
নীরবতাই ভাষা সেখানে। শব্দ মানে ট্রেসপাস। দেবীর রাজত্ব। যতোদূর চোখ যায়। শাল, সেগুন, গামার, সিসু, কেঁদ, কদম, পলাশ, শিমুল। দেবতারা সারি সারি বনস্পতি সেজে দাঁড়িয়ে আছেন। লালমাটির পথ ওঠে পড়ে। বের, করমের ডাল গায়ে এসে পড়বে এদিকওদিক করলেই। দেবরিগড় অভয়ারণ্যের পথ চলে গেছে চউরাসিমল পর্যন্ত। একুশ কিমি। বড়াখাণ্ডিয়া আর চউরাসিমলের মাঝেই দেখা যাবে জঙ্গলসংসারের ছোটো তরফ, বড়ো তরফ। বাইসন, সম্বর, বুনো শুয়োর, জংলি কুকুর। হয়তো চিতাও দেখা দিয়ে দেবে মর্জি হলে।



জায়গাটা হিরাকুঁদ বাঁধের উল্টোদিক। সম্বলপুর হয়ে যেতে হয়। মহানদীকে বেঁধে রাখা জলসাম্রাজ্য দেশের প্রথম নদীবাঁধ। তার বিপুলতা আর তো কোথাও দেখিনি। মহানদী নিজেই তো এক মায়ার প্লাবন। নিজেকে বারবার নতুন করে সাজায়। তার জন্মপ্রপাত ছত্তিসগড়ের সিহাওয়া পাহাড় থেকে ধামতারি, দণ্ডকারণ্যের মাঝখান দিয়ে ঢুকে যায় ওড়িশার পশ্চিম সীমান্ত। সম্বলপুর শহরের ধাত্রী মহানদী। সেখান থেকে পূর্বদিকে সাগরে বিলীন হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘপথের দুধারে সাজিয়ে রেখেছে সবুজের সাম্রাজ্য, জলের রাজতরঙ্গিনী।



দেবরিগড়ের বনবাংলো একটা রূপকথার দেশ। অনন্ত জলের পারে, অরণ্যঘেরা একটা নীরবতার চুপসাকিন। তাই তার নাম ‘নির্বাণ’। দিনের বেলা নীলজলের দিকে তাকিয়ে চোখের তরী বাওয়া। সাঁঝ ঢললেই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া নেইদেশের সীমাপার। দূর থেকে জলের শব্দ, বনের শব্দ, বনবাসীদের মেজাজে ডাকাডাকি। বাতি নিভিয়ে চুপ করে নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে চাঁদ নিজের বাড়ি ছেড়ে পথে নেমে আসে। রাতে বেরোনো সখত মনা। কিন্তু ভোরবেলা উঠতে পারলে দেবী উজাড় করে দেন তাঁর অক্সিজেন আর ক্লোরোফিলের ভাণ্ডার। এমন একটা দিকশূন্যপুরের বনবাংলো, কিন্তু সেখানে এসি আছে, গিজার আছে, আছে নিরামিষ পদের ভোজ্য। জঙ্গলে আমিষ খাওয়া মানা যে। খরচটা হয়তো একটু বেশিই লাগে। সরকার বলেন বনভোজনে আসা উদ্দণ্ড জনতাকে আটকাতে নাকি এই ব্যয়বাহুল্য। যে যাই বলুক দেবরিগড় না গেলে কিছু ছেড়ে যায়। আবার ঘুরে আসতেই হবে…



