
কালীঘাটের আদিগঙ্গার পাশে সেই বাড়িটায় আমি একবার গিয়েছিলাম। সেটা ১৯৮২ সাল। কয়েক বছর হল বিভিন্ন সংবাদপত্রে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা শুরু করেছি। অধুনালুপ্ত ‘যুগান্তর’ সংবাদপত্রের বিভাগীয় প্রধান কবি গৌরাঙ্গ ভৌমিক আমাকে বললেন, ‘প্রেমেন্দ্র মিত্রের একটা সাক্ষাৎকার নিয়ে এসো। তাঁর ছেলেবেলার কিছু কিছু মজার ঘটনা নিয়ে লেখাটা তৈরি করবে।’ যুগান্তরে তখন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ছেলেবেলা নিয়ে প্রতি সপ্তাহে ছোটদের পাতায় একটা সিরিজ বেরোতো। সেখানে বেশ কয়েকটা লেখা আমি লিখেছিলাম।
গৌরাঙ্গদা বলে দিলন, প্রেমেন্দ্র মিত্রের বাড়িটা কোথায়। তখন তো আর ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্টের অত ব্যাপার ছিল না। একদিন সকাল আটটার মধ্যে পৌঁছে গেলাম সেই বাড়িটায়। বাইরে থেকে দেখে কেমন শিহরিত হচ্ছিলাম। বাংলা সাহিত্যের সমস্ত মহারথীর পদধূলি ধন্য সেই তীর্থস্থান।
বাড়ির ভিতরে ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম দোতলায়। তখন তিনি হেলান দিয়ে বসেছিলেন একটি আরাম কেদারায়। প্রায় অথর্ব, দৃষ্টি অস্বচ্ছ। একজন তাঁর সামনে বসেছিলেন। পরে জেনেছি, তিনি এসে রোজ প্রেমেন্দ্র মিত্রকে বিভিন্ন লেখা পড়ে শোনাতেন।

অসম্ভব পড়ার নেশা ছিল প্রেমেন্দ্র মিত্রের। দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার পর বড় বড় ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে পড়াশোনা করতেন। পরিবারের আপত্তিতে সেটা বন্ধ হয়ে যায়। তখন একজন এসে রোজ তাঁকে সকালের কাগজ থেকে বিভিন্ন গল্প, উপন্যাস, কবিতা, বিশ্ব সাহিত্য, বিজ্ঞানের খবর সব পড়ে শোনাতেন। ওই বয়সের তরুণ কবি, লেখকরা কে কোথায় কী লিখছেন, সব খবর ছিল প্রেমেন্দ্র মিত্রের নখদর্পণে।
যাকগে, আমার কথায় ফিরে আসি। আমি তাঁকে প্রণাম করে বললাম, কেন এসেছি। বললাম, গৌরাঙ্গ ভৌমিক পাঠিয়েছেন। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে শিহরিত হচ্ছিলাম। মনের মধ্যে ভেসে উঠছিল এক এক একটা কবিতার পংক্তি। ‘আমি কবি যত কামারের আর কাঁসারির আর ছুতোরের, / মুটে মজুরের / আমি কবি যত ইতরের।’ বাংলার এভাবে সাব অল্টার্নদের পাশে দাঁড়িয়ে সেই সময় তিনি বেনজিরভাবে এসব কথা উচ্চৈঃস্বরে বলতে পেরেছেন। কিংবা আমার সেই প্রিয় কবিতা, ‘আমার শহর নয়কো তেমন বুড়ো, / অতীত কালের অস্থি মুদ্রা চৈত্য বিহার কিছু / পাবে না তার কোথাও মাটি খুঁড়ে।’
