুল সত্তর কিমি, রাজধানী ভুবনেশ্বর যেতে গেলে একশো ষাট। একদিকে টিকরপাড়া গর্জ অন্যদিকে লবঙ্গির অরণ্যরোমাঞ্চ। কপাল থাকলে বুনো জীবজন্তু দেখা যায়। তবে বেশি আশা না করাই ভালো। বাঘ, হাতি, কুমির, শুয়োর, চিতা, মোষ, হরিণ, নিজেদের মুডে থাকে। পর্যটকদের গার্ড অফ অনার দিতে ফল ইন দাঁড়িয়ে থাকেনা।

এককালের সাতকোসিয়া অভয়ারণ্য আর বৈসিপল্লি অভয়ারণ্যকে মিলিয়ে দিয়ে তৈরি হয়েছে সাতকোসিয়া টাইগার রিজার্ভ| চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা| ‘সভ্য’ মানুষের এলাকার বাইরে| গ্রাম পঞ্চায়ত অফিস রয়েছে পুরুনাকোটে| পাঁচ কিমি যেতে হবে| জেলা সদর সেই অনুগুল| সত্তর কিমি দূরে| ছোটকেই গ্রামে রয়েছেন পাঁচ-ছশো মানুষ| শ দেড়েক কাঁচা বাড়িঘর| বিদ্যুৎ নেই| নেই ফোন| নিকটতম স্বাস্থ্যকেন্দ্র‚ তাও পঁয়ত্রিশ কিমি| বিকেল ছটার মধ্যে দিন শেষ| মানুষজন ঘরের মধ্যে| ঘরের বাইরে তখন হরিণদের স্বর্গরাজ্য| নিকষ অন্ধকারে অগুন্তি সবুজ চোখ জ্বলছে‚ নিভছে| সূর্য জাগার আগেই মানুষজন জেগে যান| একুশ শতকেও মোবাইল ফোনের ছোঁয়াচ এড়িয়ে থাকা মানুষের অভয়ারণ্য।

ছোটকেইতে আছে প্রকৃতির উজাড় করে দেওয়া ভাণ্ডার। মানুষের তবু কোনও জীবিকা নেই। বিদ্যুৎ নেই। তাই নেই কোনও ছোটো প্রকল্প বা সেচ ব্যবস্থা। বছরে একবার ফসল হয়। বৃষ্টিজলের কৃপায়। লোকজন চলে যান শহরে মজুরি খাটতে। সামান্য কয়েকজন বনবিভাগের ঠিকে শ্রমিক। কয়েকজন বনবিভাগের অতিথিশালায় কাজ করেন। ঐটাই একমাত্র থাকার জায়গা । ছোটকেই নেচার ক্যাম্প। ছবির মতো কটেজ কয়েকটা। বনবিভাগ থেকে ব্যবস্থা করা যায়। জায়গাটা ঘন বনের ভিতর। আমিষভোজন নিষেধ। মাছের টুকরোর মাপ নিয়ে ক্ষুব্ধ বঙ্গবন্ধুরা সতর্ক হবেন।

কাকভোরে বেরিয়েছিলুম চারদিক মুআইনা করতে। রোদ উঠতে ফিরে আসি। স্নানটান করে সুন্দর খড়-ছাওয়া গোল ঠেকটায় পুরিসব্জি খেয়ে গান গাইছি ‘এ শুধু অলস মায়া’। হঠাৎ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গোঁগোঁ করতে করতে একটা মাহিন্দ্রা বোলেরো এসে দাঁড়ালো। সরাইখানার বাইরে। গাড়ির নম্বরটা ডবলিউ দিয়ে শুরু। দেখেই ব্রাহ্মণীকে বলি, যাও, তোমার নৈঃশব্দ্যের বিলাস এবারের মতো শেষ হলো। ড্রাইভার নেমে আসে। ক্যাম্পের ম্যানেজারকে বলে, পার্টি এসেছে। কাউকে পাঠাও মাল আনতে। ম্যানেজারবাবু বড়ো নিরীহ একজন মানুষ। ওড়িয়া ভাষাটাই জানেন। হিন্দি তথৈবচ। আমাদের সঙ্গে ওড়িয়াতেই কথা বলছিলেন। আমরা এককথায় ‘ভয়ানক’ ওড়িয়া’তে জবাব দিচ্ছিলুম। কাজ চলে যাচ্ছিলো। দুঃখ করছিলেন কলকাতা থেকেই বেশি লোকজন আসেন। অনেকেই বড়ো অবুঝ। এই গভীর বনের মধ্যে যে ইচ্ছেমতো খাবারদাবার পাওয়া যায়না তা বুঝতেই চাননা। একবার অনুগুল যাওয়া আসা মানে দেড়শো কিমি। তার উপর অনেক গাড়িভাড়া। চেষ্টা করি, বোঝাতে পারিনা।

