শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

নাগরিক কবিয়াল ভূপেন হাজারিকার শতবর্ষ

‘বিস্তীর্ণ দু’পারের অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনে নিঃশব্দে নীরবে, ও গঙ্গা তুমি, ও গঙ্গা বইছো কেন—’। এই গান তাঁকে অমর করে রেখেছে। তবে গানটি শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা হলেও এটি অনুপ্রাণিত। গানটির একটি প্রেক্ষিত রয়েছে। প্রায় একশো বছর পূর্বে, ১৯২৭ সালে দুই বন্ধু কবি অস্কার হ্যামারটাইন জুনিয়র এবং সুরকার জেরোম কার্ন তাঁদের পরবর্তী প্রযোজনার জন্য একটি গান বাঁধলেন। সেটি ছিল ‘Old man river’। পাঁচের দশকে পল রোবসনের গলায় সেই গান দাবানলের মতো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। গান সেখানে আর নান্দনিক বিনোদনের মাধ্যম হয়ে রইল না। তা সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ হয়ে উজ্জীবিত করল সারা বিশ্বের মানুষকে। বিশেষ করে যাঁরা নিপীড়িত, যাঁরা বর্ণবৈষম্যের শিকার, তাঁদের কাছে এই গান হয়ে উঠল হাতিয়ার।


সেই সময় এক ভারতীয় ছাত্র ছিলেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকগানের গবেষক। সেই গানের স্ফুলিঙ্গ তাঁকেও স্পর্শ করেছিল। তিনি মিসিসিপির সেই গানের ভেলাকে ভাসিয়ে দিলেন ব্রহ্মপুত্রের খরস্রোতে। সেই ছাত্রটি ছিলেন ভূপেন হাজারিকা। তৈরি হল অসমিয়া ভাষায় ‘বিস্তীর্ণ পারারে’। একদিন ভূপেন হাজারিকা শিবদাসকে বললেন, ‘এই গানটি বাংলা ভাষায় লিখে দিন।’ ব্যস, মিসিসিপি ও ব্রহ্মপুত্রের পর সেই গান তৈরি হল গঙ্গাকে নিয়ে। শিবদাস লিখলেন, ‘বিস্তীর্ণ দু’পারের’ গানটি। গাইলেন ভূপেন হাজারিকা। কথা, সুরে ও গায়কীর ত্রিধারায় যেন ইতিহাস সৃষ্টি হল। গান যে এমন উদ্দীপক হতে পারে, প্রেরণার উৎস হতে পারে, কিংবা রোমাঞ্চিত করতে পারে, তা আবার নতুন করে বোঝা গেল। এখানে বহমান গঙ্গা যেন বিপ্লবের মন্ত্রদাত্রী হয়ে ওঠে। মানুষকে জাগিয়ে তোলার এক শক্তি হয়ে ওঠে। এই গান বার বার গঙ্গার কাছে প্রশ্ন রাখে, মানবতার পতন দেখেও গঙ্গা নিঃশব্দ অলসভাবে বইছে কেন? এই গান যেন এক সাম্যবাদের ভাবনাকেই প্রকাশ করে, কলুষিত সমাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্রোত বইয়ে দেওয়ার কথা বলে। গঙ্গার বহমানতার সুরেই যেন জেগে ওঠে অসংখ্য প্রশ্ন। ‘জ্ঞানবিহীন নিরক্ষরের, খাদ্যবিহীন নাগরিকের, নেতৃবিহীনতায় মৌন কেন?’ শুনলে মনে হয়, এ গান শুধু কোনও সময়ের প্রকোষ্ঠে রুদ্ধ হওয়ার নয়। তা যেন সর্বকালীন আবেদন নিয়ে প্রকাশিত।

যুবক ভূপেন হাজারিকা


লোকায়ত গানের সুরে ভূপেন বেঁধেছিলেন প্রেম ও প্রতিবাদকে। তার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর সাম্যবাদী সমাজভাবনা। দীর্ঘ ছিল তাঁর গায়কী জীবন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে প্রথম গান গেয়েছিলেন অসমীয়া ছবি ‘ইন্দ্রমালতী’। শৈশব থেকেই গানের টান অনুভব করতে থাকেন। মাত্র দশ বছর বয়সে গান লিখে সুরারোপ করে সকলকে চমকে দেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে লিখলেন অসাধারণ গান, ‘অগ্নিযুগর ফিরিঙ্গাথি মাই’, অর্থাৎ আমি অগ্নিযুগের এক স্ফুলিঙ্গ।