তাঁর সামনে দাড়িয়ে ছিলাম কয়েক মুহূর্ত। শ্রদ্ধাবনত আমি। আমার চোখের সামনে মুহূর্তে ছায়াছবির মতো অসংখ্য কীর্তি-বলাকা উড়ে উড়ে যাচ্ছিল। কবিতা, উপন্যাস, অমর চরিত্র ঘনাদা, গোয়েন্দা চরিত্র পরাশর বর্মা। শুধু কি তাই! বিশাল প্রতিভা নিয়ে তিনি শুধু তো সাহিত্যের অঙ্গনেই বিরাজ করেননি, চলচ্চিত্র জগতেও ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। সেই হাড় হিম করা ছবি ‘হানাবাড়ি’র কথাও মনে পড়ছিল। কীভাবে সব ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর চলার পথে একের পর একটা মাইলস্টোন বসিয়ে বসিয়ে এগিয়ে গিয়েছেন। এই বহুমুখী প্রতিভা সেই সময় কেউ দেখাতে পারেননি।

তন্ময়তা কাটল তাঁর কথায়। বললেন, ‘বোসো।’ আমি ডায়েরি পেন খুলে সামনে বসলাম। একটু ভেবে নিয়ে বলতে শুরু করলেন, তাঁর ছেলেবেলার কথা। আমি কান খাড়া করে শুনছি আর লিখছি। জড়ানো জড়ানো অস্পষ্ট কথা। সব শব্দ ভালো বুঝতেও পারছি না। খুব মন দিয়ে তাই শোনার চেষ্টা করছি।
ছেলেবেলায় একটা মেলা দেখার মজার স্মৃতির কথা বলছিলেন তিনি। একসময় বললেন ‘একটা ব্যইদার মায়া’। লিখতে গিয়ে থমকে গেলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী মায়া?’ উনি আবার বললেন। আমি বুঝতে না পেরে আবার জিজ্ঞেস করতেই তিনি গলা উঁচু করে বললেন, ‘ব্যইদার মায়া’। কিছুটা রাগত স্বর দেখে আমি বিপাকে পড়লাম। কী করব? কিছুই তো বুঝলাম না, কী লিখব!
পাশেই ছিলেন সেই সহায়ক ব্যক্তি। উনি আমাকে বিপদ থেকে বাঁচালেন। বললেন, ‘উনি বলছেন বেদের মেয়ে’। আমার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। তারপর আর কোনও অসুবিধা হয়নি। আমার মতো একজন অপরিচিত ছোকরার জন্য তিনি সময় দেবেন, সেটা আগে ভাবতেও পারিনি।
ইচ্ছে ছিল কবিতা নিয়ে দু’একটা কথা বলব। কিন্তু ওইরকম পরিস্থিতির পর এবং অমন মানুষের সামনে বসে আমার মতো সামান্য একজন তাঁর সঙ্গে আলোচনা করার স্পর্ধা দেখাতে পারিনি। প্রেমেন্দ্র মিত্রকে সবসময় এক ভিন্ন ধরনের স্রষ্টা হিসাবে মনে হয়েছে। কল্লোলের সেই যুগে বাংলা সাহিত্যে নতুন জোয়ার আনার একজন সাহিত্যিক হিসাবেই তিনি নিজেকে প্রকাশ করেননি। বহুমুখী প্রতিভার এক দিগন্ত আবিষ্কার হতে পারে তাঁর কীর্তির দিকে চোখ রাখলে।
আমাদের শৈশব ও কৈশোরে দেব সাহিত্য কুটির থেকে পুজোর সময় বেরত বিশেষ পুজো সংখ্যা। ‘উত্তরায়ণ’, ‘শুকসারি’, ‘অরুণাচল’, ‘উদ্বোধন’, ‘মন্দিরা’, ‘চন্দনা’ ইত্যাদি নাম হতো বইগুলির। বিভিন্ন সাহিত্যিক সেখানে লিখতেন। অসাধারণ সব গল্প, কবিতা। আজকের মতো এমন দৈন্যদশা বাংলা সাহিত্যের তখন ছিল না। সেগুলি পড়ে অল্প বয়সিদের মধ্যে গড়ে উঠত সাহিত্যিক হওয়ার স্বপ্ন। মিটত গল্প পড়ার তৃষ্ণা। সেখানেই আমি প্রথম প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখা পড়েছিলাম। কোনও বছর তিনি লিখতেন বিজ্ঞানের গল্প, কোনও বছর লিখতেন হাসির গল্প, লিখতেন ঘনাদার কাহিনি অথবা পুরাণের মধ্য থেকে নতুন কোনও আখ্যান। সেখানেই প্রথম ঘনাদার কাহিনি পড়েছিলাম, ‘জল’। ঘনাদার গল্পগুলোর এমনই নাম হতো। ‘কাদা’, ‘পোকা’, ‘ধুলো’, ‘মুলো’, ‘মশা’, ‘ছড়ি’, ‘টুপি’, ‘মাছ’ ইত্যাদি।