গাড়ি থেকে নেমে আসেন বিভিন্ন মাপের জনা আষ্টেক মানুষ। কাগজ দেখান। তাঁদের দুটো ঘরের বুকিং। ম্যানেজার বলেন দুটো ঘরে চার জনের বেশি থাকতে পারবেন না। বনবিভাগের বিশেষ অনুমতি থাকলে একটা ঘরে তিন জন পর্যন্ত থাকতে পারেন। তার জন্য আলাদা মাশুল দিতে হবে। দুজন মহিলা ছিলেন তাঁদের শিশু সন্তানদের নিয়ে। বাচ্চাগুলি এতোদূর গাড়িতে ওভাবে ঠাসাঠাসি করে এসে খুব ক্লান্ত। প্রাণভরে চেঁচাচ্ছে। মায়ের ওপর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। তাঁদের ‘বিয়ে করা স্বামী’ দের উদ্দেশে ততোধিক চেঁচাচ্ছেন। কোথায় নিয়ে এলে জঙ্গলের মধ্যে? দুই পতিদেব ধূমপানের অছিলায় পগারপার। চারদিকে অরণ্যের আইন লেখা বোর্ডগুলো জ্বলজ্বল করছে। জঙ্গলের সীমার মধ্যে ধূম ও সুরাপান নিষিদ্ধ। কে শোনে কার কথা? সব তো ভাগলপুরে শরৎচন্দ্রের নতুনদার অবতার। ‘খাস কলকাতা’র লোক। সঙ্গে রয়েছেন বয়স্ক বাবা-মা। কথাবার্তায় বোঝা গেলো তাঁরা দুই মেয়ে ও দুই জামাইকে নিয়ে পুরী যাবার পথে ‘জঙ্গল’ ঘুরতে এসেছেন। কেন যে এসেছেন?

অ্যাই তুমহারা ইঁহা কোমোড হ্যায়। শ্বশুর মশাই গর্জন করেন। হাঁ সার। তবে রুম খোল দো। হামকো জানা হ্যায়। কিন্তু দুটি ঘরে আটজন কীভাবে থাকবেন তা এখনও ফয়সালা হয়নি। সবাই মিলে ঐ গভীর জঙ্গলের মধ্যে প্রায় বিয়েবাড়ি বসিয়ে দিয়েছেন। এক মহিলা জানতে চান, ইধর পর্যন্ত বাঘা আতা হ্যায়? নহি ম্যাডাম। সে কী? এখানেও বাঘ আসেনা। বেকার নিয়ে এলো। ক্ষোভে ফেটে পড়েন তিনি।

দুই বিপন্ন জামাই ম্যানেজারকে একধারে ডাকেন। বুঝতে পারি ডিল করার চেষ্টা হচ্ছে। ম্যানেজার ইঙ্গিতে আমাদের দেখিয়ে বলেন ওঁরা রেঞ্জারসাহেবের বন্ধু। জানতে পারলে আমার চাকরি চলে যাবে। তাঁরা আমাদের দিকে হিংস্র চোখে তাকান। শেষ পর্যন্ত ম্যানেজার আমার কাছে এসে কানে কানে বলেন, সার এঁদের ঘর দিয়ে দিই। আমি অবাক হয়ে বলি, আরে আমি তার কী জানি? বুকিং থাকলে দিয়ে দিন। না সার, রেঞ্জারসাহেব যদি জানেন…!! আমি বলি, ধ্যুৎ। তাঁরা শোভাযাত্রা করে কটেজগুলির দিকে এগিয়ে যান। ভাবি শান্তি হলো।

কিন্তু লর্ড জগড়নাথের ইচ্ছা অন্যরকম। মিনিট পনেরোর মধ্যেই দুজোড়া দ্যাবাদেবী ফিরে এলেন। ইধার লাঞ্চ কেয়া মিলতা হ্যায়? মেনু দেখাও। ম্যানেজার আবার বিপন্ন স্বরে জানান মেনু নেই। যা জিনিশ পাওয়া যায়, তাই রান্না হয়। মছলি ক্যা হ্যায়? বলা হয়, এখানে সব নিরামিষ। দুই মহিলা আবার ফেটে পড়েন। জামাই বাবাজিরা বলেন, জঙ্গল মে মুর্গা নেহি মিলতা? নহি সার। এবার কী হবে? বাবা মাছ ছাড়া কিছু খেতে পারেনা। টুবুনও মাছ না থাকলে ভাত মুখে তুলবে না। কোথায় নিয়ে এলে তোমরা? সে এক জ্যাড্যাপহ ব্যাপার। বাঘ নেই, মাছ নেই, কী চুলোর ছাই জায়গা?

আমি ব্রাহ্মণীকে বলি, কেটে পড়ো। ম্যানেজারকে বলি, রান্না হয়ে গেলে ডেকে নিও। নিজেদের কটেজে ফিরে আসি। একদিনের জন্য যথেষ্ট খোরাক জোগাড় হয়ে গেছে।

সন্ধেবেলা তাঁদের অন্ত্যাক্ষরীর চাপে হরিণরা আর এলোনা। আমরা ঘরে বসে শুনতে পাচ্ছিলুম, মিলির বিয়েতে মেজোকাকা চার রকম মাছের ব্যবস্থা করেননি। কিপ্টেমি যাবেনা। লোটনমামার মেয়ের পাখা গজিয়েছে। মামির কোনও কন্ট্রোল নেই। নানা যুগান্তকারী খবরাখবর। মাঝখানে বাচ্চাদের আকাশ ফাটানো ইন্টারল্যুড।

মানুন না মানুন, সব কিছু নিয়েই ছোটকেই পৃথিবীর তেমনি একটা জায়গা, যেখানে যেতে হয়। নয়তো? নাহ, পিছিয়ে পড়ার কোনও ব্যাপার নেই, তবে অফসোস থেকে যাবেই। একটাই তো জীবন …

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.