সারাজীবনে অসংখ্য গান গেয়েছেন তিনি। তার মধ্যে তাঁর ভালোবাসা ছিল লোকগানের প্রতি। লোকগানের প্রখ্যাত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস আমাকে বহুদিন আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ভূপেন হাজারিকা হলেন বাংলা লোকগানের অন্যতম রক্ষাকর্তা। যদিও ভূপেনের লোকগানে আধুনিকতার ছোঁয়া এসেছে, তবু এই গানকে বাঁচাতে কী অপরিসীম কষ্টস্বীকার করেছেন, তার কথা ইতিহাস লিখে রাখেনি।‘ আসলে গত শতাব্দীর ছয়ের দশকে বাংলা, অসম এবং ত্রিপুরার গ্রামে গ্রামে ঘুরে যে তিনজন ব্যক্তিত্ব লোকগানের সংরক্ষণ এবং লোকশিল্পীর অন্বেষণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভূপেন হাজারিকা। বাকি দু’জন ছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস এবং নির্মলেন্দু চৌধুরী। তাঁদের আবিষ্কার ছিল ‘মাহুত বন্ধু রে’-খ্যাত প্রতিমা বড়ুয়া।

ভূপেন হাজারিকা, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, নির্মলেন্দু চৌধুরী

ভূপেন হাজারিকা আজীবন তাঁর গানে একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করে গিয়েছেন। সমাজের শোষিত মানুষরা বারবার উঠে এসেছেন তাঁর গানে। ব্রহ্মপুত্রের বহমানতা তাঁর গানে বিস্তর প্রভাব ফেলেছে। মানুষের জীবন তাঁর গানে বারবার ফিরে এসেছে। তাই ‘চারণকবি’ ভূপেন হাজারিকা তাঁর গানে মানবিকতা, শোষণহীনতা, সংহতির কথা বলেছেন। সেই সুর সমস্ত প্রাদেশিকতার বেড়া ভেঙে বিশ্বজনীন হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া, বুকের মধ্যে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।‘ ভূপেন গাইলেন, ‘আমি এক যাযাবর।‘ সেখানে তিনি দেশের গণ্ডি ভেঙে সুরের মধ্য দিয়ে দিলেন বিশ্ব নাগরিকতার বার্তা।

সেই বার্তা আজও অম্লান। ১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্ম। সেই অর্থে শতবর্ষে পা রাখলেন তিনি। শতবর্ষে মনে হয়, আরও অনেকদিন বেঁচে থাকবে তাঁর গান। অবশ্য তিনি তো শুধু একজন গায়ক নন, তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, রাজনীতিবিদ এবং প্রগতিশীল লেখক।

বাংলা গানকেও তিনি সমৃদ্ধ করেছেন নানাভাবে। তাঁর বিখ্যাত গানগুলি বাঙালি ভোলেনি। আজ বাংলা গানের দৈন্য অবস্থার মধ্যে তাঁর গানগুলি আমাদের মেলোডি ও ভাবনায় ঋদ্ধ করে রাখে। যখন তিনি তাঁর ব্যারিটোন ভয়েসে গেয়ে ওঠেন, ‘যত বন্ধ হাজার দুয়ার ভেঙে আয়রে ছুটে আয়’, তখন আমাদের বুকের ভেতর যেন আমরা মুক্তির উল্লাস ও প্রেরণা অনুভব করি। কিংবা যখন শুনি ‘যুগে যুগে ছুটি মোরা কাঁধে নিয়ে দোলাটি দেহ ভেঙে ভেঙে পড়ে’, তখন যেন শ্রমজীবী মানুষের বেদনার ঘাম ঝরে পড়ে তার সুরের সঙ্গে। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গানে বেজে ওঠে এক বিশ্বপথিক মানুষের সহমর্মিতার বেদনা।


আসলে তিনি তাঁর গানের উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন তাঁর মায়ের কাছ থেকে। মা শান্তিলতা হাজারিকা। অসমে মায়েরা শিশুদের ঘুম পাড়ানোর জন্য একধরনের গান গাইতেন। একে বলেন লুলারি গান। অর্থাৎ লোরি সঙ্গীত। যেমন, ‘ঘুম ঘুম আরা বাপুনে / চাঁদরে মেলা আকাশত / মাকর কোলাত তুই শুই পর / সপনোত ফুলেরে খেলা কর।‘ অর্থাৎ ঘুম তুই চোখে আয় বাবুর / চাঁদে ভরা আকাশে/ মায়ের কোলেতে ঘুমিয়ে পড় / স্বপ্নে ফুল নিয়ে খেলা কর। সেইসব গান ভূপেনের শৈশব ও কৈশোরে বিরাট প্রভাব ফেলেছিল। পরবর্তীকালে তিনি বিভিন্ন লোকগান ও লোকসুরকে আধুনিকতার আঙ্গিকে এনে তাকে বিশ্বজনীন করে তোলার চেষ্টা করেছেন। যেমন অসমের বিহু গান, ডেফেলা, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, এইসব লোকসুরকে আধুনিক কথা ও বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে পরিবেশন করে শ্রোতাদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন।তার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনদর্শন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার দিকটি প্রকাশিত হয়েছে।

চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবেও তাঁর সার্থকতার শেষ নেই। অসমীয়া, বাংলা ও হিন্দি ছবি মিলিয়ে তিনি প্রায় ২০টি ছবিতে সুর দিয়েছেন। তার মধ্যে বাংলা ‘চামেলী মেমসাহেব’ ছবিতে সুরারোপের জন্য তিনি পান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ১৯৯২ সালে তিনি পান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার। ২০১৯ সালে পেয়েছেন ভারতরত্ন।

প্রথম জীবনে তিনি বামপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। মুম্বইয়ে আইপিটিএ—র কাজ করার সময় তিনি সলিল চৌধুরী, বলরাজ সাহানি, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে আসেন। বামপন্থী ভাবনায় লালিত হলেও তিনি কোনওদিন পার্টির সদস্য হননি। তিনি ছিলেন কংগ্রেসের কড়া সমালোচক।

কিশোর কুমার, ভূপেন হাজারিকা, লতা মঙ্গেশকার

তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে অনেকেই অবশ্য সেভাবে জানেন না। অসমে তিনি দু’বার নির্দল প্রার্থী হিসাবে জিতে বিধায়ক হন। ১৯৬৭ এবং ১৯৭২ সাল। সেবার ভারী মজার এক ঘটনা ঘটেছিল। একবার বাজেটের ওপর আলোচনা চলছে। তখন রাজ্যে কংগ্রেসের অর্থমন্ত্রী কামাখ্যা প্রসাদ ত্রিপাঠী। সেই বাজেট বক্তৃতায় প্রতিবাদ জানিয়ে সভায় গান গেয়ে উঠলেন ভূপেন। গানের শেষে সবাই টেবিল চাপড়ে সাধুবাদ জানালেন।

জীবনের শেষপর্বে এসে তিনি বিজেপির প্রার্থী হয়ে ভোটের লড়াইয়ে নামেন। গুয়াহাটি লোকসভা আসন থেকে তিনি ২০০৪ সালে লড়াই করে কংগ্রেস প্রার্থীর কাছে হেরে যান। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আজ অসমে যে বিজেপির একচেটিয়া আধিপত্য, তার মূলে রয়েছেন ভূপেন হাজারিকা। তার জনপ্রিয়তাকে মূলধন করেই অসমে বিজেপি এগিয়েছে।

ভূপেন হাজারিকা নিজেই স্বীকার করেছেন, তাঁর গানের চিন্তাভাবনা ও প্রেরণার উৎস ছিল বামপন্থী মানবতাবাদ। সেই সময় বহু বামপন্থী আন্দোলনে তাঁর গান হয়ে উঠেছিল এক প্রেরণা। কিন্তু বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর অনেকে তাঁর সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠেন। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া নিয়ে তিনি তাঁর যুক্তি দিয়েছেন। বলেছেন, বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কারণ, আমার মনে হয়েছে, এতে করে আমি সংস্কৃতির প্রসারে ও উত্তর পূর্ব ভারতের উন্নতির জন্য আমি কাজ করতে পারব।

শেষের দিকে অবশ্য তাঁর মোহভঙ্গ হয়েছিল। মানুষও তাঁর মৃত্যুর পর এসব মনে রাখেনি। কেননা ভূপেনের শক্তি তাঁর গান। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর গানে। তাঁর কণ্ঠের মধ্যে রয়েছে এক দুর্বার প্রত্যয়। সেই প্রত্যয় আরও অনেকদিন মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে। যখনই মানুষ সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে কোনও প্রতিবাদের গান গাইবে, শ্রেণিহীন সমাজের ভাবনা নিয়ে গান বাঁধবে অথবা বিশ্বজনীনতার ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হবে, তখনই অনিবার্যভাবে আসবে ভূপেনের গান। মৃত্যুহীন গানের নাগরিক কবিয়াল ভূপেন হাজারিকা।

[লেখকের পূর্ব রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x