শিশুসাহিত্যে তাঁর কলম ছিল টানটান। যেসব শিশু তাঁর ‘পিঁপড়ে পুরাণ’ পড়েনি, তারা জানেই না শৈশব বা কৈশোরের স্বাদ কত মিষ্টি! আমাদের সময় এমন একটা কল্পবিজ্ঞানের কাহিনি শিহরিত করে তুলেছিল। আজ থেকে সাড়ে চার বা পাঁচ হাজার বছর পরের কাহিনি। তখন পিঁপড়েরা সারা পৃথিবী মানুষের কাছ থেকে দখল করার জন্য এগিয়ে আসছে। তারা সঙ্ঘবদ্ধ। তাদের বিশাল চেহারা। অসাধারণ তাদের বুদ্ধি। তাদের সবুজ রশ্মির বিচ্ছুরণ মানুষকে অন্ধ করে দিচ্ছে। সেখান থেকে মানুষ কীভাবে নিজেদের রক্ষা করল সেটাই কাহিনির উপজীব্য। গত তিরিশ বছর ধরে আমরা এমন কল্পবিজ্ঞানের কাহিনি প্রচুর পড়ছি। কিন্তু মনে রাখা দরকার, প্রেমেন্দ্র মিত্র এই কাহিনি লিখেছিলেন প্রায় একশো বছর আগে। কল্পবিজ্ঞান লেখায় তাঁকে উৎসাহ দিয়েছিলেন আর এক কল্পবিজ্ঞানের লেখক ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য।
যেকোনও বাঙালিকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায়, বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের মেসবাড়িতে থাকেন কোন বিখ্যাত চরিত্র? বেশির ভাগ পাঠকই বলে দেবেন, কে আবার ঘনাদা! বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ‘দাদা’ চরিত্রের মধ্যে তিনি হলেন অন্যতম বিখ্যাত এক দাদা। পরবর্তীকালে আমরা টেনিদা নামক একটি চরিত্রকে পেয়েছি নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কলমে। কিন্তু টেনিদার সঙ্গে ঘনাদার চরিত্রের অনেক তফাৎ। টেনিদা যেমন বাকসর্বস্বতার মধ্যে হাস্যরসের উদ্রেক করে, ঘনাদা তা নয়। তাঁর বলা গল্পগুলির মধ্যে আত্মজাহিরের ব্যাপার আছে, কৌতুক আছে। কিন্তু পাশাপাশি আছে তাঁর পাণ্ডিত্য, উইট, বিজ্ঞানমনস্কতা, ইতিহাস সচেতনতা এবং রোমহর্ষক অভিযান। বাংলা সাহিত্যে বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় মজলিশি চরিত্র আছে। তার মধ্যে ঘনাদা অন্যতম। ঘনাদার আগে এমন ধরনের চরিত্র বাংলায় কয়েকজন ছিল। যেমন ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ডমরু, পরশরামের কেদার চাটুজ্জে, সৈয়দ মুজতবা আলির চাচা, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বরদা প্রমুখ। কিন্তু ঘনাদার চরিত্রটি যেন অন্যমাত্রায় প্রতিষ্ঠিত। সেটা মজলিশি ভাষার মধ্যে যেমন ছিল, তেমনই ছিল চরিত্রটির বিজ্ঞানমনস্কতায়। তার মধ্য দিয়ে হাস্যরস তৈরি করে গিয়েছেন। এটা খুব সহজ কাজ নয়।