শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

লবঙ্গি- বুকের কাছাকাছি …

Shibanshu Dey

আজ এখানে মেঘ করেছে। সকালে খুব খানিকটা বৃষ্টি আর সোঁ সোঁ হাওয়া। লবঙ্গির কথা মনে পড়ল। বেশ তবে আজ লবঙ্গি বনের কথাই হোক।

লবঙ্গি রেঞ্জের বন আমাকে আলাদা করে টানে। সেখানে ঘোর সবুজের লণ্ডভণ্ড আর বাঘের অভয়ারণ্য, জলখাই দীঘি, আতা-কাঁঠাল খেতে আসা হাতির দঙ্গল, এদিক-ওদিক বয়ে চলা পাগলাঝোরার স্রোত, চারিদিকে পাহাড় আর পাহাড় আর তার কোলে ছবির মতো একটি বনবাংলা।

গণেশ পারিজা লবঙ্গির ফরেস্ট গার্ড। অনুগুলে ব্যাংকের একজন কর্তাকে বলেছিলুম, যাবো, একটু ব্যবস্থা করে রেখো। সে তো সোজা সাতকোসিয়ার রেঞ্জ অফিসারকেই বলে দিয়েছিল। ফলে খাতিরদারি কিঞ্চিৎ গুরুতর। গণেশের সঙ্গে একজন স্পটার, আরেক জন চৌকিদার, তার সঙ্গী। বোলেরোর আগে পিছে বসে তারা আমাদের নিয়ে লবঙ্গির অন্দরমহলে। জঙ্গলমহালের গেট পেরোলেই বাঁদিকে নীলপাহাড়ের পথে এগিয়ে গেছে সবুজ রাস্তা। লালমাটিতে সবুজ মাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া দুচাকায় লালমাটির সমান্তরাল অবণ্যের পথ। একটা চমৎকার বনবাংলা। যার হাতায় ছড়ানো গোল টেবিলচেয়ার। পাহাড় জঙ্গল দেখতে দেখতে চা-কফি। হ্যাঁ, জঙ্গলের ভিতর মদিরা কি মাংসের প্রবেশ নিষেধ। ঐ বনবাংলায় একটি রাত মনে থাকে, থেকে যায় বহুদিন। গাড়ি যায় গড়াতে গড়াতে। শব্দ করা মানা। কখন কোথায় হাতির দল রোঁদে বেরিয়েছে জানা নেই। ঠিক গ্রাম নয়, মাঝে মাঝেই দু-চারটে খড়চালার বাড়ি। গাছের মাঝখানে কোথায় লুকিয়ে থাকে ঠাহরও হয়না। বেশির ভাগই জঙ্গলমহালের কর্মচারী। কিছু আদি অধিবাসী। তাঁদের কথা জানা যায় যখন পাগলা হাতি খেপে গিয়ে দুচারজনকে পরপারে পাঠিয়ে দেয়। পথ যতো এগোয়, পাকদণ্ডী ঘাসে ঢেকে আসে। শাল, সেগুন, গামার, কেঁদ, কদম, সিসু, জাম, বনস্পতির দাঁড়িয়ে থাকা গায়ে গায়ে। এদিক-ওদিক রাস্তা ভাসিয়ে বয়ে যাওয়া আলতো ঝোরার জল তাকালেই ভিতরটা ধুইয়ে দিয়ে যায়।

ঐ রকম ঘন জঙ্গলেও যখন একটি লেভেল ক্রসিং আড়াআড়ি পথ রোধ করে বাঁধা , প্রশ্ন জাগে। গণেশ বলে, এর আগে আর গাড়ি যায়না। পর্যটকদের দৌড় এতোটাই। কিন্তু আপনাকে গেমট্যাংক পর্যন্ত নিয়ে যাব। যদি কপালে থাকে…. !! আমি তাকে বলি, দ্যাখো আমি জঙ্গল দেখতেই আসি, বাঘ দেখতে নয়। তুমি নিশ্চিন্ত থেকো। আমাকে ‘বাঘ’ দেখাবার কোনও দায়িত্ব তোমার নেই। সে খুশি হয়। ক্যালকাটা সে জো ভি আতা, পুছতা বাঘ কঁহা?

গেমট্যাংকের পথটার দুধারে ঘন সেগুনবন। ভাবি এমন গাছ কীকরে এতো নিরাপদে থাকে এখানে? গণেশ বলে এদের নিয়ে বড়ো জ্বালা। সারাক্ষণ পাহারা দিতে হয়। একবার পোচাররা গাড়ি নিয়ে ঢুকে গেলে শুধু সেগুনচন্দন নয়, দুচারটে বাঘেরও সত্যনাশ করে যাবে। ওয়াচ টাওয়ারে উঠতেই একরাশ হনুমানের কিচিমিচি। গণেশের কান খাড়া হয়ে যায়। ফিসফিস করে বলে, সার, মনে হয় বেরিয়েছে। একেবারে চুপ থাকতে হবে। হঠাৎ একটা দলছুট হরিণশিশু কোত্থেকে এসে গেমট্যাংকের পাশে ঘাসবনে ঢুকে পাতা চিবোচ্ছে। গণেশের মায়া হয়, এটা আজকে গেল!!

অনেকক্ষণ অরণ্যের জলজ, বাষ্পাকুল স্তব্ধতা। চুপ করে পাখির ডাক শোনা। কিছু দেখা যাচ্ছেনা। নাহ, আবার সেই হনুমান কুলের গাছ থেকে গাছে লাফ। ফেউয়ের ডাক। গণেশ বলতে যায়, আর এদিকে আসবে না। তার আগেই একটা চেনা গর্জন। ব্যাঘ্ররাজের ডাক ডপলার এফেক্টে দূরে চলে যাচ্ছে। আরও কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা। নীচে থেকে স্পটার হাত নাড়ে। আমরা নেমে আসি।

দিগন্তে ঘন মেঘ। গাড়ি ছাড়তেই জঙ্গলে ঘন বর্ষণ। সবুজধোয়া জলের প্রপাত লালমাটিতে আছড়ে পড়ছে। অরণ্য পেরোতে পেরোতেই নীলপাহাড়ের পিছনে মেঘ শাদা হয়ে আসছে যেন। লালধুলো ধোয়া আরও সবুজের সাম্রাজ্যে গাড়িটি এগিয়ে যায়, আহিস্তা আহিস্তা…
লবঙ্গি সর্বদাই থাকে, বুকের কাছাকাছি …

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.