
উড়ানটাই জীবন। বাকি সময়টা সেই জীবনের জন্য অপেক্ষা করা। জুতোকে বিরাম দিতে নেই। এদিক ওদিক বেড়ানোর স্মৃতি নেড়েচেড়ে এই মুহূর্তে অপেক্ষা করি আবার কবে জুতোটা পায়ে উঠবে। গারদের মেয়াদ সবার বুকেই চেপে বসছে প্রতিদিন। শুধু প্রকৃতির কাছে সমর্পণ, নানা জায়গার উড়ান স্মৃতি নিয়ে জীবনের সাত কাহন গড়ে ওঠে।


ভূতের রাজার জুতো পাইনি তো গুপীবাঘার মতো। কিন্তু সাধটা রয়েছে টনটনে। তাই এক জায়গায় স্থির হয়ে ঝিমিয়ে থাকা হয়না কিছুতেই। আর যেমন দ্যাবা, তেমনি দেবী। হুট করতেই বেরিয়ে পড়া রেলগাড়ি, উড়োগাড়ি, নিজের গাড়ি, পরের গাড়ি, ইচ্ছেগাড়ি, সব চলতা। যেখানেই যাই, একটাই সাধ সেই জায়গাটা একটু স্নিগ্ধতা দিলো কী? জীবনে? এতো তেতেপুড়ে শুকনো হয়ে থাকা আমাদের নিত্যযাপন। রেহাই লাগে, অক্সিজেন লাগে, কাকভোরের শিশিরভেজা ঘাস লাগে, খালি পায়ের নীচে।

স্নিগ্ধতা মানে জল, স্নিগ্ধতা মানে সবুজ, স্নিগ্ধতা মানে মেঘ, স্নিগ্ধতা মানে পৃথিবীর নিত্যনতুন সাজ। তাই জলের কাছে যাই। মেঘসবুজে ঝলমলে রোদের কারুকাজ খুঁজতে খুঁজতে বার বার অরণ্যের কাছে আসা-যাওয়া।


সাতকোসিয়ার সংকীর্ণ গিরিসংকট বা ‘গর্জ’-এর চারদিকে যে ঘন অরণ্য সেখানে নানা ধরনের গাছপালা আর প্রাণীদের বিচিত্র সমাবেশ দেখা যায়। উনিশ শো ছিয়াত্তর সালে নদীর ওপারে নয়াগড় জেলায় নতুন অভয়ারণ্য তৈরি করা হয়। তার সরকারি নাম বইসিপল্লি অভয়ারণ্য। মহানদীর অববাহিকায় সাতকোসিয়া গিরিসংকটে সাতকোসিয়া অভয়ারণ্য ঘেরা আছে পাঁচটি জেলার আবেষ্টনীতে। অনুগুল, ঢেনকানল, কটক, বৌধ এবং নয়াগড়। এর ভিতরে একশো চারটি গ্রাম রয়েছে। সাতকোসিয়া বাঘ অভয়ারণ্যের এলাকা বিশাল। এর কোর এলাকা এগারো শো সাঁইত্রিশ বর্গ কিমি। ভূতত্ত্বের দিক দিয়ে বিচার করলে সাতকোসিয়া গর্জ ছোটনাগপুর মালভূমি আর পূর্বঘাট উপত্যকাকে পৃথক করেছে।

সাতকোশিয়া গর্জ বাইশ কিমি বিস্তৃত। এদেশের পূর্বঘাট পর্বতমালার দীর্ঘতম নদী গিরিসংকট রয়েছে সাতকোশিয়ায়। এই অভয়ারণ্যের বৃক্ষরাজি পর্ণমোচী স্বভাবের। মূলত শাল, সেগুন, গামার, আসন, ধাওড়া, বহু ধরনের বাঁশ, অর্জুন বৃক্ষের নয়নমোহন জঙ্গল মহল এখনও বহুলাংশে কুমারী এবং অরণ্যপ্রেমীদের স্বর্গ। সাতকোশিয়ায় সরকার টাইগার রিজার্ভ তৈরি করলেও এখন আর সেখানে ব্যাঘ্ররাজের সন্ধান পাওয়া যাবে না। অন্যান্য জন্তুজানোয়ারদের মধ্যে রয়েছে চিতাবাঘ, বুনো কুকুর, জংলি শুয়োর, হায়না, স্লথ ভালুক, লেপার্ড বেড়াল এবং বনবেড়াল। প্রচুর হাতি রয়েছে এই জঙ্গলে। তার সঙ্গে চিতল হরিণ, সম্বর, বার্কিং ডিয়ার, হনুমান, সজারু, প্যাঙ্গোলিন ইত্যাদি। নদীতে মগর এবং ঘড়িয়াল দুরকমের কুমিরই দেখা যায়। আর আছে বিশাল মাপের ভারতীয় অজগর। এখানে মহানদীতে বিপুল মাপের মাগুর মাছ ধরা পড়তেও দেখেছি।

পর্যটকদের থাকার জন্য এখানে দুটি নেচার ক্যাম্প তৈরি করা হয়েছে। নদীর বেলাভূমিতে টিকরপাড়া নেচার ক্যাম্পের সুইস তাঁবু ফেলা হয়। শীতকালে তার খুব চাহিদা। অন্যটি স্থায়ী ছোটকেই নেচার ক্যাম্প। পাহাড়ের উপর, জঙ্গল ঘেরা এই ঠেকটি অতুলনীয়। এছাড়া বাঘমুণ্ডা, তারাভা আর বালিপুটেও থাকার ব্যাবস্থা রয়েছে।

টিকরপাড়া এখন বাঙালিদের কাছে পরিচিত নাম। অনেক কিস্যাকাণ্ড লেখা হয়েছে তাকে নিয়ে বাংলায়। তবু এখনও তা কুমারী অরণ্য, বন্যকিশোরীর মতো উথালপাথাল নদী আর রোদচমকের ছোঁয়ায় জেগে ওঠা অনন্ত সবুজ। পাহাড়জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে উদ্দাম বয়ে যাওয়া সেই ছত্তিশগড়ী নারীটির আমরা নাম দিয়েছি মহানদী। এতো উঁচু পাড়ভাঙ্গা জলস্রোত এদেশে আমার বিশেষ চোখে পড়েনি। সাত ক্রোশ জুড়ে এঁকে বেঁকে ভাসিয়ে দেওয়া এই গর্জটির নাম সাতকোশিয়া। সঙ্গে ঘন জঙ্গল আর বাঘের রাজপাট। আর আগে যাওয়া মানা। থাকার জন্য বনবাংলা, ওয়াচ টাওয়ার আর অনন্ত নির্জনতা ছাপিয়ে অন্তহীন পাখির কলকল। অক্সিজেন, রোদ আর গেরুয়া জলের ঘূর্ণির কাছাকাছি বসলে সব ঘড়ি থেমে যায়। শহরের নিরাশা এতো দূর আর পৌঁছোতে পারেনা। বেঁচে থাকার কিছু নতুন মানে !! তাও একেবারে ফ্রী….