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতাকে নির্দিষ্ট কোনও তাত্ত্বিক শ্রেণিতে ফেলা যাবে না। তাঁর কবিতায় শ্রেণি সচেতনতা, মেহনতি মানুষের কথা বারবার উঠে এলেও তিনি নির্দিষ্ট কোনও রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকেই সেসব লিখেছিলেন, তেমন নয়। আসলে একদিকে দেশের মধ্যে অসহযোগ আন্দোলনের পথ ধরে স্বাধীনতা আন্দোলনের স্ফূরণ, অন্যদিকে রাশিয়ায় বিপ্লবের সাফল্য, এর মধ্য থেকে নিজস্ব একটি মতবাদ তাঁর মননে সৃষ্টি হয়েছিল। সেটা ছিল এক সাম্যবাদের ভাবনা। সেই সঙ্গে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী নতুন পৃথিবীতে মানবতাবাদের অপমান তাঁকে নিদারুণভাবে পীড়িত করেছিল। তাঁর প্রতিবাদী মন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় সেই যুদ্ধবাজদের দিকে। ‘কার পাপে নিজেরে শুধাই / মোর ভগবান হল অন্নের কাঙাল, / বিকৃত কুৎসিত আর আত্মায় বামন।’ আবার মানবতাবাদের বিরুদ্ধে অগ্নিস্রাবী ভাষায় লেখেন, ‘আজ / বিকৃত ক্ষুধার ফাঁদে বন্দী মোর ভগবান কাঁদে, / কাঁদে কোটি মার কোলে অন্নহীন ভগবান মোর।’ এর থেকে মানুষকে মুক্তির দিশা দেখাতে চান তিনি। তিনি চান সূর্যের আলো এসে মুছে দিক পৃথিবীর ক্লেদ। ‘রোদ দাও। / একঘেয়ে একরঙা ম্যাড়মেড়ে ছবি / আত্মার অরুচি। / রোদ দাও / এ অশুচি মুছি।’

পাশাপাশি সেই সময় তাঁর প্রকাশিত ছোটগল্পগুলির মধ্যেও ফুটে উঠছিল অসহায় মানুষের কথা, শ্রেণি সঙ্কটের কথা। ১৯২৪ সালে বস্তিবাসীদের নিয়ে লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘পাঁক’ বা ছোটগল্প ‘শিকলির দাম’এ নিপীড়িত মানবাত্মার ক্রন্দনই ধ্বনিত হয়।
অথচ কোনওদিন তিনি লেখক বা কবি হওয়ার কথা ভাবেননি। এক আপাত বোহেমিয়ান জীবন যাপন করছিলেন। সেই অর্থে স্থির ছিল না তাঁর জীবনের লক্ষ্য। কোন্নগরের মিত্র পরিবারে জন্ম হয়েছিল তাঁর মা সুহাসিনী দেবীর। কিন্তু প্রেমেন্দ্রর জন্মের পরই তাঁর বাবা জ্ঞানেন্দ্রনাথ মিত্র দ্বিতীয় বিবাহ করেন। এরপরই শিশুসন্তানকে নিয়ে তাঁর মা আপন পিতৃগৃহে ফিরে যান। প্রেমেন্দ্র মিত্রের দাদু ছিলেন খ্যাতনামা ডাক্তার রাধারমণ ঘোষ। উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুরেই কেটেছে তাঁর ছেলেবেলা। সেখানে রেল হাসপাতালের ডাক্তার ছিলেন রাধারমণ ঘোষ। সেখানকার রেল কোয়ার্টার, মুক্ত প্রকৃতি, দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ, অনেক দূরে এক সীমাহীন দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়া রেললাইন দেখেই তাঁর দিন কাটত। ওই রেললাইন যেন তাঁকে ডাকত। সেই ডাক তিনি বারবার নিজের জীবনে শুনেছেন। তাই বোধহয় আজীবন এক বোহেমিয়ান, উড়নচণ্ডীর জীবনের প্রতি ভালোবাসায় আশ্লিষ্ট হয়ে থেকেছেন।
সেখানে তাঁর সঙ্গী ছিল লজ্জু আর মুরাদ। লজ্জু মেয়েটি খুব সুন্দর গল্প বলতে পারত। সেই গল্পের টান যেন তাঁর ভাবলোকের অন্দরে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছিল সৃষ্টির এক নিঃশব্দ আহ্বান।
শৈশবেই দাদুর মৃত্যু হলে দিদিমার হাত ধরে চলে আসেন কলকাতায়। দিদিমাকে খুব ভালোবাসতেন প্রেমেন্দ্র। আদর করে ডাকতেন ‘ঠাটু’। ভর্তি হলেন সাউথ সুবার্বন স্কুলে। পড়ার বইয়ের থেকে গল্পের বই বেশি টানতে লাগল। সেই সব পড়তে গিয়ে প্রতিদিন হোমওয়ার্ক করা হতো না। তার জন্য শাস্তিও জুটত।
ভালোভাবে ম্যাট্রিক পাস করলেন। হেডমাস্টার জিজ্ঞাসা করলেন, এবার কী পড়তে চাও। প্রেমেন্দ্র বললেন, বড় ফুটবলার হতে চাই। কিন্তু একবার স্কটিশ চার্চ কলেজে আর্টস নিয়ে ভর্তি হলেন। সেখানে ভালো লাগল না। আশুতোষ কলেজে ভর্তি হলেন সায়েন্স নিয়ে। এদিকে মন বলছে, ডাক্তারি পড়বেন। কিন্তু একদিন ফস করে চলে গেলেন শ্রীনিকেতনে। ইচ্ছে কৃষিবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করা। ওরে বাবা, ভোর পাঁচটায় ওঠো, চাষ করো, জমির মাটি কাটো, চাষ করো, সেচ দাও, ফসল ফলাও। এ জীবন চেয়েছিলেন নাকি? সুতরাং আবার মাথায় ডাক্তারি পড়ার পোকা নড়ে উঠল। চলে গেলেন ঢাকা কলেজে ডাক্তারি পড়তে। সেখানে বিশেষ সুবিধা হল না। সেখানে আগে সুযোগ পাবেন ঢাকার ছেলেরাই। সুতরাং ঢাকায় থেকে লাভ কী? সব কিছু ছেড়ে ব্যাক টু ক্যালকাটা। দিদিমা তখন কাশীতে। তাই ভবানীপুরের বাড়িটি তিনি ভাড়া দিয়েছেন। এবার তাই উঠলেন একটা মেসে। ২৮ নম্বর গোবিন্দ ঘোষাল লেন। এই মেসজীবনের স্মৃতিই বারবার তাঁর ঘনাদার গল্পে ফিরে এসেছে। ২৮ নম্বর গোবিন্দ ঘোষাল লেনই তাঁকে ঠেলে দিল এক সাহিত্যিক হওয়ার কক্ষপথে। অদ্ভুত সেই গল্প।
যে ঘরে তাঁর জায়গা হল, সেই ঘরের কুলুঙ্গিতে ডাঁই করা জিনিসপত্র। আগের বোর্ডার ফেলে চলে গিয়েছিলেন। সেসব পরিষ্কার করতে গিয়ে খুঁজে পেলেন একটা পোস্টকার্ড। কৌতূহল বশত পড়ে ফেললেন চিঠিটা। একটা লাইনে এসে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। লেখা আছে, ‘বৌমার আজও জ্বর এসেছে। দেখতে দেখতে দু’মাস হয়ে গেল। ঘুসঘুসে জ্বর, কিছুতেই সারছে না।’ কল্পনার ভিতর যেন একরাশ কল্পকথা ভিড় করে আসে। প্রকাশ করতে ইচ্ছে করে সেইসব ভাবনা। বসে পড়লেন কাগজ কলম নিয়ে। রাত জেগে লিখে ফেললেন দুটো গল্প। পাঠিয়ে দিলেন প্রবাসীর দপ্তরে। তার পর টেনশন নিয়ে অপেক্ষা। অবশেষে পর পর দু’মাসে প্রকাশ পেল তাঁর লেখা সেই দু’টি গল্প, ‘কেরাণী’ এবং ‘গোপনচারিণী’।

অসীম প্রতিভার অধিকারী প্রেমেন্দ্র মিত্রের কথাসাহিত্য আজ হয়তো সেভাবে পাঠকের কাছে আদৃত নয়। আজকেই এই থ্রিলার সর্বস্ব যুগে শুধু ঘনাদা আর পরাশর বর্মার কিছুটা কদর আছে। বাকি যেন সব কালের গহ্বরে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। আসলে সময়ের বিবর্ণ প্রান্তর, যন্ত্রণার দগ্ধ অনুভূতি কিংবা মানবাত্মার ক্রন্দনের প্রেক্ষাপট তাঁর কথাসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। এছাড়া মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, তার জটিলতা, মননের গভীরে তার মনস্তাত্ত্বিক রহস্য, তাও তাঁর সাহিত্যে প্রকাশ পেয়েছে। আসলে তিনি উপন্যাস, গল্প বা কবিতার নিজস্ব ক্ষেত্রটিকে ভালো করে চিনতেন। জানতেন, কোথায় তাদের নিজস্ব সীমান্তরেখা। তাই বোধহয় তিনিই একমাত্র বলতে পারেন, ‘কোনও বিশেষ কাল ও দেশকে চিনতে বুঝতে উপন্যাসকে যদি কতকটা মানচিত্র ভাবা যায়, কবিতাকে ধরা যায় তার আকাশপ্রদীপ, তাহলে ছোটগল্পকে বোধ হয় জানালা বলা যায়, যে উন্মুক্ত জানালায় এক পলকের দেখায় একেবারে ভেতরের আসল প্রাণস্পন্দনটুকু আশ্চর্যভাবে আমাদের কাছে উদ্ভাসিত হয়।’
সেই প্রাণস্পন্দনকেই লক্ষ্য করা যায় তাঁর বিভিন্ন ছোট গল্পে। ‘শুধু কেরাণী’, ‘বিকৃত ক্ষুধার ফাঁদে’, ‘সংসার সীমান্তে’, ‘মহানগর’, ‘ভবিষ্যতের ভার’, ‘শবযাত্রা’, ‘পরাভব’, ‘পলাতকা’, ‘ছায়া কায়া’ সহ অসংখ্য গল্পে ফুটে ওঠে মানব মনের জটিলতা। সেই অন্ধকার মনের গোপন কোণে তিনি ফেললেন আলো। সেই আলোর সঙ্গে মিশে ছিল ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের রশ্মি। নতুন ব্যাখ্যায় আলোকিত করলেন মানুষের সম্পর্ক এবং নগর জীবনের দ্বন্দ্বকে।
জীবনে বারবার সাফল্য এলেও তিনি থমকে যাননি সেই খ্যাতির চৌহদ্দির মধ্যে। জীবনের মধ্যেও তাঁর ছিল এক উড়নচণ্ডী ভাবনা। কোথাও যেন থামতে জানেন না। এক অবিরত আত্মিক তাড়না তাঁকে বারবার ঠেলে দেয় উজানের দিকে। ঘাটে তরী ভিড়াতে গিয়েও যেন আর ভেড়ানো হয় না। আবার ভেসে চলেন। সাহিত্যের অঙ্গনেও তিনি এমনই এক অতৃপ্ত প্রতিভা। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ সবক্ষেত্রেই তিনি বারবার সাফল্যের স্পর্শ রেখেছেন, পেয়েছেন অজস্র খ্যাতি। কিন্তু তাও থমকে যাননি। তাঁর চরৈবেতি মন যেন বারবার বলেছে হেথা নয় হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে। সেই চরৈবেতি মন একদিন তাঁকে ঠেলে দিল সেলুলয়েডের জগতের দিকে।
গত শতকের চল্লিশের দশকে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। চারিত্রিকভাবে তিনি কোনও কিছুর সঙ্গেই একভাবে বেশিদিন জড়িয়ে থাকতে পারতেন না। তিনি নিজেই বলতেন, তাঁর একটু আলসেমি আছে। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো একটা গল্প লিখতে বসেছেন। বিকেলে সম্পাদক আসবেন লেখা নিতে। লেখা তখনো শেষ হয়নি। তার মধ্যেই ‘ধুর আর লিখতে ভালো লাগছে না’ বলে লেখার টেবিল থেকে উঠে চলে যেতেন তাসের আসরে। মনে করতেন দু’চার দান তাস খেলে নিলে আবার হয়তো লেখার মেজাজটা ফিরে আসবে। চলচ্চিত্র জগতেও তাঁর আসাটা ছিল অনেকটা হাওয়া বদলের মতো। এক দশক কাটিয়ে তাই আবার তিনি ফিরে আসেন লেখার জগতে।
প্রেমেন্দ্র মিত্র নিজে কোনওদিন সিনেমা জগতে আসার কথা ভাবতেই পারেননি। তাঁর লেখা নিয়ে ছবি হবে, এমন কথা কোনওদিন ভাবেননি। অথচ তিনিই হয়ে গেলেন বাংলা ১৪টি চলচ্চিত্রের সফল পরিচালক। এমনটি সম্ভব হতো না, যদি শিবরাম চক্রবর্তীর মতো একজন বন্ধু তিনি পেতেন।

শিবরাম মাঝে মাঝেই প্রেমেন্দ্রকে বলতেন, একটা গল্প দাও না। কয়েকজন পরিচালক চাইছেন। বারবার প্রেমেন্দ্র এড়িয়ে যেতেন। একদিন স্টুডিওপাড়া থেকে তাঁকে একজন ডেকে পাঠালেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করতেই তিনি বললেন, ‘আপনার গল্পের একটা জায়গা আপনাকে বদলে দিতে হবে।’ আকাশ থেকে পড়লেন প্রেমেন্দ্র। তিনি তো কোনও গল্প লেখেননি। সেই ব্যক্তি তাঁকে বললেন, ‘আমি সেই জায়গাটার কথা বলছি, যেখানে আপনি লিখেছেন সেই বান্ধবী দার্জিলিংয়ে গিয়ে সকলের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করে বিবস্ত্র হয়ে গেলেন।’
প্রেমেন্দ্র কী বলবেন, ভেবেই পেলেন না। এ গল্প তাঁর নামে কী করে এখানে এলো? এমন গল্প তিনি তো লেখেননি। পরে জানা গেল এ কাজ শিবরাম চক্রবর্তীর। তখন তিনি হাসবেন না শিবরামকে তিরস্কার করবেন, বুঝে পেলেন না। শিবরাম সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রেমেন্দ্র একবার বলেছিলেন, ‘ও আমার একটা অহঙ্কার।’
ছবির কাজে হাত দেওয়ার পরই ছবির প্রয়োজনে তাঁর গান লেখার সূচনা। লিখেছেন অসংখ্য গান। তার মধ্যে বেশ কয়েকটি গান সেই সময় মানুষের মুখে মুখে ফিরত। কমল দাশগুপ্তের সুরে যোগাযোগ ছবির দুটি গান খুব হিট করেছিল। একটি রবীন মজুমদারের কণ্ঠে ‘এই জীবনে যত মধুর ভুলগুলি, এবং কানন দেবীর কণ্ঠে ‘যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন।’
সুতরাং কী সৃষ্টিশীলতায়, কী জীবনবিন্যাসে তিনি সব সময় এগিয়ে গিয়েছেন চরৈবেতির মন্ত্রে। বন্দরের নোঙর বাঁধা জীবনে তিনি কোনোদিনই আটকা পড়েননি।

